Logo

আস্থা সংকটে দেউলিয়া ব্যাংক, উত্তরণের পথ কী?

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
১৫ জুলাই, ২০২৬, ১৬:৫৯
আস্থা সংকটে দেউলিয়া ব্যাংক, উত্তরণের পথ কী?
ছবি: সংগৃহীত

দেশের ব্যাংকিং খাতে আস্থার সংকট দিন দিন গভীর হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি থেকে অল্প কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে আমানতকারীরা হাজার হাজার কোটি টাকা তুলে নিয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্টদের মতে, ব্যাংকটির চেয়ারম্যান হিসেবে খুরশীদ আলমের নিয়োগের পর এই অর্থ উত্তোলনের প্রবণতা আরও বেড়ে যায়। তাকে ঘিরে এস আলম গ্রুপের সঙ্গে সম্পৃক্ততার আলোচনা থাকায় অনেক আমানতকারী ব্যাংকটির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।

অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এস আলম গ্রুপ ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের পর ব্যাংকটি থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে বের করে নেওয়া হয়। এসব অভিযোগের প্রেক্ষাপটে ব্যাংকটির আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয় এবং ধীরে ধীরে আমানতকারীদের আস্থা কমতে শুরু করে।

‘ব্যাংক রান’ কী এবং কেন এটি ভয়ংকর?

বিজ্ঞাপন

ব্যাংকের মূল কাজ হলো গ্রাহকদের কাছ থেকে আমানত গ্রহণ করে সেই অর্থ ঋণ হিসেবে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিতরণ করা। ফলে কোনো ব্যাংকের ভল্টে সব আমানতকারীর টাকা একসঙ্গে ফেরত দেওয়ার মতো নগদ অর্থ থাকে না।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

যখন বিপুলসংখ্যক গ্রাহক একই সময়ে তাদের জমা অর্থ তুলে নিতে শুরু করেন, তখন সৃষ্টি হয় ‘ব্যাংক রান’ নামে পরিচিত পরিস্থিতি। এতে ব্যাংকের নগদ অর্থ দ্রুত ফুরিয়ে যায় এবং স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে ব্যাংকের শাখা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের তথ্য অনুযায়ী, ইসলামী ব্যাংককে ১৩ হাজার কোটি টাকার সহায়তা দেওয়া হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই অর্থায়নের কারণেই আপাতত ব্যাংকটিতে বড় ধরনের ‘ব্যাংক রান’ ঠেকানো সম্ভব হয়েছে।

শুধু চেয়ারম্যান পরিবর্তনে সমাধান নয়

যদিও খুরশীদ আলমকে চেয়ারম্যানের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, তবে অনেক অর্থনীতিবিদের মতে এতে মূল সমস্যার সমাধান হয়নি।

বিজ্ঞাপন

প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যা ব্যাংকটির মোট ঋণের ৫০ শতাংশেরও বেশি। এত বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণ একটি ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তিকে মারাত্মকভাবে দুর্বল করে দেয়।

একাধিক ব্যাংকে একই চিত্র

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইসলামী ব্যাংক একক কোনো উদাহরণ নয়। গত কয়েক বছরে দেশের আরও কয়েকটি ব্যাংক একই ধরনের সংকটে পড়েছে।

বিজ্ঞাপন

অভিযোগ রয়েছে, প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলো পরিচালনা পর্ষদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিজেদের প্রতিষ্ঠান কিংবা ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের নামে বিপুল অঙ্কের ঋণ অনুমোদন করিয়েছে। পরে অতিমূল্যায়িত আমদানির কাগজপত্র দেখিয়ে ঋণের অর্থ বিদেশে পাচার করা হয়েছে এবং অধিকাংশ ঋণই আর পরিশোধ করা হয়নি।

এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংকের প্রকৃত সম্পদ কমে গেলেও কাগজে-কলমে কার্যক্রম চালু থাকায় সংকট দীর্ঘদিন আড়ালে থেকে যায়।

দুর্বল ব্যাংক অধিগ্রহণ কি সমাধান?

বিজ্ঞাপন

বিশ্লেষকদের মতে, অতীতে আর্থিকভাবে শক্তিশালী কিছু ব্যাংককে দুর্বল বা কার্যত দেউলিয়া ব্যাংক অধিগ্রহণে উৎসাহিত বা চাপ দেওয়া হয়েছিল। তবে এই নীতি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

কারণ, একটি সুস্থ ব্যাংক যদি বড় অঙ্কের লোকসানগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানের দায়ভার নেয়, তাহলে সেই ব্যাংকের আমানতকারীদের স্বার্থও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

তাই অনেক অর্থনীতিবিদের মত, সুস্থ ব্যাংককে ঝুঁকিতে না ফেলে সরকারকেই সংকটাপন্ন ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠনে সরাসরি ভূমিকা নেওয়া উচিত।

বিজ্ঞাপন

সরকারি সহায়তার প্রস্তাব

বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, সরকার চাইলে সরকারি বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ করে সংকটে থাকা ব্যাংকগুলোতে মূলধন হিসেবে বিনিয়োগ করতে পারে।

এক্ষেত্রে ঋণ হিসেবে নয়, বরং ইকুইটি বা শেয়ারমূলধন হিসেবে অর্থ প্রদান করলে সরকার ব্যাংকগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিতে পারবে এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যকর করতে সুবিধা হবে।

বিজ্ঞাপন

তাদের মতে, রাষ্ট্রীয় মালিকানা বা সরকারের শক্তিশালী গ্যারান্টি থাকলে আমানতকারীদের মধ্যে আস্থা ফিরতে পারে এবং ‘ব্যাংক রান’-এর ঝুঁকিও কমবে।

খেলাপি ঋণের বিশাল বোঝা

বর্তমানে দেশের ব্যাংকিং খাতে শ্রেণীকৃত বা খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।

বিজ্ঞাপন

এই অঙ্ক দেশের অর্থনীতির জন্য কতটা বড়, তা বোঝাতে বিশ্লেষকরা উদাহরণ দিচ্ছেন—পদ্মা সেতু নির্মাণে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ৩০ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ বর্তমান খেলাপি ঋণের অর্থ দিয়ে প্রায় ১৯টি পদ্মা সেতু নির্মাণ করা সম্ভব।

আরও পড়ুন

অন্যদিকে, সংকটাপন্ন ব্যাংকগুলোকে উদ্ধার করতে যদি প্রায় ৫ লাখ কোটি টাকার সরকারি বন্ড ইস্যু করতে হয়, তবে সেটি জাতীয় বাজেটের বড় একটি অংশের সমান হবে। এতে সরকার ও ব্যাংক খাতের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অর্থনীতিতে কী প্রভাব পড়তে পারে?

অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকার যদি বিপুল পরিমাণ বন্ড বিক্রি করে, তাহলে ব্যাংকগুলো সেই বন্ড কিনতে গিয়ে বেসরকারি খাতে ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা হারাতে পারে।

ফলে নতুন শিল্প, ব্যবসা সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান—সব ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

ব্যাংক বন্ধ করাও হতে পারে বিকল্প

বিশেষজ্ঞদের মতে, সব দেউলিয়া ব্যাংককে যে টিকিয়ে রাখতেই হবে, এমন নয়। তবে কোনো ব্যাংক বন্ধ করতে হলে তা অবশ্যই সুশৃঙ্খলভাবে করতে হবে।

সবার আগে আমানতকারীদের অর্থ ফেরতের নিশ্চয়তা দিতে হবে। এরপর ব্যাংকের অবশিষ্ট সম্পদ, ঋণ এবং বন্ধক রাখা সম্পত্তি রাষ্ট্রায়ত্ত কোনো ব্যাংক বা বিশেষ সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানের অধীনে হস্তান্তর করা যেতে পারে।

একই সঙ্গে খেলাপি ঋণ আদায়ে বন্ধকী সম্পত্তি বিক্রি এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা জোরদার করারও পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। যদিও অর্থ পাচার করে বিদেশে অবস্থান করা ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়া হতে পারে।

বিশ্লেষকদের সতর্কবার্তা, ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট হলে মানুষ আবার ব্যাংকের পরিবর্তে নগদ অর্থ, স্বর্ণ বা স্থাবর সম্পদে সঞ্চয় রাখতে শুরু করতে পারে। এতে ব্যাংকগুলোতে আমানত কমে যাবে, ঋণ বিতরণ সংকুচিত হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের ওপর গুরুতর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই ব্যাংক খাতে আস্থা পুনরুদ্ধার এবং আমানতকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এখন সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD