Logo

খাজা বাকীবিল্লাহ (রঃ) নেসবতে ভারত বর্ষে সত্য তরিকা প্রসিদ্ধি লাভ

profile picture
জনবাণী ডেস্ক
৩০ জুন, ২০২৬, ১৯:৫১
খাজা বাকীবিল্লাহ (রঃ) নেসবতে ভারত বর্ষে সত্য তরিকা প্রসিদ্ধি লাভ
ছবি: জনবাণী।

খোদাপ্রাপ্তি জ্ঞানের আলোকে শাহ্সূফি হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ও খাজা বাকীবিল্লাহ (রঃ) بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ (মূল বক্তব্যঃ নকশ্বন্দীয়া খান্দানের বিশিষ্ট বুজুর্গ আরেফে কামেল, হযরত খাজা বাকীবিল্লাহ (রঃ) ছাহেবের সাধনা জীবন, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য এবং মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের তরবিয়ত বা প্রতিপালনে তাঁহার সফলতা প্রসংগে আলোচনা)

বিজ্ঞাপন

হযরত খাজা মোঃ বাকীবিল্লাহ (রঃ) ছাহেব সেই মহান সাধক-যাহার মাধ্যমে তৎকালীন শ্রেষ্ঠতম তরিকা-তরিকায়ে নকশ্বন্দীয়া হিন্দুস্থানে প্রসার লাভ করে। তাঁহারই নেসবতে ও প্রতিপালনে হাজারী মুজাদ্দেদ (রাঃ) ছাহেব এই তরিকার পরিপূর্ণ কামালাত হাছিল করেন এবং সমগ্র উপমহাদেশে ব্যাপক ভিত্তিতে নকশবন্দীয়া তরিকা প্রচার করেন। ফলে ভারত বর্ষে এই সত্য তরিকা প্রসিদ্ধি লাভ করে। বাংলার আশেক কবি তাঁহার শানে তাই লেখেন-

"চারশ বছর আগে ভারত ভূমিতে

তুমিইতো এনেছিলে সিদ্দিকী প্রদীপ

বিজ্ঞাপন

জ্যোতি তার চেয়েছিল আরশ চুমিতে

করেছিল জরাগ্রস্ত জীবন জরিপ।"

জন্ম, শৈশব ও কৈশোরঃ

বিজ্ঞাপন

ওলীয়ে কামেল হযরত খাজা মোঃ বাকীবিল্লাহ (রঃ) ছাহেব ৯৭১ হিজরীতে আফগানস্থানের রাজধানী কাবুল শহরের এক নিভৃত কুটিরে জন্মগ্রহণ করেন। তদীয় পিতার নাম হযরত কাজী আব্দুস সালাম। কাজী আব্দুস সালাম অত্যন্ত পরহেজগার ও ধার্মিক লোক ছিলেন। তাঁহারই ঔরসে জন্ম নেন জামানার কুতুব, হযরত বাকীবিল্লাহ (রঃ) ছাহেব।

আল্লাহপাক যে সকল মহামানবকে হেদায়েতের দায়িত্বভার অর্পণ করেন, শৈশব কাল হইতে তাঁহারা একটু ভিন্ন স্বভাবের বা আলাদা প্রকৃতির হন। হযরত বাকীবিল্লাহ (রঃ) ছাহেবও এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম নহেন। বাল্যকালে তিনি আর দশটি বালকের মত ছিলেন না। তাঁহার মধ্যে চঞ্চলতা ছিল না। তিনি নীরবতা পছন্দ করিতেন; খুব শান্ত প্রকৃতির ছিলেন।

জাহেরী ও বাতেনী জ্ঞানার্জনঃ

বিজ্ঞাপন

খাজা বাকীবিল্লাহ (রঃ) ছাহেবের পিতামাতা তাঁহার জ্ঞানার্জনের প্রতি নজর দেন। তৎকালীন কাবুলে জাহেরা বিদ্যায় বিশিষ্ট বিদ্যান ছিলেন মাওলানা ছাদেক হালওয়ারী (রঃ)। মোঃ বাকীবিল্লাহকে তাঁহার হাতে সোপর্দ করা হয়। মাওলানা হালওয়ারী ছাহেবও অত্যন্ত যত্নের সাথে সুতীক্ষ্ণ মেধার অধিকারী এই বালককে পাঠ দান করিতে থাকেন। ধারালো মেধার অধিকারী এই বালক অল্প সময়ের মধ্যেই জাহেরী এলেমে ব্যাপক জ্ঞান অর্জন করেন। কুরআন, হাদীস, ফিকাহ তাফসির এবং তরিকতের পুস্তকাদি অধ্যায়ন করেন।

কিন্তু হঠাৎ করিয়া মাঝ পথেই জাহেরী এলেমের শিক্ষার্জন তিনি ছাড়িয়া দেন। খোদা প্রাপ্তিজ্ঞান অর্জনের নেশা তাঁহার অন্তরে সৃষ্টি হয়। তরিকতের কিতাবাদি অধ্যায়ন করিয়া তিনি জানিতে পারেন-খোদাতায়ালাকে এই পৃথিবী হইতে না চিনিলে পরকালে চিনিবার কোন উপায় থাকিবে না; এই পৃথিবী হইতে খোদাতায়ালাকে না দেখিলে পরকালে তাহাকে দেখা যাইবে না। তাই খোদাতায়ালাকে পাওয়ার আশা তাঁহার অন্তরে জাগে, খোদাতায়ালার প্রেম অগ্নি তদীয় অন্তরে জ্বলিয়া উঠে। তিনি জাহেরী জ্ঞান অর্জন ছাড়িয়া দেন, খোদা অন্বেষণে বাহির হন, কামেল পীরের সন্ধান করিতে থাকেন। কামেল পীরের সন্ধানে তিনি ব্যাপক সফর শুরু করেন। দেশ-বিদেশ ঘুরিয়া বেড়ান। কাবুলে, সমরখন্দে, কাশ্মিরে বা বলখে ব্যাপক সফর করেন। বিভিন্ন ওলী-আল্লাহগণের খানকায় যান, তাহাদের নিকট তওবা করেন, ফয়েজ হাছিলের চেষ্টা করেন। তাঁহার এই হঠাৎ সংকল্পের পরিবর্তন দেখিয়া অনেকেই সমালোচনামুখর হন। কেউ কেউ তাঁহার সংকল্পের দৃঢ়তার প্রশংসাও করেন এবং বলেন, এই সাহসী বীর দৃঢ় সংকল্পের অধিকারী। যে কাজেই তিনি মনোনিবেশ করেন না কেন, কাংখিত লক্ষ্যে না পৌঁছানো পর্যন্ত কিছুতেই নিবৃত্ত হন না।

হযরত বাকীবিল্লাহ (রঃ) ছাহেব বিভিন্ন ওলী-আল্লাহর সান্নিধ্যে আসেন এবং তাহাদের নিকট হইতে ফয়েজ হাছিল করেন। তিনি প্রথমে কাবুলের হযরত খাজা উবায়েদ (রঃ) এর নিকট, তৎপর সমরখন্দের বিখ্যাত বুজুর্গ খাজা ইফতেখার (রঃ) ছাহেবের নিকট, অতঃপর বলখের প্রখ্যাত ওলী-আল্লাহ হযরত আমীর আবদুল্লাহ বলখী (রঃ) ছাহেবের নিকট তওবা করেন এবং তওবার উপর স্থির থাকিতে চেষ্টা করেন। কিন্তু তাঁহার মনের যন্ত্রণা কাটে না, অস্থিরতা দূর হয় না। তিনি আবার ছফর শুরু করেন। যান, কাশ্মীরে। কাশ্মীরের বিখ্যাত দরবেশ হযরত মাবায়ে ওয়াশি (রঃ) ছাহেবের খেদমতে তিনি কিছুদিন থাকিয়া যথেষ্ট বাতেনী নেয়ামত হাছিল করেন। কিন্তু মাঞ্জিলে মাছুদে পৌঁছাইতে পারেন না। ফলে তাঁহার মনের অস্থিরতা কাটে না। এই অস্থিরতা ও পেরেশানির মধ্যেই নকশবন্দীয়া খান্দানের বিভিন্ন বুজুর্গ আসিয়া স্বপ্নে তাঁহাকে তাইদ ও মদদ দিতে থাকেন। ইহাতে ব্যাপক বাতেনী নেয়ামত তিনি লাভ করিতে সক্ষম হন।

বিজ্ঞাপন

একদা মোঃ বাকীবিল্লাহ (রঃ) ছাহেব গভীর মনোযোগ সহকারে মারেফত বিধৃত একটি কিতাব পড়িতেছিলেন। এমন সময় সহসা তাহার মধ্যে এক ভাবের সৃষ্টি হয়। তিনি আত্মবিস্মৃত হন এবং দেখেন, "হযরত বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (রঃ) ছাহেব তাহাকে রূহানী ভাবে আকর্ষণ করিতেছেন। সেই অবস্থাতেই রূহানীভাবে তিনি হযরত নকশবন্দ (রঃ) এর নিকট হইতে জেকেরের তালিম গ্রহণ করেন। তখন এক বিস্ময়কর হাল বা অবস্থা তাহার ভিতরে প্রকাশ পায়। বিশেষ এক হুজুরী তাঁহাকে আচ্ছন্ন করিয়া ফেলে।"

ইহার কিছুদিন পরে তিনি স্বপ্নে দেখেন, নকশবন্দীয়া খান্দানের বিশিষ্ট বুজুর্গ হযরত ওবায়দুল্লাহ আহরার (রঃ) ছাহেব তাঁহাকে বলিতেছেন, "বাবা, তুমি হযরত খাজেগী আমকাংগীর নিকট যাও। তোমার মঞ্জুদ ইনশাল্লাহ পূরণ হইবে।" এই নির্দেশ পাওয়ার পর পরই তিনি আবার স্বপ্নে দেখেন যে, হযরত খাজেগী আমকাংগী (রঃ) ছাহেব আসিয়া আবেগজড়িত কন্ঠে তাঁহাকে বলিতেছেন, 'হে বাকীবিল্লাহ! তোমার জন্য আমার হৃদয় ব্যথিত। দুই চক্ষু দীর্ঘ প্রতীক্ষায় ব্যাকুল।” এই স্বপ্ন দেখিবার সাথে সাথেই হযরত বাকীবিল্লাহ (রঃ) ছাহেবের হৃদয় সমুদ্রে আনন্দের স্রোত প্রবাহিত হয়। তিনি আর সময় ক্ষেপণ না করিয়া হযরত খাজেগী আমকাংগী (রঃ) ছাহেবের সন্ধানে বাহির হন।

বহু অনুসন্ধানের পর তিনি জানিতে পারেন, হযরত খাজেগী আমকাংগী (রঃ) ছাহেব "মাঅরা উন্নাহারে" বসবাস করেন। সেখানেই তিনি তরিকা প্রচার করেন। হযরত খাজা মোঃ বাকীবিল্লাহ (রঃ) কাল বিলম্ব না করিয়া রওয়ানা দেন "মাঅরা উন্নাহারের" উদ্দেশ্যে। পথ তাঁহার জানা ছিল। বহু দূর পথ হইলেও তাহা অতিক্রম করিতে তাঁহার তেমন বেগ পাইতে হয় নাই। কারণ তাঁহার হৃদয়ে ছিল এক সাগর প্রেম। প্রেমের ধাক্কাতেই তিনি অতি দ্রুত "মাঅরা উন্নাহারে" পৌঁছান, হযরত খাজেগী আমকাংগী (রঃ) ছাহেবের পবিত্র সান্নিধ্যে। তিনি বায়াত হন। পীরের সান্নিধ্যে থাকিয়া নিয়মিত ওজিফা-কালাম পালন করিতে থাকেন।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু হযরত খাজেগী আমকাংগী (রঃ) ছাহেব হযরত বাকীবিল্লাহ (রঃ) ছাহেবকে বেশী দিন খেদমতে রাখেন নাই। কিতাবে দেখা যায়, তিনি হযরত বাকীবিল্লাহ (রঃ) কে একটি পৃথক হুজরায় লইয়া নিভৃতে, গোপনে একাধারে তিন দিন তাওয়াজ্জুহ প্রয়োগ করিয়া নকশবন্দীয়া তরিকার যাবতীয় কামালাত এবং প্রয়োজনীয় বাতেনী নেয়ামত দান করেন।

হযরত বাকীবিল্লাহ (রঃ) ছাহেবের মঞ্জুদ পূর্ণ হয়। তিনি বেলায়েত ও কামালাত প্রাপ্ত হন, খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞান হাছিল করেন, খোদাতায়ালার সান্নিধ্য লাভ করেন।

হিন্দুস্থানে সত্য প্রচারের নির্দেশ প্রাপ্তিঃ

বিজ্ঞাপন

হযরত খাজেগী আমকাংগী (রঃ) ছাহেব যাবতীয় বাতেনী নেয়ামতে ভরপুর করিয়া দিয়া হযরত বাকীবিল্লাহ (রঃ) ছাহেবকে বলেন, "আল্লাহতায়ালার সীমাহীন রহমত এবং নকশবন্দীয়া তরিকার বুজুর্গগণের রূহানী তরবিয়তে কামালাত অর্জনের সব কাজ আপনার শেষ হইয়াছে। এখন আপনার ডাক পড়িয়াছে হিন্দুস্থানে। আপনার বরকতে ও প্রচেষ্টায় এই তরিকা সেখানে প্রসার লাভ করিবে। অনেক তালেবে মাওলা আপনার ফয়েজ ও বরকতের গভীর সমুদ্রে ডুব দিয়া মারেফাতের বহু অমূল্য মণি-মাণিক্য তুলিয়া আনিবে।"

হযরত বাকীবিল্লাহ (রঃ) ছাহেব খোদাতায়ালাকে পাইলেন, মারেফাত সমুদ্রে ডুব দিয়া দুর্লভ জ্ঞান রূপ বহু মণি-মাণিক্য সংগ্রহ করিলেন; দীর্ঘ দিনের মঞ্জুদ তাহার পূর্ণ হইল। কিন্তু এরই মধ্যে তদীয় পীর তাহাকে হেদায়েতের দায়িত্বভার অর্পণ করিলেন।

হিন্দুস্থানবাসীদের হেদায়েত করিতে হইবে; তাহাদের মধ্যে আল্লাহ রাসূলের মহব্বতের বীজ বপন করিতে হইবে। ইহা এক মহা দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনের লক্ষণ নিজের ভিতরে না দেখিতে পাইয়া অত্যন্ত আজিজির সাথে তিনি পীরের নিকট হিন্দুস্থানে যাওয়ার ওজর-আপত্তি তুলিলেন। কিন্তু পীর হযরত খাজেগী আমকাংগী (রঃ) ছাহেব নিজ সিদ্ধান্তে অটল। তিনি বাকীবিল্লাহকে বলিলেন, "আপনি ইস্তেখারা করিয়া দেখেন।"

বিজ্ঞাপন

হযরত বাকীবিল্লাহ (রঃ) ছাহেব বলেন, "আমি ইস্তেখারাকালে দেখিলাম, একটি খুবছুরত তোতা পাখী গাছের ডালে বসিয়া আছে। পাখীটির সৌন্দর্যে যে কেহই মুগ্ধ হইবে। আমি মনে মনে বলিলাম, পাখীটি যদি আমার হাতে আসিয়া বসিত, তাহা হইলে আমার হিন্দুস্থান সফর সাফল্যমন্ডিত হইত। মনে মনে এই খেয়াল করিতেই পাখীটি আমার হাতে আসিয়া বসিল। আমি যারপরনাই খুশী হইলাম। পাখীটিকে আদর করিলাম। তাহার ঠোঁটে-মুখে চুমু খাইলাম। মুখের লালা তোতার মুখে দিলাম। তোতাও ইহার পরিবর্তে আমার মুখ চিনিতে ভরিয়া দিল।"

তিনি বলেন, "আমি সকালে উঠিয়া হযরত খাজেগী আমকাংগী (রঃ) ছাহেবের খেদমতে আমার রাত্রির স্বপ্নের বৃত্তান্ত খুলিয়া বলিলাম। ইহা শুনিয়া তিনি বলিলেন, "হিন্দুস্থানের পাখীর মধ্যে তোতাই সমধিক প্রসিদ্ধ। হিন্দুস্থানে আপনার তরবিয়তে বা প্রতিপালনে এমন একজন বুজুর্গ আত্মপ্রকাশ করিবেন, যাহার দ্বারা সারা দুনিয়া রওশন হইবে এবং আপনিও উপকৃত হইবেন।"

খাজা বাকীবিল্লাহ (রঃ) ছাহেবের শ্রেষ্ঠতম কাজ হাজারী মুজাদ্দেদ (রাঃ) ছাহেবের তরবিয়ত বা প্রতিপালনঃ

বিজ্ঞাপন

জগতে যত ওলীয়ে কামেল পথ প্রদর্শক হিসেবে আসিয়াছেন, তাহারা সকলেই সংস্কারক হিসেবে কাজ করিয়াছেন। তবে এক একজনের কর্মের ধারা এক এক রকম ছিল। কেউবা শুধু আত্মিক সংস্কারক হিসেবে কাজ করিয়াছেন, সাধারণের আত্মিক পরিশুদ্ধতা দান করিয়াছেন আবার কেউবা ইহার সাথে আরও অতিরিক্ত কিছু সংস্কার মূলক কর্মকান্ড করিয়াছেন, অত্যাচারী শাসকবর্গের নির্যাতন থেকে সাধারণ প্রজাদের উদ্ধার করিয়াছেন, তাহাদের বদ-দীনী কার্যকলাপের বিষক্রিয়া থেকে মৃতপ্রায় ইসলামকে জীবিত করিয়াছেন ইত্যাদি। তবে প্রত্যেকেরই কর্মের সীমা নির্ধারণ করা থাকে। যাহাকে দিয়া আল্লাহপাক যতটুকু করাবেন, তিনি দুনিয়াতে আসিয়া ততটুকুই কাজ সম্পন্ন করেন।

উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, হযরত ওবায়দুল্লাহ আহরার (রঃ) ছাহেব নকশবন্দীয়া খান্দানের বিশিষ্ট ওলী ছিলেন। তিনি শুধু মোর্শেদই নহেন, মোর্শেদেরও মোর্শেদ ছিলেন। তিনি বলিতেন, "আমি শুধু পীর মুরীদি করিতে আসি নাই। আমি যদি শুধুমাত্র পীরের দায়িত্ব পালন করি, তাহা হইলে অন্য কোন পীর আর মুরীদ পাইবেন না। কিন্তু আমার উপর অন্য ধরণের বিরাট দায়িত্ব অর্পণ করা হইয়াছে। মুসলমানদেরকে জালেমদের হাত থেকে রক্ষা করা, শরীয়তের আইন-কানুন যথাযথভাবে প্রচলন করা এবং একই সাথে বাদশাহদের যথেচ্ছাচারিতা ও খেলাফ কাজ সমূহের বিরুদ্ধচারণ করাই হইতেছে আমার প্রধান কাজ। আল্লাহপাক আমাকে এমন ক্ষমতা দিয়াছেন যে, আমি যদি 'খাতা'র বাদশাহকেও পত্র দিয়া জানাই-তুমি সিংহাসন ত্যাগ করিয়া খালি মাথায় খালি পায়ে আমার খানকায় হাজির হও, তাহা হইলে সেও আমার হুকুম মানিতে বাধ্য হইবে। কিন্তু আমি আল্লাহতায়ালার ইশারা ছাড়া কোন কাজ করি না।"

হেদায়েতকারী ওলী-আল্লাহগণ সকলেই হেদায়েত কর্ম পরিচালনা করিলেও কাহারও কাহারও উপর আবার বিশেষ বিশেষ দায়িত্ব অর্পিত হয়। হযরত বাকীবিল্লাহ (রঃ) ছাহেবের উপর তেমনি বিশেষ দায়িত্ব অর্পিত হইয়াছিল-তাহা ছিলঃ হাজারী মুজাদ্দেদ হযরত শায়খ আহমদ (রাঃ) ছাহেবকে তরবিয়ত বা প্রতিপালন করা, নকশবন্দীয়া তরিকার যাবতীয় কামালাত তাঁহাকে দান করা এবং নেসবতে রাসূলে পাক (সাঃ) এর যে অমূল্য আমানত তাহার নিকট গচ্ছিত আছে, তাহা হাজারী মুজাদ্দেদ (রাঃ) ছাহেবের কালবে যথাযথ পৌঁছাইয়া দেওয়া।

বিজ্ঞাপন

দিল্লীতে আগমন ও সত্য প্রচার শুরুঃ

হযরত বাকীবিল্লাহ (রঃ) ছাহেব তাঁহার উপর অর্পিত দায়িত্ব পালনের উদ্দেশ্যে পীরের নির্দেশকে মাথায় করিয়া দিল্লী অভিমুখে রওয়ানা দেন। সংগে তদীয় বিবি ছাহেবা এবং শ্রদ্ধেয়া মা জননী। ক্ষুদ্র এই কাফেলা দিল্লীভিমুখে রওয়ানা হয়। কয়েকদিন একাধারে পথ চলিবার পর তিনি লাহোরে পৌঁছান। হযরত বাকীবিল্লাহ (রঃ) ছাহেব লাহোরে কয়েকদিন অবস্থানের ইচ্ছায় ছোট্ট একটি কুটির তৈরী করেন। তিনি ছিলেন আল্লাহপাকের নূরের জ্বলন্ত প্রদীপ। সেই প্রদীপের আলো ছড়াইয়া পড়িল চতুর্দিকে। দলে দলে তালেবে মাওলাদের ভীড় পড়িল তদীয় দরবারে। তিনি ধৈর্যের সাথে তাহাদের কথা শুনেন, ধর্মীয় বিভিন্ন সমস্যার সমাধান দেন। তিনি তাহাদের বায়াত করেন এবং মারেফাত চর্চার তালিম দিতে থাকেন। মাত্র এক বছর তিনি লাহোরে ছিলেন। তাঁহার শক্তিশালী তাওয়াজ্জুহ এত্তেহাদীর বলে লাহোরের হাজার হাজার লোকের দেলের ময়লা দূর হয়, দেল পূর্ণিমার চাঁদের মত উজ্জ্বল হয়, অসংখ্য লোক খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞান অর্জন করেন, আল্লাহ-রাসূলের প্রেমসুধা পানে ধন্য হন।

মাত্র এক বছর তিনি লাহোরে ছিলেন। বছরান্তে পুনরায় দিল্লীর উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন সেই স্বপ্নে দৃষ্ট তোতা পাখীর সন্ধানে। পথিমধ্যে সেরহিন্দে রাত্রি যাপন কালে স্বপ্নে তিনি দেখিতে পান, "কেউ যেন তাঁহাকে বলিতেছে, আপনি কুতুবের এলাকায় আসিয়া পড়িয়াছেন।" কুতুবের চেহারাও তাঁহাকে দেখানো হয়। পরের দিন তিনি সেরহিন্দ শহরের বিভিন্ন এলাকার বুজুর্গদের সহিত সাক্ষাত করেন এবং স্বপ্নে দৃষ্ট চেহারার সহিত তাহাদের চেহারা মিলে কিনা তিনি লক্ষ্য করেন। কিন্তু সেই চেহারার কোন বুজুর্গ তিনি খুঁজিয়া না পাইয়া ভাবিলেন, এই স্থানের বাসিন্দাদের মধ্যেই হয়তো কোন ব্যক্তি সেই যোগ্যতার অধিকারী হইবেন এবং সম্ভবতঃ পরে তাহার প্রকাশ হইবে।

তিনি তাই সেরহিন্দে আর বিলম্ব না করিয়া ক্ষুদ্র এই কাফেলা লইয়া দিল্লীর উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। একটানা কয়েকদিন পথ চলিয়া কাফেলা দিল্লী পৌছায়। দিল্লীতে পৌঁছাইয়া ফিরোজী কেল্লার পাশে হযরত বাকীবিল্লাহ (রঃ) ছাহেব নিজ বাসস্থান নির্ধারণ করিয়া ছোট্ট একটি কুটির নির্মাণ করেন। কুটিরের সংলগ্ন জায়গায় একটি খানকা তৈরী করেন। সেই খানকা হইতে তিনি সত্য ইসলাম তথা খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞান প্রচার শুরু করেন।

যতই দিন যায়, ততই লোকজনের ভীড় বাড়িতে থাকে। তিনি ছিলেন মহামূল্য মাণিক্যের মত। আমার পীর কেবলাজান বলিতেন, "মাণিক যদি গভীর ছাই-এর ভিতরেও লুকাইয়া থাকে, তথাপিও মানুষ তাহা খুঁজিয়া বাহির করে।" তেমনি ছিলেন হযরত বাকীবিল্লাহ (রঃ) ছাহেব। তিনি যেখানেই অবস্থান করিতেন, সেখানেই খোদাতালাশীদের ভীড় পড়িত।

কারণ তাহার দেলে ছিল মাণিকসদৃশ খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞান।

সেই মাণিক্যের সন্ধানে ও ঘ্রাণে তালেবে মাওলাগণ তদীয় খানকায় আসিয়া ভীড় করিতেন। যেমন আসিতেন সাধারণ মানুষ, তেমনি আসিতেন বড় বড় আলেম, ফাজেল ও জ্ঞানী-গুণীজন। তিনি সকলেরই কথা ধৈর্যের সাথে শুনিতেন, কথার জবাব দিতেন, তালেবে মাওলাগণকে তিনি বায়াত করিতেন, খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞান শিক্ষা দিতেন, আল্লাহ রাসূলের প্রেমের শরাব পান করাইতেন। সেই শরাব পানে সকলেই তৃপ্ত হইতেন। তাহাদের দেল পরিচ্ছন্ন হইত, উজ্জল হইত। তাহারা খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞানের দুর্লভ মারেফত অর্জন করিয়া ধন্য হইতেন।

হযরত বাকীবিল্লাহ (রঃ) ছাহেব সাধারণ্যে তরিকা প্রচার করেন, তাহাদেরকে আল্লাহ রাসূলের বাণী শোনান; কিন্তু তিনি তো দিল্লী আসিয়াছেন, মূলতঃ স্বপ্নে দৃষ্ট সেই তোতা পাখীর সন্ধানে। সময় অতিবাহিত হয়, কিন্তু তোতাপাখীর দেখা মিলে না। তদীয় পীর হযরত খাজেগী আমকাংগী (রঃ) ছাহেব তাহাকে বলিয়াছেন, স্বপ্নে দৃষ্ট সেই তোতা পাখী আল্লাহপাকের এক বিশিষ্ট বুজুর্গ, যিনি তাঁহারই (বাকীবিল্লাহর) প্রতিপালনে, তাঁহারই সযত্ন তত্ত্বাবধানে আত্ম প্রকাশ করিবেন। সেই মহান বুজুর্গের রৌশনে আলোকিত হইবে সমগ্র বিশ্ব।

খাজা বাকীবিল্লাহ (রঃ) ছাহেবের সান্নিধ্যে মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ)ঃ

খাজা বাকীবিল্লাহ (রঃ) ছাহেবের কাংখিত সেই তোতা পাখী ছিলেন শায়খ হযরত আহমদ সেরহিন্দী মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব। তিনি সেরহিন্দে বাস করিতেন। তদীয় পিতা হযরত আব্দুল আহাদ (রঃ) ছাহেবও বিশিষ্ট ওলী-আল্লাহ ছিলেন। তিনি ইন্তেকালের সময় তদীয় কালবে রক্ষিত যাবতীয় বাতেনী নেয়ামত যোগ্য পুত্র ও উত্তরাধিকার হযরত শায়খ আহমদকে দিয়ে যান।

পিতার ইন্তেকালের পরে হযরত মুজাদ্দেদ (রাঃ) ছাহেবের হজ্ব করিবার ইচ্ছা জাগে, মক্কা মদিনার আহবান শুনিতে পান। তিনি হজ্বের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন। পথিমধ্যে দিল্লী পৌঁছাইয়া তদীয় এক অন্তরংগ বন্ধু মাওলানা হাসান কাশ্মিরীর গৃহে অবস্থান করেন। মাওলানা হাসান কাশ্মিরী (রঃ) ছাহেব তাহাকে নকশবন্দীয়া খান্দানের বিশিষ্ট বুজুর্গ

হযরত বাকীবিল্লাহ (রঃ) ছাহেবের সন্ধান দেন। তিনি শায়খ আহমদ (রঃ) ছাহেবকে জানান, "দিল্লীতে একজন নকশবন্দীয়া তরিকার বুজুর্গ তশরীফ রাখিয়াছেন। তিনি নকশবন্দীয়া খান্দানের দুর্লভ রত্ন, বিরল ব্যক্তিত্বের অধিকারী। তাঁহার ছোহব্বত ফয়েজ ও বরকতে পরিপূর্ণ। দীর্ঘদিন রেয়াযত ও চিল্লা কাশি করিয়াও যাহা হাছিল করা সম্ভব নয়-তদীয় এক তাওয়াজ্জুহতেই তাহা হাছিল হয়।"

ইহা শ্রবণে হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের ভাবান্তর হয়। তিনি তদীয় পিতা মরহুম হযরত আব্দুল আহাদ (রঃ) ছাহেবের কথা স্মরণ করেন। নকশবন্দীয়া তরিকার নেছবত হাছিলের প্রবল নেশা ছিল তাঁহার। কিন্তু হিন্দুস্থানে তখন নকশবন্দীয়া খান্দানের কোন বুজুর্গ না থাকায় তিনি এই খান্দানের নেছবত ও ফয়েজ হাছিল করিতে না পারিয়া মাঝে মধ্যেই আফসোস করিয়া বলিতেন, "কাশফের দৃষ্টিতে নকশবন্দীয়া তরিকাটি কেন্দ্র ও রাজপথের উপর প্রতিষ্ঠিত বলিয়া মনে হয়। কিন্তু বড়ই আফসোসের বিষয়, বর্তমানে এই দেশে উক্ত তরিকার কোন বুজুর্গ নাই-যাহার নিকট থেকে এই উচ্চ তরিকার বরকত ও নেয়ামত হাছিল করা যায়।"

হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের স্মৃতিপটে তদীয় পিতার সেই সমস্ত কথা ভাসিয়া উঠে। পিতার সেই আফসোস মুজাদ্দেদ ছাহেবের মস্তিস্কে আঘাত করে। তিনি নকশবন্দীয়া তরিকার নেছবত হাছিলের মনস্থ করেন।

হযরত হাসান কাশ্মিরীকে লইয়া তিনি হযরত বাকীবিল্লাহ (রঃ) ছাহেবের দরবারে যান। তাঁহাকে দেখা মাত্রই তিনি চস্কিয়া উঠেন। হযরত বাকীবিল্লাহ (রঃ) ছাহেবও মুজাদ্দেদ (রাঃ) ছাহেবকে দেখিবামাত্রই পুলকিত হন। বুঝিতে পারেন, ইনিই স্বপ্নে দৃষ্ট সেই তোতা পাখী-যাহাকে প্রতিপালনের জন্যই তদীয় পীর সুদূর কাবুল হইতে তাঁহাকে দিল্লীতে প্রেরণ করিয়াছেন। সাধারণ মানুষকে হেদায়েত নয়; দিল্লীতে আসিবার মুখ্য উদ্দেশ্যই হাজারী মুজাদ্দেদ (রাঃ) ছাহেবের তরবিয়ত (প্রতিপালন) করা এবং বাতেনী নেয়ামতে তাঁহাকে ভরপুর করিয়া দেওয়া।

হযরত বাকীবিল্লাহ (রঃ) ছাহেব আলাপ কালে জানিতে পারিলেন যে, হযরত মুজাদ্দেদ ছাহেব হজ্জ প্রতিপালনের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হইয়াছেন। তিনি মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবকে বলিলেন, "যদিও আপনার ছফরের ইরাদা খুবই মোবারক, তথাপি যদি আপনি কয়েকদিন, কমপক্ষে

এক সপ্তাহ কিংবা এক মাস ফকীরের ছোহব্বতে অবস্থান করেন, তাহাতে কি কোন দোষ আছে?" হযরত বাকীবিল্লাহ (রঃ) ছাহেবের এই কথায় হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব এক সপ্তাহ তাহার ছোহব্বতে থাকিবার ইরাদা করেন।

হযরত বাকীবিল্লাহ (রঃ) ছাহেব তাঁহার প্রতি এমনই শক্তিশালী তাওয়াজ্জুহ প্রয়োগ করেন যে, দুই দিনের মধ্যেই মুজাদ্দেদ (রাঃ) ছাহেবের অন্তরে বায়াত হওয়ার প্রবল ইচ্ছা জাগ্রত হয়। তিনি তদীয় ইচ্ছার কথা হযরত বাকীবিল্লাহ (রঃ) কে জানান। হযরত বাকীবিল্লাহ (রঃ) ছাহেবের নিকট কেহ মুরীদ হইতে চাহিলে প্রথমে তিনি তাহাকে ইস্তেখারা করিবার নির্দেশ দিতেন। কিন্তু মুজাদ্দেদ (রাঃ) ছাহেব মুরীদ হওয়ার বাসনা ব্যক্ত করিলে তিনি তাহাকে ইস্তেখারার নির্দেশ না দিয়া বরং মুরীদ করিয়া লন এবং নির্জন কোঠায় লইয়া তাওয়াজ্জুহ প্রয়োগ করেন। ফলে, মুজাদ্দেদ (রাঃ) ছাহেবের জেকেরে কালবী হাছিল হয়। অতঃপর একটানা আড়াই মাস তিনি তদীয় পীর হযরত বাকীবিল্লাহ (রঃ) এর দরবারে অবস্থান করেন।

পবিত্র সান্নিধ্যে রাখিয়া হযরত বাকীবিল্লাহ (রঃ) ছাহেব মুজাদ্দেদ ছাহেবকে নিজ হাতে গড়িয়া তোলেন এবং বিভিন্ন ওলীয়ে কামেলের ছিনা হইয়া রাসূলে করীম (সাঃ) হইতে যে বাতেনী নেয়ামত আমানত স্বরূপ তিনি প্রাপ্ত হইয়াছিলেন, তাহা মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের কালবে প্রদান করেন। মাত্র আড়াই মাসের মধ্যেই মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব নকশবন্দীয়া খান্দানের পরিপূর্ণ নেছবত ও কামালিয়াত হাছিল করেন। আড়াই মাস পরে এক শুভক্ষণে হযরত বাকীবিল্লাহ (রঃ) ছাহেব মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবকে খেলাফত প্রদান করিয়া সেরহিন্দে পাঠাইয়া দেন।

মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব সেরহিন্দে আসিয়া খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞান প্রচার শুরু করেন। অল্প দিনেই তাহার বুজুর্গীর সংবাদ চতুর্দিকে ছড়াইয়া পড়ে। অসংখ্য খোদাতালাশী তদীয় পবিত্র দরবারে ভীড় জমায়। তিনি তাহাদের তালিম দেন। বিভিন্ন মুরীদানের হাল হকিকত সম্পর্কে চিঠির মাধ্যমে পীর হযরত বাকীবিল্লাহ (রঃ) এর সাথে আলাপ করেন। প্রয়োজনে পরামর্শ চান। চিঠি পত্রের মাধ্যমে পীরের সাথে তিনি যোগাযোগ রক্ষা করেন।

