পৃথিবীতে নবী ও রাসূল (আঃ) এবং মুজাদ্দেদ প্রেরণের উদ্দেশ্য

খোদাপ্রাপ্তি জ্ঞানের আলোকে শাহ্সূফি হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ও খাজা বাকীবিল্লাহ (রঃ) بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ (বিষয়বস্তুঃ পূর্ববর্তী প্রধান প্রধান ওলী-আল্লাহগণের ভবিষ্যদ্বাণীর ভিত্তিতে তরিকতের ইমাম শায়খ আহমদ সেরহেন্দী হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের শ্রেষ্ঠত্ব নিরুপণ)
বিজ্ঞাপন
পৃথিবীতে নবী ও রাসূল (আঃ) এবং মুজাদ্দেদ বা সংস্কারক প্রেরণের উদ্দেশ্যঃ
আল্লাহপাক মানুষকে সৃষ্টি করিয়াছেন তাহার পরিচয় গ্রহীতা ও প্রেম গ্রহীতা হিসেবে। মানুষ আল্লাহপাকের নাম ও গুণাবলীর প্রকাশস্থল হইবে-ইহাও মানব সৃষ্টির এক মহৎ উদ্দেশ্য। মানুষকে সৃষ্টি করিয়া আল্লাহপাক দুনিয়ায় পাঠাইয়া তদীয় প্রতিনিধিত্ব দান করিয়াছেন, আরও দান করিয়াছেন ১৮০০০ আলম'-এর উপরে মানুষের ছদারী করিবার ক্ষমতা। কিন্তু দুনিয়ায় আসিয়া মানুষ বেমালুম ভুলিয়া গিয়াছে তাহার সৃষ্টির উদ্দেশ্য, ভুলিয়া গিয়াছে পরিচয় গ্রহণের কথা; বিস্মৃত হইয়াছে আলমে আরওয়াহতে' দেওয়া ওয়াদার কথা। পার্থিব মোহ, শয়তানের কু-মন্ত্রনা ও নাফসের ধোকায় মানুষ অন্ধ।
সেই ধোকায় পড়িয়া মানুষ পাপাচার ও কুসংস্কারের অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়; আল্লাহকে ভুলিয়া যায়; ভুলিয়া যায় তাহার আদি আবাসস্থলের কথা। কিন্তু আল্লাহ পাক মানুষকে ভালবাসেন; প্রেমের কারণেই তিনি মানব সৃষ্টি করিয়াছেন। কাজেই এই মানুষ পথভ্রষ্ট হউক, শয়তানী কুহকে ও নাফসের ফেরেব' এ পড়িয়া সে ধ্বংস হউক-ইহা দয়াময় খোদাতায়ালা চান না।
বিজ্ঞাপন
তাই মানুষকে পাপাচার, অসত্য ও কুসংস্কারের অন্ধকার থেকে উদ্ধারের জন্য, গোমরাহী ও ভ্রষ্টতা থেকে মুক্তি দানের জন্য, সত্যের নূর প্রদানের জন্য অর্থাৎ নাফসের করাল গ্রাস থেকে মুক্ত করিয়া নিজ নাম ও গুণাবলীর প্রকাশস্থলের যোগ্যতা প্রদানের জন্য; যখনই প্রয়োজন বোধ করিয়াছেন, তখনই নবী বা পয়গম্বর প্রেরণ করিয়াছেন।
এই ভাবে যুগে যুগে এক লক্ষ চব্বিশ হাজার, মতান্তরে দুই লক্ষ ২৪ হাজার পয়গম্বর প্রেরণ করিয়াছেন, কাহারো কাহারো নিকট দিয়াছেন পথ চলার নিয়মপদ্ধতি সম্বলিত বিধান পুস্তক বা আসমানী কিতাব। সর্বশেষে আগমন করেন নবীকুল শিরোমণি, সারওয়ারে কায়েনাত, মোফাখারে মওজুদাত হযরত আহমদ মুজতবা মুহাম্মদ মোস্তফা (সাঃ)। শেষ নবী ও রাসূল (সাঃ) এর উপর সম্পন্ন হয় মানবজাতি ও অন্যান্য সৃষ্টির প্রতি আল্লাহপ্রদত্ত যাবতীয় নেয়ামতের পরিপূর্ণতা প্রদান।
রাসূলে পাক (সাঃ) এর পর আর কোন নবী আসিবেন না। তাহা হইলে কে আল্লাহর দীন হেফাজত করিবে? আল্লাহপাকই সেই ব্যবস্থা করেন। নিজ মনোনীত ধর্মকে জীবিত রাখিবার জন্য; গোমরাহী, শেরেকী ও বেদাতীর বিষাক্ত ছোবল থেকে ইসলামকে হেফাজতের জন্য প্রত্যেক শতাব্দিতেই মুজাদ্দেদ বা সংস্কারক প্রেরণের ব্যবস্থা করেন। রাসূলে পাক (সাঃ) এর পর থেকে আজ পর্যন্ত মুজাদ্দেদ বা ধর্মের সংস্কারক আগমনের ধারা অব্যাহত রহিয়াছে। কেয়ামত পর্যন্ত এই ধারা চালু থাকিবে। রাসূলে পাক (সাঃ) এর পরে সমস্ত উম্মতে মুহাম্মদীর মধ্যে সাহাবাদের দল শ্রেষ্ঠতম। সেই দলের শ্রেষ্ঠতম পুরুষ হযরত আবুবকর সিদ্দিক (রাঃ) ছাহেব।
বিজ্ঞাপন
সাহাবাদের যুগের পর হইতে আজ অবধি যত সাধক, যত মুজাদ্দেদ বা সংস্কারক, যত ওলী-আল্লাহ জগতের বুকে আবির্ভূত হইয়াছেন, তাঁহাদের সকলের মধ্যে ইমামে রাব্বানী, কাইউমে জামানী, গাউছে ছামদানী, হযরত শায়খ আহমদ সেরহেন্দি (রাঃ) ছাহেবের আসন বা মর্যাদা শীর্ষে। কেন তিনি শ্রেষ্ঠতম ওলী? কোন্ কোন্ কর্মকান্ডের ভিত্তিতে তিনি এমন উচ্চ আসন লাভ করিয়াছেন? সেই বিষয়ে মুজাদ্দেদীয়া তরিকার প্রত্যেক অনুসরণকারীরই কিছু না কিছু জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। এই অধ্যায়ে তাঁহার শ্রেষ্ঠত্বের কিঞ্চিত পরিচয় পাওয়া যাইবে।
সেরহিন্দের পরিচয় এবং সেরহিন্দে মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের জন্মের পূর্বাভাসঃ
হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের জন্মস্থানের নাম সেরহিন্দ-যাহা পূর্ব পাঞ্জাবের ফতেহগড় তহসীলে অবস্থিত। এই অঞ্চল ছিল গভীর জংগলাকীর্ণ; বাঘ-সিংহের আবাসস্থল। হিন্দী ভাষায় "সেহের" শব্দের অর্থ সিংহ এবং 'রিন্দ' অর্থ বন বা অরণ্য। সুতরাং সেহেররিন্দ অর্থ সিংহের আবাসারণ্য বা বাসের অরণ্য। সেরহিন্দ শব্দটি হিন্দী "সেহেররিন্দ" শব্দের অপভ্রংস বা পরিবর্তিত রূপ।
বিজ্ঞাপন
"মুজাদ্দেদে আজম" নামক পুস্তকে ঐতিহাসিক মাওলানা মুহাম্মদ হালিম সাহেব উল্লেখ করিয়াছেনঃ ফিরোজ শাহ তুঘলকের শাসনামলে একবার কয়েক জন রাজকর্মচারী সরকারী তহবিল লইয়া লাহোর হইতে দিল্লী আসিতেছিলেন। তাহাদের কাফেলায় একজন অন্তর দৃষ্টি সম্পন্ন বুজুর্গ ছিলেন। আসিবার পথে যখন সেই কাফেলা সেরহিন্দ নামক গভীর জংগলের নিকটে পৌঁছায়, তখন উক্ত বুজুর্গ তাহার দিব্যদৃষ্টিতে দেখিতে পান যে, অদূর ভবিষ্যতে ঐ সেরহিন্দ জংগল একজন বিশিষ্ট ওলী-আল্লাহর পদস্পর্শে ধন্য হইবে।
পরবর্তীতে সেই বুজুর্গ বিষয়টি ফিরোজশাহ তুঘলকের মোর্শেদ হযরত সৈয়দ জালালুদ্দিন বুখারী ওরফে মখদুম জাহানিয়া (রঃ) ছাহেবের সাথে আলোচনা করেন। ইহা শুনিবা মাত্র তিনি আনন্দিত হন এবং বাদশাহ ফিরোজ শাহকে জানান যে, হিজরী ৭৬০ সাল থেকে আমাদের তরিকায় ধারাবাহিক ভাবে এইরূপ অসিয়ত চলিয়া আসিতেছে যে, রাসূলে করীম (সাঃ) এর জামানার এক হাজার বছর পর হিন্দুস্থানে একজন বিশিষ্ট মহাপুরুষের আর্বিভাব হইবে, যিনি তাহার যুগের ইমাম ও মুজাদ্দেদ হইবেন এবং তিনি বেলায়েত ও 'নবুয়তের নিগুঢ়তত্ত্বে অভিজ্ঞ হইবেন। বিগত ওলীগণের সমস্ত নেয়ামত তিনি হাছিল করিবেন। আজ সেরহিন্দ জংগলে সেই মহান মুজাদ্দেদের বিকাশের ইংগিত পাওয়া গিয়াছে। কাজেই বিলম্ব না করিয়া উক্ত স্থান আবাদীর বন্দোবস্ত করা হউক।
বিজ্ঞাপন
পীরের নির্দেশে বাদশাহ ফিরোজ শাহ সেরহিন্দ আবাদের উদ্দেশ্যে তথায় প্রথমে একটি দুর্গ নির্মাণের আদেশ প্রদান পূর্বক উজির খাজা ফতেহ উল্লাহকে দায়িত্ব অর্পণ করেন। উজির ছাহেব সেইদিনই বেশ কয়েক হাজার লোকজনসহ সেখানে গমন করেন এবং একটা উচুস্থান বাছিয়া দুর্গ নির্মাণের জন্য ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।
তৎপর দ্রুত গতিতে কার্য শুরু করেন। কিন্তু সারাদিনে যেইটুকু কাজ করা হয় অর্থাৎ দুর্গের যেইটুকু নির্মাণ করা হয়, রাত্রিতে আপনা-আপনিই সেই অংশটুকু ধ্বংস হইয়া যায়, এমনি ভাবে দিনের কর্ম রাত্রেই শেষ হইয়া যায়। কারণ উৎঘাটনের চেষ্টা করা হইল, কিন্তু রহস্য কিছুই বুঝা গেল না। অতঃপর উজির ব্যাপারটি বাদশাহকে অবহিত করিলে বাদশাহ ঘটনাটি তদীয় পীর হযরত মখদুম (রঃ) ছাহেবকে জানান।
বিজ্ঞাপন
হযরত মখদুম (রঃ) ছাহেব স্বীয় খলিফা ও উজিরের ছোট ভাই শাহ রফিউদ্দীন হইতে নির্দেশ দেন এবং উক্ত স্থানের কুতুবিয়াত ও বেলায়েতও শাহ (রঃ) কে এই দায়িত্ব সমাপনের ভার অর্পণ করিয়া তখনই রওয়ানা রফিউদ্দিন (রঃ) কে দান করেন। হযরত শাহ রফিউদ্দিন (রঃ) ছাহেব ঘটনাস্থলে উপস্থিত হইয়া অন্তর্দৃষ্টির মাধ্যমে দেখিতে পান যে, কর্মচারীবৃন্দ জোর জবরদস্তিভাবে হযরত শাহ শরফ বুআলী কলন্দর (রঃ) কে বিনা মজুরিতে কাজ করাইতেছে। ইহাতে রাজ কর্মচারীদের উপর গোস্বা হইয়া হযরত শাহ শরফ বু-আলী কলন্দর (রঃ) ছাহেব স্বীয় আত্মিক শক্তির প্রভাবে দিনে প্রস্তুতকৃত দুর্গের অংশ রাত্রিকালে ভাংগিয়া ফেলেন।
হযরত শাহ রফিউদ্দিন (রঃ) ছাহেব বু-আলী (রঃ) ছাহেবকে সনাক্ত করিয়া তাহার সমীপে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। তখন হযরত কলন্দর (রঃ) বলেন, "আল্লাহ পাকের ইচ্ছায় আপনি এখানে আগমন করিয়াছেন। এখন দুর্গ নির্মাণ করিতে পারেন। আমি আপনাকে সুসংবাদ প্রদান করিতেছি যে, কয়েকশত বছর পরে এই স্থানে আপনার বংশধরদের মধ্যে একজন ওলীয়ে বরহক বা সত্য ওলীর জন্ম হইবে; যিনি বেলায়েতের এক গৌরবময় স্থান লাভ করিবেন।" অতঃপর উভয়েই একত্রে বিছমিল্লাহ বলিয়া নতুনভাবে দুর্গের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করিলেন। অতি অল্প সময়ের মধ্যেই এক দুর্ভেদ্য দুর্গ তৈরী করা সম্ভব হইল।
পরবর্তীতে শহরটি আবাদ হয় এবং ১২ মাইল বিস্তৃত এক জাঁকজমকপূর্ণ শহরে রূপ লাভ করে। সম্রাট আওরঙ্গজেবের আমলে এই শহরটি শিখ সম্প্রদায়ের দ্বারা লুণ্ঠিত হয়। এখানে যে শাহী কেল্লা নির্মিত হয়, শিখ সম্প্রদায় তাহার কিছু অংশ ধ্বংস করিয়া সেখানে গুরুদুয়ারা প্রতিষ্ঠা করে। এখনও সেই গুরুদুয়ারা বর্তমান। প্রতিবছর তাহার আশে পাশে বিরাট মেলা অনুষ্ঠিত হয়।
বিজ্ঞাপন
এতক্ষণ সেরহিন্দ শহরের পরিচয়ের কিছুটা তুলিয়া ধরা হইল। এই সেরহিন্দ শহরটি যে মহাপুরুষের পদধুলিতে ধন্য, সেই মহান সাধক হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের শুভ আগমন উপলক্ষে আরও যে সকল সাধক ভবিষ্যদ্বাণী করিয়াছেন, তাহাদের মধ্যে গউসপাক হযরত আব্দুল কাদের জেলানী (রাঃ) ছাহেব ও হযরত শায়খ আহমদ জাম (রঃ) ছাহেবের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ যোগ্য।
পূর্বকালীন ওলী-আল্লাহগণের ভবিষ্যদ্বাণীঃ
'রওজাতুল কাইউমিয়া' নামক পুস্তকে প্রকাশ, হযরত আব্দুল কাদের জেলানী (রঃ) ছাহেব একদা গভীর মোরাকাবায় নিমগ্ন। হঠাৎ তিনি কাশফে দেখিতে পান যে আসমান থেকে একটি নূর প্রকাশ পাইয়া সমস্ত বিশ্ব আলোকিত করিল। এই সময় এলহাম যোগে তাহাকে জানানো হয় যে, আজ থেকে পাঁচশত বছর পরে যখন পৃথিবী শেরেক ও বেদাতের ঘন অন্ধকারে আচ্ছন্ন হইবে, তখন উম্মতে মুহাম্মদীর মধ্যে এক অসাধারণ ব্যক্তি জন্ম গ্রহণ করিবেন; তিনি দুনিয়া হইতে শেরেক ও বেদাতের মূল উচ্ছেদ করিবেন। তাহার ছহব্বত স্পর্শমণিতুল্য হইবে। তাহার পুত্রগণ ও খলিফাগণ দীনী খেদমত উত্তমরূপে সম্পাদন করিবেন। অতঃপর কামালাতের নিদর্শনস্বরূপ আপন খাছ খেরকাকে স্বীয় পুত্র সৈয়দ তাজুদ্দীন আব্দুর রাজ্জাক (রঃ) কে সোপর্দ পূর্বক আদেশ করেন যে, যখন ঐ বুজুর্গ প্রকাশ লাভ করিবেন, তখন যেন ইহা তাহাকে প্রদান করা হয়। পরবর্তীতে সেই পবিত্র খেরকা মোবারক' পর্যায়ক্রমে হস্তান্তরিত হইয়া হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের হাত মোবারক পর্যন্ত পৌঁছাইয়াছিল।
বিজ্ঞাপন
হিজরী পঞ্চম শতকের মাঝামাঝি হযরত শায়খ আহমদ জাম (রঃ) ছাহেব ভবিষ্যৎ বাণী করেন যে, তাঁহার চার শত বৎসর পর ইসলাম জাহানে আহমদ নামে একজন বুজুর্গ ব্যক্তি জন্ম লাভ করিবেন, যিনি মৃতপ্রায় ইসলামকে পুনরুজ্জীবিত করিবেন।
পিতা হযরত আব্দুল আহাদ (রঃ) ছাহেবের কাশফে পুত্রের আগমনের ইশারাঃ
মাওলানা হাসান কাশ্মিরী (রঃ) ছাহেব "রওজাতুল কাইউমিয়া” গ্রন্থে উল্লেখ করিয়াছেন, ইমামে রাব্বানী হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের জন্মের কিছু দিন পূর্বে তাহার পিতা শায়খ হযরত আব্দুল আহাদ (রঃ) ছাহেব মোরাকাবায় নিমগ্ন অবস্থার কাশফি দৃষ্টিতে অবলোকন করেন যে, সমস্ত পৃথিবী নিবিড় অন্ধকারে আচ্ছন্ন। আর সেই অন্ধকারের মধ্যে বাঘ, ভালুক, শুকর, বানর প্রভৃতি হিংস্র জন্তু মানব বংশকে আক্রমণ করিয়া ক্ষত বিক্ষত করিতেছে। এমন সময় হঠাৎ তাহার বক্ষদেশ হইতে একটি অতি উজ্জল নূর বাহির হইল। সেই নূরের আলোয় আলোকিত হইল সারা বিশ্ব এবং উক্ত নূর হইতে একটি বিদ্যুত চমকিয়া সমস্ত বাঘ, ভালুক, শুকর ইত্যাদিকে জ্বালাইয়া ফেলিল। তিনি সেই নূরের মধ্যে দেখেন একটি সিংহাসন, যাহাতে একজন জ্যোতির্ময় পুরুষ নূরানী তাকিয়ায় হেলান দিয়া উপবিষ্ট এবং হাজার হাজার নূরানী লোক ও আসমানের ফেরেশতা তাহার সামনে আদবের সাথে দন্ডায়মান। তিনি আরও দেখেন, পৃথিবীর সমস্ত অত্যাচারী, পাপাচারী, ধর্মভ্রষ্ট, বিধর্মী ও নাস্তিককে তাহার সামনে আনিয়া ভেড়া-বকরীর ন্যায় জবাই করা হইতেছে এবং এক ব্যক্তি ঘোষণা করিতেছে-"ওয়া কুল জা-আল হাককু, ওয়া যাহাকাল বাতিলু, ইন্নাল বাতিলা কানা জাহুকা"-অর্থাৎ সত্য আসিয়াছে; মিথ্যা ধ্বংস হইতে চলিয়াছে। বস্তুতঃ মিথ্যার ধ্বংস অবধারিত।
বিজ্ঞাপন
মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের পিতা হযরত শায়খ মখদুম আব্দুল আহাদ এই বিষয়টি সেই জামানার শ্রেষ্ঠ বুজুর্গ হযরত শাহ কামাল কায়থেলী (রঃ) ছাহেবের নিকট বর্ণনা করিয়া ব্যাখ্যা চাহিলে তিনি হযরত আব্দুল আহাদ (রঃ) ছাহেবকে বলেন যে, অচিরেই আল্লাহতায়ালা আপনাকে এমন একটি পুত্র সন্তান দান করিবেন; যে এই দেশ হইতে সমস্ত বেদাত ও নাস্তিকতার মূল উচ্ছেদ করিয়া সুন্নতে মুহাম্মদীকে জারী করিবেন।
জন্ম ও জন্মকালীন সময়ে রূহানীভাবে সকল আম্বিয়া ও আউলিয়াকেরামের আগমনঃ
হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব হিজরী ৯৭১ সালের ১৪-ই শাওয়াল ইংরেজী ১৫৬১ খৃষ্টাব্দ মোতাবেক শুক্রবার, দিবাগত রাত্রি এই নশ্বর নরাধামে আগমন করেন। কিতাবে দেখা যায়, তাহার কুনিয়াত ছিলো আবুল বারাকাত এবং লকব ছিলো বদরুদ্দিন।
বিজ্ঞাপন
হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের জননী বলেন, আমার প্রসব বেদনা শুরু হইলে এক পর্যায়ে আমি জ্ঞান হারাইয়া ফেলি। সেই অবস্থায় দেখিতে পাই যে, উম্মতে মুহাম্মদীর সমস্ত আউলিয়া কেরাম রূহানী ভাবে আমার গৃহে তশরিফ আনিয়াছেন। অতঃপর আমার একটি পুত্র সন্তান ভূমিষ্ট হয়। এমন সময় আমি একটি গায়েবী আওয়াজ শুনিতে পাই। কে যেন আমাকে বলিলেন, আল্লাহতায়ালা শায়খ আহমদকে সর্ব বিষয়ে কামালিয়াত বা পরিপূর্ণতা দান করিয়াছেন।
মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের পিতা হযরত আব্দুল আহাদ (রঃ) ছাহেব বলেন-“শায়খ আহমদের জন্মোপলক্ষ্যে আমি দেখিতে পাই যে, হযরত রাসূলে পাক (সাঃ) সকল আম্বিয়ায়ে কেরাম ও অসংখ্য ফেরেশতাসহ আমার গৃহে পদার্পণ করিয়াছেন এবং নবজাত শিশুকে মোবারকবাদ জানাইতেছেন। রাসূলে পাক (সাঃ) নিজেই নব জাতকের কর্ণে আযান ও একামত দিতেছেন।"
শৈশবেই চিশতিয়া তরিকার নেয়ামত প্রাপ্তিঃ
হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের শৈশব কালীন একটি ঘটনা। তিনি তখনও দুগ্ধপোষ্য শিশু। হঠাৎ তিনি অসুস্থ হইয়া পড়েন এবং রোগাবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটে। তদীয় মা-বাবা ও আত্মীয় স্বজন তাঁহার জীবন সম্পর্কে হতাশায় পড়েন। এমন সময় ঘটনাক্রমে হযরত শাহ কামাল কায়থেলী (রঃ) ছাহেব সেরহিন্দ শরীফে তশরীফ আনেন। তাঁহার আগমনের সংবাদ পাইয়া হযরত আব্দুল আহাদ (রঃ) ছাহেব রুগ্ন শিশুকে লইয়া তাহার নিকটে যান। শিশুকে দেখা মাত্রই হযরত শাহ ছাহেব ভাববিহবল অবস্থায় বলিয়া ফেলেন, "আল্লাহতায়ালা এই শিশুর হায়াত দারাজ করুন। এই শিশুর ভবিষ্যত অতি উজ্জল। পরিণত বয়সে সে একজন আরেফে কামেল ও হক্কানী আলেম হইবে এবং আমার মত হাজার হাজার লোক তাঁহার আত্মিক তালিম' দ্বারা অশেষ ফায়েদা হাছিল করিবে। তাঁহার মাধ্যমে খোদাতত্ত্বজ্ঞানের যে আলোক সারা দুনিয়ায় ছড়াইবে, তাহা কেয়ামত পর্যন্ত কখনও নিষ্প্রভহইবে না। যামানার সমস্ত আউলিয়া কেরাম তাঁহার জন্য সপ্রতীক্ষ রহিয়াছেন।" অতঃপর হযরত শাহ ছাহেব তাঁহাকে নিজের ক্রোড়ে লইয়া নিজ পবিত্র জিহ্বা তাঁহার মুখের মধ্যে ঢুকাইয়া দিলেন। শিশু মুজাদ্দেদ (রাঃ) অনেকক্ষণ পর্যন্ত উক্ত জিহ্বা লেহন করেন। তৎপর শাহ কায়থেলী (রঃ) ছাহেব তাঁহার পিতাকে সান্তনা দিয়া বলেন, "চিন্তা করিবেন না, ইনশাআল্লাহ শিশু আরোগ্য লাভ করিবে। শিশু চিতিয়া তরিকার সমস্ত নেয়ামত অর্জন করিল। আল্লাহতায়ালা এই শিশুর দ্বারা অনেক কাজ করাইবেন।"
পূর্বাভাসের তাৎপর্যঃ
হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের জন্মকালীন সময়ের বা জন্মপূর্ব কালীন সময়ের যে সকল পূর্বাভাস বা ইশারা ইংগিত উপরের আলোচনায় সন্নিবেশিত হইল-তাহা সমুদয়ই হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা সম্পর্কে কিঞ্চিত পরিমাণ হইলেও পাঠকের মনে ধারণার সৃষ্টি করিবে। বর্ণিত সকল পূর্বাভাস পূর্ণাংগ বুঝিতে হইলে মুজাদ্দেদ ছাহেবের সারা জীবনের কর্মকান্ড তথা সংস্কারধর্মী কার্যকলাপ ও দীন ইসলামের হেফাজতে তাহার বলিষ্ঠ ভূমিকা এবং মারেফাত চর্চা বা খোদাতত্ত্বজ্ঞান সম্পর্কিত যে নেয়ামত তিনি রাখিয়া যান-তাহার বিশ্লেষণ প্রয়োজন। পরবর্তী নসিহত সমূহে সে সম্পর্কে আলোচনা করার আশা রহিল।
পৃথিবীতে এক লক্ষ বা দুই লক্ষ চব্বিশ হাজার পয়গম্বর আগমন করিয়াছেন। তাহাদের মধ্যে অল্প কয়েকজন পয়গম্বরের সংবাদ কুরআন হাদীসে পাওয়া যায়। লক্ষ লক্ষ পয়গম্বরের মধ্যে উলুল আজম পয়গম্বর মাত্র কয়েকজন। হযরত মুসা (আঃ), হযরত ইব্রাহিম (আঃ), হযরত ঈসা (আঃ)-সকলেই উলুল আজম পয়গম্বর।
পৃথিবীতে তাঁহাদের আগমনের পূর্বে কম বেশী পূর্বাভাস পাওয়া গিয়াছে। কিন্তু সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ও রাসূল (সাঃ) এর আগমনের পূর্বে যত বেশী আগাম সংবাদ পাওয়া গিয়াছে, তত সংবাদ আর কোন পয়গম্বরের জীবন ইতিহাসে নাই। বরং সকল উলুল আজম পয়গম্বর (আঃ)-ই দয়াল নবী (সাঃ) এর আগমনের পূর্বে তাহার শ্রেষ্ঠত্ব ও বিশাল কর্মকান্ড সম্পর্কে আগাম সংবাদ প্রদান করিয়াছেন। পূর্ববর্তী ধর্মীয় আসমানী কিতাব সমূহে যেমন তাওরাত, যবুর, ইঞ্জিলে রাসূলে পাক (সাঃ) এর আগমন সংবাদ মিলে; তেমনি পাওয়া যায় "বেদ-পুরানে” বা বৌদ্ধদিগের ধর্মগ্রন্থ "দিবা নিকায়া-য়" অথবা পার্শী জাতীয় ধর্মগ্রন্থ "জিন্দাবেস্তা বা দসাতিরে"।
রাসূলে পাক (সাঃ) সম্পর্কে উল্লিখিত কিতাব সমূহে যে সকল পূর্বাভাস সন্নিবেশিত হইয়াছে, তাহার বিস্তারিত আলোচনায় আমি যাইতেছি না-শুধু বলিতেছি যে, দুনিয়ায় আগমনের পূর্বের উল্লিখিত ভবিষ্যদ্বাণী সমূহ রাসূলে পাক (সাঃ) এর শ্রেষ্ঠত্বেরই ইংগিতবাহক। তেমনি নবুয়তির দফতর শেষ হওয়ার পরে হাজার বছরের মধ্যে কোন ওলী-আল্লাহর জীবনেই এত বেশী জন্মপূর্ব আগাম সংবাদ সন্নিবিষ্ট হয় নাই, যেমন হইয়াছে হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের জীবনে। উক্ত সমস্ত পূর্বাভাসই যে মুজাদ্দেদ আলফেছানীর (রাঃ) শ্রেষ্ঠত্বের ইংগিত বাহক, তাহা আর উল্লেখের দাবী রাখে না।
পিতা হযরত আব্দুল আহাদ (রঃ) ছাহেবের পরিচয়ঃ
হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) এর পিতা হযরত আব্দুল আহাদ (রঃ) ছাহেব একজন বিশিষ্ট ওলী ছিলেন; এলমে শরীয়ত ও তরিকতের বিজ্ঞ আলেম ছিলেন। তিনি ৯২৭ সালে সিরহিন্দে জন্ম গ্রহণ করেন। যৌবনের শুরুতেই তিনি তদানিন্তন যুগশ্রেষ্ঠ ওলী-আল্লাহ হযরত শায়খ আব্দুল কুদ্দুস গাংগুহী (রঃ) ছাহেবের নিকট বায়াত হন এবং তাহার সান্নিধ্যে থাকিয়া তরিকত ও মারেফাত সাধনায় মশগুল হওয়ার আবেদন জানান। এমতাবস্থায় হযরত গাংগুহী (রঃ) ছাহেব তাহাকে বলেনঃ বৎস, প্রথমে এলমে শরীয়ত হাছিল কর; তৎপর মারেফাত সাধনায় আত্ম নিয়োগ কর, তাহা হইলে তুমি বেশী উপকৃত হইবে; কেননা বে-এলম দরবেশ নিমকহীন খাদ্যের তুল্য। কাজেই সর্ব প্রথমে এলমে শরীয়ত হাছিলের একান্ত প্রয়োজন। তোমার জাহেরী এলেম হাছিলের পূর্বেই যদি আমার মৃত্যু হয়, তবে আমার পুত্র রুকনুদ্দীনই তোমাকে এলমে মারেফাতের তালিম (শিক্ষা) দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
পীরের নির্দেশে হযরত আব্দুল আহাদ (রঃ) ছাহেব মাদ্রাসায় ভর্তি হইয়া শরীয়তের জ্ঞান আহরণে ব্রতী হন। কিন্তু মাদ্রাসার শিক্ষা শেষ না হইতেই হযরত আব্দুল কুদ্দুস গাংগুহী (রঃ) ছাহেব ইন্তেকাল করেন। কিতাবে দেখা যায়, মৃত্যুর পূর্বে হযরত গাংগুহী (রঃ) ছাহেব স্বীয় পুত্র ও খলিফা হযরত রুকনুদ্দিন (রঃ) কে এই মর্মে অসিয়ত করিয়া যান যে, তিনি যেন আব্দুল আহাদকে তরিকত, হকিকত ও মারেফাতের তালিম (শিক্ষা) দেন। যাই হোক, মাদ্রাসায় শিক্ষা সমাপ্ত করিয়া মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের পিতা হযরত আব্দুল আহাদ (রঃ) ছাহেব হযরত রুকনউদ্দিন (রঃ) ছাহেবের কদমে খেদমত করিয়া কাদেরিয়া, চিশতিয়া ও সাবেরীয়া তরিকার খেলাফত লাভকরেন। অতঃপর তিনি হযরত শাহ কামাল কায়থেলী (রঃ) ছাহেবের কদমে থাকিয়া কিছুদিন খেদমত করিয়া পৃথকভাবে কাদেরিয়া তরিকার খাছ নেছবত ও ফয়েজ লাভ করেন। এখানে উল্লেখ্য যে কাদেরিয়া তরিকায় গউস পাক হযরত আব্দুল কাদের জেলানী (রঃ) ছাহেবের পরে হযরত শাহ কামাল কায়থেলী (রঃ) ছাহেবের মত বুজুর্গ আর কেউ ছিলেন না।
এমনিভাবে হযরত আব্দুল আহাদ (রঃ) ছাহেব চিশতিয়া ও কাদেরীয়া তরিকার কামালিয়াত হাছিল করেন। বুজুর্গ হযরত আব্দুল আহাদ (রঃ) ছাহেবের ঘরেই ৯৭১ হিজরীর ১৪-ই শাওয়াল শুক্রবার জন্মগ্রহণ করেন হাজারী মুজাদ্দেদ শায়খ আহমদ সেরহিন্দী (রাঃ) ছাহেব।
মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের শিক্ষা জীবন-এলমে শরীয়ত ও তরিকতের জ্ঞান অর্জনঃ
হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব শৈশব অতিক্রম করিয়া কৈশোরে পদার্পণ করিলেন। সুযোগ্য পিতার তত্ত্বাবধানে থাকিয়া অল্প বয়সেই তিনি পবিত্র কুরআন শরীফ হেফজ করেন। অতঃপর পিতার নিকট হইতে এবং সেরহিন্দের অন্যান্য বড় বড় আলেমের নিকট হইতে শরীয়ত ও তরিকত ভিত্তিক কিতাবসমূহ অধ্যায়ন করেন। মাত্র ১৭ বছর বয়সের মধ্যে এলমে শরীয়ত ও এলমে মারেফাতের” জ্ঞানে জ্ঞানী হন।
ডঃ আ.ফ.ম. আবুবকর সিদ্দিক রচিত 'বিপ্লবী মুজাদ্দেদ' নামক গ্রন্থে দেখা যায় যে, হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব আপন পিতার খেদমত করিয়া চিশতিয়া তরিকার খেলাফত” হাছিল করেন। তৎপর পিতার নিকট হইতে কাদেরিয়া তরিকার সবক নেন এবং পরে তৎকালের কাদেরীয়া তরিকার অন্যতম শ্রেষ্ঠ দরবেশ হযরত শাহ সেকান্দার (রঃ) এর নিকট থেকে এই তরিকার খেলাফত লাভ করেন। তৎকালে 'কুরাবিয়া' তরিকার খুবই প্রসিদ্ধি ছিল। হযরত মাওলানা ইয়াকুব (রঃ) ছিলেন তৎকালে এই তরিকার প্রসিদ্ধ বুজুর্গ। কিছুদিন হযরত মাওলানা ইয়াকুব (রঃ) ছাহেবের সান্নিধ্যে থাকিয়া হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব উক্ত 'কুরাবিয়া' তরিকার খেলাফতও লাভকরেন।
ইহার কিছুদিন পরে তাহার শ্রদ্ধেয় পিতা ও মোর্শেদ হযরত আব্দুল আহাদ (রঃ) ছাহেব ইন্তেকাল করেন। ইন্তেকালের পূর্বে নিজ কালবে রক্ষিত সমস্ত বাতেনী নেয়ামত যোগ্য পুত্রের কালবে প্রদান করিয়া তাহাকে স্থলাভিষিক্ত করিয়া যান। তৎপর পিতার নির্দেশে তৎকালীন যুগের শ্রেষ্ঠ তরিকা-তরিকায়ে নশ্বন্দীয়ার কামালিয়াত হাছিল করিয়া এলমে শরীয়ত ও মারেফাতের মহা ভান্ডারে পরিণত হন।
নক্শবন্দীয়া তরিকার শ্রেষ্ঠত্বঃ
তৎকালীন সময়ে খোদা প্রাপ্তির জন্য যে কয়েকটি তরিকা পদ্ধতির প্রচলন ছিল তাহাদের মধ্যে কাদেরিয়া, চিশতিয়া, নকশবন্দিয়া, সাবেরিয়া উল্লেখযোগ্য। সমস্ত তরিকা পদ্ধতির মধ্যে নকশবন্দিয়া তরিকাই খোদাপ্রাপ্তির পথে সবচেয়ে সহজ ছিল। কারণ অন্যান্য তরিকায় যাত্রা শুরু হয় আলমে খালক' হইতে, আর নকশবন্দীয়া তরিকার যাত্রা শুরু হয় আলমে আমর" হইতে। ফলে আলমে খালকের ছায়ের আপনা থেকেই নকশবন্দিয়া তরিকায় সিদ্ধ হয়। অন্যান্য তরিকায় বহু বছর কঠোর পরিশ্রমের ফলে যেখানে পৌঁছানো যায়, নকশবন্দীয়া তরিকার শুরুই সেখান হইতে। হযরত বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (রঃ) ছাহেব বলেন, "হকের মারেফাত আমার জন্য হারাম, যদি হযরত বায়েজীদ বোস্তামীর শেষ অবস্থা আমার শুরুতে হাছিল না হয়।"
নকশবন্দীয়া তরিকার শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের পিতা হযরত আব্দুল আহাদ (রঃ) ছাহেব মাঝে মাঝেই বলিতেন, "খোদাপ্রাপ্তির দুর্গম পথ ও দায়েরার কেন্দ্র কেউ যদি পাইয়া থাকেন, তাহা হইলে তাহা নকশবন্দীয়া তরিকার ওলীরাই প্রাপ্ত হইয়াছেন। এই তরিকার নেছবত হাছিল করিবার মত কোন বুজুর্গ তখন না পাইয়া আফসোসের সুরে মাঝে মাঝে বলিতেন, কাশফের দৃষ্টিতে এই তরিকাটি কেন্দ্র এবং রাজপথের মত মনে হয়। কিন্তু বড় আফসোসের বিষয় এই যে, এই দেশে উক্ত তরিকার এমন কোন বুজুর্গ নাই, যাহার নিকট হইতে এই তরিকার নেয়ামত ও বরকত হাছিল করা যায়।"
যাহাই হোক, পিতা হযরত আব্দুল আহাদ (রঃ) এর ভাগ্যে ছিল না বিধায় নকশবন্দীয়া তরিকার নেছবত তিনি হাছিল করিতে পারেন নাই। কিন্তু পিতার নির্দেশে হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব নকশবন্দীয়া তরিকার নেছবত লাভের আশায় এই তরিকার বুজুর্গের সন্ধান করিতে লাগিলেন।
নক্শবন্দীয়া তরিকা গ্রহণ এবং এই তরিকার নেছবত ও খেলাফত প্রাপ্তিঃ
নকশবন্দীয়া তরিকা গ্রহণের Back Ground বা পটভূমির আলোচনায় "বিপ্লবী মুজাদ্দেদ" নামক গ্রন্থে দেখা যায়ঃ-নকশবন্দীয়া তরিকার একজন প্রসিদ্ধ কামেল ব্যক্তি হযরত আমকাংগী (রঃ) ছাহেব একদা কাশফে (অন্তর্দৃষ্টিতে) দেখিতে পান যে, নকশবন্দীয়া তরিকার প্রতিষ্ঠাতা হযরত বাহাউদ্দীন নকশবন্দ (রঃ) ছাহেব তাহাকে বলিতেছেন, "অনতিবিলম্বে ভারতবর্ষে হযরত নবী করীম (সাঃ) এর একজন খাছ প্রতিনিধি মনোনীত হইবেন। উম্মতে মুহাম্মদীর আউলিয়া দফতরে তাঁহার মর্যাদা সর্বোচ্চ। সমস্ত দুনিয়ার ওলী আবদাল সকলে তাহার আবির্ভাবের অপেক্ষায় আছেন। সেই মহা পুরুষ আমার এই তরিকার মধ্যেই আবির্ভূত হইবেন সুতরাং ভারতে আমার তরিকা প্রচারের জন্য কোন যোগ্য ব্যক্তিকে প্রেরণ করুন।"
অতঃপর খাজা আমকাংগী (রঃ) ছাহেব নকশবন্দীয়া তরিকার অন্যতম বুজুর্গ খাজা বাকীবিল্লাহকে (রঃ) দ্রুত দিল্লী গমনের নির্দেশ দেন। হযরত খাজা আমকাংগী (রঃ) ছাহেবের নির্দেশে হযরত খাজা বাকিবিল্লাহ (রঃ) ছাহেব সুদূর কাবুল হইতে দিল্লী গমনের প্রস্তুতি পর্বে একদা স্বপ্নে দেখেন যে, কোন একটি গাছের ডালে একটি সুন্দর তোতা পাখী বসিয়া আছে, আর তাহার সৌন্দর্যে তিনি মুগ্ধ হইয়া ভাবিতে লাগিলেন, যদি পাখীটি তাহার হাতে আসিয়া পড়িত! এই ভাবনার সাথে সাথেই পাখীটি উড়িয়া আসিয়া তাহার হাতে বসিল। "ইহা ছিল প্রকৃতপক্ষে তাহার ভারত সফরের সফলতার পূর্বাভাস।" তৎপর কালক্ষেপণ না করিয়া তিনি দিল্লী অভিমুখে রওয়ানা দেন। পথিমধ্যে যখন সেরহিন্দে পৌঁছান, স্বপ্নে তাহাকে জানানো হয় যে, তিনি হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের এলাকায় আসিয়া গিয়াছেন। অতঃপর হযরত বাকীবিল্লাহ (রঃ) ছাহেব দিল্লীতে আসিয়া পৌঁছান।
অন্যদিকে পিতার ইনতেকালের পর হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব হজ্জ্বের উদ্দেশ্যে বাহির হইয়া সেরহিন্দ হইতে দিল্লীতে পৌঁছাইয়া তাহার এক বন্ধু মাওলানা হাসান কাশ্মিরীর গৃহে অবস্থান করেন। অতঃপর মাওলানা ছাহেব কথা প্রসংগে নকশবন্দীয়া তরিকার শ্রেষ্ঠ বুজুর্গ হযরত বাকীবিল্লাহ (রঃ) ছাহেবের গুণাবলী ও তাহার দিল্লী অবস্থানের কথা হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের নিকট প্রকাশ করিলে, মুজাদ্দেদ (রাঃ) ছাহেব কালবিলম্ব না করিয়া এই উচ্চ তরিকার নেয়ামত লাভের আশায় অবিলম্বে খাজা বাকীবিল্লাহের দরবারে হাজির হন। হযরত বাকীবিল্লাহ (রঃ) ছাহেব তাহাকে দেখিবা মাত্র বলেন, "আপনি তো হজ্জের ছফরে রওয়ানা হইয়াছেন, পথিমধ্যে আমার এখানে কিছুদিন অপেক্ষা করুন।"
হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব একটানা মাত্র আড়াই মাস হযরত বাকীবিল্লাহের সান্নিধ্যে থাকিয়া এই তরিকার যাবতীয় নেছবত ও নেয়ামত হাছিল করেন। তৎপর আড়াই মাস পরে সেরহিন্দে ফেরত আসেন। কিছুদিন পর আবার দিল্লীতে পীরের সান্নিধ্যে গমন করেন। এইবার খাজা বাকীবিল্লাহ (রঃ) ছাহেব নিজ হাছিলকৃত সমুদয় বাতেনী এলেম হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবকে প্রদান করিয়া হেদায়েতের ঝান্ডা তাহার হস্তে অর্পণ করেন এবং স্বীয় সমুদয় মুরীদ ও খলিফাদের হেদায়েত ও প্রতিপালনের দায়িত্ব তাহার উপর সোপর্দ করিয়া তাহাকে সেরহিন্দে পাঠাইয়া দেন।
মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের কতিপয় পীর বা মোর্শেদ থাকা সত্ত্বেও বলা হয় যে, তাহার পীর স্বয়ং খোদাতায়ালা-কেন?
হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব পূর্বেই চিন্তিয়া, কাদেরিয়া, কুবরাবিয়া, সোহওয়ারদীয়া তরিকার নেছবত ও কামালিয়াত (পূর্ণতা) হাছিল করিয়া খেলাফত প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। সর্বশেষে নকশবন্দীয়া তরিকার অন্যতম শ্রেষ্ঠ বুজুর্গ হযরত খাজা বাকীবিল্লাহ (রঃ) ছাহেবের সান্নিধ্যে ও খেদমতে থাকিয়া এই তরিকারও নেছবত ও খেলাফত প্রাপ্ত হন। জাগতিক দৃষ্টিকোণ থেকে চিন্তা করিলে দেখা যায় যে, হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের কতিপয় পীর বা মোর্শেদ ছিলেন। যেমন হযরত বাকীবিল্লাহ (রঃ) ছাহেব তাহার পীর ছিলেন, তেমনি তদীয় পিতা হযরত আব্দুল আহাদ (রঃ)-যাহার নিকট থেকে তিনি চিশতিয়া ও কাদেরিয়া তরিকার ছবক ও তালিম নেন, তিনিও তাহার পীর বা মোর্শেদ ছিলেন। আবার হযরত মাওলানা ইয়াকুব (রঃ) ছাহেব ও হযরত শাহ সেকান্দার (রঃ) ছাহেবও তাহার মোর্শেদ বা পীর ছিলেন। কারণ তাহাদের নিকট থেকে তিনি 'কুরাবিয়া' ও কাদেরিয়া তরিকার খেলাফত প্রাপ্ত হন।
তথাপিও বলা হয় যে, আসমানের নীচে দুইজন সাধকের পীর স্বয়ং খোদাতায়ালা। প্রথমতঃ রাসূলে করীম (সাঃ) এর পীর খোদাতায়ালা এবং দ্বিতীয়তঃ হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের পীর স্বয়ং খোদাতায়ালা। রাসূলে করীম (সাঃ) এর পীর স্বয়ং খোদাতায়ালা, এই ব্যাপারে কাহারোও কোন দ্বিমত নাই। কিন্তু দুনিয়াতে মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের একাধিক পীর বা মোর্শেদ থাকা সত্ত্বেও কেন বলা হয় যে, তাঁহার পীর খোদাতায়ালা নিজে?
মূলতঃ মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের পূর্বে হাজার বছরের মধ্যে আগত ওলী-আল্লাহ সকল খোদাপ্রাপ্তির রাস্তায় কঠোর তপস্যার মাধ্যমে যে পরিমান মারেফাত হাছিল করিয়াছিলেন-তাহা ছিল মারেফাতের বাহির আবরণ মাত্র। হাজার বছরের মধ্যে সাহাবাদের পরে দুই এক জন সাধক মাত্র বেলায়েতে কোবরার মারেফাত হাছিল করিয়াছিলেন। তাহা ছাড়া সকলেই তাঁহাদের মারেফাত শেষ করিয়াছেন বেলায়েতে ছোগরায়'-যেখানে খুব সামান্য মারেফাতই মিলে।
কাজেই কাদেরিয়া, চিন্তিয়া, কুবরাবিয়া, নকশবন্দীয়া-তথা প্রচলিত সমুদয় তরিকার নেছবত ও কামালিয়াত মুজাদ্দেদ (রাঃ) ছাহেব সিদ্ধ করেন ঠিকই; কিন্তু তাহাতে তিনি যে পূর্ণাংগ ও বিশুদ্ধ মারেফাত লাভকরেন-তাহা নয়। বরং সমস্ত তরিকার নেছবত হাছিল হওয়ার পরে মহান খোদাতায়ালা হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবকে পূর্ণাংগ মারেফাত রাজ্য ঘোরানের দায়িত্ব নিজেই নেন এবং ধীরে ধীরে মারেফাত কারখানার সমুদয় দফতর ঘুরাইয়া ঘুরাইয়া দেখান এবং সর্বশেষে নিছক জাতের সান্নিধ্য প্রদান করেন-যাহা চার খলিফার পরে হাজার বছরের ব্যবধান অন্তে হযরত শায়খ আহমদ সেরহিন্দকে দেওয়া হয়। তাই বলা হয়ঃ হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের পীর স্বয়ং খোদাতায়ালা। তাই দেখা যায়, মারেফাত কারখানার ব্যাপক ও বিস্তৃত জ্ঞান লাভের পরে তিনি যখন হযরত বাকীবিল্লাহ (রঃ) ছাহেবের সাথে দেখা করিতে দিল্লীতে আসেন, তখন হযরত বাকীবিল্লাহ (রাঃ) ছাহেব তদীয় মুরীদ, মারেফাত রাজ্যের বাদশাহ হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের সাথে এক অদ্ভুত আচরণ করেন। মুরীদের প্রতি এমন আদব প্রদর্শন করেন, মনে হয় তিনিই যেন হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের মুরীদ।
তিনি মাঝে মাঝে হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবকে মুয়াল্লেমের (মোর্শেদের) মত বসাইয়া নিজে সমুদয় খলিফা ও মুরীদসহ ফয়েজ লাভের আশায় তাহার হালকায় বা মজলিসে বসিতেন। তিনি পীর ও মোর্শেদ হওয়া সত্ত্বেও মুরীদ হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের প্রতি এতই আদব দেখাইতেন যে, তাহার নিকট জোড় হাতে দাঁড়াইয়া থাকিতেন এবং তাহার নিকট হইতে ফিরিয়া আসিবার সময় এমনভাবে আসিতেন যেন মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের প্রতি পৃষ্ঠ প্রদর্শন করা না হয়।
ইহা দৃষ্টে অন্যান্য মুরীদেরা বিরক্ত হইয়া তাঁহাদের পীর হযরত বাকী বিল্লাহ (রঃ) ছাহেবের নিকট কারণ জানিতে চাহিলে তিনি বলিলেন, "যদি তোমরা স্বীয় ঈমানের নিরাপত্তা কামনা কর, তাহা হইলে তাঁহার প্রতি আদব প্রদর্শনের জন্য বিশেষ খেয়াল রাখ। কেননা তিনি রূহানী সূর্য স্বরূপ, তাঁহার নূরের আলোকে আমাদের ন্যায় হাজার হাজার তারকা নিষ্প্রভ।" অন্যদিকে হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব তাঁহার প্রতি তদীয় পীর ও মোর্শেদের আদব প্রদর্শনের এই আশ্চর্য অবস্থা দেখিয়া ভীষণ লজ্জা পাইতেন এবং তদীয় পীরকে অত্যন্ত আদব ও বিনয়ের সাথে বলিতেন, "হুজুর, এই দীন হীন গোলামের প্রতি আপনার এই রূপ আদব ও শিষ্টাচার প্রদর্শনের জন্য আমার খুবই লজ্জা ও অনুশোচনা হয়।" ইহার উত্তরে হযরত বাকী বিল্লাহ (রঃ) ছাহেব বলিতেন, "আমি যাহা কিছু করিতেছি তাহা আল্লাহতায়ালার নির্দেশ ক্রমেই করিতেছি। আমি গায়েব (অদৃশ্য) হইতে এই রূপ করিবার জন্য আদিষ্ট হইতেছি।” হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব যে কত উচুস্তরের ওলী তাহা উপরোক্ত আলোচনা হইতে সহজেই বোধগম্য হয়।
আধ্যাত্মিক জগতে মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের মর্যাদাঃ
পূর্বেই বলা হইয়াছে যে, গউস পাক হযরত আব্দুল কাদের জেলানী (রঃ) ছাহেব স্বীয় খেরকা নিজ পুত্রের হাতে অর্পণ পূর্বক অছিয়ত করিয়া যান, পাঁচশত বৎসর পরে উম্মতে মুহাম্মদীর মধ্যে যে এক বিশেষ ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব হইবে তাঁহার হস্তে যেন ইহা পৌঁছাইয়া দেওয়া হয়।
হযরত গউস পাক (রঃ) ছাহেবের দেওয়া সেই খেরকা মোবারক বিভিন্ন সাধকের হাত হইয়া যেদিন ইহা হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) হস্তে আসে, সেদিন আধ্যাত্বিক জগতে হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবকে লইয়া নেতৃস্থানীয় সমস্ত ওলী-আল্লাহর মধ্যে শোরগোল বা বাদানুবাদের সৃষ্টি হয়-যাহার সমাধান করেন, সরোয়ারে কায়েনাত, হযরত রাসূলে পাক (সাঃ)। সেদিনের সেই ঘটনা "জাওয়াহেরে মুজাদ্দেদীয়া" নামক পুস্তকে নিম্মোক্তভাবে বর্ণিত আছে।
একদা অভ্যাস অনুযায়ী হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব ফজর নামাজের পরে মুরীদানসহ মোরাকাবায় রত। এমন সময় হযরত শাহ কামাল কায়থেলী (রঃ) এর দৌহিত্র হযরত শাহ সেকান্দার (রঃ) সেখানে উপস্থিত হন এবং একটি খেরকা হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের স্কন্ধে রাখিয়া দেন। হযরত মুজাদ্দেদ (রাঃ) ছাহেবের মোরাকাবা ভংগ হয়। চক্ষু খুলিয়া তিনি হযরত শাহ সেকান্দারকে (রঃ) দেখিয়া তাঁহাকে আলিংগন করেন এবং সম্মানের সাথে তাঁহাকে বসিতে অনুরোধ করেন।
হযরত শাহ সেকান্দার (রঃ) ছাহেব তখন বলেন, আমি আপনার পবিত্র স্কন্ধে যে খেরকাটি রাখিয়াছি, তাহা গউস পাক হযরত আব্দুল কাদের জেলানী (রঃ) ছাহেবের স্মৃতির পবিত্র নিদর্শন। এইটি আমাদের খান্দানে দীর্ঘদিন যাবৎ বংশানুক্রমিকভাবে চলিয়া আসিতেছে। আমার বুজুর্গ পিতামহ হযরত শাহ কামাল কায়থেলী (রঃ) ছাহেব পিতামহ হয়ত আমার কামাল কারিয়া নির্দেশ ছারেন, মতাই টিময়ে। এই স্বরূপ নিজের নিকট রাখিয়া দাও। আমি যাহাকে দিতে বলি, তাহাকে দিয়ে দিও।"
কিছুদিন হইতে আমার বুজুর্গ পিতামহ এই জুব্বাটি আপনাকে দেওয়ার জন্য তাগিদ করিতেছেন। কিন্তু এইরূপ অমূল্য সম্পদ হাত ছাড়া হউক-ইহা কি কেহ চায়? তাই ইহা আমার নিকট রাখিয়া দিয়াছিলাম। অতঃপর যখন আমার বুজুর্গ পিতামহ (রঃ) ছাহেব বারংবার আমাকে এইজন্যে তাগিদ দেন; শেষ পর্যন্ত আমাকে ধমক দিয়া বলেন, তুমি যদি ইহা তাহার হস্তে না পৌঁছাও, তাহা হইলে তোমার কামালিয়াত ও নেছবত এবং বাতেনী সম্পদ ছিনাইয়া লওয়া হইবে; ফলে অনন্যোপায় হইয়া এই দুর্লভ আমানতটি আপনার খেদমতে পেশ করিয়াছি।
অতঃপর হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব সেই পবিত্র খেরকাটি পরিধান পূর্বক যখন আপন হোজরায় গমন করিলেন তখন তাহার মনে এইরূপ ভাবের উদয় হইলঃ যদি এই মাশায়েখ কেরাম আমাকে প্রথম হইতেই খলিফা নির্বাচিত করিতেন, অতঃপর খেরকা প্রদান করিতেন, তাহা হইলে ভাল হইত। এমন সময় হঠাৎ তিনি অবলোকন করেন, হযরত গউসপাক আব্দুল কাদের জেলানী (রঃ) ছাহেব হযরত আলী (রাঃ) ছাহেব ও কাদেরীয়া তরিকার অন্যান্য মাশায়েখগণসহ এমনকি হযরত শাহ কামাল কায়থেলী (রঃ) ছাহেবসহ তশরিফ আনিয়াছেন। হযরত গউস পাক আব্দুল কাদের জেলানী (রঃ) ছাহেব হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবকে স্বীয় নেছবত ও বাতেনী কামালাত দ্বারা ভরপুর করিয়া দেন।
অতঃপর হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের মনে এই ধারণার সৃষ্টি হয় যে, আমার প্রতিপালন বা তরবিয়ততো নকশবন্দীয়া তরিকার মাশায়েখবর্গ করিয়াছেন। কাজেই, আমি নকশবন্দীয়া তরিকার বুজুর্গদের দলভুক্ত। এইরূপ ধারণা সষ্টি হওয়ার সাথে সাথে তিনি অবলোকন করেন যে, তাঁহার হোজরায় হযরত আবুবকর সিদ্দিক (রাঃ) ছাহেবের সাথে হযরত খালেক গুজদোওয়ানী (রঃ) ছাহেবসহ নকশবন্দীয়া খান্দানের সমস্ত মাশায়েখবর্গ এমনকি হযরত বাকী বিল্লাহ (রাঃ) ছাহেব পর্যন্ত তশরীফ আনিয়াছেন। কাদেরিয়া তরিকার মাশায়েখবর্গ পূর্বেই সেখানে উপস্থিত ছিলেন। হযরত খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (রঃ) ছাহেব উসপাক হযরত আব্দুল কাদের জেলানী (রঃ) ছাহেবের নিকটে উপবেশন করিয়াছেন। তখন তাঁহাদের মধ্যে পরস্পর আলোচনা চলিতে লাগিল। অতঃপর নকশবন্দীয়া তরিকার মাশায়েখগণের ছদার হযরত খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (রঃ) ছাহেব গউস পাক (রঃ) ছাহেবকে উদ্দেশ্য করিয়া বলিলেন, শেখ আহমদ সেরহিন্দী (রাঃ) আমাদের প্রতিপালনের দ্বারা কামালিয়াত হাছিল করিয়াছেন, আপনি অনর্থক তাহাকে আপনার দলভুক্ত করিবার চেষ্টা করিতেছেন।
এই কথার জবাবে হযরত গউসপাক আব্দুল কাদের জেলানী (রঃ) ছাহেব বলেন, "শায়খ আহমদ (রাঃ) প্রথমেই আমাদের তরিকা হইতে ফয়েজ" পাপ্ত হইয়াছেন। কাজেই সে আমাদের দলভুক্ত।" এই আলোচনার সময় চিশতিয়া, কুবরাবিয়া, সোহওয়ারদীয়া তরিকার মাশায়েখগণ তশরিফ আনেন এবং হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবকে আপন আপন তরিকাভুক্ত বলিয়া দাবী জানান। কেননা হযরত মুজাদ্দেদ (রাঃ) ছাহেব প্রথম দিকে স্বীয় পিতার নিকট হইতে উক্ত তরিকাসমূহেরও নেছবত হাছিল করিয়াছিলেন।
মাওলানা হাশেম কাশ্মেরী (রঃ) ছাহেব ও মোল্লা বদরুদ্দিন তাহাদের ইতিহাসে এইরূপ লিখিয়াছেন যে, ঐ সময় উম্মতে মুহাম্মদীর সমস্ত আউলিয়াগণ সেরহিন্দ শরীফে সমবেত হন। এই পবিত্র সময় ছিল ১০১১ হিজরীর ১১ই শাবানের সকাল হইতে জোহরের নামাজের শেষ সময় পর্যন্ত।
অতঃপর হযরত রাসূলে পাক (সাঃ) ওলী-আল্লাহগণের সেই বিশাল জলসায় তশরিফ আনেন। তাঁহার খেদমতে বিষয়টি উত্থাপন করা হয়। তৎপর রাসূলে পাক (সাঃ)-ই বিরোধের সুষ্ঠু মিমাংসা করেন। তিনি সমস্ত তরিকার মাশায়েখবর্গকে সান্তনা দিয়া বলেন, যেহেতু শায়খ আহমদ সেরহিন্দী (রাঃ) এর পরিপূর্ণতা বা কামালিয়াত নকশবন্দীয়া তরিকার উপরে সম্পন্ন হইয়াছে: কাজেই এই তরিকাকেই রেওয়াজ বা প্রচলন দান করা হউক এবং বাকী অন্যান্য সমুদয় তরিকার নেছবতও তাঁহাকে প্রদান করা হউক: যাহার ফলে শেখ আহমদের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত মুজাদ্দেদীয়া তরিকা সমস্ত তরিকার সারাংশ হিসেবে পরিগণিত হইবে এবং তোমরাও সকলে সমভাবে ছওয়াবের অধিকারী হইবে। হযরত রাসূলে পাক (সাঃ) আরও বলেন, যেহেতু নকশবন্দীয়া তরিকার যোগসূত্র, সমস্ত নবীদের পর সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ হযরত আবুবকর সিদ্দিক (রাঃ) ছাহেবের সাথে এবং এই তরিকার মধ্যে অন্য তরিকার চেয়ে সুন্নতের অনুসরণ ও বেদাত বর্জনের প্রতি বেশী লক্ষ্য রাখা হইয়াছে; তাই এই তরিকা দ্বীনের পুনুরুজ্জীবনে অধিক সহায়ক।
অতঃপর রাসূলে পাক (সাঃ) এর নির্দেশক্রমে সমস্ত তরিকার মাশায়েখগণ স্ব স্ব কামালাত ও নেছবত হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবকে অর্পণ করেন। ফলে তাঁহার এই তরিকা (মুজাদ্দেদীয়া) সমস্ত তরিকার সমন্বয়ে সমৃদ্ধি লাভ করে। অতঃপর আকায়ে-নামদার রাসূলে পাক (সাঃ) নিজের তরফ থেকে হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবকে খাছ নেছবত ও কামালত প্রদান করেন।
উপরের এই ঘটনা থেকেই হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের মর্যাদা সম্পর্কে সহজেই ধারণা জন্মে। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব সমস্ত তরিকার সমন্বয়ে এবং নকশবন্দীয়া তরিকাকে পরিমার্জন ও পরিবর্ধন করিয়া এমনই এক শ্রেষ্ঠ তরিকা প্রবর্তন করেন, যাহা সর্ব কালের সর্বশ্রেষ্ঠ তরিকা-"তরিকায়ে নবন্দীয়া মুজাদ্দেদীয়া।"
হে জাকেরান ও আশেকান সকল! উপরোক্ত আলোচনা থেকে বুঝিতে পারিলে যে, আসমানের নীচে হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের মত সাধক সাহাবাদের পরে আর আসেন নাই। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের পরে তাহারই পরিপূর্ণ কামালিয়াত ও নেছবতের অধিকারী হন আমার পীর কেবলাজান। হযরত মুজাদ্দেদ (রাঃ) ছাহেবের পর সমস্ত মাশায়েখগণের মধ্যে তাঁহার স্থান শীর্ষে। তোমরা যদি খোদাতায়ালাকে পাইতে চাও, তাহা হইলে আমার পীর কেবলাজানের এই তরিকামত চল। এই তরিকা মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের তরিকা-যাহা চিশতিয়া, কাদেরিয়া, কুবরাবিয়া, নকশবন্দীয়া তথা পূর্বের সমস্ত তরিকার সমন্বয়ে এবং রাসূলে পাক (সাঃ) এর খাছ নেছবত ও কামালিয়াতের মিশ্রণে প্রতিষ্ঠিত শ্রেষ্ঠতম তরিকা।
এই তরিকার নীতিসমূহের মধ্যে বিশেষ দুই মূলনীতি হইল আদব ও মহব্বত। পীরের প্রতি যেমন আদব প্রদর্শন করিতে হয়, তেমনি সবকিছুর চেয়ে পীরকে বেশী মহব্বত করিতে হয়। পীর হওয়া সত্ত্বেও হযরত বাকী বিল্লাহ (রঃ) ছাহেব ফয়েজ হাছিলের জন্য হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবকে কতই না আদব প্রদর্শন করিতেন! কাজেই, তোমরা যদি খোদাতায়ালার একান্ত সান্নিধ্যে পৌঁছাইতে চাও, তবে আদব, বৃদ্ধি, মহব্বত ও সাহসের সাথে কামেল পীরের খেদমত করিতে থাক। আল্লাহপাক তোমাদিগকে কামিয়াবী বশিস করুন। আমীন!








