Logo

নকশবন্দীয়া মুজাদ্দেদীয়া খান্দানে প্রচলিত শব্দাবলীর ব্যাখ্যা

profile picture
জনবাণী ডেস্ক
২৩ জুন, ২০২৬, ১৯:২৮
নকশবন্দীয়া মুজাদ্দেদীয়া খান্দানে প্রচলিত শব্দাবলীর ব্যাখ্যা
ছবি: জনবাণী।

খোদাপ্রাপ্তি জ্ঞানের আলোকে শাহ্সূফি হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত তরিকতের পাঁচ রোকন بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ নকশবন্দীয়া মুজাদ্দেদীয়া খান্দানে প্রচলিত কিছু শব্দাবলী (যেমন ওয়াকুফে কালবী, ওয়াকুফে আদ্‌দী, ওয়াকুফে জামানী ইত্যাদি) এর ব্যাখ্যা এবং রাবেতা সম্পর্কে আরও কিছু কথাঃ

বিজ্ঞাপন

নক্শবন্দীয়া মুজাদ্দেদীয়া তরিকার সাধকবর্গ খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞান অর্জনকে পাঁচটি রোকনের উপর অর্থাৎ জেকের, রাবেতা, মুরাকাবা, মোহাছাবা ও শোগলের উপরে নির্ধারণ করিয়াছেন। পীরের নির্দেশিত পথে রোকন সমূহের উপর আমল না করিয়া খোদাতায়ালার সন্তুষ্টি অর্জন করা অসম্ভব। পূর্বের তিনটি নসিহতে তরিকতের পাঁচটি রোকনের উপর আলোচনা করা হইয়াছে। এই পাঁচটি রোকন ছাড়াও আরও কিছু কিছু বিষয় আছে- যে সকল বিষয়ের উপর খোদাতালাশীর বা খোদাঅন্বেষীর আমল করা একান্ত প্রয়োজন। যদিও এই সকল বিষয়ের আমল উল্লিখিত পাঁচ রোকনের আমলেরই অন্তর্ভুক্ত। বিষয়গুলি যথাক্রমে-

  • ওয়াকুফে কালবী,

  • ওয়াকুফে আদ্‌দী

  • বিজ্ঞাপন

  • ওয়াকুফে জামানী,

  • হুশ দর দম,

  • নযর বর কদম,

  • বিজ্ঞাপন

  • ছফর দর ওয়াতান,

  • খেলওয়াত দর আঞ্জুমান,

  • ইয়াদ কর্দ,

  • বিজ্ঞাপন

  • বাজ গাশত,

  • নেগাহ দাশত ও

  • ইয়াদ দাশত।

  • বিজ্ঞাপন

    উল্লিখিত এই শব্দসমূহ নকশবন্দীয়া মুজাদ্দেদীয়া খান্দানে প্রচলিত। এই অধ্যায়ে প্রত্যেকটি শব্দের অর্থ, ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ এবং প্রত্যেকটি অধ্যায়ে করণীয় আমল সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করিতেছি

    ওয়াকুফে কালবীঃ-

    ওয়াকুফে কালবী কি? ওয়াকুফে কালবী হইল, কালব বা দেলকে কায়েম রাখা এবং কালবকে জানা। কালব মানবদেহের এক উপাদান। কালবের মধ্যে খোদাতায়ালার নিদর্শন বিদ্যমান। কালবের মধ্যেই খোদাতায়ালার গুঞ্জায়েশ। খোদাতায়ালাকে চিনিতে হইলে কালব সমুদ্রেই নিমজ্জিত হইতে হয়। কালব সম্পর্কে আল্লাহ পাক হাদীসে কুদসীতে বলেন,

    বিজ্ঞাপন

    لَا يَسْعُنِي أَرْضِي وَ لَا سَمَاءِ وَ لَكِنْ يَسْعُنِي قَلْبُ عَبْدِي الْمُؤْمِنِ.

    অর্থাং-"আসমান-জমিনে কোথাও আমার গুঞ্জায়েশ হয় না-মোমেন বান্দার কালব ব্যতীত।"

    রাসূলে পাক (সাঃ) বলেন, "মানবদেহে এক টুকরা মাংসপিন্ড আছে, যাহা পাক হইলে সমস্ত দেহ বা অজুদ পাক হয়, যাহা নাপাক থাকিলে সমস্ত দেহ বা অজুদই অপবিত্র থাকে। এই মাংসপিন্ডই হইল কালব। তাই কালব সম্পর্কে জ্ঞাত হওয়া তথা ওয়াকুফে কালবী অর্জন করা প্রাথমিক পর্যায়ে প্রত্যেক মুরীদের কর্তব্য। ওয়াকেফ অর্থ জানা বা জ্ঞাত হওয়া।

    বিজ্ঞাপন

    ওয়াকুফে কালবীর দুইটি বৈশিষ্ট্য। যথাঃ দেলকে কায়েম রাখা ও দেলকে জানা। দেলকে কায়েম রাখার উদ্দেশ্য এই যে, দেলকে জেকেরের অভীষ্ট খোদাতায়ালার প্রতি এমনভাবে নিবিষ্ট রাখা যে আল্লাহতায়ালা ভিন্ন অন্য কোন চিন্তা বা ভাবনা যেন দেলে প্রবেশ করিতে না পারে। কালব বা দেলে এক ভিন্ন দুইয়ের কোন অবস্থান নাই। মানুষ আল্লাহকে ছাড়া অন্য কিছু ভালবাসুক-আল্লাহপাক ইহা চান না। মানুষকে সে অধিকারও দেওয়া হয় নাই। এই জন্য আল্লাহর মহব্বত ভিন্ন অন্য কোন কিছুর মহব্বত যেন দেলে না থাকে সে দিকে খোদাতালাশীকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখিতে হয়।

    হযরত মাসুম কামাল (রঃ) ওয়াকুফে কালবী অর্থ লিখিয়াছেন যে, জেকেরকারী আপন কালব বা দেলের প্রতি এমনভাবে দৃষ্টি রাখিবে যে, খোদাতায়ালা ভিন্ন অন্য কোন বিষয়, ব্যক্তি বা বস্তুর ধারণা বা নকশা যেন দেলের মধ্যে প্রবেশ করিতে না পারে। ইহাই দেল বা কালবকে কায়েম রাখা।

    বিজ্ঞাপন

    হযরত শামছুল কওনায়েন ছাহেব বলেন, "আরবী ভাষায় তোগরা অক্ষরে 'আল্লাহ' নাম লিখিলে যে রূপ দেখা যায়, মানবদেহস্থিত কালব অনেকটা সেইরূপ। অর্থাৎ কালব আল্লাহর জাতি নামের অনুরূপ। এই বিষয় জ্ঞাত হওয়াও ওয়াকুফে কালবীর পর্যায়ভুক্ত। ওয়াকুফে কালবীর পর্যায়ে মুরীদের কর্তব্য একমাত্র আল্লাহকেই দেলে স্থান দেওয়া। আল্লাহ আল্লাহ জেকের হইতেছে-সর্বদা ইহা খেয়াল করা। এইরূপ খেয়াল করিতে করিতে হুজুরী কালবী হাছিল হয়। হুজুরী কালব বা হুজুরী দেলে নামাজ আদায় করিলে নামাজ কবুলিয়তের যোগ্যতা পায়। যতক্ষণ পর্যন্ত হুজুরী কালবী হাছিল না হইবে ততক্ষণ পর্যন্ত নামাজ গ্রহণযোগ্য হয় না। রাসূলে পাক (সাঃ) বলেন,

    لا صلوةَ إِلَّا بِحُضُورِ الْقَلْبِ

    অর্থাৎ-"নামাজই নয় হুজুরী দেল ব্যতীত।"

    বিজ্ঞাপন

    এই জন্যই নামাজের পূর্বে নামাজীদের উদ্দেশ্যে বলিয়া দেওয়া হয়ঃ খেয়াল কালবে, কালব আল্লাহর দিক, আল্লাহ হাজের-নাজের; খেয়াল কালবে ডুবাইয়া আল্লাহতায়ালাকে হাজের-নাজের ওয়াহেদ জানিয়া হুজুরী কালবে সেজদা করাই "আচ্ছালাতু মেরাজুল মো'মিনীন।" কাজেই ওকুফ কালবী ছাড়া হুজুরী কালবী অর্জন সম্ভব নয়। আবার হুজুরী কালবী ব্যতীত নামাজে মেরাজের ঘ্রাণ পাওয়া যায় না। এই কারণে সর্ব প্রথমে ওয়াকুফে কালবী অর্জনে প্রত্যেক মুরীদকেই সচেষ্ট হইতে হয়।

    ওয়াকুফে আদ্দীঃ-

    বিজ্ঞাপন

    পীরে কামেল প্রথমে মুরীদের লতিফা কালবে, তৎপর অন্যান্য লতিফায় এসমে জাত জেকেরের ছবক দেন। ছয় লতিফায় এসমে জাত জেকের জারী হওয়ার পর পীরে কামেল তসংগে সংযোজন করান নাফী-এসবাত জেকের। এই নাফী-এসবাত জেকের প্রথমে ছয় লতিফায় চলিতে থাকে। তৎপর পীরে কামেল মুরীদের অন্যান্য চার লতিফা আব, আতস, খাক, বাদ-এ এই নাফী-এসবাত জেকেরের ছবক দেন। ফলে দশ লতিফায় মহা ধুমধামের সহিত নাফী-এসবাত জেকের-কলেমা 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ'-চলিতে থাকে। আপন পীর মুরীদকে বেজোড় সংখ্যায় তথা তিন, পাঁচ, সাত, নয় ইত্যাদিতে নাফী-এসবাত জেকের করিবার পদ্ধতি শিক্ষা দেন।

    নাফী-এসবাত জেকেরঃ

    প্রথমে নাভি হইতে 'লা' ঊর্ধ্ব দিকে দম টানিয়া সাত তলা আসমানের উপর আরশ পর্যন্ত উঠাইতে হয়, তৎপর "ইলা-হা" রূহে ও ছেরের ভিতরে সংযোগ করিয়া "ইল্লাল্লাহ” শব্দকে খফি ও আখফার ভিতর দিয়া মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ বলিয়া মূলকেন্দ্র কালব-এ দম ফেলিতে হয়। এই ভাবে দম বন্ধ করিয়া তিনবার, পাঁচবার, সাতবার জেকের করিতে করিতে একুশ (২১) বার পর্যন্ত দম বন্ধ করিয়া জেকের করা শিক্ষা করিতে হয়। বেজোড় সংখ্যার দিকে সদা লক্ষ্য রাখিতে হয়। পীরের নির্দেশিত পথে বেজোড় সংখ্যায় দম বন্ধ করিয়া জেকের করাই ওয়াকুফে আদদী। বেজোড় সংখ্যা আল্লাহর পছন্দনীয়। হাদীছে বর্ণিত আছে,

    إِنَّ اللَّهَ وِتْرٌ وَ يُحِبُّ الْوِتْرَ -

    অর্থাৎ-"নিশ্চয় আল্লাহপাক বেজোড়, তিনি বেজোড়কে ভালবাসেন।" জেকেরের সময় বেজোড় সংখ্যার প্রতি তাই খেয়াল রাখিতে হয়, যাহা ওয়াকুফে আদ্দী হিসাবে পরিগণিত।

    উল্লিখিত নিয়মে জেকের করিতে করিতে ছালেক বা মুরীদের এমন অবস্থা হয় যে, নিজ দেহের প্রত্যেক লতিফায়, প্রত্যেক অনু-পরমাণুতে জেকেরের নূর পয়দা হয়। মুরীদ নিজ কর্ণে সে জেকেরের শব্দ অবিরত শুনিতে পায়। তাহার ইহাও মনে হয় যে, আসমান জমিন ব্যাপী নাফী-এসবাত জেকেরের চাকা ঘুরিতেছে। এই জেকেরের প্রবল বানে (স্রোতে) মুরীদের দেলের গোনাহের পাহাড়, গোনাহের তাছির, গোনাহের অন্ধকার, গোনাহের যুলমত সবই বিদূরিত হয়। এক পর্যায়ে মুরীদ ফানার মোকাম হাছিল করে।

    ওয়াকুফে জামানীঃ-

    তরিকতের পীরানে পীরগণ ওয়াকুফে জামানীর দ্বিবিধ অর্থ করিয়াছেন। (ক) দম বা শ্বাস গ্রহণ ও শ্বাস ত্যাগের প্রতি লক্ষ্য রাখা এবং (খ) সারাদিনের কৃত কর্মের প্রতি দৃষ্টি রাখা। ইহা মোহাছাবার অনুরূপ। সারাদিনের প্রতিটি কর্ম, প্রতিটি কথা, প্রতিটি পদক্ষেপ, এমনকি প্রতিটি শ্বাস বা প্রশ্বাসকে বিচার করিয়া দেখা। অংগ-প্রত্যংগ বা ইন্দ্রিয়সমূহ আল্লাহর আদেশ-নিষেধের অনুকুলে চলিলে খোদাতায়ালার শোকরিয়া আদায় করা। আর আদেশ-নিষেধের বিপরীতে চলিলে বা আদেশ-নিষেধ লংঘন করিলে মহান খোদাতায়ালার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করা। মোহাছাবার অধ্যায়ে ইহার বিস্তারিত আলোচনা করা হইয়াছে।

    হুশ দর দমঃ-

    প্রত্যেক নিঃশ্বাস বা দমের প্রতি এমনই সতর্ক থাকা যেন একটি শ্বাসও আল্লাহর জেকের বিনা গ্রহণ বা ত্যাগ করা না হয়। ইহাই হুশ দর দম। পরকালে প্রত্যেকটি শ্বাস প্রশ্বাসের হিসাব দিতে হইবে। তাই প্রত্যেক দমের প্রতি খেয়াল রাখা এই তরিকার এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য। প্রত্যেক নিঃশ্বাসে আল্লাহকে খেয়াল রাখিলে, যে নিঃশ্বাসেই তোমার ইন্তিকাল হউক না কেন, তোমার খাতেমা-বিল-খায়ের হইবে। তুমি ঈমান লইয়া মরিতে পারিবে। আর এমন একটি শ্বাস গ্রহণ বা ত্যাগের সময় যদি তোমার মৃত্যু হয়, যখন তুমি আল্লাহর জেকের থেকে গাফেল ছিলে, তাহা হইলে, খাতেমা-বিল-খায়ের তোমার নসিব হইবে না। তুমি বেঈমান বলিয়া চিহ্নিত হইবে। এই কারণে আল্লাহর আশেক সকল আজীবন খোদার দরবারে ক্রন্দন করিয়াছেন, যেন শেষ নিঃশ্বাস আল্লাহর ইয়াদের সহিত বাহির হয়।

    তুমি যদি শত বছরও কঠিন বন্দেগী কর, যদি তোমার শেষ নিঃশ্বাস আল্লাহর ইয়াদের সহিত বাহির না হয়, তবে সারা জীবনের সমস্ত ইবাদতই তোমার বরবাদ হইবে। শেষ নিঃশ্বাসের মূল্যই তাই সর্বাধিক। আর শয়তানেরও লক্ষ্য তোমার ঐ শেষ নিঃশ্বাসের প্রতি। এই কারণেই ইনতিকাল মুহূর্তে শয়তান মানুষের ঈমান নষ্ট করিবার জন্য কত শত রূপেই যে হাজির হয়, কত শত পথেই যে ছলনা দেওয়ার চেষ্টা করে-তাহার হিসাব নাই। শয়তানের সেই ছলনা বা কু-মন্ত্রনা থেকে বাঁচিবার জন্যই প্রত্যেক দমে জেকের করিবার ক্ষমতা অর্জন করিতে হয়।

    আল্লাহর জেকের ছাড়া দুনিয়ার সবই মূল্যহীন। উল্লেখ্য, শরীয়তের নির্ধারিত সকল ইবাদতই আল্লাহর জেকেরের অন্তর্ভুক্ত। কাজেই শয়তানের ধোকা থেকে বাঁচিতে হইলে প্রত্যেক দমে আল্লাহকে স্মরণ করার ক্ষমতা অর্জন করিতে হইবে। তাহা হইলে শেষ নিঃশ্বাসেও শয়তান তোমাকে বিভ্রান্ত করিতে পারিবে না। তাই তোমরা যদি 'খাতেমা-বিল-খায়ের লাভ করিতে চাও, তবে প্রত্যেক নিঃশ্বাসের প্রতি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখ। দমে দমে আল্লাহকে স্মরণ কর-তবেই কল্যাণ।

    নজর বর কদমঃ-

    চলাফেরা করিবার সময় দৃষ্টিকে আপন কদমের দিকে রাখা এবং বসা বা উপবিষ্ট অবস্থায় দৃষ্টিকে সম্মুখে রাখা। চলাফেরা করিবার সময় এদিক-সেদিক তাকানো উচিৎ নয়, কারণ এদিক সেদিক দৃষ্টি নিক্ষেপ করিলে বিভিন্ন জিনিসের নকশা বা ছবি দেলের মধ্যে প্রতিফলিত হয়। ফলে দেল সহসাই আল্লাহ বিমুখ হয়। তাহা ছাড়া নিষিদ্ধ দৃশ্যের প্রতি দৃষ্টিপাত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আর নিষিদ্ধ দৃশ্যের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ শয়তানের অসংখ্য তীরের মধ্যে বিষাক্ত এক তীর, যে তীরের আঘাতে ছালেকের দেল মারা যায়, দেল দুনিয়ার প্রেমে মত্ত হয়। এই কারণে তরিকাপন্থীকে মাথানিচু করিয়া, দৃষ্টিকে সম্মুখ পানে রাখিয়া পথ চলিতে হয়।

    কিন্তু যাহারা উরুজ (উর্ধ্বগমন)-রত, তাহাদের ক্ষেত্রে নজর বর কদমের ভিন্ন অর্থ গ্রহণ করিতে হয়। উরুজ ও ছায়েরের সময় আপন পীর মুরীদকে লইয়া বিভিন্ন অদৃশ্য জগত ভ্রমণ করান। এ ক্ষেত্রে প্রতি পদক্ষেপে আপন পীরকে অনুসরণ করিতে হয়। এই ভাবে উরুজ করিতে করিতে ছালেক নিজে যে নবী (আঃ) এর অনুসারী তাঁহার পদতলস্থ সীমা পর্যন্ত উপস্থিত হয়। অতঃপর কদমী ছায়ের সমাপনান্তে, নজরীয়া ছায়েরের মাধ্যমে উরুজ ও ছায়ের করিয়া উপরোক্ত রূপে ছালেক নিজ নবী (আঃ) এর নজরের উন্নতির সীমা পর্যন্ত পৌঁছায়। এখানে উল্লেখ্য যে, অনুসরণের দিক দিয়া এক একজন ছালেক এক একজন নবীর অনুসরণকারী।

    কেউবা হযরত মুসা (আঃ) এর অনুসারী, কেউবা হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর অনুসারী, কেউবা হযরত ঈসা (আঃ) এর অনুসারী। আবার কেউবা হযরত রাসূলে-করীম (সাঃ)-এর অনুসারী। যিনি রাসূলে করীম (সাঃ) এর পরিপূর্ণ অনুসারী তাহাকে "মুহাম্মদী মাশরার" বলা হয়। তিনি উরুজের সময় প্রতি কদমে রাসূলে করীম (সাঃ) এর অনুসরণ করিয়া সর্বশেষ স্তরে পৌঁছান। আবার যিনি হযরত মুসা (আঃ) এর অনুসারী, তিনি উরুজের সময় প্রতি পদক্ষেপে হযরত মুসা (আঃ) কে অনুসরণ করিয়া তাঁহার পদতলস্থ সীমা পর্যন্ত উরুজ করিয়া পরে কুওতে নজরীয়ার উন্নতির মাধ্যমে নিজ নবীর নজরের সীমা পর্যন্ত ছায়ের করেন।

    ছফর দর ওয়াতানঃ-

    ছফর দর ওয়াতান অর্থ স্বদেশে ভ্রমণ করা। মানুষ খোদাতায়ালা হইতে আসিয়াছে, খোদাতায়ালার নিকটেই তাহাকে ফিরিয়া যাইতে হইবে। খোদাতায়ালার দিকে ছালেকের ছফরকে 'ছফর দর ওয়াতান' বলে। এই ছায়ের পীরের তাওয়াজ্জুয়ে এত্তেহাদীর ফলে মুরীদের পক্ষে সম্ভব হয়। পীরের তাওয়াজ্জুয়ে এত্তেহাদীর প্রয়োগে মুরীদের মাথার চান্দি হইতে পায়ের তলা পর্যন্ত তেত্রিশ কোটি লতিফাই জাগ্রত হয়। অতঃপর মুরীদের রূহ ঊর্ধ্বদিকে উরুজ করে ও নূরময় জগতে প্রবেশ করেন।

    বিশাল নূরময় জগত পার হইয়া মুরীদের রূহ আল্লাহতায়ালার সিফাতে এরাদতে ফানা হয়। অতঃপর মুরীদের রূহে বেমেছালীর ছুরাত ঊর্ধ্বে উরুজ করিয়া আকরাবিয়াত, মহব্বতে আওয়াল, মহব্বতে ছানী অতিক্রম করিয়া কাওছের মোকামে পৌঁছায়। কাওছের মোকামে "ওজুদ মাওহুব লাহু” নামক খোদাপ্রদত্ত এক বিশেষ শরীর মুরীদ বা ছালেক প্রাপ্ত হয়, যাহার মাধ্যমে উরুজ ও ছায়ের করিয়া খোদাতায়ালার সান্নিধ্য পর্যন্ত পৌঁছায় এবং খোদাতায়ালার স্বভাব অর্জন করিবার ক্ষমতা প্রাপ্ত হয়।

    খেলওয়াৎ দর আঞ্জুমানঃ-

    ইহার অর্থ সভা, মিটিং, মাহফিল বা লোক জন পরিবেষ্টিত অবস্থায় খোদাতায়ালা হইতে গাফেল না হওয়া। ছালেক বা মুরীদের প্রকাশ্য অবস্থা মানুষের সহিত জড়িত থাকিবে কিন্তু অন্তর বা কালব খোদাতায়ালার স্মরণে মগ্ন থাকিবে। অর্থাৎ প্রকাশ্যে বিভিন্ন কাজে রত থাকিলেও কালব বা অন্তর আল্লাহমুখী রাখিতে হইবে। এই প্রসংগে আল্লাহ পাক পবিত্র কুরআনে বলেন,

    وَاذْ كُرِ اسْمَ رَبِّكَ وَ تَبَتَّلْ إِلَيْهِ تَبْتِيلاً

    অর্থাং-"তোমার প্রতিপালকের নামের জেকের কর এবং অন্যান্য দিক হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া তাহার দিকে সম্পূর্ণ মুতাওয়াজ্জুহ হও।" (সূরা মুযাম্মিলঃ ৮) মহান খোদাতায়ালা পবিত্র কুরআনে আরও বলেন,

    رِجَالٌ لا تُلْهِيهِمْ تِجَارَةٌ وَلَا بَيْعٌ عَنْ ذِكْرِ اللَّهِ

    অর্থাৎ- "এমন অনেক ব্যক্তি আছে যাহাদিগকে ব্যবসা বাণিজ্য, এমন কি ক্রয়-বিক্রয়ও আল্লাহর জেকের হইতে গাফেল করিতে পারে না।" (সূরা নূরঃ ৩৭)

    খাজা আউলিয়া কবির (রঃ) বলেন, ছালেক কালবে জেকেররত অবস্থায় বাজারে গমন করিলে যদি কাহারও শব্দ তাহার কর্ণে প্রবেশ না করে তবে তাহার সেই অবস্থাকে "খেলওয়াৎ দর আঞ্জুমান" বলা হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে মুরীদের ইহা কষ্টকর মনে হইলেও পীরের তাওয়াজ্জুতে এক পর্যায়ে এই কাজ তাহার নিকট সহজ হয়।

    উচ্চস্তরের ছালেক সর্বদাই খেলওয়াৎ দর আঞ্জুমানের হাল বা অবস্থায় থাকেন। তাঁহারা প্রকাশ্যে যত লোকের সাথে যত রকমের আলাপ আলোচনাতেই রত থাকেন না কেন, তাঁহাদের অন্তর সর্বদাই আল্লাহমুখী থাকে। তাঁহারা সর্বদাই বিভিন্ন লতিফার জেকেরে মগ্ন থাকেন।

    ইয়াদ কর্দঃ-

    এয়াদ কর্দ অর্থ সর্বদাই আল্লাহর জেকেরে মশগুল থাকা। মুখে হউক বা দেলে হউক আল্লাহর জেকের থেকে গাফেল না হওয়া। শয়তান মানুষের প্রকাশ্য দুশমন। সে মানুষের প্রতি তন্ত্রিকে পর্যন্ত ঘেরাও করিয়া রাখিয়াছে। সে কোন ক্রমেই মানুষকে খোদামুখী হইতে দিবে না। শয়তানী ওয়াসওয়াসা বা নাফসের কু-মন্ত্রনা যেন আল্লাহ থেকে গাফেল করিতে না পারে, সর্বদাই সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখাই "ইয়াদ কর্দ।"

    বাজ গান্তঃ-

    পীরের নির্দেশিত পথে নাফী-এসবাত জেকের করিতে হয়। নাফী-এসবাত জেকের ব্যতীত উরুজ-ছায়ের, ফানা-বাকা সিদ্ধ হয় না। বাকা সিদ্ধ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত প্রত্যেক দায়েরাতেই নাফী-এসবাত জেকের করিতে হয়। কিছুক্ষণ জেকের করিবার পর তিনবার বা পাঁচবার অতীব মহব্বতের সহিত এই দু'আ পড়িতে হয়, "হে খোদা! আপনিই আমার মকছুদ, আমি আপনারই জন্য দুনিয়া ও আখেরাত ত্যাগ করিয়াছি। আমাকে আপনার মহব্বত ও মারেফাত দয়া করিয়া দান করুন।"

    হযরত শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ (রঃ) ছাহেব বলিয়াছেন, "জেকেরের সময় মাঝে মাঝে উপরোক্ত মোনাজাত করা একটি বড় শর্ত। জেকেরের সময় ছালেকের জন্য এই দু'আ হইতে গাফেল থাকা কখনও উচিৎ নয়, কেননা আমি যাহা কিছু পাইয়াছি সবই উহারই বরকতে।" জেকেরের মাঝে মাঝে এইরূপ মুনাজাত বা দু'আ করাই বাজ গান্ত।

    নেগাহ দাপ্তঃ-

    নেগাহ্ দাশ্ত শব্দের অর্থ দৃষ্টি রাখা। তরিকতের পরিভাষায় জেকের, ফেকের, মুরাকাবা, মোশাহাদার মাধ্যমে মারেফাত সম্পর্কে যে এলেম বা জ্ঞান ছালেকের হাছিল হয়, সে দিকে দৃষ্টি রাখা। প্রাথমিক পর্যায়ে মুরীদ মুরাকাবা ও মোশাহেদার মাধ্যমে তেমন কিছুই বুঝিতে পারে না। তাই শুধুমাত্র জেকেরের প্রতি তাহাকে খেয়াল রাখিতে হয়।

    মাধ্যমিক পর্যায়ে ছালেক জেকের, মুরাকাবা ও মোশাহেদার মাধ্যমে অদৃশ্য জগতের যে জ্ঞান অর্জন করে, সে দিকে দৃষ্টি রাখিতে হয়। আর যে ছালেক পরিপক্ক তাহাকে জেকের, ফেকের, মুরাকাবা বা মোশাহেদার মাধ্যমে অর্জিত খোদাতত্ত্বজ্ঞানের প্রতি সতত দৃষ্টি রাখিতে হয়।

    ইয়াদ দান্তঃ-

    জেকের, মুরাকাবা, মোকাশাফা ও মোশাহেদার মাধ্যমে পরিপক্ক ছালেক খোদাতায়ালা সম্বন্ধে যে ব্যাপক জ্ঞান অর্জন করে, কখনও আর এই জ্ঞানের লাঘবতা হয় না। এই অবস্থাই ইয়াদ দাশত। ইহা নেগাহ্ দান্তের চরম পর্যায়। কেহ কেহ ইয়াদ দান্ত অর্থ বিনা ব্যবধানে খোদাতায়ালার উপস্থিতিকে বোঝাইয়াছেন। ইয়াদ দান্তের একাধিক স্তর রহিয়াছে।

    হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব তদীয় 'মাবদা ওয়া মা'আদ" পুস্তকে বলেন যে, ইয়াদ দান্ত অর্থ হইল জাতে হকতায়ালার সর্বক্ষণ হুজুরী বা নৈকট্য। ইহার তিনটি স্তর আছে।

    প্রথম স্তরঃ-

    কালব পরিচ্ছন্ন হওয়ার পর খোদাতায়ালার হুজুরী সর্বক্ষণ লাভ করা সম্ভব। কিন্তু এই অবস্থা ইয়াদ দান্তের ছুরাত।

    দ্বিতীয় স্তরঃ-

    ইহা ইয়াদ দান্তের হকিকত। ইহা নাফসের পবিত্রতা ও কালবের বিশুদ্ধতা অর্জনের পরেই হাছিল হয়।

    হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) বলেন, যদি জাতে হকের অর্থ মর্তবায়ে ওজুব গ্রহণ করা হয়, যাহার ফলে জাত পাক সমস্ত সিফাতে ওজুবীয়ার সমন্বয়কারী হন, এমতাবস্থায় আলমে খালক ও আলমে আমরের স্তর সমূহ অতিক্রম করার পরে, এই ধরনের শহুদ বা দর্শন হাছিলের সাথে সাথেই ইয়াদ দান্ত হাছিল হয়।

    কিন্তু জাতে হকতায়ালার অর্থ যদি জাত মোজাররাদা নেওয়া হয়, যাহা সর্ব প্রকার এসম, সিফাত, শান, শয়ুনাত, ইতেবার থেকে মুক্ত। এমতাবস্থায় ইয়াদ দান্ত হাছিল সর্বপ্রকার এসম, সিফাত, নেছবত ও ইতেবারের স্তর অতিক্রম করিবার পরেই সম্ভব হইতে পারে। ইহাই ইয়াদ দাশতের তৃতীয় স্তর।

    এতক্ষণ নকশবন্দীয়া মুজাদ্দেদীয়া তরিকায় ব্যবহৃত যে সকল শব্দাবলী এবং ইহাতে অন্তর্নিহিত আমল সম্পর্কে আলোচনা করা হইল, তাহা সমুদয়ই তরিকতের বিশিষ্ট রোকন মোহাছাবার অন্তর্ভুক্ত।

    খোদাপ্রাপ্তির পথে ছালেক বা মুরীদকে সমস্ত বিষয়ের হিসাব-নিকাশ করিয়া চলিতে হয়, নতুবা পথভ্রষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। অবশ্য চুলচেরা হিসাব-নিকাশের ক্ষমতা পীরে কামেলের খেদমত ব্যতীত অর্জিত হওয়া সম্ভব নয়। পীরে কামেলের খেদমতে জান-মাল নেছার করিলে, পীরকে সবকিছুর চেয়ে বেশী ভালবাসিতে পারিলে, খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্ব হাছিল করা যায়। উল্লিখিত বিভিন্ন গুণাবলী আপনা থেকেই তখন দেহের মধ্যে পয়দা হয়। প্রতি নিঃশ্বাসে, এমনকি প্রতি মুহূর্তে কোটি কোটি মুখে জেকের করিবার অপূর্ব ক্ষমতা জন্মে।

    কাজেই তোমরা যদি খোদাতায়ালাকে চিনিতে চাও, অদৃশ্য জগতের বিচিত্র লীলাখেলা যদি দেখিতে চাও, তাহা হইলে পীরের হাতে তেমন থাক, যেমন ধৌতকারীর হাতে মুর্দা থাকে। পীর যখন যাহা বলেন, বিনা দ্বিধায় তাহা পালন কর। পীরের হুকুমকে তোমার বিবেক দ্বারা যাচাই করিতে যাইও না। তাহা হইলে পথভ্রষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকিবে।

    নক্শবন্দীয়া মুজাদ্দেদীয়া ছেলছেলার ৭ম পুরুষ হযরত আবুল হাসান আলী খেরকানী (রঃ) ছাহেবের জীবন হইতে নেওয়া একটি ঘটনা এখানে তুলিয়া ধরিতেছি। একবার একদল লোক বাণিজ্য উপলক্ষ্যে ছফরে যাত্রাকালে হযরত আবুল হাসান আলী খেরকানী (রঃ) ছাহেবের খেদমতে হাজির হইয়া বলিল, "হযরত! আমাদের রাস্তা বিপদসংকুল, পথে দস্যুর ভয় আছে, আমাদিগকে এমন কিছু উপদেশ দিন যাহাতে আমরা পথে বিপদ-আপদ হইতে নিরাপদে থাকিতে পারি।" তিনি বলিলেন, "তোমরা কোন বিপদে পড়িলে আবুল হাসানকে স্মরণ করিও।" সেই দলের লোকেরা এই কথাটি পছন্দ করিল না, তাহারা তাহাদের উদ্দেশ্যস্থলের দিকে রওয়ানা দিল।

    ঘটনাক্রমে পথে ডাকাতের দল তাহাদেরকে আক্রমণ করিল এবং তাহাদের ধনমাল লুণ্ঠন করিয়া লইয়া যাইতে শুরু করিল। যাত্রীদলের একজন মাত্র লোকের হঠাৎ হযরত আবুল হাসান খেরকানী (রঃ) ছাহেবের উপদেশের কথা অর্থাৎ "বিপদে পড়িলে আবুল হাসানকে স্মরণ করিও" -এই কথা মনে পড়িয়া গেল। লোকটি সংগে সংগে হযরত খেরকানী (রঃ) ছাহেবকে স্মরণ করিল। স্মরণ করা মাত্রই সে ডাকাতের দৃষ্টি হইতে অদৃশ্য হইয়া গেল। ডাকাতেরা চিৎকার করিয়া বলিতে লাগিল, "ইহা তো বড়ই আশ্চর্যের ব্যাপার। একজন লোকের ধনমাল আমরা লুণ্ঠন করিতে আরম্ভ করিব। এমন সময় হঠাৎ সে তাহার মাল ও সাওয়ারীসহ কোথায় যেন অদৃশ্য হইয়া গেল, তাহাকে আর খুঁজিয়াই পাওয়া যাইতেছে না।" মোট কথা, সেই লোকটিই শুধু ডাকাতের হাত হইতে রক্ষা পাইল, অন্যান্য সকলেই লুষ্ঠিত হইল। ডাকাতের দল চলিয়া যাওয়ার পরে যাত্রীদের লোকেরা সেই লোকটিকে সম্পূর্ণ নিরাপদ অবস্থায় দেখিতে পাইল। তাহারা জিজ্ঞাসা করিল, তুমি কোথায় চলিয়া গিয়াছিলে যে, তুমি সম্পূর্ণ নিরাপদ রহিলে? সে বলিল, আমি হযরত আবুল হাসান খেরকানী (রঃ) ছাহেবের উপদেশমত তাঁহাকে স্মরণ করিয়াছিলাম। অতঃপর সে সমস্ত ঘটনা বিশদভাবে বলিল।

    সেই যাত্রীদল হযরত খেরকানী (রঃ) এর নিকট ফিরিয়া আসিয়া জিজ্ঞাসা করিল, "হযরত! দয়া করিয়া আমাদিগকে বলুন, ইহার রহস্য কি? আমরা সকলে আল্লাহতায়ালাকে ডাকিতেছিলাম কিন্তু রক্ষা পাইলাম না। আর এই ব্যক্তি আপনাকে স্মরণ করিয়া রক্ষা পাইল।" তিনি বলিলেন, "তোমরা তো আল্লাহতায়ালাকে শুধু মুখে ডাক, অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে ডাক না; পক্ষান্তরে আবুল হাসান অন্তরের অন্তঃস্থল হইতে ডাকে। কাজেই তোমরা আবুল হাসানকে স্মরণ কর। তাহা হইলে আবুল হাসান তোমাদের জন্য আল্লাহতায়ালাকে ডাকিবে এবং তোমরা নিজেদের উদ্দেশ্য হাছিলে সফলকাম হইবে। কেননা, অন্তর হইতে না ডাকিয়া শুধু মুখে অভ্যাস অনুযায়ী সহস্রবারও যদি আল্লাহকে ডাক, তবে কোন ফলই হইবে না।" কাজেই পীর যখন যে পথে চলিতে নির্দেশ দেন, তাহাই কর। তাহা হইলে মাঞ্জিলে মাকছুদে সহজে পৌঁছাইতে পারিবে। এই কারণেই মহাকবি হাফেজ বলিয়াছেন,

    "বমায়ে সাজ্জাদা রংগীকুন গারব পীরে মগা গুইয়েদ, কে ছালেক বেখবর না-বুয়াদ যে রাহ ও রেসমে মঞ্জেল হা।"

    অর্থাৎ-তোমার পীর যদি তোমাকে শরাব দিয়া জায়নামাজ ধুইয়া তদ্‌ উপরে নামাজ পড়িতে বলেন, তুমি তাহাই কর, কারণ মোকাম মঞ্জিলের খবর তোমার চেয়ে তোমার পীরই ভাল জানেন।

    দেখ, একদা হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেব তদীয় এক মুরীদসহ কোথাও যাইতেছিলেন। পথি মধ্যে এক নদী পড়িল। কিন্তু পারাপারের কোন ব্যবস্থা ছিল না। অথচ নদী পার হইতে হইবে। হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেব তদীয় মুরীদকে বলিলেন, "বাবা, তুমি আমাকে ধরিয়া 'বায়েজীদ' 'বায়েজীদ' বলিতে থাক। আর আমি মহান খোদাতায়ালাকে স্মরণ করি। তাহা হইলে আমরা পানির উপর দিয়া হাঁটিয়া নদী পার হইতে পারিব।" মুরীদ তাহাই করিলেন। সে 'বায়েজীদ', 'বায়েজীদ' বলিতে লাগিল। হযরত বায়েজীদ মুরীদকে লইয়া পানির উপর দিয়া হাঁটিয়া চলিতে লাগিলেন। নদীর মাঝামাঝি স্থানে আসিবার পরে মুরীদের হৃদয়ে এক ওয়াসওয়াছা আসিল। সে ভাবিল, "আমি কেন 'বায়েজীদ', 'বায়েজীদ' বলিতেছি? আল্লাহ আল্লাহ বলি না কেন?" ইহা ভাবিয়াই পীরের নির্দেশকে অমান্য করিয়া 'বায়েজীদ', 'বায়েজীদ' বলা বিরতি দিয়া আল্লাহ আল্লাহ বলা শুরু করিল।

    আর সংগে সংগে নদীতে তলাইয়া যাওয়ার উপক্রম হইল। মুরীদ চিৎকার দিয়া বলিল, "হুজুর! "আমি কেন তলাইয়া যাইতেছি?" হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেব তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, "তুমি কি বলিতেছিলে?" মুরীদ বলিল, আমি বায়েজীদ, বায়েজীদ বলা বাদ দিয়া আল্লাহ আল্লাহ বলিতেছিলাম।" ইহা শুনিয়া হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেব বলিলেন, "আল্লাহকে ধরিয়াছি আমি। তুমি ধর আমাকে। তাহা হইলে তুমি রক্ষা পাইবে।" মুরীদ তখন পুনরায় 'বায়েজীদ' 'বায়েজীদ' বলা শুরু করিল এবং বিনা ক্লেশে নদী পার হইয়া গেল।

    আলোচ্য দুইটি কাহিনীতে বুঝা যায় যে, বিপদে আপদে মুরীদ আপন পীরকে স্মরণ করিলে বিপদ থেকে উদ্ধার পায়। ইহাকে অনেকেই শেরেকী মনে করিতে পারে। কিন্তু ইহা শেরেকী নয়। কেননা খোদাপ্রাপ্তির পথে মূল তিনটি অধ্যায় আছে।

    খোদাপ্রাপ্তির পথে তিনটি স্তরঃ

    • ফানা-ফিশ-শেখ বা রাবেতায়ে কালব-ফিশ-শেখ।

  • ফানা-ফির-রাসূল। এবং

  • ফানা-ফিল্লাহ।

  • যতক্ষণ পর্যন্ত ফানা-ফিশ-শেখ বা রাবেতায়ে কালব-ফিশ-শেখ হাছিল না হইবে, ততক্ষণ পর্যন্ত ফানা-ফির রাসূল বা ফানা-ফিল্লাহর দরজায় উপনীত হওয়া যাইবে না। রাবেতায়ে কালব-ফিশ-শেখ হাছিল না হওয়া পর্যন্ত আল্লাহর জাত, সিফাত বা আফয়াল-কোনটা সম্পর্কেই জ্ঞান অর্জন সম্ভব হবে না, আল্লাহর জাতের নৈকট্য বা সান্নিধ্য অর্জনও

    সম্ভব নয়। সবকিছুর মূলেই হইল পীরের রাবেতাকে ধারণ করা। রাবেতা সম্পর্কে যদিও বলা হইয়াছে, প্রাসংগিক বিধায় এখানেও কিছু কথা বলিতেছি।

    রাবেতা হইল খেয়ালী চোখে আপন পীরের ছুরাত লক্ষ্য করা। প্রাথমিক পর্যায়ে মুরীদের ইহাই করণীয়। এইভাবে পীরের ছুরাত লক্ষ্য করিতে করিতে এক পর্যায়ে মুরীদ যে দিকেই তাকায় সে দিকেই আপন পীরকে দেখিতে পায়। আপন পীরের ছুরাত তাহার সম্মুখে ভাসিয়া উঠে। গাছের প্রতি পত্রে, পত্রের প্রতি অনু-পরমাণুতে, প্রতি জলকনায়, প্রতি বালুকনায় আপন পীরের ছুরাত দেখিতে পায়। এই ছুরাতই পীরের মেছালী ছুরাত। এই মেছালী ছুরাতকে যে ধরিতে পারিল, তাহার মত ভাগ্যবান আসমানের নীচে আর কে আছে? সে সহজেই খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞান হাছিল করিতে পারে। দুনিয়াবী যে কোন ধরনের বিপদেই সে পতিত হোক না কেন, অর্থাৎ সে যদি বাঘের মুখে পড়ে, যদি সাপের মুখে পড়ে, এমনকি যদি সাগরের মাঝেও হাংগর-কুমিরের আক্রমণে পড়ে, তথাপিও তাহার ভয় নাই; পীরকে স্মরণ করা মাত্রই পীরের ছুরাতে মেছালী তথায় বিদ্যুতের চেয়ে লক্ষগুণ বেগে উপস্থিত হইয়া মহান খোদাতায়ালার ইচ্ছায় তাহাকে উদ্ধার করিবে।

    ঠিক তেমনি যখন তরিকতের রাস্তায়, মোশাহেদার পথে চলিবার সময়ে অর্থাৎ উরুজ ও ছায়েরের সময় শয়তান ও নাফসে আম্মারার ধোকা বা প্রবঞ্চনা বা ওয়াসওয়াছা দেলের মধ্যে উপস্থিত হয়; তখনই পীরের ছুরাতে মেছালী তথায় উপস্থিত হইয়া মুরীদকে শয়তানি ওয়াসওয়াছা থেকে রক্ষা করে। তাই বলা হয়, মুরগী যেমন তাহার বাচ্চাগুলিকে দুই পাখার নীচে রাখিয়া কাক-চিল শত্রুর ছোবল হইতে রক্ষা করে, ঠিক তেমনি আপন পীর মুরীদকে দুনিয়াবী বিপদ-আপদসহ তরিকতের রাস্তার বিপদ-আপদ অর্থাৎ শয়তান ও নাফসে আম্মারার আক্রমণ থেকে হেফাজত করিয়া খোদাতায়ালা পর্যন্ত পৌঁছানোর রাস্তাকে বিপদমুক্ত করিয়া দেন।

    রূহের ছয় ছুরাত। যথাঃ-

    (১) ছুরাতে অছলী, ২। ছুরাতে মেছালী, ৩। ছুরাতে রূহানী, ৪। ছুরাতে জেসমানী, ৫। ছুরাতে জাহেরী, ও ৬। ছুরাতে বাতেনী।

    এই ছয় ছুরাতের মধ্যে ছুরাতে মেছালীর মূল্য সবচেয়ে বেশী। লক্ষ লক্ষ খোদাঅন্বেষীদের মধ্যে দুই এক জন মাত্র পীরের ছরাতে মেছালীকে ধরিতে পারে। মূলতঃ খোদাতায়ালাকে পাইতে হইলে পীরের সহিত পরিপূর্ণ মেশামেশি করিতে হয়। এই মেশামেশি কি? এই মেশামেশি হইল উল্লিখিত ছয় ছুরাত সহ হায়াতে ওহাদানী, হকিকতে ওহাদানী, খেয়াল খেয়ালে নজর সম্পূর্ণই আপন পীরের সহিত মিশানো। এই মেশামেশি কাজটি অত্যন্ত কঠিন। এইজন্যই আপন পীরকে সবকিছুর চেয়ে বেশী ভালবাসিতে হয়। ভালবাসার সহস্র পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইলেই কেবল পীর তাওয়াজ্জুয়ে এত্তেহাদী প্রয়োগ করেন। পীরের তাওয়াজ্জুয়ে এত্তেহাদীর প্রয়োগেই কেবল মেশামেশি সম্ভব হয়। তখন দুধের সহিত চিনি মিশাইলে যেমন এক উত্তম লজ্জতের সৃষ্টি হয়, তেমনি মেশামেশির উল্লিখিত পর্যায়ে পৌঁছাইতে পারিলে মুরীদ এমনই এক লজ্জত, এমনই এক তৃপ্তি পায়, হাফেজ বলেন, যে লজ্জত বা তৃপ্তি বেহেশতেও মিলিবে না। এই মেশামেশিই ফানা-ফিশ-শেখ বলিয়া স্বীকৃত যাহা খোদাকে চিনিবার পথে প্রথম দরজা।

    বেহেশতের নেয়ামত সম্পর্কে হাদীসে বর্ণিত আছে যে, "বেহেশতে আল্লাহপাক তাহার পেয়ারা বান্দাদের জন্য এমন সব নেয়ামত তৈরী করিয়া রাখিয়াছেন, যাহা কোন চোখ দেখে নাই, যে সম্পর্কে কোন কর্ণ কিছু শোনে নাই, কোন হৃদয় কিছু কল্পনাও করে নাই।" অথচ রাবেতা-এ-কালব-ফিশ-শেখ হাছিল হইলে মুরীদ এমনি লজ্জত পায় যাহার নিকট বেহেশতের সমুদয় লজ্জতই তুচ্ছ বলিয়া বিবেচিত হয়। কেন? আসলে কামেল মোকাম্মেল পীরের উপর আল্লাহ পাকের পবিত্র জাত, সিফাত, আফ্যালের নূর এবং তদীয় ৯৯ নামের যে ঝলক অবিরাম তুফানের মত আসিতে থাকে, মুরীদ পীরের রাবেতার মাধ্যমে তাহার অংশ প্রাপ্ত হয়। এই জাত, সিফাত ও আফ্যালী নূর প্রাপ্তিতে, আল্লাহপাকের নিরানব্বই নামের ঝলক বা জ্যোতি প্রাপ্তিতে যে আনন্দ বা তৃপ্তি পাওয়া যায়, বেহেশতের উপভোগ্য সামগ্রীর আনন্দ বা লজ্জত তাহার কাছে তুচ্ছাতিতুচ্ছ।

    রাবেতা-এ-কালব-ফিশ-শেখের পরে আসে ফানা-ফির-রাসূলের মোকাম। এই মোকামে মুরীদের রূহ পীরের রূহে বিলুপ্ত হয়, পীরের রূহ পূর্বেই রাসূলের রূহে বিলুপ্ত থাকে, ফলে মুরীদ, পীর ও রাসূলে পাক (সাঃ) একই আসনে উপবিষ্ট হন, একই দস্তরখানায় প্রেম সুধা পান করেন। তিন জনের রূহ তথা মুরীদ, পীরে কামেল ও রাসূলে পাক (সাঃ) এর রূহ একত্রিত হইয়া ফয়েজে বরকীর ধাক্কায় জাত পাকের সমুদ্রে বিলীন হয়। মুরীদ ফানা ফিল্লাহর মোকাম হাছিল করে। অর্থাৎ মুরীদের রূহ সিফাতে এরাদতে বিলীন হয়, মুরীদের হায়াত সিফাতে হায়াতে: তাহার জ্ঞান-বিবেক সিফাতে এলেমে, ক্ষমতা সিফাতে কথন বা বর্ণন শক্তি সিফাতে কালামে এবং সৃজন শক্তি সিফাতে তাকবীনে বিলীন হয়। মুরীদের নিজস্ব বলিয়া আর কিছুই থাকে না। সে শূন্য হয়। অতঃপর আল্লাহতায়ালা তাহাকে পূর্ণ করেন। তথা নিজ প্রেমের হেরেমে উপনীত করেন এবং মারেফাত রূপ সম্পদে সম্পদশালী করেন। সে তখন আল্লাহতে স্থায়িত্ব প্রাপ্ত হয়। অর্থাৎ বাকার মোকাম হাছিল করে, খোদাতায়ালার সান্নিধ্য লাভ করে।

    কাজেই যতক্ষণ রাবেতা-এ-কালব-ফিশ-শেখ হাছিল না হইবে, ততক্ষণ আল্লাহ প্রাপ্তিতো বহুদূরের কথা, তরিকতের পথের কিঞ্চিৎ জ্ঞানও সিদ্ধ হবে না; শয়তানি প্ররোচনা ও নাফসের ধোকা থেকেও নিশ্চিন্ত হওয়া যাবে না। আর রাবেতা-এ-কালব-ফিশ-শেখ হাছিলের একমাত্র উপায় হইল পীরের ছুরাতে মেছালীকে ধরিবার চেষ্টা করা অর্থাৎ খেয়ালী চোখে পীরের চেহারা মোবারক লক্ষ্য করা।

    এস্থলে একটি উদাহরণ দেওয়া যায়। যেমন সূর্য রশ্মিতে সাত প্রকারের রং বর্তমান। কিন্তু আমরা খোলা চোখে সেই সপ্তরং দেখিতে পাই না। যদি 'প্রিজম' নামক একখন্ড কাঁচ সূর্যের রশ্মিতে ধরা যায়, তাহা হইলে বুঝা যায় যে, কাঁচ খন্ডের স্বচ্ছ মাধ্যমকে ভেদ করিয়া সূর্যরশ্মি অপর পার্শ্ব দিয়া মনোমুগ্ধকর সপ্ত রং-এ দৃষ্ট হইতেছে। সূর্যরশ্নির সপ্ত রং-এর জ্ঞান অর্জন করিতে হইলে 'প্রিজম' নামক কাঁচ খন্ডের যেমন প্রয়োজন, ঠিক তেমনি খোদাতায়ালার জাত, সিফাত ও আয়ালের নূর দর্শন করিতে হইলে, আল্লাহপাককে চিনিতে হইলে, আল্লাহ ও বান্দার মাঝখানে প্রিজমের মত কামেল পীরের রাবেতার প্রয়োজন। যাহারা রাবেতাকে শেরেকী মনে করে, তাহারা আসলে কামেল পীরের মর্তবা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ। কামেল পীরের অজুদ রাজ্যের কোটি কোটি লতিফা সদা আল্লাহর জেকেরে রত।

    তদুপরি তেত্রিশ কোটি লতিফার সাথেই আল্লাহ পাকের আসমা ও সিফাতের নূরের সংযোগ বর্তমান। বলা যায় যে, ৩৩ কোটি লতিফাতেই যেন আকর্ষণীয় মরীচা বাতি ফিট করা। যে মরীচা বাতিগুলি আল্লাহর নূরের কারেন্টে সদা প্রদীপ্ত। কাজেই অন্তর দৃষ্টি সম্পন্ন যে কেহ, কোন কামেলের দিকে যদি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে, তবে বিদ্যুৎ চমকানোর আলোর মতই সেই ব্যক্তি ঐ কামেলের অজুদ রাজ্য থেকে আল্লাহপাকের নূরের ঝলক দেখিতে পায়। এই কারণেই হাদীস শরীফে ওলী-আল্লাহর পরিচয় প্রদান স্থলে বলা হইয়াছে, "যাহাকে দেখিলে আল্লাহর কথা স্মরণ হয়, তিনিই ওলী-আল্লাহ।" অবশ্যই এই দর্শন কালবী নেত্র বা অন্তর দৃষ্টির মাধ্যমে হইতে হইবে, চর্ম চক্ষুর সাহায্যে নয়। কারণ চর্মচক্ষুর সাহায্যে একজন ওলী আল্লাহ ও একজন সাধারণ আলেমের মধ্যে তেমন কোন পার্থক্যই নির্ণয় করা সম্ভব নয়। এই পার্থক্য নির্ণয়ের জন্য প্রয়োজন কালবী নেত্র।

    কাজেই তোমরা যদি আল্লাহকে পাইতে চাও, খোদাতায়ালার সন্তুষ্টি অর্জন করিতে চাও, তাহা হইলে খেয়ালী চোখে আপন পীরের ছুরাতে মেছাল অনুসন্ধান কর। হায়াতে ওহাদানী, হকিকতে ওহাদানী, ছয় ছুরাত-ছুরাতে অছলী, ছুরাতে মেছালী, ছুরাতে রূহানী, ছুরাতে জেসমানী, ছুরাতে জাহেরী, ছুরাতে বাতেনী, খেয়াল খেয়ালে নজর, বরযখ, সম্পূর্ণ আপন পীরের সহিত মিশাও। তাহা হইলে মহামূল্য নেয়ামত আল্লাহ তোমাদিগকে দান করিবেন। আত্মদর্শনের মাধ্যমে সত্য দর্শন তোমাদের নছিব হইবে। রাব্বিশ রাহলী ছাদরী ওয়া ইয়াছছেরলী, মান আরাফা নাফছাহু ফাকাদ আরাফা রাব্বাহু।

    জেবি/এসডি

    জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

    Developed by: AB Infotech LTD