খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞান অর্জনের জন্য, খোদাতায়ালার মারেফাত বা পরিচয়

খোদাপ্রাপ্তি জ্ঞানের আলোকে শাহ্সূফি হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ও খাজা বাহাউদ্দীন নক্শবন্দ (রঃ) بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ নকশবন্দীয়া তরিকা এবং ইহার শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের বক্তব্যঃ
বিজ্ঞাপন
খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞান অর্জনের জন্য, খোদাতায়ালার মারেফাত বা পরিচয় জ্ঞান লাভের জন্য বেশ কয়েকটি তরিকা পদ্ধতি চালু আছে। যেমন, কাদেরীয়া তরিকা, চিশতিয়া তরিকা, কুরাবীয়া তরিকা, সোহ্রাওয়াদ্দীয়া তরিকা, নকশ্বন্দীয়া তরিকা ও খাছ মুজাদ্দেদীয়া তরিকা। কাদেরীয়া তরিকার প্রবর্তক হযরত গউস পাক আব্দুল কাদের জেলানী (রঃ) ছাহেব, চিন্তিয়া তরিকার প্রবর্তক হযরত মঈনুদ্দিন চিশতী (রঃ) ছাহেব, নকশ্বন্দীয়া তরিকার প্রবর্তক হযরত খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (রঃ) ছাহেব এবং খাছ মুজাদ্দেদীয়া তরিকার প্রবর্তক হাজারী মুজাদ্দেদ হযরত শায়খ আহমদ ছেরহিন্দী (রাঃ) ছাহেব।
প্রচলিত সবগুলি তরিকা পদ্ধতির মধ্যে খাছ মুজাদ্দেদীয়া তরিকা খোদাপ্রাপ্তির জন্য সর্বাপেক্ষা সহজ ও নিকটতম পথ। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব নকশবন্দীয়া তরিকাকে পরিমার্জন ও পরিবর্ধন করিয়া যে বিশেষ তরিকা পদ্ধতি চালু করেন-তাহাই খাছ মুজাদ্দেদীয়া তরিকা। ইহা নকশবন্দীয়া মুজাদ্দেদীয়া তরিকা হিসেবেও পরিচিত।
হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব তাঁহার সময়ে প্রচলিত কাদেরীয়া, চিন্তিয়া, কুরাবিয়া, সোহ্রাওয়াদ্দিয়া এবং নকশ্বন্দীয়া তথা সবগুলি তরিকার নেছবত ও কামালিয়াত হাছিল করেন এবং প্রত্যেক তরিকার খেলাফত পৃথক পৃথক ভাবে প্রাপ্ত হন। নকশ্বন্দীয়া তরিকার নেছবত ও কামালিয়াত লাভ করেন হযরত খাজা মোঃ বাকীবিল্লাহ (রঃ) ছাহেবের নিকট থেকে। অতঃপর আল্লাহতায়ালা তাঁহাকে হকিকত ও মারেফাতের বহুবিধ রত্নে পরিপূর্ণ করিয়া মারেফাত দপ্তরের শেষ সীমা বা পবিত্র জাত পর্যন্ত উন্নীত করেন এবং হাজার বছরের জন্য উম্মতে মুহাম্মদীর দেখাশুনার ভার তাঁহার উপর অর্পণ করেন।
বিজ্ঞাপন
হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব তৎকালীন সময়ে প্রচলিত সবগুলি তরিকা পদ্ধতির জ্ঞান আলাদা আলাদা ভাবে অর্জন করিয়া প্রত্যেকটি পদ্ধতির উপরে তাঁহার সুচিন্তিত মতামত প্রদান করেন এবং নকশবন্দীয়া তরিকাকে তাঁহার সমকালীন সময়ের সবগুলি তরিকা পদ্ধতির শীর্ষে স্থান দেন এবং শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে স্বীয় বক্তব্য তদীয় মকতুবাত শরীফ ও অন্যান্য পুস্তকে রাখিয়া যান।
মকতুবাত শরীফের প্রথম খন্ডের ২৯০ নম্বর মকতবে তিনি বলেন, "জানা প্রয়োজন যে, আল্লাহতায়ালার মারেফাত জ্ঞান হাছিলের জন্য যে পথ নিকটতর ও পুরোগামী, যে পথ সমস্ত মানুষের পক্ষে উপযোগী, কুরআন-হাদীসের অধিক অনুকূল ও মজবুত, যে পথ শান্তিপূর্ণ ও অটল, অতীব সত্য এবং অধিক নির্দেশ প্রদানকারী, যাহা অধিক উচ্চ ও অতি সম্মানিত এবং মহান ও পূর্ণতর-তাহা হইল এই উচ্চতম তরিকায়ে নকশবন্দীয়া। আল্লাহতায়ালা তাঁহাদের আকাবারে আরওয়াহ এবং আসরারকে আরও পবিত্র করুন।
সমুজ্জল সুন্নতের দৃঢ় পায়রবী এবং বেদায়াত পরহেজ বা পরিত্যাগই এই তরিকার বুযুর্গী এবং ইহার দ্বারাই এই তরিকার বুযুর্গানে দ্বীন উচ্চ মাকাম হাছিল করিয়াছেন। হযরত খাজা বাহাউদ্দিন নকশ্বন্দ (রঃ) ছাহেব সেই বুযুর্গ, যাহার দ্বারা সাহাবায়ে কেরামের মত ছুলুকের শেষ বস্তু খোদাতালাশীর দেলে প্রথমেই ঢুকাইয়া দেওয়া হইয়াছে এবং দায়েমী হুজুর (আল্লাহতায়ালার প্রতি সার্বক্ষণিক খেয়াল) এবং আগাহীর (সর্বদা দেলের খবরদারী) মাধ্যমে সৌভাগ্যশালী করা হইয়াছে। ইহার ফলে তাঁহারা (নকশবন্দীয়া সেলসেলার বুযুর্গানে দ্বীন) মাকাম ও হুজুরীতে অন্যান্য অপেক্ষা শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করিয়াছেন।"
বিজ্ঞাপন
নকশবন্দীয়া তরিকার শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে তিনি আরও বলেন, "আমরা তত্ত্বজ্ঞান লাভের জন্য যে পথে চলিতেছি, মানব দেহের সাত লতিফার সংখ্যানুযায়ী তাহা সাত কদম মাত্র। তন্মধ্যে দুই কদম আলমে খালকের (স্থল জগতের) সাথে সম্পৃক্ত। এই দুই কদমের সম্বন্ধ দেহ ও নাফসের সাথে। অবশিষ্ট পাঁচ কদম আলমে আমর (সূক্ষ্ম জগত) এর সাথে সম্পর্কিত। ইহাদের সম্বন্ধ কালব, রূহ, ছের, খফি ও আখফা নামক লতিফাগুলির সহিত। এই সাত কদমের প্রত্যেক কদমে নূরের বা অন্ধকারের দশ হাজার করিয়া পর্দা অপসারিত হয়। হাদীস শরীফে আছেঃ আল্লাহতায়ালা এবং বান্দার মাঝখানে আলো ও আধারের সত্তর হাজার পর্দা রহিয়াছে। আলমে আমরের পহেলা কদমে তাজাল্লীয়াতে আফ্রাল, দ্বিতীয় কদমে তাজাল্লায়াতে সিফাত প্রকাশ পায়। অতঃপর তৃতায় কদমে তাজাল্লীয়াতে জাতের প্রকাশ আরম্ভ হইয়া পরবর্তী কদমে উন্নতির ধারা চলিতে থাকে-যাহা সাধকগণের অবিদিত নয়। ইহার নিকটতর হইতে থাকে।
সাত কদম শেষ হওয়া পর্যন্ত উন্নতির এ ধারা প্রত্যেক কদমে সাধক ব্যক্তি নিজের সত্ত্বা হইতে দূরতর ও আল্লাহতায়ালার অব্যাহত থাকে। অবশেষে ছালেক আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের ব্যাপারে পূর্ণতা অর্জন করে। আর তখন সে ফানা-বাকার স্তরে পৌঁছিয়া বেলায়েতে বুযুর্গানে দ্বীন আলমে আমর (সূক্ষ্ণ জগত) হইতে ছায়ের (ভ্রমণ) শুরু খাচ্ছা বা আল্লাহর বিশেষ বন্ধুত্ব লাভ করে। নকশবন্দীয়া তরিকার করেন এবং তাহাদের আলমে খালকের ছায়ের আনুসঙ্গিকভাবেই হইয়া সোহ্রাওয়াদ্দায়া ইত্যাদি) পীরানে পীরগণ ইহার বিপরীত করিয়া থাকেন যায়। আর অন্যান্য তরিকার (অর্থাৎ কাদেরীয়া, চিশতিয়া, সাবেরিয়া, অধিকতর কার্যকরী ও আশু ফলপ্রসু। অন্যান্য তরিকার যেখানে শেষ, সুতরাং আল্লাহর নৈকট্য প্রদান কারী হিসেবে নকশবন্দীয়া তরিকাই এই তরিকার শুরুই সেখান হইতে; অর্থাৎ অন্যান্য তরিকাপন্থীগণ দীর্ঘ সাধনার পর যে স্তরে পৌঁছান, সেই স্তর হইতে এই তরিকার অনুসারীদের পথ চলা আরম্ভ হয়। যাহাদের প্রারম্ভই অন্যান্যদের শেষ, তাঁহাদের শেষ যে কি হইবে, তাহা অন্যে কি আর বুঝিবে?” -(প্রথম খন্ড, মকতুব নং-৫৮)
তরিকতের ইমাম, হাজারী মুজাদ্দেদ (রাঃ) ছাহেব নকশবন্দীয়া তরিকার শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে নিজ প্রণীত "মুকাশিফাতে আয়নিয়া" পুস্তকে বলেন, নকশবন্দীয়া তরিকার বুযুর্গানে দ্বীনের কথা ঔষধের ন্যায় এবং দৃষ্টি রোগ মুক্তির কারণস্বরূপ। আল্লাহর ইচ্ছায় তাঁহাদের সহিত ছহব্বত (সম্পর্ক স্থাপন)-এর কারণে বহু বছরের কাজ মুহূর্তের মধ্যে সমাধা করা সহজ হয়। আর তাঁহাদের সামান্য দৃষ্টিপাত বহু বছরের চিল্লা কাশী হইতে শ্রেয়। কেননা অন্যদের শেষ অবস্থা; ইহাদের প্রাথমিক অবস্থায় অর্জিত হইয়া থাকে। ইহাদের তরিকা সর্বাপেক্ষা নিকটবর্তী তরিকা। আর তাঁহাদের নেছবত (সম্পর্ক), সমস্ত নেছবতের চাইতে উৎকৃষ্ট ও উত্তম। হযরত খাজা বাহাউদ্দীন নকশবন্দ (রঃ) বলেন, "আমি অন্য তরিকার শেষ বস্তুকে আমার তরিকার প্রারম্ভে প্রবেশ করাই।” তিনি আরও বলেন, হকের মারেফাত বাহাউদ্দিনের জন্য না হয়। তিনি আরও বলেন, আমার তরিকা আল্লাহপ্রাপ্তির জন্য সবচাইতে হারাম যদি আমার প্রারাম্ভ হযরত বায়েজীদ (রঃ) এর শেষ অবস্থার মত নিকটবর্তী এবং নিশ্চয়ই ইহা গন্তব্যস্থানে পৌঁছাইয়া দেয়।"
বিজ্ঞাপন
উপরের আলোচনা থেকে ইহা সহজেই বোধগম্য হয় যে, মুজাদ্দেদীয়া তরিকা ছিল খোদাপ্রাপ্তির জন্য সহজতম, নিকটতম ও শ্রেষ্ঠতম পথ। তরিকা প্রবর্তিত হওয়ার পূর্বে সমস্ত তরিকা পদ্ধতির মধ্যে নকশবন্দীয়া নিজ তরিকা হিসেবে গ্রহণ করিয়া কিছুটা পরিবর্ধন ও পরিমার্জন করিয়া সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ এক তরিকা পদ্ধতি চালু করেন-যাহা তরিকায়ে এই কারণেই হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব এই তরিকাকে নকশবন্দীয়া মুজাদ্দেদীয়া নামে পরিচিত।
নকশবন্দীয়া তরিকার প্রবর্তক হযরত খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (রঃ) ছাহেবের জন্ম, শৈশব ও শৈশবকালীন ঘটনাঃ
নকশবন্দীয়া তরিকার প্রবর্তক, হযরত খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (রঃ) ছাহেব পবিত্র বোখারা নগরীতে হিজরী ৭১৮ সনের মহররম মাসে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁহার পিতা হযরত মীর সৈয়দ জালাল উদ্দিন (রঃ) ছাহেব একজন বুযুর্গ ব্যক্তি ছিলেন।
বিজ্ঞাপন
হযরত খাজা বাহাউদ্দিন (রঃ) সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বংশ-সৈয়দ বংশে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁহার পূর্বপুরুষ ছিলেন হযরত আলী করমুল্লাহ ওয়াজহাহু।
হযরত খাজা বাহাউদ্দিন (রঃ) ছাহেবের জন্মকালীন সময়ে সমরখন্দ ও বোখারার শ্রেষ্ঠতম আধ্যাত্মিক সাধক বা পীরে কামেল ছিলেন হযরত খাজাবাবা সাম্মাছি (রঃ) ছাহেব। তিনি নকশবন্দীয়া মুজাদ্দেদীয়া সেলসেলার চতুর্দশ অধঃস্তন আধ্যাত্মিক পুরুষ ছিলেন। হযরত খাজা বাহাউদ্দিন (রঃ) ছাহেবের জন্মপূর্ব কালীন ঘটনা-হযরত খাজাবাবা সামমাছি (রঃ) ছাহেব যখন মুরীদানসহ বোখারায় আসিতেন-তখনই তিনি তথায় প্রাণশীতল করা চমৎকার একটি খোধু পাইতেন। মুরীদানদেরকে তিনি বলিতেন, বাবারা, এই স্থান হইতে আল্লাহতায়ালার এক পেয়ারা বান্দার সুবাস পাওয়া যায়। মনে হয়, অচিরেই তিনি মীর সৈয়দ জালালউদ্দিনের গৃহে হযরত খাজা বাহাউদ্দিন (রঃ) জন্মগ্রহণ দুনিয়ায় তশরীফ আনিবেন। ইহার কয়েকদিন পরেই বোখারাস্থিত হযরত করেন।
জন্মের কয়েকদিন পরে শিশু বাহাউদ্দিনের পিতামহ নাতিকে লইয়া হযরত খাজাবাবা সামমাছি (রঃ) ছাহেবের সমীপে যান। হযরত সামমাছি (রঃ) ছাহেব শিশু বাহাউদ্দিনকে দেখিয়া খুশীতে আত্মহারা। শিশুটিকে তিনি কোলে লইয়া আদর করিলেন, সোহাগ করিলেন। নিজ জিহ্বা শিশুর কচি মুখে ঢুকাইয়া দিলেন। শিশুটিও মহানন্দে খাজা ছাহেবের জিহ্বা চুষিতে থাকে। কিছুক্ষণেই হযরত সামমাছি (রঃ) ছাহেবের জিহা শুকাইয়া যায়। ইহাতে তিনি মহা খুশী। তিনি বলিলেন, "এই শিশুর হিম্মত অত্যন্ত উচু। তাঁহার নিকট আমি পরাজিত। অল্পক্ষণেই আমার জবান শুকাইয়া ফেলিয়াছে। ইহাই প্রমাণ করে যে পরবর্তী কালে এই শিশু মস্তবড ওলী-আল্লাহ হইবেন। তিনি আরও বলেন, এই সেই শিশু-বোখারাতে যাহার খোশবু আমি পাইতাম।"
বিজ্ঞাপন
হযরত খাজাবাবা সামমাছি (রঃ) ছাহেবের প্রধান খলিফা ছিলেন হযরত আমির কুলাল (রঃ) ছাহেব। তাঁহাকে ডাকিয়া আনিয়া হযরত সাম্মাছি (রঃ) ছাহেব বলিলেন, "বাবা, আমির কুলাল, এই শিশুটি আমার সন্তান। আমি তোমাকে যাহা কিছু আধ্যাত্মিক নেয়ামত প্রদান করিয়াছি তাহা তুমি যথা সময়ে এই শিশুকে পৌঁছাইয়া দিবে। সাবধান! তুমি যদি এই শিশুর তরবিয়াত (প্রতিপালন) এর ব্যাপারে সামান্যতমও গাফলতি কর, তবে কেয়ামতের দিন আমি তোমাকে ছাড়িব না।" জবাবে আমির কুলাল (রঃ) ছাহেব বলিলেন, "যদি আমি এই শিশুর প্রতিপালনে অমনোযোগী হই, তবে তো আমি মানুষই নই।" হযরত খাজাবাবা সামমাছি (রঃ) ছাহেব শিশু বাহাউদ্দিনের পিতামহকে বলিয়া দিলেন শিশুটিকে হেফাজতে রাখিতে। সাবধান করিয়া দিলেন যেন শিশুটির যত্নের কোন ত্রুটি না হয়।
সকলেই শিশুটিকে সযত্নে লালন-পালন করিতে লাগিলেন। খাছ হেফাজতের মধ্যে শিশু খাজা বাহাউদ্দিন বড় হইতে লাগিলেন। তিনি কৈশোরে পদার্পন করিলেন।
খাজা বাহাউদ্দিনের শিশু বয়সে হযরত খাজাবাবা সামমাছি (রঃ) ছাহেব যে তাওয়াজ্জুহ শক্তি প্রয়োগ করিয়াছিলেন-তাহার প্রভাব দেখা দিল কিশোর বাহাউদ্দিনের চালচলনে। তাঁহার কিছুই ভাল লাগে না। সম বয়স্ক ছেলে পেলেদের সাথে খেলাধুলা, দৌড়ঝাপ-কোন কিছুই তাঁহার পছন্দ হয় না। নির্জনতাই শুধু ভাল লাগে। নিরবতাই তাঁহার পছন্দ হয়। তাই অধিক সময়ই তিনি নীরব থাকিতেন। মনে হইত কত রাজ্যের চিন্তা যেন তাহার ছোট্ট মস্তিস্কে ভিড করিয়াছে। দিন যায়, মাস যায়, বছর যায়। হযরত বাহাউদ্দিন (রঃ) যৌবনে পদার্পন করিলেন।
বিজ্ঞাপন
যৌবনে খোদাপ্রাপ্তির কঠোর সাধনাঃ
যুবক বাহাউদ্দিন (রঃ) ছাহেবের মধ্যে তারুন্যের স্বভাবজাত উচ্ছলতা নাই। তিনি নির্জনতা পছন্দ করেন। নির্জনে তিনি গভীর ইবাদতে মগ্ন থাকেন। কখনও গভীর নিশীতে মাজার জেয়ারতে বাহির হন। কিন্তু তাহার হৃদয়ে এক জ্বালা, এক শুন্যতা, এক তৃষ্ণা অহরহই তাহাকে যন্ত্রণা দেয়। এই জ্বালা খোদাপ্রাপ্তির জ্বালা। কোথায় গেলে তিনি খোদাতায়ালাকে পাইবেন? পীরে কামেলের সান্নিধ্য ছাড়া খোদাকে পাওয়া যায় না। কিন্তু কোথায় তিনি পীরে কামেল বা হক্কানী পীর পাইবেন? এই চিন্তায় তাহার নিদ্রা নাই, আহার নাই, বিশ্রাম নাই। কেবলই থাকিয়া থাকিয়া একই চিন্তা মাথা চাড়া দিয়া উঠে। তিনি তাই সর্বদাই অস্থিরতায় কাটান।
একদিন তিনি মুরাকাবায় মগ্ন। এমন সময় এলহাম হইল, হে বাহাউদ্দিন! এখনও কি সময় হয় নাই সমস্ত বন্ধনমুক্ত হওয়ার? শুধু মাত্র আমারই ধ্যানে নিমজ্জিত হওয়ার সময় কি এখনও আসে নাই? এলহামে উক্ত নির্দেশ পাওয়ার পর তিনি আরও বিচলিত হইয়া পড়েন। দুনিয়ার প্রেমতো তিনি পূর্বেই ঝাড়িয়া ফেলিয়াছেন। কিন্তু কিভাবে খোদাতায়ালার সাধনা করিবেন? কে তাঁহাকে সাধনা পদ্ধতি শিখাইয়া দিবে?
বিজ্ঞাপন
এই চিন্তা করিতে করিতে একদিন পথ চলিবার সময়ে এক দরবেশের সহিত তাঁহার সাক্ষাত হইল। তাঁহাকে দেখিয়াই দরবেশ বলিয়া উঠিল, "বাবা, তোমাকে তো পরিচিত বলিয়া মনে হয়।" যুবক খাজা বাহাউদ্দিন (রঃ) তাহাকে বলিলেন, "হুজুর, আমাকে কিছু উপদেশ দিন। কিভাবে, কাহার নিকট গেলে খোদাতায়ালাকে পাওয়া যাইবে? আমাকে সেই ব্যাপারে নসিহত দিন।” দরবেশ শুধু বলিলেন, "বাবা, নাফসের কামনা-বাসনার বন্ধন ছিন্ন করিয়া ফেল।"
হযরত খাজা বাহাউদ্দিন (রঃ) ছাহেবের আর ভাল লাগে না। দরবেশও ইশারাপূর্ণ কথা বলিলেন। কাহার নিকটে গেলে, কাহার সাহায্যে কাহার তাওয়াজ্জুহ বলে তিনি নাফসের শিকল ছিন্ন করিতে পারিবেন দরবেশ তাহা কিছুই বলিলেন না।
মাজার জেয়ারতকালীন সময়ে ধ্যানমগ্ন অবস্থায় হযরত খালেক গজদেওয়ানী (রঃ) ছাহেব কর্তৃক কামেল পীরের সন্ধান প্রাপ্তিঃ
বিজ্ঞাপন
হযরত খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (রঃ) মাজার জেয়ারত শুরু করিলেন। উদ্দেশ্য, মাজারে শায়িত ওলী-আল্লাহ যদি দয়া পরবশ হইয়া তাহাকে কোন ওলীয়ে কামেলের সন্ধান দেন। বছরের পর বছর তিনি দুনিয়ার কয়েক বছর পরে এক রাত্রিতে মহান খোদাতায়ালার কৃপা দৃষ্টি তাহার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন পর্বক কেবল মাজারে মাজারে মুরাকাবায় রত থাকিলেন। প্রতি পড়িল। সেই রাত্রির ঘটনা বড় তাৎপর্যবহ।
রাত্রির প্রথম ভাগেই তিনি মাজার জেয়ারতের উদ্দেশ্যে বাহির হইলেন প্রথমে তিনি হযরত খাজা মুহাম্মদ ওয়ায়েছ (রঃ) ছাহেবের মাজারে গেলেন। তথায় পৌঁছাইয়া ফাতেহা শরীফ পাঠান্তে ছওয়াব রেছানী করিলেন। অতঃপর মুরাকাবায় বসিলেন। দেখিলেন, একটি প্রদীপ তেলে পরিপূর্ণ অথচ মিটি মিটি জ্বলিতেছে। তাহার মনে হইল, প্রদীপটি আরও তেজে জ্বলা উচিৎ। তিনি প্রদীপটি ধরিয়া নাড়া দিতেই তাহা তেজদীপ্ত হইয়া উঠিল। কিছুক্ষণ বাদে মাজার থেকে তাঁহাকে নির্দেশ দেওয়া হইল হযরত মুহাম্মদ আজকর নওবী (রঃ) ছাহেবের রওজা জেয়ারতের জন্য।
তাঁহার মুরাকাবা ভংগ হইল। তিনি ছুটিলেন হযরত মুহাম্মদ আজকর নওবী (রঃ) ছাহেবের কবর জেয়ারতে। যথা স্থানে পৌঁছাইয়া যথারীতি ফাতেহা পড়িয়া কবরে শায়িত হযরত আজকর নওবী (রঃ) এর প্রতি ছওয়াব রেছানী করিয়া ধ্যানে নিমগ্ন হইলেন। এখানেও দেখিলেন, একটি তেলে পরিপূর্ণ চেরাগ অথচ ক্ষীণভাবে জ্বলিতেছে। তিনি পূর্ববৎ চেরাগটি আন্দোলিত করিলেন। তাহা ভালভাবে জ্বলিয়া উঠিল। চতুর্দিক আলোকিত হইল। অতঃপর তিনি দেখিলেন, তাঁহার কোমরে দুইটি তলোয়ার বাঁধিয়া তাঁহাকে ঘোড়ায় ছাওয়ার করিয়া দেওয়া হইতেছে এবং নির্দেশ দেওয়া হইতেছে হযরত মদে আখোন (রঃ) ছাহেবের মাজার জেয়ারত করিবার জন্য।
বিজ্ঞাপন
হযরত মজদে আখোন (রঃ) এর মাজার বেশ কিছু দূরে অবস্থিত। তিনি অতি দ্রুত পথ চলিয়া শেষ রাত্রির দিকে মজুদে আখোন (রঃ) এর মাজারে পৌঁছাইলেন। যথারীতি ফাতেহা পড়িয়া ছওয়াব নজরানা দিয়া মুরাকাবায় বসিলেন। এবারও পর্বের মত তেলে ভর্তি চেরাগ দেখিলেন। অথচ টিম টিমে আলো। তিনি নাড়া দিয়া চেরাগটির তেজ বাড়াইয়া দিলেন। কিছুক্ষণ বাদে তিনি দেখিলেন আধ্যাত্মিকতায় ভরপুর অতি আশ্চর্য এক দৃশ্য। দেখিলেন, মাজারের পশ্চিমের দেয়াল ধীরে ধীরে অদৃশ্য হইয়া গেল। সেখানে নকশাখচিত কারুকার্যময় একটি আসন দেখিলেন।
আসনে বসা একজন বুযুর্গ। বুযুর্গের সামনে সবুজ বর্ণের হালকা এক আবরণ। আবরণের মধ্যে দিয়া তখতে উপবিস্ট সাধককে দেখা যাইতেছে কিন্তু অস্পষ্ট।
সেই অস্পষ্টতার মধ্যেই লক্ষ্য করিলেন, একে একে বেশ কয়েকজন লোক আসিয়া তখতে উপবিষ্ট সাধকের নিকটে উপবেশন করিতেছেন। তিনি তাহাদিগকে চিনিতে চেষ্টা করিলেন কিন্তু সবাই অপরিচিত মনে হইল। হঠাৎ দেখিলেন, হযরত খাজাবাবা সামমাছি (রঃ) আসিয়া অন্যান্যদের মত বসিয়া পড়িলেন। হযরত সামমাছি (রঃ) কে তিনি বাল্যকালে দেখিয়াছিলেন, তাই তাঁহার পবিত্র নূরানী চেহারা স্মৃতিতে ডাসিয়া উঠিল। হযরত সামমাছি (রঃ) ছাহেবকে দেখিবার পরে তিনি বুঝিতে পারিলেন যে, ইহা দুনিয়া হইতে বিদায় গ্রহণকারী ওলী-আল্লাহগণের মজলিস।
হযরত খাজা বাহাউদ্দিন (রঃ) ছাহেবের ইচ্ছা হইল তাঁহাদের পরিচয় জানিবার। এমন সময় জামাতের একজন দন্ডায়মান হইয়া তাঁহাকে বলিলেন, তখতে উপবিষ্ট বিশিষ্ট বুযুর্গের নাম হযরত আব্দুল খালেক গজদেওয়ানী (রঃ) এবং জামাতের অপরাপর বুযুর্গ সকলেই তাঁহার খলিফাবৃন্দ। ইহার পর ঘোষক পৃথক পৃথকভাবে সকলের পরিচয় প্রদান করিয়া বলিলেন, ইনি হযরত খাজা আহমদ সিদ্দিক (রঃ) ইনি খাজা আউলিয়া কবির (রঃ), ইনি হযরত আরেফ রেওগিরী (রঃ), ইনি হযরত খাজা মাহমুদ তানজীর (রঃ), ইনি হযরত খাজা আযিযান আলী আররামায়তানী (রঃ)। ঘোষক এইবার হযরত খাজাবাবা সাম্মাছি (রঃ) ছাহেবের প্রতি অংগুলী ইশারা পূর্বক বলিলেন, ইনি, হযরত খাজাবাবা সামমাছি (রঃ)। ইহার জীবদ্দশাতেই আপনি তাঁহাকে দেখিয়াছেন। স্মরণ করুন, ইনি আপনাকে একটি টুপী প্রদান করিয়াছিলেন যে টুপীটি ছিল তদীয় পীর হযরত খাজা আযিযান আলী (রঃ) ছাহেবের।
হযরত খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (রঃ) ছাহেব জবাব দিলেন, জী। আমি তাঁহাকে চিনিতে পারিয়াছি। কিন্তু তাঁহার দেওয়া টুপী কোথায় রাখিয়াছি, তাহা স্মরণ করিতে পারিতেছি না। বাল্যকালের ঘটনা, মনে নাই। ঘোষক বলিলেন টুপী আপনার ঘরেই আছে। খোঁজ করিলেই পাইবেন। ঘোষক এইবার হযরত খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (রঃ) ছাহেবকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, শুনুন, আপনাকে একটি কারামত দেওয়া হইতেছে। আজ হইতে আপনার আর এক নাম "মুশকিল কোশা।" যে কোন বালা মুছিবত আসুক না কেন, আপনার "মুশকিল কোশা" নামের ফজিলতে উহা দূরীভূত হইয়া যাইবে।
হযরত খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (রঃ) বিস্ময়ে হতবাক। কি দেখিতেছেন তিনি। সনামধন্য ওলী-আল্লাগণের মজলিস। সকলেই যেন তাঁহার প্রতি অতি সদয়। এমন সময় জামাতের মধ্য হইতে আর একজন সাধক দন্ডায়মান হইয়া তাঁহাকে বলিলেন, শুনুন, হযরত আব্দুল খালেক গজদেওয়ানী (রঃ) ছাহেব আপনার সাথে তরিকত বিষয়ক কিছু গুরুত্বপূর্ণ আলাপ আলোচনা করিতে চান।
হযরত খাজা বাহাউদ্দিন (রঃ) আরজ করিলেন, সবুজ পর্দা তুলিয়া নেওয়ার জন্য। পর্দা তুলিয়া নেওয়া হইল। হযরত বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (রঃ) ছাহেব অত্যন্ত বিনীতভাবে হযরত আব্দুল খালেক গজদেওয়ানী (রঃ) ছাহেবকে সালাম দিলেন। গজদেওয়ানী (রঃ) ছাহেব তাহাকে এরশাদ করিলেন, হে বাহাউদ্দিন! আপনিতো নিশ্চয় লক্ষ্য করিয়াছেন যে, মাজার জেয়ারত করিবার সময় প্রত্যেকটি মাজারেই তেল ভর্তি চেরাগ দেখিয়াছেন অথচ তাহা ক্ষীণভাবে জ্বলিতেছে। এই দৃশ্যের তাৎপর্য হলো এই যে, চেরাগ তেলে ভর্তি অর্থাৎ ইহা আপনার খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞান হৃদয়ঙ্গমের এবং ধারণের যোগ্যতার নিদর্শন। কিন্তু ইহার সঠিক ব্যবহার না করিলে কখনোই ইহা তেজদীপ্ত হইবে না। তাই আল্লাহর মারেফাত যাহাতে আপনার নিকট পূর্ণভাবে প্রকাশিত হয়, সেই জন্য আপনার ভিতরের সুপ্ত যোগ্যতাকে চেষ্টা ও সাধনার দ্বারা তেজদীপ্ত করিতে হইবে। অর্থাৎ খোদাতায়ালার সান্নিধ্যে পৌঁছানোর জন্য যোগ্যতানুযায়ী আমল করিতে হইবে। আমলের শর্ত হিসেবে হযরত আব্দুল খালেক গজদেওয়ানী (রঃ) ছাহেব সংক্ষিপ্ত অথচ সারগর্ভউপদেশ দেন। তিনি বলেন, মোকছেদ মঞ্জিলে পৌঁছাইতে হইলেঃ-
পূর্ণ এখলাসের সহিত আমল করিতে হইবে।
শরীয়ত ও সুন্নতের পরিপূর্ণ অনুসরণ করিতে হইবে।
যাবতীয় শিরক ও বেদাত পরহেজ বা পরিত্যাগ করিতে হইবে।
হাদীস গ্রন্থসমূহ ভালভাবে অধ্যায়ন করিতে হইবে।
সেই সংগে সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ) ছাহেবদের জীবনের বিভিন্নমুখী নিদর্শনও অনুসন্ধান করিতে হইবে।
হযরত খালেক গজদেওয়ানী (রঃ) ছাহেবের নসিহত শেষ হইল। খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (রঃ) ভাবিতেছেন-যাহা দেখিতেছি, ইহা কি স্বপ্ন, খলিফাসকল বলিলেন, "আপনি যাহা কিছু দেখিতেছেন-তাহা অতি না বাস্তব? এমন সময় হযরত খালেক গজদেওয়ানী (রঃ) ছাহেবের সত্য। ইহার বাস্তবতা যদি যাচাই করিতে চান, তবে মাওলানা শামছদ্দিন একনওবীর নিকট চলিয়া যান। উক্ত মাওলানার নিকট একজন তুর্কী একজন ভিস্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলিয়াছে। তুর্কী হক পথে আছে। তাহার অভিযোগ সত্য। কিন্তু মাওলানা ছাহেব ভিস্তির পক্ষ অবলম্বন করিয়াছেন। ঐ ভিস্তি একটি স্ত্রীলোকের সাথে জ্বেনা করিয়াছিল, ফলে স্ত্রীলোকটি গর্ভবতী হইয়াছিল। গর্ভপাতের পর শিশুটিকে মারিয়া অমুক স্থানে দাফন করা হয়। আপনি যাইয়া মাওলানা ছাহেবকে এই ঘটনাটি খুলিয়া বলুন। দেখিবেন, সত্য প্রমাণিত হইবে।"
হযরত গজদেওয়ানী (রঃ) ছাহেবের খলিফাবৃন্দ পুনরায় তাঁহাকে বলিলেন, আপনি মাওলানা ছাহেবের নিকট হইতে "লম্ফ" এর দিকে রওয়ানা দিবেন। সংগে লইবেন বড় আকৃতির তিনটি আংগুর। পথে জংগল পড়িবে। জংগলের পার্শ্ব দিয়া পথ। সেই পথ দিয়া চলিতে থাকিবেন। কিছু পথ অতিক্রমের পর একজন বৃদ্ধ জংগল হইতে বাহির হইয়া আপনার সহিত দেখা করিবে। তিনি আপনার হাতে একটি গরম রুটি দিবেন। আপনি তাহা গ্রহণ করিবেন। কিন্তু বৃদ্ধের সাথে কোন কথা বলিবেন না। আপনি ঐ তপ্ত রুটিসহ পথ চলিতে থাকিবেন। আরো কিছু দূর অগ্রসর হইলে একটি কাফেলার সহিত আপনার সাক্ষাৎ হইবে। তারপর আরো কিছুদূর গেলে একজন ঘোড়া সওয়ারকে আপনার দিকে আসিতে দেখিবেন। আপনি তাহাকে তওবা করাইবেন এবং প্রয়োজনীয় নসিহত দান করিবেন। তৎপর সেখান হইতে হযরত সৈয়দ আমির কুলাল (রঃ) ছাহেবের দরবারে হাজির হইবেন। তাহাকে কিছুই বলিবেন না। শুধু হযরত আযিযান আলী (রঃ) এর যে টুপি আপনার নিকট গচ্ছিত আছে, সেই টুপী তাহার সমীপে পেশ করিবেন। হযরত আমির কুলাল (রঃ) ছাহেবই আপনার পীর। তিনিই আপনাকে তালিম দিবেন।
বিদায় সম্ভাষণের সময় হযরত গজদেওয়ানী (রঃ) ছাহেবের খলিফাসকল পুনরায় হযরত খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (রঃ) কে বাড়ীতে যাইয়া হযরত আযিযান আলী (রঃ) ছাহেবের টুপিটি খোঁজ করিতে বলিলেন। বুজর্গানে দ্বীনের মজলিসের সভা শেষ হইল। হযরত খাজা বাহাউদ্দিন (রঃ) ছাহেবের ধ্যানভংগ হইল। দেখিলেন, তিনি হযরত মজদে আখোন (রঃ) এর মাজার শরীফের পার্শ্বে বসিয়া আছেন।
পীর সৈয়দ আমির কুলাল (রঃ) ছাহেবের সান্নিধ্যে গমন এবং কঠোর খেদমত অন্তে খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞান অর্জনঃ
হযরত খাজা বাহাউদ্দিন নকশ্বন্দ (রঃ) চক্ষু উন্মোচিত করিয়া চতুর্দিকে তাকাইলেন। সকাল হওয়ার আর কতক্ষণ বাকী আছে তাহা বুঝিতে চেষ্টা করিলেন। মনে হইল সূর্য উদয়ের আর বেশীক্ষণ বাকী নাই। তিনি দ্রুত বাড়ীতে গেলেন, সবাইকে জাগাইয়া টুপি খোঁজ করিতে লাগিলেন। ভাগ্য সুপ্রসন্ন। কিছুক্ষণেই টুপি পাইলেন। টুপি হাতে লইয়া অঝরে কাঁদিতে লাগিলেন। কান্না যেন আর থামে না। টুপিসহ তাড়াতাড়ি বাহির হইলেন। ফজর নামাজ পড়িতে হইবে মাওলানা শামছুদ্দিন একনওবীর মসজিদে। ভিস্তি ওয়ালার কাহিনী তাহার নিকট বর্ণনা করিতে হইবে। পথ চলিতে চলিতে যেইমাত্র মাওলানা ছাহেবের মসজিদের নিকটে আসিলেন, তখনই ফজরের আযান দেওয়া হইল। তিনি ঐ মসজিদে ফজরের নামাজ সম্পন্ন করিয়া মাওলানা ছাহেবকে নির্জনে ডাকিয়া তুর্কী ও ভিস্তিওয়ালার কাহিনী আদ্যোপান্ত বলিলেন। মাওলানা ছাহেব ইহা শুনিয়াতো হতবাক। তৎক্ষণাৎ তুর্কী ও ভিস্তিকে তলব করিলেন। তাহারা আসিল। মাওলানা ছাহেব ভিস্তিওয়ালাকে তাহার দাবী তুলিয়া লইতে বলিলেন। কিন্তু ভিস্তীওয়ালা তুর্কীর দাবী অস্বীকার করিল। হযরত খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (রঃ) ছাহেব তখন ভিস্তিওয়ালার গোপন জ্বেনা সম্পর্কিত সমস্ত ঘটনা প্রকাশ করিলেন। ইহা শুনিয়া ভিস্তিওয়ালা খুবই লজ্জিত হইল এবং সংগে সংগে তুর্কীর দাবীর সত্যতা স্বীকার করিয়া লইল।
হযরত খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (রঃ) ছাহেব সেখান হইতে 'লসফ' অভিমুখে রওয়ানা হইলেন। সংগে লইলেন মাত্র তিনটি বড় আকতির আংগুর। পথ চলিতেছেন। সম্মুখে জংগল পড়িল। জংগলের পার্শ্ব দিয়া রাস্তা। সেই রাস্তা দিয়া তিনি চলিতেছেন। পথ চলিতেছেন আর ভাবিতেছেন-বহু ত্যাগের পরে, বহু সুকঠিন ব্রতের পরে, অনাহার অনিদ্রায় বহু বছর অতিবাহিত করার পরে মহান খোদাতায়ালা তাহাকে পীরে কামেলের সন্ধান দিলেন। আজ তাঁহার নিকট যাইতেছেন। খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞান অর্জন করা হয়তো এখন সম্ভব হইবে: মনের অস্থিরতা দূর হইবে।
জংগলের পার্শ্ব দিয়া পথ চলিতেছেন। হঠাৎ এক বৃদ্ধ জংগল হইতে বাহির হইয়া তাহার নিকটে আসিলেন। একটি গরম রুটি তাঁহার হাতে দিলেন কিন্তু দুই জনের মধ্যে কোন কথা বার্তা হইল না।
হযরত খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (রঃ) ছাহেব নিরবচ্ছিন্ন পথ চলিতেছেন। কোথাও কোন বিরতি নাই। চলিতে চলিতে পথে মুরাকাবায় কথিত সেই কাফেলার সাথে তাহার সাক্ষাৎ হইল। কাফেলার লোকজন তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, আপনি কোথা হইতে আসিতেছেন? তিনি জবাব দিলেন, এক্কা হইতে। তাহারা পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলেন, কখন রওয়ানা হইয়াছেন? তিনি বলিলেন, সূর্যোদয়ের কিছুক্ষণ পূর্বে। কাফেলার লোকজন জবাব শুনিয়া আশ্চর্য হইয়া বলিলেন, আমরাতো প্রথম রাত্রিতে রওয়ানা হইয়া এখন এই স্থানে আসিয়া পৌঁছাইয়াছি।
যাই হোক, হযরত খাজা বাহাউদ্দিন (রঃ) আরও অগ্রসর হইলেন। দেখা হইল, এক ঘোড়া সওয়ারীর সাথে। ঘোড়াসওয়ারী হযরত বাহাউদ্দিন (রঃ) কে দেখা মাত্রই ভীত সন্ত্রস্ত হইয়া তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, "হুজুর, আপনি কে? আপনাকে দেখিয়া আমার ভয় হইতেছে কেন?"
হযরত খাজা বাহাউদ্দিন (রঃ) ছাহেব তাহাকে বলিলেন, "তুমি ঘোড়া হইতে নামিয়া আস। তোমাকে তওবা করিতে হইবে।" যুবকের হাতে মদের বোতল ছিল। যুবকটি তাহা ফেলাইয়া ঘোড়া হইতে নামিয়া হযরত খাজা বাহাউদ্দিন (রঃ) ছাহেবের নিকট তওবা করিল।
হযরত খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (রঃ) পথ চলিতে লাগিলেন। আর সামান্য দূরেই হযরত আমির কুলাল (রঃ) ছাহেবের দরবার। তিনি হযরত আমির কুলাল (রঃ) ছাহেবের দরবারে উপস্থিত হইয়া তাঁহার সমীপে হযরত আযিযান আলী (রঃ) ছাহেবের টুপিটি রাখিয়া নিশ্চুপ দাঁড়াইয়া রহিলেন। টুপিটি দেখিয়াই হযরত আমির কুলাল (রঃ) ছাহেব বলিয়া ফেলিলেন, ইহাতো হযরত আযিযান আলী (রঃ) ছাহেবের টুপি। হযরত খাজা বাহাউদ্দিন উত্তরে বলিলেন, জী। হযরত আমির কুলাল (রঃ) ছাহেব তাহাকে বলিলেন, "বাবা, ইহার ইশারা এই যে, এই টুপি অত্যন্ত হেফাজত সহকারে সংরক্ষণ করিতে হইবে।
অতঃপর হযরত আমির কুলাল (রঃ) ছাহেব হযরত খাজা বাহাউদ্দিন (রঃ) ছাহেবকে গ্রহণ করিলেন। তাহাকে খোদাপ্রাপ্তির ছবক দিলেন, তালিম বা তরবিয়ত বা প্রতিপালন করিতে লাগিলেন।
হযরত খাজা বাহাউদ্দিন (রঃ) ছাহেবের অতি শৈশবকালীন সময়ে হযরত আমির কুলাল (রঃ) ছাহেবের পীর হযরত খাজাবাবা সামমাছি (রঃ) ছাহেব তাঁহাকে [আমির কুলাল (রঃ)] কে বলিয়াছিলেন, তিনি যেন বাহাউদ্দিনের তরবিয়ত বা প্রতিপালনে বিন্দু পরিমানও গাফলতি না করেন। হযরত আমির কুলাল (রঃ) তাই অত্যন্ত যত্ন সহকারে হযরত বাহাউদ্দিনকে আল্লাহর মারেফাত বা পরিচয় জ্ঞান শিক্ষা দিতে থাকেন।
হযরত খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (রঃ) ছাহেবও এক মনে, এক প্রাণে পীরের খেদমত করিতে থাকেন। খোদাপ্রাপ্তির পথে আছে হাজার পরীক্ষা। আছে ত্যাগের পরীক্ষা, অনাহার-অনিদ্রার পরীক্ষা, কঠিন শ্রমের পরীক্ষা। হযরত বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (রঃ) ছাহেবকে তেমনি অসংখ্য পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইতে হইয়াছে। তিনি কখনও কখনও পীরের দরবার হইতে বাড়ীতে যাইতেন। একদা বাড়ী হইতে পীরের দরবার অভিমুখে রওয়ানা দিলেন। শীতের রাত। শীতের তীব্রতা অনেক বেশী। হাড় কাঁপানো শীত। তুষার পড়িতেছে। ইহারই মধ্যে তিনি পীরের দরবার অভিমুখে চলিয়াছেন। সেদিন পীর ছাহেবেরও ইচ্ছা হইল, মুরীদ বাহাউদ্দিনকে একটু পরীক্ষা করিয়া দেখিবার। দরবার শরীফের নিকটে আসিতেই হযরত আমির কুলাল (রঃ) ছাহেব বলিলেন, "ঐ যে লোকটি আসে, কে?" খাদেমেরা বলিল, "হযরত খাজা বাহাউদ্দিন (রঃ)।" হযরত আমির কুলাল (রঃ) ছাহেব বলিলেন, "বাহাউদ্দিন যেন হুজরায় প্রবেশ করিতে না পারে। তাহাকে বলিবে, সে যেন শীতের মধ্যে বাহিরেই দাঁড়াইয়া থাকে।"
হোজরার নিকটে আসা মাত্রই তাহারা পীরের নির্দেশ তাঁহাকে জ্ঞাত করিল। হযরত খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (রঃ) ছাহেব কোন দ্বিরুক্তি করিলেন না, ভাল-মন্দ চিন্তা করিলেন না। তুষারের মধ্যে বাহিরে সারারাত্রি দাঁড়াইয়া রহিলেন। ঠিক সোবেহ সাদেকের সময় হযরত আমির কুলাল (রঃ) ছাহেবের অন্তর বিগলিত হয়। তিনি দ্রুত হোজরার বাহিরে আসিয়া দেখিলেন, বাহাউদ্দিন (রঃ) তখনও বাহিরে দন্ডায়মান। তাহার শরীরে তুষারের স্তর পড়িয়াছে। তিনি দৌড়াইয়া আসিয়া হযরত বাহাউদ্দিনকে বুকে জড়াইয়া ধরিলেন। আদর করিলেন, সোহাগ করিলেন। নিজ হাতে বাহাউদ্দিন (রঃ) ছাহেবের শরীরের উপর থেকে বরফ ফেলাইতে লাগিলেন। আর কাঁদিতে কাঁদিতে বলিলেন, "বাবা, খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞান অর্জনের যোগ্যতা এক মাত্র তোমারই আছে।" এমনিভাবে বহু কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়া পীরের নেক ও খাছ রহমতের দৃষ্টি লাভে সক্ষম হন। হযরত আমীর কুলাল (রঃ) ছাহেব স্বীয় পীর হযরত সামমাছি (রঃ) ছাহেবের নির্দেশ মত নিজ দেলের যাবতীয় আধ্যাত্মিক নেয়ামত হযরত খাজা বাহাউদ্দিন (রঃ) ছাহেবকে দান করেন। ইহার পর হইতে হযরত বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (রঃ) ছাহেবের খোদাপ্রাপ্তির সাধনার কঠিনতম অধ্যায় শুরু হয়। সে সম্পর্কে পরবর্তী নসিহত সমূহে আলোচনা করা হইবে।
আমার জীবনের দু'টি কথাঃ
হে জাকেরান সকল! তোমরা দেখিলে, হযরত বাহাউদ্দিন (রঃ) ছাহেব শৈশব ও কৈশোরে নির্জনতা ভালবাসিতেন, নিরিবিলি পছন্দ করিতেন। সম বয়স্ক ছেলেপেলেদের সাথে খেলাধুলা, দৌড়-ঝাঁপ, আনন্দ-ফুর্তি কোন কিছুই তাহার ভাল লাগিত না। তাঁহার জীবনের সাথে এই মিছকিনের জীবনের খানিকটা মিল রহিয়াছে। এখানে একটি কথা বলা প্রয়োজন। হযরত খাজা বাহাউদ্দিন নক্শবন্দ (রঃ) ছাহেব একজন মহাসাধক ছিলেন। সেই মহা তাপসের সহিত নিজেকে তুলনা করিব-এমন স্পর্ধা বা দুঃসাহস আমার নাই। এমন কোন গুণ আমার মধ্যে নাই-যাহা দ্বারা নিজেকে উক্ত মহা আধ্যাত্মিক সাধকের সাথে তুলনা করা যায়। মূলতঃ হযরত খাজা বাহাউদ্দিন নক্শবন্দ (রঃ) ছাহেবের কদমের ধুলার সমানও আমি নই। আমার মধ্যে শুন্যতা ছাড়া আমি কিছুই দেখি না। তবে যে আমার জীবনের দু'চারটি কথা বলিতেছি-তাহা মূলতঃ তোমাদেরকে শিক্ষা দানের জন্যই। আমার পীর কেবলাজান আমাকে যে রকম ভাবে শিক্ষা দিয়াছেন, যে ভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিয়াছেন- তাহার কিছু কিছু বর্ণনা করিতেছি এই জন্য যে, ইহা খোদাপ্রাপ্তির পথে তোমাদের সামান্যতম হইলেও সহায়ক হইবে-এই চিন্তা করিয়া। যাই ভাল লাগিত। শৈশব ও কৈশোরে আমার তেমন বন্ধু-বান্ধব ছিল না। হোক, ছোট বেলায় আমারও নির্জনতা পছন্দ হইত। একা একা থাকিতেই গাঁয়ের সম বয়স্ক ছেলেমেয়েদের সাথে খেলাধুলাও আমার পছন্দ হইত না। আমাদের বাড়ীতে একটি পুকুর ছিল। আমি শৈশবে সেই পুকুরে ঢিল ছুড়িতাম। অনেকগুলি মাটির বা ইটের টুকরা একত্রিত করিয়া একের পর এক সেগুলি পুকুরে নিক্ষেপ করিতাম।
একদা শৈশবে নিশিতে আমি স্বপ্নে দেখি যে, আমি পুকুরে একা একা ঢিল ছুঁড়িতেছি। কিছুক্ষণ পর আমারই বয়সের একজন সুন্দর ছেলে আসিয়া আমার সাথে ঢিল ছড়িতে শুরু করিল। আমি এবং সেই বালক দুইজনে মাটির টুকরা পুকুরে ফেলিতেছি। এমন সময় দেখি, আমার আব্বাজান আমাকে ডাকিতেছেন। নিকটে গেলে আব্বাজান আমাকে বলিলেন, "বাবা, তোমার সাথে যে ছেলেটি খেলিতেছে, সে কিন্তু মদিনা হইতে আসিয়াছে। তুমি তাহাকে তোমার সাথে রাখিতে চেষ্টা করিও; সে যেন চলিয়া যাইতে না পারে। আব্বাজানের নিকট এই মূল্যবান তথ্য পাইয়া আমি মদিনার মেহমানকে খেলার সংগী হিসেবে ধরিয়া রাখার জন্য কত যে কৌশল আঁটিতেছি-তাহার শেষ নাই।" এই পর্যন্ত দেখিয়া নিদ্রা ভংগ হইল। ইহার পর হইতে আমার শৈশবকালীন খেলার সাথী ছিলেন মদিনার সেই মেহমান। সেই ছোট্ট বেলা হইতেই উক্তরূপ তাৎপর্যবহ বিভিন্ন স্বপ্ন আমি মাঝে মাঝেই দেখিতাম। যাহা ছিল এই অধমের প্রতি পীর কেবলাজানের এক মহাদান।
হযরত খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (রঃ) ছাহেবের হৃদয়ে খোদাপ্রাপ্তির উত্তাপ সৃষ্টি হওয়ার পর হইতে পীরে কামেলের সন্ধানে, হক্কানী পীরের খোঁজে বহু জায়গায় গিয়াছেন, কিন্তু মন মত কামেল পীর তিনি পান নাই। তাই বছরের পর বছর তিনি ওলী-আল্লাহগণের মাজার জেয়ারত করিয়াছেন। উদ্দেশ্য, কামেল পীরের সন্ধান লাভ। অবশেষে তিনি কামেলের সন্ধান পান। মাজার জেয়ারতের সময়ে নকশবন্দ সেলসেলার কতিপয় বুযুর্গানে দ্বীন তাঁহাকে সত্য পীরের সন্ধান দেন।
কামেল পীর অনুসন্ধানের জন্য আমাকে উক্তরূপ পরিশ্রম করিতে হয় নাই। হিজরী চতুর্দশ শতাব্দীর মুজাদ্দেদ, যুগের মহা কামেল, মহা তাপস, হযরত খাজাবাবা এনায়েতপুরী (কূঃ) ছাহেব নিজেই একবার আমাদের শেরপুরস্থ বাড়ীতে তশরীফ রাখিয়াছিলেন। আমার বয়স তখন ৭/৮ বছর। সেদিনের সেই স্মৃতি আজও অম্লান।
পীর কেবলাজান ছাহেব প্রথমে পাকরিয়াতে মোঃ নঈমুদ্দিন মুন্সী ছাহেবের বাড়ীতে উঠেন। নইমুদ্দিন মুন্সী ছাহেব পীর কেবলাজানের মুরীদ ছিলেন। কথাবার্তার এক পর্যায়ে পীর কেবলাজান মুন্সী ছাহেবকে বলেন, 'তোমাদের এলাকার ছর্দারকে ডাকিয়া আন।" মুন্সী ছাহেব আমার আব্বাজানকে ডাকিয়া কেবলাজান হুজুরের সমীপে হাজির করিয়া বলেন, উনিই আমাদের গ্রামের ছর্দার গাঁয়ের মাতব্বর। আব্বাজানের সাথে পীর কেবলাজান ছাহেবের বহুক্ষণ আলোচনা হয়। কেবলাজান হুজুরের অমায়িক ব্যবহারে আব্বাজান মুগ্ধ হন, চমৎকৃত হন। অতঃপর আমাদের বাড়ীতে তশরীফ রাখার জন্য তিনি অতি বিনয়ের সাথে তাহার কদমে দাওয়াত পেশ করেন। কেবলাজানও দাওয়াত কবুল করেন এবং পরবর্তী দিন বাদ আছর তিনি আমাদের গৃহে কদম রাখেন। বয়স বেশী না হইলেও সেইদিনের সেই সব স্মৃতি আজও আমি ভুলি নাই। সফেদ পোশাক পরিহিত কেবলাজান হুজুরের নূরানী চেহারা মোবারক দেখিয়া আমি এতই উদ্বেলিত হইয়াছিলাম যে, আমার মনে হইতেছিল, কোন স্বর্গীয় দূত আমাদের বাড়ীতে তশরীফ রাখিয়াছেন। আমার আরও মনে হইতেছিল যে, আসমান হইতে দলে দলে ফেরেশতা সকল আমাদের বাড়ীতে আসিতেছেন। কথাবার্তার একটি পর্যায়ে কেবলাজান হুজুর আমাকে এবং আমার বড় ভাই হযরত মাওলানা আলতাফ হোসেন (রঃ) ছাহেবকে দেখাইয়া বলিলেন, "বাবা, আপনার ঐ ছেলেদ্বয়কে আমাকে দেন।" আব্বাজানও নিঃশর্তভাবে আমাদেরকে পীর কেবলার কদমে সোপর্দ করিলেন। দেওয়া নেওয়ার পর্ব শেষ হইল। আমি তখন থেকেই পীর কেবলাজানের নেক নজরে। ইহার দুই বছর পরের কথা। আমার বয়স তখন ১০ (দশ)। আব্বাজানের সাথে সেই দশ বছর বয়সে আমি প্রথম পীর কেবলাজান ছাহেবের এনায়েতপুরস্থ দরবার শরীফে যাই। কিন্তু দরবার শরীফে যাওয়ার পূর্বের দুই বছর অর্থাৎ পীর কেবলাজান ছাহেবকে প্রথম দেখিবার ক্ষণ হইতে এনায়েতপুরে যাওয়ার মধ্যবর্তী সময়ে মাঝে মাঝে আমি কেবলাজান হুজুরকে স্বপ্নে দেখিতাম। দেখিতাম, তিনি আমাকে আদর করিতেছেন, সোহাগ করিতেছেন। কখনও দেখিতাম, তিনি আমাকে উপদেশ প্রদান করিতেছেন।
পীর কেবলাজান হুজুর ঐ একবারই শেরপুরস্থ পাকুরিয়া গ্রামে তশরীফ রাখিয়াছিলেন: আর কখনও তিনি যান নাই। জামালপুরের বগাবাইদ নিবাসী মোঃ মঈনুদ্দিন ছাহেব নামক এক ব্যক্তি পীর কেবলাজান নিজের চেয়েও বেশী মহব্বত করিতেন। তিনি সব সময়ই জজবা হালাতে থাকিতেন। আধ্যাত্মিক জ্ঞান সম্পন্ন মজজুব পাগল ছিলেন তিনি। যাহা বলিতেন তাহা সত্য হইত। আমি এবং আমার বড় ভাই হযরত মাওলানা আলতাফ হোসেন (রঃ) মাঝে মাঝে তাহার নিকট যাইতাম। আমাদেরকে তিনি অতিশয় মহব্বত করিতেন।
কিন্তু কেন এত ভালবাসিতেন, তাহা বুঝিতাম না। পীর কেবলাজান আমাদের বাড়ীতে তশরীফ রাখিয়াছেন, হয়তো সেই কারণে হবে। তিনিই একদিন আমাদেরকে বলিলেন, "হযরত পীর কেবলাজান হুজুর যে একবার মাত্র শেরপুরের অজ পাড়া গাঁ পাকুরিয়াতে গিয়াছিলেন, তাহা শুধুমাত্র আপনাদের দুই ভাইকে আনয়নের জন্যে। কাজেই পীরে কামেল অনুসন্ধানের জন্য আমাকে হযরত খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (রঃ) ছাহেবের মত দুঃখ ভোগ করিতে হয় নাই সত্য, তবে আমার উপরে খোদাতায়ালা কর্তৃক অর্পিত দুঃখ কষ্টের ধারা ছিল ভিন্নতর।
পূর্বেই বলিয়াছি, অতি শৈশবে আমি মাতৃহারা হই। তৎপর আমার আব্বাজান আমাকে এবং আমার এক ছোট বোনকে লালন পালনের জন্য তাহার এক ফুপুকে আমাদের গৃহে আনয়ন করেন। দূর সম্পর্কীয় সেই দাদীমার প্রতিপালনে আমরা বড় হইতে থাকি। মাতৃহারা দুই ভাইবোনকে আব্বাজান খুবই আদর করিতেন। কিন্তু না; বেশীদিন সেই সুখ আমরা ভোগ করিতে পারিলাম না। আমার দুই জন সৎ মা ছিলেন। দ্রুতই আমরা তাহাদের চক্ষুশুলে পরিণত হইলাম। আমাদের বিরুদ্ধে নানাবিধ মিথ্যা অভিযোগ তাহারা আব্বাজানের নিকট করিতেন। আব্বাজানকে খাবার পরিবেশনের সময় দুই সৎ মা দুই পার্শ্বে বসিতেন। আমাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ একজনের বলা শেষ হইলে অতঃপর আর একজন বলিতেন। তাহাদের কান কথা আব্বাজান বিশ্বাস করিয়া আমাদের প্রতি ধীরে ধীরে বিরক্ত হন এবং সেই স্কুল বয়সেই আমাদেরকে তিনি পৃথক করিয়া বা জুদা করিয়া দেন। তারপর হইতে কত রকমের যন্ত্রণা যে আমার জীবনে আসিতে থাকে-তাহার ইয়ত্তা নাই।
ছোট বেলা হইতেই আমি অধিক সময়ই অসুস্থ্য থাকিতাম। রোগ, ব্যাধি, পীড়া আমার আজন্মের সংগী। একটা না একটা ব্যাধি সবসময়ই লাগিয়া থাকিত। যেমন শিকলের রিং-একটির সংগে আর একটি সংযুক্ত। কখনও কখনও অসুস্থ্যতার মাত্রা এত অধিক হইত যে আমার নাড়ীর স্পন্দন পর্যন্ত অনুভূত হইত না। ফলে চারিদিকে আমার মৃত্যুসংবাদ পর্যন্ত প্রচারিত হইত। কিন্তু আমার প্রতি পীর কেবলাজানের দয়ার দৃষ্টি ছিল। আমাকে তিনি যারপরনাই ভালবাসিতেন। তিনিই মহান খোদাতায়ালার নিকট আমার হায়াত দরাজের জন্য দু'আ করিতেন। ফলে আল্লাহপাক আমার হায়াতকে দরাজ করিতেন। বারবার আমার জীবনে এই রকম ঘটনা ঘটিয়াছে।
একবারের একটি রোগের কথা বলি। তখন আমার নানাজান জীবিত আছেন। আমি আমাদের ঘরে একটি আলো দেখিতাম। আকাশে যেমন বিদ্যুৎ চমকায়, ঠিক তেমনি বিদ্যুৎ চমকানোর মতই আলোর ঝলক দেখিয়া জ্ঞানশূন্য হইতাম। মাঝে মাঝেই এমন হইত। কেওবা বলিত ইহা অশরীরী প্রভাব। কেউবা বলিত জ্বেনের তাছির। আমার নানাজান একজন নাম করা ফকির ও দরবেশ ছিলেন। আমার সুস্থ্যতার জন্য তিনি বহু তদবির করিলেন। নানাজানের চেষ্টা তদবিরে, পীর কেবলাজানের অছিলায় আল্লাহ পাক দয়া করিয়া সেই রোগ থেকে আমাকে মুক্তি দেন।
আর একটি ঘটনা তোমাদের বলি। সেবার আমি খুবই অসুস্থ ছিলাম মরণাপন্ন অবস্থা আমার। তেমন অবস্থায় আমি স্বপ্নে দেখিলাম, "আমি ইন্তেকাল করিয়াছি। আমাকে প্রথম আকাশে নেওয়া হইয়াছে। সেখানে একটি নূরের কোঠায় আমাকে রাখা হইল। সেই কোঠা হইতে আমি আমার লাশকেও দেখিতে পাইলাম। আমি দেখিলাম লাশের চতুর্দিকে ক্রন্দনরত আত্মীয় স্বজনকে। তাহারা সকলেই কান্নাকাটি করিতেছে। এমন সময় দেখি, পীর কেবলাজান হুজুর আমাদের বাড়ীতে আসিয়া আমার নাম ধরিয়া ডাকিতেছেন। আত্মীয়রা আমার মৃত্যুসংবাদ তাঁহার সমীপে পৌঁছাইলে তিনি বলিলেন, "সে তো মারা যাওয়ার কথা নয়। তাঁহার বহু কর্ম বাকী আছে। তোমরা তাহার শবদেহকে আমার নিকটে লইয়া আস।" মৃতদেহকে উঠানে আনিয়া কেবলাজানের কদমে রাখা হইল। কেবলাজান হুজুর আমার হায়াত বৃদ্ধির জন্য খোদাতায়ালার দরবারে হাত তুলিলেন। তদীয় পবিত্র হস্তদ্বয়ের অছিলায় আল্লাহ আমার হায়াত বৃদ্ধি করিলেন। আমি জাগিয়া উঠিলাম যেমন ঘুমন্ত শিশু জাগিয়া উঠে। কেবলাজান হুজুর বলিলেন, "বাবা, আল্লাহপাক তোমার দশ বছর হায়াত দরাজ করিলেন। তৎক্ষণাৎ আমি বলিলাম, "হুজুর, দশ বছরতো হাসিয়া-খেলিয়াই চলিয়া যাইবে। আর একবার দয়া করিয়া হাত তুলুন।" তিনি হাত উঠাইলেন।
আল্লাহপাক আমার হায়াত আরও পাঁচ বছর বৃদ্ধি করিলেন। আমি ১৫ বছরের হায়াত পাইলাম। অতঃপর আমি দেখিলাম যে, আমাকে দেখিয়া সকলেই ভয় পায়। কারণ কিছুক্ষণ পূর্বেই আমি মৃত ছিলাম। আমাকে কেন্দ্র করিয়াই সকলে কাঁদিতেছিন। কিন্তু এখন আর্মি জীবিত। আমি হাঁটিতেছি, চলিতেছি। ইহা দেখিয়া আত্মীয়-স্বজন সকলেই ভয়ে আমার থেকে দূরে সরিয়া পড়ে।
মনে মনে ভাবিলাম, সকলেই যখন আমাকে ভয় পায়, আমি আর এই গাঁয়ে থাকিব না। পীর কেবলাজানের নিকটে যাইব।
অতঃপর আমি এনায়েতপুর দরবার শরীয়ে গেলাম। দেখিলাম, বিশাল এক হল রূম কিন্তু লোকে ভর্তি: কোথাও কোন জায়গা নাই। বহু চেষ্টা করার পরে সেই হল রূমের দেওয়াল সংলগ্ন এলাকায় সামান্য একটু জায়গা পাইলাম সেখানে আমি কোন রকমে বসিলাম। অতঃপর স্বপ্ন ভাংগিয়া গেল। পীর কেবলাজানের দয়ায় যে ১৫ বছরের হায়াত পাইলাম, তাহা ছিল রূহানী জগতের সময়। আর রূহানী জগতের ১৫ বছর; জাগতিক সময়ে কত বছর হয়-তাহা আল্লাহপাকই ভাল জানেন।
যাই হোক, সারা জীবনই বিভিন্ন রোগ-ব্যাধিতে আমি আক্রান্ত হইয়াছি; এখনও হইতেছি। বহুবারই মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়িয়াছি। কিন্তু পীর কেবলাজানের নেক দৃষ্টির বরকতে, তাহারই তাঈদ-মদদে সমুদয় বিপদ কাটাইয়া উঠিতে পারিয়াছি।
খোদাপ্রাপ্তির পথ বড় বন্ধুর। বহু চড়াই-উৎরাই এই পথে। রোগ-ব্যাধি, পীড়া-বিমার, অনাহার-অনিদ্রা, বিপদ-আপদের কন্টক সারা পথ বিছানো থাকে। সব রকমের পরীক্ষাই উত্তীর্ণ হওয়া যায়, সকল বিপদ-আপদের পর্দাকেই ছিন্ন করা যায় কিন্তু অনাহারের পর্দা ছিন্ন করা বড় কঠিন। এখানে প্রয়োজন পীরের অগাধ মহব্বত। পীরের মহব্বত দেলে পয়দা হইলে মহান খোদাতায়ালা দুর্গম সেই পথ পথিকের জন্য সহজ করিয়া দেন। তোমরা যদি খোদাতায়ালা পর্যন্ত পৌঁছাইতে চাও, তবে পীরকে ভালবাস। পীরের নির্দেশ মানিয়া চল। তবে পীরের অছিলাতেই আল্লাহপাক তোমাদের জন্য রোগ-ব্যাধি, বালা-মুছিবত, বিপদ-আপদ ও দুঃখে-কষ্টে পরিপূর্ণ খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞান হাছিলের পথ সহজতর করিয়া দিবেন। পীরের প্রতি মহব্বতের আধিক্যের কারণে পরীক্ষাস্বরূপ আগত বিপদ-আপদ, বালা-মুছিবতের যন্ত্রণা আর যন্ত্রণা বলিয়া মনে হইবে না। সমুদয় বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করিয়া তোমরা মাঞ্জিলে মাকছুদে পৌঁছাইতে পারিবে: আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টি অর্জনে সক্ষম হইবে। তোমরা কামিয়াবী হও। আল্লাহতায়ালা তোমাদের দয়া করুন। এই দু'আ করিয়া এই অধ্যায় এখানেই শেষ করিতেছি। আমীন!








