জেকেরের প্রকারভেদ এবং খোদাপ্রাপ্তির পথে জেকেরের গুরুত্ব

খোদাপ্রাপ্তি জ্ঞানের আলোকে শাহ্সূফি হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত তরিকতের পাঁচ রোকন بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
বিজ্ঞাপন
জেকের, জেকেরের প্রকারভেদ এবং খোদাপ্রাপ্তির পথে জেকেরের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আলোচনাঃ
শরীয়তে পাঁচটি রোকন বা ভিত্তি নির্ধারিত আছে। ঠিক তেমনি তরিকতেও পাঁচটি রোকন আছে। শরীয়তের রোকন সমূহ হইলঃ ঈমান, নামাজ, যাকাত, রোজা ও হজ্জ। আর তরিকতের পাঁচটি রোকন হইলঃ জেকের, রাবেতা, শোগল, মুরাকাবা ও মোহাছাবা। এই অধ্যায়ে তরিকতের প্রথম দুই রোকন, অর্থাৎ জেকের ও রাবেতা সম্পর্কে আলোচনা করিতেছি।
জেকেরঃ- জেকের আরবী শব্দ, যাহার অর্থ স্মরণ বা ইয়াদ করা। ইসলামী পরিভাষায় আল্লাহপাককে স্মরণ করাই জেকের। জেকের বা খোদাতায়ালার স্মরণ হইল সমস্ত ইবাদতের মূল বা সারবস্তু। জেকেরই ইবাদতের প্রাণ। জেকের দুই প্রকার, যথাঃ- জেকেরে এমে জাত অর্থাৎ আল্লাহর জাতি নামের জেকের। এবং জেকেরে নাফী-এসবাত অর্থাৎ 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ' -এই কলেমা শরীফের জেকের। জেকের সম্পর্কে আল্লাহপাক সূরা আনকাবুতে বলেন,
বিজ্ঞাপন
وَ لَذِكْرُ اللَّهِ أَكْبَرُ
অর্থাৎ-"আল্লাহর জেকেরই সর্বশ্রেষ্ঠ" (আয়াত নং ৪৫)।
রাসূলে পাক (সাঃ) জেকের সম্পর্কে বলেন, "আমি কি তোমাদিগকে তোমাদের শ্রেষ্ঠ আমল কি-তা বলবো না, যা তোমাদের প্রভুর নিকট অধিক প্রিয় ও পবিত্র এবং যা তোমাদের মর্যাদা বৃদ্ধির ব্যাপারে সর্বশ্রেষ্ঠ এবং তোমাদের পক্ষে সোনা-রূপা দান করা অপেক্ষাও শ্রেষ্ঠ এবং ইহা অপেক্ষাও শ্রেষ্ঠ যে জেহাদে তোমরা শত্রুর মুকাবেলা করবে ও তাদের গর্দান কাটবে, আর তারাও তোমাদের গর্দান কাটবে অর্থাৎ জেহাদে শহীদ হবে।" তারা উত্তর করলেন, হ্যা, হুজুর (অবশ্যই বলবেন)। তখন আল্লাহর রাসূল (সাঃ) বললেন, "তা হলো আল্লাহর জেকের বা স্মরণ।" (মেশকাত শরীফ, তিরমিযী শরীফ, ইবনে মাযা শরীফ)।
বিজ্ঞাপন
পবিত্র কুরআনের উল্লিখিত আয়াত ও পবিত্র হাদীসের ভাষ্য থেকে বুঝা যায় যে, আল্লাহর জেকেরই শ্রেষ্ঠ। ইসলামী বিধানে সর্বপ্রথমে আসে ঈমান। ইসলামের মূলমন্ত্র, কলেমা "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ," অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নাই, মুহাম্মদ মোস্তফা (সাঃ) আল্লাহর প্রেরিত পূরুষ। এই কলেমার মৌখিক স্বীকারোক্তি ও আন্তরিক বিশ্বাস যাহা শরীয়তের সর্ব প্রথম ও শ্রেষ্ঠতম রোকন।
বিশ্বাসের পরে আসে আমল। ইসলামী জীবন বিধানের সমুদয় আমলের মধ্যে নামাজ শ্রেষ্ঠতম, কারণ নামাজের মধ্যে খোদাতায়ালার দরশন বা মেরাজ বা সান্নিধ্য মিলে। নামাজের দুইটি দিক। একটি বাহ্যিক, অপরটি অভ্যন্তরীণ। বাহ্যিক দিক; যথাঃ- নামাজের আহকাম-আরকান বা ফরজ সমূহ, ওয়াজেব, সুন্নত, মোস্তাহাব, তথা সমুদয় নিয়ম কানুনসহ নিখুঁত ও পরিপূর্ণ ভাবে নামাজ আদায় করা। সমুদয় নিয়ম-কানুনসহ নিখুঁতভাবে নামাজ আদায় করিলেও নামাজ হইবে না, যদি নামাজে খোদাতায়ালার জেকের বা স্মরণ না থাকে। খোদাতায়ালার জেকের হইল নামাজের অন্তর বা অভ্যন্তরীণ দিক। মুখে আল্লাহর নাম আর অন্তরে দুনিয়ার চিন্তা এমন নামাজে তাই কোন ফল হয় না। মৌখিক ভালবাসার কোন দাম নাই। ইহাকে লিপ্সিমপ্যাথি (Lipsympathy) বলা হয়।
আল্লাহর জেকের শূন্য যে নামাজ তাহা যত নিখুঁতই হউক না কেন, আসমানের উপরে উঠে না। "আত্মদর্শনে সত্যদর্শন"-এর লেখক বান্দা খলিল নিজ জীবনের একটি ঘটনা তদীয় পুস্তকে উল্লেখ করিয়াছেন। তিনি বলেন, "একদিন আছরের নামাজের সময় আমি এবং তিন জন আবেদ' একটি রূমে অবস্থানরত। ঐ তিনজনের মধ্যে একজন উচু স্তরের সাধক ছিলেন; আমি তাহা জানিতাম না। তাঁহারা তিনজনই আমাকে ইমামতি করার জন্য অনুরোধ করিলে আমি ইমাম হইয়া নামাজ শুরু করিলাম। যথানিয়মে নামাজ শেষ করিলাম। নামাজ শেষে মোক্তাদি তিনজনের একজন আমাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, আচ্ছা বলুন তো "ইমাম অর্থ কি"? আমি কিছু বলিবার পূর্বে তিনিই বলিলেন, "ইমাম অর্থ ইঞ্জিন।
বিজ্ঞাপন
ইঞ্জিন যে দিকে যায়, গাড়ীও সেই দিকে যায়; ইঞ্জিন যদি অকেজো হয়, গাড়ী আর সম্মুখপানে অগ্রসর হইতে পারে না।" ইহা বলিয়াই তিনি আমাকে বলিলেন, "ভাই, আপনার নামাজ এমন হইল কেন? মধ্যপথ পর্যন্ত উঠিয়া নামাজ আর উপরে উঠিতে পারিতেছিল না। কিন্তু ইমামের নামাজ না হইলে মোক্তাদিদেরও নামাজ আরশের ঊর্ধ্বে উঠাইয়া তৎপর আমরা উঠিয়াছি। কাজেই একটু সাবধানে হয় না। তাই বাধ্য হইয়া পিছন হইতে আপনার নামাজকে ঠেলিয়া নামাজ পড়িবেন।" আমি বলিলাম, "আমিতো নামাজের সমস্ত নিয়ম-রীতি ঠিক ঠিক ভাবে পালন করিয়াছি। কোথায় যে ভুল হইয়াছে, আমি তাহা বুঝিতে পারিতেছি না।" সেই সাধক বলিলেন, "ভাই, দুই রাকায়াতের শেষে আপনি নামাজে আল্লাহকে ভুলিয়া অমুক অমুক চিন্তা করিতেছিলেন।” ইহা শুনিয়া আমি আশ্চর্য হইলাম। এই কারণেই আল্লাহপাক বলিয়াছেন,
وَ أَقِمِ الصَّلوةَ لِذِكْرِى
অর্থাৎ-"তোমরা নামাজ কায়েম কর, আল্লাহর জেকেরের উদ্দেশ্যে।" (সূরা ত্বাহাঃ আয়াত নং-১৪)।
বিজ্ঞাপন
নামাজের মত অপরাপর যত আমল শরীয়তের বিধানে চালু আছে, সমুদয় আমলের প্রাণ হইল আল্লাহর জেকের। রোজাই হউক, যাকাত প্রদানই হউক কিংবা হজ্জ পালনই হউক, যদি আল্লাহর স্মরণ অনুপস্থিত থাকে, তবে উল্লিখিত আমল হইবে সারশূন্য। আর সারশূন্য আমল কবুলিয়তের যোগ্যতা রাখে না। জেকের সম্পর্কে আল্লাহপাক বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اذْكُرُوا اللَّهَ ذِكْرًا كَثِرًا - و سَبِّحُوهُ بُكْرَةً وَأَصِيْلاً
অর্থাৎ -“হে বিশ্বাসীগণ, তোমরা আল্লাহকে স্মরণ কর অত্যাধিক জেকের দ্বারা এবং সকাল সন্ধ্যায় তছবীহ কর।" (সূরা আহযাব, আয়াত-৪১-৪২)। আল্লাহপাক আরও বলেন,
বিজ্ঞাপন
الَّذِينَ يَذْكُرُونَ اللَّهَ قِيمًا وَقُعُودًا وَ عَلَى جُنُوبِهِمْ .
অর্থাৎ-“(তারাই তত্ত্বজ্ঞানী) যাহারা দন্ডায়মান, উপবিষ্ট এবং ডান বা বামে শায়িত অবস্থায় পরওয়ারদিগারকে স্মরণ করে।" "(সূরা আলে ইমরান, আয়াত নং ১৯১)। সূরায়ে নিসার ১০৩ নং আয়াতে আল্লাহপাক বলেন,
فَإِذَا قَضَيْتُمُ الصَّلوةَ فَاذْكُرُوا اللَّهَ قِيَامًا وَقُعُودًا و عَلَى جُنُوبِكُمْ .
বিজ্ঞাপন
অর্থাৎ-“যখন তোমরা ছালাত সম্পন্ন কর, তৎপর দাঁড়ানো, বসা ও শায়িতাবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ কর।"
আলে ইমরান ও সূরায়ে নেছার উল্লিখিত দুই আয়াত থেকে বুঝা যায় যে মানুষ সার্বক্ষণিকভাবে আল্লাহতায়ালার জেকের করুক-ইহাই তাহার নির্দেশ। তথা শয়নে-স্বপনে-জাগরণে, দাঁড়ানো, বসা বা শায়িত অর্থাৎ সর্বাবস্থায় বান্দা আল্লাহর জেকের করিবে-ইহাই খোদাতায়ালার কাম্য। পবিত্র কুরআনেও আল্লাহপাক ইহার ইশারায় আরও বলেন,
وَ مَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونَ
বিজ্ঞাপন
অর্থাৎ-"আমি মানুষ ও জ্বিনকে কেবলমাত্র আমার ইবাদত' ভিন্ন অন্য কাজের জন্য সৃষ্টি করি নাই।" (সূরা জারিয়াতঃ আয়াত নং-৫৬)।
সার্বক্ষণিক জেকের করার মাধ্যম হইল মানবদেহস্থিত লতিফা সমূহ অর্থাৎ-কালব, রূহ, ছের, খফি, আখফা, আব, আতস, খাক, বাদ ও নাফস। প্রথম পাঁচটি আলমে আমরের এবং দ্বিতীয় পাঁচটি আলমে খালকের লতিফা। প্রাথমিক অবস্থায় লতিফা সমূহ নির্জীব থাকে। পাপের কারণেই ইহা হয়। অন্যায় ও পাপের ময়লায় লতিফা সমূহ ঢাকা থাকে। জেকেরের সাহায্যেই লতিফা সমূহের ময়লা দূর হয়। রাসূলে পাক (সাঃ) বলেন, "প্রত্যেক জিনিসেরই একটা মাজন থাকে, আর অন্তরের মাজন হলো আল্লাহর জেকের। আল্লাহর জেকের অপেক্ষা আল্লাহর গজব হইতে অধিক ত্রাণদাতা আর কোন বস্তুই নাই।" (মেশকাত শরীফ)।
তাই তরিকতের প্রথম শিক্ষার্থীকে ওলীয়ে কামেল লতিফা কালবে ছবক দেন। লতিফা কালবে পীরে কামেল তদীয় শাহাদাত অংগুলী স্পর্শ করিয়া বলিয়া দেন যে, লতিফা কালবে ছবক দেওয়া হইল। ইহা আল্লাহতায়ালার ভেদ রহস্যের ভান্ডার, জ্ঞানের অপূর্ব মাকাম। ইহা খোদাপ্রাপ্তির প্লাটফর্ম। এখানে সর্বদাই আল্লাহ আল্লাহ জেকের হইতেছে-এই খেয়ালে থাকিতে হইবে। এই খেয়ালে নামাজ পড়িবে, অন্যান্য ইবাদত কর্ম করিবে; এই খেয়ালেই দুনিয়াবী কাজকর্ম করিবে। প্রথম শিক্ষার্থীর উদ্দেশ্যে আরও বলা হয় যে, নামাজে দাঁড়াইয়া খেয়াল কালবে, কালব আল্লাহর দিকে, আল্লাহ হাজের-নাজের; খেয়াল কালবে ডুবাইয়া, আল্লাহতায়ালাকে হাজের-নাজের, ওয়াহেদ জানিয়া সেজদা করিতে হইবে। ইহাই নামাজের মেরাজের অধ্যায়ে পৌঁছিবার পথ। এইভাবে খেয়াল করিতে করিতে এক পর্যায়ে কালবের ময়লা দূরীভূত হয়, কালব পরিচ্ছন্ন হয়, সেখানে আল্লাহ আল্লাহ জেকের জারী হয়।
বিজ্ঞাপন
এই জেকের সর্বক্ষণই চলিতে থাকে। তৎপর পীরের তাওয়াজ্জুয়ে এত্তেহাদীর বলে ধীরে ধীরে ছালেক' এর দেহের দশ লতিফা জাগ্রত হয় অর্থাৎ আল্লাহ আল্লাহ জেকের জারী হয়। লতিফা সমূহে আল্লাহ পাকের আসমা ও সিফাতের নূর প্রতিফলিত হয়। দশ লতিফাতে এসমে জাত জেকের জারী হইলে তদীয় পীর তদসংগে সংযোজন করান নাফী এসবাত জেকের, কলেমা "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ” একই সংগে দশ লতিফায় এসমে জাত ও নাফী এসবাতের জেকের চলিতে থাকে। তৎপর পীরে কামেলের নেক দৃষ্টিতে মুরীদের ৭০ হাজার লতিফা বিশিষ্ট লতিফায়ে কালেবে এবং মুরীদের অজুদ রাজ্যের কোটি কোটি লতিফায় এসমে জাত ও নাফী এসবাতের জেকের মহা ধুমধামের সহিত চলিতে থাকে।
মুরীদের দেহের ভিতরে ও বাহিরে, দেহের প্রত্যেক লোমকূপে, প্রত্যেক অনু-পরমাণুতে দেহের বাহিরে আলো-বাতাস, গাছ-পালা, বৃক্ষলতায়, চন্দ্র-সূর্য, গ্রহ-নক্ষত্রে, তথা সৃষ্টি জগতের প্রত্যেক অনু-পরমাণু হইতে এসমে জাত ও নাফী এসবাতের জেকের মুরীদ এমন ভাবে শুনিতে পায় যেমন ঝি-ঝি পোকার একটানা সুর (ডাক) বা পানাপুকুরের মৎসকুলের বিরতিহীন চপচপ শব্দ। ইহাই সুলতানুল আজকরের দরজা। এমতাবস্থায় ছালেক বা মুরীদ এক অবর্ণনীয় তৃপ্তি পায়। মহান খোদাতায়ালা এই তৃপ্তিকে শান্তি হিসেবে উল্লেখ করিয়াছেন। আল্লাহপাক বলেন,
أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ
বিজ্ঞাপন
অর্থাৎ-"আল্লাহর জেকেরেই দেলে শান্তি।" (সূরা রা'আদঃ আয়াত নং-২৮) এই জেকেরকারীদের উদ্দেশ্যেই আল্লাহপাক বলেন,
رِجَالٌ لا تُلْهِيهِمْ تِجَارَةً وَّ لَا بَيْعٌ عَنْ ذِكْرِ اللَّهِ
অর্থাৎ-"এমন অনেক ব্যক্তি আছে যাহাদিগকে ব্যবসা-বাণিজ্য, এমন কি ক্রয়-বিক্রয়ও আল্লাহর জেকের হইতে গাফেল করিতে পারে না।" (সূরা নূরঃ আয়াত নং-৩৭)। দেল ও দেহের কোটি কোটি লতিফার মাধ্যমে জেকের করায় জেকেরকারীর দেল, চাম, হাড্ডি-মজ্জা সবই নরম হইয়া যায়। আল্লাহপাক বলেন,
ثُمَّ تَلِينُ جُلُودُهُمْ وَقُلُوبُهُمْ إِلَى ذِكْرِ اللَّهِ.
অর্থাৎ-"আল্লাহর জেকেরে তাঁহাদের চামড়া, দেহ, অন্তর সবই মোলায়েম হয়।" (সূরা জুমারঃ আয়াত নং-২৩)। আমার পীর কেবলাজানের ইন্তিকালের আঠাশ (২৮) ঘন্টা পর কবরে নামাইবার সময়ও তদীয় পবিত্র দেহ মোবারক তুলার মত নরম ছিল
কলেমা "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ"-শ্রেষ্ঠতম জেকের। রাসূলে পাক (সাঃ) বলেন, মানুষ যে সমস্ত নেক কার্য করিয়া থাকে, কিয়ামত দিবসে তাহা মাপদন্ডে ওজন করা হইবে। তন্মধ্যে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ"-কলেমাটি যদি এক পাল্লায় রাখিয়া অপর পাল্লার মধ্যে সাত আসমান, সাত জমিন এবং এই উভয়ের মধ্যস্থিত যাবতীয় পদার্থ স্থাপন করা হয়, তথাপিও "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ"-কলেমার পাল্লাই অধিক ভারী হইবে। তিনি আরও বলিয়াছেন, কলেমা "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ" উচ্চারণকারী যদি এই বাক্যে সত্যবাদী হয় অর্থাৎ অকুন্ঠ চিত্তে ও সরল অন্তরে এই কলেমা পাঠ করে, সে যদি জমিনের বালুকা রাশির সম পরিমান অসংখ্য পাপ কার্যও করিয়া থাকে, তথাপিও (কলেমার বরকতে) তাহার সমস্ত পাপ মার্জনা করিয়া দেওয়া হইবে।" তিনি আরও বলিয়াছেন, "যে ব্যক্তি সরল মনে কলেমা "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ"-অর্থাৎ আল্লাহ ভিন্ন কোন মাবুদ নাই, মুহাম্মদ আল্লাহর প্রবেশ করিবে।" প্রেরিত প্রতিনিধি-এই কথা দুইটি বলিবে, সে ব্যক্তি নিশ্চয়ই বেহেশতে
কেন কলেমাটির এত গুরুত্ব? কারণ ইহার মধ্যেই আছে বেলায়েতে নবুয়ত ও কামালাতে নবুয়ত এর ইশারা। ইহার মধ্যেই আছে জ্ঞানের পরিপূর্ণতা। এই কলেমাকে নাফী এসবাত জেকের বলা হয়। কলেমার প্রথম অংশ "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" বেলায়েতের নিদর্শন। ইহারও দুইটি অংশ আছে, যথাঃ- ১। লা-ইলাহা ২। ইল্লাল্লাহ। প্রথম অংশকে নাফী বলা হয় এবং দ্বিতীয় অংশকে এসবাত বলা হয়। কলেমার প্রথম অংশের 'লা' যেন নিষিদ্ধ বৃক্ষ, যে বৃক্ষের নিকট হয়রত আদম (আঃ) এর গমন নিষিদ্ধ ছিল। তেমনি আল্লাহ ভিন্ন যাহা কিছু আছে সবই 'লা' এর অন্তর্ভুক্ত। কাজেই খোদা অন্বেষীকে আল্লাহ ভিন্ন সব কিছুকেই নাফী করিতে হইবে। 'লা' এর মাধ্যমে আল্লাহ ব্যতীত সমস্ত ব্যক্তি, বস্তু এবং যাবতীয় বাতেল উপাস্য তুল্য উদ্দেশ্য সমূহকে নাফী করিতে হয়। আল্লাহ ব্যতীত সব কিছুকে নাফী করিতে পারিলে ছালেক ফানার মাকামে উন্নীত হয়।
সেখানে ছালেক বা খোদাতালাশী খোদাতায়ালার আসমা ও সিফাতের প্রতিবিম্বিত নূরে ফানা প্রাপ্ত হইয়া সবকিছু ভুলিয়া যায়। এমন কি নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কেও ছালেকের কোন অনুভূতি থাকে না। তৎপর ইল্লাল্লাহর মাধ্যমে এসবাত প্রতিষ্ঠিত হয়। এখানে যে ফানার কথা উল্লেখ করা হইল তাহা ফানার প্রথম স্তর। এখান হইতে ঊর্ধ্বদিকে যাহা কিছু পরিলক্ষিত হয়, তথা সিফাতে এজাফিয়া', সিফাতে হাকীকী', আসমা, শান, শয়ুনাত-সব কিছুকেই নাফী করিয়া খোদাতায়ালার জাতপাকের প্রান্তসীমায় পৌঁছাইয়া খোদাতায়ালার পবিত্র জাতে ফানা হইতে হয়। ইহাই খোদাপ্রাপ্তির চরম সীমা। ইহাই বেলায়েতের শেষ সীমা-যাহা কলেমার প্রথম অংশের মধ্যে নিহিত। কাজেই বলা হয়, নাফী এসবাত জেকের ছাড়া খোদাতায়ালার সান্নিধ্যে পৌঁছানো কোন ক্রমেই সম্ভব নয়। এই নাফী এসবাত জেকেরই উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য বুরাক বা রফ রফ তুল্য। কলেমার দ্বিতীয় অংশ তথা "মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ" কামালাতে নবুয়তের নিদর্শন; দুনিয়াবাসীদের আল্লাহ মুখী করিবার বা আল্লাহতায়ালার পথে হেদায়েতের নিদর্শন।
তরিকতের নবশিক্ষার্থীসকল দুই পদ্ধতিতে জেকের করিতে পারে। যথাঃ জেকেরে খফি ও জেকেরে জলি।
জেকেরে খফিঃ-
মুখ বা জিহা দ্বারা শব্দ না করিয়া কেবলমাত্র দেল দ্বারা জেকের করাকে "জেকেরে খফি" বলা হয়।
জেকেরে জলিঃ- শব্দ করিয়া জেকের করাকে "জেকেরে জলি” বলা হয়। যেমন তোমরা এই জাকের মঞ্জিলে ফজর নামাজের পূর্বে কিছুক্ষণ এবং মাগরিবের পরে কিছু সময় মহাধুমধামের সাথে গজলের তালে তালে জেকেরে জলি কর। জেকের একা একাও করা যায়, আবার দলবদ্ধভাবেও করা যায়। তবে দলবদ্ধভাবে জেকের করার ফজিলত বেশী। দলবদ্ধভাবে জেকের করাকে হালকায়ে জেকের বলা হয়। হালকা অর্থ বৃত্ত বা মজলিস। রাসূলে পাক (সাঃ) জেকেরের এই মজলিসকে বেহেশতের বাগানের সহিত তুলনা করিয়াছেন। (তিরমিজি শরীফ, মেশকাত শরীফ)।
পবিত্র বুখারী শরীফের এক হাদীসে আছে, রাসূলে পাক (সাঃ) বলেন, "আল্লাহর একদল ফেরেশতা আছে যাহারা ঘুরিয়া ঘুরিয়া আল্লাহর জেকেরকারীদের অন্বেষণ করেন। যখন তাহারা কোনও দলকে আল্লাহর জেকেররত দেখিতে পান, তখন পরস্পর পরস্পরকে বলেন, "আস, আমাদের কাম্য বস্তু এখানেই। হুজুরপাক (সাঃ) বলেন, "অতঃপর তাঁহারা জেকেরকারীদিগকে আপন ডানা দ্বারা ঘিরিয়া লন, নিকটতম আসমান পর্যন্ত। রাসূলে পাক (সাঃ) আরও বলেন, তখন আল্লাহতায়ালা ফেরেশতাদিগকে জিজ্ঞাসা করেন, "আমার বান্দাগণ কি করিতেছে?” যদিও তিনি জেকেরকারীদের অবস্থা ভালভাবেই জানেন। রাসূলে করীম (সাঃ) বলেন, "তদুত্তরে ফেরেশতারা বলেন, তাহারা আপনার জেকের তথা পবিত্রতা, মহত্ব ঘোষণা, প্রশংসাবাদ ও মর্যাদা বর্ণনা করিতেছে। তখন আল্লাহপাক বলেন, ওরা কি কখনও আমাকে দেখিয়াছে? জবাবে ফেরেশতারা বলেন, "কসম প্রভু! তাহারা কখনও আপনাকে দেখে নাই।” রাসূলে পাক (সাঃ) বলেন, অতঃপর আল্লাহপাক ফেরেশতাদিগকে সাক্ষী রাখিয়া ঐ সমস্ত জেকেরকারীদিগকে ক্ষমা করিয়া দেন। তখন ফেরেশতারা বলেন, "প্রভু! ঐ জেকেরকারী দলের এক ব্যক্তি ঐ দলভুক্ত নহে-সে তাহার নিজ কাজেই সেখানে গিয়াছিল।" আল্লাহপাক বলেন, জেকেরকারীদের খাতিরে তাহাকেও ক্ষমা করিয়া দিলাম।
রাবেতার পরিচয় এবং খোদাপ্রাপ্তির পথে রাবেতার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আলোচনাঃ
তরিকতের দ্বিতীয় রোকনের নাম 'রাবেতা'। রাবেতা কি? চক্ষুদ্বয়কে বন্ধ করিলে প্রিয় ব্যক্তি বা বস্তুর যে আকৃতি বা ছুরাত হৃদয়পটে বা মানস চক্ষে ভাসিয়া উঠে, তাহাই রাবেতা। তরিকতের পরিভাষায়, খেয়ালী চোখের দুই ভ্রুর মাঝে আপন পীরের আকৃতি বা ছুরাতকে কল্পনা করাই রাবেতা।
খোদাপ্রাপ্তির পথে পীরের মহব্বত একান্ত আবশ্যক। পীরের মহব্বত অর্জিত হইলে আল্লাহ ও রাসূলের মহব্বত দেলে পয়দা হয়। নিজের ছেলে-মেয়ে, মা-বাবা, আত্মীয়-স্বজন, সহায়-সম্পদ এবং নিজ জীবনের চেয়েও পীরকে বেশী ভালবাসিতে হয়। নতুবা আল্লাহপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞান হাছিল হওয়া সম্ভব নয়। আর পীরের প্রতি মহব্বত অর্জনের জন্য পীরের ছুরাত বা আকৃতিকে সর্বদা কল্পনা বা খেয়াল করা মুরীদের জন্য একান্তই আবশ্যক।
শয়তান আদম সন্তানের প্রকাশ্য শত্রু। শয়তানের পক্ষ হইতে নাফসে আম্মারা মানব দেহে এক সিপাহসালার'। শয়তান ও নাফস সর্বদাই মানবসন্তানকে আল্লাহবিমুখ করিবার কাজে তৎপর। তাহাদের এই অপতৎপরতা হইতে মুক্ত হইয়া খোদামুখী হওয়া একা একা কাহারো পক্ষে সম্ভব নয়। আল্লাহপাককে দুনিয়ায় থাকিয়াই চিনিয়া লইতে হইবে। পরকালে চিনিবার কোন উপায় নাই। কিন্তু ইহজগতে বান্দা আল্লাহপাককে চিনিবে কেমন করিয়া? আল্লাহতায়ালার কোন মেছাল নাই, উদাহরণ নাই, রূপক নাই, আকার নাই। আল্লাহপাক আকার ও প্রকারবিহীন, অবর্ণনীয় ও অবোধগম্য। তদুপরি শয়তান ও নাফস মানুষকে বিভ্রান্ত করিবার কাজে নিয়োজিত। মানুষকে সর্বদাই শয়তান দুনিয়াবী চিন্তা ও বেহুদা কাজে লিপ্ত রাখে। মানুষের মনকে সর্বদাই অস্থির ও চঞ্চল রাখে।
তাই দেখা যায়, আবেদ যখন ইবাদতে লিপ্ত হয়; ছালেক যখন জেকের, মুরাকাবা বা মোহাছাবায়" লিপ্ত হয়, তাহার মন তখন পাগলা হাতির মত ছুটাছুটি শুরু করে, মনকে উদ্দিষ্ট কর্মে লিপ্ত রাখা সম্ভব হয় না। কাজেই ইবাদতে একাগ্রতা আনয়নের জন্য, মুরাকাবায় খেয়ালকে এককালীন দেল দরিয়ায় ডোবানোর জন্য পীরের তাছাউর বা রাবেতা অর্থাৎ পীরের চেহারা বা ছুরাত কল্পনা করিতে হয়। তরিকতের পীরানে পীরগণ তাই রাবেতাকে খোদাপ্রাপ্তির পথে একটি প্রয়োজনীয় রোকন হিসেবে নির্ধারিত করিয়াছেন। এইরূপ কল্পনা বা খেয়াল করিতে করিতে এক পর্যায়ে মুরীদ বিনা চেষ্টাতেই, যে দিকেই তাকায় সেই দিকেই পীরের ছরাত বা আকৃতি দেখিতে পায়।
পীরের এই ছুরাতকে ছুরাতে মেছালী বলে। যে মুরীদ পীরের ছুরাতে মেছালকে বিনা চেষ্টাতেই সর্বদিকে দেখিতে পায়, সে অতি ভাগ্যবান। খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্ব হাছিল করা তাহার জন্য অতি সহজ হয়। বিনা চেষ্টাতে পীরের ছুরাত বা চেহারা খেয়ালে আসা পীরের প্রতি মুরীদের অতীব মহব্বতের কারণেই সম্ভব হয়। পীরের প্রতি মহব্বতে জাতী পয়দা না হইলে বিনা চেষ্টাতে পীরের ছুরাত খেয়ালে আসা সম্ভব নয়। আর এই মহব্বতে জাতী পয়দা করার জন্যই পীরকে সব কিছুর অধিক, এমন কি নিজ প্রাণাধিক মহব্বত করিতে হয়। যে দিকেই তাকানো যায়, সে দিকেই যদি মুরীদ আপন পীরের ছুরাত দেখিতে পায়, তবে বুঝিতে হইবে যে তাহার রাবেতা-এ-কালব-ফিশ-শেখ হাছিল হইয়াছে, যাহা মারেফাত রাজ্যের প্রধান ফটক বা তোরণ হিসেবে পরিগণিত। লক্ষ লক্ষ মুরীদানের মধ্যে দুই একজনের ভাগ্যে এ নেয়ামত লাভ হয়। এমন মুরীদ সর্বক্ষণই পীরের রাবেতাকে সম্মুখে পায়, এমন কি নামাজের সময়ও।
এমতাবস্থায় কোন কোন মুরীদ শেরেকী হইবে মনে করিয়া পীরের এই ছুরাত বা আকৃতিকে দূরে সরাইতে চেষ্টা করে। কিন্তু ইহা নিতান্তই বোকামী ছাড়া আর কিছু নয়। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব তদীয় মকতুবাত শরীফের ২য় খন্ডের ৩০ নং মকতুবে ইহার চমৎকার ব্যাখ্যা উপস্থাপন করিয়াছেন। উল্লিখিত মকতুবে খাজা মোহাম্মদ আশরাফ হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের নিকট লিখিয়াছেন যে, "রাবেতার নেছবত আমার এত অধিক হইয়াছে যে নামাজের মধ্যেও উহাকে সেজদাস্থল বলিয়া দেখা যাইতেছে। যদি দূর করিতে চাই তাহা হইলেও তাহা দূর হয় না।" ইহার উত্তরে হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) বলেন, "ইহা এক মহা দৌলত। এই রকমের দৌলত বা সম্পদ সৌভাগ্যবানদের ভাগ্যে ঘটে। আপনি কেন ইহাকে নাফী করিতে চান? এই রকম হালওয়ালা মুরীদ আপন ছোহব্বতের দ্বারা পীরের সমস্ত কামালাতকে আকর্ষণ করিয়া লয়।"
দুনিয়ার সমস্ত মোসলমান কাবামুখী হইয়া আল্লাহতায়ালাকে সেজদা করে। কিন্তু কাবাগৃহ বা বায়তুল্লাহকে কেহ সেজদা করে না। বায়তুল্লাহ বা কাবাগৃহ এখানে মজ্জুদ ইলায়হে (অর্থাৎ যাহার দিকে ফিরিয়া সেজদা করা হয়), ইহা মসজুদ লাহু নহে (অর্থাৎ যাহাকে সেজদা করা হয় যেমন আল্লাহ)। এখানে বায়তুল্লাহ বা কাবাগৃহ হইল জাহেরা শরীয়তে বান্দা এবং আল্লাহর মধ্যে রাবেতা। ঠিক তেমনি বান্দার দেল এবং আল্লাহর মধ্যে পীরের ছুরাত হইল রাবেতা। পীরের ছুরাত এখানে মুরীদের দেলের কাবা যেমন আবেদের জাহেরা কাবা হইল বায়তুল্লাহ। এই কারণেই হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব উল্লিখিত মকতুবে খাজা মোহাম্মদ আশরাফকে আরও বলেন যে, "আপনি রাবেতাকে নাফী করিতে চান, মসজিদ বা মেহরাবকে নাফী করেন না কেন?" মসজিদ বা মেহরাবকে নাফী করার যেমন কোন অর্থই হয় না, ঠিক তেমনি রাবেতাকেও নাফী করিবার চেষ্টা করার কোন মানেই হয় না।
হযরত মাছুম কামাল ইবনে মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) বলেন, "এই মুজাদ্দেদীয়া নকশবন্দীয়া তরিকা পীরের রাবেতা ও মহব্বতের ভিত্তিতে সংস্থাপিত। পীরের রাবেতা ও মহব্বত দ্বারা প্রকৃত খোদাঅন্বেষী প্রতি মুহূর্তে পীর হইতে ফয়েজ হাছিল করিয়া থাকে।" যাহার রাবেতা-এ-কালব-ফিশ-শেখ হাছিল হইয়াছে, সে মহা ভাগ্যবান। পীরের উপর আল্লাহপাকের তরফ হইতে যত রকমের ফয়েজ ওয়ারেদ হয়, রাবেতার মাধ্যমে মুরীদ ব্লোটিং পেপারের" মত পীর হইতে সেই ফয়েজের অংশ লাভ করে। রাবেতায়ে মুর্শেদের এই দরজায় মুরীদ পীরের রূহকেই নিজ রূহ মনে করে এবং নিজেকে বিস্মৃত হয়। এই অবস্থায় মুরীদ এক অনাবিল আত্মিক শান্তি বা লজ্জত লাভ করে। মহা কবি হাফেজ বলেন যে, এই লজ্জত বেহেশতেও মিলিবে না। পীরের সহিত মুরীদের মেশামেশির এই পর্যায়ে সর্ব রকমের বিপদে-আপদে, দুঃখ-দুর্দশায় পীর মুরীদকে রূহানী তাওয়াজ্জুহ দ্বারা সাহায্য করিয়া থাকেন। এই ক্ষেত্রে আমার জীবনের একটি ঘটনা তোমাদের বলিতেছি। একবার আমি এনায়েতপুর পাক দরবার শরীফে উরস মোবারকে যোগদানের জন্য আমার বাড়ী শেরপুর হইতে রওয়ানা হই। উরস শরীফ সামনে, তাই আমি প্রচন্ড বৃষ্টির মধ্যেও স্টীমার ধরার জন্য জগন্নাথগঞ্জ ঘাটে যাই।
সেই সময় একদিন পর পর স্টীমার চলিত। তাই সেদিন স্টীমার ছিল না-পাওয়া গেল না। এই দিকে আবহাওয়া ভীষণ খারাপ। প্রচন্ড বৃষ্টি হইতেছিল। সেই বৃষ্টির মধ্যে আমি জগন্নাথগঞ্জ ঘাটে ছুটাছুটি করিতে করিতে ভাবিতেছিলাম কি উপায়ে ঠিক সময়ের মধ্যে দরবার শরীফে পৌছাইব। এই খারাপ আবহাওয়ার মধ্যে কোন নৌকা ছাড়িবে কিনা ছাড়িলেও নিরাপদ হইবে কিনা তাহা ভাবিতেছিলাম। কারণ তখন মাঝে মাঝেই নৌকায় ডাকাতি হইবার খবর পাওয়া যাইত। মাঝি। মাল্লারা নিজেরাও অনেক সময়ে ডাকাতি করিত। যদি কোন ডাকাতের নৌকায় গিয়া উঠি তাহা হইলেইবা উপায় কি হইবে। এই সব ভাবিয়া ভাবিয়া আমি বৃষ্টির মধ্যেই জগন্নাথ গঞ্জের ঘাটে ছুটাছুটি করিতেছিলাম।
এমন সময় আমি দেখিতে পাইলাম-একটা নৌকা হইতে পীর কেবলাজান হুজুর আমাকে ডাকিয়া বলিতেছেন, "বাবা, তাড়াতাড়ি এই নৌকায় ওঠো"। আমি সেই নৌকায় গেলাম। ভাবিলাম, আমার পীর কেবলাজান যখন স্বয়ং ডাকিতেছেন, তখন আর ভয় করিবার কিছু নাই। নৌকার লোকদের জিজ্ঞাসা করিয়া জানিলাম তাহারা সোহাগপুরে যাইবেন। সোহাগপুর ঘাট হইতেই এনায়েতপুর যাইবার পথ ছিল। আমি খুশী হইয়া জিজ্ঞাসা করিলাম, "আপনারা সোহাগপুর গেলে আমাদের কি নিতে পারেন? আমরা সোহাগপুরে যাইব"। তাহারা বলিল, "আমরা সোহাগপুর যাইব। আপনারা গেলে আমরা নেব না কেন"? ঐ নৌকায় করিয়া আমরা ঠিক ঠিক সময় উরস শরীফে পৌঁছাইলাম। এইরূপে বিপদে আপদে কামেল পীর মুরীদকে রূহানী শক্তির দ্বারা রক্ষা করেন।
রাবেতা সম্পর্কে বলিতে গিয়া হযরত আহরার (রঃ) ছাহেব তাঁহার কিতাবে বলেন, "পীরের রাবেতা বা তাছাউর আল্লাহর জেকের হইতে উৎকৃষ্ট।" হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব তদীয় মাকতুবাত শরীফের ১ম খন্ডের ১৮৭ নং মকতুবে ইহার ব্যাখ্যায় বলেন, পীরের ছুরাত বা চেহারার কল্পনা বা তাছাউর অধিকতর উপকারী বলিয়াই হযরত আহরার (রঃ) ছাহেব ইহাকে উৎকৃষ্ট বলিয়াছেন। তাঁহার এই উক্তির তাৎপর্য হইতেছে এই যে, যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহতায়ালার সহিত মুরীদের পূর্ণ সম্পর্ক কায়েম না হইবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তাঁহার জেকের দ্বারা সে পূর্ণ ফায়েদা হাছিল করিতে পারিবে না। তদবস্থায় পীরের ছুরাত বা চেহারার কল্পনা বা রাবেতা তাহার পক্ষে শ্রেয়, যাহা শেষ পর্যন্ত তাহাকে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছাইয়া দিবে, যে পর্যায়ে সে জেকের করিয়া পূর্ণ ফায়েদা লাভ করিবে।
অনেকেরই হয়তো ধারণা হইতে পারে যে, রাবেতা ওলী-আল্লাহদের নব আবিষ্কৃত কোন পদ্ধতি। কিন্তু মোটেই তাহা নয়, ওলী-আল্লাহসকল ধর্মে এই পদ্ধতির নতুন সংযোজন করেন নাই। এই পদ্ধতির শুরু রাসূলে পাক (সাঃ) এর সময় থেকেই। ইহার বহু প্রমাণ হাদীস শরীফে বিদ্যমান, যাহার একটি মাত্র তথ্য এখানে তুলিয়া ধরিতেছি।
একদা রাসূলে পাক (সাঃ) কতিপয় ছাহাবীসহ বসিয়া আপন আপন পছন্দনীয় ব্যক্তি বা বস্তু লইয়া আলাপ-আলোচনা করিতেছিলেন। প্রথমে রাসূলে পাক (সাঃ) বলিলেন যে, "আমার নিকট তিনটি জিনিস বেশ পছন্দনীয়। যথাঃ-
খোশবু বা সুগন্ধি
সতী স্ত্রী
নামাজ বা ছালাত
এই কথা শুনিয়া সাহাবাগণের মধ্যে সর্ব প্রথমে হযরত ছিদ্দিকে আকবর (রাঃ) বলিলেন, "হুজুর, আমার কাছেও তিনটি জিনিস খুবই প্রিয়। আর সেগুলি হইতেছে,
আল্লাহর হাবীব (সাঃ) এর পবিত্র চেহারা মুবারকের দিকে এক দৃষ্টে তাকাইয়া থাকা,
তাঁহার খেদমতে আমার মেয়ে আয়েশা প্রাণপাত করুক-তাহা দেখা। এবং
ইসলাম ধর্মের জন্য আমার জান-মাল কুরবান করা।"
ছিদ্দিকে আকবর (রাঃ) এর পছন্দনীয় উক্ত তিনটি বিষয়, মজলিসে উপস্থিত সাহাবা সকলও পছন্দ করিয়া ভূয়সী প্রশংসা করিলেন। ছিদ্দিকে আকবর (রাঃ) এর উক্ত পছন্দনীয় তিনটি বিষয় আল্লাহপাকেরও পছন্দ হইল। মহান খোদাতায়ালা হযরত জিব্রাইল (আঃ) এর মাধ্যমে তদীয় পছন্দের কথা রাসূলে পাক (সাঃ) কে জ্ঞাপন করিলেন।
হযরত আবুবকর সিদ্দিক (রাঃ) ছাহেব রাসূলে পাক (সাঃ) কে নিজের জীবনের চেয়েও অধিক ভালবাসিতেন। যে যাহাকে ভালবাসে সে তাহাকে স্মরণ করিবে বা খেয়ালী চোখে দেখিবে-ইহা তো স্বাভাবিক কথা। ছিদ্দিকে আকবর (রাঃ) ছাহেবের প্রিয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন রাসূলে করীম (সাঃ)। তাই যতক্ষণ রাসূলে করীম (সাঃ) এর সান্নিধ্যে থাকিতেন; ততক্ষণ তিনি রাসূলে পাক (সাঃ) এর চেহারার দিকে তাকাইয়া থাকিতে সর্বাধিক ভালবাসিতেন। আর রাসূলে পাক (সাঃ) হইতে যতক্ষণ দূরে থাকিতেন, ততক্ষণ যে তিনি তাঁহার প্রিয় ব্যক্তি নবীজীর চেহারা বা বদন মোবারক খেয়ালী চোখে দেখিতেন, ইহাইতো স্বাভাবিক। কারণ রাসূলে করীম (সাঃ)-ই যে তাঁহার সবচেয়ে আপন জন। আলোচ্য এ ঘটনাই রাবেতার জ্বলন্ত প্রমাণ।
হযরত ওয়ায়েছ আল করণী (রাঃ) রাসূলে পাক (সাঃ) কে চর্ম চক্ষুতে দেখেন নাই। কিন্তু মানসচক্ষে বা অন্তর চক্ষুতে তিনি সর্বক্ষণই যে আল্লাহর হাবীব (সাঃ) কে দেখিতেন, তাহা তদীয় জীবনের কিছু ঘটনা থেকেই উপলব্ধি করা যায়।
হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) ইন্তিকালের পূর্বে হযরত উমর ফারুক (রাঃ) ও হযরত আলী (রাঃ) কে অছিয়ত করিয়া যান যে, তাঁহারা যেন তদীয় পবিত্র জুব্বা মুবারক হযরত ওয়ায়েছ করণীর নিকট পৌঁছাইয়া দেন। রাসূলে পাক (সাঃ) এর ইন্তিকালের পর তদীয় অছিয়ত অনুযায়ী হযরত উমর (রাঃ) ও হযরত আলী (রাঃ) হযরত ওয়ায়েছ করণী (রাঃ) কে খুঁজিয়া বাহির করিয়া পবিত্র জুব্বা মুবারক তাঁহার হাতে অর্পণ করেন। এই সময় সাহাবাদ্বয়ের সহিত হযরত ওয়ায়েছ করণী (রাঃ) এর কিছু আলাপ আলোচনা হয়। এক পর্যায়ে তিনি হযরত উমর (রাঃ) কে হুজুর পাক (সাঃ) এর ভ্রু-যুগল যুক্ত ছিল, না পৃথক ছিল-তাহা প্রশ্ন করেন এবং পরে নিজেই উত্তর দিয়া তাঁহাদেরকে অবাক করিয়া দেন। এই ঘটনা হইতে বুঝা যায় যে, রাসূলে পাক (সাঃ) এর পবিত্র চেহারা বা আকৃতি বা রাবেতা হযরত ওয়ায়েছ করণীর অত্মিক দৃষ্টির নিকট দিবালোকের মতই পরিচ্ছন্ন ছিল।
যাহাই হউক, রাবেতার উৎস যে রাসূলে পাক (সাঃ) এর সময় হইতেই ইহাতে আর কোন সন্দেহ থাকার কথা নয়। পরবর্তীতে তরিকতের পীরানে পীরগণ রাবেতাকে খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞান হাছিলের অত্যাবশ্যকীয় অংগ হিসেবে উল্লেখ করিয়াছেন।
কাজেই হে জাকেরান ও আশেকান সকল! তোমরা খেয়ালের চোখে আপন পীরের ছুরাত বা চেহারা ধরিবার চেষ্টা কর। যদি সর্বাবস্থায়, সর্বদিকে, সর্ববস্তুতে আপন পীরের রাবেতা বা চেহারা দেখিতে পাও, তাহা হইলে তোমাদের রাবেতায়ে কালব-ফিশ-শেখ হাছিল হইবে। আর রাবেতায়ে কালব-ফিশ-শেখ অর্জিত হইলে, খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞান লাভ করিতে তোমাদের আর তেমন বেগ পাইতে হইবে না। আমি দু'আ করি; তোমরা সফল হও। আমীন!








