Logo

মুরাকাবার পরিচয় এবং তরিকতের জ্ঞান অর্জনে মুরাকাবার গুরুত্ব

profile picture
জনবাণী ডেস্ক
২১ জুন, ২০২৬, ২০:২৫
মুরাকাবার পরিচয় এবং তরিকতের জ্ঞান অর্জনে মুরাকাবার গুরুত্ব
ছবি: জনবাণী।

খোদাপ্রাপ্তি জ্ঞানের আলোকে শাহ্সূফি হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত তরিকতের পাঁচ রোকন بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ মুরাকাবার পরিচয় এবং তরিকতের জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে মুরাকাবার গুরুত্ব সম্পর্কীয় আলোচনাঃ

বিজ্ঞাপন

তরিকতের পাঁচটি রোকনের মধ্যে প্রথম দুই রোকন-জেকের ও রাবেতা সম্পর্কে প্রথম অধ্যায়ে আলোচনা করিয়াছি। এই পরিচ্ছদে মুরাকাবা সম্পর্কে কিছু বলিতেছি। মুরাকাবা তরিকতের অত্যাবশ্যকীয় এক রোকন। মুরাকাবা অর্থ ধ্যান করা; চিন্তা, গবেষণা বা তাফাক্কুর করা। আল্লাহ পাক পবিত্র কুরআনে বলেন,

إِنَّ فِي خَلْقِ السَّمَوتِ وَالْأَرْضِ وَاخْتِلافِ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ لايت لأُولِي الْأَلْبَابِ الَّذِينَ يَذْكُرُونَ اللَّهَ قِيمًا وَقُعُودًا وَ عَلَى جُنُوبِهِمْ وَ يَتَفَكَّرُونَ فِي خَلْقِ السَّمَوتِ وَ الأَرْضِ .

অর্থাৎ-“নিশ্চয় আসমান জমিনের সৃষ্টির মধ্যে এবং দিবা-রাত্রি পরিবর্তনের মধ্যে তত্ত্বজ্ঞানী লোকদের জন্য আল্লাহতায়ালার নিদর্শন সমূহ বিদ্যমান। ঐ সমস্ত লোক যাহারা দন্ডায়মান, উপবিষ্ট বা শায়িতাবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করে এবং আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টির বিষয়ে গভীর মনোনিবেশ সহকারে ধ্যান বা তাফাকুর বা মুরাকাবা করে।" (সূরা আলে ইমরান, আয়াত নং ১৯০-১৯১)। আল্লাহপাক আরও বলেন,

বিজ্ঞাপন

وَ فِي أَنْفُسِكُمْ طَ أَفَلَا تُبْصِرُونَ

অর্থাৎ-"আমার নিদর্শনতো তোমাদের মধ্যেই আছে, তোমরা দেখ না কেন?" (সূরা জারিয়াত, ২১ নং আয়াত)। এই আয়াতের মর্মার্থ হইল, আমিতো তোমাদের মধ্যেই আছি, আমাকে দেখ না কেন? আল্লাহপাক আরও বলেন,

وَ نَحْنُ أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنْ حَبْلِ الْوَرِيدِ

বিজ্ঞাপন

অর্থাৎ-"আমি তাহার (মানুষের) কণ্ঠশিরা হইতেও নিকটবর্তী অর্থাৎ প্রাণাপেক্ষা নিকটবর্তী।" (সূরা ক্বাফ, ১৬ নং আয়াত)। আল্লাহপাক আরও বলেন,

فَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِي عَنِّي فَإِنِّي قَرِيبٍ

অর্থাৎ-["হে মুহাম্মদ) (সাঃ)! যখন আমার বান্দা আমার সম্বন্ধে আপনার নিকট প্রশ্ন করে, তখন (তাদেরকে বলিয়া দিন) নিশ্চয় আমি তাহাদের অতি নিকটে।" (সূরা বাকারা, আয়াত নং ১৮৬)

বিজ্ঞাপন

যে মহান খোদাতায়ালা মানুষের অতি নিকটে, কন্ঠশিরা হইতেও নিকটে, এমন কি মানুষের ভিতরেই; সেই খোদাতায়ালাকে চিনিবার বা দেখিবার বা তাহার সৃষ্টি কৌশল সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনের জন্য যে ধ্যান বা তাফাক্কুর করা হয়; তাহাই মুরাকাবা। মহান খোদাতায়ালাকে এই দুনিয়া হইতে না চিনিলে পরকালে চিনিতে পারিবে না। এই পৃথিবী হইতে খোদাতায়ালাকে না দেখিলে পরকালে তাঁহাকে দেখিতে পাইবে না। আল্লাহপাক পবিত্র কুরআনে বলেন,

مَنْ كَانَ فِي هَذِهِ أَعْمَى فَهُوَ فِي الْآخِرَةِ أَعْمَى

অর্থাৎ-"যে ইহকালে অন্ধ থাকিবে, পরকালেও সে অন্ধ হইয়া উঠিবে।" (সূরা বনি-ইস্রাইল, আয়াত ৭২)

বিজ্ঞাপন

কাজেই এই নশ্বর দুনিয়া হইতেই খোদাতায়ালাকে চিনিতে হইবে। আমাদের দেহের ভিতরেই খোদাতায়ালার নিদর্শন। কিন্তু কোথায়?

রাসূলে পাক (সাঃ) বলেন,

বিজ্ঞাপন

قُلُوْبُ الْمُؤْمِنِينَ عَرْشِ اللَّهِ

অর্থাৎ-"মোমিনের দেল আল্লাহর আরশ।" হযরত মাওলানা রূমী (রঃ) বলেন,

"মান্ না-গুঞ্জাম দর জমিনে আছেমা

বিজ্ঞাপন

লেকি গুঞ্জাম দর কুলুবে মো'মিনা।"

অর্থাৎ-"আসমান-জমিন কোথাও আল্লাহর গুঞ্জায়েশ হয় না, তাহার গুঞ্জায়েশ হয় একমাত্র মোমিন বান্দার দেলে।" মোমেন বান্দা ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তফাৎ বিদ্যমান। সাধারণ মানুষের দেলে আল্লাহ অবস্থান করেন না। কারণ তাহাদের দেল অন্যায় ও পাপাচারের দুর্গন্ধময় ময়লায় পূর্ণ থাকে; তাহাদের স্বচ্ছ দেল পাপ ও অন্যায়ের কারণে অন্ধকারাচ্ছন্ন থাকে। কিন্তু মোমেনের দেল থাকে পরিচ্ছন্ন, খোদাতায়ালার নূরে উদ্ভাসিত। তাই মোমেনের দেলে আল্লাহর অবস্থান।

আল্লাহপাক বলেন, "তোমাদের দেলে যে দুর্গন্ধময় আবর্জনা আছে, প্রথমে তাহা দূর কর। তৎপর তথায় প্রেমের বিছানা পাত। তাহা হইলে তোমাদের কালবের প্রেমের বিছানায় আমি বসিব। কবির ভাষায়ঃ-

বিজ্ঞাপন

যার তার কাছে আসে না সে

বুক ভরা চায় ভালবাসা,

বুক ভরা চায় ভালবাসা, আর প্রাণভরা চায় প্রেমের নেশা।

বিজ্ঞাপন

যার তার কাছে আসে না সে,

বুক ভরা চায় ভালবাসা।

উপরোক্ত আলোচনা থেকে বুঝা যায় যে, খোদাতায়ালাকে চিনিবার, জানিবার বা দেখিবার উদ্দেশ্যে কালব বা দেল দরিয়ায় অনুসন্ধান করা প্রয়োজন; কারণ কালব বা দেলেই আল্লাহর গুঞ্জায়েশ।

বিজ্ঞাপন

কাজেই নিবিষ্ট চিত্তে, গভীর মনোনিবেশসহ, একাগ্রতার সহিত চারজানু একত্র করিয়া বসিয়া, চক্ষুদ্বয়কে বন্ধ করিয়া, খেয়ালকে সর্বদিক হইতে ফিরাইয়া, এককালীন দেল দরিয়ায় ডুবাইয়া মহান খোদাতায়ালার অনুসন্ধান বা তালাশ করাই মুরাকাবা। কিন্তু খোদাতায়ালা আকার ও প্রকার বিহীন, অবর্ণনীয় ও অবোধগম্য। খোদাতায়ালার মেছাল নাই, উদাহরণ নাই। মেছালবিহীন খোদাতায়ালাকে অনুসন্ধান করা সাধারণের পক্ষে কঠিন। এই জন্য মুরাকাবায় পীরের ছুরাত বা আকৃতি বা রাবেতাকে সম্মুখে রাখিয়া খোদাতায়ালার অনুসন্ধান করিতে হয়।

যদিও আল্লাহ মানুষের ভিতরে, মানুষের প্রাণাপেক্ষাও নিকটবর্তী: তথাপিও আল্লাহ প্রাপ্তির সাধনা, খোদাপ্রাপ্তির রেয়াজত সর্বাপেক্ষা কঠিন: এই সাধনায় সময়ও লাগে প্রচুর। আমার পীর কেবলা, হযরত খাজাবাবা এনায়েতপুরী (কঃ) ছাহেব বলেন, "হাতে কলমে শিক্ষা দিলেও খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞান হাছিল করিতে বা আল্লাহতায়ালার সান্নিধ্য বা রেজামন্দী লাভ করিতে দীর্ঘ ২৪ বছর বা ৩৬ বছরের প্রয়োজন।" কিন্তু কেন? কারণ রাসূলে পাক (সাঃ) বলেন, "বান্দা এবং আল্লাহর মধ্যে ৭০,০০০ আলো-অন্ধকারের পর্দা বিদ্যমান।" এই সত্তর হাজার পর্দাকে অপসারিত না করা পর্যন্ত খোদাতায়ালার নৈকট্য অর্জন অসম্ভব। আর এই পর্দা সমূহ অপসারণ করার জন্য দীর্ঘ সময় ধরিয়া তপস্যা বা সাধনার প্রয়োজন।

আল্লাহপাক মানুষের নিকটে হইলেও লক্ষযোজন দূরে। হাদীসে কুদসীতে আল্লাহপাক বলেন, তোমরা তিনটি জগত তথা জড় জগত, নূরের জগত ও সিফাতের জগত পার হইয়া আমার আকরাবিয়াতে আস। সেখানে হইবে তোমাদের সাথে আমার প্রেমের খেলা।"

এই নশ্বর দুনিয়া হইতে মহান খোদাতায়ালার জাতপাকের দূরত্ব এত অধিক যে তাহা কল্পনায়ও আনয়ন সম্ভব নয়। আলোর গতিসম কোন দ্রুতযানে চড়িয়া কেহ যদি এই বিশাল পথ অতিক্রমের চেষ্টা করে, তাহা হইলে অযুত-কোটি বছরেও সে পথ অতিক্রম করা তাহার পক্ষে সম্ভব নয়। এই দীর্ঘ পথ অতিক্রমের জন্য যে পদ্ধতি তরিকতে নির্ধারিত আছে; তাহাই মুরাকাবা বা ধ্যান। দুনিয়া এবং দুনিয়াস্থিত সবকিছুকে ভুলিয়া দেল দরিয়ায় ডুব দিলে সেই মহা সড়কের প্রধান ফটক উন্মুক্ত সেই সড়কপথে ভিতরে অদৃশ্য জগতের অপূর্ব লীলাখেলা ভাসিয়া উঠে। বিচিত্র ও বিভিন্ন বর্ণের নূরে ছালেকের মোহাচ্ছন্ন হয়। সেই নূরময় ও আলোকিত পথ ধরিয়া খোদাতায়ালাভিমুখে ছালেকের যাত্রা চলিতে থাকে। যতক্ষণ না খোদাতায়ালার সান্নিধ্য পায়, ততক্ষণ আর তাহার যাত্রা থামে না, হৃদয়ের বিচ্ছেদ যন্ত্রনার আগুনও নির্বাপিত হয় না। বিচিত্র বর্ণের মনোমুগ্ধকর নূর ও অপূর্ব সব নেয়ামতে ভরপুর এই মহাসড়ক-যাহাকে তরিকতের পীরানে পীরগণ মোশাহেদা নামে উল্লেখ করিয়াছে। আশেক কবি বলেন-

"মুরাকাবার ঘোড়ায় চড়ে,

মোশাহেদার সড়কে।

৭০,০০০ পর্দার নীচে,

প্রেমের খেলা খেলতেছে;

আমার দেখতে সাধ করে।"

মূলতঃ ৭০,০০০ পর্দার অন্তরালে আল্লাহপাকের প্রেমের হেরেমে মাশুকের সহিত আশেকের যে সান্নিধ্য, যে প্রেমময় মিলন; উপরোক্ত কবিতাংশে তাহারই ইশারা বিদ্যমান। কাজেই মুরাকাবার দ্রুতযানে, মোশাহেদার বিচিত্র নূরের মনোমুগ্ধকর সড়কপথে চলিয়া জড় জগত, নূরের জগত, সিফাতে এজাফিয়া ও সিফাতে হাকীকীর জগত, তথা আসমা, সিফাত, শান, শয়ুনাত ও এতেবারের সমুদয় মাকাম পার হইয়া খোদাতায়ালার জাতপাকের সান্নিধ্য লাভ করিতে হয়।

কাজেই খোদাতায়ালার সান্নিধ্য বা নৈকট্য লাভের জন্য মুরাকাবা বা ধ্যান ব্যতীত গত্যন্তর নাই। হাদীস শরীফেও ইহার প্রমাণ মিলে। হাদীসে জিব্রাইলে, "এহসান কি?” এই প্রশ্নের উত্তরে রাসূলে পাক (সাঃ) বলিয়াছিলেন, "আল্লাহর ইবাদত এমনভাবে করিতে হইবে যেন, ইবাদতকারী আল্লাহকে দেখিতে পায় অর্থাৎ আল্লাহকে দেখিয়া তাহার ইবাদত করা এবং আবেদ যদি তাঁহাকে দেখিতে না পায়, তবে সে যেন ভাবে যে আল্লাহ তাহাকে দেখিতেছেন।" এই হাদীসের ভাষ্যে মুরাকাবার পরিপূর্ণ ইশারা বিদ্যমান। এহসান শব্দের আভিধানিক অর্থ- বিশুদ্ধ ও সুচারুরূপে কাজ সম্পন্ন করা। আর ব্যবহারিক অর্থ- একান্ত এখাস, বিনয়, আন্তরিকতা, মুরাকাবা ও মোশাহেদার মাধ্যমে খোদাতায়ালার সান্নিধ্য বা নৈকট্য অর্জন করা।

হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) নবুয়ত প্রাপ্তির পূর্বে প্রায় দীর্ঘ ১৫ বৎসর হেরা পর্বতের নির্জন গুহায় আল্লাহতায়ালার অসীম কুদরত, মহিমা, গরিমা তথা স্রষ্টারহস্য এবং সৃষ্টিরহস্য সংক্রান্ত জ্ঞান অর্জনের জন্যই ধ্যান বা তাফাকুর বা মুরাকাবা করিয়াছিলেন।

হযরত আদম (আঃ) থেকে হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) পর্যন্ত সকল নবী ও রাসূল ধ্যান বা মুরাকাবা করিয়াছেন। সকল ওলীয়ে কামেল ধ্যান বা মুরাকাবা করেন। মুরাকাবা সম্পর্কে তাবেয়ী হযরত আমীর ইবনে আরদে কায়ছ (রঃ) বলেন, "আমরা সাহাবায়ে কেরামের অনেকের নিকট হইতেই শুনিয়াছি, ঈমানের নূর হইল মুরাকাবা।"

মুরাকাবার জন্য ধীর স্থির হইয়া বসা শর্ত। একদিন হযরত শিবলী (রঃ) হযরত সাওরী (রঃ) ছাহেবের নিকট গমন করিয়া তাঁহাকে দেখিলো পাইলেন, তিনি এমন তন্ময় ও ধীরস্থির ভাবে মুরাকাবায় বসিয়া আছেন যে, তাঁহার শরীরের একটি লোমও নড়িতেছে না। হযরত শিবলী (রঃ) তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, "এমন স্থিরতা ও নিস্পন্দের সহিত মুরাকাবা করা আপনি কাহার নিকট হইতে শিখিয়াছেন?" তিনি উত্তর করিলেন, "বিড়াল হইতে। কেননা আমি বিড়ালকে ইঁদুরের অন্বেষণে ইঁদুরের গর্তের মুখে ইহা অপেক্ষা অধিক নিশ্চল ভাবে বসিয়া থাকিতে দেখিয়াছি।" কাজেই ধীর স্থিরভাবে, নিবিষ্ট চিত্তে, চক্ষুদ্বয়কে বন্ধ করিয়া পীরের রাবেতা লইয়া খেয়ালকে দেল দরিয়ায় ডুবাইয়া মহান খোদাতায়ালার নূর আগমনের প্রতিক্ষা করাই মুরাকাবা। এই ভাবে মুরাকাবা বা ধ্যান করিতে করিতে দেল পরিচ্ছন্ন হয়, দেলে আল্লাহ আল্লাহ জেকের জারী হয়; দেল ১৪ই রাত্রির পূর্ণিমার চাঁদের মত উজ্জল ও আলোকিত হয়। দেলে আল্লাহপাকের আসমা ও সিফাতের নূর প্রতিফলিত হয়। এই নূরের সাহায্যে ছালেক বা মুরীদ আল্লাহর সমগ্র সৃষ্টি জগত দেখিতে পায়। রাসূলে পাক (সাঃ) বলেন, মোমেন আল্লাহর নূর দ্বারা দেখে।" আল্লাহপাক পবিত্র কুরআনে বলেন,

مَا كَذَبَ الْفُؤَادُ مَا رَأَى .

অর্থাৎ-“যাহা তিনি দেখিয়াছেন, তাহার অন্তকরণ তাহা অস্বীকার করে নাই।" (সূরা নযম, আয়াত নং ১১)।

লতিফাসমূহের মুরাকাবাঃ

লতিফা কালবের মুরাকাবায় জাত আহাদিয়াতের ফয়েজান বা নূর খেয়াল করিতে হয়। জাত আহাদিয়াতের ফয়েজান পতনের স্থান লতিফায়ে কালব। এই মাকামের মুরাকাবায় খেয়াল করিতে হয় যে, "জাত আহাদিয়াতের ফয়েজ রাসূলে পাক (সাঃ) এর পাক দেল হইয়া সমস্ত পীরানে পীরগণের দেলের অছিলায় আমার হযরত দয়াল পীরের পাক দেল হইয়া আমার দেলে আসিতেছে, দেল ভরিতেছে।" এইভাবে খেয়াল করিতে করিতে দেলে নূরের পতন এত অধিক হয় যে, যে দিকেই তাকানো যায়, সেই দিকেই সরিষা ফুলের ন্যায় হরিদ্রা বর্ণের নূর ভিন্ন আর কিছুই দৃষ্ট হয় না। নিম্নে তাহাতাছ ছারা হইতে ঊর্ধ্বদিকে আরশ পর্যন্ত সমুদয় স্থান ও বস্তু উক্ত নূরে প্লাবিত দেখা যায়। তখন রূহ এই নূরে ভাসমান হইয়া ঊর্ধ্বদিকে উরুজ ও ছায়ের করিতে শুরু করে। লতিফা কালবের মত অন্যান্য লতিফা তথা লতিফায়ে রূহ, লতিফায়ে ছের, লতিফায়ে খফি ও লতিফায়ে আখফার মাকামের মুরাকাবা করিতে হয়। পৃথক পৃথক লতিফার মুরাকাবায় ভিন্ন ভিন্ন বর্ণের নূর দেখা যায়। লতিফায়ে রূহের নূরের বর্ণ সোনালী বা লাল। লতিফায়ে ছেরের নূরের বর্ণ সাদা-অতি তেজস্কর। লতিফায়ে খফির নূরের বর্ণ আকিক পাথরের মত কাল, তবে দৃষ্টিরোধক নয়। লতিফায়ে আখফার নূরের বর্ণ সবুজ বর্ণের। লতিফায়ে নাফসের নূর বে-রংগী।

  • মুরাকাবায় কয়েকটি দিকে বিশেষ লক্ষ্য রাখিতে হয়। যথাঃ

  • যে স্থান হইতে নূর নির্গত হয় সেদিকে খেয়াল রাখা।

  • যে স্থানে নূর পতন হয় সেখানে খেয়াল রাখা এবং

  • নূরের বর্ণের প্রতি খেয়াল রাখা।

  • বিভিন্ন লতিফার জাগ্রত করণ ও নূর আগমন পীরে কমেলের দয়া ভিন্ন সম্ভব হয় না। পীরে কামেলের তাওয়াজ্জুয়ে এত্তেহাদীর ফলেই মুরীদের সমস্ত লতিফা তথা দেহের তেত্রিশ কোটি লতিফাই জাগ্রত হয় এবং খোদাতায়ালার নূরের সহিত এক অপূর্ব সংযোগ সৃষ্টি হয়-যাহা মুরীদ মুরাকাবায় অবলোকন করিয়া এক অনাবিল তৃপ্তি বা শান্তি পায়। মুরীদের রূহ পীরের সহযোগিতায় ঊর্ধ্বদিকে উরুজ করিতে থাকে। এক পর্যায়ে মুরীদ যে দিকেই তাকায়, সে দিকেই তাহার পীরকে দেখিতে পায়। তাহার ফানা-ফিশ-শেখ হাছিল হয়; পীরের রূহকেই সে নিজ রূহ মনে করে এবং নিজ রূহকে সম্পূর্ণ ভুলিয়া যায়। ইহা দায়েরায়ে এমকানের অবস্থা বা হাল। রূহের উৎপত্তিস্থল সিফাতে এরাদত। রূহ তাহার উৎপত্তিস্থলে উত্থিত হইয়া এরাদত সিফাতে ফানা হয়।

    এই অবস্থায় জাতে আহাদিয়াত হইতে ফয়েজ লইতে হইলে এই খেয়ালে মুরাকাবা করিতে হয় যে, "আহাদিয়াতের ফয়েজ ঐ পবিত্র জাত হইতে নবী করীম (সাঃ) এর উপর পড়িতেছে এবং তথা হইতে রূপে মুরাকাবা করিতে করিতে এত নূরাধিক্য হয় যে, ছালেক একমাত্র আমার রূহে, রূহ হইয়া নাফসে ও অন্যান্য লতিফায় পড়িতেছে। এই নবী করীম (সাঃ) এর রূহ ভিন্ন নিম্নস্থিত আপনার বলিয়া জানা পীরের রূহকেও ভুলিয়া যায়। তৎপর দ্বিতীয় দায়েরা বেলায়েতে ছোগরার দিকে ছালেক অগ্রসর হয়।

    ছায়ের (ভ্রমণ) ও ছুলুক (আত্মিক ভ্রমন দ্বারা মাকামসমূহের অবস্থা, বিস্তৃতি এবং অবস্থান পর্যবেক্ষণ করা) রত অবস্থায় বিভিন্ন দায়েরার মুরাকাবাঃ

    খোদাপ্রাপ্তির পথে মোশাহেদার যে মহাসড়কের কথা উল্লেখ করা হইয়াছে, নকশবন্দীয়া মুজাদ্দেদীয়া তরিকার সাধকগণ সেই পথ বা সড়কের অবস্থা ও হাল সম্যকভাবে জ্ঞাত হওয়ার জন্য ২৩/২৪ টি দায়েরা নির্ধারণ করিয়াছেন, যে দায়েরা সমূহ অতিক্রমের উপর নির্ভর করে ৭০,০০০ পর্দার অপসারণ, সিফাতে হাকীকীর আটটি বিশেষ পর্দা অর্থাৎ হায়াত, এলেম, কুদরত, এরাদত, সামাওয়াত, বাছারত, কালাম ও তাকবিনের দৃশ্যত অপসারণ এবং খোদাতায়ালার সান্নিধ্য বা নৈকট্য অর্জন। দায়েরা সমূহ হইলঃ-

    দায়েরায়ে এমকান, বেলায়েতে ছোগরা, বেলায়েতে কোবরা-যাহার সাড়ে তিনটি দায়েরা, যথাঃ আকরাবিয়াত, মহব্বতে আউয়াল, মহব্বত ছানী ও কাওছ; ছায়েরে এস্মোজ্জাহের, ছায়েরে এস্মোল বাতেন, বেলায়েতে উলিয়া, মুরাকাবায়ে শরহে ছদর, কামালাতে নবুয়ত, কামালাতে রেছালত, কামালাতে উলুল আজম, তৎপর হকিকতের পথে হকিকতে কুরআন, হকিকতে কাবা, হকিকতে ছালাত ও মাবুদিয়াতে ছেরফা এবং মহব্বতের পথে হকিকতে ইব্রাহিমী, হকিকতে মুছবী, হকিকতে মুহাম্মদী, হকিকতে আহমদী ও হোব্বে সেরফা।

    দায়েরায়ে এমকানের পর আসে বেলায়েতে ছোগরাঃ-

    এই দায়েরাকে আসমা ও সিফাতের প্রতিবিম্বের দায়েরাও বলা হয়। ইহাকে দায়েরায়ে জেলালও বলা হয়। দায়েরায়ে এমকান হইতে শুরু করিয়া আকরাবিয়াতের পূর্ব পর্যন্ত যে বিশাল নূরময় জগত-তাহাই বেলায়েতে ছোগরা নামে পরিচিত। এই দায়েরাতে সিফাতে হাকীকী ও সিফাতে এজাফিয়ার নূর একত্রিত হইয়া নূরের এমনই এক বিশাল সমুদ্র তৈরী হয়, যাহার কোন কুল-কিনারা নাই। এই দায়েরাতে মুরীদের ফানা-ফির-রাসূলের মোকাম সিদ্ধ হয়। অর্থাৎ মুরীদ পীরের রূহে বিলুপ্ত হয়, পীরের রূহ পূর্বেই রাসূলে পাক (সাঃ) রূহে বিলুপ্ত থাকে। ফলে মুরীদ, পীর ও রাসূলে পাক (সাঃ) একই আসনে উপবিষ্ট হয়, একই দস্তরখানায় বসিয়া প্রেমের সুধা পান করেন।

    এই দায়েরার মুরাকাবায় খেয়াল করিতে হয় যে, আসমা ও সিফাতের প্রতিবিম্বের ফয়েজ আল্লাহতায়ালার জাতপাক হইয়া রাসূলে পাক (সাঃ) এর পাক রূহ হইয়া সমস্ত পীরানে পীরগণের রূহের অছিলায় আমার হযরত দয়াল পীরের পাক রূহ হইয়া আমার রূহের উপর এবং তথা হইতে আমার নাফস ও অন্যান্য লতিফায় পড়িতেছে। এই দায়েরার মুরাকাবায় নূরের পতন এত অধিক হয় যে, ছালেকের নিকট মনে হয়, ছয় দিক বা দশ দিক হইতে নূরের তুফান তাহার উপর পড়িতেছে। এই নূরে ছালেক সমস্ত বিশ্ব ব্রহ্মান্ডকে, এমন কি নিজেকেও নিমজ্জিত দেখে। বেলায়েতে ছোগরার দায়েরার মুরাকাবায় ছালেকের নিকট পবিত্র কুরআনের নিম্নে বর্ণিত আয়াত,

    وَ هُوَ مَعَكُمْ أَيْنَمَا كُنْتُمْ

    অর্থাৎ-"তিনি তোমাদের সংগে আছেন, তোমরা যে স্থানেই থাক" (সূরা হাদীদঃ আয়াত নং-৪)।-এই আয়াত পাকের তাৎপর্য স্পষ্ট হয়।

    দায়েরায়ে আকরাবিয়াতের মুরাকাবাঃ--

    ইহা বেলায়েতে কোবরার প্রথম দায়েরা। আকরাবিয়াত হইতে প্রকৃত মারেফাত শুরু হয়। এই দায়েরার পূর্ব পর্যন্ত যে মারেফাত অর্জিত হয়, হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ইহাকে রাস্তায় ফেলিয়া দেওয়া খড়কুটা বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। এই দায়েরার মুরাকাবায় খেয়াল করিতে হয় যে, "আকরাবিয়াতের ফয়েজ খোদাতায়ালার যে জাত আমার জান রগের চেয়ে নিকটবর্তী, সেই জাত হইতে বেলায়েতে কোবরার প্রথম দায়েরা আসমা ও সিফাত দিয়া আমার রূহের উপর এবং তথা হইতে নাফস ও অন্যান্য লতিফায় পড়িতেছে।" পবিত্র কুরআনের বাণী,

    نَحْنُ أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنْ حَبْلِ الْوَرِيدِ .

    অর্থাৎ- "আমি তাহার (মানুষের) জান রগ হইতেও নিকটবর্তী"-এই আয়াত পাকের মর্ম ছালেক আকরাবিয়াত দায়েরার মুরাকাবায় উপলব্ধি করিতে পারে।

    মহব্বতে আউয়ালের মুরাকাবাঃ-

    এই দায়েরা বেলায়েতে কোবরার দ্বিতীয় দায়েরা। এই দায়েরার মুরাকাবায় খেয়াল করিতে হয় যে, মহব্বতে আউয়ালের ফয়েজ খোদাতায়ালার জাতপাক হইয়া বেলায়েতে কোবরার দ্বিতীয় দায়েরা আসমা ও সিফাতের মূল হইয়া রাসূলে-পাক (সাঃ) এর ছুরাতে রূহে বেমেছালী এবং আপন পীরের ছুরাতে রূহে বেমেছালীর যোগাযোগে আমার রূহে আসিয়া তথা হইতে নাফস ও সর্ব শরীরে পড়িতেছে।" এই দায়েরার মুরাকাবায় ছালেক-

    يُحِبُّهُمْ وَيُحِبُّونَهُ

    অর্থাৎ-"তিনি তাহাদিগকে ভালবাসেন, তাহারা তাঁহাকে ভালবাসে।" (সূরা মায়িদাহঃ ৫৪)-এই আয়াত পাকের মর্মার্থ উপলব্ধি করিতে পারে। এইরূপ মুরাকাবায় অতি সূক্ষ্ম তেজস্কর নূরের পতন হয় এবং ফয়েজ এতই অধিক হয় যে, পূর্বের সকল নূর পতনের ফয়েজান ছালেকের নিকট অতি সাধারণ ও নগন্য বলিয়া বোধ হয়।

    দায়েরায়ে মহব্বতে ছানীর মুরাকাবাঃ-

    ইহা বেলায়েতে কোবরার তৃতীয় দায়েরা। এই দায়েরার মুরাকাবায় খেয়াল করিতে হয় যে, মহব্বতে ছানীর ফয়েজ বেলায়েতে কোবরার তৃতীয় দায়েরা আসমা ও সিফাতের মূলের মূল হইতে রাসূলে পাক (সাঃ) ও আপন পীরের ছুরাতে রূহে বেমেছালীর যোগাযোগে আমার রূহ হইয়া নাফস ও সর্ব শরীরে পড়িতেছে।" এই দায়েরার মুরাকাবায় যে নূর দৃষ্ট হয় তাহা পূর্বের মাকাম হইতেও সূক্ষ্ম। এই দায়েরাতে খোদাতায়ালার প্রতি ছালেকের প্রেমাকর্ষণ প্রগাঢ় হয়।

    দায়েরায়ে কওছের মুরাকাবাঃ-

    ইহা বেলায়েতে কোবরার অভ্যন্তরস্থ সর্বশেষ দায়েরা। এই দায়েরাতে ছালেক খোদা প্রদত্ত এক বিশেষ শরীর লাভ করে, যাহার নাম "ওজুদ মাওহুব লাহু।" ইহার গতি বিদ্যুতের গতির চেয়েও লক্ষ গুণ বেশী। ইহার সাহায্যেই ছালেক আল্লাহতায়ালার জাত ও তাহার জাহেরী ও বাতেনী সিফাতে ছায়ের করিতে পারে। এই "ওজুদ মাওহুব লাহু"-এর মাধ্যমে ছালেক মুরাকাবায় এই দায়েরাতে ছায়েরে এছমোজ্জাহের' ও ছায়েরে এস্মোলবাতেন' সম্পন্ন করে।

    দায়েরায়ে মুরাকাবায়ে শরহে ছদরঃ-

    এই দায়েরার মুরাকাবায় খেয়াল করিতে হয় যে, শরহে ছদর' এর ফয়েজান জাতপাক হইয়া "ওজুদ মাওহুব লাহু” হইয়া আমার দশ লতিফা বিশিষ্ট হায়াতে ওহাদানীর উপরে পড়িতেছে। সৃষ্টির উপর খোদাতায়ালার তরফ হইতে যত রকমের ফয়েজ ওয়ারেদ হয়, তাহার সমুদয়ই এই দায়েরায় ছালেকের উপর পতিত হয় ও ছালেকের ছিনা প্রশস্ত হয়।

    দায়েরায়ে বেলায়েতে উলিয়ার মুরাকাবাঃ-

    ইহা ফেরেশতাদের খাছ বেলায়েত। এই দায়েরার মুবাকাবায় খেয়াল করিতে হয় যে, এছমোল বাতেনের ফয়েজ বেলায়েতে উলিয়ার দায়েরা হইয়া "ওজুদ মাওহুব লাহু” হইয়া আমার শরীরস্থ আগুন, পানি ও বায়ুর উপর পড়িতেছে এবং দেহের এই তিন লতিফা পাক হইতেছে।" এই দায়েরাতে দেহের মাটির স্তর ব্যতীত অন্যান্য স্তর তথা আগুন, পানি ও বায়ু পবিত্র হয়। মাটির স্তর পাক হয় পরবর্তী দায়েরা কামালাতে নবুয়তে।

    দায়েরায়ে কামালাতে নবুয়তের মুরাকাবাঃ-

    ইহা আল্লাহতায়ালার দায়েমী তাজাল্লীর অংশ। দায়েমী তাজাল্লী অর্থ যে তাজাল্লী অনবরত আসিতে থাকে। এ দায়েরার মুরাকাবায় খেয়াল করিতে হয় যে, "তাজাল্লীয়াতে দায়েমীর ফয়েজ কামালাতে নবুয়তের দায়েরা দিয়া "ওজুদ মাওহুব লাহু'র " যোগাযোগে আমার হায়াতে ওহাদানীর উপর পড়িতেছে।” এই দায়েরার ফয়েজে দেহের মাটির স্তর পাক হয়।

    দায়েরায়ে কামালাতে রেছালতের মুরাকাবাঃ-

    এই দায়েরার মুরাকাবায় খেয়াল করিতে হয় যে, "তাজাল্লীয়াতে জাতি দায়েমীর ফয়েজ কামালাতে রেছালতের দায়েরা হইতে "ওজুদ মাওহুব লাহু" হইয়া আমার দশ লতিফা বিশিষ্ট হায়াতে ওহাদানীতে পড়িতেছে।"

    কামালাতে উলুল আজমের দায়েরার মুরাকাবাঃ-

    এই দায়েরার মুরাকাবায় খেয়াল করিতে হয় যে, "তাজাল্লীয়াতে জাতী দায়েমীর ফয়েজ কামালাতে উলুল আজমের দায়েরা হইতে "ওজুদ মাওহুব লাহুর" যোগাযোগে আমার হায়াতে ওহাদানীর উপর পড়িতেছে।" এই দায়েরার ফয়েজ পূর্ববর্তী সকল দায়েরা হইতে অধিক আনন্দদায়ক।

    দায়েরায়ে হকিকতে কুরআনের মুরাকাবাঃ-

    এই দায়েরার মুরাকাবায় খেয়াল করিতে হয় যে, "হকিকতে কুরআনের দায়েরার ফয়েজ আমার দশ লতিফা বিশিষ্ট হায়াতে ওহাদানীতে পড়িতেছে।" এই দায়েরার ফয়েজ বর্ণনাতীত ও বেরংগী। এখানে আসিলে ছালেকের মনে হয় যে, আল্লাহপাক আপন কুদরতের দ্বারা এই মুহূর্তেই পবিত্র কুরআন অবতীর্ণ বা নাযিল করিতেছেন।

    দায়েরায়ে হকিকতে কাবার মুরাকাবাঃ-

    এই দায়েরার মুরাকাবায় খেয়াল করিতে হয় যে, "হকিকতে কাবার মাকাম হইতে ফয়েজান আসিয়া আমার দশ লতিফা বিশিষ্ট হায়াতে ওহাদানীতে পড়িতেছে।" এই মাকামে ছালেক স্পষ্ট দেখিতে পায় যে, সৃষ্টির প্রতি রেণু-পরমাণু হকিকতে কাবার দিকে সেজদা করিতেছে।

    হকিকতে ছালাতের দায়েরার মুরাকাবাঃ-

    এই দায়েরার মুরাকাবায় খেয়াল করিতে হয় যে, "দায়েরায়ে হকিকতে ছালাত হইতে ফয়েজ আসিয়া আমার দশ লতিফা বিশিষ্ট হায়াতে ওহাদানীতে পড়িতেছে।" এই দায়েরায় ছালেকের মেরাজ সিদ্ধ হয়।

    দায়েরায়ে মাবুদিয়াতে ছেরফার মুরাকাবাঃ-

    এই দায়েরার মুরাকাবায় খেয়াল করিতে হয় যে, "আল্লাহতায়ালার জাত মোজাররাদা হইতে মাবুদিয়াতে ছেরফার ফয়েজ আমার ওজুদ মাওহুব লাহুর কুওতে নজরীয়ার দ্বারা হায়াতে ওহাদানীতে পড়িতেছে।" এই দায়েরায় কদমী ছায়ের চলে না। ওজুদ মাওহুব লাহুর কুওতে নজরীয়ার দ্বারা ছায়ের করিতে হয়।

    দায়েরায়ে হকিকতে ইব্রাহিমীর মুরাকাবাঃ-

    এই দায়েরার মুরাকাবায় খেয়াল করিতে হয় যে, "মাহবুবিয়াতে সিফাতির উৎপত্তি স্থান হকিকতে ইব্রাহিমী হইতে ফয়েজ আসিয়া আমার হায়াতে ওহাদানীতে পড়িতেছে।" এই মুরাকাবায় খোদাতায়ালার জাতের সহিত ছালেকের এক বিশেষ প্রণয় সৃষ্টি হয়।

    দায়েরায়ে হকিকতে মুছবীর মুরাকাবাঃ-

    এই দায়েরা হইতে মহব্বতে জাতি নূর প্রকাশ পায়। এই দায়েরার মুরাকাবায় খেয়াল করিতে হয় যে, "বিশুদ্ধ মহব্বতে জাতি নূরের উৎপত্তিস্থান হকিকতে মুছবী হইতে ফয়েজ আসিয়া আমার হায়াতে ওহাদানীতে পড়িতেছে।"

    দায়েরায়ে হকিকতে মুহাম্মদীর মুরাকাবাঃ-

    এই দায়েরা মহব্বতে জাতি ও মাহবুবিয়াতে জাতির সম্মিলিত ফয়েজানের উৎপত্তিস্থান। এই দায়েরার মুরাকাবায় খেয়াল করিতে হয় যে, "মহব্বতে জাতি ও মাহবুবিয়াতে জাতির উৎপত্তিস্থান হকিকতে মুহাম্মদী হইতে ফয়েজান আসিয়া আমার হায়াতে ওহাদানীতে পড়িতেছে।" এই দায়েরায় উন্নীত ছালেকের সহিত রাসূলে-পাক (সাঃ) এর এক বিশেষ প্রণয় সম্পর্ক সৃষ্টি হয়।

    দায়েরায়ে হকিকতে আহমদীর মুরাকাবাঃ-

    এই দায়েরা বিশুদ্ধ মাহবুবিয়াতে জাতি নূরের উৎপত্তিস্থান। এখান হইতে জাতি মহব্বতের প্রকাশ। এই দায়েরার মুরাকাবায় খেয়াল করিতে হয় যে, "বিশুদ্ধ মাহবুবিয়াতে জাতি নূরের প্রকাশস্থান হকিকতে আহমদী হইতে ফয়েজান আসিয়া আমার হায়াতে ওহাদানীতে পড়িতেছে।"

    দায়েরায়ে হোব্বে ছেরফার মুরাকাবাঃ-

    এই দায়েরার মুরাকাবায় খেয়াল করিতে হয় যে, "হোব্বে ছেরফার ফয়েজ আসিয়া আমার হায়াতে ওহাদানীতে পড়িতেছে।" এই দায়েরা জাত মতলক সংলগ্ন অতি নিকটবর্তী মাকাম। ইহা অপেক্ষা নিকটবর্তী মাকাম আর নাই। এই দায়েরার নূর বেরংগী।

    এমনি ভাবে ছালেক সমুদয় দায়েরা অতিক্রম করিয়া খোদাতায়ালার জাতপাকের নিকটতম দুই দায়েরা মাবুদিয়াতে ছেরফা ও হোব্বে সেরফা হইতে "ওজুদ মাওহুব লাহু”র কুওতে নজরীয়ার মাধ্যমে খোদাতায়ালার পবিত্র জাতের দর্শন, সান্নিধ্য ও জ্ঞান অর্জন করে-যাহা সমুদয়ই মুরাকাবার মাধ্যমে ছালেকের সিদ্ধ হয়। এই পর্যন্ত উরুজ করিবার পরে কিছু সংখ্যক ছালেক খোদাতায়ালার সান্নিধ্যে থাকিয়া প্রেমসুধা পানে রত থাকেন। তাহারা আর দুনিয়ার দিকে ফিরিয়াও তাকান না। তাহারা সর্বক্ষণই মুরাকাবায় নিমগ্ন থাকিয়া খোতাদায়ালার প্রেমের শরাব পানে বিভোর থাকেন। তাহারাই বেলায়েতে নবুয়তের সাজে সজ্জিত।

    হযরত ইমাম গাজ্জালী (রঃ) ছাহেব কিমিয়ায়ে সা'আদাত নামক কিতাবে হযরত আব্দুল্লা ইবনে খাফীক (রঃ) ছাহেবের জীবনের একটি ঘটনা তুলিয়া ধরিয়াছেন। ঘটনাটি হইলঃ- আব্দুল্লাহ ইবনে খাফীক (রঃ) বলিয়াছেন যে, আমি লোকমুখে শুনিতে পাইলাম, "সুর” নামক শহরে একজন বৃদ্ধ ও একজন যুবক নিরবচ্ছিন্নভাবে মুরাকাবায় নিমগ্ন রহিয়াছে। আমি তথায় গিয়া দেখিতে পাইলাম। তাঁহারা উভয়ে কেবলামুখী হইয়া মুরাকাবায় নিমগ্ন। আমি পর পর তিনবার তাঁহাদিগকে ছালাম করিলাম। তাঁহারা একজনও আমার ছালামের জবাব দিলেন না। আমি তাঁহাদিগকে

    আল্লাহর কসম দিয়া বলিলাম, আমার ছালামের জবাব দিন।" তখন যুবকটি মস্তক উত্তোলনপূর্বক বলিলেন, "হে ইবনে খাফীক! পার্থিব জীবন অতি সংক্ষিপ্ত। তাহারও আবার বেশীর ভাগই গত হইয়া সামান্য অংশ মাত্র অবশিষ্ট আছে। পরমায়ুর এই সামান্য অংশ হইতে পারলৌকিক সৌভাগ্যের অধিকাংশই হাছিল করিয়া লও।

    হে ইবনে খাফীক। তোমাকে বড়ই উদাসীন ও বিঘ্নসষ্টিকারী দেখিতেছি। তুমি আমাদিগকে ছালাম করিবার কাজে ব্যাপৃত রহিয়াছ। (নিজের আত্মকর্ম পর্যবেক্ষণ ও পরকাল চিন্তনে মশগুল হও না কেন?) এতটুকু বলিয়ায় তিনি পুনরায় গ্রীবা নত করিয়া মুরাকাবায় নিমগ্ন হইলেন। আমি অতিশয় ক্ষুধার্ত ও পিপাসাতুর ছিলাম। কিন্তু তাঁহাদের অবস্থা দর্শন ও উক্তি শ্রবণ করিয়া আমার ক্ষুধা তৃষ্ণা উড়িয়া গেল। তাঁহারা উভয়ে নিজেদের অবস্থায় ও উক্তিতে আমাকে হতবুদ্ধি ও আত্মহারা করিয়া ফেলিলেন। আমি স্থিরভাবে দাঁড়াইয়া রহিলাম। পরিশেষে তাঁহাদের সহিত জোহর ও আসরের নামাজ সমাধা করিয়া নিবেদন করিলাম, "অনুগ্রহপূর্বক আমাকে কিছু উপদেশ প্রদান করুন।" তাঁহারা বলিলেন, "হে ইবনে খাফীক! আমরা নিতান্তই বিপন্ন। উপদেশের উপযোগী ভাষাই আমাদের নাই।” আমি তথায় তিন দিবস পর্যন্ত উপদেশ লাভের আশায় দাঁড়াইয়া রহিলাম। আমাদের তিন জনের মধ্যে কেহ কিছু মাত্র খাদ্যও গ্রহণ করিলাম না, এমন কি এক মুহূর্তের জন্য ঘুমাইলামও না।

    আমাদের মধ্যে কাহারও পেটে ক্ষুধা-তৃষ্ণা এবং চোখে ঘুম ছিল না। অবশেষে আমি মনে মনে চিন্তা করিলাম, আমাকে কিছু উপদেশ প্রদানের জন্য আমি ইহাদিগকে আল্লাহতায়ালার কছম দিয়া দেখি, ফল কি দাঁড়ায়? ঠিক এমন সময় যুবক লোকটি মস্তক উত্তোলন পূর্বক বলিলেন, "উপদেশ প্রাপ্তির জন্য এমন লোকের অনুসন্ধান কর, যাহাকে দেখিবা মাত্র তোমার মনে আল্লাহতায়ালার স্মরণ আপনা আপনি জাগিয়া উঠে এবং আল্লাহর ভয় তোমার হৃদয়ে উৎপন্ন হয় এবং সেই লোকটির আকৃতি, প্রকৃতি ও বাহিরের অবস্থার ভাষাই যেন তোমাকে উপদেশ প্রদান করে; মুখের কথায় উপদেশ প্রদানের আবশ্যক না হয়।"

    এই ঘটনা থেকে বুঝা যায় যে, ঐ বৃদ্ধ ও যুবক বেলায়েতে নবুয়তের দায়েরায় থাকিয়া খোদাতায়ালার প্রেমসুধা পানে রত ছিলেন। কিন্তু আর এক শ্রেণীর সাধক আছেন, যাহাদিগকে মহান খোদাতায়ালা নিজ সন্নিধান থেকে দিয়া দুনিয়ার দিকে ঘুরাইয়া দেন আল্লাহ ভোলা মানুষদেরকে হেদায়েত কামালাতে নবুয়তের সাজে সজ্জিত করিয়া, হেদায়েতের দায়িত্বভার মাথায় করিবার জন্য। তাঁহারাই ওলীয়ে কামেল হিসেবে পরিচিত। উল্লিখিত ঘটনায় সাধক যুবক হযরত ইবনে খাফীককে উপদেশ গ্রহণের জন্য কামালাতে নবুয়তের সম্পদে সম্পদশালী ওলীয়ে কামেলের নিকটই যাওয়ার ইশারা দিয়াছেন।

    প্রাথমিক স্তরের মুরীদানদেরকে যে সমস্ত ফয়েজ হাছিলের জন্য মুরাকাবা করিতে হয়-তাহার বিবরণঃ

    খোদা প্রাপ্তির পথে যাত্রার শুরুতে খোদাতালাশী ব্যক্তিদেরকে নিম্নলিখিত বিভিন্ন সময়ে নিম্নবর্ণিত ফয়েজ সমূহ খেয়াল করিতে হয়।

    • রাত্রির তিনভাগের দুইভাগ অতিবাহিত হওয়ার পর রহমতের সময় শুরু হয়। রহমতের সময়ে মুরাকাবার হালতে বসিয়া রহমতের ফয়েজ এবং আওয়ারে জেরে এলাহিয়ার ফয়েজ খেয়াল করিতে হয়।

  • ফজরের নামাজ শেষ করিয়া ফাতেহা শরীফ আদায় করিয়া ৭০০ মর্তবা খতম শরীফ পড়িয়া হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবকে নজরানা দিতে হয়। খতম শরীফ পড়িবার পূর্বে মুরাকাবার হালতে বসিয়া কুওতে এলাহিয়ার ফয়েজ খেয়াল করিতে হয়।জোহর ওয়াক্তের নামাজ সম্পন্ন করিবার পরে মুরাকাবায় বসিয়া রাসূলে পাক (সাঃ) এর খাছ হোব্ব এশক মহব্বতের ফয়েজ খেয়াল করিতে হয়।

  • আছরের নামাজ আদায় করিবার পরে মুরাকাবায় বসিয়া তওবা কবুলিয়তের ফয়েজ খেয়াল করিতে হয়।

  • মাগরিবের ওয়াক্তে পাঁচ প্রকারের ফয়েজ ওয়ারেদ হয়। নব শিক্ষার্থীদেরকে মাগরিবের নামাজ আদায় করিয়া মুরাকাবা মোশাহেদার মাধ্যমে পাঁচ প্রকারের ফয়েজ খেয়াল করিতে হয়।

  • (ক) হকিকতে তওবা কবুলিয়তের ফয়েজ।

    (খ) দোসরা দায়েরা হইতে কুওতে এলাহিয়ার ফয়েজ।

    (গ) রাসূলে পাক (সাঃ) এর খাছ হোব্ব-এঙ্ক-মহব্বতের ফয়েজ।

    (ঘ) আল্লাহপাকের খাছ হোব্ব-এশক-মহব্বতের ফয়েজ।

    (ঙ) আওয়ারে জেরে এলাহিয়ার ফয়েজ।

    • এশার নামাজের পর মুরাকাবায় বসিয়া রাসূলে-পাক (সাঃ) এর গায়রাতের ফয়েজ খেয়াল করিতে হয়।

    বর্ণিত বিভিন্ন রকমের ফয়েজ খেয়াল করিবার নিয়ম-পদ্ধতি সংক্ষিপ্ত ওজিফা নামক পুস্তিকাতে আছে। তাই পুনরায় এখানে আর উল্লেখ করিলাম না।

    হে জাকেরান ও আশেকান সকল! তোমরা যদি খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্ব হাছিল করিতে চাও, তবে মুরাকাবা মোশাহেদা সহ তরিকতের যাবতীয় নিয়ম পদ্ধতি ঠিক ঠিক মত প্রতিপালন কর। হর নিঃশ্বাসে আল্লাহকে স্মরণ রাখ। তবেই কল্যাণ।

    জেবি/এসডি

    জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

    Developed by: AB Infotech LTD