Logo

সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়লে জনগণের ওপর কী প্রভাব পড়বে?

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
৯ জুলাই, ২০২৬, ১৪:৪১
সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়লে জনগণের ওপর কী প্রভাব পড়বে?
ছবি : জনবাণী গ্রাফিক্স

সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো (পে-স্কেল) বাস্তবায়নের প্রস্তুতি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। প্রায় এক যুগ পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাড়ানোর উদ্যোগকে অনেকেই সময়োপযোগী মনে করলেও অর্থনীতিবিদদের একাংশ সতর্ক করে বলছেন, এই সিদ্ধান্তের প্রভাব শুধু সরকারি কর্মচারীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। মূল্যস্ফীতি, নিত্যপণ্যের দাম, আয় বৈষম্য, দারিদ্র্য এবং ব্যাংকিং খাতের তারল্য—সব ক্ষেত্রেই এর প্রভাব পড়তে পারে।

বিজ্ঞাপন

মূল্যস্ফীতির বাজারে নতুন উদ্বেগ

ঢাকার মিরপুরের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মোহাম্মদ শিহাব উদ্দিনের মতো অনেক বেসরকারি চাকরিজীবী মনে করছেন, সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ার পর বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আরও বাড়তে পারে। বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে সীমিত আয়ে সংসার চালানোই যেখানে কঠিন, সেখানে নতুন করে মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা তাদের উদ্বিগ্ন করে তুলছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এই উদ্বেগ পুরোপুরি অমূলক নয়। কারণ, সরকারি চাকরিজীবীদের হাতে অতিরিক্ত অর্থ এলে বাজারে ভোগব্যয় বাড়তে পারে, যা চাহিদা বৃদ্ধি করে মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিতে পারে।

বিজ্ঞাপন

প্রায় ১১ বছর পর নতুন পে-স্কেল

বাংলাদেশে সর্বশেষ জাতীয় বেতন কাঠামো কার্যকর হয়েছিল ২০১৫ সালে। এরপর প্রতিবছর মূল বেতনে ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট যোগ হলেও নতুন পে-স্কেল আর ঘোষণা করা হয়নি।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

২০২৫ সালে গঠিত বেতন কমিশন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করে। কমিশনের প্রস্তাবে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার কথা বলা হয়। পাশাপাশি বৈশাখী ভাতা ২০ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশে উন্নীত করা এবং যাতায়াত ভাতা বৃদ্ধিরও সুপারিশ করা হয়েছিল।

পরবর্তীতে নতুন সরকার ওই সুপারিশ পর্যালোচনার জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, কমিটি ইতোমধ্যে নতুন বেতন কাঠামোর খসড়া প্রস্তুত করেছে, যেখানে বিশেষ করে ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তুলনামূলক বেশি সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। কিছু গ্রেডে মূল বেতন প্রায় দ্বিগুণ পর্যন্ত বাড়তে পারে।

খসড়াটি শিগগিরই মন্ত্রিসভার অনুমোদনের জন্য পাঠানো হতে পারে। অনুমোদন মিললে গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

কেন মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা?

বিশ্লেষকদের মতে, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত বিপুল অর্থের প্রয়োজন হবে। বেতন কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, পুরো কাঠামো বাস্তবায়নে অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে।

অর্থনীতিবিদদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এই অর্থের জোগান দিতে সরকার যদি ঋণের ওপর নির্ভর করে বা অর্থ সরবরাহ বাড়ায়, তাহলে বাজারে অর্থের প্রবাহ বাড়বে। এর ফলে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে।

বিজ্ঞাপন

বর্তমানেও দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার ৯ শতাংশের ওপরে রয়েছে। এমন অবস্থায় অতিরিক্ত সরকারি ব্যয় মূল্যস্ফীতিকে আরও চাপে ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন অর্থনীতি বিশ্লেষকেরা।

নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার ঝুঁকি

সরকারি কর্মচারীদের আয় বাড়লে তাদের ক্রয়ক্ষমতাও বাড়বে। এতে বাজারে বিভিন্ন পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

অর্থনীতিবিদদের মতে, চাহিদা বাড়ার সঙ্গে যদি সরবরাহ সমানতালে না বাড়ে, তাহলে নিত্যপণ্যের দাম আরও বেড়ে যেতে পারে। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে অতিরিক্ত মুনাফা আদায়ের চেষ্টা করেন। ফলে বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের কার্যকর নজরদারি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

বাড়তে পারে আয় বৈষম্য

বর্তমানে দেশে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় সাড়ে ১৪ লাখ। অন্যদিকে বেসরকারি খাতে কর্মরত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৭ কোটি।

বিজ্ঞাপন

অর্থনীতিবিদদের মতে, যদি শুধু সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ে কিন্তু বেসরকারি খাতের কর্মীদের আয় একই জায়গায় থেকে যায়, তাহলে দুই শ্রেণির মানুষের মধ্যে আয় বৈষম্য আরও বাড়তে পারে।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশে দারিদ্র্যের হারও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেড়েছে। ফলে আয় বৈষম্য বৃদ্ধি পেলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়তে পারে।

ব্যাংকিং খাতে চাপের আশঙ্কা

বিজ্ঞাপন

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতার জন্য প্রায় ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পেনশন ও গ্র্যাচুইটিসহ এ ব্যয় দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকায়।

সরকারি হিসাবে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের জন্য অতিরিক্ত প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এই অতিরিক্ত ব্যয়ের অর্থ কোথা থেকে আসবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বিশ্লেষকদের মতে, সরকার যদি দেশীয় ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নেয়, তাহলে ব্যাংকিং খাতে তারল্যের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। আবার বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়লেও অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে।

সরকারের পরিকল্পনা কী?

সরকারও স্বীকার করছে যে বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় একবারে পুরো পে-স্কেল বাস্তবায়ন করা কঠিন হতে পারে। তাই নতুন বেতন কাঠামো ধাপে ধাপে কার্যকর করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম ধাপে মূল বেতন বা বেসিক বেতন বৃদ্ধি করা হবে। পরবর্তী ধাপগুলোতে বিভিন্ন ভাতা কার্যকর করা হবে। পে-স্কেল পর্যালোচনা কমিটির সুপারিশেও প্রথম দুই অর্থবছরে ধাপে ধাপে মূল বেতন বাড়ানো এবং পরে অন্যান্য ভাতা কার্যকর করার প্রস্তাব রয়েছে।

সরকারের আশা, ধাপে ধাপে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করলে সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয় মোকাবিলায় সহায়তা করা সম্ভব হবে, একই সঙ্গে অর্থনীতির ওপর হঠাৎ বড় ধরনের চাপও তুলনামূলকভাবে কম থাকবে।

তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি করলেই হবে না; একই সঙ্গে বাজার তদারকি জোরদার, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখা এবং বেসরকারি খাতের কর্মীদের আয় বৃদ্ধির দিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। অন্যথায় নতুন পে-স্কেলের সুফলের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে।

তথ্য সূত্র: বিবিসি বাংলা

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD