Logo

হক্কানী আলেম এবং দুনিয়াদার আলেমের পরিচয়

profile picture
জনবাণী ডেস্ক
২৯ জুন, ২০২৬, ১৯:৪৭
হক্কানী আলেম এবং দুনিয়াদার আলেমের পরিচয়
ছবি: জনবাণী।

খোদাপ্রাপ্তি জ্ঞানের আলোকে শাহ্সূফি হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ও খাজা বাকীবিল্লাহ (রঃ) بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ (মূল বক্তব্যঃ হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব তৎকালীন দুনিয়াদার আলেমসমাজ কর্তৃক সৃষ্ট ফেতনা দূর করনার্থে যে বিপ্লবী সংস্কার আন্দোলন পরিচালনা করেন-সেই সম্পর্কে আলোচনা)

বিজ্ঞাপন

উৎকৃষ্ট বা হক্কানী আলেম এবং নিকৃষ্ট বা দুনিয়াদার আলেমের পরিচয়ঃ

'আলেম' আরবী 'আলিম' শব্দের পরিবর্তিত রূপ। আলিম শব্দের আভিধানিক অর্থ ইসলাম ধর্মতত্ত্বজ্ঞ বা ধর্ম বিশেষজ্ঞ। অর্থাৎ যিনি ইসলাম ধর্ম সম্পর্কিত এলেমে বুৎপত্তি অর্জন করেন, তিনিই 'আলেম' বলিয়া অভিহিত। আলেম দুই প্রকারঃ

১। উৎকৃষ্ট আলেম বা হক্কানী আলেম।

বিজ্ঞাপন

২। নিকৃষ্ট আলেম বা দুনিয়াদার আলেম বা মোনাফেক আলেম।

সেই আলেমকেই উৎকৃষ্ট আলেম বলা হয়, যিনি তদীয় অর্জিত জ্ঞান দ্বারা আখেরাতকে দুনিয়ার উপরে প্রাধান্য দেন; স্বীয় জ্ঞান দ্বারা খোদাতায়ালাকে অন্বেষণ করেন। "যে ব্যক্তি আল্লাহর দিকে অগ্রসর হয়, আল্লাহও তাঁহার প্রতি অগ্রসর হন।" (হাদীসের ভাষ্য) ফলে আল্লাহতায়ালা সেই ব্যক্তির দেল পরিচ্ছন্ন করিয়া দেন, দেলের প্রশস্ততা দান করেন, আপন নূরে আলোকিত করেন; তদোপরি সান্নিধ্য দান করেন।

তাহাদের পরিচ্ছন্ন দেলে আল্লাহ উপবিষ্ট হন এবং তাহারা আল্লাহপাক কর্তৃক পরিচালিত হন। এই সকল আলেমদেরকে আল্লাহপাক আশ্রাফুল মাখলুকাতের' মর্যাদা দান করেন। তাহাদেরকে এমনই শ্রেষ্ঠত্ব দেওয়া হয় যে, সমগ্র সৃষ্টিই তাহাদেরকে নত মস্তকে সম্মান প্রদর্শন করেন। গাছ-পালা, বৃক্ষ-লতা, পশু-পাখী, কিট-পতঙ্গ, নদীর মাছ সবই তাঁহাদেরকে ছালাম জানায়। হযরত গউস পাক আব্দুল কাদের জেলানী (রঃ) ছাহেব তদীয় 'মজলিসে সিত্তীন' পুস্তকে বলেন, "উৎকৃষ্ট আলেম বা আল্লাহওয়ালা আলেমকে আল্লাহতায়ালা এমন উন্নত স্থানে ও আধ্যাত্মিক অবস্থায় উপনীত করেন যে, আসমানের ফেরেশতাগণ পর্যন্ত চতুর্দিক হইতে তাঁহাকে ঘিরিয়া সেজদা করিতে থাকে।"

বিজ্ঞাপন

হক্কানী আলেম বা ওলী-আল্লাহদের খাতিরেই আল্লাহতায়ালা জমিনে শস্য দেন, পানিতে মাছ দেন, গাছে ফল দেন, আকাশ হইতে বৃষ্টি বর্ষণ করেন। তাই হয়তঃ শোকরিয়া আদায় স্বরূপ আকাশের পাখী, সমুদ্রের মাছ, পৃথিবীর চতুষ্পদ জন্তু ও কেরামন-কাতেমিন তাঁহাদের জন্য অবিরাম দু'আ করিতে থাকে। (হাদীসের ভাষ্য)।

কিন্তু আলেম সমাজের মধ্যে আরেক শ্রেণীর আলেম আছে, যাহারা স্বীয় এলেম দ্বারা দুনিয়াকে অন্বেষণ করে; দুনিয়ার মান-সম্মান, ইজ্জত, ধন-সম্পদ, শান-শওকত ও প্রভাব-প্রতিপত্তি অর্জনে স্বীয় এলমকে মূলধন হিসেবে কাজে লাগায়। এই সকল আলেমদেরকেই দুনিয়াদার আলেম বা নাফসপরস্ত আলেম বলা হয়। ইহারা মানবজাতির কলংক। ইহারাই নিকৃষ্ট আলেম হিসেবে আখ্যায়িত। ইহাদের উদ্দেশ্য অভিশপ্ত দুনিয়া অর্জন।

হাদীস শরীফে আছে, বান্দা যতক্ষণ আল্লাহর জেকের করে, আল্লাহ তাঁহার কালবে অবস্থান করেন; আর যখনই সে জেকের থেকে গাফেল হয়, তখনই তাহার কালবে শয়তান উপবিষ্ট হয় ও শয়তান কর্তৃক সে পরিচালিত হয়। দুনিয়া পূজারী বা নাফসপরস্ত আলেম সর্বদাই আল্লাহ বিরোধী চিন্তায় মঞ্জুল থাকে। ফলে তাহার কালবে অবস্থান করে অভিশপ্ত শয়তান। হাদীস শরীফে আছে, "মানবদেহস্থিত কালব পবিত্র হইলে, মানুষের সমস্ত অজুদ (অস্তিত্ব)-ই পাক হয়, কালব অপবিত্র হইলে সমস্ত সত্ত্বাই অপবিত্র হয়।" দুনিয়াদার আলেমের কালবে থাকে অপবিত্র শয়তান। ফলে উক্ত আলেমের সমস্ত সত্ত্বাতেই শয়তানের প্রভাব বিদ্যুতের মতোই প্রবাহিত হয়; সে শয়তানের মুর্ত প্রতীকে পরিণত হয়; শয়তানের খেলাফতি প্রাপ্ত হয়।

বিজ্ঞাপন

হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলেন, "কোন এক বুজুর্গ ব্যক্তি স্বপ্নে শয়তানকে নিশ্চিন্ত ও নির্লিপ্ত দেখিয়া উহার কারণ জানিতে চাহিলে সে জানাইল যে, দুনিয়াপূজক আলেমগণ তাহার কার্যে বিশেষ সহায়তা করিতেছে এবং তাহাকে চিন্তা হইতে অবসর দান করিয়াছে। (মকতুবাদ শরীফ, ১ম খন্ড, মকতুব নং-৩৩) মোটকথা দুনিয়াদার আলেমবর্গ শয়তানের প্রতিনিধিত্ব করিতেছে। এই কারণে তরিকতের পরিভাষায় দুনিয়াপ্রেমিক আলেমকে মানব শয়তান বলা হয়। তাহাদের রূহকেই আরোওয়াহ শয়তান বলা হয়।

রাসূলে পাক (সাঃ) বলেন, অবশ্যই আমি দাজ্জালকে ততটুকু ভয় করি না, যতটুক দাজ্জাল নয়, এমন ব্যক্তিকে ভয় করি। প্রশ্ন করা হইল, সেই ব্যক্তি কে? তিনি বলিলেন, আমি পথভ্রষ্টকারী শাসকদেরকে ভয় করি।" (এহইয়াউ-উলুমুদ্দীন-ইমাম গাজ্জালী) আর উপরোক্ত পথভ্রষ্টকারী শাসকদেরকে যাহারা পথচ্যুত করেন তাহারাই হইলেন দুনিয়াপুজারী আলেম সমাজ। এই কারণেই দুনিয়াদার আলেম সমাজ সষ্টির মধ্যে নিকষ্ট জীব। তাহাদের অশুভ প্রভাব সমাজে সংক্রামক ব্যাধির মত ছড়ায়। তাহাদের সংস্পর্শ প্রাণনাশক বিষতুল্য।

পৃথিবীস্থিত চার শ্রেণীর মানুষের পরিচয়ঃ

বিজ্ঞাপন

পৃথিবীতে চার শ্রেণীর মানুষ আছে। এক শ্রেণীর মানুষ আছে, যাহাদের জিহ্বা ও দেল উভয়ই মৃত। তাহারা সুরতে মানুষ বটে কিন্তু হকিকতে পশু। তাহারা যাবতীয় কুসংস্কারের অন্ধকারে নিমজ্জিত। তাহারা অভিশপ্ত; তাহাদের ঠিকানা দোযখ।

আর এক শ্রেণীর মানুষ আছে, যাহাদের জিহ্বা তাজা, কিন্তু দেল মৃত। কুরআন, হাদীস, ফিকাহ, তাফসিরের জ্ঞানে তাহারা জ্ঞানী বটে, কিন্তু এই জ্ঞানকে দুনিয়া অর্জনে কাজে লাগায়। তাহারা আপন স্বার্থ হাছিলে ধর্মীয় রীতি-নীতিকে প্রয়োজনে রদ-বদল করে; হালালকে হারাম, হারামকে হালাল বলিতেও দ্বিধাবোধ করে না। তাহাদের দেল অন্ধকার আচ্ছন্ন; অন্ধকার দেলে শয়তান উপবিষ্ট। তাহারা মানব রূপী শয়তান। তাহারাই মোনাফেক আলেম বা দুনিয়াদার আলেম। রাসূলে পাক (সাঃ) ইহাদেরকে জ্ঞান পাপী বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন এবং ধর্মের ব্যাপারে ইহাদেরকেই বেশী ভয় করিয়াছেন। তিনি ফরমাইয়াছেন, "আমার উম্মতগণের মধ্যে আমি জ্ঞানপাপী দুনিয়াপরস্ত আলেমগণকে সবচাইতে বেশী ভয় করি।" এই সমস্ত দুনিয়াপরস্ত আলেমগণকে হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব "দীনের চোর" বলিয়া আখ্যায়িত করিয়াছেন।

আরেক শ্রেণীর লোক আছে, যাহাদের জিহ্বা মৃত; কিন্তু দেল জীবন্ত। তাঁহারা মানব সমাজ হইতে গুপ্ত। তাহাদের দেলে আল্লাহর অবস্থান; দেলে সর্বদাই আল্লাহর নূর প্রবাহিত থাকে। দেলের চোখে আল্লাহর সমুদয় সৃষ্টি জগত দেখিতে পান। আধ্যাত্মিক জগতে তাঁহারা ভ্রমণ করেন। তাঁহারা সকলেই ওলী-আল্লাহ। আল্লাহর সাথে তাঁহাদের বাক্যালাপ হয়। আল্লাহর রহস্য জগত তাঁহারা দিব্যদৃষ্টিতে অবলোকন করেন; কিন্তু কোন কিছু বলিবার অনুমতি তাঁহাদের নাই। তাঁহারা নীরবে বা গোপনে খোদা কর্তৃক অর্পিত দায়িত্ব পালন করেন।

বিজ্ঞাপন

আরেক শ্রেণীর লোক আছে, যাহাদের জিহ্বা এবং দেল উভয়ই তাজা বা জীবন্ত। তাঁহারা আল্লাহর সমগ্র সৃষ্টজগত মুহূর্তে ঘুরিয়া দেখিবার ক্ষমতা রাখেন। আবার তাঁহারা যাহা কিছু বলেন, তাহাও চিরসত্য। তাঁহাদের বাক্যসিদ্ধ। তাঁহাদের বাক্য রোগ আরোগ্যকারী। তাঁহাদের দৃষ্টিতে রহমত বর্ষে। তাঁহারাই যামানার উৎকৃষ্ট আলেম বা ওলীয়ে কামেল। আল্লাহপাক বলেন, "তোমরা যদি এমন আলেমের সন্ধান পাও, তবে পতংগের মত তাঁহার দিকে ধাবিত হও, তাঁহার প্রেম অগ্নিতে নিজেদের কামনা-বাসনাকে জ্বালাইয়া ফেল। তাহা হইলে আমার সান্নিধ্য তোমরা লাভ করিতে পারিবে।"

দুনিয়াদার আলেমরাই যাবতীয় ফেতনার মূলঃ

পৃথিবীতে যখনই দুনিয়াপূজক আলেমদের দৌরাত্ম্য বাড়িয়া যায়; তাহাদের অপতৎপরতা বা ধর্মবিরোধী কার্যকলাপ সীমা লংঘন করে, তখন আলাহপাক দুনিয়ার বুকে এক একজন করিয়া মুজাদ্দেদ প্রেরণ করেন, যাহারা বলিষ্ঠ সংস্কার আন্দোলনের মাধ্যমে দুনিয়া প্রেমিক আলেমগণকে যেমন হেদায়েত করেন, তেমনি তাহাদের বদ-দীনী কার্যকলাপের বিষক্রিয়া থেকে মৃতপ্রায় ইসলামকে জীবিত করেন। ইতিহাস তাহার সাক্ষ্য বহন করে।

বিজ্ঞাপন

ইসলামের ইতিহাস পর্যালোচনা করিলে দেখা যায়, ইসলাম ও মুসলিম জাতির উপর যত মুছিবত বা বিপদ আপতিত হইয়াছে-তাহা দুনিয়াপূজারী আলেমদের কারণেই হইয়াছে। দুনিয়াদার আলেমরাই যাবতীয় ফেতনার মূল কারণ। পূর্বেই বলা হইয়াছে, মুসলিম জাতি ৭৩ দলে বিভক্ত-যাহাদের একটিই হকপন্থী, সত্য পথানুসারী। বাকী ৭২ দল পথভ্রষ্ট। এই ৭২ দলের প্রত্যেক দলনেতাই দুনিয়াপূজারী আলেম। তাহারা আপন আপন নাফসানী খায়েশ পূরণ করিতেই বিভিন্ন দল-উপদলে বিভক্ত হইয়া পড়িয়াছে। তাহারা নিজেরা পথভ্রষ্ট হইয়াছে; সাধারণ মানুষকে পথভ্রষ্ট করিয়াছে। আখেরাতে তাহাদেরকেই সর্বাপেক্ষা কঠিন শাস্তি দেওয়া হইবে।

