ব্যাংকে টাকা রেখে পাওয়া সুদ সম্পর্কে কী বলে ইসলাম?

ব্যাংকে টাকা জমা রেখে পাওয়া সুদ বা ইন্টারেস্ট গ্রহণ করা ইসলামের দৃষ্টিতে বৈধ কি না—এ প্রশ্ন দীর্ঘদিন ধরেই মুসলিম সমাজে আলোচনার বিষয়। ইসলামি শরিয়াহভিত্তিক অধিকাংশ আলেম ও গবেষকের মতে, প্রচলিত সুদভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সুদ গ্রহণ বা সুদভিত্তিক লেনদেনে অংশ নেওয়া ইসলামে নিষিদ্ধ (হারাম)।
বিজ্ঞাপন
ইসলামি চিন্তাবিদদের ভাষ্য অনুযায়ী, কেউ যদি কেবল অর্থের নিরাপত্তার জন্য প্রচলিত ব্যাংকে টাকা রাখেন, তাহলে সুদভিত্তিক সঞ্চয়ী হিসাবের পরিবর্তে সুদবিহীন চলতি (কারেন্ট) হিসাব ব্যবহার করাই উত্তম। কারণ এ ধরনের হিসাবে সাধারণত সুদ দেওয়া হয় না।
অনেকের ধারণা, ব্যাংক থেকে পাওয়া সুদের অর্থ নিজে ব্যবহার না করে দান করে দিলে সমস্যা থাকে না। তবে অধিকাংশ ইসলামি বিশেষজ্ঞের মতে, এ অর্থ দান করা হলেও এর বিনিময়ে সওয়াব বা আল্লাহর পুরস্কারের আশা করা যাবে না। কারণ ইসলামের দৃষ্টিতে সুদ নিজেই অবৈধ সম্পদ। তাই সুদভিত্তিক লেনদেন থেকে বিরত থাকাই একজন মুসলমানের জন্য করণীয়।
কোরআনে সুদ সম্পর্কে কী বলা হয়েছে?
বিজ্ঞাপন
পবিত্র কোরআনে সুদ সম্পর্কে কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন— “হে ঈমানদারগণ! তোমরা চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ খেও না। আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।” (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৩০)
এ ছাড়া কোরআনের বিভিন্ন স্থানে সুদ পরিহার এবং বৈধ ব্যবসাকে উৎসাহিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ইসলামি আলেমদের মতে, কেউ যখন সুদভিত্তিক হিসাবে অর্থ জমা রাখেন এবং সেই সুদ গ্রহণের শর্তে সম্মত হন, তখন তিনি সুদভিত্তিক একটি চুক্তির অংশ হয়ে যান। এ কারণে ইসলামে এ ধরনের লেনদেন থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
সুদের পরিবর্তে কী করা যেতে পারে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, অর্থ নিরাপদ রাখার প্রয়োজন হলে কয়েকটি বিকল্প বিবেচনা করা যেতে পারে। যেমন— ইসলামি ব্যাংকে শরিয়াহসম্মত হিসাবে অর্থ রাখা; প্রচলিত ব্যাংকে সুদবিহীন কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করা; ব্যবসায়িক প্রয়োজন অনুযায়ী সীমিত অর্থ ব্যাংকে রাখা; অতিরিক্ত অর্থ বৈধ বিনিয়োগে ব্যবহার করা, যেমন ব্যবসা, সম্পত্তি বা শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগ এবং প্রয়োজনে ব্যাংকের লকার ভাড়া নিয়ে মূল্যবান সম্পদ সংরক্ষণ করা।
ইসলামে ‘রিবা’ বা সুদ কী?
বিজ্ঞাপন
কোরআন ও হাদিসে সুদের জন্য ‘রিবা’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। আরবি (ربا) শব্দটির আভিধানিক অর্থ হলো বৃদ্ধি, আধিক্য বা অতিরিক্ত হওয়া। কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন— “আল্লাহ সুদকে নিশ্চিহ্ন করেন এবং সদকাহকে বৃদ্ধি করেন।”
ফিকহবিদদের সংজ্ঞা অনুযায়ী, একই ধরনের সম্পদ বা অর্থের বিনিময়ে কোনো বৈধ প্রতিদান ছাড়া অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণ করাই সুদ। সহজ ভাষায়, ঋণ হিসেবে দেওয়া মূল অর্থের সঙ্গে সময়ের বিনিময়ে পূর্বশর্ত অনুযায়ী যে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া বা দেওয়া হয়, সেটিই সুদ।
ইসলামি আইনবিদদের মতে, সুদ নির্ধারণের ক্ষেত্রে তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ— মূল অর্থের অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণ, সময়ের বিনিময়ে সেই অতিরিক্ত অর্থ নির্ধারণ এবং লেনদেনের শুরুতেই সেই অতিরিক্ত অর্থকে শর্ত হিসেবে নির্ধারণ করা।
বিজ্ঞাপন
এই তিনটি উপাদান থাকলে সেটি সুদভিত্তিক লেনদেন হিসেবে গণ্য হয়।
ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি
ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী, সুদ ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, কোম্পানি বা রাষ্ট্র—যার সঙ্গেই হোক না কেন, ঋণের বিপরীতে নির্ধারিত অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণ বা প্রদান বৈধ নয়। ফলে অধিকাংশ ইসলামি বিশেষজ্ঞের মত হলো, একজন মুসলমানের উচিত সুদভিত্তিক লেনদেন এড়িয়ে শরিয়াহসম্মত বিকল্প ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকে যাওয়া।
বিজ্ঞাপন
তবে বিভিন্ন দেশের আইন, ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও নির্দিষ্ট পরিস্থিতি অনুযায়ী বাস্তব প্রয়োগের বিষয়ে ইসলামি আইনজ্ঞদের মধ্যে কিছু মতপার্থক্য থাকতে পারে। ব্যক্তিগত বা জটিল আর্থিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে বিশ্বস্ত ও যোগ্য আলেম বা ইসলামি ফিকহ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই উত্তম।








