Logo

বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেবের শরীয়ত খেলাফ উক্তির অন্তর্নিহিত তাৎপর্য

profile picture
জনবাণী ডেস্ক
২ জুলাই, ২০২৬, ১৯:৩৪
বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেবের শরীয়ত খেলাফ উক্তির অন্তর্নিহিত তাৎপর্য
ছবি প্রতিনিধি।

খোদাপ্রাপ্তি জ্ঞানের আলোকে শাহ্সূফি হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ও খাজা বাহাউদ্দীন নক্শবন্দ (রঃ) بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেবের কিছু শরীয়ত খেলাফ উক্তির অন্তর্নিহিত তাৎপর্যের বিশ্লেষণঃ

বিজ্ঞাপন

পূর্বের নসিহতে সুলতানুল আরেফীন, সেরাজুছ ছালেকীন হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেবের জীবন বৃত্তান্তের অংশ বিশেষ তথা খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞান হাছিলের পথে তদীয় ত্যাগ-তিতিক্ষা, রেয়াযত ও কঠোর তপস্যা সম্পর্কে আলোচনা করা হইয়াছে। এই পরিচ্ছেদে সেই মহান সাধকের জীবন কাহিনীর পরবর্তী অধ্যায় সম্পর্কে আলোচনা করা হইতেছে।

এই মহান বুযুর্গ বোস্তাম নগরী হইতে তদীয় হেদায়েতকর্ম পরিচালনা করিতেন। দিক-বিদিক হইতে তালেবে মাওলাগণ তাঁহার দরবারে ভীড় করিত। তিনিও ধৈর্যের সাথে তাহাদিগকে তালিম দিতেন, তরবিয়ত (প্রতিপালন) করিতেন, খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞানের সবক দিতেন। কিন্তু ভিতরে ভিতরে তিনি সর্বদাই খোদাতায়ালার ধ্যানে নিমগ্ন থাকিতেন; খোদাতায়ালার অপূর্ব রূপ দর্শনে বিভোর থাকিতেন।

কথিত আছে, এক যুবক বিশ বছর যাবৎ হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেবের দরবারে খেদমতে রত ছিলেন। এই বিশ বছরে সেই যুবক দরবার ছাড়িয়া কোথাও যায় নাই। তদীয় পীর তাহাকে কোন কাজের হুকুম দেওয়ার সময় প্রথমে তাহার নাম জিজ্ঞাসা করিয়া তৎপর কাজের নির্দেশ দিতেন। যুবক বিশ বছর যাবৎ একই অবস্থা লক্ষ্য করিয়া আসিতেছে। একদা কোন কাজের নির্দেশ দেওয়ার পূর্বে যুবকের নাম জিজ্ঞাসা করিলে যুবকটি তৎক্ষণাৎ হুজুরকে জিজ্ঞাসা করিলেন, "হুজুর! আপনি কি আমার সাথে কৌতুক করেন, নাকি সত্যই আমার নাম ভুলিয়া যান?” উত্তরে হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেব বলিলেন, "বাবা, আমি তোমার সাথে কৌতুক করিতেছি না। কিন্তু তোমার নাম যে আমি ভুলিয়া যাই; ইহার কারণ হইল, যখন হইতে আমার মালিকের নাম আমার অন্তরে প্রবেশ করিয়াছে, তখন হইতে দুনিয়ার সমুদয় নাম আমি ভুলিয়া গিয়াছি। তাই প্রতিদিনই তোমার নাম আমাকে জিজ্ঞাসা করিতে হয়।"

বিজ্ঞাপন

পূর্বেই বলা হইয়াছে, হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেব মারেফত শেষ করিয়াছেন বেলায়েতে ছোগরায়। বেলায়েতে ছোগরার শেষ প্রান্তে মহান খোদাতায়ালার অজুদ (শুভ গুণসমষ্টির প্রতিবিম্ব) পর্যন্ত তিনি পৌছাইয়াছিলেন। অজুদেই তিনি ফানা বা আত্মবিলোপ করিয়াছেন বলিয়া মনে করিয়াছেন। মুলতঃ তিনি সর্বদাই তৌহিদে অজুদীর অসীম-অনন্ত নূরময় জগতে বিচরণ করিতেন। এই জগতে বিচরণকারী সাধকবর্গ সমুদয় বিশ্বব্রহ্মান্ডকে খোদাতায়ালার নূরে নিমজ্জিত দেখেন। যে দিকেই তাকান, সেই দিকেই দেখেন শুধু নূর আর নূর। ডানে-বামে, সম্মুখে-পশ্চাতে, উপরে-নীচে, ভিতরে-বাহিরে শুধু নূর আর নূর। আরশ, কুরছী, লওহ-কলম, বেহেশত দোযখ, আসমান-জমীন কিছুই সাধকের চোখে দেখা যায় না; এমনকি নিজেকেও না। এমন অবস্থায় সাধক যাহা কিছু বলেন, তাহা মুলতঃ আল্লাহপাকেরই কথা।

কারণ সাধকতো আল্লাহর নূরে লীন। তাই তৌহিদে অজুদীর আকাশে বিচরণকারী সাধক অনেক সময় শরীয়তের খেলাফ কথা বলিয়া ফেলেন। যেমন হযরত মনসুর হাল্লাজ (রঃ) ছাহেব বলিয়াছেন, "আনাল হক"। মূলতঃ তাঁহার অবস্থাতে তিনি ঠিকই বলিয়াছেন, কারণ মনসুর হাল্লাজের দৃষ্টিতে তখন আল্লাহই ছিলেন, মনসুর দৃশ্যতঃ ছিলেন না। হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেবও মনসুর হাল্লাজের আনাল হকের অনুরূপ বহু কথাই বলিয়া ফেলিয়াছেন-যাহা স্থূল দৃষ্টিতে শরীয়তের খেলাপ; যদিও তরিকত ও মারেফাতের দৃষ্টিতে ইহা খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার বা ঘটনা। যেমন তিনি বলিতেন,

أَنَا سُبْحَانُ - مَا شَانِي

বিজ্ঞাপন

অর্থাৎ-আমি সুবহান, কি মহৎ আমার শান!

কখনও তিনি বলিতেন, "লোকে মনে করিয়া থাকে, আমি তাহাদের মতই একজন, কিন্তু তাহারা আমার আলমে গায়েব' এর অবস্থা দর্শন করিলে ধ্বংস হইয়া যাইবে। আমি এমন একটি দরিয়া যাহার গভীরতা অজ্ঞাত, আদি-অন্তও অজ্ঞাত।" আবার কখনও কখনও মুরীদানদের উদ্দেশ্যে বলিতেন, "আমি তোমাদের প্রভু; তোমরা আমার ইবাদত কর।" হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেবের উল্লিখিত শরীয়তের খেলাপ উক্তি সমূহ তিনি কখন, কি অবস্থাতে বলিয়াছেন, তাহা ভাবিয়া দেখিবার বিষয়।

মূলতঃ মানুষ আল্লাহতায়ালার অজুদের প্রতিবিম্ব ও আদামাতের (যাবতীয় অশুভের উৎপত্তিস্থল) মিশ্রন।একদিকে মানুষের মধ্যে শুভগুণ সমূহ আছে যাহা অজুদ (শুভের উৎপত্তিস্থল) এর প্রতিবিম্ব; অন্যদিকে মানুষের নিজস্ব বলিয়া আছে আদামাত বা অশুভের সমষ্টি। শুভ আর অশুভ মিলিয়াই মানুষ। কিন্তু সাধক যখন বেলায়েতে ছোগরায় উপনীত হন, তখন আল্লাহতায়ালার নাম ও গুণাবলীর প্রতিবিম্বিত নূরের প্রভাবে তাহার অশুভ দিকটা তথা আদামাত ঝরিয়া পড়ে, থাকে শুধু শুভঅংশটি-যাহা আল্লাহর অজুদের প্রতিবিম্ব। প্রতিবিম্ব দেখিতে আসলের অনুরূপ। এই কারণেই এই স্থানে সাধক নিজেকে স্রষ্টার (অজুদের) অনুরূপ মনে করে। সাধকের সাধনার এক পর্যায়ে এই প্রতিবিম্ব আসলে গিয়া মিশে।

বিজ্ঞাপন

ফলে সাধক কিভাবেইবা নিজেকে খুঁজিয়া পাবেন? এমন অবস্থাতেই মানবীয়জ্ঞানশূন্য হইয়া সাধকবর্গ শরীয়ত খেলাফ অনেক কথাই বলিয়া ফেলেন; যেমন হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেব বলিয়াছেন। তবে এইরূপ বলাটা নিয়ম নয়। এই রকম আধ্যাত্মিক চাপে যতদূর সম্ভব চুপ থাকিতে পারিলে উত্তম। কিছু কিছু সাধক আছেন, যাহারা বেলায়েতে ছোগরার তেমন অবস্থাতে নিজেকে নিশ্চুপ রাখিয়াছেন, আল্লাহতায়ালাও তাহাদেরকে ছোগরা বেলায়েতের গন্ডি পার করাইয়া বেলায়েতে কোবরা, বেলায়েতে উলিয়া, কামালাত ও হকিকতের অধ্যায় সমুহের মারেফাত দান করিয়াছেন। তবে সেই উচু দরজার আরেফের সংখ্যা খুবই নগন্য।

বেলায়েতে ছোগরায় মারেফাত শেষ করিলে কখনও কখনও শ্রেষ্ঠত্বের অনুভূতি নিজের ভিতরে পয়দা হইতে পারে যাহা সাধকের জন্য অনেক সময় ক্ষতির কারণ হয়। একদা হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেব নির্জনে বসিয়া ধ্যান করিতেছেন। হঠাৎ তাহার মনে এক অদ্ভুত খেয়াল আসে। তিনি বলেন যে, আমার মনে হইল, আমি এই জামানার শ্রেষ্ঠ পীর ও শ্রেষ্ঠ কুতুব। পরক্ষণে একটু চিন্তা করিয়া আমি বুঝিতে পারিলাম যে, এরূপ কল্পনা মনে স্থান দিয়া আমি বড়ই ভুল করিয়াছি। আমার ভিতর অস্থিরতা শুরু হইল। আমি তখনই বোস্তাম হইতে খোরাসানের দিকে রওয়ানা হইলাম। পথিমধ্যে এক মঞ্জিলে উপস্থিত হইয়া আমি কসম করিলাম যে, যে পর্যন্ত মহান খোদাতায়ালা কোন কামেলকে পাঠাইয়া আমার প্রকৃত অবস্থা আমাকে জানাইয়া না দিবেন, সেই পর্যন্ত আমি আর সম্মুখপানে অগ্রসর হইব না।

আমি সেই মঞ্জিলেই অপেক্ষা করিতে লাগিলাম। তিনদিন তিনরাত গত হইল; কিন্তু কোন সমাধান হহল না। চতুর্থ দিন ভোর বেলা দেখি, একজন অন্ধ ও অপরিচিত লোক উষ্ট্রপৃষ্ঠে আমার দিকে আসিতেছেন। মনে মনে ভাবিলাম, আমার সমস্যার সমাধান হয়তো এখনই হইবে। উটটি নিকটে আসিতেই আমি থামিবার জন্য ইশারা দেই। সাথে সাথেই উটটির পা মাটিতে আটকাইয়া যায়। তখন আগন্তক লোকটি আমার দিকে অত্যন্ত কড়া দৃষ্টিতে তাকাইয়া বলিলেন, "হে বায়েজীদ! আমাকে উত্তেজিত করিয়া তুমি কি ইহাই কামনা কর যে, আমি আমার বন্ধ চক্ষুটি খুলিয়া তোমার খোলা চোখটি বন্ধ করি এবং বোস্তাম নগরী ও ইহার অধিবাসীবৃন্দকে বায়েজীদসহ ৭০ গজ মাটির নীচে তলাইয়া দেই?”

বিজ্ঞাপন

এই কথা শোনা মাত্রই আমার জ্ঞানবুদ্ধি লোপ পাওয়ার উপক্রম হইল। আমি নিজেকে সামলাইয়া সেই বুযুর্গকে জিজ্ঞাসা করিলাম, "হুজুর, আপনি কোথা হইতে তশরীফ আনিতেছেন।" তিনি উত্তরে বলিলেন, “হে বায়েজীদ! তুমি যখন আল্লাহর নামে কছম করিয়াছ যে, এই স্থান হইতে নড়িবে না, তখন আমি এখান হইতে তিন হাজার ক্রোশ' দূরে ছিলাম। তৎক্ষণাৎ আমি সেখান হইতে যাত্রা শুরু করিয়াছি এবং তিনদিন তিন রাত্র পর আজ আমি এখানে পৌঁছিয়াছি।" অতঃপর সেই বুযুর্গ আমাকে সতর্ক করিয়া বলিলেন, "সাবধান! হে বায়েজীদ! অন্তরকে হেফাজত করিও এবং সদা সতর্ক দৃষ্টি রাখিও।" ইহা বলিয়াই তিনি আমার দিক হইতে অন্য দিকে মুখ ফিরাইলেন এবং মুহূর্তে অদৃশ্য হইয়া গেলেন। হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেব তদীয় দেলে সৃষ্ট শ্রেষ্ঠত্বের অনুভূতির আসন্ন ক্ষতি থেকে মহান খোদাতায়ালার দয়ায় রক্ষা পাইলেন।

কিন্তু বেলায়েতে ছোগরায় আদামাতের অন্ধকারদোষমুক্ত হওয়া সত্ত্বেও কেন সাধকের মনে এমন ক্ষতিকর চিন্তার উদ্রেক হয়?

আসলে বেলায়েতে ছোগরায় সাধকের নাফস মোৎমাইন্ন্যার' গুণাগুণ পায়, নাফসের দোষ সমূহ ঝরিয়া পড়ে, নাফস খোদাতায়ালার উপর সন্তুষ্ট হয়, খোদাতায়ালাও নাফসের উপর সন্তুষ্ট হয়। ছোগরাস্থিত সাধকের নাফসের উপর কোনরূপ অভিযোগ চলে না। এই নাফস আম্মারার দোষণীয় স্বভাবমুক্ত পবিত্র নাফস; ইহা আলমে আরোওয়াহের গুণ ফিরিয়া পায়। তথাপিও সাধকের অন্তরে কেন উক্তরূপ ক্ষতিকারক অনুভূতি জাগ্রত হয়? মুলতঃ নাফস ছাড়াও মানবদেহে জড় জগতের চারটি উপাদান-আগুন, পানি, মাটি ও বাতাস বর্তমান। এই চারটি উপাদানেরও পৃথক পৃথক দোষ আছে-যাহা খোদাপ্রাপ্তির পথে অন্তরায় অর্থাৎ নিজেকে অন্যের চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করা। মানবদেহস্থিত চার সৃষ্টি করে। উক্ত চার উপাদানের মধ্যে আগুনের স্বভাব হইল অহংকার অবস্থা বিকশিত হয় না। আর উক্ত চার উপাদান-আগুন, পানি, মাটি, উপাদান পবিত্র না হওয়া পর্যন্ত মানুষের মধ্যে বিনয়-গুণের প্রশংসনীয় বাতাস পবিত্র হয় মূল মারেফাত কারখানাস্থিত দুই বিশেষ দায়েরা বেলায়েতে উলিয়া ও কামালাতে নবুয়তের মাকামে, আল্লাহপাকের সিফাতি ও জাতি নূরের অবিরাম প্রবাহে।

বিজ্ঞাপন

তবে বেলায়েতে ছোগরা প্রতিবিম্বের দায়েরা। আকরাবিয়াত হইতে পবিত্র জাতের পূর্ব পর্যন্ত যাহা কিছু আছে তথা আল্লাহপাকের নাম, গুণ, শান, শয়ুনাত-সব কিছুরই প্রতিবিম্ব আছে বেলায়েতে ছোগরায়। এই প্রতিবিম্বের ফয়েজে সাধকের চরিত্রে উত্তম গুণাবলী সন্নিবেশিত হয়। সাধক সিফাতি হাকীকীর প্রতিবিম্বের নূরে হাকীকী গুণাগুণ লাভকরে।

প্রধান মারেফাত কারখানায় মুরাকাবায়ে শরহে ছদর নামক এক মাকাম বর্তমান, যে মাকামের ফয়েজে ছালেকের ছিনা প্রশস্ত হয়; ছালেকের ধৈর্য গুণ বৃদ্ধি পায়। এই মাকাম হইতে নির্গত নূরের প্রতিবিম্ব আছে বেলায়েতে ছোগরায়। ফলে ছোগরাস্থিত সাধক মুরাকাবায়ে শরহে ছদরের গুণে ভূষিত হয়। হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেবের জীবনেও আমরা ইহার প্রতিফলন দেখিতে পাই। হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেবের জীবনে কম দুঃখ-কষ্ট আসে নাই। স্বীয় বিবি ছাহেবার হাজার অপমান, নির্যাতন, বোস্তাম বাসীদের অবর্ণনীয় অত্যাচার তাঁহার উপর আসিয়াছে। কিন্তু তিনি তাহাদের উপর কোন অভিশাপ দেন নাই; বরং বোস্তামবাসী তথা সমগ্র মানবজাতির মুক্তি ও ক্ষমার জন্য দিবা-নিশি রোদন করিয়াছেন।

হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেবের কিছু কিছু উক্তির গভীর তাৎপর্য বুঝিতে না পারিয়া স্থূল দৃষ্টি সম্পন্ন বোস্তামবাসী আলেমওলামা এক এক করিয়া সাতবার দেশ হইতে তাঁহাকে বিতাড়িত করিয়াছেন; কিন্তু তবুও সেই বোস্তামবাসীদের জন্যই তিনি অঝরে কাঁদিতেন। একবার তিনি বোস্তাম বাসীদের জিজ্ঞাসা করিলেন, কেন তোমরা আমাকে স্বদেশ হইতে তাড়াইয়া দাও? তাহারা জবাব দিল, তুমি একজন নিকৃষ্ট লোক। হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেব বলিলেন, সেই শহরটি খুবই উত্তম শহর, যেখানকার নিকৃষ্টতম লোক বায়েজীদ।

বিজ্ঞাপন

ওলী-আল্লাহদের আছলাতেই পৃথিবীতে আল্লাহর রহমত আসে। তাঁহাদের অছিলাতেই জমিনে শস্য হয়, পানিতে মাছ হয়, গাছে ফল হয়, আকাশ হইতে মিঠা পানি বর্ষে। তাহাদের কারণেই জগতের মানুষ টিকিয়া ও বাঁচিয়া থাকে।

একদা বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেবের উপর বোস্তামবাসীরা তদীয় তাৎপর্যবহ কিছু উক্তির মর্ম অনুধাবন করিতে না পারিয়া অবর্ণনীয় নির্ঘাতন চালাইল। সেই নির্যাতনে বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেব অতিষ্ঠ হইয়া বোস্তাম ত্যাগ করিয়া অন্যত্র চলিয়া যাওয়ার জন্য রওয়ানা হইলেন। তিনি হাঁটিতে হাঁটিতে এমন এক পর্যায়ে আসিলেন, যখন তাঁহার এক পা বোস্তাম নগরীতে, অন্য পা বোস্তাম নগরীর সিমানার বাহিরে। তৎক্ষণাৎ তাঁহার উপর এলহাম হইল, "হে বায়েজীদ! বোস্তাম নগরীর সিমানা হইতে তোমার পা শূন্যে উঠানো মাত্রই সমুদয় অধীবাসীসহ বোস্তাম নগরী ধ্বংস করিয়া ফেলিব।" বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেব আর পারিলেন না, সংগে সংগেই সিমানার বাহিরে নেওয়া কদম বোস্তাম নগরীর সিমানার মধ্যে লইয়া আসিলেন এবং মহান খোদাতায়ালার নিকট হাত তুলিয়া বলিলেন, "হে খোদা! ওরা যতই নির্যাতন করুক, ওদেরকে তুমি ক্ষমা কর।"

হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেবের চারিত্রিক গুণাবলীঃ

বিজ্ঞাপন

হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেব ধৈর্যে, সহনশীলতায়, দানশীলতায়, উদারতায়, মহানুভবতায়, ক্ষমা, মহত্ত্বে ও অমায়িক ব্যবহারে ছিলেন অতুলনীয়।

একবারের একটি ঘটনা। হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেব একদা একাকীই কোন এক কবরস্থানের পার্শ্ব দিয়া যাইতেছেন। এমন সময় তিনি দেখিতে পান, বোস্তামের কোন এক ধনাঢ্য লোকের যুবক পুত্র কবরস্থানের পাশে বাদ্য-যন্ত্র বাজাইতেছে। তিনি যুবকটিকে কবরস্থানের পার্শ্বে বাদ্য-যন্ত্র না বাজাইবার পরামর্শ দেন। কিন্তু যুবকটি উপদেশ না শুনিয়া বরং রাগান্বিত হয়। হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) তখন আস্তে আস্তে এই দু'আটি পড়েন-

لا حَوْلَ وَ لَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ الْعَلِيُّ الْعَظِيمِ

বিজ্ঞাপন

যাহার অর্থ-"মহান ও সর্ব শক্তিমান আল্লাহতায়ালা ছাড়া এই যুবককে অপকর্ম হইতে ফেরানোর শক্তি কাহারো নাই।" যুবকটি ইহা শুনিয়া এমনি ক্রোধান্বিত হইল যে, তখনই হাতের বাদ্য-যন্ত্র দ্বারা হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেবের মস্তকে সজোরে আঘাত করিল ইহাতে বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেবের মস্তক ফাটিয়া গেল; যুবকটির বাদ্য যন্ত্রটিও ভাংগিয়া গেল। তিনি কাহাকেও কিছু না বলিয়া খানকায় চলিয়া আসিলেন। সারা রাত্র এক অস্বস্তিকর যন্ত্রণায় অতিবাহিত করিলেন এই যন্ত্রণা নিজের মাথার ক্ষত স্থানের জন্য নয়, বরং যুবকটির বাদা যন্ত্রের জন্য।

যুবকটির বাদ্য-যন্ত্র মুলতঃ তাঁহারই কারণে ভাংগিয়া গেল। এই চিন্তায় রাত্রিতে তাঁহার ঘুম হইল না। পরের দিন ভোরবেলা তিনি বাদ্য যন্ত্রটির মূল্যস্বরূপ কিছু মুদ্রা এবং কিছু মিষ্টান্ন এক খাদেমের নিকট অর্পণপূর্বক উক্ত যুবকের ঠিকানা দিয়া বলিলেন, "তুমি যুবকটির নিকট যাইয়া আমার তরফ হইতে বলিবে যে, গতকাল আপনি হুজুরের মাথায় আপনার সাধের বাদ্য যন্ত্র দ্বারা আঘাত করিয়া যন্ত্রটি ভাংগিয়া ফেলিয়াছেন, উহার ক্ষতিপূরণ স্বরূপ আমার হুজুর এই মুদ্রাগুলি প্রেরণ করিয়াছেন, এই মুদ্রা গুলি গ্রহণ করুন এবং নতুন পছন্দমত একটি বাদ্য যন্ত্র কিনুন। কিছু মিষ্টান্ন হুজুর কেবলা প্রেরণ করিয়াছেন; ইহা ভক্ষণ করুন, তাহা হইলে বাদ্য যন্ত্র নষ্ট হওয়ার জন্য যে যন্ত্রণা ও বেদনা আপনার মনে সৃষ্টি হইয়াছে তাহাও দূর হইবে।”

গতরাতের ঘটনায় যুবকটির মনও ভীষণ খারাপ ছিল, অনুতাপের আগুন জ্বলিতেছিল, কিন্তু ভোরবেলা হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেবের এমন মহত্ব ও অমায়িক ব্যবহারে তাহার মন এমনিভাবে গলিয়া গেল যে, যুবকটি অঝরে কাঁদিতে কাঁদিতে হযরত বায়েজীদ (রঃ) ছাহেবের খানকায় গিয়া উপস্থিত হইল এবং মহাত্মার কদমে পড়িয়া বুক ফাটা কান্না শুরু করিল। তিনিও যুবকটিকে ক্ষমা করিয়া মুরীদ করিয়া লইলেন। হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেবের চারিত্রিক মাধুর্যে মুগ্ধ হইয়া এমনি ভাবে পথভোলা মানুষ সত্যের সন্ধ্যান লাভ করিত।

বিজ্ঞাপন

তিনি ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সকলকেই ভালবাসিতেন। প্রেমের রশি দিয়া টানিয়া সকলকেই তিনি খোদাতায়ালার দিকে আগাইয়া নিতেন। তাঁহার খানকার পার্শ্বেই একজন অগ্নিপূজক বাস করিতেন। সংসারে তাহার সদস্য বলিতে মাত্র তিন জন। অগ্নি পূজক নিজে, তাঁহার স্ত্রী এবং একটি দুগ্ধপোষ্য শিশু সন্তান। তথাপিও তাহার সংসারে সচ্ছলতা ছিল না। অগ্নিপূজক কার্য উপলক্ষ্যে বিভিন্ন জায়গায় সফরে যাইতেন। গৃহে থাকিত বিবি ও শিশু সন্তান। শিশু সন্তানটি সারা রাত্রি ধরিয়া ক্রন্দন করিত। খবর লইয়া জানা গেল, অগ্নি পুজকের ঘরে কোন প্রদীপ জ্বালাইবার ব্যবস্থা নাই।

অন্ধকার ঘরে শিশুটি তাই চিৎকার করে। ইহা শুনিয়া হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেব নিজ হোজরার একটি প্রদীপ অগ্নি পূজকের গৃহে পাঠাইয়া দিলেন। প্রদীপের আলো পাইয়া শিশু সন্তানের ক্রন্দন থামিয়া গেল। ইহার পর হইতে তিনি প্রতিদিনই প্রদীপের তেল অগ্নি পূজকের ঘরে পাঠাইয়া দিতেন; সংগে অন্যান্য প্রয়োজনীয় সাহায্যও করিতেন। অগ্নি পূজক গৃহে আসিয়া বিবির নিকট হইতে একজন ভিন্ন ধর্মাবলম্বীর প্রতি হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেবের এমন মহৎ আচরণের কথা শুনিয়া মুগ্ধ হইলেন। বিবিকে বলিলেন, হযরত বায়েজীদের ন্যায় মহামানবের আলো যখন আমার ঘরে আসিয়াছে, তখন অন্ধকারে ডুবিয়া থাকা আমার জন্য সমীচীন নয়। অতঃপর তিনি হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেবের খেদমতে যাইয়া ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করিয়া মুসলমানদের দলভুক্ত হন।

হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেব রাসূলে করীম (সাঃ) এর চরিত্রে চরিত্রবান ছিলেন। রাসূলে পাক (সাঃ) যেমন উম্মতকে ভালবাসিতেন, তেমনি অপরাপর সৃষ্টিকেও ভালবাসিতেন। কিট-পতংগ, পশু-পাখী সবার প্রতিই তাঁহার মহব্বতের ধারা প্রবাহিত ছিল। ঠিক তেমনি হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেবও মানব কুলের মুক্তির জন্য কাঁদিয়াছেন, মানব সমাজকে যেমন প্রেমরসে সিক্ত করিতেন, তেমনি অপরাপর সৃষ্টির প্রতিও তাঁহার ভালবাসা ছিল অতুলনীয়।

একবার হজ্জ সমাপনান্তে মক্কা হইতে ফিরিবার পথে হামাদান নামক এক স্থান হইতে কিছু ফলের বীজ ক্রয় পূর্বক চাদরের কোনে বাঁধিয়া রাখিলেন। বোস্তামে আসিয়া চাদরের গিরা খুলিয়াই দেখিলেন, বীজের সাথে কিছু পিপীলিকা। তিনি দুশ্চিন্তায় পড়িলেন। এই পিপীলিকাগুলিকে তিনিইতো দলছাড়া ও স্থানচ্যুত করিয়াছেন। আত্মীয়-স্বজনের বিচ্ছেদ ব্যাথায় না জানি পিপীলিকাগুলোর কতই না কষ্ট হইতেছে। এই ক্ষুদ্র প্রাণীর কষ্ট তিনি নিজের করিয়া উপলব্ধি করিলেন এবং তৎক্ষণাৎ ফেলিলেন। যথাস্থানে পিপীলিকাগুলোকে রাখিয়া তবেই তিনি স্বস্তির নিঃশ্বাস পিপীলিকাগুলোকে পূর্ববৎ বাঁধিয়া হামাদানের দিকে রওয়ানা হইলেন।

হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেব শরীয়ত ও সুন্নতের পরিপূর্ণ অনুসরণ করিতেন। নিজে যেমন শরীয়তের খুটিনাটি হুকুম আহকাম পর্যন্ত পালন করিতেন, তেমনি তদীয় মুরীদবর্গকেও শরীয়ত পরিপূর্ণ অনুসরণের নির্দেশ দিতেন। একদা কতিপয় লোক আসিয়া হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেবের নিকট একজন দরবেশের কথা উত্থাপন করিয়া বলিল, সেই দরবেশ সারা বছর দিনে রোজা রাখে, রাত্রি নফল ইবাদতে কাটাইয়া দেয়। হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেবের স্বভাব ছিল কোন দরবেশের খোঁজ পাইলে তাঁহার সাথে দেখা করা এবং মারেফাতের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয়ে আলাপ আলোচনা করা।

একদিন কিছু খাদেমসহ তিনি সেই দরবেশের সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হইলেন। দরবেশের খানকায় পৌঁছাইয়া দেখিলেন, তিনি তদীয় শিষ্যদেরকে উপদেশ দান করিতেছেন। হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেব কিছু বলিবেন, এমন সময় লক্ষ্য করিলেন, কথিত দরবেশ কাবা শরীফের দিকে থু থু ফেলিল। ইহা দৃষ্টে তিনি আর এক মুহূর্ত সেখানে থাকিলেন না; মুরীদানসহ নিজ খানকায় চলিয়া আসিলেন। মুরীদানসকল কারণ জিজ্ঞাসা করায় তিনি বলিলেন, কাবা শরীফের দিকে যে লোক থু থু ফেলে, সে আর যাই হোক, তরিকতপন্থী লোক হইতে পারে না, আধ্যাত্মিকতার সাথে তাহার কোন সম্পর্ক থাকিতে পারে না। উল্লিখিত ঘটনা থেকে বুঝা যায় যে, শরীয়ত প্রতিপালনের প্রতি তিনি সর্বদাই সজাগ দৃষ্টি রাখিতেন। আর এই কারণেই মহান খোদাতায়ালা তাহাকে বহুবিধ উত্তম গুণে বিভূষিত করেন।

নিজেকে নিকৃষ্ট দর্শনঃ

মানব জাতির জন্য আল্লাহতায়ালার শ্রেষ্ঠতম দান হইল, নিজেকে নিকৃষ্ট দর্শনের জ্ঞান-যে জ্ঞানের মাধ্যমে নিজের অযোগ্যতা, অক্ষমতা, অপারগতা ও নিঃস্বতা উপলব্ধি করা যায়। এই জ্ঞান সাধক পরিপূর্ণ লাভ করেন মারেফাতের শেষের শেষ মাকাম-হকিকতে আহমদীর দায়েরাতে, মাহবুবিয়াতে জাতি নূরের ফয়েজে। কিন্তু এই দায়েরার প্রতিবিম্ব আছে বেলায়েতে ছোগরায়। সেই প্রতিবিম্বের মাধ্যমে হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেবও নিজেকে নিকৃষ্ট দর্শনের জ্ঞান লাভকরিয়াছিলেন। ইহার প্রমাণ মিলে তদীয় জীবনের কতিপয় ঘটনায়।

একদা হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেব নামাজের জন্য মসজিদের দরজায় পৌছিয়াই থকিয়া দাঁড়াইলেন এবং রোদন করিতে লাগিলেন। মুরীদানেরা ইহার কারণ জিজ্ঞাসা করিলে তিনি বলিলেন, "আমি নিজেকে হায়েযওয়ালী স্ত্রী লোকের ন্যায় মনে করিতেছি। কেননা ঋতুমতী স্ত্রী লোকেরা মসজিদ অপবিত্র হওয়ার ভয়ে মসজিদে আসে না। আমিও আশংকা করিতেছি, আমার অপবিত্র দেহের পরশে পাছে মসজিদ অপবিত্র না হইয়া যায়।" নিজেকে কেমন নিকৃষ্ট জানিতেন তিনি; তাই আল্লাহর রহমতের স্রোতও অবিরাম প্রবাহিত হইত তাঁহার প্রতি।

ইবাদতে নিজের অক্ষমতা ও অপরাগতাকে নিম্নরূপে তিনি প্রকাশ করেন। জীবনের শেষ প্রান্তে আসিয়া মাঝে মাঝেই তিনি বলিতেন, "আমার সারাটি জীবন এই আকাংখার উপর কাটিয়াছে এবং এখনও কাটিতেছে যে, একবার এমন নামাজ পড়ি যাহা তাহার দরবারের উপযুক্ত হয়। কিন্তু আমার সেই আকাংখা আজও পূর্ণ হয় নাই। আমি একবারও তেমন নামাজ পড়িতে পারি নাই।” তিনি এশার নামাজের পরে চারি রাকায়াত করিয়া নফল নামাজ পড়িতেন। প্রত্যেক বারই ছালাম ফিরাইয়া বলিতেন, এই নামাজতো তাঁহার দরবারে যোগ্য নামাজ হয় নাই। আবার নিয়ত বাঁধিয়া নামাজ আরম্ভ করিতেন ও শেষ করিয়া পূর্বের ন্যায় বলিতেন। এই রূপ করিতে করিতে রাত্রি শেষ হইয়া যাইত। তিনি বলিতেন, "এলাহী! আপনার দরবারের উপযোগী নামাজ পড়িবার খুবই চেষ্টা করিলাম; কিন্তু পারিলাম না। হে খোদা! আপনি বহু বেনামাজিকেও তো আপনার দয়া গুণের খাতিরে মাফ করিয়া দিবেন। আপনার গাফ্ফার নামের বরকতে আমার অক্ষমতাকে ক্ষমা করিয়া আমাকেও তাহাদের দলে অন্তর্ভুক্ত করেন।"

জীবনের শেষ লগ্নে ইন্তেকালের পূর্বে তাহার মুখ নিঃসৃত বাণী থেকেও মারেফাত রাজ্যের শেষ স্তরের হাল পরিলক্ষিত হয়। তিনি বলেন, “হে পরওয়ারদিগার! আমি কখনও গাফলত ও অমনোযোগিতা ভিন্ন আপনাকে স্মরণ করি নাই। আর, এখন আমার প্রাণ পাখী উড্ডয়নের পথে, এখনও আমি আপনার ইবাদত হইতে গাফেল। জানি না, আমার অন্তঃকরণ আপনার দরবারে হাজির হওয়ার ভাগ্য কখন লাভ করিবে?এই শব্দগুলি উচ্চারিত হইতে হইতেই তদীয় প্রাণ পাখী খোদাতায়ালার সান্নিধ্যে চলিয়া গেল।

তিনি ৭৪ বছর জীবিত ছিলেন। এই দীর্ঘ সময়ে দেশ-বিদেশের লক্ষ সফলকাম হইয়াছেন, খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞান হাছিল করিয়াছেন। তিনি শুধু লক্ষ লোক তদীয় পবিত্র সান্নিধ্যে থাকিয়া আত্মশুদ্ধির তপস্যা করিয়া কালে ঘুরিয়া ঘুরিয়া তিনি জ্ঞানের আলো বিতরণ করিয়াছেন। একদা বোস্তাম নগরী থেকেই তরিকা প্রচার করেন নাই। পৃথিবীর বিভিন্ন তিনি চট্টগ্রাম বন্দরের নিকটবর্তী বাজে বোস্তানে আসিয়া এই দেশ বাসীদের মধ্যে খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞান প্রচার করেন; অবশ্য আবার চলিয়াও যান। তাঁহার পবিত্র দেহ সমাহিত করা হইয়াছে বোস্তাম নগরীতে। সেখানেই তাঁহার মাজার অবস্থিত।

হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেবের দাফনকার্য সম্পন্ন হওয়ার পরে হযরত আহমদ খাযরাবিয়াহর বিবি বায়েজীদ (রঃ) ছাহেবের মাজার জিয়ারত করিতে আসিলেন। তিনি জিয়ারত শেষ করিয়া উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে বলিলেন, তোমরা কি জান না, হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেব কে ছিলেন? লোকেরা জবাব দিল, তাঁহার সম্পর্কে আপনিই ভাল জানেন। বিবি ছাহেবা বলিলেন, এক রাত্রিতে আমি খানায়ে কাবা তাওয়াফ করিতে করিতে ক্লান্ত হইয়া এক জায়গায় বসিয়া পড়ি। কিছুক্ষণেই আমার তন্দ্রা আসে। আমি স্বপ্নে দেখিলাম, আমাকে ঊর্ধ্বজগতে লইয়া যাওয়া হইতেছে। ধীরে ধীরে আমি আরশের নীচ পর্যন্ত যাইয়া পৌঁছিলাম। আরশের নীচে দেখিলাম, বিশাল এক ফুলের বাগান। নানা বর্ণের নানা ফুলে পরিপূর্ণ ও শোভামন্ডিত। গভীরভাবে লক্ষ্য করিয়া দেখিলাম যে, প্রত্যেকটি ফুলের প্রতি পাপড়িতে লিখিত রহিয়াছে, "বায়েজীদ (রঃ) আল্লাহর ওলী।” উল্লিখিত এই ঘটনা থেকে আসমানী জগতে হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেবের মর্যাদা সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা জন্মে। এত অধিক মর্যাদা ও সম্মান তিনি লাভ করিয়াছিলেন তদীয় অপরিসীম ত্যাগ-তিতিক্ষা ও নজিরবিহীন কঠোর তপস্যার কারণেই।

খোদাতালাশীদের জন্য এই মিছকিনের উপদেশঃ

হে জাকেরান সকল! হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেবের জীবন-অর্জন চরিত পর্যালোচনায় তোমরা বুঝিতে পারিলে যে খোদা প্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞান করিতে হইলে, খোদাতায়ালার রেযামন্দী লাভ করিতে হইলে নিম্নলিখিত বিষয়গুলির প্রতি অবশ্যই সজাগ দৃষ্টি রাখিতে হইবে।

কোন কামেল ও মোকাম্মেল ওলীর সান্নিধ্যে ও সাহচর্যে থাকিয়া খেদমত করা।

  • শরীয়ত ও সুন্নতের পরিপূর্ণ আমল করা।

  • দুনিয়ার মোহমুক্ত হওয়া।

  • নাফসের শৃংখলমুক্ত হওয়া।

  • অনাহার, অনিদ্রাসহ আত্মশুদ্ধির কঠোর তপস্যা করা।

  • খোদাপ্রাপ্তির পথে আগত যাবতীয় বিপদ-আপদ ও বালা মুছিবত চরম ধৈর্যের সাথে মোকাবেলা করা।

  • এই প্রসংগে তিনি বলেন, মারেফাতের দ্বারে প্রবেশ করিয়া দুনিয়াকে তিন তালাক প্রদান করিয়া আমি সম্পূর্ণরূপে নিঃসংগ হইলাম। অতঃপর আল্লাহতায়ালাকে বলিলাম, "হে মাবুদ! তুমি ছাড়া আর আমার কেহ নাই। দয়া করিয়া আমাকে তুমি কবুল কর। ইহার পরই আমার উপর আসিতে শুরু করিল তছবীহের দানার মত একের পর এক বিপদ-আপদ ও বালা-মুছিবতের পরীক্ষা। তিনি বলেন, এই ভাবে বহুবিধ পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরে যখন আমি নিখুঁত বলিয়া বিবেচিত হইলাম, তখন সর্ব প্রথম আল্লাহ আমাকে যে শক্তি দান করিলেন, তাহা হইল, আমি আমার মনের কালিমা ও গলদ সমূহ অর্থাৎ নাফসের দোষ ত্রুটি দূর করিতে সক্ষম হইলাম।"

    হে জাকেরান ও আশেকান সকল! তোমরা যদি খোদাতায়ালাকে পাইতে চাও, তবে পীরের নির্দেশিত পথে চল; যখন যে আদেশ তোমাদেরকে দেওয়া হয়, তাহা যথাযথ পালন কর। পীরের আদিষ্ট কর্ম করিতে ভাল মন্দ চিন্তা করিও না। পীরের নির্দেশ প্রতিপালনে চুল পরিমান এদিক সেদিক করিলে খোদাপ্রাপ্তির এই পিচ্ছিল রাস্তায় হোঁচট খাওয়ার সম্ভাবনা আছে। কারণ শয়তান সর্বদাই তোমাদের পিছনে ছায়ার মত লাগিয়া পথে চলিলে শয়তান তোমাদের ক্ষতি করিবার কোন পথই খুঁজিয়া পাইবে না। কিভাবে শয়তানকে শায়েস্তা করিতে হয়, তাহা পারে আছে; সুযোগ পাইলেই তোমাদিগকে পথ ভ্রষ্ট করিবে। পীরের নির্দেশিত কামেল ভাল ভাবেই জানেন।

    হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেবের সমকালীন সময়ে হযরত হযরত আহমদ খাজরুই (রঃ) ছাহেব বলেন, একদা আমি কোন কাজে আহমদ খাজরুই (রঃ) নামক আরও একজন ওলী বোস্তামে ছিলেন। যন্ত্রণায় ছটফট করিতেছে। আমি শয়তানকে জিজ্ঞাসা করিলাম, কে পথ চলিতেছিলাম। পথে দেখিলাম, ইবলিস (শয়তান) শুলবিদ্ধ অবস্থায় তোমাকে শুলবিদ্ধ করিয়াছে? সে বলিল, বর্তমান যুগের প্রধানতম শত্রু কর্তৃক আমি এহেন দুর্দশাগ্রস্থ হইয়াছি। আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, তিনি কে? ইবলিস জবাব দিল, তাহার নামটিও উচ্চারণ করিতে আমার ভয় হয়।

    আহমদ খাজরুই (রঃ) বলেন, ইবলিসের কথা শুনিয়া আমি মনে মনে ভাবিতে লাগিলাম, এমন আশ্চর্য ক্ষমতার অধিকারী এই যুগে হযরত বায়েজীদ (রঃ) ছাহেব ভিন্ন অন্য কেহ নয়। তিনি সরাসরি হযরত বায়েজীদ (রঃ) এর দরবারে গেলেন। তিনি দেখিলেন, হযরত বায়েজীদ (রঃ) তদীয় মুরীদানদের সহিত ইবলিস প্রসংগেই আলাপ করিতেছেন।

    তিনি বলেন, "আমি তাঁহার নিকট আরজ করিলাম, হুজুর, পথে ইবলিসকে শুল বিদ্ধাবস্থায় যন্ত্রণায় ছটফট করিতে দেখিলাম। আপনিই কি তাহাকে এই শাস্তি দিয়াছেন? তিনি বলিলেন, "হ্যা, ইবলিস আমার সাথে প্রতিজ্ঞা ভংগ করিয়াছে। তাই তাহাকে আমি এই রূপ শাস্তি দিয়াছি।"

    কাজেই, পীরের নির্দেশ যথাযথ প্রতিপালন কর। শয়তান তোমাদের কোনই ক্ষতি করিতে পারিবে না। তদুপরি খোদাতায়ালা থেকে আগত যাবতীয় পরীক্ষায় তোমরা উত্তীর্ণ হইতে পারিবে।

    খোদাপ্রাপ্তির এই রাস্তায় চলা অতিশয় কঠিন। @@@ "কঠিন" শব্দটি যত কঠিন, খোদাপ্রাপ্তির রাস্তায় চলা তাহার চাইতেও কঠিন @@@@। সারা জীবনের অভিজ্ঞতার আলোকে তোমাদিগকে আমি বলিতেছি যে, নিজ কলিজার খুন নিজে পান না করা পর্যন্ত কেহ খোদাতায়ালা পর্যন্ত পৌছাইতে পারে না। পূর্বেও কেহ পারেন নাই। যদি কেহ বলেন যে, ইহা সম্ভব; আমি তাহা বিশ্বাস করি না। হাজার পরীক্ষার কষ্টি পাথরে যাচাই না করিয়া আল্লাহতায়ালা কাহাকেও নিজ দরবারের "প্রবেশ মাত্র" (Admit Card) দান করেন না। এই পথে প্রয়োজন আদব, বুদ্ধি, মহব্বত ও সাহসের; প্রয়োজন কঠোর ত্যাগ-তিতিক্ষার: প্রয়োজন অপরিসীম ধৈর্য ও সহনশীলতার।"

    খোদাপ্রাপ্তির পথে নিজ জীবনের কঠোর সাধনার কিঞ্চিত বিবরণ পূর্বের নসিহতে তোমাদের উদ্দেশ্যে বলিয়াছি। আমার উপরে পীর কেবলাজানের কঠোরতর শাসন ছিল খাদ্য না দেওয়া। তিনি যে আমাকে আদর কম করিতেন তাহা নহে। তিনি বলিতেন, ' তোমাকে যে আমি তোমার আব্বাজানের চেয়ে কম আদর করি তাহা নয়; তবে আহার বেশী দেওয়া আমার নীতি নয়।" সাধনার সেই দিনগুলির কথা মনে পড়িলে আজও শরীর শিহরিয়া উঠে। পীর কেবলাজান আমাকে বলিতেন, "বাবা, কোমরে কাপড় বাঁধিয়া কাজ কর।" কিন্তু কিভাবে এত অধিক কাজ করিব? আমার শরীরে তো শক্তি ছিল না। কোন দিন হয়তো সকালে অর্ধ চামচ ভাত দিতেন কিন্তু সারা দিনে আর খাবার দিতেন না, রাত্রিতেও না। রাত্রি বেলায় ক্ষুধার জ্বালায় পেটে আগুন জ্বলিত। কখনবা ক্ষুন্নিবৃত্তির জন্য শয়নপূর্বে পেট ভরিয়া পানি পান করিতাম; কিন্তু তাহাতে পেটের ক্ষুধাজনিত জ্বালা আরও বাড়িয়া যাইত।

    কিছু ক্রয় করিয়া আহার করিব; এমন সামর্থও আমার ছিল না। আমার অর্থ-কড়ি ছিল না; সহায়-সম্পদ ছিল না, কোন শুভাকাংখী আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবও ছিল না। শুধু আমি আর আমার পীর ছাহেব। দুইয়ের মাঝখানে আর কিছুই ছিল না।

    আমার নাফস মাঝে মাঝে আমার সাথে ঝগড়া করিত। বলিত, তুমি আমাকে খুবই কষ্ট দিতেছ। তোমার ভিতরে আসিয়া আমার হাল নাই। আমার প্রাণ ওষ্ঠাগত। তোমা ভিন্ন অন্য কাহারো মধ্যে আসিলে আমি সুখে শান্তিতে থাকিতে পারিতাম। আমি বলিতাম, তোমাকে যে সারা দিনে অর্ধচামচ খাবার দেওয়া হয়, ইহাই তোমার অধিক প্রাপ্য। তুমি অকৃতজ্ঞ, তুমি নিমকহারাম, তোমাকে অনাহারেই মারা উচিৎ। এমনিভাবে নাফসের সাথে মাঝে মাঝেই আমাকে তর্ক-বিতর্ক করিতে হইত।

    পীর কেবলাজান মাঝে মধ্যে বলিতেন, "কোলকাতায় যাও; চাকুরী খোঁজ কর।" বহু বার আমি কোলকাতায় গিয়াছি, কিন্তু কোন চাকরীর ব্যবস্থা হয় নাই। পীর কেবলাজান কোলকাতায় যাওয়ার নির্দেশ দিতেন, কিন্তু কখনও কখনও আমি যাইতে অনিচ্ছা প্রকাশ করিতাম। ইহাতে কেবলাজান হুজুর আমাকে ধমক দিতেন, তিরস্কার করিতেন। সেই ধমকে আবার কোলকাতার দিকে রওয়ানা হইতাম। আসলে এই আটরশিতে আসিবার লাইনটাই ছিল কোলকাতায়। বার বার কোলকাতায় যাইতাম; চাকুরী খুঁজিতাম। কিন্তু কে দেবে আমাকে চাকুরী? আমি ক্ষুধা পেটে দিনের পর দিন কোলকাতার রাস্তায় রাস্তায় ঘুরিয়াছি।

    আমার দুঃখ দুর্দশার ঢেউ খাজা ছাহেবদের দেলেও আঘাত করিয়াছিল। খাজা ছাহেবেরাও পীর কেবলাজানের নিকট একাধিকবার আমার জন্য সুপারিশ করিয়াছেন। বলিয়াছেন, "আব্বাহুজুর, তাঁহার উড়িবার পাখা নাই, ধরিবার ডাল নাই। তাঁহার জন্য একটা ব্যবস্থা করুন।" কিন্তু খাজা ছাহেবদের সুপারিশেও পীর কেবলাজান হুজুর কোন ভ্রুক্ষেপ করিতেন না; তবে মাঝে মধ্যে বলিতেন, আল্লাহ ও রাসূল (সাঃ) যাহার জন্য উঁচু স্তরের এক চাকুরী রাখিয়াছেন, দুই একদিনের দুঃখ কষ্টে তাহার আসে যায় কি?

    খোদাতায়ালার ইচ্ছায়, পীর কেবলাজানের দয়ায় সেই দুঃখ-কষ্টের সাগর পাড়ি দিতে এই মিসকিন সক্ষম হইয়াছিল। তাই পীর কেবলাজান আমাকে কবুল করিলেন, তদীয় কদমের নীচে জায়গা দিলেন। রাসূলে পাক (সাঃ) হইতে পীরানে পীরগণের আত্মা পরম্পরায় মহা আধ্যাত্ম নেয়ামত খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞান -যাহা নিজ দেলে সংরক্ষিত ছিল, তাহাও তিনি এই মিসকিনকে দান করিয়া পথহারা মানব সমাজের হেদায়েতের নির্দেশ দিলেন।

    হে জাকেরান সকল! তোমরা যদি খোদাতায়ালাকে পাইতে চাও, খোদাতায়ালার রেযামন্দী' হাছিল করিতে চাও, তবে তরিকতের নিয়ম পদ্ধতি যথারীতি আদায় কর এবং যতই পরীক্ষা-নিরীক্ষা তোমাদের উপর আসুক না কেন, যতই বিপদ-আপদ, বালা-মুছিবতের ঝড় আসুক না কেন, অপরিসীম ধৈর্য ও সাহসিকতার সাথে তাহা মোকাবেলা কর। আল্লাহপাক তোমাদের সহায় থাকুন। তোমরা কামিয়াবী হও। এই দু'আ করিয়া এই অধ্যায় এখানেই শেষ করিতেছি। আমীন!

    জেবি/এসডি

    জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

    Developed by: AB Infotech LTD