দুনিয়া পরস্ত আলেমদের অপতৎপরতা বা পাপাচার অতীতেও ছিল, আজও বর্তমান। মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের সময়ে দুনিয়াপূজারী আলেমদের দৌরাত্ম্য মাথাচাড়া দিয়া উঠে। হাজারী মুজাদ্দেদ (রাঃ) ছাহেব বিপ্লবী সংস্কার আন্দোলনের মাধ্যমে তাহাদের অপকর্ম থেকে মুসলিম জাতি ও ইসলামকে রক্ষা করেন।

ইতিহাস বিধৃত পুস্তকে দেখা যায়, মোগল সম্রাট আকবর তাহার প্রাথমিক জীবনে একজন কট্টর সুন্নী মোসলমান ছিলেন। তাহার পিতা পিতামহগণ সকলেই নকশবন্দীয়া তরিকার বিশিষ্ট বুজুর্গ হযরত নাসির উদ্দিন উবায়েদ আহরার (রঃ) এর ভক্ত ছিলেন। নকশবন্দীয়া খান্দানের সাথে তাহার ও তাহার পূর্ব পুরুষের আত্মীয়তার সম্পর্কও ছিল। সম্রাট বাবর স্বীয় কন্যা গুলবদন বেগমকে নুরুদ্দীন মুহাম্মদের সহিত বিবাহ দেন, যাহার পূর্ব পুরুষ ছিলেন খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (রঃ)। সম্রাট আকবর তদীয় এক বোন সখিনা বানুকে নকশবন্দীয়া তরিকার অন্যতম সূফী খাজা হাসান নকশবন্দী (রঃ) এর সহিত বিবাহ দেন। আকবরের অপর বোন বখশী বেগমকে খাজা শরফুদ্দিন হোসাইনের সহিত বিবাহ দেওয়া হয়, যিনি হযরত খাজা নাছির উদ্দীন উবায়েদ আহরার (রঃ) এর পুত্র ছিলেন।

বিজ্ঞাপন

কাজেই বুঝা যায়, আকবর, তাহার পিতা ও পিতামহগণ সূফীপন্থী লোক ছিলেন। সুন্নী জামাতের অনুসারী ছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে আকবর সত্যপথচ্যুত হইয়া ইসলামবিধ্বংসী দীনে-এলাহী রচনা করেন মূলতঃ দুনিয়াপরস্ত আলেমদের প্ররোচনা ও প্রভাবে। এই সমস্ত দুনিয়াদার আলেমদের মধ্যে ছিল শায়খ আবুল ফজল, মখদুম উল মুলক, শায়খ আবদ উন নবী, তাজউল আরেফীন, ফৈজী ও আরো অনেকে।

পূর্বেই বলা হইয়াছে, বাদশাহ আকবর ধর্মীয় আলোচনা পছন্দ করিতেন। তাই তিনি ধর্ম বিষয়ক আলোচনার উদ্দেশ্যেই ফতেহপুর সিক্রিতে ৯৮৩ হিজরীতে একটি "ইবাদতখানা” নির্মাণ করেন। সেই "ইবাদতখানায়” ধর্ম আলোচনার জন্য আমন্ত্রণ জানান আলেম সম্প্রদায়কে। আলেমগণ আসেন। ধর্ম বিষয়ে আলোচনাও করেন। কিন্তু ইহাদের মধ্যে দুনিয়াদার আলেমদের সংখ্যাই বেশী ছিল। ফলে ইবাদত খানার পরিবেশ মাঝে মাঝে উত্তপ্ত রূপ ধারণ করিত। ইবাদতখানায় দুনিয়াপরস্ত আলেম সমাজ দুই দলে বিভক্ত ছিল।

একদলের নেতা ছিল মখদুম উল মুলক। অপর দলের নেতৃত্বে ছিল আবদ-উন-নবী। এক দল কোন বিষয়ে হালাল ফতোয়া দিলে, সাথে সাথে আরেক দল আজও বর্তমান। মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের সময়ে দুনিয়াপূজারী আলেমদের দৌরাত্ম্য মাথাচাড়া দিয়া উঠে। হাজারী মুজাদ্দেদ (রাঃ) ছাহেব বিপ্লবী সংস্কার আন্দোলনের মাধ্যমে তাহাদের অপকর্ম থেকে মুসলিম জাতি ও ইসলামকে রক্ষা করেন।

বিজ্ঞাপন

ইতিহাস বিধৃত পুস্তকে দেখা যায়, মোগল সম্রাট আকবর তাহার প্রাথমিক জীবনে একজন কট্টর সুন্নী মোসলমান ছিলেন। তাহার পিতা পিতামহগণ সকলেই নকশবন্দীয়া তরিকার বিশিষ্ট বুজুর্গ হযরত নাসির উদ্দিন উবায়েদ আহরার (রঃ) এর ভক্ত ছিলেন। নকশবন্দীয়া খান্দানের সাথে তাহার ও তাহার পূর্ব পুরুষের আত্মীয়তার সম্পর্কও ছিল। সম্রাট বাবর স্বীয় কন্যা গুলবদন বেগমকে নুরুদ্দীন মুহাম্মদের সহিত বিবাহ দেন, যাহার পূর্ব পুরুষ ছিলেন খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (রঃ)। সম্রাট আকবর তদীয় এক বোন সখিনা বানুকে নকশবন্দীয়া তরিকার অন্যতম সূফী খাজা হাসান নকশবন্দী (রঃ) এর সহিত বিবাহ দেন। আকবরের অপর বোন বখশী বেগমকে খাজা শরফুদ্দিন হোসাইনের সহিত বিবাহ দেওয়া হয়, যিনি হযরত খাজা নাছির উদ্দীন উবায়েদ আহরার (রঃ) এর পুত্র ছিলেন।

কাজেই বুঝা যায়, আকবর, তাহার পিতা ও পিতামহগণ সূফীপন্থী লোক ছিলেন। সুন্নী জামাতের অনুসারী ছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে আকবর সত্যপথচ্যুত হইয়া ইসলামবিধ্বংসী দীনে-এলাহী রচনা করেন মূলতঃ দুনিয়াপরস্ত আলেমদের প্ররোচনা ও প্রভাবে। এই সমস্ত দুনিয়াদার আলেমদের মধ্যে ছিল শায়খ আবুল ফজল, মখদুম উল মুলক, শায়খ আবদ উন নবী, তাজউল আরেফীন, ফৈজী ও আরো অনেকে।

পূর্বেই বলা হইয়াছে, বাদশাহ আকবর ধর্মীয় আলোচনা পছন্দ করিতেন। তাই তিনি ধর্ম বিষয়ক আলোচনার উদ্দেশ্যেই ফতেহপুর সিক্রিতে ৯৮৩ হিজরীতে একটি "ইবাদতখানা” নির্মাণ করেন। সেই "ইবাদতখানায়” ধর্ম আলোচনার জন্য আমন্ত্রণ জানান আলেম সম্প্রদায়কে। আলেমগণ আসেন। ধর্ম বিষয়ে আলোচনাও করেন। কিন্তু ইহাদের মধ্যে দুনিয়াদার আলেমদের সংখ্যাই বেশী ছিল। ফলে ইবাদত খানার পরিবেশ মাঝে মাঝে উত্তপ্ত রূপ ধারণ করিত। ইবাদতখানায় দুনিয়াপরস্ত আলেম সমাজ দুই দলে বিভক্ত ছিল।

বিজ্ঞাপন

একদলের নেতা ছিল মখদুম উল মুলক। অপর দলের নেতৃত্বে ছিল আবদ-উন-নবী। এক দল কোন বিষয়ে হালাল ফতোয়া দিলে, সাথে সাথে আরেক দল তাহা হারাম বলিয়া ঘোষণা দিত। তাহারা নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণার্থে কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি করিত, একদল আরেক দলকে কাফের ফতোয়া দিতেও দ্বিধাবোধ করিত না। তাহাদের উদ্দেশ্যই ছিল দুনিয়া অর্জন, অর্থোপার্জন। প্রয়োজনে তাহারা বৈধকে অবৈধ; অবৈধকে বৈধ বলিত। ন্যায়-অন্যায়, হক-নাহক বিচার না করিয়াই তাহারা ফতোয়াজারী করিত। মোল্লা আব্দুল কাদের বদায়্যুনী তাঁহার রচিত ইতিহাসে এক জায়গায় লিখিয়াছেন, "কতিপয় ভন্ড আলেম বাদশাহকে যুগের সর্বময় কর্তা বলিয়া প্রচার করিত এবং তিনি হিন্দু, মুসলিম, শীয়া-সুন্নী প্রভৃতি সম্প্রদায়ের বিভিন্ন মতবাদ রহিত করতঃ তদ্‌স্থলে নিজস্ব মতবাদ প্রবর্তন করিতে সক্ষম বলিয়াও তাহারা অভিমত দিত।"

উক্ত সব দুনিয়াদার আলেমদের (আবুল ফজল, ফৈজী প্রমুখ) ইন্ধনের কারণেই বাদশাহ আকবরের স্বেচ্ছাচারিতা বহুগুণে বর্ধিত হয় এবং দীনে এলাহী প্রবর্তনে সাহসী হন। দুনিয়াপরস্ত আলেম সমাজ যদি সম্রাট আকবরকে ইন্ধন না যোগাইত, তাহা হইলে আকবর হয়তো ধর্মকে লইয়া ছিনিমিনি খেলিবার এতখানি দৌরাত্ম্য দেখাইতে পারিতেন না। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব তাই বলেন, "আকবরকে সত্য পথ হইতে বিভ্রান্ত করিবার জন্য দুনিয়াদার অসৎ আলেমরাই দায়ী।" (মকতুবাত শরীফঃ ১ম খন্ড)

প্রখ্যাত মনীষী মাওলানা আবুল কালাম আজাদ হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের জামানায় দুনিয়াদার আলেমগণের স্বভাব ও প্রকৃতি সম্পর্কে বলেন, "তদানীন্তন আলেম সমাজের অবস্থা এই ছিল যে, তাহারা নিজ নিজ ক্ষুরধার রসনা দ্বারা একে অন্যের মুন্ডপাত করিতেছিল, একে অন্যের নামে কুফরীর ফতোয়া ঝাড়িয়া প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করিতেছিল, রাজ্যের আমীর উমরাহদের পরস্পরের মধ্যে একজনের হাত অপর জনের গর্দান-এই রূপ সম্পর্কই ছিল বিদ্যমান। ক্ষমতার এই টানা হেঁচড়ায় পড়িয়া দুনিয়াদার আলেম সমাজ কখনও এই পাল্লা, আবার কখনও ঐ পাল্লা ভারী করিতেছিল। কোন একজন আলেম কোন কিছু হালাল হওয়ার হুকুম দিলে অপর জন উহাকে হারাম প্রতিপন্ন করিবার জন্য উঠিয়া পড়িয়া লাগিত। আর তদানীন্তন বাদশাহ এই সমস্ত আলেমগণকে নিজ জামানার ইমাম গাজ্জালী ও ইমাম রাযী বলিয়া মনে করিত। দীনে ইসলামের ধারক ও বাহক আলেম সমাজের এহেন নৈতিক অধঃপতন দেখিয়া হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব দারুনভাবে উদ্বিগ্ন ও উৎকণ্ঠিত হইয়া পড়েন।"

তৎকালীন পারিপার্শ্বিক অবস্থার বিবরণ দিতে যাইয়া "রূদে কাউসার" ছিল যে, তাহাদের অধিকাংশই ধর্মীয় শিক্ষায় বিশেষ পারদর্শী ছিলেন, গ্রন্থে শায়খ মুহাম্মদ বলেন, "তৎকালে আলেম সমাজের অবস্থা এইরূপ কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে ধর্মের প্রতিফলনের ব্যাপারে তাঁহারা সেই সমস্ত লোকের মতই ছিলেন-যাহারা নামাজ সম্পর্কীয় যাবতীয় মাছলা-মাছায়েল অপরকে বাৎলাইতে সক্ষম এবং হর-হামেশা নামাজ শিক্ষা বগলদাবা করিয়া ঘুরাফেরা করেন অথচ নিজে নামাজ পড়েন না। জাকাতের সমুদয় মাছায়েল তাহারা জ্ঞাত থাকিলেও নিজেদের কর্মধারা ছিল এই যে, বৎসরের শেষে স্বীয় সমস্ত ধন সম্পত্তি স্ত্রীর নামে হেবা' করিয়া দিয়া জাকাত আদায়ের আপদ হইতে মুক্ত থাকিতেন। তাহাদের কাহাকেও তাহার উপর হজ্জ ফরজ কিনা জিজ্ঞাসা করা হইলে তিনি জওয়াব দিতেন-"না"। আর ইহার কারণ বলিতেন, "যদি স্থলপথে যাই, তবে রাফেজীদের দেশের মধ্য দিয়া যাইতে হয়, ইহাতে প্রাণনাশের সমূহ আশংকা। আর যদি জলপথে যাই, তবে নাছারাদের সংগে বিভিন্ন রকম চুক্তিতে আবদ্ধ হইতে হয়, তাহাও এক প্রকার জিল্লতী'। অতএব কোন অবস্থাতেই আমার উপর হজ্জ ফরজ নহে।"

হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব তদীয় এক মকতুবে বলেন, "আমাদের আলেমগণ শান-শওকত ও ঐশ্বর্যের আসক্তিতে গ্রেফতার হইয়া এলমে দীনের প্রকৃত সৌন্দর্য হারাইয়া ফেলিয়াছেন। তাহাদের লেখনী শক্তিশালী ও জিহ্বা ক্ষুরধার বিশিষ্ট। কিন্তু তাহাদের লেখনীশক্তি ও বাগ্মিতা ইসলামের বিনাশ সাধনেই তৎপর। তাহাদের এলেম তাহাদের কু-প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রিত না করিয়া বরং কু-কার্যেই লিপ্ত রাখিয়াছে। এই শ্রেণীর আলেমগণ তাহাদের প্রতি আল্লাহর বিশেষ নেয়ামত 'এলেমের' যথার্থ মূল্য না দিয়া উহাকে পার্থিব ধন-দৌলত, ইজ্জত ও নেতৃত্ব লাভের উপকরণরূপে ব্যবহার করিতেছেন। অথচ তাহারা ভুলিয়া গিয়াছেন যে, দুনিয়া এবং উহার যাবতীয় সম্পদ আল্লাহর দৃষ্টিতে অতি তুচ্ছ ও নিকৃষ্ট। যাহারা তুচ্ছ ও নিকৃষ্ট বস্তুর লোভে মত্ত, তাহারা আল্লাহর দৃষ্টিতে খুবই নিকৃষ্ট ও অধম। সাধারণ লোক হইতেও তাহারা জঘন্য ধর্মচোর, যদিও তাহারা নিজদিগকে ধর্মের পেশোয়া ও সম্মানী মনে করিয়া আত্মপ্রসাদ লাভ করেন।" এই ছিল তৎকালীন আলেমদের নৈতিক অবস্থা।

তৎকালীন দুনিয়াদার আলেমগণের প্রকৃতি বর্ণনা করিতে গিয়া হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) মকতুবাত শরীফের ১ম খন্ডের ৩৩ নং মকতুবে আরও বলেন, "যে আলেম স্বীয় এলেমকে দুনিয়ার সম্পদ ও খ্যাতি অর্জনের মূলধন রূপে খাটান, তাহার এলেম প্রকৃত পক্ষে তাহার উপকারের পরিবর্তে অপকারই করিয়া থাকে। হযরত রাসূলে পাক (সাঃ) বলেন, কেয়ামতের দিন সবচেয়ে কঠিন শাস্তি সেই আলেমই ভোগ করিবে যে নিজের এলেম দ্বারা উপকৃত হয় নাই।" আসল কথা হইল, যে এলেম আল্লাহ তায়ালার বিবেচনায় এতই সম্মানিত, উহাকে যে ব্যক্তি পার্থিব কোন কিছু হাছিলের হাতিয়ার রূপে ব্যবহার করে, সে আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ নেয়ামতের অপব্যবহার করে। সর্বোৎকৃষ্ট সম্পদকে সে নিকৃষ্ট বস্তুর বিনিময়ে ব্যবহার করে বলিয়া উহা তাহার উপকার না করিয়া বরং অপকারই করিয়া থাকে। বস্তুত এই রূপ করা আল্লাহতায়ালার দৃষ্টিতে খুবই অপছন্দনীয় এবং আল্লাহর সহিত প্রতিদ্বন্দ্বিতার নামান্তর মাত্র। অপরকে এলেম শিক্ষা দেওয়া এবং সর্বসাধারণ মুসলমানের প্রয়োজনে ফতোয়া জারী করা খাঁটি নিয়তে আল্লাহর ওয়াস্তে হইলে প্রশংসনীয়। তদ্বারা উভয় পক্ষই উপকৃত হয়। আর যদি উহাতে মান-সম্মান, খ্যাতি, কর্তৃত্ব ও ধনোপার্জন উদ্দেশ্য হয়, তবে তাহা নিন্দনীয়।

"যে সকল আলেম পার্থিব সুখ সম্ভোগের মোহে আচ্ছন্ন, তাহারাই 'দুনিয়াদার আলেম' নামে পরিচিত। তাহারা নিকৃষ্ট পর্যায়ের আলেম, মানব সমাজের নিকৃষ্ট জীব ও ধর্মের চোর রূপে বিবেচিত। অথচ তাহারা নিজেদেরকে সমাজের উচ্চ শ্রেণীর লোক ও সৃষ্টির সেরা মনে করিয়া থাকে। আল্লাহতায়ালা কুরআন পাকে বলেন, "তাহারা ধারণা করে যে, তাহারা উৎকৃষ্ট বস্তুর অধিকারী। জানিয়া রাখ, নিশ্চয়ই তাহারা মিথ্যাবাদী। শয়তান তাহাদের উপর প্রবল হইয়া তাহাদিগকে আল্লাহর স্মরণ ভুলাইয়া দিয়াছে। তাহারাই শয়তানের দল। সাবধান! নিশ্চয়ই শয়তানের দলই ক্ষতিগ্রস্থ হইবে।"

দুনিয়াপরস্ত আলেম সমাজের বদ-দীনী কার্যকলাপের অশুভ প্রভাব থেকে ইসলামকে রক্ষায় মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের নিরলস প্রচেষ্টাঃ

উপরের আলোচনায় ইহা স্পষ্ট হয় যে, হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের সময়ে দুনিয়াপরস্ত আলেম সমাজের পাপাচারের ঘন কুয়াশায় ইসলামী আকাশ আচ্ছন্ন ছিল। দুনিয়াদার আলেমদের এহেন বদ-দীনী কার্যকলাপ ও দেশব্যাপী তাহার অশুভ প্রভাব দেখিয়া তিনি অত্যন্ত উদ্বিগ্ন ও ব্যথিত হন। ঐ সকল দুনিয়াপূজক আলেম সমাজ ও পথ ভ্রষ্ট বাদশাহের বিরুদ্ধে কিছু বলার সাহসও তেমন কাহারও ছিল না। হক্কানী আলেম দু-চারজন যাহারাই সম্রাট ও দুনিয়া প্রেমিক আলেম সমাজের বিরুদ্ধে কথা বলিয়াছেন, তাহাদেরকেই অকালে জীবন দিতে হইয়াছে। ফলে হক পন্থী আলেম সমাজ নিশ্চুপ ও নির্লিপ্ত থাকিতেন।

হাজারী মুজাদ্দেদ হযরত শায়খ আহমদ সেরহিন্দী (রাঃ) ছাহেব দেখিলেন, দুনিয়াদার আলেম সমাজের দৌরাত্ম্যকে আরও অধিক প্রশ্রয় দিলে সত্য ইসলামের চিহ্ন আর ভারতবর্ষে থাকিবে না, চিরদিনের জন্য নিশ্চিহ্ন হইবে। তাই তিনিই সোচ্চার হন দুনিয়াপরস্ত আলেম সমাজের বিরুদ্ধে। তিনি বলিষ্ঠ লেখনী ও ক্ষুরধার বক্তৃতার মাধ্যমে ইসলামদ্রোহী সম্রাট ও দুনিয়াদার আলেম সমাজের বিরুদ্ধে রুখিয়া দাঁড়ান এবং এক সংস্কারমুখী আন্দোলন পরিচালনা করেন। হাজারী মুজাদ্দেদ ছাহেবের দূরদর্শীতা, ত্যাগ, তিতিক্ষা ও ঐকান্তিক প্রচেষ্টার ফলে ভারতবর্ষ থেকে দুনিয়াপরস্ত আলেমদের যাবতীয় বদ-দীনী কার্যকলাপ সমূলে উৎপাটিত হয়; তাহাদের পাপাচারের ঘন কুয়াশা ইসলামী আকাশ থেকে দূর হয়, সত্য ইসলামরূপ সূর্য পুনরায় পূর্ণ দীপ্তিতে আত্মপ্রকাশ করে।

কিভাবে হাজারী মুজাদ্দেদ তদীয় এই সংস্কার কর্মসূচী পরিচালনা করেন? মুজাদ্দেদ ছাহেব লক্ষ্য করিলেন যে, দুনিয়াপরস্ত আলেম সমাজ তাহাদের নাানী খাহেশাত পূরণ করিবার উদ্দেশ্যে ধর্মীয় বিধানে 'বেদাতে হাসানা' বা উত্তম বেদাত নামক এক সূত্র চালু করিয়াছে, যেই সূত্র পথে তাহারা স্বীয় স্বার্থ হাছিলে নব নব বিধান ধর্মে আমদানী করিতেছে। ফলে সত্য ধর্ম শেরেকী বেদাতীতে নিমজ্জিত হইতেছে। সেই জন্য তিনি এই ধ্বংসাত্মক মতবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন এবং কোন বেদাতই "হাসানা” বা উত্তম হওয়ার পর্যায়ভুক্ত নয় বলিয়া অভিমত ব্যক্ত করেন।

তিনি বলেন, "আলেমগণ বেদাতকে "হাসানা" ও "ছাইয়েয়া”-এই দুইভাগে বিভক্ত করিয়াছেন। তাহাদের মতে, 'বেদাতে হাসানা' সেই নেক আমলকে বলা হয়, যাহা হযরত নবী করীম (সাঃ) এবং খোলাফায়ে রাশেদীনের পরবর্তী যুগে প্রবর্তিত হইয়াছে, তবে উহার প্রসারের ফলে কোনও সুন্নতের বিলুপ্তি বা বিনাশ সাধন হয় নাই। আর "বেদাতে ছাইয়েয়া' সেই নব প্রবর্তিত কাজকে বলে যাহার প্রসারের ফলে নবীজীর কোনও সুন্নত বিনাশপ্রাপ্ত হয়। এই অধম উভয় প্রকারের বেদাতের কোনটির মধ্যেই কোনরূপ সৌন্দর্য ও কল্যাণ দেখিতে পায় না, অমানিশি ও পংকিলতা ছাড়া কিছুই অনুভব করে না। দৃষ্টি শক্তির দুর্বলতার কারণে কোন বেদাতকে আপাতঃ যদিও তরতাজা ও সৌন্দর্যমন্ডিত দেখা যায়, কিন্তু যখন দৃষ্টিশক্তি সতেজ হইবে, তখন উহার পরিণাম ক্ষতি ও অনুতাপ ছাড়া কিছুই দেখা যাইবে না।

"খায়রুল বাশার নবী করীম (সাঃ) বলেন, আমার ধর্মের মধ্যে যাহা কিছু নতুন সৃষ্টি উহার সবই বাতিল বলিয়া বিবেচিত। সুতরাং শরীয়ত প্রবর্তক নিজেই যাহা বাতিল ঘোষণা করিয়াছেন, উহাতে কিরূপে সৌন্দর্য ও কল্যাণ থাকিতে পারে?

"হযরত রাসূলে পাক (সাঃ) বলেন, নিশ্চয়ই আল্লাহর বাণীই সর্বশ্রেষ্ঠ বাণী, মুহাম্মদ মোস্তফা (সাঃ) এর হেদায়েতই সর্বোৎকৃষ্ট হেদায়েত। আর নব প্রবর্তিত সমস্ত কাজই নিকৃষ্ট এবং সমস্ত বেদাতই পথভ্রষ্টতা ...। সমস্ত বেদাতই যখনই পথভ্রষ্টতা, তখন আর "হাসানার' কি মূল্য থাকিতে পারে?

-"এতদ্‌ সম্পর্কীয় বিভিন্ন হাদীসের মর্ম অনুধাবন করিলে বুঝা যায় যে, প্রত্যেক বেদাতই কোন না কোন সুন্নতের বিলোপ সাধন করে; তাহাতে হাসানা ও ছাইয়েয়ার কোন পার্থক্য নাই। সুতরাং বেদাত মাত্রই সুন্নত বিনাশক। হযরত হাছান (রাঃ) ছাহেব হইতে বর্ণিত, হযরত রাসূলে পাক (সাঃ) বলেন, কোন জাতি যখন ধর্মের মধ্যে নতুন কোন কিছুর প্রচলন করে, তখন আল্লাহতায়ালা উহার সমতুল্য কোনও কল্যাণধর্মী আদর্শকে তাহাদের জীবন ধারা হইতে তুলিয়া লন; আর তাহারা সে কল্যাণ হইতে চিরতরে বঞ্চিত হইয়া যায়।

"ওলামায়ে কেরাম ও মাশায়েখে তরিকত কতক বেদাতকে যে মোস্তাহাবের মর্যাদা দিয়া থাকেন, সেগুলি গভীর ভাবে পর্যালোচনা করিলে দেখা যায় যে, উহাদের প্রত্যেকটিই কোন না কোন সুন্নতের আলেমগণ নামাজের মৌখিক বিলুপ্তির কারণ হইয়া থাকে। যেমন নিয়তকে "মোস্তাহাব' সাব্যস্ত করিয়াছেন অর্থাৎ মনে মনে স্থির করার সাথে সাথে মুখেও নামাজের নিয়ত সম্পর্কিত বাক্যগুলি উচ্চারণ করাকে ভাল কাজ রূপে গ্রহণ করিয়াছেন। অথচ ছহী কিংবা জঈফ অর্থাৎ বিশুদ্ধ কিংবা দুর্বল কোন প্রকার বর্ণনায় রাসূলে পাক (সাঃ) এইরূপ করিয়াছেন বলিয়া প্রমাণ নাই। সাহাবা কেরাম ও তাঁহাদের পরবর্তী যুগের শীর্ষ স্থানীয় তাবেঈগণের কেউ কখনও মুখে নামাজের নিয়ত উচ্চারণ করিয়াছেন বলিয়া দলিল পাওয়া যায় না। নামাজের জন্য একামত বলা হইলে তাহারা শুধু তাকবীর তাহরীমাই বলিতেন।

সুতরাং নামাজের নিয়ত মুখে উচ্চারণ করাটা একটি বেদাত কাজ-যাহাকে বেদাতে হাছানার মর্যাদা দেওয়া হইয়া থাকে। এই অধমের অভিমত হইলঃ এই বেদাতটি শুধু সুন্নতেরই বিলোপ সাধন করে না; উপরন্তু ইহার ফলে অনেক সময় একটি ফরজই তরক হইয়া যায়। মুখে নিয়ত উচ্চারণ করিতে যাইয়া অনেকেই শুধু মৌখিক উচ্চারণকেই যথেষ্ট মনে করে অথচ মনের গাফ্লতি বা অন্যমনস্কতার জন্য এতটুকু ভয় করে না। ফলে মনের নিয়ত যাহা নামাজের একটি ফরজ তাহাই তরক হইয়া যায় এবং উহার ফলে নামাজই অশুদ্ধ হইয়া যায়। অন্যান্য সব বেদাতেরই একই অবস্থা। কেননা উহা সুন্নতের উপর বাড়াবাড়ী অতএব হযরত রাসূলে পাক (সাঃ) এর অনুসরণে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হওয়া এবং তাঁহার সাহাবীগণের অনুকরণকে যথেষ্ট মনে করা আমাদের সকলের কর্তব্য, তাহাদের অনুকরণের মধ্যেই হেদায়েত প্রাপ্তি নিহিত।" (মকতুবাত শরীফঃ ১ম খন্ড, মকতুব নং ১৮৬)

এমনিভাবে হাজারী মুজাদ্দেদ (রাঃ) ছাহেব ক্ষুরধার ওয়াজ নসিহত ও কার্যকরী লেখনীর মাধ্যমে বেদাতের মূল উচ্ছেদ করেন। ফলে দুনিয়াদার আলেমদের জন্য ইসলামে নব নব প্রথা আমদানীর মাধ্যমে সুন্নতের বিলোপ সাধনের পথ বন্ধ হয়; তাহাদের বদ-দীনী কর্মকান্ডের বিষক্রিয়া হইতে মৃতপ্রায় ইসলাম জীবিত হয়।

মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের সংস্কারমূলক কর্মকান্ড উলুল আজম পয়গম্বরগণের অনুরূপঃ

হাজারী মুজাদ্দেদ ছাহেবের সংস্কার মূলক উক্ত কর্মকান্ড ছিল উলুল আজম পয়গম্বরগণের অনুরূপ। তিনি হাজার বছরের ব্যবধানে সত্য ইসলামে পুঞ্জীভূত যাবতীয় আবর্জনা তথা দুনিয়াপরস্ত আলেম বা নাফসপরস্ত আলেমদের দৌরাত্ন্য, শিয়া, খারেজী বা রাফেজীদের বদ-অকীদার প্রভাব, শাহী ফেত্না, ভন্ড সূফীদের অপতৎপরতা এবং সর্বোপরি আকবর প্রবর্তিত ইসলাম বিধ্বংসী দীনে এলাহীর বিষাক্ত প্রভাব হইতে রক্তপাতহীন বিপ্লবী ও সংগ্রামী আন্দোলনের মাধ্যমে ধ্বংসোম্মুখ মুসলিম জাতি ও মৃতপ্রায় ইসলামকে উদ্ধার করেন। এই প্রসংগে তিনি তদীয় পুত্রের নিকট লিখিত এক পত্রে বলেন, "প্রিয় বৎস, বিগত জামানার অন্ধকারাচ্ছন্ন সময়ে যখন কোন উলুল আজম পয়গম্বর প্রেরণ করা হইত; সেই সময়ের পরিবেশের সহিত বর্তমান জামানার হুবহু মিল রহিয়াছে।

কিন্তু এই উম্মত সমস্ত উম্মতগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ এবং তাহাদের নবী খাতেমুর রাসূল (সাঃ)। এই উম্মতের উলামাগণকে বনী ইসরাইলের নবীগণের মর্তবা দান করা হইয়াছে। এই জন্য প্রত্যেক শত বছরে এই উম্মতের উলামাগণের মধ্যে একজনকে মুজাদ্দেদ নির্ধারণ করা হয়, যিনি শরীয়তে মুহাম্মদীকে পুনরুজ্জীবিত করেন। বিশেষ করিয়া এক হাজার বছর অতিবাহিত হওয়ার পর বিগত জামানার উম্মতগণের মধ্যে কোন উলুল আজম পয়গম্বর প্রেরিত হওয়ার সময় হইত এবং কেবল নবীর দর্জার উপর যথেষ্ট মনে করা হইত না। কাজেই এই সময়ে উম্মতে মুহাম্মদীর মধ্যে এই রূপ একজন বড় শানদার মুজাদ্দেদ প্রয়োজন, যিনি আরেফে কামেল এবং উলুল আজম নবীর নায়েব হইবার যোগ্যতা রাখেন।"

সেই শানদার মুজাদ্দেদই যে হযরত শায়খ আহমদ সেরহিন্দী মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ), তাহা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তিনি আরও এক মকতুবে বলেন, "পীর-মুরীদী করিবার জন্য আমাকে প্রেরণ করা হয় নাই এবং আমাকে পয়দা করিবার উদ্দেশ্য কেবল সৃষ্ট জীবের শিক্ষা-দীক্ষার পূর্ণতা দান করা নহে। বরং ইহা একটি ভিন্নতর ব্যাপার এবং একটি ভিন্ন ধরণের কার্যক্রমের জন্য আমাকে পয়দা করা হইয়াছে। ইহার মাধ্যমে যে ব্যক্তি আমার সহিত সম্পর্ক স্থাপন করিবে, সে ফয়েজ প্রাপ্ত হইবে, নতুবা নয়। তকমীল ও ইরশাদের কার্যটি এই কার্যক্রমের মোকাবেলায় রাস্তার উপর পরিত্যাক্ত বস্তু সদৃশ। নবী (আঃ) গণ কর্তৃক ধর্মের প্রতি দাওয়াত ও আল্লাহতায়ালার সহিত তাঁহাদের বাতেনী সম্পর্কটিও এই ধরণের। যদিও নবুয়তের সেলসেলা শেষ হইয়াছে, কিন্তু নবুয়তের কামালাত ও ইহার বৈশিষ্ট্যরাজী রাসূলে পাক (সাঃ) এর পূর্ণ অনুসরণ ও উত্তরাধিকার সুত্রে নছীব হইয়া থাকে।" (মকুতবাত শরীফঃ ২য় খন্ড, মকতুব নং-৬)

কাজেই বুঝা গেল, মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব উলুল আজম পয়গম্বরগণের মতই তাওয়াজ্জুহ শক্তির প্রয়োগে যাবতীয় কুসংস্কার ও ইসলাম বিরোধী কার্যকলাপ হইতে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রকে মুক্ত করেন এবং রাসূলে পাক (সাঃ) প্রবর্তিত সত্য ইসলামকে মজবুত ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করেন।

সারকথাঃ

পাঁচটি পর্বের অধ্যায়নে নিশ্চয়ই তোমরা বুঝিয়াছ যে,

(১) সাহাবা, তাবেঈ ও বার ইমামের পর হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব শ্রেষ্ঠ ওলী।

(২) হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব সেই উম্মত-যাহার মাধ্যমে হাজার বছর পর হযরত রাসূলে পাক (সাঃ) হকিকতে ইব্রাহিমীর কামালত অর্জন করেন। তৎপর উম্মতে মুহাম্মদীর সমুদয় দায় দায়িত্ব দ্বিতীয় হাজার বছরের জন্য মুজাদ্দেদ ছাহেবের নিকট অর্পণ করিয়া তিনি প্রেম সাগরের গুপ্ত প্রদেশ হোব্বে সেরফায় মহান খোদাতায়ালার সাথে মিলিত হন।

(৩) তদ্‌ প্রবর্তিত এই খাছ মুজাদ্দেদীয়া তরিকা খোদাপ্রাপ্তির সর্বাপেক্ষা সহজ পথ।

(৪) এই মুজাদ্দেদীয়া তরিকা সর্ব কালের সর্বশ্রেষ্ঠ তরিকা।

(৫) এই তরিকা পূর্ববর্তী সমস্ত তরিকার সমন্বয়ে সৃষ্ট এবং রাসূলে পাক (সাঃ) এর পরিপূর্ণ নেছবতে প্রতিষ্ঠিত।

(৬) এই তরিকার মধ্য হইতেই আসিতেছেন ইমাম মেহেদী (আঃ)-যাহার পবিত্র হস্তে হাত রাখিয়া উম্মতে মুহাম্মদীর দলভুক্ত হইবেন পয়গম্বর হযরত ঈসা (আঃ)।

মূলতঃ হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব সংস্কারকদেরও সংস্কারক। আসমানের নীচে সাহাবাদের পরে এমন উঁচু দরজার ওলী আর আসেন নাই।

হাজারী মুজাদ্দেদ (রাঃ) ছাহেবের পরে দুনিয়ায় আগত ওলী-আল্লাহগণের মধ্যে হযরত খাজাবাবা এনায়েতপুরী (কৃঃ) ছাহেব শ্রেষ্ঠতম। তাঁহার সংস্কার মুখী কর্মকান্ডঃ

হাজারী মুজাদ্দেদ (রাঃ) ছাহেবের পরে যে কয়েক জন আরেফে কামেল মুজাদ্দেদ বা সংস্কারক রূপে আর্বিভূত হন এবং সংস্কার কর্মকান্ড পরিচালনা করেন, তাহাদের মধ্যে আমার পীর কেবলাজানের আসন সকলের উর্ধ্বে। তিনি ১৪০০ শতাব্দীর মুজাদ্দেদ রূপে আবির্ভূত হন। এই শতাব্দীতে দুনিয়াদার আলেম সমাজের ইসলাম বিরোধী কার্যকলাপ যেমন মাথাচাড়া দিয়া উঠে, তেমনি বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষতার এই যুগে বিজ্ঞানপরস্ত মানুষের ধর্মবিরোধী অপপ্রচার সংক্রামক ব্যাধির মত সাধারণ মানুষকে আক্রমণ করে। ফলে সাধারণ মানুষ আল্লাহবিরোধী কর্মকান্ডে গা ভাসাইয়া দেয়, ধর্মকে অবহেলা করে, আল্লাহ প্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞান চর্চাকে প্রয়োজনহীন মনে করে।

আমার পীর কেবলাজান জীবনের বেশীর ভাগ সময় বাংলা ও আসামে ছফর করেন; তদীয় তাওয়াজ্জুহ শক্তি প্রয়োগে সাধারণ মুসলমানের উপর থেকে দুনিয়াপরস্ত আলেম সমাজ ও বিজ্ঞান পূজারী তথাকথিত শিক্ষিত সমাজের প্রভাব মুক্ত করেন। ফলে খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞান চর্চার প্রয়োজনীয়তা যেমন সাধারণ মুসলমান বুঝিতে পারেন, তেমনি দুনিয়াপরস্ত আলেম সমাজও তাহাদের ভুল বুঝিতে পারেন এবং খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞান চর্চাকে একান্ত জরুরী বলিয়া মনে করেন।

পীর কেবলাজানের ঐকান্তিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে বাংলা ও আসামের লক্ষ লক্ষ মানুষ যাবতীয় শেরেকী, বেদাতী ও বদ-দীনী কার্যকলাপের তাছিরমুক্ত হন; জাহেরী আমলের সাথে সাথে বাতেনী জ্ঞান চর্চার দ্বারা আত্মার সংশোধন করেন, দুনিয়ার মোহমুক্ত হন, নাফসের শৃংখলমুক্ত হন। পীর কেবলাজানের অপরিসীম ত্যাগ তিতিক্ষা ও সর্বাত্মক চেষ্টার মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ মানুষের এই সমাজ শেরেকী ও বেদাতীর বিষাক্ত প্রভাব বা তাছির মুক্ত হয়। লক্ষ লক্ষ মানুষ খাজাবাবা হযরত এনায়েতপুরী (কুঃ) ছাহেবের ছোহব্বতে আল্লাহ ও রাসূলের প্রেমসুধা পানে ধন্য হন; সত্য ইসলামে নিহিত নিগুঢ় সত্যকে উপলব্ধি করিতে পারেন।

হে জাকেরান সকল! তোমরা যদি দেলের আবর্জনা দূর করিতে চাও, পরিচ্ছন্ন দেলে খোদাতায়ালার নূর ধারণ করিতে চাও, দেলকে প্রশস্ত করিতে চাও, তবে আমার পীর কেবলাজানের মহব্বত অর্জনের চেষ্টা কর। কিন্তু পীর কেবলাজান হুজুরের মহব্বত অর্জন করিবে কেমন করিয়া? তিনিতো এখন পর্দার অন্তরালে। তাহাকে তোমরা দেখ না। অথচ তিনি তোমাদিগকে ভালবাসেন। তাই তদীয় মহব্বত যাহাতে সহজে তোমরা অর্জন করিতে পার, সেই জন্য তদীয় নেয়ামতের ডালা আমার মস্তকে অর্পণপূর্বক তোমাদের মাঝেই আমাকে রাখিয়া গিয়াছেন। কাজেই আমি যাহা বলি, সেই অনুযায়ী চল।

যে নির্দেশ তোমাদের দেই, সেই নির্দেশ প্রতিপালন কর। আমাকে ভালবাস, আমাকে আদর কর, আমাকে মহব্বত কর। তাহা হইলে আমার পীরের মহব্বত তোমাদের দেলে পয়দা হইবে; সংগে সংগে মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের মহব্বত ও আল্লাহ-রাসূলের মহব্বত তোমরা অর্জন করিতে সক্ষম হইবে। উক্ত মহব্বতের প্রবল স্রোতে তোমাদের দেলের গোনাহের যাবতীয় ময়লা ভাসিয়া যাইবে; তোমাদের নাফস পরিশুদ্ধ হইয়া মোৎমাইন্ন্যার স্তরে উপনীত হইবে। তথা হইতে প্রেম সাগরের গুপ্ত ও চূড়ান্ত প্রদেশ হোব্বে সেরফায় উপনীত হইতে পারিবে। তবে শুধু মহব্বত অর্জন করিলেই চলিবে না, ইবাদতের পরিপূর্ণতাও অর্জন করিতে হইবে। জানা দরকার, খোদাপ্রাপ্তির দুইটি পথঃ মহব্বত ও ইবাদত। মহব্বত ও ইবাদত অংগাঅংগী ভাবে জড়িত। একটিকে বাদ দিলে আর একটির কোন মূল্য থাকে না।

মহব্বত শূন্য ইবাদত যেমন কবুলিয়তের যোগ্যতা পায় না; তেমনি ইবাদতবিহীন শুধু মহব্বতও খোদাতায়ালার নিকট গ্রহণযোগ্য নহে। কাজেই মহব্বত অর্জনের প্রচেষ্টার সাথে সাথে নিত্য দিনের ফরজ, ওয়াজেব, সুন্নত, নফল ইবাদত এবং তরিকতের নিয়ম পদ্ধতি যথারীতি আদায় করিতে হইবে। ইহাতে আল্লাহপাকের দয়ায় তোমাদের ভাগ্য সুপ্রসন্ন হইলে মহব্বতের চূড়ান্ত ঘাটি হোব্বে সেরফায় যেমন উপনীত হইতে পারিবে, তেমনি ইবাদতের শেষ মাকাম মাবুদিয়াতে সেরফায় পৌঁছাইতে পারিবে, খোদাতায়ালার একান্ত সান্নিধ্য লাভ করিতে পারিবে, তোমাদের জীবন ধন্য হইবে। এক অনাবিল শান্তি সাগরে তোমরা অবিরাম সন্তরণ করিতে পারিবে। আল্লাহপাক তোমাদিগকে কামিয়াবী বখশিস করুন। আমীন!

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD