Logo

হাসিনা বলয়ে হাতিলের মাথায় দুর্নীতির মুকুট

profile picture
বশির হোসেন খান
৯ জুলাই, ২০২৬, ১৬:২৬
হাসিনা বলয়ে হাতিলের মাথায় দুর্নীতির মুকুট
হাতিলের এমডি সেলিম এইচ রহমান। ফাইল ছবি

সাবেক প্রধানমন্ত্রী স্বৈরাচারের দোসর শেখ হাসিনার ঘর থেকে শুরু হাতিল ফার্নিচারের দৌরাত্ম। আওয়ামী লীগ শাসনামলে সরকারি কেনাকাটায় ‘হাতিল কমপ্লেক্স লিমিটেড’-এর একচ্ছত্র আধিপত্য ও দুর্নীতির কালো থাবার অভিযোগ দুর্নীতি দমন কমিশনে। শুধু শেখ হাসিনাই নয়, শেখ পরিবারের অধিকাংশ সদস্যদের বেড রুম থেকে ওয়াশরুম এবং ফার্নিচার থেকে অফিস রুম সবই ফ্রিতে সাজিয়ে দেন হাতিল এমডি। কোটি কোটি টাকা শেখ পরিবারের মনোরঞ্জনে ব্যায় করে রাষ্ট্রের হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয় হাতিল।

বিজ্ঞাপন

অভিযোগ সূত্র বলছে, ১৯৮৮ সালে পুরান ঢাকার ফরাশগঞ্জে বাবা হাবিবুর রহমানের কাঠের ব্যবসার দোকানে নিয়মিত বসতেন হাতিল ফার্নিচারের কর্ণধর স্বৈরাচারের দোসর সেলিম এইচ রহমান। সেখানেই এক ক্রেতাকে কাঠের দরজা বানিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে শুরু হয়েছিল এই পথচলা। তার পরে ঢিমে তালে চললেও আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে সাবেক সংসদ শেখ সেলিমের সঙ্গে চুক্তিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরি করে শুরু হয় ব্যবসার নতুন পথ চলা। তার পর শেখ হাসিনার বেড রুম থেকে শুরু করে ওয়াশ রুম ও অফিস রুম সব গুলোতে ছিলো নান্দনিকতার ছোয়া।

শিল্প ও শৈলীর ডিজাইন দিয়ে সাজিয়ে শেখ হাসিনার মনে আলাদা জায়গা করে নিয়েছে হাতিল। কোটি কোটি টাকার ফার্নিচার দিলেও কোনো বিল নেয়নি হাতিল। উপহার হিসেবে ফার্নিশার্স দিয়ে হাসিনার গুড বুকে নাম লেখান হাতিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান। তার পর থেকেই পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে।

অভিযোগ সূত্র বলছে, এক সময় পুরান ঢাকার ফরাশগঞ্জে কাঠের ব্যবসার দোকানে সীমিত পরিসরে ব্যবসা পরিচালনা করা ‘হাতিল ফার্নিচার’ আওয়ামী লীগ সরকারকে পুঁিজ করে ১৭ বছরের ব্যবধানে দেশের অন্যতম আলোচিত ফার্নিচার প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়ে দেশে এখন হাতিলের বিক্রয়কেন্দ্র আছে ৭০ টিরও বেশি। প্রতিষ্ঠানটির এই দ্রুত উত্থান নিয়ে ব্যবসায়িক মহল, অর্থনীতিবিদ এবং নাগরিক সমাজের মধ্যে নানা প্রশ্ন ও আলোচনা শুরু হয়েছে। গণপূর্ত অধিদপ্তর, শিক্ষা অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরসহ সরকারি সকল দপ্তরে টেন্ডার জালিয়াতি করে একক অধিপত্য বিস্তার করেছেন। এ নিয়ে কয়েকবার তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ পেলেও গণভবনের নির্দেশে মুহুত্বেই চাপা পড়ে যায়।

বিজ্ঞাপন

অনুসন্ধানে দেখা যায়, রাষ্ট্রের ক্ষমতার অলিন্দ থেকে করপোরেট সাম্রাজ্যের উত্থান এমন গুঞ্জন বহুদিন ধরেই ঘুরপাক খাচ্ছে ‘হাতিলের’ ব্যবসায়িক অঙ্গনে। অভিযোগ বলছে, রাষ্ট্রীয় প্রভাব, নীতিগত পক্ষপাত এবং অস্বচ্ছ ক্রয়প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি একের পর এক বড় প্রকল্প নিজেদের দখলে নেয়। প্রতিষ্ঠানটি কিছু দুর্নীতিবাজ প্রকৌশলীকে কালো টাকার জোর কিনে নিয়েছেন হাতিল ফার্নিচারের মালিক সেলিম এইচ রহমান।

ক্ষমতা ও কালো টাকার জোরে একাধিক বড় প্রকল্পে আসবাবপত্র সরবরাহের সুযোগ পায়। এসব প্রকল্পের মাধ্যমে তাদের উৎপাদন সক্ষমতা, বিক্রয় নেটওয়ার্ক এবং ব্র্যান্ড পরিচিতি দ্রুত বৃদ্ধি পায়। একই সময়ে তারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন শোরুম চালু করে এবং আধুনিক উৎপাদন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করে।

অর্থনীতি বিশ্লেষক ড. আরিফ রহমান বলেন, “যেকোনো প্রতিষ্ঠানের দ্রুত প্রবৃদ্ধি স্বাভাবিকভাবেই মানুষের আগ্রহের বিষয় হয়ে ওঠে। তবে প্রতিষ্ঠানের সাফল্যর পেছনে অনিয়ম থাকলে ব্যবস্থা নিতে হবে।

বিজ্ঞাপন

করপোরেট গভর্ন্যান্স গবেষক অধ্যাপক সায়মা হক বলেন, “সরকারি বা বড় প্রকল্পে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছ দরপত্র, প্রতিযোগিতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত হলে সন্দেহের অবকাশ অনেকটাই কমে যায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সাবেক সরকারি ক্রয় বিশেষজ্ঞ বলেন, যে বড় চুক্তির ক্ষেত্রে স্বাধীন নিরীক্ষা, উন্মুক্ত তথ্যপ্রকাশ এবং নিয়মিত অডিট জনআস্থা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

এ ব্যাপারে হাতিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান মুঠোফোনে কল দিলে তিনি রিসিভ করেননি। তবে সম্প্রতি গণমাধ্যমে তিনি এক সাক্ষাতকারে বলেছেন, সাফল্যের মূল কারণ হলো উন্নত মানের পণ্য, দক্ষ জনবল, প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক পরিকল্পনা। তারা আরও দাবি করে, সব চুক্তি প্রযোজ্য আইন ও বিধিমালা অনুসরণ করেই সম্পন্ন হয়েছে। ব্যবসায়িক মহলের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, দ্রুত প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে যেকোনো বড় প্রতিষ্ঠানের ওপর জনসাধারণের নজরও বাড়ে। তাই স্বচ্ছতা, নিয়মিত নিরীক্ষা এবং তথ্যপ্রকাশের মাধ্যমে আস্থা ধরে রাখা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিজ্ঞাপন

এ ব্যাপারে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “কোনো প্রতিষ্ঠানের অস্বাভাবিক দ্রুত প্রবৃদ্ধি হলে তার আর্থিক কার্যক্রম, কর পরিশোধ এবং ব্যবসায়িক সম্প্রসারণের উৎস নিয়ে স্বচ্ছতা থাকা জরুরি। স্বচ্ছ তথ্য থাকলে জনমনে প্রশ্ন কমে।” তিনি আরো বলেন, সরকারি ক্রয়, সুশাসন, জবাবদিহি এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। বড় সরকারি ব্যয় বা ক্রয়প্রক্রিয়ায় উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা, তথ্যপ্রকাশ, স্বাধীন তদারকি এবং কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করা জনআস্থা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD