নাফসের সাথে সংগ্রামে হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ)

খোদাপ্রাপ্তি জ্ঞানের আলোকে শাহ্সূফি হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ও খাজা বাহাউদ্দীন নক্শবন্দ (রঃ) بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ নাফসের সাথে সংগ্রামে হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ)
বিজ্ঞাপন
মহান বুজুর্গ হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেব যৌবনে একদা স্বপ্নে দেখেন মহান খোদাতায়ালাকে। তিনি দেখেন, আল্লাহপাক তাঁহাকে বলিতেছেন, 'হে বায়েজীদ! তুমি কি চাও?" জবাবে হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেব বলেন, 'হে মাবুদ! আমি তোমার সান্নিধ্য চাই। তোমার নিকট উপনীত হওয়ার রাস্তা আমাকে বাতাইয়া দাও।" আল্লাহপাক বলিলেন, 'হে বায়েজীদ! আমিত্ব পরিহার কর অর্থাৎ নাফসের দাসত্ব মুক্ত হও। তাহা হইলে আমার নিকট আসিতে পারিবে।"
আবার তদীয় কঠোর সাধনাকালীন সময়ে একদা আল্লাহপাককে দেখিয়া তাঁহার সমীপে তিনি আরজ করেন, 'হে এলাহী! কোন্ পথে আমি তোমার নিকট আসিব?" এলহাম হইল, 'হে বায়েজীদ! প্রথমে নিজ নাফসকে তিন তালাক দাও। অতঃপর আমার নাম লও।"
জীবনের মাঝামাঝি পর্যায়ে পুনরায় তিনি আল্লাহতায়ালাকে দেখিয়া তাহার সান্নিধ্যে পৌঁছানোর রাস্তা সম্পর্কে প্রশ্ন করিলে খোদাতায়ালা তাঁহাকে জানান, 'হে বায়েজীদ! তোমার নিকট ভাংগা বদনা ও ছেঁড়া কম্বল আছে-যতক্ষণ তাহা তুমি ফেলিয়া না দিবে, ততক্ষণ আমার দরবার পর্যন্ত পৌঁছাইতে পারিবে না।" তিনি বলেন, আমি বদনা ও ছেঁড়া কম্বল পরিত্যাগ করিলাম। সংগে সংগে এলহাম হইল, 'হে বায়েজীদ! তুমি মারেফাতের সেই সকল ভন্ড ও মিথ্যা দাবীদারদের বলিয়া দাও যে, বায়েজীদের চল্লিশ বছরের সাধনা ও রেয়াযত থাকা সত্ত্বেও ভাংগা বদনা ও ছেঁড়া কম্বল সংগে থাকিবার কারণে-যেই পর্যন্ত সেই বদনা ও কম্বল ত্যাগ করে নাই-সেই পর্যন্ত খোদাতায়ালার পবিত্র দরবারে উপনীত হইতে পারে নাই। তোমরা সাংসারিক সম্পর্কের পুটলি বাঁধিয়া নিজের কাছে রাখিয়াছ, আর আমার তরীকতের পন্থাকে নিজের নাফসের আকাংখা পূরণের জন্য ফাঁদ ও চারা স্বরূপ করিয়া লইয়াছ। বলত, তোমরা কেমন করিয়া সেই দরবারে প্রবেশের আশা করিতে পার? কখনই নহে, কোন অবস্থাতেই তোমরা সেই মহান দরবারে প্রবেশ করিতে পারিবে না।"
বিজ্ঞাপন
আল্লাহতায়ালার সাথে হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেবের উদ্ধৃত কথোপকথন থেকে ইহাই বোঝা যায় যে, খোদাতায়ালার নৈকট্য অর্জনের জন্য প্রয়োজন দুনিয়ার সম্পর্ক চ্যুত হওয়া, দুনিয়াকে দেল থেকে পরিপূর্ণ ঝাড়িয়া ফেলা এবং নাফসের দাসত্বমুক্ত হওয়া, উপরে কামনা-বাসনাকে পরিত্যাগ করা।
আর তাই দুনিয়ার সম্পর্ক ছিন্ন পূর্বক হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেব নাফসের শংখলমুক্ত হওয়ার জন্য নজির বিহীন কঠোর রেয়াযত কখনও নির্জন বিপদসংকুল পাহাড়-পর্বতে মুরাকাবায় থাকিয়া শুরু করিলেন। বছরের পর বছর তিনি শ্বাপদসংকুল গভীর অরণ্যে, খোদাতায়ালার সন্ধান করিলেন।
বিজ্ঞাপন
কিন্তু সাধনা যত কঠিনই হউক, ত্যাগের মাত্রা যত অধিকই হউক না কিন্তু, খোদাতত্ত্বজ্ঞ ওলীয়ে কামেলের সান্নিধ্যে খেদমত ব্যতীত আল্লাহতায়ালাকে পাওয়া যায় না। হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ত্রিশটি বছর: কিন্তু সফলকাম হইতে পারেন নাই, সিদ্ধি অর্জন সম্ভব ছাহেব কল্পনাতীত কঠোর তপস্যায় অতিবাহিত করিয়াছেন জীবনের হয় নাই। অতঃপর তিনি হযরত ইমাম জাফর ছাদেক (রঃ) ছাহেবের খেদমত করিয়া মহামূল্য মারেফাত রত্ন প্রাপ্ত হন, খোদাতায়ালার সান্নিধ্য পর্যন্ত পৌঁছান। তাই হয়তো মরমী ও আধ্যাত্মবাদী কবি হযরত মাওলানা রূমী (রঃ) ছাহেব বলিয়াছেন,
" হিসনা কোশাদ মারে রাজো জাল্লেপীর,
দামনে আ নাফসরে কোশরা ছাফতগীর।"
বিজ্ঞাপন
অর্থাৎ "তুমি যদি নাফস রূপী কাল সাপের ছোবল হইতে বাঁচিতে চাও, তবে নাফস হন্তা মোর্শেদে কামেলকে শক্ত করিয়া ধর।"
হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেব এলমে শরীয়ত ও মারেফাতের সম্রাট হযরত ইমাম জাফর ছাদেক (রঃ) ছাহেবের খেদমতে থাকিয়া নাফসকে পর্যুদস্ত করিতে এবং দুনিয়ার আকর্ষণ পরিপূর্ণ মুক্ত হইতে সক্ষম হন। ফলে অনাবিল নূরের প্রবাহ তাঁহার উপর আসিতে থাকে।
হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেবের উদ্দেশ্য ছিল কেবলমাত্র খোদাতায়ালার সান্নিধ্য অর্জনঃ
বিজ্ঞাপন
পীরের সান্নিধ্যে আসিতে হয় খোদাতায়ালাকে পাওয়ার জন্য, খোদপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞান হাছিলের জন্যে। ছালেক যখন খোদাতায়ালার দিকে অগ্রসর হয়, খোদাতায়ালাও পরীক্ষাচ্ছলে ছালেককে বহু নেয়ামত দান করেন। যেমন বাক্যে সিদ্ধি দান অথবা কারামত বা অলৌকিক কার্যকলাপ প্রদশনের ক্ষমতা দান ইত্যাদি এবং অদৃশ্য হইতে নীরবে লক্ষ্য করেন যে বান্দা উক্ত সব নেয়ামতেই মগ্ন থাকে, নাকি নেয়ামতের দিকে প্রক্ষেপ না করিয়া কেবল তাঁহার প্রতিই নিবিষ্ট থাকে। যদি বান্দা যাবতীয় মর্যাদা ও নেয়ামতকে দূরে ঠেলিয়া কেবল খোদাতায়ালার জন্যই আবেগাকুল থাকে, তবে সেই বান্দাকে আল্লাহতায়ালা নিজ সন্নিধ্য দান করেন। আর যাহারা আল্লাহ প্রদত্ত নেয়ামতে নিমগ্ন থাকে তথা কারামাত প্রদর্শনে অথবা জীবন্ত জিহ্বার কার্যকারিতা প্রদর্শনে ব্যস্ত থাকে: তবে কখনই আল্লাহতায়ালা পর্যন্ত পৌঁছানোর পথ তাহারা পায়
হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেবের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল শুধুমাত্র আল্লাহতায়ালা। তদীয় জীবনের বেশ কিছু ঘটনা থেকে ইহার প্রমাণ মিলে।
একদা একদিন তিনি দজলা নদীর তীরে ভ্রমণ উদ্দেশ্যে যান। হঠাৎ করিয়া নদীর পানি তরঙ্গায়িত হইয়া তাঁহাকে এস্তেকবালের জন্য অগ্রসর হইল। তিনি বলিলেন, "আমি তোমার এই তরঙ্গ ও উত্তেজনা দেখিয়া গর্বিত নই। কেননা সামান্য মুদ্রার বিনিময়ে আমি তোমাকে পার হইয়া যাইতে পারি। আমার ত্রিশটি বছরের সাধনা, রেয়াযত, ত্যাগ-তিতিক্ষা ও পরিশ্রমকে এই সামান্য তরংগ ও উত্তেজনার খাতিরে বিনষ্ট করিতে চাই না। আমি করিমকে (অর্থাৎ খোদাকে) চাই; কারামতে আমার দরকার নাই।"
বিজ্ঞাপন
তাঁহার সমসাময়িককালের একজন বিশিষ্ট ওলী হযরত খায়রাবিয়াহ (রঃ) বলেন, "আমি একরাত্রে আল্লাহতায়ালাকে স্বপ্নে দেখিলাম। স্বপ্নে খোদাতায়ালা আমাকে বলিলেন, "হে খায়রাবিয়াহ! দুনিয়ার সবাই আমার নিকট বিভিন্ন প্রকারের বস্তু প্রার্থনা করিয়া থাকে; কিন্তু বায়েজীদ আমার নিকট শুধু আমাকেই চায়।"
আর একটি ঘটনা। হযরত ইয়াহইয়া মা'আয (রঃ) ছাহেব নামক একজন খ্যাতনামা ওলী বায়েজীদ (রঃ) এর সমকালীন সময়ে ছিলেন যিনি একদিন মহাত্মার সাথে সাক্ষাত করিবার উদ্দেশ্যে বোস্তামে আসিয়া মুরাকাবায় নিমগ্ন আছেন। তিনি কবরস্থানে যাইয়া দেখেন যে, দুষ্ট শোনেন, হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেব কোন কবরস্থানে পায়ের বদ্ধাংগুলির উপর ভর করিয়া মহাত্মা দন্ডায়মান রহিয়াছেন। ইহাও শুনিতে পান যে, সন্ধ্যা হইতে তিনি ঐরূপ দাঁড়াইয়া ইবাদত করিতেছেন। সাধনার এমন নজিরবিহীন দৃশ্য দেখিয়া তিনি বিস্মিত হন এবং সাক্ষাত লাভের আশায় সেখানেই দাঁড়াইয়া থাকেন। প্রভাতের আলো প্রকাশ হওয়ার পূর্বক্ষণ পর্যন্ত হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেব দন্ডায়মান অবস্থাতেই ধ্যানমগ্ন রহিলেন।
দিবালোকের আলো প্রকাশ পাইলে তিনি ধ্যানভংগ করিয়া শুধু বলিলেন, "হে খোদা! আমি তোমার নিকট মর্যাদা প্রার্থনা করা হইতে আশ্রয় চাহিতেছি।" বিস্ময়াবিষ্ট হযরত ইয়াহইয়া মা'আয (রঃ) ছাহেব নিকটবর্তী হইয়া ছালাম প্রদান পূর্বক তাঁহাকে বলিলেন, "হুজুর, এই রূপ উক্তির তাৎপর্য আমাকে ব্যাখ্যা করুন।" উত্তরে হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেব বলিলেন, অদ্য রাত্রির এই রেয়াযতে খোদাতায়ালা আমাকে বিশটি মর্যাদার প্রতিশ্রুতি দিলেন। কিন্তু আমি বলিলাম, "হে মাবুদ! ইহার কোনটিই আমার দরকার নাই। কেননা সমুদয় মর্যাদাই তোমা হইতে পর্দাস্বরূপ। আমি শুধু তোমাকেই চাই।"
বিজ্ঞাপন
অতঃপর হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেব আগন্তক হযরত ইয়াহইয়া মা'আয (রঃ) কে উপদেশ দান উদ্দেশ্যে বলিলেন, "হে ইয়াহইয়া মা'আয (রঃ)! মুরাকাবা মোশাহাদার সময় তোমাকে যদি হযরত আদম (আঃ) এর ন্যায় খাঁটিত্ব, হযরত জিব্রাইল (আঃ) এর ন্যায় পবিত্রতা, হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর ন্যায় বন্ধুত্ব, হযরত মুসা (আঃ) এর ন্যায় আগ্রহ এবং হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সাঃ) এর ন্যায় মহব্বতও দান করা হয়, তবু তুমি কখনই উহা গ্রহণে সম্মত হইও না; একমাত্র আল্লাহতায়ালা ভিন্ন অন্য কোন দিকে মনোনিবেশ করিও না। খুব সাহসের সাথে নিজের কর্তব্য পালন করিতে থাক, অন্য কোন বস্তুর প্রতি লক্ষ্য করিও না। কেননা অন্যদিকে মন দিলে পর্দার অন্তরালে পড়িয়া থাকিবে।"
হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেবের মাকছুদ শুধু খোদাতায়ালাই ছিলেন। অন্য কোন দিকে তাঁহার কোন খেয়াল ছিল না। যাহার প্রমাণ উপরে উল্লিখিত ঘটনা সমূহ থেকে পাওয়া যায়। আর সেই কারণেই মহান আল্লাহতায়ালা তাঁহাকে এমন মর্যাদা ও সান্নিধ্য দান করিয়াছেন-যাহা তাঁহার সমকালীন সময়ে অন্য কাহাকেও দান করেন নাই।
হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেবের খোদাদর্শনঃ
বিজ্ঞাপন
হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) এর খোদাদর্শন অন্য সকলের খোদা দর্শন থেকে পথক ছিল। মূলতঃ সাধকবর্গ আপন আপন যোগ্যতানুযায়ী খোদাতায়ালার সান্নিধ্য পান, দর্শন লাভ করেন। সমসাময়িক সময়ে তিনি ছিলেন যোগ্যতার শীর্ষে-আর তাই খোদাতায়ালা তাহাকে যেমন মারেফাতে ভরপুর করিয়া দেন, তেমনি দৃষ্টান্তশূন্য তাজাল্লা প্রদান করেন
কথিত আছে, আবু তোরাব বশী (রঃ) ছাহেবের এক মুরীদ সর্বদাই জষবা' হালাতে থাকিত। ওয়াজদ ও হালের প্রভাব তাহার উপর বেশী ছিল। পীর ছাহেব একদিন মুরীদকে বলিলেন, "বাবা, তুমি যদি কিছুদিন হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেবের খেদমতে থাক, তবে তোমার উক্ত ওয়াজদ-এর প্রভাব কাটিয়া যাইবে।" মুরীদতো সর্বদাই জযবা হালাতে থাকিত, পীরের উপদেশ শুনিয়া উপদেশ প্রতিপালনে তৎপর না হইয়া সে বরং বলিল, "হুজুর, যে ব্যক্তি প্রতিদিন বায়েজীদের খোদাকে শতবার দর্শন করে, বায়েজীদের সান্নিধ্যে তাহার কি লাভহইবে? পীর ছাহেব বলিলেন, "তুমি তোমার অবস্থা ও যোগ্যতানুযায়ী খোদাতায়ালাকে দেখ।
যদি হযরত বায়েজীদ (রঃ) ছাহেবের তাওয়াজ্জুহ এত্তেহাদীর বলে তুমি খোদাতায়ালার দর্শন লাভ কর, তবে সে দর্শন হইবে আলাদা ধরণের। মনে রাখিও, দর্শনে দর্শনেও অতি বড় পার্থক্য বর্তমান। তুমি কি জান না যে, আল্লাহতায়ালা সমগ্র মানব জাতির জন্য যেখানে একবার তাজাল্লা প্রকাশ করিবেন, সেখানে হযরত আবুবকর সিদ্দিক (রাঃ) ছাহেবের জন্য স্বতন্ত্রভাবে একবার তাজাল্লা প্রকাশ করিবেন।" এই উপদেশ মুরীদের মনে ক্রিয়া করিল। সে পীর ছাহেবকে বলিল, চলুন, আমরা দু'জনই যাই। অতঃপর পীর ও মুরীদ-দুইজনই হযরত বায়েজীদ (রঃ) ছাহেবের বোস্তামস্থিত খানকাভিমুখে রওয়ানা দিলেন। উদ্দিষ্টস্থানে পৌছাইয়া দেখিলেন যে, বায়েজীদ (রঃ) ছাহেব ঘরে নাই, তিনি নিকটস্থ কোথাও পানি আনিতে গিয়াছেন। কিছুক্ষণ অপেক্ষান্তে দেখিলেন, এক হাতে এক কলস পানি ও অন্য হাতে একটি ছেঁড়া ও পুরাতন চাদর লইয়া তিনি খানকার দিকে আসিতেছেন। তাঁহার দৃষ্টি আবু তোরাবের মুরীদের প্রতি পড়িতেই সেই মুরীদ কাঁপিতে কাঁপিতে মাটিতে পড়িয়া গেল।
বিজ্ঞাপন
কিছুক্ষণ বাদেই তাহার প্রাণবায়ু বাহির হইয়া গেল। অকস্মাৎ এমন ঘটনায় হযরত আবু তোরাব (রঃ) কিংকর্তব্যবিমূঢ়। তিনি ইহার কারণ জিজ্ঞাসা করিলে বায়েজীদ (রঃ) ছাহেব বলিলেন, "হে আবু তোরাব! তোমার এই মুরীদের অন্তরে একটি অতি সূক্ষ্ম প্রশ্ন দীর্ঘদিন যাবত উঁকি-ঝুঁকি মারিতেছিল, কোন সমাধান এই পর্যন্ত সে পায় নাই। বায়েজীদের দর্শন লাভের সংগে সমাধানের আঘাত সহ্য করিতে না পারিয়া যুবকটি অর্থাৎ তোমার সেই সংগে তাহার সেই সমস্যার সমাধান হইয়া গেল। আর সেই তাৎক্ষণিক মুরীদ নিজ প্রাণ মহান খোদাতায়ালার হাতে সমর্পণ করিয়া দিল। মিশরের রমনীদেরও ঠিক এইরূপ ঘটনা ঘটিয়া ছিল। তাহারা হযরত ইউসুফ (আঃ) এর রূপের কিরণ সহ্য করিতে না পারিয়া একেবারে নিজেদের হাতই কাটিয়া ফেলিল। কেননা ইতিপূর্বে তাহারা হযরত ইউসুফ (আঃ) এর অনুপম সৌন্দর্য সম্পর্কে অজ্ঞ ছিল।"
হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেব মুরাদ ছিলেন, মুরীদ নহেনঃ
খোদাপ্রাপ্তির রাস্তায় দুই শ্রেণীর লোক আছেন। একদল আছেন-যাহারা নিজ হইতে খোদাতায়ালাকে চান। ইহাদিগকে মুরীদ বলা হয়। আর এক দল আছেন-যাহাদিগকে খোদাতায়ালা চান। এই দলকে বলা হয় মোরাদ। মুরীদ বা মোরাদ উভয় দলকে খোদাপ্রাপ্তির এই রাস্তায় অপরিসীম দুঃখ-কষ্ট ভোগ করিতে হয়; দিতে হয় ত্যাগের পরীক্ষা। কিন্তু মোরাদ খোদাতায়ালার যতখানি সান্নিধ্য অর্জন করিতে পারেন, মুরীদ কখনও তাহা পারেন না। হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেব মুরাদ ছিলেন; মুরীদ নন। তিনি বলেন, আমি ত্রিশ বছর পর্যন্ত আল্লাহতায়ালাকে অন্বেষণ করিয়া আসিতেছি। সর্বশেষে দৃষ্টি করিয়া দেখিলাম, আল্লাহতায়ালাই আমার অন্বেষণকারী; আর আমি তাঁহার কাংখিত। তিনি বলেন, আমি হজ্বে যাইতাম, কাবা ঘর তাওয়াফ করিতাম। কিন্তু পরবর্তীতে আল্লাহপাক যখন নিজ সান্নিধ্য দান করিলেন, তখন দেখিলাম, কাবা ঘরই আমার চতুর্দিকে তাওয়াফ করিতেছে।
বিজ্ঞাপন
হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেব ছিলেন প্রেম সাগরের সুদক্ষ ডুবুরীঃ
হযরত বায়েজীদ (রঃ) ছিলেন খোদাতায়ালার প্রেম সমুদ্রের সুদক্ষ জরুরী। গভীর তলদেশ পর্যন্ত বিচরণ করিতে সক্ষম ছিলেন তিনি। এই প্রেম আল্লাহতায়ালার শ্রেষ্ঠতম আমানত-যাহা তিনি বিশেষ বিশেষ বান্দার দেলে গচ্ছিত রাখেন। এই প্রেমের তেজ বড় বেশী। সকলে তাহা সহ্য করিতে পারে না। প্রেমের দুই এক ঢোক শরাব পানে অনেকে এমনই মাতাল হন যে, আর সম্মুখ পানে অগ্রসর হইতে পারেন না। হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেব যদিও সাধনার প্রাথমিক তাহাকে প্রেমের উত্তাপ সহ্য করিবার প্রবল ক্ষমতা দান করিয়াছিলেন, পর্যায়ে দুই একবার ভাবোন্মাদ হইয়াছিলেন, পরবর্তীতে আল্লাহতায়ালা যাহা নিম্নের ঘটনা থেকেই স্পষ্ট বুঝা যায়।
একদিন হযরত ইয়াহইয়া মা'আয (রঃ) ছাহেব বায়েজীদ (রঃ) কে এক কারো লিখিলেন, "এমন ব্যক্তি সম্পর্কে আপনি কি বলেন, যে লোক আমাদিকালে মহব্বতে এলাহীরূপ শরাবের একটি মাত্র পেয়ালা পান করিয়া এমন মাতাল হইয়া পড়িয়াছে যে, অনন্তকাল পর্যন্ত মাতালই থাকিবে?” উত্তরে হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) লিখিলেন, "এখানে এমন একজন লোক রহিয়াছেন, যিনি একদিন ও এক রাত্রির মধ্যেই অনাদি অনন্ত পেম সমুদ্র পান করিয়া থাকেন। ইহার পরেও-আরও অধিক আছে কি?-এই প্রশ্ন বার বার করিতে থাকেন।" বোস্তাম নিবাসী সেই সাধকই ছিলেন হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেব।
ধৈর্য ও সহনশীলতায় অতুলনীয়ঃ
ওলী-আল্লাহদের উপর আল্লাহতায়ালার তরফ থেকে পরীক্ষা স্বরূপ একের পর এক বিপদ আপদ আসিতে থাকে। আর ওলী-আল্লাহ সকল তাহা খোদাতায়ালার নেয়ামত মনে করিয়া ধৈর্য ধারণ করিতে থাকেন। ধৈর্যের বিরাট পুরস্কারও আল্লাহতায়ালা তাঁহাদের দান করেন। হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেবের উপর আসিয়াছে অসংখ্য বিপদ-আপদ, বালা-মুছিবত। তিনি বিচলিত হন নাই। শুধু মাঝে মাঝে খোদাতায়ালাকে বলিতেন, "হে খোদাতায়ালা! রুটিতো আপনিই পাঠাইয়াছেন, ব্যাঞ্জন (তরকারী) ও ইহার সংগে প্রেরণ করুন, যাহাতে আমি উহা উত্তমরূপে আহার করিতে পারি। অর্থাৎ ধৈর্য ও সহনশীলতা দান করুন যেন এই
মুছিবত উত্তমরূপে বরদাশত করিতে পারি।"
মানবতার জীবন্ত প্রতীকঃ
প্রতীক। সৃষ্টি হিসেবে সকলকেই তিনি ভাল বাসিতেন। তাঁহার করুণার হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেব ছিলেন বিশ্ব মানবতার জীবদ্ধ খোদাতায়ালার সান্নিধ্যের স্তর পর্যন্ত পৌছাইলাম, তখন তিনি আমাকে ধারা সকলের প্রতি ছিল প্রবাহিত। তিনি বলেন, "আমি যখন বলিলেন, হে বায়েজীদ! প্রার্থনা কর। আমি নিবেদন করিলাম পরওয়ারদিগার! সমস্ত মখলুকের প্রতি রহম করুন।"
হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেবের জীবনে কারামত বা অলৌকিক কর্মকান্ডঃ
আল্লাহপাক যাহাদেরকে মানবকুলের পথ প্রদর্শক বা হাদী হিসেবে নিয়োজিত করেন, তাহাদেরকে অলৌকিক কার্যকলাপ প্রদর্শনেরও ক্ষমতা প্রদর্শনের ক্ষমতা দান করিয়াছেন-নবী রাসূল (আঃ) গণকে প্রদত্ত সেই দান করেন। প্রত্যেক নবী রাসূলকেই কম বেশী অলৌকিক কর্মকান্ড অতি মানবীয় কার্যকলাপকে বলা হয় মোজেজা। নবী রাসুলগণের অনুরূপ ওলীয়ে কামেলগণকেও আল্লাহপাক অলৌকিক কর্মকান্ড প্রদর্শনের ক্ষমতা দান করেন। ওলী-আল্লাহদের এই কর্মকান্ডকে বলা হয় কারামত।
ওলী-আল্লাহগণের মধ্যে গউসপাক হযরত আব্দুল কাদের জেলানী (রঃ) ছাহেব কর্তৃক সর্বাধিক সংখ্যক কারামত প্রকাশ পাইয়াছে। হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেবের জীবনও কারামতে পরিপূর্ণ। ভূমিষ্ট হওয়ার পূর্বে মাতৃগর্ভ হইতেই তাঁহার কারামাত প্রকাশ পাইতে থাকে। মাতৃগর্ভে থাকাবস্থায় তদীয় মাতা যদি কখনও কোন সন্দিগ্ধ খাবার মুখে দিতেন, তৎক্ষনাৎ বায়েজীদ (রঃ) মায়ের পেটে নড়াচড়া শুরু করিতেন। যতক্ষণ না তাহার মাতা খাবার ফেলিয়া দিতেন, ততক্ষণ তাহার আন্দোলনও থামিত না। তিনি মাদারজাত ওলী ছিলেন। পরিণত বয়সের একটি উক্তি থেকে ইহার প্রমাণ মিলে। একদিন লোকে তাহাকে প্রশ্ন করিয়াছিল, তরিকতের মধ্যে কোন বস্তু উত্তম? তিনি উত্তর করিয়াছিলেন, তরিকতের মধ্যে উচ্চ শিখরে উন্নীত হওয়ার সর্বোত্তম বস্তু হইল মাতৃগর্ভে থাকাকালীন সম্পদ।
কথিত আছে, একবার তিনি কতিপয় মরীদানসহ হজ্বের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়াছেন। তাঁহার এবং হজ্জযাত্রী মরীদান সকলের মালপত্র বোঝা বাঁধিয়া একটি উটের পিঠে তুলিয়া দেওয়া হইয়াছে। ইহা দৃষ্টে একজন পথিক বলিয়া উঠিল, একটি মাত্র উটের উপরে এত বড় বোঝা-ইহা তো যুলুম বটে। কথাটি হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেবের কর্ণে আসিল। তিনি লোকটিকে উদ্দেশ্য করিয়া বলিলেন, "বাবা, তুমি ভাল ভাবে লক্ষ্য করিয়া দেখ, বোঝাটি কি উটেরই পষ্ঠে, নাকি অন্য কোথাও?" লোকটি ভাল ভাবে লক্ষ্য করিয়া দেখিল যে, বোঝাটি উটের পষ্ঠ হইতে কিছুটা উপরে শূন্যাবস্থায় রহিয়াছে। তিনি বিস্ময়ে বলিয়া উঠিলেন, 'সুবহানাল্লাহ, ইহাতো আশ্চর্য জনক ব্যাপার!"
আর একবারের একটি ঘটনা। হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেব তখন অধিক সময়ই জযবা হালাতে থাকিতেন, নূরময় জগতে বিচরণ করিতেন। তিনি বলেন, আমি মহব্বত ও তৌহিদের প্রবল প্রভাবে একবার এমনই মুগ্ধ হইয়া পড়িয়াছিলাম যে, খোদাতায়ালার সাথে জামার এক চুল পরিমাণ ব্যবধান নির্ণয় করিতে পারিলাম না। নিজস্ববোধ হারাইয়া জংগলের দিকে বাহির হইয়া পড়িলাম। হঠাৎ দেখিলাম, এক বৃদ্ধা একটি বোচকাসহ একটু দূরে দন্ডায়মান। আমাকে দেখিয়াই হাতের ইশারা দ্বারা নিকটে আহবান করিয়াই বলিল, "বাবা, আমার ময়দার বোচকাটি বহন করিয়া লইয়া চল।" কিন্তু আমার অবস্থা তখন স্বাভাবিক ছিল না। নিজেকেই সামলাইয়া চলাই তখন দুস্কর, তদুপরি বোঝা বহন মোটেই সম্ভব ছিল না।
আমি অদূরেই একটি বাঘ দেখিতে পাইয়া ইশারা দিলাম। বাঘটি নিকটে আসিলে বৃদ্ধার ময়দার বোচকা তাহার পৃষ্ঠে রাখিয়া বৃদ্ধাকে বলিলাম, যান, বাঘটিই আপনার বোঝা গৃহ পর্যন্ত পৌছাইয়া দিবে। বাঘসহ বৃদ্ধা রওয়ানা দিলেন। আমি তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলাম, লোকে জিজ্ঞাসা করিলে আপনি কি বলিবেন? বৃদ্ধা বলিলেন, আমি বলিব, এক অহংকারী ও রিয়াকারী যালেম এই কাজ করিয়াছে। আমি বৃদ্ধাকে বলিলাম, আপনি ইহা কি বলিতেছেন? তিনি বলিলেন, ঠিকই বলিতেছি। আপনিই বলুন, এই বাঘটি কি শরীয়তের বিধানের আওতাভুক্ত? আমি বলিলাম, "না।"
তিনি বলিলেন, যাহাকে আল্লাহতায়ালা তাহার আদেশ পালনের কষ্ট প্রদান করেন নাই, আপনি তাহাকে কষ্ট দিতেছেন: আপনি যালেম নয়তো কি? ইহা ছাড়াও আপনার ইচ্ছা লোকে অবগত হউক যে, আপনি বড় কারামতওয়ালা এক ওলী। ইহা রিয়া বা লোক দেখানো কর্ম ছাড়া আর কি? আমি বলিলাম, আপনি সত্যই বলিতেছেন। বৃদ্ধার উক্ত কথাগুলি আমার বিরাট সংশোধন করিল। ইহার পর হইতে আমি এমন হইয়া গিয়াছি আমি আল্লাহতায়ালার নিকট উহার যথার্থতার প্রমাণ চাহিতাম। তৎক্ষণাৎ যে যখনই আমার মধ্যে কারামতের কোন লক্ষণ প্রকাশ পাইত, তখনই আমার প্রতি এক হলদে নূর প্রকাশ পাইত-যাহাতে সবুজ অক্ষরে লেখা থাকিত-
"লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ, নুহু নাবিয়াল্লাহ, ইব্রাহিমু খালিলুল্লাহ, মুসা কালিমুল্লাহ, ঈসা রূহুল্লাহে আলাইহেমুস ছালাতু ওয়া সাল্লাম।" এই পাঁচজন সাক্ষীর সাক্ষ্য দ্বারা কারামাতের সত্যতা প্রমাণিত হইতে আরম্ভ করিল।
হযরত বায়েজীদ (রঃ) ছাহেবের সমগ্র জীবন কাহিনীতে অসংখ্য কারামত বর্তমান। তাঁহার ইন্তেকালের পূর্বরাতে হযরত আবু মুসা (রঃ) ছাহেব এক তাৎপর্যবহ স্বপ্ন দেখেন। তিনি বলেন, "আমি দেখিলাম যে আমি আরশ মাথায় করিয়া উড়িতেছি।" নিদা ভংগের পর স্বপ্নের কথা স্মরণ করিয়া তিনি বিস্মিত হন। স্বপ্নের তাবির জানার জন্য তাহার অন্তরে অস্থিরতা শুরু হয়। তিনি ভোর বেলাতেই বোস্তাম অভিমুখে রওয়ানা হন। উদ্দেশ্য-হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেবের নিকট হইতে স্বপ্নের তাবির জানিয়া নেওয়া।
তিনি বলেন, বোস্তামে পৌঁছাইয়া আমি জানিলাম যে বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) গত রাত্রেই ইন্তেকাল করিয়াছেন। বহু লোক খানকায় ভিড় করিয়াছে তাহার জানাযায় শরীক হওয়ার জন্য। জানাযার নামাজ শেষ হইল। লাশ মোবারক খাটিয়ায় উঠানো হইল। প্রধান প্রধান খাদেমরা সকলেই চেষ্টা করিতেছেন খাটিয়ার পায়া ধরিবার জন্য। আমিও চেষ্টা করিলাম কিন্তু আমার পালা আসিল না। অবশেষে খাটিয়ার নীচে মাথা ঠেকাইয়া বহন করিতে লাগিলাম। তিনি বলেন, বোস্তামে আসিয়াছিলাম হযরত বায়েজীদ (রঃ) ছাহেবের নিকট থেকে পূর্বরাত্রিতে দৃষ্ট স্বপ্নের তাবির জানিবার জন্য। কিন্তু ঘটনার আকস্মিকতায় স্বপ্নের কথাই আমি ভুলিয়া গিয়াছিলাম। খাটিয়ার তলদেশে মাথা ঠেকাইয়া যখন পবিত্র লাশ মোবারক বহন করিতেছিলাম, তখন আমি শুনিতে পাইলাম, হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেব বলিতেছেন, "হে আবু মুসা! তোমার গত রাত্রের স্বপ্নের তাবির ইহাই। তুমি যে দেখিয়াছিলে, আরশ মাথায় করিয়া উড়িয়া বেড়াইতেছ-তাহা এই বায়েজীদেরই শবদেহের খাটিয়া বহন।"
হে জাকেরান সকল, তোমরা বুঝিতে পারিলে, সুলতানুল আরেফীন হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেব সমগ্র জীবনই কেবল দুঃখ-কষ্ট ভোগ করিয়াছেন। তাঁহার খোদা প্রাপ্তির সাধনা জীবনে দুঃখ ছিল, ত্যাগের পরীক্ষা ছিল, বালা-মুছিবতের মোকাবেলা ছিল: ঠিক তেমনি তাহার প্রচার জীবন ছিল কন্টকাকীর্ণ। খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞান প্রচার জীবনে তাঁহাকে বহু নির্যাতন, লাঞ্চনা বা গঞ্জনা সহ্য করিতে হইয়াছে, দেশ থেকেও নির্বাসিত হইতে হইয়াছে অনেকবার। ওলী-আল্লাহগণের জীবন সুখময় থাকে না। নবী রাসূলগণের জীবনও আরাম আয়েশের ছিল না। জন্ম হইতে ওফাত পর্যন্ত তাঁহারা দুঃখ-কষ্টের মধ্যে দিয়াই অতিবাহিত করিয়াছেন এবং খোদাকর্তৃক অর্পিত দায়িত্ব পালন করিয়াছেন।।
হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেবের সাধনা ও প্রচার জীবনের সাথে আমার জীবনের কিছু মিল বা সাদৃশ্যঃ
হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেবের জীবনের সাথে যথেষ্ট সাদৃশ্য আছে আমার খোদাপ্রাপ্তির সাধনা ও প্রচার জীবনের। গত দুইটি নসিহতেই আমার জীবনের কিছু দুঃখ-কষ্টের কথা তোমাদেরকে বলিয়াছি। নিশ্চয়ই তোমরা সেখানে লক্ষ্য করিয়াছ, খোদাতায়ালার সান্নিধ্য অর্জনে, রেযামন্দী হাছিলে আমাকে কত দিবা-নিশি অনাহারে অতিবাহিত করিতে হইয়াছে; ক্ষুধা পেটে খেদমতও করিতে হইয়াছে প্রচুর। পীর কেবলাজান হুজুর আমাকে খাইতে দিতেন না বটে, কিন্তু কাজের হুকুম দিতেন সকলের চেয়ে বেশী। আমার পেটে ভাত ছিল না, শরীরে শক্তি ছিল না। এমনই অবস্থা যে দশ কদম হাঁটিবার শক্তি পাইতাম না। কিন্তু কাজ না করিয়া উপায় ছিল না।
ক্ষুধা পেটে, দুর্বল শরীরে আমাকে মাটি কাটিতে হইত; ছয় (৬) মাইল দূরবর্তী খুকনি থেকে ঝাকা বোঝাই বাসন আনিতে হইত। উরস শরীফের পূর্বে ৩০ টি গরুর গাড়ীতে করিয়া যমুনা ঘাট হইতে চাউল, ডাউল বা ধান আনিতে হইত। আমি অবস্থাসম্পন্ন পরিবারের সন্তান ছিলাম। বোঝা বহন করা বা মাটি কাটা আমার অভ্যাস ছিল না। আমাকে হুকুম দিলেন, "বাবা, মাটি কাট।" আমি মাঠে গেলাম। প্রথমবারে মাত্র এক টুকরী মাটি মাথায় লইতে পারিয়াছিলাম। সংগে সংগে মাথা যেন আগুন হইয়া উঠিল। সেদিন আর পারি নাই। অবশ্য পরবর্তীতে মাটি সকলের সাথে মাটি কাটিতাম। অন্যান্য জাকের ভাইদের তেমন কষ্ট হইত না। কারণ তাহাদেরকে কেবলাজান হুজুর পেট পুরিয়াই খাবার কাটা অভ্যাসে পরিণত হইল। তৎপর প্রতিদিনই বেলা ১১ টা পর্যন্ত দিতেন। তাহাদের গায়ে শক্তি ছিল।
ক্ষুধা পেটে খেদমত করিতে আমার যতই কষ্ট হউক না কেন, আমি মনে মনে স্থির করিয়াছিলাম, এই জীবন থাক আর যাক-পীরের নির্দেশ পালন করিবই। দৃঢ় মনোবলের কারণে কাজে আমার সফলতাও আসিত।
খুকনি থেকে বাসন আনিতে হইত। জায়গাটি ছিল দরবার থেকে ছয় মাইল দূরে। সকলের ঝাকাতেই বাসন দেওয়া হইত পনেরটি আমাকে দেওয়া হইত বিশটি। দীর্ঘ পথ; শুধু শরীরের বোঝা বহনই যেখানে আমার জন্য দুঃসাধ্য ছিল, সেখানে বিশটি মাটির বাসনপূর্ণ টুকরি মাথার উপরে থাকিত। কি হাল বা অবস্থা আমার হইত, একটু চিন্তা করিয়া দেখ। তবে যতই কষ্ট হউক: পীরের নির্দেশকে আমি অবহেলা করি নাই। তাই এই মিসকীনকে তিনি গ্রহণ করিলেন এবং খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞানের ধারক ও প্রচারক হিসেবে মনোনীত করিলেন। বলিলেন, "বাবা, কোটি কোটি লোকের ছর্দার তুমি, ভুল করিও না।"
আমাকে এই আটরশী হইতে তরিকা প্রচারের নির্দেশ দিলেন। ছোট্ট একটি কুঁড়ে ঘর হইতে আমি সত্য তরিকা প্রচার শুরু করি। মাত্র আট টাকার বিনিময়ে সে ঘরটি ক্রয় করিয়াছিলাম। বাংলা ১৩৫৪ সাল থেকে শুরু হয় প্রচার জীবন। সেই সময় সেই ঘরের নাম দেওয়া হইয়াছিল "জাকের ক্যাম্প"; সময়ের ব্যাবধানে আজ যাহা বিশ্ব জাকের মঞ্জিলে রূপ লাভ করিয়াছে। তরিকা প্রচারের শুরুতে সপ্তাহে একদিন জলসা করিতাম। যাহারা জলসায় যোগদান করিতেন-তাহাদেরকে তালিম দিতাম, খোদাপ্রাপ্তির সবক দিতাম। কিন্তু আমার সেই প্রচার কার্য নির্বিঘ্ন ছিল না। ছিল বাধা। ছিল বিরোধিতা। ছিল অপপ্রচার। স্থল দৃষ্টিসম্পন্ন দুনিয়াপরস্ত আলেম সমাজ ও পীরেরা যুক্তফ্রন্ট তৈরি করিল। সভা সমিতি করিল। সিম্পোজিয়াম করিল। তাহারা আমাকে কাফের ফতোয়া দিল, যেমন হযরত গউস পাক (রঃ) কে তৎকালীন দুনিয়াপূজারী আলেমেরা কাফের ফতোয়া দিয়াছিল। কাফের ফতোয়া সম্বলিত লিফ লেট ও বিজ্ঞাপন তাহারা হাতে হাতে বিতরণ করিল। তথাপিও সত্য
প্রচার থেকে আমাকে বিরত রাখিতে পারে নাই। আমি নিজ কার্যে ছিলাম অবিচল, স্থির। আমার পীর কেবলাজান আমাকে বলিয়াছিলেন, "বাবা, তোর কোন চিন্তা নাই তোর সমস্ত কাজ আমার হাতে রাখলাম।"
সেই মহা ওলীর তাইদ ও মদদে, মহান খোদাতায়ালার ইচ্ছায় আসমুদ্র হিমাচল আজ সত্য তরিকা প্রচার হইতেছে। যে মহা ওলী হযরত খাজাবাবা এনায়েতপুরী (কঃ) ছাহেবের তাইদ, মদদে এমন অসাধারণ কাজ সম্ভব হইল, সেই মহা সাধকের নেছবতে তোমরা যদি খোদাতায়ালা পর্যন্ত পৌছাইতে চাও, তবে আমি যেমন পীরের নির্দেশ যথাযথ পালন করার চেষ্টা করিয়াছি-ভাল মন্দ কখনও চিন্তা করি নাই। তোমরাও তেমনি তোমাদেরকে দেওয়া নির্দেশাদি ঠিক ঠিকমত পালন কর।
পীরের মহব্বত অর্জনের চেষ্টা কর। পীরকে ভালবাস। তাহা হইলে আল্লাহ রাসূলের মহব্বত তোমাদের দেলে পয়দা হইবে। আল্লাহ ও রাসুলের খাছ হোেব্ব-এশক-মহব্বতের ফয়েজ তোমরা পাইতে থাকিবে। পীরের সন্তুষ্টি অর্জনই হইল মূল কথা। পীরের সন্তুষ্টির পশ্চাতে আল্লাহ এমন কি স্বীয় প্রাণাপেক্ষা যদি আপন পীরকে ভালবাসিতে পার, তাহা ও রাসূলের সন্তুষ্টির অবস্থান। ধন সম্পদ, আত্মীয়-স্বজন, পুত্র-পরিজন, হইলে আল্লাহর মারেফাত অর্জন করা বা পরিচয় জ্ঞান লাভ করা তোমাদের জন্য খুবই সহজ হইবে।
হযরত মাওলানা রূমী (রঃ) ছাহেব বলেন,
"চু তো যাতে পীরেরা কারদি কবুল
হাম খোদা দর জাতাশ আমাদ হাম রসূল।"
অর্থাৎ-যেইমাত্র তুমি তোমার পীরের জাতকে কবুল করিলে, তখনই আল্লাহ তোমাকে বান্দা হিসেবে, রাসূল তোমাকে উম্মত হিসেবে স্বীকৃতি দিলেন। আল্লাহ ও রাসূলের স্বীকৃতি তখনই তুমি লাভ করিলে, যখন পীরের তরফ হইতে স্বীকৃতি পাইলে।








