মোহাছাবার পরিচয় এবং তরিকতের রাস্তায় মোহাছাবার গুরুত্ব

খোদাপ্রাপ্তি জ্ঞানের আলোকে শাহ্সূফি হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত তরিকতের পাঁচ রোকন بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ মোহাছাবার পরিচয় এবং তরিকতের রাস্তায় মোহাছাবার গুরুত্ব বা অপরিহার্যতা সম্পর্কে আলোচনাঃ
বিজ্ঞাপন
পূর্ববর্তী নসিহতে মুরাকাবা সম্পর্কে আলোচনা করা হইয়াছে। এই অধ্যায়ে তরিকতের অবশিষ্ট দুই রোকন-মোহাছাবা ও শোগল সম্পর্কে আলোচনা করিতেছি।
মোহাছাবাঃ-
মোহাছাবার আভিধানিক অর্থ হিসাব গ্রহণ। তরিকতের পরিভাষায় মোহাছাবা হইল, দিন শেষে রাত্রিতে নিদ্রা যাওয়ার পূর্বে কিছুক্ষণ সারা দিনের কৃতকর্মের পুংখানুপুংখ হিসাব গ্রহণ করা। সারা দিনে সম্পাদিত সমস্ত কাজ যদি খোদাতায়ালার আদেশ-নিষেধ অনুযায়ী পরিচালিত হয়, তবে আল্লাহর শোকরিয়া' আদায় করা। আর যদি ভুল-ভ্রান্তি হয়, তবে অনুতপ্ত হইয়া খোদাতায়ালার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করা। এই রকম প্রতি রাত্রিতে নিদ্রা গমন পূর্বে কেহ যদি মোহাছাবায় লিপ্ত হয়, তবে সে সহসা বিপথগামী বা পথভ্রষ্ট হইবে না। শয়তানী ওয়াসওয়াসা বা নাফসের কু-প্ররোচনা তাহার উপর তেমন প্রভাব ফেলিতে পারিবে না।
বিজ্ঞাপন
কেন মোহাছাবা বা কৃতকর্মের হিসাব গ্রহণ প্রয়োজন? কারণ মানুষ এই দুনিয়ার বুকে আপন ইচ্ছানুযায়ী চলিবে-এমন অধিকার তাহাকে দেওয়া হয় নাই। কিছু বিধি-নিষেধ বাঁধিয়া দেওয়া হইয়াছে, যে বিধি-নিষেধ মোতাবেক তাহাকে জীবন পরিচালনা করিতে হইবে। মানুষ এক গুরু দায়িত্ব তথা আমানতের বোঝা লইয়া দুনিয়ায় আসিয়াছে। সেই আল্লাহ পাকের গুণাবলীর প্রতিবিম্ব যাহা মানুষকে প্রদান করা হইয়াছে; তাহাই আমানত। অর্থাৎ আল্লাহপাক মানুষকে সৃষ্টি করিয়া আরে রাব্বি বা আল্লাহর হুকুম বা রূহ ফুকিয়া দিলেন। তৎপর মানুষকে নিজের সিফাতে হায়াত থেকে জীবন, সিফাতে এলেম থেকে জ্ঞান-বিবেক, সিফাতে কুদরত থেকে ক্ষমতা, সিফাতে এরাদত থেকে ইচ্ছাশক্তি, সিফাতে ছামাওয়াত থেকে শ্রবণশক্তি, সিফাতে বাছারাত থেকে দর্শনশক্তি, সিফাতে কালাম থেকে কথন বা বর্ণনশক্তি এবং সিফাতে তাকবিন থেকে সৃজনশক্তি প্রদান করিয়াছেন।
কাজেই এই ক্ষমতা সমূহ অর্থাৎ চিন্তন, দর্শন, শ্রবন, কথন, বর্ণন, সৃজন, মনন ইত্যাদি সমুদয় শক্তি আল্লাহপাকের; মানুষের নয়। মানুষকে এই গুণাবলী সমূহ আমানত স্বরূপ দেওয়া হইয়াছে। মানুষকে ইহা ধার দেওয়া হইয়াছে। সময়মত আবার আল্লাহপাকের নিকট ইহা ফেরত দিতে হইবে। এই আমানত মানুষকে দেওয়ার সাথে সাথে কিছু শর্তও তাহাকে দেওয়া হইয়াছে। অর্থাৎ আল্লাহপ্রদত্ত আমানতের খেয়ানত যাহাতে না হয়, সে জন্য মহান খোদাতায়ালা নবী রাসূল (আঃ) গণের মাধ্যমে মানুষকে নিজ আদেশ-নিষেধ সম্বলিত বিধান প্রদান করিয়াছেন। সেই বিধান মতে যদি মানুষ নিজ জীবনকে পরিচালনা করে, সমুদয় কর্মকান্ডকে সে যদি আল্লাহপাকের আদেশ-নিষেধ মত সম্পাদিত করে, তবে আল্লাহপাক তাহাকে পুরস্কার স্বরূপ অনন্ত সুখের আবাসস্থল বেহেশত এবং নিজের সান্নিধ্য বা নৈকট্য প্রদান করিবেন; তদুপরি নিজ হাস্যমুখী তাজাল্লা দান করিবেন। কিন্তু বিধানগত আদেশ-নিষেধ অবহেলা বা অবজ্ঞা করিয়া যদি কেহ আল্লাহপ্রদত্ত আমানতের খেয়ানত করে, আমানতকে যদি যথাযথভাবে ফেরত দিতে না পারে, তবে আল্লাহর কোপানলে পতিত হইয়া চির শাস্তির আবাসস্থল দোযখে নিপতিত হইবে।
মানুষ আমানতকে যথাযথভাবে রক্ষা করিল কিনা কিংবা অবজ্ঞা বা অবহেলা করিয়া নষ্ট করিল কিনা, তাহার হিসাব হইবে পরকালে, বিচার দিবসে। হিসাব গ্রহণ করিবেন স্বয়ং খোদাতায়ালা। সেইদিন প্রত্যেকটি মানুষের সমুদয় কার্য-কলাপের চুলচেরা হিসাব গ্রহণ করা হইবে। কেহ তিল পরিমান পাপ বা পুণ্য করিলে তাহাও পাল্লায় ওজন করা হইবে। হিসাব শেষে কেউবা আমলনামা ডান হাতে প্রাপ্ত হইয়া অতিশয় খুশী হইবে, কেউবা বাম হাতে প্রাপ্ত হইয়া দুঃখ ভারাক্রান্ত হইবে। কেউবা বেহেশতে, কেউবা দোযখে যাইবে। সেই বিচারের দিবসে আল্লাহর সামনে, নবী-রাসূল, ওলী-আল্লাহ ও অগণিত ফেরেশতাদের সম্মুখে যাহাতে লজ্জিত হইতে না হয়, অপদস্ত হইতে না হয়, সেই জন্য সতর্কতা স্বরূপ নিজ কৃত সমস্ত কাজের চুলচেরা হিসাব নিতে হয়। ইহাই মোহাছাবা। তরিকতে তাই মোহাছাবা অত্যাবশ্যকীয় এক রোকন হিসেবে নির্ধারিত। এই প্রসংগে আল্লাহপাক পবিত্র কুরআনে বলেন,
বিজ্ঞাপন
وَلْتَنْظُرْ نَفْسٌ مَا قَدَّمَتْ لِغَدٍ -
অর্থাৎ-"প্রত্যেকটি মানুষ পৃথিবীতে পুংখানুপুংখরূপে হিসাব করিয়া দেখুক-আগামী কল্যের (অর্থাৎ কিয়ামতের মহা বিচার দিবসের) জন্য কি প্রেরণ করিয়াছে?” (সূরা হাশর, আয়াত-১৮)
রাসূলে পাক (সাঃ) বলেন, "যে ব্যক্তি সদা সর্বদা নিজের কৃতকর্মের হিসাব রাখিতে থাকে এবং মৃত্যুর পরে কাজে লাগিবে এমন কার্য করিয়া থাকে-সেই বুদ্ধিমান।" মোহাছাবা প্রসংগে হযরত ওমর (রাঃ) বলেন,
বিজ্ঞাপন
حَاسِبُوا قَبْلَ أَنْ تُحْسَبُوْا -
অর্থাৎ-"হিসাব লও, তোমার নিজের হিসাব (আল্লাহতায়ালা কর্তৃক) লওয়ার পূর্বে। "হযরত ওমর (রাঃ) ছাহেব সারাদিন কর্তব্য কর্মে ডুবিয়া থাকার পর রাত্রিকালে যখন গৃহে গমন করিতেন, তখন স্বীয় পাদদেশে দোরা মারিয়া জিজ্ঞাসা করিতেন "তুমি অদ্য কি কি কার্য করিয়াছ? হিসাব দাও।"
সদা সর্বদাই মানুষকে হিসাব করিয়া চলা কর্তব্য। যে ব্যবসায়ী ব্যবসা কর্মে ঠিক ঠিক মত হিসাব রাখে, সে কখনও লোকসানে পতিত হয় না। তোমার আয় যত অল্পই হোক, হিসাবমত ব্যয় করিলে তুমি কখনও অভাবগ্রস্থ হইবে না। আর যদি বেহিসাবী চল, তবে আয় যত বেশীই হউক, তোমার অভাব কখনও দূর হইবে না। বেহিসাবী লোক সর্বদাই অপদস্থ ও লাঞ্ছিত হয়।
বিজ্ঞাপন
রাসূলে পাক (সাঃ) বলেন, "ইহ জগতের একটি দিন ও রাত্রি ২৪ ঘন্টার। আগামীকল্য অর্থাৎ কিয়ামতের বিচার দিবসে উক্ত চব্বিশ ঘন্টার বিনিময়ে চব্বিশটি ভান্ডার মানুষের সম্মুখে স্থাপন করা হইবে এবং প্রত্যেকটি ভান্ডারের দরজা খুলিয়া মানুষকে দেখান হইবে। যে ঘন্টায় নেক কাজ করা হইয়াছিল, তাহার বিনিময়ে প্রাপ্ত ভান্ডারটির দরজা উন্মুক্ত করা মাত্রই মানব উহাকে তাহার কৃত নেক কাজের আলোকে উজ্জল ও জ্যোতির্ময় দেখিতে পাইবে। সেই আলোকছটা দর্শনে মানুষ এত আনন্দিত ও উৎফুল্ল হইবে যে, সেই আনন্দের সামান্য অংশ দোযখীদের মধ্যে বন্টন করিয়া দিলে তাহারা সকলে দোযখের যন্ত্রণার কথা ভুলিয়া যাইবে। বেহেশতীরা এইরূপ আনন্দিত হওয়ার কারণ এই যে, তাহারা উক্ত আলোক দেখিবামাত্র বুঝিতে পারিবে যে, এই জ্যোতিই আল্লাহতায়ালার সমীপে তাহাদের নৈকট্য ও প্রিয় হওয়ার অছিলা বা কারণ হইবে।
অতঃপর আর একটি দরজা খোলা হইবে, তাহা অন্ধকারে পরিপূর্ণ এবং ঘোর কৃষ্ণবর্ণ দেখা যাইবে, তাহা হইতে এমন বিকট দুর্গন্ধ বাহির হইবে যে, সকলে নাক বন্ধ করিয়া লইবে। যেই ঘন্টায় পাপ বা অন্যায় কাজ করা হইয়াছিল, ইহা তৎবিনিময়ে প্রাপ্ত ভান্ডার। উহা দর্শন মাত্র লোকের মনে এমন ভয়, ঘৃণা ও দুঃখ-কষ্ট উৎপন্ন হইবে যে, তাহার কিয়দংশ বেহেশতবাসীদের মধ্যে বণ্টন করা হইলে সকলের জন্য দুঃসহ হইয়া উঠিবে, সমগ্র বেহেশত দুঃখময় হইয়া পড়িবে। আর একটি ভান্ডারের দরজা খুলিলে দেখা যাইবে, উহা একেবারে শূন্য। তাহাতে আলো বা অন্ধকার কিছুই নাই। যে ঘন্টাটি অলসভাবে বিফলে ব্যয় করা হইয়াছে, যাহাতে কোন পুণ্যও করা হয় নাই, কোন পাপও করা হয় নাই, ইহা তৎবিনিময়ে প্রাপ্ত ভান্ডার। ইহা দেখিয়া মানুষের মনে এমন অনুতাপ, লজ্জা ও ক্ষোভের উৎপত্তি হইবে, যেমন কোন ব্যক্তি বিশাল রাজ্যের ও অফুরন্ত ধন ভান্ডারের অধিকার হাতে পাইয়া তাহার সদ্ব্যবহার করিল না, পরিশেষে তাহা বৃথা নষ্ট হইয়া গেল; এই ব্যক্তির মনে যেরূপ অনুতাপ ও লজ্জার উদয় হইয়া থাকে, বৃথা অলসতায় সময় নষ্টকারীগণ উক্ত শূন্য ভান্ডার দেখিয়া তদ্রুপ অনুতপ্ত ও লজ্জিত হইবে।"
পবিত্র কুরআনের উল্লিখিত বাণী ও হাদীসের ভাষ্য থেকে ইহা স্পষ্টতঃ যে, মানুষ ইহকালে তাহার সময় যে সকল কর্মকান্ডের ভিতর দিয়া অতিবাহিত করিবে, তাহার পুংখানুপুংখ হিসাব পরকালের বিচার দিবসে দিতে হইবে। কাজেই বুদ্ধিমান ও সতর্ক লোক নিজেদের সকল কর্ম কান্ডের চুলচেরা হিসাব করিয়া থাকে।
বিজ্ঞাপন