ঐদিকে মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবকে বিদায় দিয়া হযরত বাকীবিল্লাহ (রঃ) ছাহেব অন্যান্য মুরীদানদের তরবিয়ত (প্রতিপালন) বা তালিম প্রদানে সময় অতিবাহিত করেন। কিছুদিন পর তিনি সংবাদ পান যে, হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব দিল্লীতে আসিতেছেন। মুজাদ্দেদ ছাহেবকে এস্তেকবাল করিবার জন্য হযরত বাকীবিল্লাহ (রঃ) ছাহেব কিছু মুরীদান ও খলিফাসহ কাবুলী দরওয়াজা পর্যন্ত আগাইয়া যান। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব দ্বিতীয় বারের মত দিল্লীর দরবারে আসেন। এইবার হযরত বাকীবিল্লাহ (রঃ) মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের সহিত এক আশ্চর্য আচরণ করেন-তেমন আচরণ ইতিপূর্বে কোন পীর কোন মুরীদের সাথে করেন নাই।

কিছুদিন পূর্বে এই খানকাতেই তিনি ছিলেন পীর, মুজাদ্দেদ ছাহেব ছিলেন মুরীদ। এইবার তিনি মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবকে পীরের আসনে বসাইয়া সমুদয় খলিফা ও মুরীদানসহ নিজেকে তাঁহার নিকট সোপর্দ করেন। মুজাদ্দেদ ছাহেব তদীয় পীরসহ সকলের প্রতিই তাওয়াজ্জুহ প্রয়োগ করেন।

মোট তিনবার মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব তদীয় পীরের দিল্লীস্থ দরবারে আসেন। তৃতীয়বারে আসিয়া পীর ছাহেবকে অত্যন্ত দুর্বল ও অসুস্থ দেখিতে পান; যেন অকাল বার্ধক্য তাহাকে পাইয়া বসিয়াছে।

হযরত বাকীবিল্লাহ (রঃ) ছাহেব মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবকে বলেন, আল্লাহপাক আর কয়দিন আমাকে দুনিয়াতে রাখিবেন, জানি না। তবে মনে হয়, আর বেশী দিন নাই। এইবার হযরত বাকীবিল্লাহ (রঃ) তাহার দুই পুত্র হযরত ওবায়দুল্লাহ (রঃ) ও হযরত আব্দুল্লাহ (রঃ) কে তাওয়াজ্জুহ প্রদানের জন্য হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের সমীপে পেশ করেন। মুজাদ্দেদ (রাঃ) ছাহেব তাঁহার দুই পীর ভাইয়ের প্রতি তাওয়াজ্জুহ প্রয়োগ করেন। অতঃপর হযরত মুজাদ্দেদ (রাঃ) ছাহেব তদীয় পীরের আদেশে পীর আম্মার প্রতি গায়েবানা তাওয়াজ্জুহ প্রয়োগ করেন। এই তাওয়াজ্জুয়ের কিছু প্রভাব হযরত বাকীবিল্লাহ (রঃ) ছাহেবের উপরও পড়ে।

মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে হযরত খাজা বাকীবিল্লাহ (রঃ):

হযরত বাকীবিল্লাহ (রঃ) ছাহেব মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের মর্যাদা প্রসংগে এবং দিল্লী আগমনে নিজের সফলতা প্রসংগে বলেন, শায়খ আহমদের মত মর্যাদাসম্পন্ন ওলী আসমানের নীচে আর নাই। তিনি মোকাম্মেল, মুরাদ, মাহবুব ও কুতুব। সাহাবা, তাবেঈ, কামেলীন, মোজতাহিদ ইমামগণের পরে এই রকম বিশিষ্ট ওলী পৃথিবীতে খুব কমই আসিয়াছেন।" তিনি আরও বলেন, দিল্লীতে আমি এতদিন পীর-মুর্শিদি করি নাই; খেলাধুলা করিয়াছি মাত্র। কিন্তু সমস্ত প্রশংসা আল্লাহতায়ালার। আমার সামান্য প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয় নাই। আমার তরবিয়তের ফলে শায়খ আহমদের মত মর্যাদাবান ব্যক্তির আত্মপ্রকাশ ঘটিয়াছে।"

তিনি আরও বলেন, মিঞা শায়খ আহমদ এবং আমার সম্পর্ক-খাজা আবুল হোসেন খেরকানী (রঃ) ছাহেব এবং তদীয় মুরীদ হযরত আব্দুল্লাহ আনসারী (রঃ) মত। হযরত আব্দুল্লাহ আনসারী (রঃ) ছাহেব বলিয়াছিলেন, "আমার পীর যদি বর্তমানে বাঁচিয়া থাকিতেন তবে আমার মুরীদ হওয়া ছাড়া তাঁহার কোন উপায় ছিল না।" মিঞা শায়খ আহমদের মধ্যে কুতুবে মাদার ও কুতুবে এরশাদের কামালাত একত্রিত হইয়াছে। তাহারই তোফায়েলে আমি জানিতে পারিয়াছি, তৌহিদে অজুদী বা 'সবই খোদা' মতবাদ মারেফাতের সংকীর্ণ গলিপথ মাত্র। প্রকৃত রাজপথ অবশ্যই ভিন্ন।"

সকলের সামনে উল্লিখিত ঘোষণা দান করিয়া তিনি মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবকে বিদায় দেন। ইহাই ছিল মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের সাথে হযরত বাকীবিল্লাহ (রঃ) ছাহেবের শেষ দেখা।

খাজা বাকীবিল্লাহ (রঃ) ছাহেবের ইনতেকালঃ

মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবকে বিদায় দিয়া খাজা বাকীবিল্লাহ (রঃ) ছাহেব দিল্লীস্থ দরবারে অবস্থান করিতে থাকেন। তিনি ক্রমান্বয়ে শারীরিক অসুস্থতা অনুভব করেন। যে সমস্ত কর্মকান্ড লইয়া তিনি দুনিয়ায় আসিয়াছিলেন, তাহাও প্রায় শেষের দিকে। এইবার হয়তো পরপারের ডাক আসিবে। তিনি সেই ডাকের অপেক্ষা করিতে থাকেন।

তদীয় বয়স চল্লিশে পৌঁছায়। একদিন তিনি স্বপ্নে দেখেন, কে যেন তাঁহাকে বলিতেছেন, "যে উদ্দেশ্যে আপনাকে দুনিয়ায় পাঠানো হইয়াছিল-তাহা পূর্ণ হইয়াছে।" তিনি এই স্বপ্নের কথা স্বীয় বিবি ছাহেবাকে বলেন।

হযরত বাকীবিল্লাহ (রঃ) ছাহেবের শরীরের অসুস্থতা ক্রমেই বাড়িতে থাকে। মাহে জমাদিউস সানির মাঝামাঝিতে রোগশয্যাতে থাকিয়াই তিনি স্বপ্নে দেখেন হযরত ওবাইদুল্লাহ আহরার (রঃ) ছাহেবকে। তিনি দেখেন, হযরত ওবাইদুল্লাহ আহরার (রঃ) ছাহেব তাহাকে একটি পিরহান পরিধান করিতে নির্দেশ দিতেছেন।

স্বপ্নের কথা প্রকাশ করিয়া মৃদু হাসিয়া তিনি বলেন, "যদি সুস্থ্য হই, স্তবে পিরহান পরিব, যদি না হই তবে কাফনই হইবে সেই পিরহান।"

ধীরে ধীরে তিনি একেবারেই দুর্বল হইয়া পড়েন। ১০১২ হিজরীর ২৫-শে জমাদিউস সানী সমস্ত মুরীদান ও আশেকানদের কান্দাইয়া, তাহাদেরকে শোক সাগরে ভাসাইয়া তিনি দারুল বাকায় তশরীফ রাখেন, খোদাতায়ালার একান্ত সান্নিধ্যে চলিয়া যান।

তিনবার সাক্ষাতে তিন ধরণের আচরণ-কেন?

হযরত বাকীবিল্লাহ (রঃ) ছাহেবের সহিত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের সাক্ষাত হয় মাত্র তিনবার। প্রথমবারে দেখা গেল, হযরত বাকীবিল্লাহ (রঃ) ছাহেব নিজে পীরের আসনে বসিয়া মুজাদ্দেদ (রাঃ) ছাহেবকে তাওয়াজ্জুহ প্রয়োগ করিয়া নকশবন্দিয়া সেলসেলার পরিপূর্ণ কামালত দান করেন।

কিন্তু দ্বিতীয় বারে দেখা যায়, তিনিই মুরীদ হইয়া হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবকে পীরের আসনে বসাইয়া সমুদয় মুরীদান সহ নিজেকে তাঁহার হাতে সোপর্দ করেন।

তৃতীয় বারের সাক্ষাতেও দেখা যায়, তিনি তদীয় দুই পুত্রকে এবং বিবি ছাহেবাকে তাওয়াজ্জুহ দেওয়ার জন্য মুজাদ্দেদ ছাহেবকে বলেন। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবও তাই করেন। তিনি দুই পীরভাই ও পীর আম্মার প্রতি তাওয়াজ্জুহ প্রয়োগ করেন। আসলে ব্যাপারটা কি?

মূলতঃ মারেফাত রাজ্যে বহু দফতর আছে। মারেফাত রাজ্যের দফতর সমূহ মোটামুটি নিম্নরূপ-কালব, রূহ, সের, খফি, আখফা, নাফস, আব, আতস, খাক, বাদ, সারা শরীরের সবক, সুলতানুল আঙ্কার, আলমে খালক, আলমে আমর, দায়েরায়ে এমকান, বেলায়েতে ছোগরা, বেলায়েতে কোবরা, বেলায়েতে উলিয়া, মোরাকাবায়ে শরহে ছদর, কামালাতে নবুয়ত, কামালাতে রেসালাত, কামালাতে উলুল আজম, হকিকতে কুরআন, হকিকতে কারা, হকিকতে সালাত, মাবুদিয়াতে সেরফা, হকিকতে ইব্রাহিমী, হকিকতে মুছবী, হকিকতে মুহাম্মদী, হকিকতে আহমদী ও হোব্বে সেরফা। দায়েরা সমূহ শিকলের রিং-এর মত একের পর এক সজ্জিত আছে। ইহাদের মধ্যে মূল মারেফাত কারখানা বা ল্যাবরেটরী আকরাবিয়াত (যাহা বেলায়েতে কোবরার প্রথম অধ্যায়) হইতে শুরু। আকরাবিয়াত হইতে হোব্বে সেরফা ও মাবুদিয়াতে সেরফা পর্যন্ত সমুদয় দফতর মূল মারেফাত ল্যাবরেটরীতে অবস্থিত। কারখানার বাহিরে এবং নিম্নে মহা নূরময় জগত-যাহার নাম বেলায়েতে ছোগরা। বেলায়েতে ছোগরাকে প্রতিবিম্বের দায়েরাও বলা হয়। মূল মারেফাত কারখানা বা ল্যাবরেটরীতে যাহা কিছু আছে তথা আকরাবিয়াত হইতে পবিত্র জাতের পূর্ব পর্যন্ত যত দায়েরা আছে, যত দুর্লভ মারেফাত আছে, যত হাল-হকিকত আছে-সবকিছুরই প্রতিবিম্ব বেলায়েতে ছোগরার নূরময় জগতে আছে। মূল মারেফাত কারখানায় আছে চিরস্থায়ী সিফাত', শান', শয়ুনাত', ইতেবার এবং পবিত্র জাত। জাত ভিন্ন যাহা কিছু প্রধান দফতরে আছে-তাহার সবই বেলায়েতে ছোগরাতে আছে প্রতিবিম্ব হিসেবে।

পূর্ববর্তী ওলী-আল্লাহগণের প্রায় সকলেই বেলায়েতে ছোগরা বা প্রতিবিম্বের দায়রাতে মারেফাত শেষ করিয়াছেন। মূলতঃ চেষ্টা সাধনা বা তপস্যা দ্বারা ইহার উপরে যাওয়ার ক্ষমতাও কাহারো নাই। কেবলমাত্র আল্লাহপাকের দয়া হইলেই তা সম্ভব। আল্লাহপাক রাসূলে পাক (সাঃ) কে পরিপূর্ণ মারেফাত দান করিয়াছেন। তাঁহার তোফায়েলে সাহাবাগণের কেহ কেহ পূর্ণাংগ মারেফাত হাছিল করেন। অতঃপর হাজার বছরের মধ্যে আর কেহই ততদূর পর্যন্ত মারেফাত অর্জন করিতে পারেন নাই। হাজার বছর পরে হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবকে আবার সেই পূর্ণাংগ মারেফাতের অলংকারে অলংকৃত করা হয়।

হযরত বাকীবিল্লাহ (রঃ) ছাহেবও মারেফাত শেষ করিয়াছেন বেলায়েতে ছোগরায়। মুজাদ্দেদ (রাঃ) ছাহেবের সহিত প্রথম সাক্ষাতে তিনি পীরের আসনে বসিয়া মুরীদ মুজাদ্দেদ (রাঃ) ছাহেবকে তাওয়াজ্জুহ প্রদান করিয়া বেলায়েতে ছোগরা পর্যন্ত উন্নীত করেন এবং তথাকার যাবতীয় মারেফাত ও নেছবতে পরিপূর্ণ করেন। এখানে তিনি পীর, মুজাদ্দেদ ছাহেব মুরীদ।

পীরের সাথে দ্বিতীয়বার সাক্ষাতের পূর্বে মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব সেরহিন্দে কিছুদিন অবস্থান করেন এবং তরিকা প্রচারের কাজে ব্যস্ত থাকেন। এই সময়ের মধ্যে মহান খোদাতায়ালা হাজারী মুজাদ্দেদ (রাঃ) ছাহেবকে বেলায়েতে ছোগরার গন্ডি হইতে মুক্ত করিয়া মারেফাত রাজ্যের প্রধান প্রধান সমস্ত দফতর ঘুরাইয়া দেখান এবং দুষ্প্রাপ্য মারেফাতের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম জ্ঞানে ভূষিত করেন।

মহান খোদাতায়ালা হযরত বাকীবিল্লাহ (রঃ) কে কাশফের মাধ্যমে মুজাদ্দেদ (রাঃ) ছাহেবের উচ্চতার কথা জানাইয়া দেন-তাই দ্বিতীয়বার সাক্ষাতের পরে হযরত বাকীবিল্লাহ (রঃ) নিজে মুরীদ হন; মুজাদ্দেদ ছাহেবকে পীরের মর্যাদা দেন-মূলতঃ মারেফাতের প্রধান কারখানাস্থিত দুর্লভ বাতেনী সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম জ্ঞান আহরণের জন্য। ইহাতে তিনি সফলও হন। তাই তিনি বলেন, "মুজাদ্দেদ (রাঃ) ছাহেবের তাওয়াজ্জুতেই "হামাউস্ত" বা সবই তিনি মতবাদ যে মারেফাতের কারখানার রাস্তায় ফেলে দেওয়া খরকুটা-তাহা আমি বুঝিতে পারি।"

খাজাবাবা এনায়েতপুরী (কুঃ) ছাহেবের শ্রেষ্ঠত্বঃ

মহান হাজারী মুজাদ্দেদ (রাঃ) ছাহেবের পরে মহান খোদাতায়ালা আমার পীর কেবলাজানকে মারেফাতের সমুদয় দফতর ঘুরাইয়া দেখান; প্রত্যেক দফতরে রক্ষিত জ্ঞানে তাঁহাকে ভূষিত করেন। যেমন বেলায়েতে ছোগরায় তিনি ছায়ের করেন, তেমনি আকরাবিয়াত থেকে তদূর্ধ্বের সমস্ত মাকাম ছায়ের করিয়া ব্যাপক মারেফাত জ্ঞান অর্জন করিয়া মারেফাত ও হকিকতের মহা সমুদ্রে পরিণত হন।

বেলায়েতে ছোগরার হাল সম্পর্কে ইতিপূর্বে বলা হইয়াছে, এই দায়েরাতে ছালেকের কালব ও রূহ এক হইয়া যায়। ছালেকের উপর ছয় দিক বা দশ দিক হইতে নূরের প্রবল স্রোত আসিতে থাকে। দশমুখী নূরের প্লাবনে নূরের এক মহাসমুদ্র তৈরী হয়। যে সমুদ্রের মধ্যে ছালেক সমগ্র বিশ্ব ব্রহ্মান্ডকে নিমজ্জিত দেখে; নিজেকেও সেই নূরে হারাইয়া ফেলে। সেই নূর হইতে নিজেকে আর পৃথক করিতে পারে না। ফলে যে দিকেই তাকায়, সেই দিকেই কেবল দেখে খোদাতায়ালার নূর আর নূর। আর কিছুই তাহার চোখে দৃষ্ট হয় না। ফলে ছালেক বলিয়া ফেলেন "হামাউস্ত" বা সবই তিনি। অথবা বলেন, আনাল হক। মূলতঃ এইরূপ অবস্থা বেলায়েতে ছোগরার নূরময় দায়েরার খুবই স্বাভাবিক হাল।

আমার পীর কেবলাজান কতবড় শক্তিশালী তাওয়াজ্জুহের অধিকারী যে, বেলায়েতে ছোগরার ঐ দায়েরায় ছবক দেওয়ার সময় আমাকে বলিলেন, বাবা, "এই দায়েরাতে পৌঁছাইলে মুরীদের হুশ জ্ঞান থাকে না; মতিভ্রম হয়; নিজের দিকে, এমনবি পরণের কাপড়ের দিকে কিংবা খাবার-দাবারের দিকেও কোন রূপ খেয়াল থাকে না। আমি দু'আ করি, আল্লাহপাক যেন তোমাকে সুস্থ্য রাখেন। এই দায়েরায় জ্ঞান অর্জনে তোমার যেন কোন রূপ অসুবিধা না হয়।"

পীর কেবলাজানের দয়ায় বেলায়েতে ছোগরা দায়েরার জ্ঞান আহরণে, বিচরণে এবং এই দায়েরা পার হইয়া ঊর্ধ্বে গমনে আমার কোন অসুবিধা হয় নাই।

পীর কেবলাজানের তোফায়েলে মহান খোদাতায়ালা এই মিসকীনকেও মারেফাতের সমুদয় দফতর ঘুরাইয়া দেখাইয়াছেন। আকরাবিয়াত হইতে শুরু করিয়া পবিত্র জাত পর্যন্ত সমস্ত দায়েরা এই ফকির ঘুরিয়া দেখিয়াছে। কিন্তু আফসোস, খোদাতায়ালাকে বুঝিতে পারিলাম না। আমার পীর কেবলাজানের হকিকতও হৃদয়ঙ্গম করিতে পারিলাম না।

আমি সেই ছোট্ট বেলায় পীর কেবলাজানের সান্নিধ্যে যাই। আমার বয়স তখন ১০। আমি ভাল গজল গাইতে পারিতাম। পীর কেবলাজান মাঝে মাঝে নিজের পাশে বসাইয়া আমাকে গজল পরিবেশনের নির্দেশ দিতেন। আমি নিঃসংকোচে গজল ধরিতাম। কেবলাজান হুজুরও আমার সুরে সুর মিলাইয়া গজল গাইতেন। সেই হইতে পীর কেবলাজানকে আমি গবেষণা (Study) করা শুরু করি। আজ আমার ৮০/৮১ বছর বয়স। এই দীর্ঘ সময় সাধনা করিয়াও কেবলাজান হুজুরের হকিকতকে আমি বুঝিতে পারি নাই।

হযরত আবুল হোসেন খেরকানী (রঃ) ছাহেব বলেন, “তিনটি জিনিসের সীমা আমি জানিতে পারিলাম না।"

➡ রাসূলে করীম (সাঃ) এর মর্যাদার সীমা।

➡ মারেফাতের শেষ সীমা এবং

➡ নাফসের ধোকাবাজীর সীমা।

উপরের তিনটি বিষয়ের সাথে আরও একটি বিষয়ের সীমা আমি জানিতে পারি নাই। তাহা হইলঃ আমার পীরের মর্যাদার সীমা।

সেই মহান মুজাদ্দেদ, আমার পীর কেবলাজান হযরত খাজাবাবা এনায়েতপুরী (কুঃ) ছাহেব তিরোধানের পূর্বে আমাকে বলিয়া গিয়াছেন, "বাবা, তোর ভাল ও মন্দ-উভয়টাই আমার হাতে রইল। তোর কোন চিন্তা নাই।” কোন পীর তাহার মুরীদকে বিদায়ের পূর্বে এমন উক্তি করিয়াছেন বলিয়া আমার জানা নাই।

সেই মহান সাধক হযরত খাজাবাবা এনায়েতপুরী (কুঃ) ছাহেবের কদমের ছায়াতলে তোমরা আছ। তোমাদের কোন ভয় নাই। তোমর বুকে টোকা দিয়া চল। অর্থাৎ নির্ভয়ে চল। আমার পীরের এই সত তরিকার রজ্জুকে তোমরা যদি ধরিয়া থাকিতে পার, তবে ইহকাল ও পরকাল-কোথাও তোমরা আটকাইবে না। আল্লাহপাক তোমাদের দয়া করুন। তোমরা কামিয়াবী হও। দু'আ, ইতি।

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD