হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেবের খোদাপ্রাপ্তির তপস্যা সম্পর্কিত আলোচনা

খোদাপ্রাপ্তি জ্ঞানের আলোকে শাহ্সূফি হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ও খাজা বাহাউদ্দীন নক্শবন্দ (রঃ) بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ সুলতানুল আরেফীন, সেরাজুছ ছালেকীন হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেবের জন্ম, শৈশব ও যৌবন; যৌবনে খোদাপ্রাপ্তির কঠোর তপস্যা সম্পর্কিত আলোচনা এবং তাঁহার বিভিন্ন হালের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণঃ
বিজ্ঞাপন
পূর্ববর্তী ওলী-আল্লাহদের মধ্যে যে কয়েক জন সাধক খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞান হাছিলের পথে, খোদাতায়ালার মারেফাত সাধনায় বা আত্মশুদ্ধি অর্জনে নজিরবিহীন কঠোর তপস্যার দৃষ্টান্ত স্থাপন করিয়াছেন, হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেব তাঁহাদের মধ্যে অগ্রগণ্য। তিনি এলমে শরীয়ত ও মারেফাতের সূর্যতুল্য ছিলেন।
সমকালীন সময়ে সমুদয় ওলী-আল্লাহগণের ছর্দার ছিলেন। খ্যাতনামা ওলীয়ে কামেল হযরত জোনায়েদ বোগদাদী (রঃ) ছাহেব তাঁহার সম্পর্কে বলেন, "আমাদের মধ্যে হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) এর মর্তবা ফেরেশতা জাতির মধ্যে হযরত জিব্রাইল (আঃ) এর মর্তবার ন্যায়। তৌহিদের ময়দানে সমস্ত তরীকত পন্থীরা যত দৌড়-ঝাপ এবং চেষ্টা-তদবীর করুক না কেন, হযরত ওলী-আল্লাহবায়েজীদের প্রারম্ভ ও প্রাথমিক স্থান পর্যন্ত পৌঁছিয়াই ক্ষান্ত হইয়া যায়। সেখানেই তাহারা হয়রান ও আত্মহারা হইয়া গমনে ক্ষান্ত দিয়া বসিয়া থাকে।"
হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেবের পিতামহ একজন অগ্নিপূজক ছিলেন। কিন্তু তাঁহার পিতা হযরত ঈসা ইসলাম ধর্মের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হইয়া স্বধর্ম ত্যাগ করিয়া মুসলমান হন এবং অতি অল্প সময়ের মধ্যেই দীনী এলেম সম্পর্কীয় ব্যাপক জ্ঞান অর্জন করেন।
বিজ্ঞাপন
এক শুভক্ষণে হযরত ঈসা বোস্তামী (রঃ) ছাহেবের গৃহ আলোকিত করেন সদ্য প্রসূত হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ)। সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশুর নূরানী চেহারা সন্দর্শনে মুগ্ধ হন তদীয় বাবা-মা। অত্যন্ত আদর যত্নে শিশুটিকে লালন পালন করিতে থাকেন। শিশুটি ধীরে ধীরে বড় হইতে থাকে। তদীয় পিতা হযরত ঈসা বোস্তামী (রঃ) পুত্রের শিক্ষাদানে মনোযোগী হন। প্রাথমিক শিক্ষা তিনিই দেন। অতঃপর মা করিয়া দেন। পুত্রকে মাদ্রাসায় ভর্তি করিবার কিছুদিন ইন্তেকাল করেন।
হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেব পিতৃহারা হন। তদীয় বিদুষী মাতা ছেলের লেখাপড়ার দায়িত্ব নিজেই নেন এবং প্রতি ওয়াক্ত নামাজান্তে ছেলের মংগল কামনায় মহান খোদাতায়ালার দরবারে দু'আ প্রার্থনা করেন।
হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) অত্যন্ত মেধাবী ও তীক্ষ্ণ প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। অতি অল্প সময়ের মধ্যে শিক্ষকমন্ডলীর দৃষ্টি তাঁহার প্রতি পড়ে। শিক্ষকেরা লক্ষ্য করিলেন, বায়েজীদ শুধু জ্ঞান অর্জনই করেন না, অর্জিত জ্ঞান অনুযায়ী আমলও করেন। কিন্তু অন্যান্য ছেলেরা জ্ঞান কমবেশী অর্জন করে ঠিকই, কিন্তু আমল ঠিক মত করে না। অন্যান্য ছেলেদের সাথে এখানেই মেধাবী ছাত্র বায়েজীদের তফাৎ ছিল।
বিজ্ঞাপন
ছাত্র বায়েজীদ মাদ্রাসার লেখাপড়া করেন। আবার গৃহে আসিয়া মায়ের খেদমতে নিয়োজিত থাকেন। তিনি তদীয় মাতাকে অতিশয় ভক্তি শ্রদ্ধা করিতেন-যাহার নজির খুঁজিয়া পাওয়া যায় না। তাঁহার মাতৃভক্তির কাহিনী শতাব্দির পর শতাব্দি ধরিয়া মুসলমান সমাজ তাঁহাদের ছেলেমেয়েদের শিক্ষা দেন। ছেলেমেয়েদের স্কুলের বই পুস্তকেও সে কাহিনী পরিলক্ষিত হয়। একদা রাত্রিতে হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) গৃহে বসিয়া মাদ্রাসার পুস্তকাদি অধ্যয়ন করিতেছেন। তদীয় মাতা শয্যায় শায়িতা।
তিনি পুত্রকে বলিলেন, "বাবা বায়েজী আমি পিপাসিত। আমাকে এক গ্লাস পানি দাও।" হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেব পানি আনিতে যাইয়া দেখেন কলসী শূন্য। তিনি দ্রুত নিকটস্থ নদীর ঘাটে যাইয়া পানি আনয়ন করিয়া মায়ের শিয়রে আসিয়া দেখেন তিনি ঘুমাইয়া পড়িয়াছেন। হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) চিন্তা-ভাবনা করিয়া সেই কনকনে শীতের মধ্যে পানির গ্লাস হাতে লইয়াই মাতৃ শিয়রে দাঁড়াইয়া রহিলেন। সেদিন রাত্রিতে মায়ের আর নিদ্রা ভাংগিল না। ঠিক ফজরের নামাজের পূর্বক্ষণে ঘুম হইতে জাগিয়া পুত্র বায়েজীদকে শীতের মধ্যে গ্লাস হাতে দাঁড়াইয়া থাকিতে দেখিয়া বিস্ময়ে বিমূঢ় হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, "বাবা, তুমি গ্লাস হাতে এখনও দাঁড়াইয়া রহিয়াছ?
পুত্র বায়েজীদ বলিলেন, "আম্মাজান! আপনি নিদ্রা গমনের পূর্বে এক গ্লাস পানি দিতে বলিলেন। আমি কলসীতে পানি না পাইয়া নদীর ঘাটে যাইয়া পানি আনয়ন করি। কিন্তু আসিয়া দেখি, আপনি নিদ্রাভিভূত হইয়াছেন। ভাবিলাম, পানির গ্লাস শিয়রে রাখিয়া আমি যদি নিদ্রা যাই, আপনি ঘুম হইতে জাগ্রত হইয়া পানি ভর্তি গ্লাস খুঁজিয়া না পাইলে পিপাসায় আপনার কষ্ট হইবে। তাই পানি ভর্তি গ্লাসসহ শিয়রেই দাঁড়াইয়া রহিয়াছি; যাহাতে আপনি জাগিলেই আমি আপনাকে পানি পান করাইতে পারি।"
বিজ্ঞাপন
হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেবের মাতা পানি পান করিয়া একমাত্র পুত্রের জন্য মহান খোদাতায়ালার দরবারে অন্তরের অন্তস্থল হইতে দু'আ করিলেন, 'হে রাব্বুল আ'লামীন! তুমি তোমার এই দাসীর সন্তানটিকে ওলী-আল্লাহগণের ছদার করিয়া দাও।" পুত্রের জন্য মায়ের হৃদয়-নিংড়ানো দু'আ কবুল না হইয়া কি পারে? মহান-খোদাতায়ালা হযরত বায়েজীদ (রঃ) এর মায়ের দু'আ কবুল করিলেন। হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেব পরিণত বয়সে সমসাময়িক সকল ওলী-আল্লাহর ছদার হইয়াছিলেন। মহান খোদাতায়ালার তরফ হইতে উপাধী পাইয়াছিলেন "সুলতানুল আরেফীন" অর্থাৎ আরেফদের ছর্দার।
মেধাবী ছাত্র হযরত বায়েজীদ (রঃ) গভীর মনোযোগের সাথে লেখাপড়া করেন। একদা শ্রেণী কক্ষে পবিত্র কুরআন শরীফের সূরা লোকমানের কিছু আয়াতের অর্থ এবং তাফসীর সম্পর্কিত আলোচনা হইতেছে। যখন সূরাটির এই আয়াতটি পাঠ করা হইল,
أَنِ اشْكُرْ لِي وَلِوَالِدَيْكَ
বিজ্ঞাপন
অর্থাৎ-আল্লাহতায়ালা বলেন, "আমার শোকরগুজারী কর এবং নিজ পিতামাতার শোকর কর।" (সূরা লোকমানঃ আয়াত-১৪)
হযরত বায়েজীদ (রঃ) উক্ত আয়াতের তাৎপর্য শিক্ষকের নিকট জিজ্ঞাসা করায় শিক্ষক ছাহেব আয়াতের তাফসীর বায়েজীদ (রঃ) কে বুঝাইয়া দিলেন। হযরত বায়েজীদের ভাবান্তর হইল। তিনি ভাবিলেন, একদিকে মহান খোদাতায়ালার হক আদায় করিতে হইবে, অন্য দিকে পিতামাতারও হক আদায় করিতে হইবে। এক সংগে দুই কাজ কেমন করিয়া সম্ভব? তিনি শিক্ষক ছাহেবের নিকট থেকে ছুটি লইয়া সরাসরি বাড়ী আসিলেন। অসময়ে বায়েজীদকে দেখিয়া তদীয় জননী চিন্তায় পড়িলেন। জিজ্ঞাসা করিলেন, তুমি মাদ্রাসা হইতে এখন কেন আসিলে? পুত্র বায়েজীদ বলিলেন, আম্মাজান! আজ মাদ্রাসায় সূরা লোকমানের একটি আয়াত দৌড়াইয়া আসিয়াছি। মাতা জিজ্ঞাসা করিলেন, 'কোন আয়াত?" পুত্র পড়িয়া আমি বিভ্রান্তিতে পড়িয়াছি।
তাই ছুটি লইয়া আপনার নিকট বলিলেন, আম্মাজান! আজ যে আয়াত পড়িলাম, তাহাতে আল্লাহপাক বলেন, 'তোমরা আমার শোকর কর এবং নিজ মাতা-পিতারও শোেকর কর।" কিন্তু আম্মাজান, একই সাথে দুই কুল রক্ষা করিতে আমি পারিব না। হয়, আল্লাহর নিকট হইতে আমাকে চাহিয়া লন, খোদাতায়ালার হক আদায় হইতে আমাকে অব্যাহতি দেন, নতুবা আপনি আল্লাহপাকের হাতে আমাকে সোপর্দ করেন, আপনার প্রতি আমার হক আদায় হইতে নিস্কৃতি দেন। যদি আল্লাহতায়ালার নিকট হইতে আপনি আমাকে চাহিয়া লন, তাহা হইলে কায়মনোবাক্যে আমি আপনার খেদমতে নিয়োজিত হই, আর যদি আপনি আমাকে খোদাতায়ালার হাতে সোপর্দ করেন, তাহা হইলে খোদা সন্ধানে আমি বাহির হই, তাহারই ইবাদতে মশগুল থাকি। তাঁহার মাতা পুত্রের এহেন প্রশ্নে যেমন আশ্চর্যও হইলেন, তেমন খুশীও হইলেন। তিনি পুত্রকে বলিলেন, "বাবা, তোমাকে আমি খোদাতায়ালার হাতে সোপর্দ করিলাম। আমার হক আমি তোমাকে মাফ করিয়া দিলাম। তুমি খোদারই হইয়া যাও এবং একমনে খোদাতায়ালার ইবাদতে মশগুল হও।"
বিজ্ঞাপন
হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেব মায়ের নিকট হইতে বিদায় লইয়া খোদাতালাশে বাহির হন। তিনি ভাবিয়া দেখেন যে, খোদাতায়ালার হক যথাযথ আদায় করিতে হইলে খোদাতায়ালাকে চিনিতে হইবে, তাহার সান্নিধ্য অর্জন করিতে হইবে। তাই তিনি দেশে-বিদেশে বিভিন্ন ওলী-আল্লাহর সান্নিধ্যে আসেন খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞান হাছিলের উদ্দেশ্যে। কিতাবে দেখা যায়, তিনি ১৩৩ জন ওলী-আল্লাহর সাহচর্যে আসেন এবং তাঁহাদের নিকট হইতে বাতেনী ফয়েজ হাছিল করেন। কিন্তু তথাপিও তাঁহার অস্থিরতা কাটে না। তিনি শ্যামদেশের গভীর নির্জন অরণ্যে, পাহাড়-পর্বত বা প্রান্তরে খোদাতায়ালার ধ্যানে মগ্ন থাকেন। এই ভাবে ত্রিশ বৎসর তিনি বনে-জংগলে, পাহাড়-পর্বতে ঘুরিয়া বেড়ান। কিন্তু উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয় না।
অতঃপর তিনি হযরত ইমাম জাফর ছাদেক (রঃ) ছাহেবের সান্নিধ্যে যান। তাঁহার হাতে বায়াত হইয়া খেদমত করিতে থাকেন। হযরত ইমাম জাফর ছাদেক (রঃ) ছাহেবও অতীব যত্নের সাথে বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেবকে তালিম (শিক্ষা) এবং তরবিয়ত (প্রতিপালন) করিতে থাকেন। তাঁহারই প্রতিপালনে কয়েক বছরের মধ্যেই হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেব শরীয়ত ও মারেফাতের ব্যাপক জ্ঞান অর্জন করেন এবং খোদাতায়ালার সান্নিধ্য অর্জন করেন।
মাতার নিকট হইতে বিদায় লওয়ার পর হইতে দেশে-বিদেশে বিভিন্ন খানকায়, পাহাড়ে-পর্বতে নির্জন মুরাকাবায় এবং সর্বোপরি হযরত ইমাম জাফর ছাদেক (রঃ) ছাহেবের পবিত্র সান্নিধ্যে থাকিয়া খোদাতায়ালা পর্যন্ত পৌঁছাইতে তাঁহার সময় লাগিয়াছিল কমপক্ষে চল্লিশ বছর। কিন্তু কেন এত সময়ের দরকার? মুলতঃ হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেব খোদাতায়ালার মারেফাত জ্ঞান হাছিলে সাধনা শুরু করিয়াছিলের নাফস হইতে। নাফস খোদাদ্রোহী। নাফস বলে, আমি খোদাকে মানি না, বিশ্বাস করি না; খোদাকে আমার কোন দরকার নাই। নাফস অন্ধকারে সৃষ্ট। ইহার স্বভাবও অন্ধকার। যাবতীয় কু-চিন্তা ও কু-স্বভাবের উৎপত্তিস্থল এই নাফস। এই নাফসকে পথে আনা তাই শুধু কষ্টকরই নয়, প্রচুর সময়ও প্রয়োজন।
বিজ্ঞাপন
সাহাবা ও তাবেঈগণের পর হইতে হযরত বাহাউদ্দিন নকশবন্দী (রঃ) ছাহেব পর্যন্ত সাধকবর্গকে তাঁহাদের সাধনা শুরু করিতে হইত আলমে খালকের লতিফা-লাতিফায়ে নাফস হইতে; যাহা ছিল অত্যন্ত কষ্টকর ও সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। পরবর্তীতে হযরত বাহাউদ্দিন নকশবন্দী (রঃ) এর অছিলায় মহান খোদাতায়ালা খোদাতালাশীদের জন্য সহজতর পথ প্রদান করেন যে পথে সাধনা শুরু হয় আলমে আমরের লতিফা-লতিফায়ে কালব হইতে। এই পথ তুলনামূলকভাবে সহজতর। হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেব খোদাপ্রাপ্তির সাধনা শুরু করিয়াছিলেন আলমে খালকের (স্কুল জগতের) লতিফা-লতিফায়ে নাফস হইতে। তাই নাফসে আম্মারার শৃংখলমুক্ত হইতে বা আদামাতের তমদোষমুক্ত হইতে তাঁহাকে যেমন কঠোর পরিশ্রম করিতে হইয়াছিল, তেমনি সময় লাগিয়াছিল কয়েক যুগ।
আত্মশুদ্ধির কঠোর তপস্যা সম্পর্কে তিনি নিজেই বলেন, "আমার নাফসের মলিনতা দূর করিয়া উহার সংশোধন কার্যে আমি বার বছর যাবৎ লৌহকার রূপে কাজ করিয়াছি। নাফসকে কঠোর রেয়াযত ও তপস্যার অগ্নিকুন্ডে ফেলিয়া মুরাকাবা, মোশাহাদা ও মুজাহাদা অর্থাৎ কঠোর পরিশ্রমের আগুনে উত্তপ্ত করিয়া তিরস্কারের হাতুড়ি দ্বারা পিটাইতে থাকি। এই উপায়ে নাফসের যাবতীয় দোষত্রুটি দূর করিয়া উহাকে আয়নার ন্যায় স্বচ্ছ করিয়া ফেলিতে সক্ষম হই।
প্রথমে নাফসকে পথে আনিতে তথা আয়নারূপে গঠন করিতেই আমার পাঁচ বৎসর কাটিয়া যায়, এই সময়ে আমি যাবতীয় ইবাদত-বন্দেগীর রেত দ্বারা উহাকে মার্জিত করিয়া লই। পরে এক বৎসর ধরিয়া উহার মধ্যে গভীর দৃষ্টিপাত করিয়া দেখিলাম যে, আমার কোমরে নিজের ইবাদত ও আমলের প্রতি ভরসা জনিত অহংকার ও আত্মতৃপ্তির পৈতা জড়ানো রহিয়াছে। অতঃপর আরও পাঁচ বছর কাল ব্যাপী কঠোর ইবাদত বন্দেগী ও চেষ্টা-সাধনার দ্বারা সেই পৈতা ছিড়িয়া ফেলিতে সক্ষম হই। তখন যেন নতুন ভাবে মুসলমান হইলাম। অতঃপর দুনিয়ার মানব সমাজের প্রতি দৃষ্টি ফেলিয়া দেখিলাম, সকলেই মৃত। এইবার চার তাকবীরের সাথে তাহাদের জানাযা পড়িয়া নিজ কর্তব্য পালনে মনোনিবেশ করিলাম এবং অবশেষে বিনা বাধায় আল্লাহপাকের সহিত মিলিত হইলাম।"
বিজ্ঞাপন
নাফসে আম্মারাকে শায়েস্তা করিতে তিনি যে কঠিন পদ্ধতি অবলম্বন করেন তাহার দৃষ্টান্ত খুঁজিয়া পাওয়া যায় না। একদা কতিপয় লোক তাঁহাকে তাঁহার সাধনা পদ্ধতির উচ্চতম পর্যায় সর্ম্পকে জানিতে চাহিলে তিনি বলিলেন, উচ্চতম পর্যায় সম্পর্কে কিছু বলিতে চাই না কারণ ইহা তোমাদের বোধগম্য হইবে না, ফলে তোমরা দৌড়াইয়া পালাইবে; বরং নিম্নতম পর্যায় সম্পর্কে কিছু বলি। অতঃপর তিনি তদীয় সাধনা পদ্ধতির নিম্নতম পর্যায় সম্পর্কে বলিলেন যে, "একবার আমি লক্ষ্য করিলাম, আমার নাফস (আম্মারা) বড়ই বাড়াবাড়ি শুরু করিয়াছে। ইবাদতে অলসতা আনিতে, আমার মনকে একটু আরাম অন্বেসী করিয়া তুলিতে বহুমুখী চেষ্টা চালাইতেছে। আমি গভীর ভাবে চিন্তা করিয়া দেখিলাম যে, এই ভাবে নাফসকে তাহার ইচ্ছার উপরে ছাড়িয়া দিলে আমার ভরাডুবি হইবে। তাই নাফসকে শায়েস্তা করিবার জন্য আমি পানি পান করা বন্ধ করিয়া দেই। দীর্ঘ এক বছর আমি আর পানি পান করি নাই।"
একবারের একটি ঘটনা। গভীর শীতের রাত। হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেব কিছু সময়ের জন্য নিদ্রাভিভূত হইয়াছেন। ইহার মধ্যে তাহার গোসল ফরজ হইয়া গেল। তিনি টের পাওয়া মাত্রই গোসল করিতে মনস্থ করিলেন। কিন্তু নাফস কাকুতি-মিনতিসহ বলিতে লাগিল, এই প্রচন্ড শীতের রাত্রিতে গোসল করিলে রক্ত জমিয়া যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। কাজেই রাত্র শেষ হউক, সূর্য উঠক, তৎপর গোসল করিলে শীতও কম লাগিবে: গোসলেও আরাম পাওয়া যাইবে।
নাফসের এহেন কু-পরামর্শে তিনি দমিলেন না। বরং পরবর্তীতে নাফস যাহাতে এমন কু-পরামর্শ দিতে না পারে সেই উদ্দেশ্যে নাফসে আম্মারাকে সমুচিত শিক্ষা দিবার জন্য তখনই হাড়-কাঁপানো শীতের মধ্যে পোশাক পরিহিতাবস্থায়ই পানির ভিতরে নামিয়া উত্তমরূপে গোসল করেন। গোসল শেষে ভিজা পোশাকেই বসিয়া থাকেন, পোশাকও পরিবর্তন করেন না। এমনিভাবে তিনি নাফসকে ধীরে ধীরে খোদাতায়ালার দিকে আগাইয়া লন।
বিজ্ঞাপন
দীর্ঘকাল উক্তরূপ কঠোর তপস্যার পরে তদীয় নাফস আম্মারার স্তর থেকে মোৎমাইন্ন্যার স্তরে উপনীত হয়। পূর্বে যে নাফক্স খোদাবিমুখ ছিল, সেই নাফসই এখন খোদার জন্য অস্থির হয়। এই প্রসংগে তিনি বলেন, "আমি দীর্ঘদিন যাবৎ নাফসকে খোদার দরবারে লইয়া যাওয়ার জন্য চেষ্টা করিয়াছিলাম; কিন্তু সে খুব ক্রন্দন করিত এবং যাইতে চাহিত না। অতঃপর যখন আল্লাহতায়ালার তরফ হইতে সাহায্য আসিল, তখন সেই নাফসই এমন হইয়া গেল যে, সে নিজেই আমাকে আল্লাহতায়ালার দরবারের দিকে টানিয়া লইয়া যাইতে লাগিল এবং আমার প্রতি হাস্য করিতে লাগিল।"
ধীরে ধীরে হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) এর উপর আল্লাহপাকের নূর বিকশিত হইল। দেল প্রশস্ত হইল। হাদীসে আছে, "মোমেন আল্লাহর নূরে দেখে।” হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেবও খোদাতায়ালার নূরে আল্লাহর সমগ্র সৃষ্টি জগত দেখিলেন। বেহেশত, দোযখ, আরশ-কুরছি, লওহ কলম-সবই দেখিলেন। তিনি বলেন, "খোদাতায়ালা নিজ নূর দ্বারা আমার চোখের আলো বাড়াইয়া দিলেন। আর সেই জ্যোতিপূর্ণ চক্ষু দ্বারা আমি সমগ্র বিশ্বজাহান দেখিতে লাগিলাম।"
অতঃপর হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেব আদামাতের তমদোষ মুক্ত হন অর্থাৎ বেলায়েতে ছোগরার দায়েরাতে খোদাতায়ালার দশমুখী নূরের প্লাবনে তদীয় দেলের গোনাহের ময়লা, গোনাহের তাছির, গোনাহের অন্ধকার, গোনাহ করিবার হাউস সবই বিদূরিত হয়। দেল পরিচ্ছন্ন হয়। নাফস খোদাতায়ালার উপর সন্তুষ্ট হয়। এই অবস্থায় তাহার আদামাতের খোলস ঝরিয়া যায়। কোটি কোটি নূরের বাল্ব প্রজ্জলিত এক বিশেষ সত্তা (অজুদের প্রতিবিম্ব) তিনি প্রাপ্ত হন। এই সত্তা দেখিতে খোদাতায়ালার অজুদের (শুভগুণ সমষ্টির প্রতিবিম্ব) অনুরূপ। এই প্রসংগে তিনি বলেন, "যে দিন আমি আমার অস্তিত্ব বর্জন করিয়া বাহিরে আসিলাম-সর্প যেরূপ নিজের খোলস ত্যাগ করিয়া বাহির হইয়া যায়: সেই দিন হইতে আমার দৃষ্টিতে আশেক ও মাশুক (সৃষ্টি ও স্রষ্টা) একই রকম বোধ হইতে লাগিল।"
বিজ্ঞাপন
ইহাই বেলায়েতে ছোগরার শেষ অবস্থা। এখানে ছালেক নিজেকে আল্লাহর অজুদের সাথে লীন হইতে দেখে। ফলে একত্বের অনুভূতি আসে-যে অনুভূতিকে "তৌহিদে অজুদী" বলা হয়। এই অবস্থায় সাধক সৃষ্টিকে স্রষ্টার অনুরূপ মনে করে। তাই ছালেক এই অবস্থাতে নিজের যাবতীয় কর্মকান্ড খোদাতায়ালার বলিয়া মনে করে। হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেব বলেন, "ঐ অবস্থায় আমি লক্ষ্য করিলাম, আমার নিজস্ব বলিয়া কিছু নাই। আমার নূর ও ইজ্জত নিজস্ব সত্ত্বাশূন্য। আমার ইবাদত-বন্দেগী, তাহাও আমার নহে। সবই তাঁহার। তাঁহারই ইচ্ছায় আমি সব কিছু করি, তাঁহারই ইচ্ছায় আমি নড়ি-চড়ি। আমার আমিত্ব তিনি, আমার সত্ত্বাও তিনি। আমি তাঁহার মধ্যে ডুবন্ত এক অনু।"
আদামাতের খোলসমুক্ত হওয়ার পরে খোদাতালাশী ব্যক্তি কোটি কোটি নূরের বাল্ব প্রজ্জলিত দেহ-বিমুক্ত যে সত্ত্বা পায়-সে সত্ত্বা চির অমরত্ব লাভ করে। ফলে বেলায়েতে ছোগরার সেই অবস্থায় ছালেক "হায়াতে আবাদী" লাভ করে।
হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেব বলেন, "আল্লাহপাকের দয়ায় আমার যবান তাঁহার রহমতের প্রশংসায়, আমার চক্ষু তাহার অপূর্ব সৌন্দর্যে এবং আমার অন্তর তাহার অভাবনীয় নূরে রূপান্তরিত হইল। আমার দৃষ্টি ও ভাবনা এখন অসীমের পানে। আমি চির অমর, মৃত্যুর আশংকা নাই। আর, আমি নিজে চলি না। নিজে বলি না বা নিজে ইবাদত করি না। তাঁহার ইংগিতেই সবকিছু ঘটিতেছে। তিনিই সকল কিছু করিতেছেন। আমি শুধু এক উপলক্ষ মাত্র।"
মারেফাত দপ্তরে বেলায়েত তিন শ্রেণীতে বিভক্ত। যথাঃ
বেলায়েতে ছোগরা বা ওলীদের বেলায়েত।
বেলায়েতে কোবরা বা নবীদের বেলায়েত।
বেলায়েতে উলিয়া বা ফেরেশতাদের বেলায়েত।
বেলায়েতে ছোগরার যেখানে শেষ, সেখান হইতে নবীদের বেলায়েত পূর্ববর্তী শেষ করিয়াছেন বেলায়েতে ছোগরায়। হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ)ও তাঁহার মারেফাত শেষ করিয়াছেন বেলায়েতে ছোগরায়। বেলায়েতে ছোগরার শেষ প্রান্তে, বেলায়েতে কোবরার প্রথম দায়েরা-আকরাবিয়াতের নিম্নে খোদাতায়ালার অজুদ (শুভগুণ সমষ্টির প্রতিবিম্ব) পর্যন্ত তিনি পৌছাইয়াছেন। অজুদের দর্শন লাভ করিয়াছেন; অজুদেই নিজেকে ফানা বা বিলুপ্ত করিয়াছেন বলিয়া মনে করিয়াছেন।
অজুদের দর্শনকে তিনি আল্লাহ দর্শন বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। শুধু তিনিই নন, বেলায়েতে ছোগরায় মারেফাত সমাপ্তকারী সকল সাধকই আল্লাহতায়ালার অজুদকেই আল্লাহ বলিয়া মনে করিয়াছেন। এই প্রসংগে তিনি বলেন, "আমি উরুজ ও ছায়ের করিয়া আল্লাহতায়ালার (অজুদের) এত নিকটবর্তী হইলাম, আমার মনে হইল, এত নিকটে অন্য কেহই নাই। অতঃপর আমি গভীরভাবে লক্ষ্য করিয়া দেখিলাম, আমার মস্তক এক পয়গম্বরের কদমের নীচে। আমি বুঝিতে পারিলাম ওলী-আল্লাহদের মর্যাদা যেখানে সমাপ্ত হইয়াছে, নবী রাসূলগণের মর্যাদা সেখান হইতে শুরু হইয়াছে।"
হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেব আরও বলেন, "আমি আল্লাহময় জগত ভ্রমণ করিলাম, আল্লাহকে দেখিলাম। সেখান হইতে বহু দূরে দেখিলাম রাসূলে পাক (সাঃ) এর হকিকত। সেখানে যাওয়ার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করিলাম; কিন্তু ব্যর্থ হইলাম। কারণ পথে দেখিলাম অসংখ্য আগুনের নদী প্রবাহিত। কাহার সাধ্য যে, সেই নদী অতিক্রম করে? আল্লাহর খাস দরবারে রাসূলে করীম (সাঃ) এর তাবু দৃষ্টি গোচর হইল। আমার খুবই ইচ্ছা জাগিল সেখানে যাওয়ার; কিন্তু চেষ্টা করিয়াও পারিলাম না। খুবই দুঃখ পাইলাম। আল্লাহতায়ালাকে মনের ব্যথা জানাইলে তিনি বলিলেন, ঐ খানে যাওয়া সম্ভব নহে, যতক্ষণ না তাঁহার সুন্নতের পরিপূর্ণ আমল করিবে।"
উল্লিখিত ঘটনায় স্পষ্ট বুঝা যায় যে, হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) যে আল্লাহময় জগত ছায়েরের কথা বলিয়াছেন তাহা ছিল আল্লাহতায়ালার নাম ও গুণাবলীর প্রতিবিম্বিত নূরের জগত। আর আল্লাহ দর্শন বলিতে তিনি আল্লাহর অজুদের দর্শন বুঝিয়াছেন; আল্লাহপাকের জাত (সত্ত্বা) দর্শন নয়। আল্লাহপাকের অজুদ (সিফাত সমষ্টির প্রতিবিম্ব) মারেফাতের মূল কারখানার (আকরাবিয়াত হইতে পবিত্র জাত পর্যন্ত বিশাল মারেফাত দফতরের গভীরতম অধ্যায়-যাহা হকিকতে মুহাম্মদীরও বহু উপরে। রাজ্য) বাহিরের অবস্থা। কিন্তু আল্লাহপাকের জাত মুল মারেফাত আল্লাহর জাত দর্শনই প্রকৃত আল্লাহ দর্শন-যাহা খুব অল্প সংখ্যক ওলী-আল্লাহই লাভ করিয়াছেন।
আল্লাহপাকের অজুদ হইতে হকিকতে মুহাম্মদী বহু, বহু উর্ধ্বের দায়েরা। অজুদ ও হকিকতে মুহাম্মদীর মধ্যে আছে-আকরাবিয়াত, মহব্বতে আউয়াল, মহব্বতে ছানী, কাওছ, বেলায়েতে উলিয়া, মুরাকাবায়ে শরহে ছদর, কামালাতে নবুয়ত, কামালাতে রেছালত, কামালাতে উলুল আজম, হকিকতে ইব্রাহিমী ও হকিকতে মুছবীর দায়েরা, অতঃপর হকিকতে মুহাম্মদীর দায়েরা। অজুদ ও হকিকতে মুহাম্মদীর মধ্যে আছে দশ-বারটি মাকাম যে সকল মাকাম হইতে অনবরত আল্লাহতায়ালার সিফাতি ও জাতি নূর প্রবাহিত হইতেছে। মূলতঃ হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেব তদীয় উল্লিখিত ঘটনায় আল্লাহপাক (অজুদ) ও হকিকতে মুহাম্মদীর মধ্যে যে অসংখ্য আগুনের নদীর কথা উল্লেখ করিয়াছেন তাহা আল্লাহতায়ালার সিফাতে হাকীকী ও জাতি নূরের অবিরাম প্রবাহ।
হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেব এমনি ভাবে সাধনা শেষ করেন। তাঁহাকে খোদাতায়ালা পর্যন্ত পৌছাইয়া দেন হযরত ইমাম জাফর ছাদেক (রঃ) ছাহেব। তিনি দীর্ঘ সময় ইমাম জাফর ছাদেক (রঃ) ছাহেবের খেদমতে ছিলেন। বিদায় হওয়ার দুই দিন পূর্বের ঘটনা। ইমাম জাফর ছাদেক (রঃ) ছাহেব মুরীদানের উদ্দেশ্যে তরিকত বিষয়ক নসিহত প্রদান করিতেছেন। এমন সময় তিনি বায়েজীদকে বলিলেন, "বাবা, তুমি তাকের উপর হইতে অমুক কিতাবখানা লইয়া আস। "কিন্তু বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেব জিজ্ঞাসা করিলেন, হুজুর! তাক কোন জায়গায়?
হযরত ইমাম জাফর ছাদেক (রঃ) ছাহেব অবাক বিস্ময়ে বায়েজীদ (রঃ) এর প্রতি তাকাইয়া বলিলেন, "কিহে বায়েজীদ! তুমিতো কয়েক বছর যাবৎ আমার খেদমতে আছ, অথচ আজ পর্যন্ত আমার বইয়ের তাক কোথায়, তুমি জান না। ব্যাপার কি?"
হযরত বায়েজীদ (রঃ) ছাহেব বলিলেন, "হুজুর! আমি আপনার সান্নিধ্যে আসিয়াছি খোদাতায়ালাকে পাওয়ার ইচ্ছায়। আমি নিজেকে কায়মনবাক্যে আপনার প্রতি নিয়োজিত রাখিয়াছি। আমার দৃষ্টি শুধু আপনারই প্রতি।কোথায় তাক? কোথায় কিতাব? সেই দিকে কখনও আমি লক্ষ্য করি নাই। আমাকে ক্ষমা করুন।"
হযরত ইমাম জাফর ছাদেক (রঃ) ছাহেব এই রূপ উক্তি শুনিয়া অতিশয় খুশী হইলেন। তিনি বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) কে মারেফাতের সম্পদে ভরপুর করিয়া দিয়া বলিলেন, "বাবা, আমি তোমার উপর খুশী। আল্লাহপাক তোমার মনো বাসনা পূরণ করিয়াছেন। তুমি এখন দেশে যাও, মানব সমাজের হেদায়েতের দিকে দৃষ্টি দাও।"
পীরের নির্দেশে হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) গৃহাভিমুখে রওয়ানা দিলেন। দীর্ঘ ৩৫/৪০ বছর পূর্বে মায়ের নিকট হইতে বিদায় লইয়া খোদাতালাশে বাহির হইয়াছিলেন। দীর্ঘ সময় পরে হইলেও উদ্দেশ্য সিদ্ধ হইয়াছে। তিনি খোদাতায়ালার সান্নিধ্য লাভ করিয়াছেন; ব্যাপক মারেফাত জ্ঞান অর্জন করিয়াছেন। আজ তিনি দেশাভিমুখে চলিতেছেন। এই দীর্ঘ কালের ব্যবধান। তদীয় জননী জীবিত আছেন, নাকি দারুল বাকায় চলিয়া গিয়াছেন-তিনি তাহা জানেন না। আজ বার বারই তদীয় মাতার কথা স্মৃতিপটে ভাসিয়া উঠিতেছে। বেশ কয়েকদিন পথ চলিয়া একদিন নিজ গৃহের দ্বারে যাইয়া পৌঁছান।
কান পাতিয়া শুনিতে পান, ঘরের ভিতরে তাঁহার মাতা ওযু করিতে করিতে এই দু'আ করিতেছেন-এলাহী! আমার সেই মুসাফির পুত্রটিকে নিরাপদে রাখিও, তাহার প্রতি বুজর্গানে দ্বীনের অন্তর সন্তুষ্ট রাখিও। আর তাঁহাকে উত্তম হাল দান করিও। হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেব মায়ের এইরূপ দু'আ শুনিয়া অঝরে কিছুক্ষণ কাঁদিলেন। তিনি বুঝিতে পারিলেন, তাঁহার প্রতি আল্লাহর দয়া প্রদানের মূলে ছিল মায়ের হৃদয়-নিংড়ানো দু'আ। অতঃপর তিনি দ্বারে করাঘাত করিলেন। মাতা ভিতর হইতে শব্দ করিলেন, কে? হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) কান্নাভেজা কন্ঠে বলিলেন, আপনার মুসাফির পুত্র। ইহা শুনিয়া তাঁহার মাতা কাঁদিতে কাঁদিতে দৌড়াইয়া আসিয়া দরজা খুলিয়া দিয়া বলিলেন, "বাবা, এত বিলম্ব কেন করিলে? তোমার বিচ্ছেদ যাতনায় কাঁদিতে কাঁদিতে আমি দৃষ্টি শক্তি হারাইয়া ফেলিয়াছি। আমার পৃষ্ঠদেশ কুঁজো হইয়া গিয়াছে।"
হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেব বোস্তামে আসিলেন। তিনি বোস্তাম বাসীদের হেদায়েতের কাজে হাত দিলেন। দু'চারজন যাহারা আসেন, তাহাদেরকে আল্লাহ রাসূলের বাণী শোনান, আল্লাহ রাসূলের প্রেমের শরাব পান করান। দেশে আসিয়া তিনি বিবাহও করিলেন। সংসার জীবন শুরু করিলেন।
কয়েকবছর পরের কথা। তিনি তখন একাধিক সন্তানের জনক। লোকজন তোদীয় খানকায় আসে, তিনি তাহাদেরকে তালিম দেন; পথ চলার নসিহত দেন। বাদ বাকী সময় তিনি আল্লাহর ধ্যান বা মুরাকাবায় নিমগ্ন থাকেন; নূরময় জগতে বিচরণ করেন। তাঁহার মুরাকাবা প্রসংগে তদীয় মুরীদ ও খলিফা হযরত ঈসা বোস্তামী (রঃ) ছাহেব বলেন: "আমি আমার পীর হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) এর পবিত্র সান্নিধ্যে ত্রিশ বছর অতিবাহিত করিয়াছি। এই সুদীর্ঘ কালের অভিজ্ঞতায় আমি বলিতেছি, হুজুর যখনই মুরাকাবায় বসিতেন, তাঁহার মস্তক দুই হাটুর সংলগ্ন হইয়া যাইত।
ঘন্টার পর ঘন্টা এই ভাবেই কাটিয়া যাইত। দীর্ঘ ত্রিশ বছর কচিৎ দুই একটি দিন দেখিয়াছি, তিনি মস্তক উত্তোলন করতঃ মুখে একবার "আহ" শব্দ উচ্চারণ করিতেন। সে সময় আমরা তাঁহার চেহারার দিকে তাকাইয়া দেখিতাম, মনে হইত, তিনি যেন কোন আধ্যাত্মিক জগতে বিচরণ করিতেছেন।" হযরত ঈসা বোস্তামী (রঃ) ছাহেবের বর্ণিত ঘটনা হইতে বুঝা যায় যে, হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেব কি গভীর মুরাকাবাতেই না নিমগ্ন থাকিতেন!
একদা হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেব পরিবার পরিজনকে গৃহে রাখিয়া বোস্তাম নগরীর কোন মসজীদে মুরাকাবায় নিমগ্ন হন; খোদাতায়ালার অসীম অনন্ত নূরময় জগত ভ্রমণ করিতে থাকেন। একাধারে কয়েকদিন ধরিয়া তিনি মুরাকাবায় থাকিতেন। তাঁহার চক্ষুর দুই পাতা পরস্পর লাগিয়া যাইত। পরে টানিয়া খুলিতে হইত।
তিনি মসজিদে মুরাকাবায় নিমগ্ন। এদিকে সংসারে কোন খাবার দাবার নাই। বিবিও ক্ষুধার্ত। ছেলেমেয়ে গুলোও ক্ষুধার জ্বালায় কেচোর মত গড়াগড়ি করিতেছে। বিবির আর সহ্য হইল না। তিনি তদীয় স্বামী হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) এর প্রতি অতিশয় ক্ষিপ্ত হইলেন। ছেলেমেয়েদেরকে গৃহে রাখিয়া তিনি স্বামী সন্ধানে বাহির হইলেন। খোঁজাখুজির পরে এক মসজিদে যাইয়া দেখিলেন, তদীয় স্বামী গভীর মুরাকাবায় নিমগ্ন। ইহা দৃষ্টে বিবি তেলে-বেগুনে জ্বলিয়া উঠিলেন। অকথ্য ভাষায় স্বামীকে গালাগালি করিলেন। এমনি অশ্লীল সে ভাষা, আমার পীর কেবলাজান ছাহেব বলেন, "যাহা শুনিলে কুকুরেও বমন করিত।"
হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) বহু কষ্টে চক্ষুর দুই পাতা টানিয়া খুলিলেন। বিবি ছাহেবাকে দেখিয়া আবার মুরাকাবায় নিমগ্ন হইলেন। ইহা দৃষ্টে তদীয় বিবি তাঁহার গলায় কাপড় বাঁধিয়া গৃহে লইয়া আসিয়া তদীয় ক্ষুধার্ত ছেলেমেয়েদের আহাজারির দৃশ্য দেখাইলেন এবং অশ্লীল ভাষায় বকাবকিও করিলেন। হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছেলেমেয়েদের অবস্থা স্বচক্ষে দেখিলেন বটে কিন্তু কোন ভাবান্তর হইল না। তিনি পুনরায় মসজিদে যাইয়া মুরাকাবায় নিমগ্ন হইলেন।
মহান খোদাতায়ালা অদৃশ্য হইতে তদীয় বন্ধুর অবস্থা সবই অবলোকন করিলেন। তিনি ফেরেশতাদের বলিলেন, "দেখ, আমার বন্ধু আমারই ধ্যানে নিমগ্ন, আমারই সৌন্দর্য দর্শনে রত। ছেলে, মেয়ে, বিবির দিকে তাহার লক্ষ্য নাই। তোমরা যাও, আমার বন্ধুর গৃহে এক বস্তা ময়দা দিয়া আস।"
ফেরেশতাগণ খোদাতায়ালার নির্দেশে এক বস্তা ময়দা লইয়া হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেবের গৃহে যাইয়া তাঁহার বিবি ছাহেবার নিকট অর্পণ পূর্বক বলিলেন, আপনার স্বামী যে মালিকের চাকরি করেন, সেই মালিক আপনার ছেলেমেয়েদের জন্য ইহা প্রেরণ করিয়াছেন। ফেরেশতাগণ চলিয়া গেলেন। ইত্যবসরে হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ঘরে আসিয়া ময়দা দেখিয়া বিবি ছাহেবাকে জিজ্ঞাসা করিয়া জানিতে পারিলেন, একদল লোক আসিয়া ইহা প্রদানপূর্বক তাহাকে বলিয়া গিয়াছেন যে, তিনি যে মালিকের চাকুরী করেন-তিনিই ইহা পাঠাইয়াছেন।
হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেব সেই ময়দা লইয়া এলাকার গরীব দুঃখীদের মধ্যে বন্টন করিয়া দিয়া মসজিদে গমনপূর্বক মুরাকাবায় নিমগ্ন হইলেন। পরবর্তী দিনে মহান খোদাতায়ালা ফেরেশতাদেরকে বলিলেন, দেখ, আমার বন্ধুকে যে ময়দা দেওয়া হইয়াছিল, তিনি তাঁহা গরীব দুঃখীদের মধ্যে বন্টন করিয়া দিয়াছেন। তাঁহাকে তোমরা দুই বস্তা ময়দা দিয়া আস। ফেরেশতারা তাই করিলেন। কিন্তু সেই দিনও হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) মসজিদ হইতে আসিয়া সেই সমুদয় ময়দা এলাকার দরিদ্রদের মধ্যে বিলাইয়া দিলেন। পরের দিন মহান খোদাতায়ালার নির্দেশে ফেরেশতাগণ চার বস্তা ময়দা বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেবের গৃহে দিয়া গেলেন।
সেবারও হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) মসজিদ হইতে আসিয়া সমুদয় ময়দা বিলাইয়া মসজিদে গমন পূর্বক পুনরায় মুরাকাবায় নিমগ্ন হইলেন। আল্লাহপাক ফেরেশতাদেরকে বলিলেন, "আমার বন্ধুকে যাহাই প্রদান করা হয়, তাহাই তিনি বিলাইয়া দেন। কাজেই তাঁহাকে এমন পরিমানে দেওয়া হউক, তিনি যেন বণ্টন করিয়া কখনও শেষ করিতে না পারেন।" কথিত আছে, পৃথিবীর সর্বত্র হইতে বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেবের দরবারে ভেট (উপঢৌকন) বা নজরানা আসিত।
হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেবের খ্যাতি ধীরে ধীরে সর্বত্র ছড়াইয়া পড়িল। দিক-বিদিক হইতে তদীয় খানকায় তালেবে মাওলাগণ ভিড করিল। তিনি তাহাদেরকে তালিম দেন, মারেফাত শিক্ষা দেন এবং অধিকাংশ সময়ই মুরাকাবায় মগ্ন থাকেন।
মহান খোদাতায়ালা হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) কে হযরত ইমাম জাফর ছাদেক (রঃ) এর তরবিয়তে, তদীয় মাতার হৃদয় নিংড়ানো দু'আর বরকতে এবং তাঁহার একনিষ্ঠ সাধনার ফলশ্রুতিতে সমকালীন সময়ের সমস্ত ওলী-আল্লাহদের ছদার করিয়া দেন, "সুলতানুল আরেফীন" খেতাবে ভূষিত করেন।
এই প্রসংগে তিনি বলেন, "একদা এক চাঁদনী রাত্রে আমি বোস্তাম শহরের বাহিরে গেলাম। চাঁদের স্নিগ্ধ আলোয় পৃথিবী আলোকিত। সমস্ত মানুষ ঘুমে অচেতন। একাই আমি হাটিতেছি। হঠাৎ আমি এক মহা দরবার দেখিতে পাইলাম। সেই দরবার এতই বিস্তৃত যে তাহার তুলনায় ১৮০০০ আলম এক অণুর সমান মনে হইল। ইহা দৃষ্টে আমার উপর এক বিচিত্র অবস্থার সৃষ্টি হইল। আমি বলিলাম, ইয়া আল্লাহ! এত বড় দরবার অথচ এত খালী! এমন অসাধারণ দরবার অথচ এত গুপ্ত! তৎক্ষণাৎ গায়েব হইতে আওয়াজ আসিল, আমার দরবার খালী থাকার কারণ এই যে, কেহ এখানে আসে না। কারণ আমি চাই না যে, অযোগ্য লোক এই দরবারে আসুক। হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেব বলেন, তখন আমার ইচ্ছা হইল আমি অন্যান্য লোকের জন্য সুপারিশ করি। কিন্তু পরক্ষণেই ভাবিলাম, সুপারিশের যোগ্যতাতো একমাত্র মুহাম্মদ মোস্তফা (সাঃ) এর জন্য নির্দিষ্ট। সুতরাং আদব রক্ষার্থে আমি নীরব রহিলাম। অতঃপর এলহাম হইল-এইমাত্র তুমি যে আদব প্রদর্শন করিলে, ইহার খাতিরে আমি তোমার নাম উচ্চ করিয়া দিলাম। হে বায়েজীদ! কেয়ামত পর্যন্ত লোকে তোমাকে "সুলতানুল আরেফীন" বলিতে থাকিবে।"
খোদাপ্রাপ্তি সাধনার কঠোরতা সম্পর্কীয় আমার জীবনের কিছু কথাঃ
হে জাকেরান ও আশেকান সকল! তোমরা দেখিলে, খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞান হাছিলে, খোদাতায়ালার সান্নিধ্য অর্জনে হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেব কি কঠিন সাধনাই না করিলেন। কত দিবা-নিশি অনিদ্রায় কাটাইলেন, অনাহারে থাকিলেন-তাহার হিসাব কে দিবে? যুগের পর যুগ গভীর নির্জন অরণ্যে, পাহাড়ে-পর্বতে, জীবনের মায়া ত্যাগ করিয়া খোদা সন্ধানে মুরাকাবায় কাটাইলেন। পরিশেষে হযরত ইমাম জাফর ছাদেক (রঃ) এর হাতে বায়াত হইয়া, তাঁহার খেদমত করিয়া খোদাতায়ালার সন্তুষ্টি অর্জন করিলেন; মারেফাত সাধনায় সিদ্ধি লাভ করিলেন।
মারেফাত সাধনায় এত তপস্যার কেন প্রয়োজন? আসলে খোদাপ্রাপ্তির পথে সর্বাপেক্ষা বড় বাধা বা পর্দা হইল নাফসে আম্মারা। এই নাফসকে শায়েস্তা করাও দুরুহ। কিন্তু নাফসকে পর্যদুস্ত না করা পর্যন্ত খোদাতায়ালাকে পাওয়া সম্ভব নয়। তাই জীবনকে বাজী রাখিয়া নাফসকে গ্রেফতারের জন্য সংগ্রাম করিতে হয়। এই কারণে নাফসের সাথে জেহাদকে রাসূলে পাক (সাঃ) "জেহাদে আকবর" বলিয়াছেন।
হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেব নজির বিহীন রেয়াযত করেন নাফসের শৃংখলমুক্ত হওয়ার জন্য, দুনিয়ার মোহমুক্ত হওয়ার জন্য। দীর্ঘ সময় পরে হইলেও তিনি সফলকাম হন।
খোদাতায়ালার মারেফাত অর্জনে এই মিসকিনকেও কম দুঃখ-কষ্ট করিতে হয় নাই। অতি শৈশবেই মাতৃহারা হই। মায়ের আদর কি-আমি তাহা বুঝিতে পারি নাই। অতঃপর পিতার স্নেহে, পিতামহীর আদরে আমি বড় হইতে থাকি। সকলের ছোট ছিলাম বিধায় স্বভাবতঃই বাবা আমাকে একটু বেশী আদর করিতেন। আমরা দুইভাই দামী পোশাক পরিয়া হাতির পিঠে চড়িয়া ঘুরিয়া বেড়াইতাম। বড় সুখময় জীবন ছিল আমাদের। কিন্তু সেই সুখের স্থায়িত্ব বেশী দিন ছিল না।
আমার দশ বছর বয়ঃক্রমকালে বাবার সাথে আমি প্রথমে পীরের দরবারে যাই। সেই হইতে শুরু হয় খোদাপ্রাপ্তির কঠোর সাধনা। আজও যে সাধনার শেষ হয় নাই। পীরের সান্নিধ্যে যাওয়ার পর হইতেই আমার প্রতি পিতার স্নেহ হ্রাস পায়, আত্মীয়-স্বজন বীতশ্রদ্ধ হয়।
মোটকথা, খোদাপ্রাপ্তির সাধনার পূর্বেই মাকে হারাই। অতঃপর এই পথে পা বাড়াইবার কিছু দিনের মধ্যেই পিতার স্নেহ বঞ্চিত হই, আত্মীয়-স্বজনের চক্ষুশুলে পরিণত হই, বন্ধু-বান্ধবকেও হারাই। জমি-জমা যাহা ছিল বিক্রয় করিয়া প্রাপ্ত টাকা পীর কেবলাজানকেই নজরানা দেই। অতঃপর আমার বলিয়া আর কিছুই থাকে না। চরম দরিদ্রতায় নিপতিত হই। উড়িবার পাখা থাকে না: ধরিবার ডাল থাকে না।
সেই দুর্দিনে একমাত্র পীর কেবলাজানই আমার আশ্রয়স্থল ছিলেন। তিনি দয়া করিয়া আমাকে তদীয় কদমে জায়গা দিয়াছিলেন। কিন্তু তিনিও পেট ভরিয়া কখনও আমাকে খাইতে দেন নাই। অর্ধ চামচ ভাত, তদ্সংগে কিঞ্চিত তরকারী-ইহাই ছিল আমার খানা। কখনও দিনে একবার, কখনওবা দিনে দুইবার। এত সামান্য আহার! অথচ আমাকেই কাজ করিতে হইত সকলের চেয়ে বেশী। আহার কম, কাজ বেশী। ফলে, দেহ ধীরে ধীরে শুকাইতে লাগিল। কিছুদিন পরে পীর কেবলাজান আমাকে কতিপয় নির্দেশ দিলেন। তিনি বলিলেন,
+ আটদিন অন্তর অন্তর আহার করিবে। তোমাকে দেখিয়া লোকে হাসিবে। কাহাকেও কিছু বলিতে পারিবে না। কাহারও নিকট হাত পাতিতে পারিবে না।
+ চারা কলা গাছের বুক ফাড়িয়া যদি কলার ছড়া বাহির হয়; সে কলা পোক্তও হয় না। ছোপও বালা (নষ্ট) হইয়া যায়। কাজেই আনা-ফানার মোকাম তয় করিয়া অতঃপর হেদায়েতের জন্য কোমরে কাপড় বাঁধ (অর্থাৎ বেলায়েতে নবুয়ত ও কামালাতে নবুয়তের সাজে নিজেকে সজ্জিত করিয়া; উক্ত দুই মাকামের মারেফাতে সমৃদ্ধ হইয়া খোদাতায়ালার দিকে মানব সমাজকে পথ দেখাও)।
উক্ত নির্দেশ প্রাপ্তির পর হইতে শুরু হয় খোদা প্রাপ্তির বর্ণনাতীত কঠোর তপস্যা। পীরের সান্নিধ্যে এই নজীরবিহীন কঠোর সাধনা চলে আমার জীবনের ৫৪ বছর বয়ঃক্রম পর্যন্ত; যে সাধনার শুরু হইয়াছিল ১০ বছর বয়স হইতে। অর্থাৎ দীর্ঘ ৪৪ বছর অনাহার-অনিদ্রাসহ বর্ণনাতীত কঠোর তপস্যা শেষে এই মিস্কিনের উদ্দেশ্য কিছুটা সিদ্ধ হয়; আদামাতের তমদোষমুক্ত হই; নূরময় জগতে বিচরণের ক্ষমতা জন্মে। কিন্তু খোদাপ্রাপ্তির সেই সাধনা এখনও শেষ হয় নাই। এখনও আমি পীরেরই নির্দেশে পূর্বের মতই চলি, যাবতীয় কার্য সম্পাদন করি।
পীরের সান্নিধ্যে থাকাকালীন সময়ে খোদাপ্রাপ্তির সেই কঠোর তপস্যায়, আটদিন অন্তর অন্তর সামান্য খাদ্য গ্রহণে চেহারা সুরতের কি হাল হওয়ার কথা তাহা একটু চিন্তা করিলেই তোমরা বুঝিতে পারিবে। শরীরের মাংস হাড়ের সাথে লাগিয়া গিয়াছিল; রক্ত কনিকা পর্যন্ত শুকাইয়া গিয়াছিল।
তোমরা অনেকেই ব্যবসা কর, কারবার কর। ধর, তুমি কোন জিনিস ১০০ টাকায় ক্রয় করিলে। সেই জিনিসের উপর লাভ করিতে হইলে অবশ্যই তাহা ১০০ টাকার উপরে বিক্রয় করিতে হইবে। তবেই কিছু আয় হইবে।
কাজেই যে মহামুল্য মারেফাত রত্ন এত কষ্টের বিনিময়ে, এত ত্যাগ-তিতিক্ষা ও কঠোর রেয়াজতের বিনিময়ে প্রাপ্ত হইলাম, তাহা তোমরা কষ্ট না করিয়া কিভাবে পাওয়ার আশা রাখ? খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞান হাছিল করিতে আমার হাড্ডি মাংশ শুকাইয়া গিয়াছিল, কলিজার রক্ত পানি হইয়াছিল। তোমরা ভাবিও না যে, বিনা লাভে আমি ইহা বিক্রয় করিব। কাজেই, তোমরা যাহারা খোদাতায়ালার সান্নিধ্য চাও, জীবন বাজী রাখিয়া এই পথে চলিতে থাক; অনাহার, অনিদ্রা ও দরিদ্রতার জন্য প্রস্তুত হও। তবে মনে রাখিও, যে আল্লাহর দিকে অগ্রসর হয়, আল্লাহও তাহার দিকে অগ্রসর হন; কঠোর দুর্গম পথ অতিক্রম করিবার ধৈর্য-সাহস তিনিই তাহাকে দান করেন। আমি দু'আ করি, আল্লাহপাক তোমাদিগকে আত্মশুদ্ধির এই কঠিন পথে চলিবার ধৈর্য দেন, সাহস দেন ও শক্তি দেন। আমীন!