খোদাতালাশী বা খোদাঅন্বেষীকে রাত্রির নিদ্রাগমনের পূর্বে সমস্ত দিনের কৃতকর্মের হিসাব লইতে হয়। তাহার কর্মোন্দ্রিয়সমূহ সৎ না অসৎ কাজে, পাপ না পুণ্যকর্মে লিপ্ত ছিল, তাহা কাঁটায় কাঁটায় হিসাব করিয়া দেখিতে হয়। ইন্দ্রিয়সমূহ দ্বারা যে সমস্ত পাপ বা অন্যায় সম্পাদিত হয়, তাহার জন্য অনুতপ্ত হৃদয়ে মহান খোদাতায়ালার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করিতে হয়। নিত্যদিনের মোহাছাবায় এরূপ করিতে করিতে এমন এক সময় আসিবে যখন পাপ বা অন্যায় তাহার দ্বারা আর সংঘটিত হইবে না। আল্লাহপাকের সন্তুষ্টি অর্জন তাহার জন্য সহজ হইবে। মানুষের কর্মোন্দ্রিয়সমূহের মধ্যে জিহবা, চক্ষু, কর্ণ, হস্ত, পদ এবং অন্তর বা কালব অন্যতম। প্রত্যেকটি কর্মোন্দ্রিয় থেকে পুরাপুরি হিসাব বুঝিয়া লইতে হয়।
জিহবা মানুষের একটি মূল্যবান অংগ। জিহবা দ্বারা মানুষ মনের ভাবকে প্রকাশ করে। আল্লাহর নির্দেশিত পথে যদি জিহবাকে ব্যবহার করা যায়, তবেই কল্যাণ; আর যদি জিহবাকে সংযত রাখা না যায়, তবে ইহা মানুষের জন্য ধ্বংসের কারণ। এই কারণে খোদা প্রাপ্তির পথে অল্প আহার ও অল্প নিদ্রার সাথে সাথে অল্প কথার অভ্যাস করিতে হয়। অধিক কথা বলায় বহুবিধ অপরাধ সংঘটিত হওয়ার সম্ভাবনা বিদ্যমান। অধিক কথা বলার কুফল নিম্নরূপঃ-
(ক) যাহারা অধিক কথা বলে, ইচ্ছায় হউক, অনিচ্ছায় হউক, তাহারা পরনিন্দা-পরচর্চা বা গীবত করিয়া থাকে।
বিজ্ঞাপন
(খ) মিথ্যা কথা বলে।
(গ) ওয়াদা ভংগ করে, কারণ ওয়াদা দেওয়ার সময় চিন্তা-ভাবনা না করিয়াই ওয়াদা দেয়। পরে আর রক্ষা করিতে পারে না।
(ঘ) অতিরিক্ত কথা বলার কারণে আসল কথাকে অতিরঞ্জিত করে।
বিজ্ঞাপন
(ঙ) বেহুদা কথায় লিপ্ত থাকে।
(চ) হাস্য-কৌতুকে সময় কাটায়। ফলে যিনি অধিক কথা বলেন, তাহার দেল মারা যায়। হযরত শেখ সাদী (রঃ) বলেন, "তোমার কথা আদন' এর মুক্তার চেয়েও যদি মুল্যবান হয়, তথাপিও তুমি যদি বেশী কথা বল, তবে তোমার দেল মারা যাইবে। দেল অন্ধকার আচ্ছন্ন হইবে।"
অধিক কথা বলায় যে পাপ মানুষ সবচেয়ে বেশী করে তাহা হইল গীবত অর্থাৎ পরনিন্দা বা পরচর্চা এবং মিথ্যা কথা বলা। এই দুটোই ইসলামী দৃষ্টিকোণে জঘন্য অপরাধ বলিয়া পরিগণিত। গীবত কি? কোন ব্যক্তির অসাক্ষাতে তাহার দোষ-ত্রুটির আলোচনা করাকে গীবত বলে। রাসূলে পাক (সাঃ) বলেন, "গীবত জেনা হইতেও কঠিনতম গোনাহ।" ছাহাবাগণ আরজ করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ (সাঃ)! গীবত
বিজ্ঞাপন
জেনা হইতেও কঠিনতর? তিনি বলিলেন, "কোন ব্যক্তি জেনা করিয়া তওবা করিলে আল্লাহতায়ালা তাহার তওবা কবুল করেন এবং তাহাকে মাফ করিয়া দেন, কিন্তু গীবতকারীর জন্য তওবার কোন বিধান নাই, যে পর্যন্ত না যাহার গীবত করা হইয়াছে, সে মাফ করে।"
অনুরূপে মিথ্যা কথা বলাও জঘন্য পাপ। মিথ্যা কথায় দেলে তিল সদৃশ্য কাল দাগ পড়িয়া দেলকে অন্ধকার আচ্ছন্ন করিয়া ফেলে। কাজেই প্রত্যেক রাত্রিতে ঘুমাইবার পূর্বে হিসাব করিয়া দেখা উচিত যে, সারাদিনে জিহবা কতগুলো কথা বলিয়াছে, ইহার মধ্যে কতক্ষণইবা আল্লাহর জেকের বা গুণগান করিয়াছে, কতক্ষণইবা পরনিন্দা, পরচর্চা বা বেহুদা কথায় লিপ্ত থাকিয়াছে। প্রতিরাত্রিতে জিহবার হিসাব লইলে বেহুদা কথা বলা হইতে জিহবাকে সংযত করা সহজ হইবে। জিহবাকে মূলতঃ আল্লাহর গুণগান করার জন্যই সৃষ্টি করা হইয়াছে। মহাকবি হাফেজ বলেন,
" যে দিল করুণা করি রসনা লোলিত
বিজ্ঞাপন
কেনরে না গাও তার মহিমার গীত।”
অর্থাৎ-যিনি তোমাকে এমন সুন্দর জবান তৈরী করিয়া দিলেন, সেই জবান দিয়া তাহাকে ডাকা কি তোমার উচিত নয়? এমনিভাবে নিত্যদিনে জিহবার মোহাছাবা করিলে জিহবাকে সংযত করা সহজ হইবে।
মানুষের আর এক ইন্দ্রিয় চক্ষু। চক্ষু দ্বারা মানুষ দর্শন করে। মানুষ যাহা দেখে, তাহার প্রভাব দেলের উপরে পড়ে। এই জন্য খোদাতালাসীকে নিষিদ্ধ দৃশ্যের প্রতি দৃষ্টিপাত করা থেকে বিরত থাকিতে হয়। কারণ নিষিদ্ধ দৃশ্যের প্রতি দৃষ্টিপাত করিলে, তাহার অশুভ প্রভাব মনের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। মনকে খোদামুখী রাখা আর সম্ভবপর হয় না। এই জন্য আল্লাহপাক ঘোষণা করেন, "ঈমানদারদের বলিয়া দিন, চোখ যেন তাহারা নিচু করিয়া চলে।" অর্থাৎ ইহার তাৎপর্য হইল, ঈমানদারেরা যেন তাহাদের চোখকে নিষিদ্ধ ব্যক্তি, বস্তু বা দৃশ্যের প্রতি দৃষ্টিপাত করা থেকে বিরত রাখে। মানুষকে চক্ষু প্রদান করা হইয়াছে মহান খোদাতায়ালার সৌন্দর্য অবলোকনের জন্য। মহাকবি হাফেজ বলেন,
"যে দিল করুণা করি যুগল নয়ন
উচিত কি নয় তার রূপ দরশন?"
অর্থাৎ-যিনি তোমাকে একটি চক্ষুর পরিবর্তে দুইটি চক্ষু দান করিলেন, সেই চক্ষু দিয়া তাহাকে দেখিবার চেষ্টা করা কি তোমার উচিত নয়?
কাজেই তুমি তোমার চক্ষুর মোহাছাবা করিয়া দেখ, সারাদিনে সে কতবার নিষিদ্ধ লক্ষ্যের প্রতি দৃষ্টিপাত করিয়াছে। যদি না করিয়া থাকে তবে ভাল, আর যদি করিয়া থাকে, তবে কালবিলম্ব না করিয়া খোদাতায়ালার নিকট ক্ষমা চাও এবং পরবর্তীতে তেমন দৃষ্টিপাত যাহাতে না করিতে হয়, তাহার জন্য খোদাতায়ালার নিকট দয়া ভিক্ষা চাও।
মানুষের আর এক ইন্দ্রিয় হইল কর্ণ বা শ্রবণেন্দ্রিয়। মানুষ যাহা কিছু শোনে, তাহার প্রভাব মনের বা দেলের উপর পড়ে। তোমরা যখন আল্লাহ রাসূলের কথা শুন, তোমাদের চোখে পানি আসে, কারণ আল্লাহ রাসূলের মহব্বতপূর্ণ যে কথা তোমরা শুন, তাহার একটি শুভ প্রভাব দেলের উপর পড়ে। ঠিক তেমনি তুমি যদি আজে-বাজে কথা শ্রবণ কর, তাহা হইলে ইহার অশুভ প্রভাব তোমার দেলের উপর কালিমা ফেলিবে। দেখ, শরীয়তে গান-বাজনা শ্রবণ করা নিষিদ্ধ। কারণ গান-বাজনা শুনিলে কালব দুনিয়ামুখী হয়; কালবে দুনিয়ার প্রেম বৃদ্ধি পায়।
আর দুনিয়ার মহব্বত হইল যাবতীয় পাপের মূল। যতক্ষণ পর্যন্ত কালবে বিন্দু পরিমাণ দুনিয়ার মহব্বত থাকিবে, ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহপ্রাপ্তির আশা বৃথা। এই কারণেই আজে-বাজে কথা বা গল্প-গুজব শোনা, বা গান-বাজনা শোনা থেকে তোমার শ্রবণেন্দ্রিয়কে সংযত রাখ। তুমি হিসাব করিয়া দেখ, তোমার শ্রবণেন্দ্রিয় সারাদিনে কতক্ষণ আজে-বাজে কথা, গল্প গুজব বা গান-বাজনা শুনিয়াছে। যদি না শুনিয়া থাকে তবে খোদাতায়ালার শোকরিয়া আদায় কর। আর যদি উল্লিখিত পাপকর্মে তোমার কর্ণ রত থাকে, তবে মহান খোদাতায়ালার নিকট ক্ষমা চাও। এমনিভাবে দেহের প্রত্যেকটি অংগ প্রত্যংগের কৃতকর্মের পুংখানুপুংখ হিসাব গ্রহণ করিতে হয়।
সর্বশেষে হিসাব লইতে হয় কালব বা দেলের। কারণ কালব হইল সমস্ত অংগ-প্রত্যংগের ও ইন্দ্রিয়ের মূল। কালব বা দেল যদি পবিত্র হয় তাহা হইলে কোন ইন্দ্রিয় দ্বারাই আর পাপ সংঘটিত হয় না। আর কালব যদি অপবিত্র হয় তবে চেষ্টা করিয়াও অন্যান্য ইন্দ্রিয় সমূহকে সুপথে আনা যায় না। এই জন্যই বলা হয়, কালব দুনিয়াদারীর প্লাটফর্ম, কালব নাফসে আম্মারার প্লাটফর্ম, কালব শয়তানের প্লাটফর্ম, আবার কালব খোদাপ্রাপ্তিরও প্লাটফর্ম। এই কালবে যখন যে অবস্থান করে, ঐ কালবের অধিকারী তখন তাহার গোলাম হয়। যদি কালবে দুনিয়ার মহব্বত পূণ থাকে, তবে সে দুনিয়ার দাসে পরিণত হয়। যদি কালব নাফসের আবাসস্থল হয়, তবে সে নাফসের দাসত্বে বা তাবেদারীতে লিপ্ত হয়। তাহার কালব যদি শয়তানের আশ্রয়স্থল হয়, তবে সে শয়তানের হুকুম পালন করিতে থাকে।
আর যখন কালবে আল্লাহর গুঞ্জায়েশ হয়, তখন ঐ কালবওয়ালা আল্লাহর দাসে পরিণত হয়; তাহার কালব পবিত্র হয় এবং তাহার সমুদয় কর্মোন্দ্রিয় আল্লাহর আদেশ-নিষেধ পালন করিতে থাকে। কিন্তু যখন কালবে নাফস ও শয়তান অধিষ্ঠিত থাকে তখন তাহার দ্বারা শুধুই পাপ ও অন্যায় সংঘটিত হয়। এই কারণে নকশবন্দীয়া মুজাদ্দেদীয়া তরিকায় খোদাতালাশীকে লতিফায়ে কালবে ছবক দেওয়ার সময় বলিয়া দেওয়া হয় যে, সর্বদাই এখানে আল্লাহ আল্লাহ জেকের হইতেছে, এই খেয়ালে থাকিতে হইবে। এই খেয়ালে ইবাদত কর্ম ও দুনিয়াবী কাজ-উভয়ই করিতে হইবে।
কালব হইল দেহ রাজ্যের বাদশাহ এবং সকল ইন্দ্রিয় এই রাজ্যের প্রজাবৃন্দ। বাদশাহ যাহা নির্দেশ দেন, প্রজাবৃন্দ তাহা করেন। বাদশাহ যদি আল্লাহর অনুগত হন, প্রজাবৃন্দও আল্লাহর অনুগত হয়। এই কারণেই কালবের পরিচ্ছন্নতার গুরুত্বের প্রতি পবিত্র কুরআন ও হাদীসে তাগিদ দেওয়া হইয়াছে। তুমি চিন্তা করিয়া দেখ, তোমার কালব বা অন্তর আল্লাহর জেকেরেই লিপ্ত ছিল, নাকি দুনিয়াবী চিন্তায় মশগুল ছিল। যদি দুনিয়াবী চিন্তায় মশগুল থাকে তবে তোমার খোদাপ্রাপ্তির আশা বৃথা। এখনই দুনিয়ার মহব্বত তোমার দেল থেকে ঝাড়িয়া ফেল এবং দেলে আল্লাহ আল্লাহ জেকের হইতেছে-এই খেয়ালে থাক।
এমনিভাবে প্রতি দিবাগত রাত্রিতে বিছানায় যাওয়ার পূর্বে কৃত সমস্ত কর্মের হিসাব-নিকাশ লইতে হয়। এই হিসাব-নিকাশ গ্রহণই মোহাছাবা। ইহা সাধারণ শ্রেণীর বা তরিকতের প্রথম শিক্ষার্থীর মোহাছাবা। কিন্তু যাহাদের লতিফা সমূহ জাগ্রত, যাহারা খোদাতায়ালার পথে উরুজ ও ছায়েররত, তাহাদের মোহাছাবায় আরও সূক্ষ্ম হিসাব রাখিতে হয়।
বাতেনী রাস্তায়, মোশাহেদার সড়কে চলিবার পথে সদা সর্বদা আপন পীরের নির্দেশমত চলিতে হয়। পীরের নির্দেশের চুল পরিমাণ অবহেলা করিলে বিপথগামী হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আপন পীর যখন যে লতিফায় যে জেকের বা মুরাকাবা করিতে বলেন, অথবা যে বর্ণের নূরের প্রতি খেয়াল করিতে বলেন, সেই জেকের বা বর্ণের প্রতি খেয়াল রাখিতে হয়। শয়তান মানুষের প্রকাশ্য দুশমন। শয়তানের দুশমনী বাতেনী জগতে জাহেরা জগতের দুশমনীর হাজার গুণ। কোন ছালেক উরুজ ও ছায়েররত হইলে শয়তান তাহাকে পথভ্রষ্ট করিবার জন্য কত শত পথে যে ধোকা দেওয়ার চেষ্টা করে-তাহার ইয়ত্তা নাই।
এমনকি মুরাকাবা মোশাহেদার পথে ছালেককে বিভ্রান্ত করিবার জন্য এলহাম বা গায়েবী আওয়াজও প্রেরণ করে। কাজেই কোন্ আওয়াজ বা গায়েবী শব্দ ঊর্ধ্ব জগতের, কোন্ আওয়াজ শয়তানের তাহা বুঝা ভীষণ কষ্ট বিধায় সমুদয় আওয়াজের কথাই আপন পীরকে জানাইতে হয়। তৎপর পীর যে ভাবে চলিতে নির্দেশ দেন, সেইভাবে চলিতে হয়। "এরশাদে খালেকীয়া" পুস্তকের লেখক মৌলভী মোহাম্মদ আব্দুল করিম ছাহেব তদীয় পুস্তকে এই রকম একটি ঘটনার উল্লেখ করিয়াছেন। তিনি বলেন যে, একদিন এক লোক আসিয়া আমাকে বলিল যে, "আমি আমার পীরের খেদমতে রত ছিলাম। কয়েকদিন খেদমত করিতে না করিতেই আমার মনের আশা পূর্ণ হইল।
অর্থাৎ আমি এক এলহাম শুনিতে পাই, সেই এলহামে যে আদেশ আমার প্রতি হয়, তাহা পীরের নির্দেশের বিপরীত হইলেও আমি তঅনুসারে কার্য করি। অবশ্য পীর ছাহেবকে ইহা ব্যক্ত করায় তিনি আমাকে বলিলেন, "আমি আজ পর্যন্ত খোদাকে পাইলাম না, তুমি কেমন করিয়া পাইলে? উহা তোমার জন্য মঙ্গলজনক নয়। তুমি আর এ আদেশমত চলিও না, বরং উহা শ্রবণও করিও না।" লোকটি বলিল যে, আমি পীর ছাহেবের এই কথা শুনিয়া পাছে পীর ছাহেব আমার ঐ অবস্থা বিনষ্ট করিয়া দেন, এই ভয়ে ভীত হইয়া পলায়ন করিয়া বেড়াইতেছি। আমি তাহার এই কথা শুনিয়া জিজ্ঞাসা করিলাম, ঐ শব্দ তোমার কোন্ দিক থেকে আসে? সে উত্তর দিল, আমি উহা স্থির করিতে পারি না।
আমি তাহাকে বলিলাম, ভাই, এই সামান্য বিষয় যখন তুমি বুঝিতে পার না, তখন তুমি এই আদেশ মতে চলিয়া কিভাবে উদ্ধার পাইবে? ঐ শব্দে বিস্তর ধোকা আছে। পশ্চাৎ দিক বা বাম দিক হইতে যে শব্দ শুনা যায়, উহা শয়তানের। মস্তকের উপর হইতে যে আদেশ হয়, তাহাও শয়তানের। ঘাড়ের উপর হইতে যে শব্দ আসে, তাহা খান্নাছের। স্কন্ধ হইতে শব্দ হইলে উহা ফেরেশতার; আর যাহা অধিক উপর হইতে মনে হয়, উহা আহাদিয়াতের আওয়াজ-উহাই যথার্থ। যাহা হউক, তুমি ঐ আদেশ বিপথগামী করিয়া তোমার জীবনকে বরবাদ করিতে পারে। এই উপদেশ মত চলিও না। নিজ বুদ্ধিতে ঐ আদেশ মতে চলিলে শয়তান তোমাকে দিয়া আমি তাহাকে বিদায় করিয়া দিলাম।
অভিশপ্ত শয়তানকে আল্লাহপাক প্রচুর ক্ষমতা প্রদান করিয়াছেন। আর শয়তানও তাহার সবটুকুই ক্ষমতা ও কৌশল মানুষকে পথভ্রষ্ট করার কাজে ব্যয় করে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহতায়ালা শয়তানকে উদ্দেশ্য করিয়া বলিতেছেন, "হে শয়তান! তুমি আওয়াজ দ্বারা যাহাকে পার গোমরাহ কর।" কাজেই বাতেনী পথে বা মোশাহেদার রাস্তায় চলিবার পথে যে গায়েবী বাণীই তুমি শ্রবণ কর না কেন, আপন পীরকে জানাইয়া তাহার বিশ্বস্ততা যাচাই করিয়া লইতে হইবে। কোন ছালেক তদীয় মোহাছাবায় যদি ইহা ভুল করে, তবে পথভ্রষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা তাহার বেশী। পীরে কামেল সর্বদাই মুরীদকে শরীয়তের সিরাতুল মোস্তাকিমের পথে চলিতে নির্দেশ প্রদান করেন। শরীয়ত ও সুন্নতের খেলাফ কোন এলহাম যদি ছালেকের উপর হয়, তাহা অবশ্যই পরিত্যাগ করিতে হইবে, কারণ শরীয়তের খেলাফ কোন আদেশ আল্লাহপাকের তরফ থেকে আসিতে পারে না। গউস-পাক হযরত আব্দুল কাদের জেলানী (রঃ) ছাহেবের সাধনাকালীন সময়ের একটি ঘটনা এখানে উল্লেখ করিতেছি।
একদা গউসপাক (রঃ) ছাহেব গভীর ধ্যান বা মুরাকাবায় নিমগ্ন। মুরাকাবায় তিনি দেখিতে পান যে, হঠাৎ সমস্ত আকাশ আলোকিত হইল। আলোকউজ্জল আকাশে এক নূরানী আসনে উপবিষ্ট এক ব্যক্তি তাহাকে উদ্দেশ্য করিয়া বলিতেছে, "হে মহিউদ্দিন আব্দুল কাদের! তোমার ইবাদত ও কঠোর সাধনায় আমি অতিশয় খুশী হইয়াছি। আজ হইতে আমি তোমাকে শরীয়তের যাবতীয় হুকুম আহকাম থেকে অব্যাহতি দিলাম। কোন আমল না করিলেও তোমার চলিবে।" গউস-পাক (রঃ) ছাহেব বলেন যে, আমি ভীষণ দুশ্চিন্তায় পড়িলাম। কারণ শরীয়তের হুকুম পালন থেকে কোন নবী-রাসূল অব্যাহতি পান নাই, কোন ওলী-আল্লাহও পান নাই। শরীয়তই শয়তানের ধোকা হইতে বাঁচিবার চাবিকাঠি। নিশ্চয় ইহা শয়তানী প্রবঞ্চনা ব্যতীত কিছু নয়।
আমি সাথে সাথে "লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লা হিল আ'লিয়্যুল আ'জিম"-এই দু'আ পড়িলাম। আর সংগে সংগে শয়তান অদৃশ্য হইয়া গেল। কিছুক্ষণ পরে মানুষের রূপে আসিয়া আমাকে বলিল, "হে আব্দুল কাদের জিলানী! আপনাকে যে পথে ধোকা দেওয়ার চেষ্টা করিয়াছিলাম, ঠিক এমনিভাবে বহু সাধককে ধোকা দিয়া সফল হইয়াছি। কিন্তু আপনার জ্ঞান আপনাকে রক্ষা করিল।" আমি বলিলাম, “হে শয়তান! তুই আবার আমাকে ধোকা দিতে আসিয়াছিস। আমার জ্ঞান আমাকে রক্ষা করে নাই। আমাকে রক্ষা করিয়াছেন স্বয়ং খোদাতায়ালা। ইহা বলিবা মাত্র শয়তান দ্রুত পলায়ন করিল।" দেখ! গউস পাক (রঃ) ছাহেবের মত বলিষ্ঠ সাধককেও শয়তান ধোকা দিতে পিছু পা হয় নাই। আর তুমি তো মোশাহেদার পথের একজন কাঁচা পথিক মাত্র। কাজেই তোমাকে সর্বদাই পীরের নির্দেশের প্রতি লক্ষ্য রাখিতে হইবে।
প্রতি রাত্রিতেই মোহাছাবার নির্দিষ্ট সময়ে ভালমত হিসাব-নিকাশ করিয়া দেখ যে, পীরের আদেশ ও শরীয়তের খেলাফ কিছু হইতেছে কিনা, তাহা হইলে এখনই সতর্ক হও এবং পীর যে পথে চলিতে বলেন সেই পথে চল।
হযরত ইউসা (আঃ) এর সময়ে বলমবাউর নামক একজন প্রসিদ্ধ আবেদ ছিলেন। তিনি পয়গম্বর হযরত ইউসা (আঃ) এর বিপক্ষে বদ দু'আ করিয়া একেবারে মদুদ (পতিত) হইয়া গেলেন। তিনি যদি এতটুকু মোহাছাবা করিতেন যে, পয়গম্বরদের মর্তবা আবেদের অনেক ঊর্ধ্বে। কোন পয়গম্বরের বিরুদ্ধে বদ দু'আ করিবার কোন অধিকার কোন আবেদের নাই, তাহা হইলে তাহার জীবন বরবাদ হইত না।
বিসাই মুনসী নামক তোমাদের এক জাকের ভাই ছিল। সে দীর্ঘদিন আল্লাহ রাসূলের দরবার, এই বিশ্ব জাকের মঞ্জিলে খেদমত করিয়াছিল। ফলে তাহার বাক্য সিদ্ধ হইয়াছিল। সে যাহা বলিত, তাহা সত্য হইত। বাক্য সিদ্ধ হওয়ার পর সে খেদমত বন্ধ করিয়া নিজেই বাড়ীতে জলসা করা শুরু করিল। আমি তাহাকে একদিন ডাকিয়া বলিলাম, বিসাই মুন্সী! ব্যাটারীতে চার্জ দিলে সে চার্জ কিন্তু ২৪ ঘন্টার বেশী থাকে না। তুমি আর কিছুদিন খেদমত করিয়া স্থায়ী চার্জের অধিকারী হও। কিন্তু বিসাই মুন্সী আমার কথা শুনিল না। সে মোহাছাবায় ভুল করিল। কিছুদিন পর তাহার কথার ফয়েজ নষ্ট হইল। ঝড়ে ঘর-বাড়ী ফেলাইয়া দিল। ব্যবসা করিতে যাইয়া সঞ্চিত টাকা নষ্ট করিয়া ফেলিল। তৎপর সে মারা গেল। সে যদি একটু মোহাছাবা করিয়া দেখিত যে, পীরের সান্নিধ্যে থাকিয়া চার্জ স্থায়ী করিয়া নেওয়াই উত্তম, তাহা হইলে তাহার এমন ভয়াল পরিণতি হইত না।
কাজেই তোমরা তোমাদের প্রতিটি কর্ম, প্রতিটি কথা, প্রতিটি পদক্ষেপকে মোহাছাবার মাধ্যমে যাচাই করিয়া দেখ। পীর যখন যে ইশারা দেন, সেই ইশারামত চল। আমার পীর কেবলাজান বলিয়াছেন, "পীরের ইশারা যে বুঝে না, দ্বীন-দুনিয়া উভয়ই সে খোলা দিয়া খায়” (অর্থাৎ ইহকাল-পরকাল বরবাদ করে)। পীরের হাতে তেমন থাক, যেমন ধৌতকারীর হাতে মুর্দা থাকে। তাহা হইলে খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞান হাছিল করা তোমাদের জন্য সহজ হইবে।
শোগলের সংজ্ঞা এবং মোহাছাবার সহিত শোগলের পার্থক্য নির্ণয়ঃ
শোগলঃ-
শোগল অর্থ কার্যে লিপ্ত হওয়া। এই কাজ দুই দিকে প্রসারিত। একদিকে হিসাব-নিকাশ রাখা, অন্যদিকে ধ্যান করা।
মোহাছাবার সহিত শোগলের পার্থক্যঃ-
দিন-রাত্রি ২৪ ঘন্টার মধ্যে নির্দিষ্ট এক সময়ে, বিশেষ করিয়া রাত্রিতে নিদ্রা যাবার পূর্বে সারাদিনের কৃত কর্মের চুলচেরা হিসাব নেওয়াই মোহাছাবা। কিন্তু শোগলের জন্য নির্দিষ্ট সময়ের প্রয়োজন নাই। চলিতে-ফিরিতে, উঠিতে-বসিতে তথা সর্বাবস্থায় সূক্ষ্ম হিসাব মত চলাই শোগল। মোহাছাবা নির্দিষ্ট এক সময়ের জন্য কিন্তু শোগল সর্বক্ষণের জন্য।
আবার মুরাকাবা বা ধ্যান ও শোগলের পার্থক্যঃ-
মুরাকাবায় কতকগুলি শর্ত মানিয়া চলিতে হয়।
যথাঃ-
স্থির চিত্তে, নিবিষ্ট মনে মুরাকাবায় বসিতে হয়।
নূর-নির্গত স্থানের প্রতি খেয়াল রাখিতে হয়।
নূর পতন স্থানের প্রতি লক্ষ্য রাখিতে হয়।
নূরের বর্ণের প্রতি খেয়াল রাখিতে হয়।
নূর পতন স্থান বা লতিফা সমূহের জেকেরের প্রতি খেয়াল রাখিতে হয়।
কিন্তু শোগল মুরাকাবার ন্যায় স্থির ও নিস্পন্দ শরীরে করা শর্ত। চলিতে-ফিরিতে, উঠিতে-বসিতে তথা সর্বাবস্থায় শোগল করিতে হয়। অর্থাৎ সমুদয় কাজের প্রতি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি যেমন রাখিতে হয়, তেমনি নূর পতন স্থানে এবং নূরের বর্ণের প্রতি খেয়াল রাখিতে হয়। শোগলে ধীর স্থির হইয়া বসা যেমন শর্ত নয়, ঠিক তেমনি নূর-নির্গত স্থানের প্রতিও খেয়াল রাখার দরকার নাই। শোগল সকল সময়ের জন্য।
তরিকতে নব শিক্ষার্থীর শোগলঃ-
চলিতে-ফিরিতে, উঠিতে-বসিতে-হাটিতে তথা সর্বাবস্থায় কৃত কার্য-কলাপের প্রতি শিক্ষার্থীর প্রাথমিক পর্যায়ে যেমন তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখিতে হয়, ঠিক তেমনি সকল সময় কালবে আল্লাহ আল্লাহ জেকের হইতেছে-এই খেয়াল করিতে হয়। কালবে আল্লাহ আল্লাহ জেকের হইতেছে-এই খেয়ালে দুনিয়াবী কাজ করিলে তাহাও ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত বলিয়া পরিগণিত হয়।
প্রাথমিক পর্যায়ে মুরীদকে আরও খেয়াল করিতে হয় যে, তাহার সমুদয় কার্য-কলাপ এবং মনের সর্ববিধ চিন্তা ও কল্পনা মহান খোদাতায়ালা দেখিতেছেন। এই প্রসংগে আল্লাহপাক সূরা নিসায় বলেন, "নিশ্চয় আল্লাহতায়ালা তোমাদের সকলের খবর রাখেন। "আল্লাহপাক পবিত্র কুরআনে আরও বলেন,
إِنَّهُ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ -
অর্থাৎ-"তিনি তো অন্তরের অন্তস্থলেরও খবর রাখেন"।
কাজেই মহান খোদাতায়ালা প্রকাশ্য ও গুপ্ত, জাহের ও বাতেন সমস্ত অবস্থার খবর রাখেন। সর্বক্ষণ এই হিসাব রাখা ও খেয়াল করাও শোগল। ইমাম গাজ্জালী (রঃ) তাঁহার রচিত পুস্তকে একটি কাহিনীর উল্লেখ করিয়াছেন।
কাহিনীটি হইলঃ- কোন এক পীর ছাহেবের বহু মুরীদ ছিল। তন্মধ্যে তিনি একজনকে সর্বাপেক্ষা অধিক ভালবাসিতেন এবং কাজে কর্মে তাহার প্রতি সমধিক লক্ষ্য রাখিতেন। ইহাতে অন্যান্য মুরীদগণের মনে ভীষণ দুঃখ ও হিংসার উদয় হইল। পীর ছাহেব তাহাদের এই রূপ মনোভাব বুঝিতে পারিয়া একদিন কিছু সংখ্যক মুরীদকে ডাকিয়া প্রত্যেকের হস্তে এক একটি পাখী ও এক একখানী ছুরি প্রদান পূর্বক আদেশ করিলেন, "তোমরা নিজ হস্তস্থিত পাখীটিকে এমন স্থানে লইয়া গিয়া যবাই করিয়া আন যেখানে তোমাদের কার্য কাহারও দৃষ্টি গোচর না হয়। সকলেই পছন্দমত নির্জন ও নিভৃত স্থানে গিয়া পাখী যবেহ করিয়া আনিল।
কেবল মাত্র তাঁহার সেই প্রিয় মুরীদ নানাস্থানে ঘোরাফেরা করিয়া পরিশেষে পাখীটিকে যবাই না করিয়া জীবিত অবস্থায় সংগে লইয়া পীর ছাহেবের নিকট উপস্থিত হইয়া বলিতে লাগিল, "হুজুর, কেহ দেখিতে না পায় এমন স্থান কোথাও না পাইয়া আমি পাখীটিকে যবাই করিতে পারিলাম না। যেখানে গিয়াছি, আমার মনে হইয়াছে, আল্লাহতায়ালা আমার কার্য দেখিতেছেন।” তখন পীর ছাহেব দরবারে উপস্থিত সকল মুরীদকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, "এই ব্যাপারটি হইতে তোমরা এই লোকটির মর্যাদা বুঝিয়া লও। এই মুরীদ এমন স্তরে উন্নীত হইয়াছে যে, সর্বদা আল্লাহতায়ালার মহিমা সন্দর্শনে নিমজ্জিত আছে। আল্লাহ ভিন্ন অন্য কোন ব্যক্তি, বস্তু বা বিষয়ের প্রতি ভূক্ষেপও সে করে না। এই কারণেই স্বভাবতই তাহার প্রতি আমার স্নেহ একটু বেশী।"
আল্লাহপাক তাহার পবিত্র জাতকে বা শ্রবণকারী ও দর্শনকারী বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন। আবার মানুষ সম্পর্কে তিনি বলেন যে, "নিশ্চয় মানুষকে শুক্রবিন্দু হইতে সৃষ্টি করিয়াছি এবং তাহাকে শ্রবণকারী ও দর্শনকারী করিয়াছি।"
আল্লাহপাক শোনেন এবং দেখেন। আবার মানুষও শোনে ও দেখে। একই শব্দ স্রষ্টা ও সৃষ্টি উভয়ের ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা হইলেও আল্লাহ ও মানুষের শোনা ও দেখার মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাৎ।
মানুষ নিকটে দেখে, দূরে দেখিতে পারে না; সম্মুখে দেখে, পিছনে দেখিতে পারে না; বর্তমান দেখে, অতীত বা ভবিষ্যতের কিছু দেখিতে পারে না। মানুষ জাহের বা প্রকাশ্য অবস্থা দেখিতে পারে, গুপ্ত বা অন্তর দেখিতে পারে না। অর্থাৎ মানুষের দর্শন সর্বদাই ত্রুটিপূর্ণ থাকে।
কিন্তু আল্লাহতায়ালার দর্শন মানুষের মত নয়। আল্লাহতায়ালা প্রকাশ্য অবস্থা যেমন দেখেন, অন্তরও তেমন দেখেন, আল্লাহতায়ালার দর্শন দিকের সাথে সম্পর্কিত নয়। তিনি নিকটে বা দূরে, অতীত, বর্তমান বা ভবিষ্যৎ একই রকম দেখিতে পান। সমস্ত বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের প্রত্যেক রেণু-পরমাণুই তদীয় দর্শন ক্ষেত্রের ভিতরে।
দর্শনের মত আল্লাহতায়ালার অন্যান্য গুণাবলীকেও চিন্তা করিতে হইবে। বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের মধ্যে যখন যেখানে যে শব্দ উচ্চারিত হয়, তাহা তিনি শুনিতে পান। মানুষ মনে মনে যে কথা বলেন, আল্লাহতায়ালা মানুষের প্রকাশ্য কথার মতই তাহা শুনিতে পান।
কাজেই তোমরা পৃথিবীর যেখানেই থাক না কেন, যে কর্মই কর না কেন, প্রকাশ্য বা গোপনে যে কথাই বল না কেন, মহান খোদাতায়ালা সব কিছুরই খবর রাখেন। তুমি যদি এই খেয়াল বা ধ্যান সব সময়ের জন্য করিতে পার যে, আমি যাহা কিছুই করি না কেন, আল্লাহতায়ালা দেখিতেছেন, প্রকাশ্য বা গোপনে যাহা কিছুই বলি না কেন, আল্লাহতায়ালা তাহা শুনিতেছেন; তাহা হইলে কোন পাপ বা অন্যায়ই তোমাকে স্পর্শ করিতে পারিবে না। আর সর্বক্ষণ এই খেয়াল বা ধ্যান করাই শোগল। খোদাপ্রাপ্তির পথে শোগলের খুবই প্রয়োজন। দুনিয়াবী কাজেও শোগলের প্রয়োজন।
এতক্ষণ যাহা বলা হইল, তাহা মুরীদের প্রাথমিক পর্যায়ের শোগল। কিন্তু যে সমস্ত মুরীদের লতিফা সমূহ জাগ্রত তাহাদের শোগল হইলঃ-লতিফা সমূহের প্রতি নযর রাখা, লতিফা সমূহের উপর যে বর্ণের নূর পতন হয়, তাহার দিকে খেয়াল রাখা এবং লতিফা সমূহের জেকেরের প্রতি খেয়াল রাখা। এই হিসাব-নিকাশ ও ধ্যান বা খেয়াল সকল সময় করিতে হয়। নিয়ম মত শোগল করিলে প্রথমে দেলে এবং পরে ধীরে ধীরে দেহের সমস্ত লতিফাতেই নূরের সংযোগ হয় ও অধিক হারে নূর আসিতে থাকে। ধীরে ধীরে মুরীদের অযুদ রাজ্য এক অতি উজ্জ্বল নূর পিন্ডে পরিণত হয়, যে পিন্ড হইতে সদা সর্বদা কোটি কোটি মুখে আল্লাহর জেকের হইতে থাকে, মুরীদ তাহা শুনিতে পায় এবং অনাবিল শান্তি ও তৃপ্তি পায়।
এই ভাবে মুরীদ পীরের নির্দেশিত পথে তরিকতের পাঁচ রোকন তথা জেকের, রাবেতা, মুরাকাবা, মোহাছাবা ও শোগল করিতে করিতে মোশাহেদার সড়ক পথে চলিয়া সমুদয় মাকাম পার হইয়া খোদাতায়ালার সান্নিধ্য অর্জন করে, রেজামন্দী হাছিল করে।
কাজেই তোমরা যদি খোদাতায়ালাকে পাইতে চাও, অনাবিল শান্তির অধিকারী হইতে চাও, তাহা হইলে জাহেরা শরীয়তের রোকনসমূহের সাথে সাথে তরিকতের রোকন সমূহের উপর আমল কর। তরিকতের ওজিফা সমূহ ঠিক ঠিক মত প্রতিপালন কর। আল্লাহপাক তোমাদের কামিয়াবী বখশিস করুন। আমীন!








