Logo

নবম পে-স্কেলে ইনক্রিমেন্ট ও ভাতায় আসছে বড় পরিবর্তন

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
১০ জুলাই, ২০২৬, ১৬:৩০
নবম পে-স্কেলে ইনক্রিমেন্ট ও ভাতায় আসছে বড় পরিবর্তন
ছবি: সংগৃহীত

সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য প্রস্তাবিত নবম জাতীয় বেতন কাঠামো (পে-স্কেল) বাস্তবায়নের প্রস্তুতি চললেও এর আর্থিক ও প্রশাসনিক দিক নিয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি। বেতন কমিশনের সুপারিশ, সরকারের আর্থিক সক্ষমতা, বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট, বিভিন্ন ধরনের ভাতা এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যয়—সবকিছু একসঙ্গে সমন্বয় করতে গিয়ে বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা সচিব কমিটি জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে। ফলে নতুন পে-স্কেলের কাঠামো নিয়ে একাধিক বৈঠক হলেও এখনো চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য প্রস্তুত করা সম্ভব হয়নি।

বিজ্ঞাপন

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এবার শুধু গ্রেডভিত্তিক বেতন নির্ধারণের প্রচলিত ধারা অনুসরণ করা হবে না। কর্মচারীদের প্রকৃত আয়, জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি এবং বাস্তব অর্থনৈতিক চাহিদাকেও ইনক্রিমেন্ট নির্ধারণের ক্ষেত্রে গুরুত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর ফলে বর্তমান ব্যবস্থার তুলনায় নিম্ন ও মধ্যম গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তুলনামূলক বেশি সুবিধা পেতে পারেন।

বর্তমানে সরকারি চাকরিজীবীদের অধিকাংশ গ্রেডে গড়ে ৫ শতাংশ হারে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট দেওয়া হয়। তবে নতুন খসড়া অনুযায়ী সব গ্রেডে একই হার বজায় রাখা হবে না। প্রস্তাব অনুযায়ী, ষষ্ঠ থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত বিদ্যমান ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট বহাল রাখা হতে পারে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

অন্যদিকে, পঞ্চম গ্রেডের জন্য ৪ শতাংশ, তৃতীয় ও চতুর্থ গ্রেডের জন্য ৩ দশমিক ৫ শতাংশ এবং দ্বিতীয় গ্রেডের জন্য ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্টের সুপারিশ করা হয়েছে। প্রথম গ্রেডের বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট আলাদা নীতিমালার মাধ্যমে নির্ধারণের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এই পরিবর্তনের মূল লক্ষ্য হলো নিম্ন আয়ের সরকারি কর্মচারীদের আর্থিক চাপ কিছুটা লাঘব করা এবং আয়ের বৈষম্য কমানো। একই সঙ্গে বাস্তব জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে বেতন বৃদ্ধির সম্পর্ক আরও কার্যকরভাবে সমন্বয় করা।

জানা গেছে, নতুন বেতন কাঠামো প্রণয়নের আগে সরকার একটি বড় পরিসরের জরিপ পরিচালনা করে। এতে অংশ নেন ১ লাখ ৬৭ হাজার ৫০০ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, ৬১ হাজার ৫০০ সাধারণ নাগরিক এবং ৩ হাজার ৫১৩টি প্রতিষ্ঠানের প্রধান।

বিজ্ঞাপন

জরিপের ফলাফলে দেখা যায়, বর্তমান ইনক্রিমেন্ট পদ্ধতির পক্ষে মত দিয়েছেন মাত্র ৫ দশমিক ৬ শতাংশ অংশগ্রহণকারী। বিপরীতে ৫০ দশমিক ৪৩ শতাংশ মনে করেন, মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বেতন বৃদ্ধি করা উচিত। এছাড়া ৩১ দশমিক ৫৪ শতাংশ অংশগ্রহণকারী জীবনযাত্রার ব্যয়কে ভিত্তি করে ইনক্রিমেন্ট নির্ধারণের পক্ষে মত দিয়েছেন। একই সঙ্গে প্রায় ৭৯ দশমিক ৫ শতাংশ অংশগ্রহণকারী ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন আরও বাড়ানোর সুপারিশ করেছেন।

নবম পে-স্কেলের সুপারিশ দ্রুত মন্ত্রিসভার অনুমোদনের জন্য পাঠানোর উদ্যোগও শুরু হয়েছে। অর্থ বিভাগকে আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে বিষয়টি মন্ত্রিসভার বৈঠকে উপস্থাপনের প্রস্তুতি নিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

তবে গত ৬ জুলাই অনুষ্ঠিত সচিব কমিটির বৈঠকে দীর্ঘ আলোচনা হলেও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। কমিটির সদস্যদের ধারণা, সুপারিশ চূড়ান্ত করতে আরও অন্তত দুটি বৈঠকের প্রয়োজন হতে পারে। এরপর অর্থমন্ত্রীর কাছে সুপারিশ পাঠানো হবে এবং সরকারের অনুমোদনের পর গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে নতুন পে-স্কেল কার্যকর হবে।

বিজ্ঞাপন

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অনুমোদন পেলেও নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবে কার্যকর করতে কিছুটা সময় লাগবে। প্রশাসনিক আদেশ, সরকারি গেজেট প্রকাশ, হিসাব সফটওয়্যার হালনাগাদ এবং সংশ্লিষ্ট কারিগরি প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে কয়েক মাস সময় প্রয়োজন হতে পারে।

সে কারণে জুলাই থেকে নতুন বেতন কার্যকর ধরা হলেও বর্ধিত বেতন ও ভাতার অর্থ পরবর্তী সময়ে একসঙ্গে পরিশোধের সম্ভাবনা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের ধারণা, অক্টোবর মাসে বকেয়াসহ বর্ধিত বেতন-ভাতা সরকারি কর্মচারীদের হাতে পৌঁছাতে পারে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

নতুন বেতন কাঠামো নির্ধারণে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘লিভিং স্ট্যান্ডার্ড সার্ভে-২০২৫’-এর তথ্যও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। জরিপ অনুযায়ী, দেশে একটি পরিবারের গড় মাসিক ব্যয় বর্তমানে ৩৫ হাজার ৩১১ টাকা। সিটি করপোরেশন এলাকায় এই ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৬ হাজার ৭৭৮ টাকায়। আর ছয় সদস্যের একটি পরিবারের গড় মাসিক ব্যয় প্রায় ৬৬ হাজার ২৫৩ টাকা।

বিজ্ঞাপন

বেতন কমিশনের সুপারিশে প্রথম গ্রেডের মূল বেতন ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা এবং ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ২০ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে সচিব কমিটিতে প্রথম গ্রেডের মূল বেতন দেড় লাখ টাকা নির্ধারণ এবং সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন বেতনের অনুপাত ১:৭.৫ রাখার বিষয়েও আলোচনা চলছে। বর্তমানে এই অনুপাত ১:৯.৪।

বর্তমান ব্যবস্থায় ২০তম গ্রেডের একজন সরকারি কর্মচারী বেতন ও বিভিন্ন ভাতা মিলিয়ে মাসে ১৬ হাজার ৯৫০ টাকা পান। নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়িত হলে সেই পরিমাণ বেড়ে প্রায় ৪১ হাজার ৯০৮ টাকায় পৌঁছাতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

এছাড়া বিভিন্ন ধরনের ভাতা পুনর্বিন্যাসের পরিকল্পনাও রয়েছে। বিশেষ করে যাতায়াত ভাতা, টিফিন ভাতা, ধোলাই ভাতা এবং ঝুঁকিভাতার মতো সুবিধাগুলো নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর প্রস্তাব আলোচনায় রয়েছে। সরকারের লক্ষ্য, নতুন পে-স্কেলের মাধ্যমে নিম্ন আয়ের কর্মচারীদের আর্থিক সুরক্ষা জোরদার করা এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি টেকসই বেতন কাঠামো গড়ে তোলা।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD