Logo

বাংলা কিউআরের ফি ঘিরে বিতর্ক, যে ব্যাখ্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
১১ জুলাই, ২০২৬, ১৭:২৭
বাংলা কিউআরের ফি ঘিরে বিতর্ক, যে ব্যাখ্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের
ছবি: সংগৃহীত

দেশে নগদবিহীন লেনদেন আরও বিস্তৃত করতে গত ১ জুলাই থেকে সব বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও মার্চেন্ট পয়েন্টে অভিন্ন ‘বাংলা কিউআর’ কোড ব্যবহার বাধ্যতামূলক করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন এই ব্যবস্থায় যেকোনো ব্যাংক বা মোবাইল আর্থিক সেবা (এমএফএস) অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে একটি মাত্র কিউআর কোড স্ক্যানের মাধ্যমে অর্থ পরিশোধ করা সম্ভব হবে। তবে উদ্যোগটি চালুর পর থেকেই মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট (এমডিআর) বা সেবা ফি নিয়ে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, ভোক্তা এবং অর্থনীতিবিদদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, আগে বিভিন্ন ব্যাংক ও এমএফএস প্রতিষ্ঠানের আলাদা আলাদা কিউআর কোড ব্যবহার করা হলেও এখন একটি সর্বজনীন বাংলা কিউআর কোডই ব্যবহার করতে হবে। একই সঙ্গে যেসব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এই কিউআর ব্যবস্থা চালু করবে না, তাদের ট্রেড লাইসেন্স নবায়নের ক্ষেত্রেও জটিলতা দেখা দিতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।

এমডিআর কী, কার ওপর পড়বে এই ব্যয়?

বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালায় বাংলা কিউআরের মাধ্যমে মার্চেন্ট পেমেন্টে ভ্যাটসহ সর্বনিম্ন ১ শতাংশ এমডিআর নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, এ অর্থ গ্রাহকের কাছ থেকে নেওয়া হবে না।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

অর্থাৎ, কোনো ক্রেতা যদি কিউআর স্ক্যান করে এক হাজার টাকার পণ্য কেনেন, তাহলে তার অ্যাকাউন্ট থেকে ঠিক এক হাজার টাকাই কাটা হবে। কিন্তু দোকানদারের হিসাবে জমা হবে প্রায় ৯৯০ টাকা। বাকি প্রায় ১০ টাকা সেবা ফি হিসেবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা পেমেন্ট সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান কেটে রাখবে।

এই কাঠামোই ব্যবসায়ীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।

ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অভিযোগ

বিজ্ঞাপন

রাজধানীর হাতিরপুল এলাকার ব্যবসায়ী শাখাওয়াত হোসেন বলেন, আগে তিনি বাংলা কিউআরের জন্য তুলনামূলক কম চার্জ দিতেন। কিন্তু নতুন নির্দেশনার পর ন্যূনতম চার্জ বেড়ে যাওয়ায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়েছে। তার মতে, সরকার যদি ডিজিটাল লেনদেন উৎসাহিত করতে চায়, তাহলে চার্জ কমানো উচিত।

চকবাজারের এক ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, বিশ্বের অনেক দেশে কিউআরভিত্তিক পেমেন্টে কোনো সেবা ফি নেই। সেখানে বাংলাদেশে বাধ্যতামূলক চার্জ আরোপ করায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা নিরুৎসাহিত হতে পারেন।

আরেক ব্যবসায়ী বায়েজিদ আহমেদের ভাষ্য, অধিকাংশ ছোট ব্যবসার লাভের পরিমাণই সীমিত। সেখানে প্রতিটি লেনদেনে ১ শতাংশ কেটে নেওয়া হলে সেটি ব্যবসার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে। তার মতে, ডিজিটাল অর্থনীতিকে জনপ্রিয় করতে হলে কিউআর পেমেন্ট এবং পয়েন্ট অব সেল (পস) সেবাকে আরও সহজলভ্য ও স্বল্পব্যয়ী করতে হবে।

বিজ্ঞাপন

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সমালোচনা

বাংলা কিউআরের এমডিআর নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও চলছে ব্যাপক আলোচনা।

অনেকের প্রশ্ন, ডিজিটাল পেমেন্টে যদি নগদ অর্থ ব্যবহারের প্রয়োজন না থাকে, তাহলে সেই অর্থ ব্যয়ের জন্য অতিরিক্ত ফি কেন দিতে হবে?

বিজ্ঞাপন

আবার কেউ কেউ বলছেন, বাস্তবে এই চার্জ শেষ পর্যন্ত ব্যবসায়ীরা পণ্যের মূল্য বাড়িয়ে ভোক্তার কাছ থেকেই আদায় করবেন। ফলে নামমাত্র ব্যবসায়ীর ওপর চার্জ আরোপ করা হলেও এর প্রকৃত চাপ সাধারণ মানুষের ওপরই পড়বে।

কিছু ব্যবহারকারী আরও মত দেন, ডিজিটাল লেনদেনের মাধ্যমে সরকারের রাজস্ব সংগ্রহ সহজ হবে এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রম আরও স্বচ্ছ হবে। সে কারণে শুরুতে অন্তত চার্জমুক্ত বা অত্যন্ত কম খরচে এই ব্যবস্থা চালু করা উচিত ছিল।

ব্যবসায়ী সংগঠনের উদ্বেগ

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সাবেক সভাপতি হেলাল উদ্দিন বলেন, ডিজিটাল লেনদেন অবশ্যই সময়ের দাবি। তবে এমন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে যাতে ব্যবসায়ীরা নিরুৎসাহিত না হন।

তার মতে, অতীতে ইলেকট্রনিক ক্যাশ রেজিস্টার (ইসিআর) এবং ইলেকট্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইস (ইএফডি) চালুর উদ্যোগও কাঙ্ক্ষিত সফলতা পায়নি। বাংলা কিউআরের ক্ষেত্রেও বাস্তবতা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।

বাংলাদেশ দোকান মালিক ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সভাপতি মো. নাজমুল হাসান মাহমুদও এমডিআর পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, যদি প্রতিটি লেনদেনে ব্যবসায়ীদের হিসাব থেকে অর্থ কাটা হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই সেই ব্যয় তারা পণ্যের দামে সমন্বয় করার চেষ্টা করবেন।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাখ্যা

ব্যবসায়ীদের সমালোচনার জবাবে বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, এমডিআরকে শুধু অতিরিক্ত ব্যয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি ডিজিটাল ব্যবসা পরিচালনার একটি বিনিয়োগ।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনার খরচ কমানো, লেনদেনে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, কর ব্যবস্থাপনা সহজ করা, অর্থপাচার ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং ডিজিটাল অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে বাংলা কিউআর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম)-এর অধ্যাপক ড. শাহ মো. আহসান হাবীব বলেন, নতুন প্রযুক্তি চালুর শুরুতে সাধারণ মানুষের মধ্যে অনীহা থাকাটা স্বাভাবিক। অতীতে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সংশয় ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেটি বদলে গেছে। বাংলা কিউআরের ক্ষেত্রেও ধীরে ধীরে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে তিনি মনে করেন।

ভবিষ্যতে কমতে পারে এমডিআর

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফর হোসেন খান জানিয়েছেন, বর্তমানে নির্ধারিত ১ শতাংশ এমডিআর স্থায়ী নয়।

বিজ্ঞাপন

তার ভাষ্য, ভবিষ্যতে বাংলা কিউআরের ব্যবহার বাড়বে, লেনদেনের পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে এবং ব্যাংক, এমএফএস ও পেমেন্ট সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়লে পরিচালন ব্যয় কমবে। তখন এমডিআরের হারও ধাপে ধাপে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।

আরও পড়ুন

তিনি ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার বাইরে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গিতে এই উদ্যোগকে মূল্যায়নের আহ্বান জানান।

অর্থনীতিবিদদের মতামত

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নতুন প্রযুক্তি চালুর শুরুতে কিছুটা অস্বস্তি ও মানিয়ে নেওয়ার সময় লাগাই স্বাভাবিক। তবে বাস্তবতা বিবেচনায় প্রাথমিক পর্যায়ে এমডিআর আরও কম রাখা হলে ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণ বাড়তে পারত।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো ও অর্থনীতিবিদ এম হেলাল আহমেদ জনি বলেন, শুরুতেই ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থাকে রাজস্ব আহরণ বা অতিরিক্ত মুনাফার উৎস হিসেবে না দেখে মানুষের মধ্যে এর ব্যবহার বাড়ানোর দিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

তার মতে, প্রাথমিক পর্যায়ে ১ শতাংশের পরিবর্তে ০.৫ শতাংশ এমডিআর নির্ধারণ করা হলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা সহজেই নতুন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হতেন। পরে ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজন অনুযায়ী নীতিমালা সমন্বয় করা যেত।

বিশ্লেষকদের অভিমত, বাংলা কিউআরের মূল লক্ষ্য দেশের ডিজিটাল অর্থনীতিকে আরও বিস্তৃত করা। তবে এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে ব্যবসায়ী, ভোক্তা এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমডিআর নিয়ে চলমান বিতর্কের মধ্যেই এখন নজর থাকবে—কেন্দ্রীয় ব্যাংক ভবিষ্যতে ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ কমাতে নীতিমালায় কোনো পরিবর্তন আনে কি না।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD