Logo

বাতেনী শরীয়ত সংস্কারে মোজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের নিরলস চেষ্টা

profile picture
জনবাণী ডেস্ক
২৫ জুন, ২০২৬, ১৯:৫৭
বাতেনী শরীয়ত সংস্কারে মোজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের নিরলস চেষ্টা
ছবি: জনবাণী।

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ (মূল বক্তব্যঃ ইসলামের অন্তরাংগ বা বাতেনী শরীয়তের সংস্কার সাধনে মোজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের নিরলস চেষ্টা এবং সফলতা)

বিজ্ঞাপন

মুজাদ্দেদ এবং মুজাদ্দেদীয়াতঃ

'মুজাদ্দেদ' আরবী শব্দ। যাহার আভিধানিক অর্থ সংস্কারক, সংশোধক বা ভ্রম-প্রমাদ দূরকারী বা উৎকর্ষ সাধক। পূর্বেই বলা হইয়াছে, মানুষ যখনই আল্লাহকে ভুলিয়া অসত্য ও কুসংস্কারের অন্ধকারে নিমজ্জিত হইত, শয়তান বা নাফসে আম্মারার পায়রবী' করা শুরু করিত, আল্লাহর বিধানের বিরোধিতা করিত; ঠিক তখনই দয়াময় খোদাতায়ালা এক একজন নবী বা রাসূল প্রেরণ করিয়া আল্লাহভোলা, পথভ্রষ্ট ও গোমরাহ মানব জাতিকে অসত্য ও অন্ধকারের গভীর সমুদ্র হইতে উদ্ধার করিবার ব্যবস্থা করিতেন। আগত নবী বা রাসূল মানবজাতিকে শয়তান ও নাফসের শৃংখল হইতে মুক্ত করিতেন; তাহাদের আত্মিক ত্রুটি-বিচ্যুতি ধুইয়া মুছিয়া পরিস্কার করিতেন তথা আত্মিক সংস্কারক হিসাবে কাজ করিতেন। ঠিক তেমনি সমাজ ও রাষ্ট্র হইতে যাবতীয় কুসংস্কার ও মিথ্যাকে ঝাড়িয়া ফেলিয়া আল্লাহর সত্য বিধানকে প্রতিষ্ঠিত করিতেন; অশান্ত ও ঝঞ্ছা-বিক্ষুপ্ত মানবসমাজে শান্তি আনয়ন করিতেন। আল্লাহর প্রেরিত ঐ সমস্ত নবী ও রাসূলের যাবতীয় কর্মকান্ডই ছিল সংস্কারমুখী।

শ্রেষ্ঠ নবী, রাসূলে পাক (সাঃ) এর পরে আল্লাহপাক তাহার বিধানকে শেরেকী, বেদাতী ও মিথ্যার বেড়াজাল হইতে মুক্ত রাখার জন্য নবী পাঠান না ঠিকই; কিন্তু নবীদের চরিত্রে চরিত্রবান করিয়া প্রতি শতাব্দিতেই উম্মতে মুহাম্মদীর মধ্য হইতে কিছু কিছু বিশেষ লোক পাঠান, যাহারা আল্লাহর বিধানকে বা দীন ইসলামকে কলুষমুক্ত রাখিবার জন্য আজীবন পরিশ্রম করেন। তাহাদের কর্মকান্ডও হয় সংস্কার ধর্মী। তাহাদেরকেই মুজাদ্দেদ বলা হয়। মূলতঃ নবুয়ত ও মুজাদ্দেদীয়াতের তফাৎ করিতে গেলে যাহা বলা যায়, তাহা হইল-নবুয়ত হইল মূল বা আসল, আর মুজাদ্দেদীয়াত হইল প্রতিবিম্ব বা ছায়া।

বিজ্ঞাপন

পবিত্র কুরআনে নবী বা রাসূলগণের আবির্ভাব সম্পর্কে বিভিন্ন স্থানে বে'সাত শব্দ প্রয়োগ করা হইয়াছে-যাহার অর্থ 'প্রেরণ'। ঠিক তেমনি নবুয়তীর পরে জগতের বুকে মুজাদ্দেদ 'প্রেরণের' ক্ষেত্রেও যে হাদীস শরীফ দেখা যায়-তাহাতেও বে'সাত শব্দের উল্লেখ লক্ষ্যণীয়। যেমন রাসূলে পাক (সাঃ) ফরমান, "ইন্নাল্লাহা আজা অজাল্লা ইয়াবাসু লেহাজিহিল উম্মাতি আলা রাইছি কুল্লি মিয়াতি মিন ছানাতি ইউজাদ্দিদু লাহা দিনাহা।” (আবুদাউদ শরীফ) অর্থাৎ নিশ্চয় আল্লাহতায়ালা এই উম্মতের (হেদায়েতের) জন্য প্রতি শতাব্দিতে এমন এক মহান পুরুষকে 'প্রেরণ' করেন, যিনি তাহার যুগে দীনের সংস্কারক হন। সুতরাং দেখা যায়, নবী বা রাসূল (আঃ) গণের আবির্ভাব ক্ষেত্রে যে বে'সাত শব্দ পবিত্র কুরআনে ব্যবহৃত হইয়াছে; ঠিক একই শব্দ মুজাদ্দেদ বা দীনের সংস্কারক 'প্রেরণের' ক্ষেত্রেও হাদীস শরীফে ব্যবহৃত হইয়াছে। কাজেই বুঝা গেল, নবুয়ত ও মুজাদ্দেদীয়াতের কর্মকান্ড একই রকমের; তবে নবুয়ত আসল, মুজাদ্দেদীয়াত তাহার প্রতিচ্ছায়া।

কেন শায়খ আহমদকে মুজাদ্দেদ আলফেছানী বলা হয়?

আমাদের তরিকার ইমামকে মুজাদ্দেদ আলফেছানী উপাধিতে ভূষিত করা হইয়াছে। মুজাদ্দেদ অর্থ সংস্কারক যাহা পূর্বেই বলা হইয়াছে আর আলফুন অর্থ হাজার ও 'ছানী' অর্থ দ্বিতীয়। সুতরাং মুজাদ্দেদ আলফেছানী'র অর্থ দাঁড়ায় দ্বিতীয় হাজার বছরের সংস্কারক। নবী ও রাসূল (আঃ) গণ যে বয়সে নবুয়তীর দায়িত্ব প্রাপ্ত হইতেন, সেই বয়সেই অর্থাৎ ৪০তম বছরে আমাদের তরিকার ইমাম শায়খ আহমদ সেরহিন্দী দ্বিতীয় সহস্রাব্দের সংস্কার মুখী কর্মকান্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে, শায়খ আহমদ সেরহিন্দী (রাঃ) একদা ফজরের নামাজ অন্তে আপন হোজরা মোবারকে মোরাকাবায় মশগুল আছেন। এমন সময় তিনি দেখিতে পান, হযরত রাসূলে পাক (সাঃ) রুহানীভাবে সমস্ত আম্বিয়া, অসংখ্য ফেরেশতা এবং আউলিয়া ও গাউস-কুতুবদের সঙ্গে লইয়া সেখানে তশরীফ আনেন এবং নিজ হাতে তাঁহাকে একটি অমূল্য 'খিত' বা স্বীয় প্রতিনিধিত্বের প্রতীক স্বরূপ এক বিশেষ পোশাক পরাইয়া দেন এবং বলেন, 'শায়খ আহমদ, মুজাদ্দেদ বা সংস্কারকের প্রতীক স্বরূপ আমি তোমাকে এই 'খিআত' পরাইয়া মনোনিত করিলাম। আমার উম্মতের দ্বীন-দুনিয়ার তথা ইহকাল ও দিলাম এবং দ্বিতীয় সহস্রাব্দের জন্যে তোমাকে আমার বিশেষ প্রতিনিধি পরকালের যাবতীয় বিষয়ের দায়িত্ব আজ হইতে তোমার উপর ন্যস্ত করা হইল। এই ঘটনাটি ১০১০ হিজরীর ১০ রবিউল আউয়াল, শুক্রবার, ফজরের নামাজের সময় সংঘটিত হয়।

বিজ্ঞাপন

ইসলামের দুইটি দিকঃ

রাসূলে পাক (সাঃ) প্রতিষ্ঠিত ইসলামের দুইটি দিক রহিয়াছে। একটি বহিরাঙ্গ, অপরটি অন্তরাঙ্গ। একটি জাহেরী, অপরটি বাতেনী। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের মুজাদ্দেদীয়াত বা সংস্কারমূলক কর্মকান্ড শরীয়তের জাহেরী ও বাতেনী-উভয় অংশ ব্যাপিয়া বিস্তৃত। শরীয়তের জাহেরী অংশকে দেহের সাথে তুলনা করিলে বাতেনী অংশ হয় তাহার অন্তর। রাসূলে পাক (সাঃ) এর তিরোভাবের পরে, হাজার বছরের ব্যবধানে ইসলামের জাহেরী অংশ তথা দেহ যেমন শেরেকি, বেদাতী, মিথ্যা ও কুসংস্কারের ভয়াল আক্রমণে ক্ষত-বিক্ষত হয়, তেমনি অন্তর তথা বাতেনী শরীয়তও সূক্ষ্ম শেরেক ও বেদাতের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব উভয় অংশের সংস্কার বা সংশোধন করেন।

দায়েরায়ে এমকান ও বেলায়েতে ছোগরাঃ

বিজ্ঞাপন

খোদাতালাশী পথিকদের সুবিধার্থে খোদাপ্রাপ্তির পথকে এই বিদ্যার বিশেষজ্ঞরা কতকগুলো অধ্যায়ে ভাগ করিয়াছেন। প্রথম অধ্যায়ের নাম দায়েরায়ে এমকান। দ্বিতীয় অধ্যায়ের নাম দায়েরায়ে বেলায়েতে ছোগরা। দায়েরায়ে এমকানের দুইটি বিভাগ আছে। একটি আলমে খালক, অপরটি আলমে আমর। আলমে খালক ও আলমে আমরের মধ্যখানে আছে আরশ। আরশের নিম্নে আলমে খালক বা জড় জগত, আর আরশের উর্ধ্বে আলমে আমর, সূক্ষ্ম জগত বা হুকুমের জগত।

দায়েরায়ে এমকানের উপর হইতে আকরাবিয়াত পূর্ব পর্যন্ত যে বিশাল নূরময় জগত, তাহাই বেলায়েতে ছোগরা নামে পরিচিত। ইহাকে দায়েরায়ে জেলাল বা প্রতিবিম্বের দায়েরাও বলা হয়। এই দায়েরাতে যে নূর দৃষ্ট হয়, তাহা আসমা ও সিফাত বা আল্লাহতায়ালার নাম ও গুণাবলীর জেলাল বা প্রতিবিম্বের নূর।

পীরের নির্দেশিত পথে জেকের আজকার ও অন্যান্য রেয়াজত' করিবার কারণে ছালেকের লতিফাসমূহ জাগ্রত হয়। জাগ্রত লতিফাতে নাম ও গুণাবলীর প্রতিবিম্বিত নূর আসে। ফলে ছালেক ধীরে ধীরে পার্থিব আকর্ষণ মুক্ত হয় এবং আল্লাহ ভিন্ন সবকিছুকে ভুলিয়া যাইতে সক্ষম হয়। এই অবস্থাতে ছয় দিক বা দশ দিক হইতে সিফাতে এজাফিয়া বা নাম ও গুণাবলীর জেলালের নূরের স্রোত ছালেকের উপর অবিরাম পড়িতে থাকে। যে নূরে সে নিজেকে এবং সমস্ত বিশ্বব্রহ্মান্ডকে নিমজ্জিত দেখে; নূর হইতে নিজেকে আর পৃথক করিতে পারে না। নাম ও গুণের চোখ ঝলসানো, মন মাতানো নূরে বিমোহিত হইয়া আবেগ বশতঃ শরীয়তের খেলাফ অনেক কথাই এই স্তরের সাধক বলিয়া ফেলেন। সৃষ্টি স্রষ্ঠার যথাযথ, সৃষ্টির কার্যকলাপ ও গুণাগুণ আল্লাহর কার্যকলাপ ও গুণাগুণ-ইত্যাকার অনেক কথাই বেলায়েতে ছোগরাস্থিত ওলী-আল্লাহ সকল বলিয়া ফেলেন।

বিজ্ঞাপন

"অহদাতে ওজুদ" মতবাদ কি? "আনাল হক" বা 'আনা সোবহানী'র তাৎপর্য কি?

মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের পূর্বে হাজার বছরে যত ওলী-আল্লাহ জগতের বুকে আসিয়াছেন, তাঁহাদের মধ্যে দুই একজন ব্যতীত প্রায় সকলেই বেলায়েতে ছোগরায় তাঁহাদের মারেফাত শেষ করিয়াছেন। ফলে তাহাদের অনেকের থেকেই শরীয়তের খেলাফ এমন এমন কিছু তথ্য প্রকাশ লাভ করিয়াছে; যাহা শরীয়তের দৃষ্টিতে কুফরী বা শেরেকী, যদিও তরিকতের দৃষ্টিতে ইহা উচ্চ অবস্থায় আধ্যাত্মিক চাপের বহিঃপ্রকাশ ভিন্ন কিছুই নয়। বেলায়েতে ছোগরার চোখ ধাঁধাঁনো নূরের তীব্রতায় তথা আধ্যাত্মিক চাপে তাঁহারা ঐ রকম কুফরী কথাবার্তা বলিয়া ফেলিয়াছেন। তথাপি যুগের পর যুগ, শতাব্দির পর শতাব্দি যাবৎ মারেফতওয়ালাদের মধ্যে তেমন কথাবার্তা প্রচলন হওয়ায় জাহেরা ওলামা বা ফেকাহবিদদের সহিত তাহাদের এক দীর্ঘস্থায়ী বিরোধের সৃষ্টি হয়। ফলে ইসলামের মধ্যে দুইটি দলের পয়দা হয়। একটি শরীয়তপন্থী, অপরটি মারেফাতপন্থী। এই দুই দলের মধ্যে এক শক্ত প্রাচীর সৃষ্টি হয়। জাহেরা ওলামা সকল মারেফাতচর্চাকে নিষ্প্রয়োজন

মনে করে। সর্বাপেক্ষা বেশী ক্ষতি হয় সাধারণ মুসলমানের। আল্লাহকে পাওয়ার ইচ্ছা থাকিলেও সাধকদের কুফরি ও শেরেকীপূর্ণ কথাবার্তায় তাহারা বিভ্রান্ত হইয়া আল্লাহপ্রাপ্তি সাধনা ছাড়িয়া দিতেন। আল্লাহপাকের বিশেষ দয়ায় রাসূলে পাক (সাঃ)-এর তিরোধানের হাজার বছর পরে হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব ধরায় আবির্ভূত হইয়া উক্ত দুই দলের মধ্যেকার দীর্ঘস্থায়ী বিরোধের সুষ্ঠু মিমাংসা করেন।

বিজ্ঞাপন

তিনি তদীয় মকতুবাদ শরীফের দ্বিতীয় খন্ডের প্রথম মকতুবে ইহার বর্ণনায় প্রথমে পূর্ববর্তী ওলী-আল্লাহগণের দলিল হিসাবে পরিচিত হযরত মহীউদ্দিন ইবনুল আরাবীর "অহদাতে ওজুদ"-এর প্রসঙ্গ টানিয়া পরে ইহার সঠিক বিশ্লেষণ করেন এবং পূর্ববর্তী ওলী-আল্লাহদের ভুল ধরাইয়া দেন। তিনি বলেন, 'শেখ মহীউদ্দিন ইবনুল আরাবী ও তাহার অনুসরণকারীগণ বলিতেন যে, আল্লাহতায়ালার নাম ও গুণসমূহ নিছক জাতপাকের যথাযথ এবং একে অন্যের অনুরূপ। যেমন এলেম ও কুদরত সিফাত আল্লাহর জাতের যথাযথ; তেমনি জাতও এলেম বা কুদরতের যথাযথ। এখানে কমবেশীর কোন নাম-গন্ধ নাই এবং পার্থক্যেরও কোনরূপ নিদর্শন নাই। মোট কথা এই যে, সমস্ত নাম, গুণ ও শান' সমূহের প্রত্যেকটি অস্তিত্ব হিসাবে আল্লাহর যথাযথ ও একই; কমবেশী বা ভেদাভেদ কিংবা 'স্থিতি কোনরূপেই সম্ভব নয়; পার্থক্য যাহা আছে তাহা কেবল নিছক জাতপাকে সমষ্টিগতভাবে বা একত্রিতভাবে বর্তমান। এই এজমালী বা সমষ্টিগত অবস্থাই তাইনে আউয়াল এবং এই নিছক জাতের সমষ্টিগত অবস্থার পৃথক পৃথক অবস্থাসমূহ তাইনে ছানীতে অবস্থিত। এই তাইনে আউয়ালকে 'অহদাত' এবং হকিকতে মুহাম্মদী বলিয়া জানিতেন এবং তাইনে ছানীকে 'অহদানিয়াত' বলিতেন এবং তাহাদের প্রকাশ্য সমস্ত মোমকেনাতকে বাস্তব জানিতেন। আবার এই বাস্তব সৃষ্টিকে জাত মতলকের আয়েন বা যথাযথ জানিতেন। তাহারা বলিতেন যে বিভিন্ন সৃষ্টি, যাহাকে বুঝিতে পারা যায়, তাহা জাত মতলকের প্রতিবিম্ব ছাড়া অন্য কিছুই নয়। যেমন প্রতিবিম্বের অজুদের যথাযথ রূপের তুলনায় কোন পার্থক্য নাই; তেমনিই এই সৃষ্টির মধ্যে ওয়াজেবে অজুদের যথাযথ প্রকাশ ছাড়া অন্য কিছুই সম্ভব নয় এবং তাহাই বিশ্বাস করিলে সঠিক বিশ্বাস করা হইবে বলিয়া মনে করিতেন।

তাইনে আউয়াল ও তাইনে ছানী-সমষ্টিগত ও পার্থক্যগত, এই দুই অধ্যায় ছাড়া প্রকাশ্যে যাহা দেখা যায় তাহা তিন রকম-

প্রথম- তাইনে রূহী।

বিজ্ঞাপন

দ্বিতীয়- তাইনে মেছালী।

তৃতীয়- তাইনে জাছাদী।

এইগুলি প্রকাশ্য বা দৃষ্ট বস্তুর সহিত সম্পর্কিত। এই পাঁচটি তাইন পাঁচ অবস্থায় অবতীর্ণ। এই পাঁচটি অবস্থার বিভিন্ন প্রকাশগুলি আল্লাহতায়ালা হইতে সম্পূর্ণ পৃথক। এই সমস্ত জ্ঞান সাপেক্ষ রূপ বা অজুদগুলিকে তাহারা সুরাতে আয়েন বা যথাযথ আকৃতি বলেন এবং এই সুরাতে আয়েনই আল্লাহতায়ালার যথাযথ প্রতিবিম্ব এবং সে কারণে উহাদিগের প্রতি দৃষ্টি একান্তভাবেই নিবদ্ধ হওয়ায় উহাদিগের সমষ্টিকেই 'হামাউস্ত' বা উহাই তিনি বলেন। ইহাই শেখ মহীউদ্দিন ইবনুল আরাবীর ধারণা এবং ইহাই তাহার 'অহদাতে অজুদের' মোটামুটি বর্ণনা। তাহারা বলিতেন যে ইহাই বেলায়েতের দর্জার শেষ, এই জ্ঞান বিশিষ্ট ও শেষ জ্ঞান। তাহার মতের এই 'খাতেমুল বেলায়েত'কে তিনি 'খাতেমুন নবুয়ত' বলিয়া নির্ধারণ করিতেন। এই সমস্ত দলিলসমূহের দ্বারা তাহারা নিজেদেরকে নিখুঁত মনে করিয়া নিজেদেরকেই যথেষ্ট মনে করিতেন। এই সমস্ত তাইনসমূহকে শুধু ইনিই হযরত মহীউদ্দিন (রঃ)] প্রকাশ করিয়াছেন। তাহার পূর্বে আর কেহই তাহা প্রকাশ করিতে সাহস পান নাই। এই সমস্ত জ্ঞানবশতঃ তৌহিদ বা একত্ববাদ প্রতিষ্ঠাকল্পে নেশার বশবর্তী হইয়া তাহারা আনাল হক বা আনা সোবহানী বলিয়াছেন। কিন্তু তৌহিদ বা একত্ববাদকে কেহই সঠিকভাবে বুঝিতে পারেন নাই।

বিজ্ঞাপন

"অহদাতে ওজুদ” মতবাদের কারণে বাতেনী

শরীয়তে সৃষ্ট জটিলতার গিট মুক্তকরণঃ

হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবকে আল্লাহপাক মারেফাতের কারখানার সমস্ত দফতর ঘুরাইয়া দেখান। তিনি ঘোষণা করেন, মারেফাতের মূল কারখানা আকরাবিয়াত বা সিফাতে হাকীকী হইতে শুরু, তৎপর মহব্বতে আউয়াল, মহব্বতে ছানী, কাওছ, বেলায়েতে উলিয়া, অতঃপর কামালাতের অধ্যায়সমূহ, হকিকতে আম্বিয়ার অধ্যায়সমূহ, হকিকতে এলাহিয়ার অধ্যায়সমূহ হইয়া লাতাইনস্থিত নিছক নূরকে অতিক্রম করিয়া পবিত্র জাতের সান্নিধ্য পর্যন্ত ইহার বিস্তৃতি। যাই হোক, মারেফাতের মূল কারখানার প্রধান দরজাই আকরাবিয়াত। শেষ সীমা বেলায়েতে ছোগরা-যাহা মারেফাত কারখানার গেটের তথা অথচ পূর্ববর্তী অহদাতে অজুদপন্থী ওলী-আল্লাহ সকলের মারেফাতের আকরাবিয়াতের নিম্নের অবস্থা। মুজাদ্দেদ (রাঃ) ছাহেবের মারেফাতের তুলনায় যাহা সাগরের নিকট দুই এক ফোটা পানির মত।

বিজ্ঞাপন

হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলেন, পূর্ববর্তী শায়খদের দলিলস্বরূপ হযরত মহীউদ্দিন ইবনুল আরাবী (রঃ) ও তদীয় অনুসরণকারীরা 'অহদাতে অজুদ' সম্পর্কে যাহা বলিয়াছেন-মূলতঃ উহার মধ্যে কিছু নিগুঢ় তত্ত্ব আছে-তাঁহারা তাহা বুঝিতে পারেন নাই। তাঁহাদের নিকট সেই সমস্ত তত্ত্ব প্রকাশও পায় নাই। তিনি বলেন, মহান খোদাতায়ালা দয়া করিয়া সেই সমস্ত গুপ্ত তত্ত্ব এই ফকিরের (শায়খ আহমদ) নিকট প্রকাশ করিয়াছেন। অতঃপর সেই সমস্ত নিগুঢ় তত্ত্বসমূহ তিনি প্রকাশ করেন। ২য় খন্ডের ১ম মকতবে তিনি বলেন, 'আল্লাহতায়ালা হইতে আটটি সিফাত প্রকাশিত অবস্থায় বর্তমান। এই আটটি সিফাতের পার্থক্য জাত 'মতলকের' অধ্যায়ে অবর্ণনীয়ভাবে বর্তমান। এই সিফাতগুলির ভিতর পার্থক্য নির্ণয়ের কোন বর্ণনীয় পার্থক্য-কার্য করা যায় না। অথচ তাহারা প্রত্যেকেই পৃথক।

এই অবর্ণনীয় পার্থক্য জাত মতলকের অধ্যায়ে প্রমাণিত আছে। অতঃপর তিনি বলেন, এই পার্থক্য বিশিষ্ট প্রত্যেকটি সিফাতের ভিতর দুইটি বিপরীত অবস্থা আছে-যেমন সিফাতে এলেমের ভিতর জাতপাকের হাকীকী নিখুঁত জ্ঞান ও মানুষের অসম্পূর্ণ জ্ঞান বর্তমান। কুদরতের মধ্যে তাহার নিখুঁত ক্ষমতা ও মানুষের অসম্পূর্ণ ক্ষমতা বরং অক্ষমতা বর্তমান ইত্যাদি। এই পারস্পরিক বৈপরীত্যভাব আল্লাহতায়ালার সিফাতের মধ্যে বর্তমান। এই পার্থক্যের বিপরীত ভাবটির (অক্ষমতার) প্রতিবিম্বই প্রকাশিত হইতেছে এবং এ প্রতিবিম্বের রূপটি সিফাতের মধ্যস্থিত বিপরীত অবস্থার নিরাকার রূপের আয়না এবং বিপরীত গুণবিশিষ্ট সিফাতগুলির দর্পন হইলেন স্বয়ং আল্লাহপাক নিজে উহাদের প্রকাশক হিসেবে। বিপরীতভাব বা অবস্থাই হইলো সৃষ্টির হকিকত। হযরত মহীউদ্দিন (রঃ) এর নিকট সৃষ্টির হকিকত হইল আল্লাহতায়ালার আসমা ও সিফাত যাহা এলেম সিফাতের মধ্যে একটি অপরটির হইতে পৃথক এবং ফকিরের [হযরত মুজাদ্দেদ (রাঃ)। নিকট সৃষ্টির হকিকতসমূহ হইল সিফাতস্থিত বিপরীত খুঁত বিশিষ্ট নিরাকার হাকীকী অবস্থা। আল্লাহপাক যখন সৃষ্টি করিতে ইচ্ছা করিলেন, তখন ঐ সিফাতস্থিত রূপহীন হকিকতসমূহকে রূপ দিয়া প্রকাশ করিলেন।

এই প্রতিবিম্বস্থ সৃষ্টিসমূহকে যখন নিজের কামালাতের সৃষ্টি করিলেন, গেল এবং সেই সৃষ্টির ভিতর যে অক্ষমতা আসিল তাহা সৃষ্টির নিজেরই অক্ষমতাকে প্রতিবিম্বিত করা হইল যাহা ঐ সিফাতের মধ্যে বিপরীত ও হাকীকী অবস্থায় বর্তমান ছিল। ফকিরের (মুজাদ্দেদ ছাহেব) নিকট কোন সৃষ্টির প্রতিবিম্ব ঐ জিনিস নয় বরং তাহার রূপক। এখানে প্রকাশ থাকে যে, সৃষ্টি যখন বাস্তব হইয়া উঠিল তখন এই সৃষ্টি যেমন সিফাতস্থিত খুঁত বিশিষ্ট হকিকতের প্রতিবিম্ব ছাড়া অন্য কিছুই নয়; তেমন ঐ হাকীকী সিফাতের নিখুঁত অবস্থারও প্রতিবিম্ব সৃষ্টির ভিতরে আসিল-কিন্তু নিখুঁত সিফাত যথাযথ হিসাবে আসিল না। সিফাতের ভিতরে যেমন সৃষ্টির ত্রুটিযুক্ত হকিকত আছে; তাহারই প্রতিবিম্ব হইল সৃষ্টির এই অজুদ-আসলে যাহা আদমী ও ক্ষণস্থায়ী অজুদ বা অনস্তিত্ব। তেমনই সমষ্টিগত শুভ সমষ্টি বেলায়েতে ছোগরা স্তরে আসিয়া অজুদ নামে নামীয় হইল। তিনি আরও বলেন, "সৃষ্টির অজুদ ওয়াজেবুল অজুদের (সমষ্টিগত শুভ গুণ) ছায়া বা প্রতিবিম্ব যাহা আদমের আয়নার ওপর দিয়া প্রতিবিম্বিত হইয়াছে। ফকিরের নিকট কোন জিনিসের ছায়া অবিকল সেই জিনিস নয়; বরং সেই জিনিসের মেছাল। ইহা অপরের ভিতর প্রবেশ করে না।

বিজ্ঞাপন

সুতরাং ফকিরের নিকট সৃষ্টি ওয়াজেবের তথা আসল অজুদের যথাযথ বা আয়েন নহে এবং সৃষ্টিরও ওয়াজেবের ভিতর প্রবেশাধিকার নাই। কেননা সৃষ্টির হকিকত আদম বা ত্রুটিপূর্ণ অনস্তিত্বতা এবং ঐ ছায়া বা আসমা ও সিফাত বা আল্লাহতায়ালার নাম ও গুণসমূহ অজুদের মাধ্যম হইয়া এই আদমের মধ্যে প্রতিবিম্বিত হইয়াছে। উহা ঐ আসমা ও সিফাতের মত (যেমন মানুষের মধ্যে দেখাশুনার গুণ আছে); উহা যথাযথ বা একই রকম নহে। সুতরাং 'হামাউস্ত'-সবই তিনি বলা চলিবে না বরং 'হামা আজ উস্ত' বা সবই তিনি হইতে আগত-এই কথা বলা সঠিক বা জায়েজ হইবে।'

এমনিভাবে হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব 'অহ্দাতে অজুদ' মতবাদের কারণে বাতেনী শরীয়তে অথবা ইসলামী উচ্চ দর্শনে সৃষ্ট জটিলতার গিটমুক্ত করেন এবং দুই দলের মধ্যেকার দীর্ঘ স্থায়ী বিরোধের সমাধান দেন।

মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের দুনিয়ায় আগমনের উদ্দেশ্যঃ

হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব তাঁহার জন্মের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেন যে, তাঁহাকে মূল দুইটি উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য সৃষ্টি করা হইয়াছে। যাহার একটি হইল "অহদাতে অজুদ" মতবাদের কারণে দুই দলের (তৌহিদে অজুদীবাদ ও ফেকাহবিদ) মধ্যে সৃষ্ট ঝামেলা দূর করিয়া তাহাদেরকে সংশোধন করিবার জন্য। অপরটি সম্পর্কে তিনি বলেন, 'আমাকে দুই দরিয়ার মিলনওয়ালা বা সংযোজক হিসেবে সৃষ্টি করা হইয়াছে। এই দুই দরিয়া কি এবং কিভাবে তিনি তাহাদের মিলনকারী হইলেন? এখন সেদিকে নজর দেওয়া যাক।

উল্লিখিত দুই দরিয়া হইল-হকিকতে ইব্রাহিমী ও হকিকতে মুহাম্মদী। যাহা তাইনে আউয়ালের বৃত্তের পরিধি ও কেন্দ্র। প্রথমে তাইনে আউয়াল সম্পর্কে পূর্ববর্তী মাশায়েখবর্গ বা ওলী-আল্লাহদের ধারণা কি ছিল-সে সম্পর্কে কিছু বলা প্রয়োজন। তাইনে আউয়াল বা প্রথম তাইয়্যুন হইল আল্লাহতায়ালার জাতের অজুদ বা অস্তিত্ব গুণের অবতরণ-যাহা নিছক জাত ভিন্ন আল্লাহতায়ালার সমুদয় কামালাতকে বেষ্টন করিয়া আছে। ইহা নিছক জাত নয়। অথচ পূর্ববর্তী বহু ওলী-আল্লাহ তাইনে আউয়ালকে জাত মনে করিয়াছেন এবং উহাকে জাত বলিতে নির্দেশও দিয়াছেন এবং জাত হইতে অতিরিক্ত বলা নিষেধ করিয়াছেন। সূফীদের বৃহৎ একদল উহাকেই খোদা বলিয়া উপাসনা করিয়াছেন এবং উপাস্য ও উদ্দিষ্ট-উহা ব্যতীত অন্য কাহাকেও অন্বেষণ করেন নাই এবং উহাকেই বাহ্যিক কার্যকলাপের উৎপত্তিস্থল ও দৈনন্দিন কার্যের স্রষ্টা ধারণা করিয়াছেন।

হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবই প্রথম এই জটিলতার সমাধান দেন এবং সূক্ষ্ম শেরেক করা হইতে পরবর্তী সময়ের ওলী-আল্লাহদের হেফাজত করেন। তিনি বলেন, আল্লাহ হইতে তাহার অপরগণকে পৃথক করা 'একটি অতি উচ্চ সৌভাগ্য-যাহা আল্লাহতায়ালা এই পরবর্তী সম্বলহীন ফকির [হযরত মুজাদ্দেদ (রাঃ)]-এর জন্য গচ্ছিত রাখিয়াছিলেন। মাবুদ বা উপাস্য হইতে যাহা উপাস্য নহে, তাহা নিবারণ করা ও তাহার সমকক্ষতাকে অপসারণ করা পয়গম্বর (আঃ) গণের উচ্ছিষ্ট অবশিষ্ট ছিল-যাহা এই ভিখারী [হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ)]-এর জন্য আল্লাহপাক রাখিয়াছিলেন। (মকতুব নং ৯৩, তৃতীয় খন্ড)।

অতঃপর হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব তাইনে আওয়াল সম্পর্কে বলেন, ইহা হইল হযরত ইব্রাহিম (আঃ)-এর উৎপত্তিস্থল এবং খোল্লাতেরও উৎপত্তিস্থান এবং তিনি আরও বলেন যে, তাইনে আউয়াল বৃত্তের কেন্দ্র হইল হকিকতে মুহাম্মদী-যাহা হযরত হাবীবুল্লাহ (সাঃ) এর উৎপত্তিস্থল এবং তাহার মহব্বত বা প্রেমেরও উৎপত্তিস্থল।

পবিত্র জাতের পরিচয় প্রদান কালে তিনি বলেন, আল্লাহতায়ালার পবিত্র জাত স্বয়ং সুন্দর। তাহার কান্তি ও রূপ লাবণ্য নিজস্ব। আমাদের অনুভূতি ও আত্মিক বিকাশে যে রূপ-লাবণ্য অনুভূত হয় এবং যাহা আমাদের জ্ঞান ও চিন্তায় সংকুলান হয়-উহা তদ্রুপ নহে। ইহা সত্ত্বেও আল্লাহতায়ালার উচ্চ দরবারে এমন এক পবিত্র স্তর বা অবস্থা আছে যে, সে স্তরের উচ্চতা ও মহত্ব হেতু ঐ রূপ-লাবণ্য তথায় উপনীত হইতে সক্ষম হয় না এবং স্বীয় সৌন্দর্য ও রূপ দ্বারা সেই মর্তবাকে বিশেষিত করিতে পারে না। (মকতুব-৯৪, তৃতীয় খন্ড)

উক্ত মকতুবেই তিনি বলেন, তাইনে আউয়াল বা প্রথম অবতরণ-যাহা অজুদী বা অস্তিত্বজাত অবতরণ, তাহা আল্লাহপাকের উক্ত জাতি পূর্ণতা ও সৌন্দর্যের অবতরণ ও প্রথম প্রতিচ্ছায়া। ইহা ব্যতীত আল্লাহপাকের যে উচ্চ পবিত্র মর্তবার কথা বলা হইয়াছে, তাহার সৌন্দর্য ও পূর্ণতার অবকাশ নাই। সেখানকার কোন তাইয়্যুন নাই। যেহেতু উহা এত অধিক উচ্চ ও মহান যে, কোন অবতরণ তাহাতে সংঘটিত হয় না। কিন্তু উক্ত উচ্চ মর্তবায় এক গুপ্ত রহস্য ও ভাব বা অবস্থা আছে-যাহা তাইনে আউয়াল বৃত্তের কেন্দ্রে নিহিত; যেন নিদর্শন রহিত সত্ত্বার কিঞ্চিত নিদর্শন তথায় গুপ্ত রাখা হইয়াছে। তাইনে আউয়াল যেমন হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর বেলায়েত বা নৈকট্যের স্থান; তদ্রুপ উক্ত রহস্য-যাহা তাইনে আউয়ালের কেন্দ্রে নিহিত, তাহা হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সাঃ) এর বেলায়েতের উৎপত্তিস্থান।

উল্লিখিত জাতি সৌন্দর্য-তাইনে আউয়াল যাহার প্রতিবিম্ব, তাহা রূপ ও গৌরতার অনুরূপ-যাহা ইহজগতে তিলককপোল ইত্যাদি সৌন্দর্যের গন্ডিভুক্ত এবং উল্লিখিত রহস্য-যাহা উক্ত কেন্দ্রে নিহিত আছে, তাহা লাবন্যের অনুরূপ; তিলককপোল ইত্যাদির সৌন্দর্য হইতে ইহা অতি উচ্চ। তিনি আরও বলেন যে, উল্লিখিত বর্ণনা দ্বারা হযরত ইব্রাহিম (আঃ) ও হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সাঃ) এর বেলায়েত বা নৈকট্যের পার্থক্য উপলব্ধি বেলায়েতে ইব্রাহিমীর লক্ষ্য আল্লাহপাকের জাতের পূর্ণতাসমূহের প্রতি করা উচিত: যদিও উভয়ে আল্লাহতায়ালার নৈকট্য হইতে উৎপন্ন এবং বেলায়েতে মুহাম্মদীর লক্ষ্য আল্লাহতায়ালার নিছক জাতের প্রতি।

হকিকতে মুহাম্মদীতে যেমন লাবণ্য আছে, তেমনি প্রেম বা মহব্বত হকিকতে মুহাম্মদীতে বর্তমান। হকিকতে মুহাম্মদী বা কেন্দ্র হইতে আছে। প্রেমের দুইটি অবস্থা। প্রেমিকতু ও প্রেমাস্পদত্ব। উভয় অবস্থাই আরও উর্ধ্বে গমণ করিলে বা উন্নতি করিলে-এই কেন্দ্রই তখন বৃত্তের রূপ লাভ করে। এই দ্বিতীয় বৃত্তের কেন্দ্র হয় মাহবুবিয়ত বা প্রেমাস্পদত্ব এবং পরিধি হয় প্রেমিকত্ব-যাহা হযরত মুসা (আঃ) এর বেলায়েতের উৎপত্তিস্থল বা হকিকতে মুছবী; আর কেন্দ্র যাহা মাহবুবিয়ত তাহা হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর বেলায়েতের উৎপত্তিস্থল। সুতরাং দেখা গেল যে হকিকতে ইব্রাহিমী ও হকিকতে মুহাম্মদীর মধ্যে আরও একজন পয়গম্বরের তথা হযরত মুসা (আঃ) এর উৎপত্তিস্থল বর্তমান। হকিকতে ইব্রাহিমীর চেয়ে হকিকতে মুহাম্মদী দুই দায়েরা উচ্চে-যাহা জাতের অধিক নিকটবর্তী। তথাপিও রাসূলে পাক (সাঃ) কে আদেশ করা হইল হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর অনুসরণ করিবার জন্য। মূলতঃ হকিকতে ইব্রাহিমীর কামালাত অর্জন করিতে হইলে রাসূলে পাক (সাঃ) কে নিজ হকিকত হইতে দুই সিঁড়ি নীচে নামিতে হয়-যাহা স্বভাবের বিপরীত। এখন প্রশ্ন দাঁড়ায়ঃ তাহা হইলে কিভাবে রাসূলে পাক (সাঃ) হকিকতে ইব্রাহিমীর কামালাত বা পূর্ণতাসমূহ অর্জন করিলেন?

হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলেন, এই জন্য রাসূলে পাক (সাঃ) এর উম্মতের মধ্যে কোন এক ব্যক্তির মধ্যস্থতা প্রয়োজন, যিনি নবী করীম (সাঃ) এর অনুসরণের মাধ্যমে তাইনে আউয়ালের কেন্দ্র হকিকতে মুহাম্মদীর দায়েরাতে উপনীত হইয়া অন্য এক পথে উহার পরিধির সহিত সম্পর্ক স্থাপন করে। যাহাতে সেই উম্মত উক্ত পরিধির কামালাত অর্জন করিয়া তাহার তত্ত্বের সহিত সম্মিলিত হয়। হাদীস শরীফে আছে-যে ব্যক্তি কোন সুন্দর পথ আবিস্কার করে, সে উহার পারিতোষিক প্রাপ্ত হয় এবং অন্য যাহারা উক্তরূপে, ঐভাবে আমল করে তাহাদের পারিতোষিকও সে প্রাপ্ত হয়।” এই হাদীস অনুযায়ী সেই উম্মত ও রাসূলে পাক (সাঃ) তথায় উপনীত হওয়ার মাধ্যমে সেখানকার কামালাত প্রাপ্ত হন।

তাইনে আউয়ালের অর্থাৎ প্রথম বৃত্তের পরিধি সম্পর্কে বলা হইয়াছে-ইহা হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর বেলায়েতের উৎপত্তিস্থল। আর কেন্দ্র যাহা হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর বেলায়েতের উৎপত্তিস্থল। কেন্দ্র হইতে অগ্রে যে দ্বিতীয় বৃত্তের তৈরী হয় তাহার পরিধিকে বলা হইয়াছে হযরত মুসা (আঃ) এর বেলায়েতের উৎপত্তিস্থল আর কেন্দ্র যাহা প্রেমাস্পদত্ব তাহা বেলায়েতে মুহাম্মদী। এই দ্বিতীয় বৃত্তের কেন্দ্র যাহার প্রতি হকিকতে মুহাম্মদী নির্ভরশীল-তাহা রাসূল পাক (সাঃ) এর হাজার বৎসর পর বৃত্তের রূপ পাইল: যে বৃত্তের (তৃতীয় বৃত্তের) কেন্দ্র হইল হকিকতে আহমদী-যাহা নিছক প্রেমাস্পদত্বের উৎপত্তিস্থল এবং এই তৃতীয় বৃত্তের পরিধি হইল 'মাহবুবিয়াতে মোমতাজেজ বা মোহেব্বিয়াত-যেখানে প্রেমাস্পদত্বের সহিত প্রেমিকত্বের সংমিশ্রণ প্রকাশ পায়। এই তৃতীয় বৃত্তের পরিধিই হইল হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের বেলায়েতের উৎপত্তিস্থল বা হকিকতে মুজাদ্দেদ আলফেছানী।

হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবই হইলেন সেই উম্মত যিনি রাসূলে পাক (সাঃ) এর অনুসরণের মাধ্যমে হকিকতে ইব্রাহিমী ও হকিকতে মুসবীর কামালাত অর্জন করিয়া হকিকতে মুহাম্মদীতে মিলিত হন। ফলে রাসূলে পাকও (সাঃ) হকিকতে ইব্রাহিমীর কামালাত প্রাপ্ত হন। ইহা নির্ধারিত কথা যে, যে কোন কামালাত (পূর্ণতা) কোন উম্মত লাভ করে, তাহা উক্ত নবীর জন্য হাছিল হইয়া যায়। কাজেই সুযোগ্য উম্মত হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের কারণে রাসূলে পাক (সাঃ) এর হকিকতে ইব্রাহিমীর কামালাত অর্জিত হইল এবং হযরত ইব্রাহিম (আঃ) কে অনুসরণের যে আদেশ রাসূলে পাক (সাঃ) কে আল্লাহপাক দান করিয়াছিলেন তাহাও পূর্ণ হইল। ইহা ছাড়া 'আল্লাহুম্মা ছাল্লে আলা মোহাম্মাদিন কামা ছাল্লায়তা আলা ইব্রাহিমা' অর্থাৎ হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর অনুরূপ আমাদের পয়গম্বর (সাঃ) এর প্রতি দরূদ প্রেরণ কর। এই দোয়াটিও হাজার বছর পর কবুলিয়াত পাইল এবং কার্যে পরিণত হইল।

হকিকতে ইব্রাহিমীর কামালাত পূর্ণ হাছিল হওয়ার পর তাইনে আউয়ালের কেন্দ্রে যে রহস্যের কথা বলা হইয়াছে; সেই রহস্যের সহিত রাসূলে পাক (সাঃ) এর পরিপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপিত হইল। যে উম্মতের মাধ্যমে হাজার বছর পর রাসূলে পাক (সাঃ) তাইনে আউয়ালের পরিধির কামালাত অর্জন করিলেন; সেই উম্মতকে অর্থাৎ হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবকে পরবর্তী হাজার বছরের জন্য স্বীয় সমুদয় উম্মতের হেফাজত ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব অর্পণ করিয়া দুনিয়ায় ফিরাইয়া দিলেন এবং তিনি স্বয়ং অদৃশ্যের অদৃশ্য স্থানে, প্রেম সমুদ্রের গুপ্ত প্রদেশে মহান খোদাতায়ালার সহিত মিলিত হইলেন। (মকতুব ৯৪, তৃতীয় খন্ড)

হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) তাহার জন্মের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেন, (যাহা পূর্বেও উল্লেখ করা হইয়াছে) 'আল্লাহপাক আমাকে দুই সমুদ্রের সংযোজনকারী হিসেবে সৃষ্টি করিয়াছেন।' উপরোক্ত হকিকতে ইব্রাহিমী ও হকিকতে মুহাম্মদীর আলোচনায় যাহার প্রমাণ মিলে। মূলতঃ হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের কারণে রাসূলে পাক (সাঃ) হকিকতে ইব্রাহিমীর কামালাত অর্জন করিলেন যাহা সহস্র বছর পর সম্ভব হইল। এই কাজ মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের জন্যই নির্ধারিত ছিল। তিনি তাই আরও বলেন, 'আমার জন্মের উদ্দেশ্য এই যে আমি যেন বিশ্বাস করি যে, বেলায়েতে মুহাম্মদী যেন বেলায়েতে ইব্রাহিমীর রংগে রঞ্জিত হইয়া যায় এবং বেলায়েতে মুহম্মদীর লাবণ্য যেন বেলায়েতে ইব্রাহিমীর উজ্জ্বল সৌন্দর্য্যের সহিত মিশিয়া যায়। (মকতুব নং ৬, দ্বিতীয় খন্ড)

মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব ইসলামী উচ্চ দর্শনের ল্যাবরেটরীঃ

উল্লিখিত আলোচনা হইতে বুঝা যায় যে, রাসূলে পাক (সাঃ) এর পরে হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের মত এত বড় ইসলামী দার্শনিক আর পৃথিবীতে আসেন নাই। মুজাদ্দেদ ছাহেব মূলতঃ ইসলামী উচ্চ দর্শনের ল্যাবরেটরী বা গবেষণাগার। তাহার মারেফাত কারখানার নিকট পূর্ববর্তী ওলীদের মারেফাত ধর্তব্যই নয়। ইহার মূল কারণ এই যে, তাঁহারা মারেফাতের কারখানাতে প্রবেশই করেন নাই। কারখানার বাহিরেই ঘোরাফেরা করিয়াছেন মাত্র। তাই তাহাদের বর্ণিত মারেফাতের মধ্যে বহু ভুল-ভ্রান্তি মিশ্রিত থাকিয়া যায়। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব সমুদয় ভুল-ভ্রান্তি সংশোধন করিয়া খোদাতালাশীদের জন্য নিখুঁত মারেফাত উপস্থাপন করেন।

ছায়েরে আফাক ও ছায়েরে আনফাস সম্পর্কে পূর্ববর্তী ওলী-আল্লাহ সকল বলিতেন যে, ছায়েরে আফাক হইল ছায়েরে এল্লাল্লাহ (আল্লাহর দিকে ভ্রমণ) এবং ফানাকে এই ছায়েরের অন্তর্ভুক্ত করিতেন এবং ছায়েরে আনফুসীকে ছায়েরে ফিল্লাহ (আল্লাহর মধ্যে ভ্রমণ) বলিতেন এবং বাকাবিল্লাহকেও এখানে প্রমাণ করিয়াছেন।

হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলেন যে, ছায়েরে আফাক ও ছায়েরে আনফাস-উভয়ই ছায়েরে এলাল্লাহর মধ্যে পরিগণিত। আল্লাহকে আফাক ও আনফাসের মধ্যে পাওয়া যাইবে না। তিনি দূরে-বহুদূরে। তিনি আরও বলেন, আল্লাহতায়ালা সমস্ত নাম বা সিফাত এবং তামাম শান, বিশ্বাস, সূক্ষ্ম, গুপ্ত, সমস্ত প্রকাশের ও জ্যোতির দর্শন ও অনুধাবন, স্কুল ও অনুধাবনীয় সমস্ত ধ্যান-ধারণা হইতে দূরে-বহুদূরে, সীমার ওদিকে, বরং অসীমেরও ওধারে। (মকতুব নং-১, ২য় খন্ড)

পূর্ববর্তী ওলী-আল্লাহগণের বেলায়েতে ছোগরাতে মারেফাত শেষ করিবার কারণঃ

পূর্ববর্তী ওলী-আল্লাহ সকল বেলায়েতে ছোগরাতেই কেন মারেফাত শেষ করিয়াছেন? জবাবে বলা যায়, বেলায়েতে ছোগরাই হইল ওলী-আল্লাহদের বেলায়েত। ইহার উপরে আছে নবীদের বেলায়েত ও ফেরেশতাদের বেলায়েত। ওলী-আল্লাহদের বেলায়েত-বেলায়েতে ছোগরা হওয়ায় তাহারা চেষ্টা-সাধনা বা তপস্যা দ্বারা ছোগরা বেলায়েত পর্যন্তই পৌঁছাইতে পারেন। নিজ চেষ্টা-সাধনা দ্বারা ইহার উপরে যাওয়ার সাধ্য কাহারো নাই। তবে মহান খোদাতায়ালা দয়া করিয়া নিজ হইতে যাহাদিগকে টানিয়া মূল মারেফাত কারখানার ভিতরে নেন এবং বেলায়েতে কোবরা, বেলায়েতে উলিয়া বা কামালাতে নবুয়তের সম্পদে ভূষিত করেন, তাহাদের কথা স্বতন্ত্র।

যে কয়েকজন ওলী-আল্লাহকে মহান খোদাতায়ালা বেলায়েতে ছোগরা হইতে আপন প্রেমের হেরেমে লইয়া তথাকার মারেফাত দান করিয়াছেন-তাহাদের সংখ্যা খুবই কম। সেই অল্প সংখ্যক ওলী-আল্লাহদের মধ্যে যাহাকে সর্বাপেক্ষা নৈকট্য, সান্নিধ্য বা মারেফাত দান করিয়াছেন তিনিই হইলেন হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব। এই জন্যে তাহার মারেফাতের তুলনায় অন্যান্যদের মারেফাত সামান্য বলিয়া পরিগণিত। তথাপিও বেলায়েতে ছোগরাতে যাহারা মারেফাত চর্চা শেষ করেন বা উরুজ ও ছায়ের শেষ করেন-তাহাদের জ্ঞানেরও সীমা-পরিসীমা নাই। তাহারা আল্লাহ ভিন্ন সবকিছুকে ভুলিয়া বা ত্যাগ করিয়া এমন এক স্তরে উপনীত হন যেখানে তাহাদের কালব ও রূহ এক হইয়া নূরের এক মহাসমুদ্রের ভিতরে তাহারা বিচরণ করিতে থাকেন-যে সমুদ্রের কোন কুল-কিনারা নাই। এখানে আছে সিফাতে এজাফিয়া ও সিফাতে হাকীকীর নূর। আছে নূরে মুহাম্মদী ও আলমে আরওয়াহর নূর। আছে আল্লাহর অজুদ গুণের নূর। ইহা প্রতিবিম্বরূপে বেলায়েতে ছোগরাতে বর্তমান। শুধু তফাৎ হইল-মারেফাত ছাড়াও মূল মারেফাত কারখানার মধ্যে যাহাকিছু আছে-তাহার সবকিছুই কারখানাতে তাহা আছে আসল হিসেবে: আর বেলায়েতে ছোগরাতে তাহা আছে প্রতিবিম্ব হিসেবে।

বেলায়েতে ছোগড়াস্থিত ওলী-আল্লাহগণ শরীয়তের খেলাফ কথা কেন বলেন?

মূলতঃ বেলায়েতে ছোগরায় আল্লাহপাকের নাম ও গুণাবলীর প্রতিবিম্বিত নূরে ছালেকের দোষণীয় সমস্ত স্বভাব বিদ্ররীত হয়; ছালেকের নাফস পরাজিত হয়; আদামাত পর্যদুস্ত হয়; ফলে ছালেকের মধ্যে আল্লাহতায়ালার নাম ও গুণাবলীর প্রতিবিম্ব ব্যতীত আর কিছুই পরিলক্ষিত হয় না। ছালেক আদামাতের তমদোষমুক্ত কোটি কোটি নূরের বাল্ব প্রজ্জ্বলিত দেহ নিরপেক্ষ এক সত্ত্বা লাভ করেন; যাহা কোটি কোটি মুখে সর্বদাই আল্লাহপাকের জেকেরে রত থাকে। এই দেহ-নিরপেক্ষ সত্ত্বাকেও বলা হয় অজুদ। এই স্তরে ছালেক বা ওলী-আল্লাহ সকল আপন অজুদের সহিত আল্লাহতায়ালার অজুদ (যাহা যাবতীয় শুভের উৎপত্তিস্থল) এর মিল বা ঐক্য খুঁজিয়া পায়। তাই আবেগবশতঃ বা নেশাবশতঃ, অর্জন সাপেক্ষ জ্ঞান হারাইয়া শরীয়তের প্রতিকূল কিছু উক্তি করিয়া ফেলেন। খোদা প্রাপ্তির পথ বেলায়েতে ছোগরাতে ইহা হওয়া খুবই স্বাভাবিক। তাই তরিকতের দৃষ্টিতে ইহা অপরাধ নয়; যদিও শরীয়তের দৃষ্টিতে তাহারা অপরাধী। তরিকতের দৃষ্টিতে তাহারা অপরাধী নয়-এই কারণে যে, তাহারা আল্লাহ ভিন্ন সবকিছুকে ভুলিয়া নূরময় জগতে উপনীত হইয়া সমস্ত দোষণীয় স্বভাবকে ঝাড়িয়া ফেলিয়া আল্লাহর গুণে গুণান্বিত হন। আপন অজুদের কোটি কোটি মুখে সদা সর্বদা তাহারা আল্লাহ নামের জেকেরে রত থাকেন। কাজেই, তাহাদের সমান আর কে?

তবে হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবকে আল্লাহপাক নিজ হইতে আকর্ষণ করিয়া মারেফাতের আরও এমন কিছু নেয়ামত দান করিয়াছেন-যাহা অতুলনীয় ও অকল্পনীয়। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের পরে আমার পীর কেবলাজানকে মহান খোদাতায়ালা দয়া করিয়া মারেফাতের মূল কারখানার সমুদয় অংশ ঘুরাইয়া দেখান। এই কারণেই আধ্যাত্ম জগতে মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের পরে আমার পীরের মত উচ্চ মর্যাদা আর কেহই পান নাই।'

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD