সমুদ্রের ঢেউ মাটি সরিয়ে নিলেও অটুট ছিল যে মসজিদ

সৌদি আরবের জেদ্দা কর্নিশে অবস্থিত আল-জাজিরা মসজিদ দীর্ঘদিন ধরেই পর্যটক ও স্থাপত্যপ্রেমীদের কাছে বিস্ময়ের এক নাম। আর-রাহমা মসজিদ নামেও পরিচিত এই স্থাপনাটি শুধু নান্দনিক সৌন্দর্যের জন্য নয়, বরং এর নির্মাণশৈলী ও অবিশ্বাস্য স্থায়িত্বের কারণেও বিশ্বজুড়ে আলোচনায় রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
এক শীতের সকালে জেদ্দা কর্নিশে ঘটে যায় এক অপ্রত্যাশিত ঘটনা। পৌরসভার একটি গাড়ি রাস্তার বড় একটি গর্তে পড়ে গেলে দেখা যায়, সমুদ্রের ঢেউ ধীরে ধীরে মসজিদের নিচের বালু ও মাটি সম্পূর্ণ ধুয়ে নিয়ে গেছে। ফলে ভবনের নিচে আর কোনো দৃশ্যমান ভিত্তি অবশিষ্ট ছিল না। অথচ পুরো মসজিদটি অটুট অবস্থায় দাঁড়িয়ে ছিল। এই দৃশ্য দেখে বিস্মিত হন প্রখ্যাত মিশরীয় স্থপতি আবদেল ওয়াহেদ আল-ওয়াকিল। তার ভাষায়, মনে হচ্ছিল মসজিদটি যেন কোনো অবলম্বন ছাড়াই বাতাসে ভেসে রয়েছে।
আরও পড়ুন: শুরু হলো ২০২৭ সালের হজের প্রাক-নিবন্ধন
ঘটনার খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন জেদ্দার মেয়র এবং প্রকৌশলীরা। সবাই যখন আশঙ্কা করছিলেন যে ইটের তৈরি ভবনটি যেকোনো সময় ধসে পড়তে পারে, তখন আল-ওয়াকিল রসিকতার ছলে মন্তব্য করেছিলেন, মসজিদটি যেন ফেরেশতারাই ধরে রেখেছেন। তবে বাস্তবে এর পেছনে ছিল অসাধারণ নির্মাণকৌশল, যা আধুনিক স্থাপত্যবিদদের কাছেও এক বিস্ময়ের বিষয় হয়ে ওঠে।
বিজ্ঞাপন
সম্প্রতি আথির প্ল্যাটফর্মের ‘বিতাফসিল’ অনুষ্ঠানে আবদেল ওয়াহেদ আল-ওয়াকিল জেদ্দা ও মদিনার বিভিন্ন ঐতিহাসিক মসজিদ নির্মাণ এবং সংস্কারের পেছনের নানা অজানা অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তিনি জানান, ১৯৮৪ সালে জেদ্দা কর্নিশে নির্মিত এই মসজিদের পরিবেশবান্ধব ও ব্যতিক্রমী নকশার জন্য লন্ডনের একটি সাময়িকী থেকে সম্মাননা লাভ করেন। পরে ১৯৮৯ সালে একই মসজিদের জন্য অর্জন করেন মর্যাদাপূর্ণ আগা খান স্থাপত্য পুরস্কার। তার বিশ্বাস, স্থাপত্য কেবল প্রকৌশলের বিষয় নয়, বরং এটি মানুষের বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও আত্মিক চেতনারও বহিঃপ্রকাশ।
আল-জাজিরা মসজিদের অলৌকিকতা
গল্পের শুরু এক সাহসী সিদ্ধান্তের মাধ্যমে। আল-ওয়াকিল জেদ্দার তৎকালীন মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ ফারসিকে একটি প্রবাল দ্বীপের ওপর মসজিদ নির্মাণের প্রস্তাব দেন। আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলো যখন সেখানে রড ও কংক্রিটের ৪০ মিটার গভীর ভিত্তি দেওয়ার জন্য বিশাল খরচের হিসাব দিচ্ছিল, তখন আল-ওয়াকিল রড ও সিমেন্ট ছাড়াই মসজিদ তৈরির সিদ্ধান্ত নেন।
বিজ্ঞাপন
তিনি ইট ও পোড়ামাটির তৈরি দেয়াল ও গম্বুজের ওপর ভিত্তি করে ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে আল-জাজিরা মসজিদ নির্মাণ করেন, যা সমুদ্রের আর্দ্রতা ও ভূমিকম্পের বিরুদ্ধে এক প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ ছিল। সমুদ্রের ঢেউ মসজিদের নিচের মাটি ধুয়ে নিয়ে একটি বড় গুহা তৈরি করার পরও যখন ভবনটিতে কোনো ফাটলও দেখা যায়নি, তখন প্রমাণ হয়ে যায় যে আধুনিক স্থাপত্যের চেয়ে সনাতনী নির্মাণশৈলী কতটা শক্তিশালী।
জেদ্দায় সফলতার পর আল-ওয়াকিলকে মদিনার ঐতিহাসিক মসজিদগুলোর সংস্কার ও সম্প্রসারণের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এর মধ্যে ছিল মসজিদে কুবা, কিবলাতাইন এবং মিকাত জিল হুলাইফা।
মসজিদে কুবায় কাজের সময়কার একটি স্মরণীয় ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এক কৃশকায় বৃদ্ধ লোক কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই আমাদের সাথে কাজ করার জন্য জেদ ধরছিলেন। পরে নিরাপত্তারক্ষীরা তাকে আটক করলে তিনি এমন কিছু কথা বলেছিলেন যা আমি কখনো ভুলব না। তিনি বলেছিলেন, তোমরা কি ভাবছ তোমরাই এই মসজিদ বানাচ্ছ? চারদিকে তাকিয়ে দেখ, ফেরেশতারা এখানে তাওয়াফ করছে এবং তারাই এই মসজিদ নির্মাণ করছে।
বিজ্ঞাপন
হস্তশিল্প ও মাটির ছোঁয়া
আবদেল ওয়াহেদ আল-ওয়াকিল বিশ্বাস করেন, জেদ্দা ও মদিনার মসজিদগুলোর আধ্যাত্মিক আবহ লুকিয়ে আছে মানুষের হাতের স্পর্শ ও দক্ষতায়। ইতালীয় চিত্রশিল্পী সিলভিও বিকি এবং পরবর্তীতে প্রখ্যাত স্থপতি হাসান ফাতির সান্নিধ্যে এসে তিনি শেখেন যে স্থাপত্য শুধু দেয়াল তোলা নয়, একটি নৈতিক দায়িত্ব।
বিজ্ঞাপন
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, মানুষের হাত যখন কাজ করে না, তখন তার মস্তিষ্কও বিকৃত হয়ে যায়। তাই তিনি ইট-পাথর ও কাদার তৈরি ঘরকে ঋণ দিতে অস্বীকৃতি জানানো ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। লড়াই করেছেন সেই তথাকথিত সিমেন্ট আইনের বিরুদ্ধে, যা গ্রীষ্মের প্রচণ্ড উত্তাপ থেকে মানুষকে বাঁচাতে পারে না। তিনি কংক্রিটের বদলে ঐতিহ্যবাহী উপায়ে কাদা ও ইটের ব্যবহারে জোর দেন। রাজমিস্ত্রির হাত যখন প্রতিটি পাথর আর ইট স্পর্শ করে, তখন সেই দেয়ালে এক ধরণের বরকত বা কল্যাণ তৈরি হয়, যা কোনো আধুনিক যন্ত্র দিতে পারে না।
বিশ্বজুড়ে স্বীকৃতি পেয়েছে তার নির্মাণদর্শন
নিজের কাজের মাধ্যমে মানুষের উপকার করাকেই সবসময় সবচেয়ে বড় অর্জন বলে মনে করেন আবদেল ওয়াহেদ আল-ওয়াকিল। তবে তার অসাধারণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি একাধিক আন্তর্জাতিক সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন।
বিজ্ঞাপন
১৯৮০ সালে আলেকজান্দ্রিয়ার হালাওয়া হাউস প্রকল্পের জন্য তিনি আগা খান পুরস্কার অর্জন করেন। এরপর ১৯৮৫ সালে ইসলামিক স্থাপত্য গবেষণায় অবদানের জন্য লাভ করেন কিং ফাহাদ পুরস্কার। এছাড়া আমেরিকান ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্টসের সম্মানসূচক ফেলোশিপ এবং ২০০৮ সালে ধ্রুপদি স্থাপত্যে বিশেষ অবদানের জন্য রিচার্ড ড্রেইহাউস পুরস্কারও তার ঝুলিতে যোগ হয়।
তার স্থাপত্যদর্শনের প্রতি আন্তর্জাতিক মহলের আস্থার অন্যতম প্রমাণ হলো—ব্রিটেনের রাজা চার্লসও অক্সফোর্ড ইসলামিক সেন্টারের নকশা প্রণয়নের দায়িত্ব তার ওপর অর্পণের আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। এসব অর্জনের মধ্য দিয়ে আবদেল ওয়াহেদ আল-ওয়াকিল প্রমাণ করেছেন, ঐতিহ্য, বিশ্বাস ও পরিবেশবান্ধব নির্মাণশৈলীর সমন্বয় ঘটিয়েও বিশ্বমানের স্থাপত্য সৃষ্টি করা সম্ভব।
সূত্র : আল জাজিরা
বিজ্ঞাপন








