Logo

হযরত খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (রঃ) ছাহেবের জীবন-চরিত

profile picture
জনবাণী ডেস্ক
৫ জুলাই, ২০২৬, ১৯:৫১
হযরত খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (রঃ) ছাহেবের জীবন-চরিত
ছবি: জনবাণী।

খোদাপ্রাপ্তি জ্ঞানের আলোকে শাহ্সূফি হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ও খাজা বাহাউদ্দীন নক্শবন্দ بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ (প্রসংগঃ হযরত খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (রঃ) ছাহেবের সাধনা জীবনের কতকাংশ এবং তদ প্রবর্তিত নকশবন্দীয়া তরিকার শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে আলোচনা।)

বিজ্ঞাপন

নকশবন্দীয়া তরিকার সম্রাট হযরত খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (রঃ) ছাহেবের জীবন-চরিত সম্পর্কে আলোচনা করা হইয়াছে। আলোচনার বিষয়বস্তুতে ছিল সেই মহা তাপসের শৈশব, কৈশোর ও যৌবন। শৈশবে হযরত খাজা সাম্মাছি (রঃ) ছাহেবের তাওয়াজ্জুহ প্রদান, কৈশোরে সেই তাওয়াজ্জুয়ের প্রভাবে দেলে খোদাতায়ালার প্রেমের উত্তাপ অনুভব, অতঃপর পীরে কামেলের সন্ধানে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস বিভিন্ন খানকায় ছফর এবং মাজারে মাজারে জেয়ারত, শেষে হযরত আব্দুল খালেক গজদেওয়ানী (রঃ) ছাহেব ও তদীয় কতিপয় খলিফা কর্তৃক যুগের প্রখ্যাত কামেল হযরত আমীর কুলাল (রঃ) ছাহেবের খেদমতে গমনের নির্দেশ প্রাপ্তি এবং পরিশেষে হযরত আমীর কুলাল (রঃ) ছাহেবের খানকায় বেশ কয়েক বছর খেদমত অন্তে কিছু বাতেনী নেয়ামত হাছিল সম্পর্কীয় বিষয় সন্নিবেশিত আছে প্রথম পর্বে। এই অধ্যায়ে সেই মহান খাজা হযরত বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (রঃ) ছাহেবের সাধনা ও প্রচার জীবনের পরবর্তী অধ্যায় সম্পর্কে আলোচনা করা হইবে। সংগে তাহার নব প্রবর্তিত তরিকা পদ্ধতি সম্পর্কেও কিছু মূল্যবান তথ্য থাকিবে।

আপন পীরের প্রতি খাজা হযরত বাহাউদ্দিন নকশ্বন্দ (রঃ) ছাহেবের 'তৌহিদে মতলব'ঃ

খোদাপ্রাপ্তির পথে পীরের প্রতি মুরীদের চরম একাগ্রতা ও একনিষ্ঠতা থাকা প্রয়োজন। দেহ, মন, প্রাণ ও খেয়াল সবই পীরের দিকে মগ্ন রাখিতে হয়। এই পথে তৌহিদে-মতলব একান্ত প্রয়োজন। তৌহিদে মতলব তরিকতের একটি বিশেষ পরিভাষা। যাহার অর্থ-মুরীদকে নিজের পীর সম্পর্কে এইরূপ বিশ্বাস পোষণ করিতে হইবে যে, নিজ পীর ব্যতীত অন্য কেহই তাহাকে মাঞ্জিলে মাকছুদে পৌঁছাইয়া দিতে পারিবে। না। ইহা হইতে পারে যে নিজের পীর ছাড়াও আরোও অনেক কামেল আছেন। কিন্ত কখনও নিজের পীর ছাড়া অন্য দিকে দৃষ্টিপাত করা যাইবে না। খোদাপ্রাপ্তির পথে মরীদের ইহা খুবই দরকার। ইহা এক বিশেষ গুণ-যাহা মরীদকে পীরের তাইদ, মদদ, ফয়েজ ও নেছবত পাইতে সহায়তা করে।

বিজ্ঞাপন

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, হযরত গউস পাক আব্দুল কাদের জেলানী (রঃ) ছাহেবের খানকার সম্মুখ দিয়া একজন লোক প্রতিদিনই যাতায়াত করিত। কিন্তু যখনই সে দরবারের সামনে আসিত, তখনই সে তাঁহার রুমাল দ্বারা চেহারার একটি অংশ ঢাকিয়া অতঃপর পথ অতিক্রম করিত। হযরত গউসপাক আব্দুল কাদের জেলানী (রঃ) ছাহেব প্রায়ই এই দৃশ্য দেখিতেন। একদিন তিনি আপন হুজরার বারান্দায় বসিয়া আছেন। এমন সময় লক্ষ্য করিলেন, সেই লোকটি হুজরার সম্মুখস্থ রাস্তা অতিক্রম করিতেছে। রাস্তা অতিক্রম করিবার সময় তাহার চেহারার এক অংশ প্রতিদিনের মত রুমালে আবৃত। তিনি স্বীয় খাদেম পাঠাইয়া তাহাকে ডাকাইয়া আনিয়া খান্কার সামনের রাস্তা অতিক্রমের সময় রুমাল দ্বারা চেহারা আবৃত করণের কারণ জিজ্ঞাসা করিলেন।

লোকটি বলিলঃ আপনার খাল্কা হইতে একটু দূরেই আমার পীরের দরবার। আমি প্রতিদিন একবার পীরের দর্শনে যাই। কিন্তু যাতায়াতের একটিই রাস্তা যাহা আপনার খানকার সম্মুখ দিয়া চলিয়া গিয়াছে। ঠিক আপনার হুজরার সম্মুখ অংশ অতিক্রম করিবার সময় রুমালে চেহারা ঢাকিয়া দেই এই কারণে যে, আমি জানি আপনি গাউছুল আজম, বর্তমানে সমস্ত ওলী-আল্লাহদের ছর্দার। আপনার পবিত্র নূরানী চেহারার প্রতি দৃষ্টি পতিত হইলে আমার অন্তরে আপনার প্রতি মহব্বত সৃষ্টি হইতে পারে যাহা পরিণামে আমার পীরের প্রতি অভক্তি সৃষ্টির কারণ হইতে পারে। ফলে শয়তান আমাকে এই ধোকায় ফেলিতে পারে যে, তুমি গাউছুল আজমের মুরীদ না হইয়া একজন অখ্যাত পীরের মুরীদ হইয়া খুবই ভুল করিয়াছ। এই রকম অনুভূতি আমার দেলে পয়দা হইলে, আমার পীর আমার প্রতি অসন্তুষ্ট হইবেন। পীর নারাজ হইলে খোদাতায়ালাকে পাওয়া কখনও আমার পক্ষে সম্ভব হইবে না। অধিকন্ত তকদিরে পোকা ধরিবে, আমার ইহ ও পরকাল উভয়ই ধ্বংস হইবে।

লোকটির এহেন নির্ভীক জবাবে হযরত গউসপাক যারপরনাই প্রীত হইলেন এবং তাহার জন্য দু'আ করিয়া উপস্থিত সকলের উদ্দেশ্যেই বলিলেন, আপন পীরের প্রতি বিশ্বাস, ভক্তি, শ্রদ্ধা ও মহব্বত এমনই থাকা প্রয়োজন।

বিজ্ঞাপন

আপন পীরের প্রতি হযরত খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (রঃ) ছাহেবের ভক্তি, মহব্বত, ধারণা ও বিশ্বাস উক্ত লোকটির মতই ছিল। তাঁহার মন-প্রাণ, ধ্যান-চিন্তা সব সময়ই পীরের প্রতি নিবিষ্ট থাকিত।

একবারের একটি ঘটনা। হযরত খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (রঃ) ছাহেব আপন পীর হযরত আমীর কুলাল (রঃ) ছাহেবের দরবার অভিমুখে চলিতেছেন। তাহার মনপ্রাণ সবই পীরের প্রতি মগ্ন ছিল। তিনি এক মনে, এক ধ্যানে পথ চলিতেছেন। হঠাৎ একজন বৃদ্ধ ঘোড়-ছাওয়ারী তাহার পথ আটকাইয়া ধরিলেন। তিনি হযরত খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (রঃ) ছাহেবের সহিত কথা বলিতে চান। কিন্তু খাজা ছাহেব কথা বলিতে নারাজ। তিনি পাশ কাটিয়া আবার পথ চলিতে শুরু করিলেন। সেই বৃদ্ধ আবার তাঁহার পথ রোধ করিয়া দাঁড়াইলেন। এবারও হযরত খাজা বাহাউদ্দিন (রঃ) ছাহেব পাশ কাটিয়া চলিতে লাগিলেন। কিন্তু সেই বৃদ্ধ নাছোড় বান্দা। তিনি আবারও পথে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করিলেন। হযরত খাজা বাহাউদ্দিন (রঃ) ছাহেব ভাবগম্ভীর স্বরে বলিলেন, আমি আপনাকে চিনি। আপনি হযরত খিজির (আঃ)। কিন্তু আপনার সাথে কথা বলার অবকাশ আমার নাই। এই কথা বলিয়া তিনি আবার পথ চলিতে শুরু করিলেন। হযরত খিজির (আঃ) বেশ কিছু পথ খাজা বাহাউদ্দিন (রঃ) ছাহেবের পিছন পিছন আসিয়া অবশেষে চলিয়া গেলেন।

খাজা বাহাউদ্দিন নকশ্বন্দ (রঃ) ছাহেব স্বীয় পীরের দরবারে পৌঁছানো মাত্রই হযরত আমীর কুলাল (রঃ) ছাহেব রাগতঃ স্বরেই তাঁহাকে বলিলেন, "হে বাহাউদ্দিন! পথিমধ্যে হযরত খিজির (আঃ) তোমার সাথে কথা বলিতে ইচ্ছা করিলেন। কিন্তু তুমি তাঁহার প্রতি ভ্রুক্ষেপ করিলে না কেন?” জবাবে তিনি বলিলেন, "আমার মন-প্রাণ সবই পীরের প্রতিই মোতাওয়াজ্জুহ ছিল। তাঁহার প্রতি ভ্রুক্ষেপ করিবার ফুরসত আমার কোথায়?" হযরত আমীর কুলাল (রঃ) ছাহেব খাজা ছাহেবের উত্তরে খুবই সন্তুষ্ট হইলেন।

বিজ্ঞাপন

অন্যকে তালিম প্রদানে যোগ্যতা প্রাপ্তিঃ

হযরত খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (রঃ) ছাহেব আপন পীরকে যেমন নিজ প্রাণাপেক্ষা বেশী মহব্বত করিতেন, তেমনি খেদমতও করিতেন প্রচুর। তাঁহার পীর তাহার সুকঠিন ব্রত, খোদাপ্রাপ্তির দুঃসাধ্য সাধনা, অপরিসীম ত্যাগ-তিতিক্ষা, অনাহার অনিদ্রা দর্শনে অত্যন্ত প্রীত হন এবং কয়েক বছরের মধ্যেই নিরবচ্ছিন্ন তালিম প্রদান ও প্রতিপালনে তাহাকে খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞানের যোগ্য করিয়া তোলেন। অবশেষে এক শুভ মুহূর্তে নিজ দেলে সংরক্ষিত সমস্ত বাতেনী নেয়ামত খাজা বাহাউদ্দিন (রঃ) ছাহেবের দেলে প্রদান করিয়া বলেন, "হে বাহাউদ্দিন! মুরীদকে প্রশিক্ষণদান অন্তে নিজের দেওয়া তালিমের তাছির দেখিবার বাসনা অবশ্যই পীরের অন্তরে জাগে। তোমাকে বিগত কয়েক বছর যাবৎ তালিম বা শিক্ষা দিলাম। আজ তুমি অন্যকে তালিম প্রদানে যোগ্য। তোমার যোগ্যতা আমি পরীক্ষা করিয়া দেখিতে চাই। যদি কোনরূপ অপূর্ণতা থাকে-তাহা পূর্ণ করিয়া দেওয়া হইবে।" ইহা বলিয়া হযরত আমীর কুলাল (রঃ) ছাহেব স্বীয় পুত্র বোরহানউদ্দিনকে নিকটে ডাকিলেন। তাহাকে দেখাইয়া খাজা বাহাউদ্দিনকে বলিলেন, "বোরহানউদ্দিন আমার পুত্র। আজ পর্যন্ত আমি তাহার প্রতি তাওয়াজ্জুহ প্রদান করি নাই। অনা কেউও কোনরূপ তাওয়াজ্জুহ তাহাকে প্রদান করে নাই। তুমি তাহার প্রতি তাওয়াজ্জুহ প্রয়োগ কর। তাওয়াজ্জুয়ের প্রভাব দেখিয়া আমি তোমার তালিম প্রদানের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে বুঝিতে পারিব এবং তোমার তালিম প্রদানের ক্ষমতার উপর আমার পূর্ণ আস্থা জন্মিবে।"

হযরত খাজা বাহাউদ্দিন (রঃ) ছাহেব পীরের নির্দেশ প্রতিপালন করিলেন। তাওয়াজ্জুহ প্রয়োগ করিলেন পীরভাই বোরহানউদ্দিনের প্রতি। তৎক্ষণাৎ তাওয়াজ্জুয়ের প্রভাব পরিলক্ষিত হইল। পীরজাদা বোরহানউদ্দিনের দেল আল্লাহর মহব্বতে ভরিয়া গেল।

বিজ্ঞাপন

ইহা দেখিয়া হযরত আমীর কুলাল (রঃ) ছাহেব অত্যন্ত খুশী হইলেন এবং খাজা বাহাউদ্দিনকে উদ্দেশ্য করিয়া বলিলেন, "বাবা, বাহাউদ্দিন! তোমার বয়স তখন মাত্র কয়েকদিন। তোমার পিতামহ তোমাকে ক্রোড়ে করিয়া আমার পীর হযরত খাজা সাম্মাছি (রঃ) ছাহেবের সমীপে আনিলেন। তোমাকে দেখিয়াতো আমার পীর মহা খুশী। তোমাকে কোলে লইয়া তিনি আদর করিলেন, সোহাগ করিলেন এবং আমাকে নির্দেশ দিলেন, তোমার পরিণত বয়সে তোমাকে যেন আমি অত্যন্ত যত্ন সহকারে তালিম দেই এবং আমার দেলে সংরক্ষিত যাবতীয় বাতেনী নেয়ামত তোমাকে প্রদান করি। আমি আমার পীরের নির্দেশ যথাযথ পালন করিয়াছি। আমি অতি যত্নে তোমাকে প্রতিপালন করিয়াছি। যাহা কিছু বাতেনী জ্ঞান আমার নিকট ছিল-তাহা তোমাকে দান করিয়াছি।

তোমার জ্ঞান ধারণ ক্ষমতা আমাদের অনেকের চেয়েই বেশী। তোমার যোগ্যতা অতুলনীয়। আল্লাহপাক তোমাকে অতি উচ্চ মর্তবা দান করিবেন। তুমি তুর্কীস্থান, তাজাকিস্তান যেখানে যাহা কিছু পাও তাহা হাছিল করিতে চেষ্টা করিও। কোনরূপ গাফলতি যেন না হয়।" উপদেশ প্রদান করিয়া পীর ছাহেব খাজা বাহাউদ্দিন (রঃ) কে বিদায় দিলেন।

পীরের নির্দেশে আরও কতিপয় সাধকের কদমে খাজা বাহাউদ্দিন নকশ্বন্দ (রঃ) ছাহেবের কঠোর তপস্যা এবং উচ্চতর বাতেনী নেয়ামত প্রাপ্তিঃ

বিজ্ঞাপন

হযরত খাজা বাহাউদ্দিন নকশ্বন্দ (রঃ) ছাহেব আপন গৃহে চলিয়া আসিলেন। পীরের নির্দেশ বার বার স্মরণে পড়িতে লাগিল। পীর ছাহেব বলিয়াছেন তুর্কীস্থান, তাজাকিস্তান যেখানে যাহা পাও তাহা অর্জন কর। কিন্তু কোন্ দরবেশের সান্নিধ্যে যাইতে হইবে-তাহা তিনি বলেন নাই।

উক্ত চিন্তা করিতে করিতে একদা তাহার তন্দ্রা আসে। তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় তিনি স্বপ্নে দেখেন যে, তুর্কীস্থানের প্রথিতযশা ওলী হযরত হেকিম আনা (কুঃ) অপর একজন দরবেশসহ তশরিফ আনিয়াছেন। হযরত হেকিম আনা (কৃঃ) ছাহেব উক্ত দরবেশের নিকট তাঁহার সম্পর্কে সুপারিশ করিতেছেন। সফেদ পোশাক পরিহিত দরবেশের সৌম্য ও শান্ত চেহারা হইতে যেন নূরের ছটা বাহির হইতেছে। ইহা দেখিয়া নিদ্রাভঙ্গ হয়। তিনি তাহার পূণ্যময়ী দাদীমার নিকটে দৃষ্ট স্বপ্নের কথা খুলিয়া বলেন। দাদীমা তাৎপর্যবহ স্বপ্নের তাবিরে বলেন, "ইহার অর্থ হইতেছে এই যে, তুর্কীস্থানের মাশায়েখ হইতেও তোমার রূহানী ফয়েজ হাছিল হইবে।" তৎক্ষণাৎ পীরের উপদেশের কথা তাঁহার মনে পড়িল। পীর ছাহেবতো তাঁহাকে তুর্কীস্থান ও তাজাকিস্থানের কথাই বলিয়াছেন।

স্বপ্নে দৃষ্ট দরবেশের নূরানী চেহারা তাঁহার হৃদয়পটে ভাসিতেছে। তিনি বিভিন্ন জায়গাতে সেই দরবেশের খোঁজ করিতে থাকেন। একদা বোখারার কোন বাজারে কোন কাজে গমন করেন। প্রচন্ড ভীড়। এর মধ্যে তিনি। লক্ষ্য করেন, একজন ফকির বেশকিছু শিষ্যসহ সেই বাজার অতিক্রম করিতেছেন। ফকিরের চেহারা দেখিয়াই তাহার স্বপ্নে দৃষ্ট সেই দরবেশের কথা মনে পড়িল। ইনিতো সেই ব্যক্তি; সেই শুভ্র পোশাক, সুন্দর চেহারা, মাথায় পাগড়ী। স্বপ্নে দৃষ্ট দরবেশের সাথে তাঁহার কোন পার্থক্য নাই। হযরত খাজা বাহাউদ্দিন (রঃ) ছাহেব দরবেশের সাথে দেখা করিতে চেষ্টা করিলেন, কিন্তু লোকের প্রচন্ড ভীড়ের কারণে পারিলেন না। ভাবিলেন, কিছুক্ষণ বাদে ভীড় হ্রাস পাইলে তিনি দেখা করিবেন। অল্পক্ষণ পরেই একজন লোক আসিয়া হযরত খাজা বাহাউদ্দিন (রঃ) কে বলিলেন, "খলিল দরবেশ আপনাকে ডাকিতেছেন।" খাজা ছাহেব কিছু নজরানাসহ অত্যন্ত বিনয়ের সাথে খলিল দরবেশের সাথে দেখা করিলেন। বলিলেন, "হুজুর, আমি একটি স্বপ্নে দেখিয়াছি।" ইহা শুনিয়া দরবেশ ছাহেব মৃদু হাসিয়া বলিলেন, "বাবা, বলিতে হইবে না। আমি জানি।" অতঃপর হযরত খাজা বাহাউদ্দিন (রঃ) ছাহেব খলিল দরবেশের খেদমত করিতে লাগিলেন।

বিজ্ঞাপন

কয়েকদিন বাদে খলিল দরবেশ হযরত বাহাউদ্দিনকে না বলিয়া কোথায় যেন চলিয়া গেলেন। আর আসিলেন না। বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (রঃ) ছাহেব বহু খোঁজাখুজি করিলেন কিন্তু তাঁহাকে পাইলেন না। অতঃপর একদা খোঁজ পাইলেন যে, সেই খলিল দরবেশ এখন "মাঅরা উন্নাহারে।” তিনি সেখানকার বাদশাহ হইয়াছেন। হযরত খাজা বাহাউদ্দিন (রঃ) ছাহেব মঅরা উন্নাহারে যাইয়া শাসক ও দরবেশ হযরত খলিল (রঃ) ছাহেবের খেদমত করিতে লাগিলেন। একাধারে দীর্ঘ ছয় (৬) বছর তিনি সেই দরবেশের খেদমত করিলেন। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি দরবেশ ছাহেবের নিকট হইতে মারেফতের বহু সূক্ষ্ম বিষয়ক জ্ঞান অর্জন করিলেন। ছয় বছরের মধ্যে হযরত খলিল দরবেশ বহু বারই তাঁহাকে একটি উপদেশ প্রদান করিয়াছেন। বলিয়াছেন, 'যে ব্যক্তি শুধু মাত্র আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টির জন্যে খেদমত করে, তিনি মানুষের মধ্যে অত্যন্ত উচু মর্তবা হাছিল করিতে সক্ষম হন।"

ছয় বছর পরে হযরত খলিল দরবেশ তাঁহাকে বিদায় দিলেন। বলিলেন, "বাবা, বোখারাতে যাও।" বোখারায় আসিয়া হযরত খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (রঃ) আরও সাত বছর হযরত খাজা মাওলানা আরেফ ছাহেব (রঃ) ও হযরত শায়খ ফাতাহ (রঃ) ছাহেবের খেদমত করিলেন। উক্ত দুই সাধকের নিকট হইতেও তিনি কিছু বাতেনী নেয়ামত হাছিল করিলেন।

অতঃপর হযরত খলিল দরবেশের উপদেশ বারংবার তাঁহার হৃদয়পটে আল্লাহতায়ালার রেজামন্দীর উদ্দেশ্যে তাহার বান্দাগণের খেদমত করে, ভাসিয়া উঠিল। দরবেশ ছাহেব বলিতেন, যে ব্যক্তি শুধুমাত্র তিনি মানুষের মধ্যে অতি উচু মর্তবা অর্জন করিতে সক্ষম হন। তাই হযরত খাজা বাহাউদ্দিন (রঃ) ছাহেব বিভিন্ন খানকায় ও বোখারার বিভিন্ন মাদ্রাসায় প্রয়োজনীয় পানি সরবরাহ করিতেন, যাহাতে তালেবে মাওলাদের পানির অভাবে কষ্ট না হয়। কখনও কখনও তিনি টয়লেট (পায়খানা) সাফ করিতেন। এই দীর্ঘ সাধনার পর তাহার উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয়, খোদাতায়ালার রেজামন্দী হাছিল করিতে তিনি সক্ষম হন।

বিজ্ঞাপন

উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য একটি সহজ ও আসান তরিকা প্রাপ্তিঃ

হযরত খাজা বাহাউদ্দিন নকশ্বন্দ (রঃ) ছাহেব নির্জনে বসিয়া ভাবেনঃ খোদাতায়ালার সন্তুষ্টি অর্জন করিতে, খোদাতায়ালার পরিচয় জ্ঞান লাভকরিতে তাঁহার সময় লাগিল দীর্ঘ পঞ্চাশ বছর। এতকাল ব্যাপী কি কঠিন তপস্যাই না তাঁহাকে করিতে হইল। বছরের পর বছর আহার-নিদ্রা-বিশ্রাম ত্যাগ করিয়া খোদাপ্রাপ্তির এই দুর্গম পথে চলিতে হইয়াছে। অবশেষে খোদাতায়ালার কৃপা হয় তাঁহার প্রতি। খোদা তাঁহাকে নিজ সান্নিধ্য দান করেন, মারেফাত জ্ঞানে ভূষিত করেন। হযরত খাজা বাহাউদ্দিন (রঃ) ছাহেব ভাবেন যে, খোদাতায়ালাকে চিনিতে, খোদাতায়ালার মারেফাত জ্ঞান অর্জন করিতে যদি এত দীর্ঘ দুঃসাধ্য সাধনার প্রয়োজন হয়, এত ত্যাগ-তিতিক্ষার দরকার হয়, এত অমানুষিক খাটুনির প্রয়োজন হয়, তাহা হইলে কে খোদাতায়ালাকে চিনিতে আগ্রহ প্রকাশ করিবে? দিনে দিনে খোদাতালাশীদের সংখ্যা কমিতে থাকিবে। হয়তো এক পর্যায়ে আল্লাহ প্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞান অর্জনের জন্য কোন তালেবই আর খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে না।

আল্লাহপাক মানুষ সৃষ্টি করিয়াছেন তাহার পরিচয় গ্রহীতা হিসেবে। কিন্তু পরিচয় গ্রহণের শর্ত যদি এত কঠিন হয়, তাহা হইলে জ্ঞানের দফতরে মারেফাত বা পরিচয় জ্ঞান বলিয়া আর কিছুই থাকিবে না। অদূর ভবিষ্যতে আর আল্লাহওয়ালা লোেক হিসেবে কাহাকেও খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে না। ইহাতে ক্ষতিগ্রস্থ হইবে মানুষই। কেননা আল্লাহর ইবাদত করিবার জন্য তাহার পরিচয় জ্ঞানও প্রয়োজন। পরিচয় গ্রহীতা ও ইবাদতকারী হিসাবে সৃষ্টি করা হইয়াছে মানব সমাজকে। মানুষ যদি ইবাদত না করে, যদি খোদাতায়ালার পরিচয় জ্ঞান অর্জন না করে, তাহা হইলে সেইতো ক্ষতিগ্রস্থ হইবে, সেইতো ভয়াবহ পরিণতির দিকে আগাইয়া যাইবে। আল্লাহপাক পরমুখাপেক্ষীহীন। কেউ তাহার পরিচয় গ্রহণ করুক, আর নাই করুক; কেউ তাহার ইবাদত করুক, আর নাই করুক, তাহাতে তাঁহার কিছুই আসে যায় না।

বিজ্ঞাপন

উক্তরূপ চিন্তায় তিনি পেরেশান হন। ধীরে ধীরে দুর্বল হইয়া পড়েন। তিনি মনস্থ করেন যে, খোদাতায়ালার নিকট উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য একটি সহজ ও আসান তরিকা প্রার্থনা করিবেন-যে তরিকা পদ্ধতিতে অল্প সময় সাধনা করিয়া খোদাতায়ালার মারেফাত জ্ঞান অর্জন করা যাইবে; যে তরিকায় দাখিল হইলে কেহ আর বঞ্চিত হইবে না।

হযরত খাজা বাহাউদ্দিন (রঃ) ছাহেব সেজদায় লুটাইয়া পড়িলেন। উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য একটি আসান তরিকার আশায় খোদাতায়ালার মহান দরবারে দেলের ঝুলা পাতিলেন। খোদাতায়ালাকে বলিলেন, "হে পাক পরোয়ারদিগার! এই মিছকীনকে তুমি এমন এক সহজ ও আসান তরিকা দান কর, যে তরিকায় দাখিল হওয়ার পরে কেহ আর বঞ্চিত হইবে না; যে তরিকাতে অল্প শ্রমে অধিক ফল লাভ করা যাইবে।" সেজদায় পড়িয়া অঝরে কাঁদিতে লাগিলেন, সেজদার স্থান চোখের পানিতে ভিজিতে লাগিল। এক দিন, দুই দিন, তিন দিন, চার দিন অতিবাহিত হইল। কোন সাড়াশব্দ নাই। তিনি শুধুমাত্র নামাজের সময় নামাজ পড়েন, আর বাকী সময় সেজদায় খোদাতায়ালার শাহী দরবারে ক্রন্দন করেন। আহার নাই। নিদ্রা নাই। বিশ্রাম নাই। আগত মেহমানদের সাথে কথাবার্তা নাই। নির্জনে, নিভৃতে সেজদারত অবস্থায় শুধু ক্রন্দন; শুধুই কান্দাকাটি। তবুও খোদাতায়ালার দিক থেকে কোন উত্তর নাই। তিনি ভাবিলেন, যদি আসান তরিকা খোদাতায়ালা না-ই দেন, তাহা হইলে সেজদাতেই নিজের প্রাণ খোদাতায়ালার হাতে সোপর্দ করিবেন, তথাপিও সহজ তরিকা না লইয়া তিনি মাথা উঠাইবেন না।

উম্মতে মুহাম্মদীর জন্যে তাঁহার এই ব্যাকুলতা ছিল হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর মতই। আল্লাহতায়ালা দয়াল নবী (সাঃ) কে মেরাজ দান করিলেন, নিজের দীদার দান করিলেন, সমুদয় সৃষ্টি জগত দেখাইলেন। অতঃপর তাহাকে দুনিয়ায় পাঠাইয়া দিলেন। কিন্তু দুনিয়ায় আসিয়া রাসূলে পাক (সাঃ) তাঁহার প্রেমাস্পদ উম্মতের জন্য অঝরে কাঁদিতে লাগিলেন। ক্রন্দনের কারণ জিজ্ঞাসা করায় তিনি আল্লাহতায়ালাকে বলিলেন, হে খোদা! তুমি আমাকে এমন নেয়ামত দান করিয়াছ যাহা ইতিপূর্বে কোন পয়গম্বরকেও দান কর নাই, আমি ইহাতে অতিশয় খুশী। কিন্তু আমি কাঁদিতেছি আমার উম্মতের জন্য। আমি যে নেয়ামত পাইলাম, তাহারা তো সেই নেয়ামত থেকে বঞ্চিত হইবে। রাসূলে পাক (সাঃ)-এর ক্রন্দনে আল্লাহতায়ালা দয়া পরবশ হইয়া উম্মতে মুহাম্মদীকে সেই মেরাজ দিলেন। সেই মেরাজ পাওয়া যায় নামাজের মধ্যে। হাদীসে প্রকাশ,

বিজ্ঞাপন

الصلوةُ مِعْرَاجُ الْمُؤْمِنِينَ

অর্থাৎ-নামাজ মোমেনের জন্য মেরাজ।

উম্মতে মুহাম্মদীর ভাগ্যে যাহাতে মেরাজ নসিব হয়, সেই উদ্দেশ্যেই রাসূলে পাক (সাঃ) কত চোখের পানি ফেলিলেন। অথচ সেই মেরাজ বা খোদাতায়ালার দীদার লাভ বা সান্নিধ্য অর্জনের শর্ত কত কঠিন। এই মেরাজ অর্জনে হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেবকে চল্লিশ বছর, হযরত গউস পাক (রঃ) ছাহেবকে পয়তাল্লিশ (৪৫) বছর, হযরত আমীর কুলাল (রঃ) ছাহেবকে পয়ত্রিশ (৩৫) বছর, হযরত বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (রঃ) ছাহেবকে দীর্ঘ পঞ্চাশ (৫০) বছর কি কঠিন শ্রম ও অপরিসীম ত্যাগ-তিতিক্ষাই না করিতে হইল। রাসূলে পাক (সাঃ) কাঁদিয়াছিলেন উম্মতে মুহাম্মদীর মেরাজের বা দীদারের জন্য, আর হযরত বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (রঃ) ছাহেব সেই মেরাজ লাভের জন্য একটি সহজ ও আসান তরিকার আশায় সেজদায় পড়িয়া অঝরে কাঁদিতেছেন। দিন যায়, রাত যায়। একদিন, দুইদিন করিতে করিতে দশ দিন চলিয়া গেল। কিন্তু মহান খোদাতায়ালার তরফ থেকে কোন সাড়া শব্দ আসে না। দশম দিনের পর হইতে আল্লাহতায়ালা শুধু মাঝে মাঝে এলহাম পাঠান। বলেন, হে বাহাউদ্দিন (রঃ)! আমি যেইরূপ চাই, তুমি সেইরূপ তরিকা গ্রহণ কর। হযরত খাজা বাহাউদ্দিন (রঃ) ছাহেব বলেন, "হে মহান খোদাতায়ালা! তোমার বান্দা বাহাউদ্দিন যেইরূপ আসান তরিকা চায়, তাহাকে সেইরূপ তরিকা দান কর।"

হযরত খাজা বাহাউদ্দিন (রঃ) ছাহেব এই রূপে ১৫ দিন একটানা সেজদায় পড়িয়া সহজ তরিকা লাভের আশায় কাঁদিলেন। অবশেষে বাহাউদ্দিনের ক্রন্দনে আল্লাহর রহমতের দরিয়ায় তুফান উঠিল। আল্লাহ পাক কৃপা নজরে তাঁহার দিকে তাকাইলেন। বলিলেন, "হে বাহাউদ্দিন! তোমাকে সহজ তরিকা দেওয়া হইল। তুমি যেইরূপ চাহিয়াছিলে সেই রূপ আসান তরিকাই তোমাকে দেওয়া হইল। সে তরিকায় দাখিল হইলে কেহ আর মাহরুম (বঞ্চিত) হইবে না।"

প্রাপ্ত আসান তরিকার বৈশিষ্ট্যঃ

আল্লাহপাক আসান ও সহজ তরিকার বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বাহাউদ্দিন (রঃ) ছাহেবকে বলিলেনঃ "মানবদেহ দশ লতিফার সমন্বয়ে গঠিত। লতিফাগুলি হইল-কালব, রূহ, ছের, খফি, আখফা, আব, আতস, খাক, বাদ ও নাফস। ইহার মধ্যে পাঁচটি অর্থাৎ কালব, রূহ, ছের, খফি ও আখফা আলমে আমর বা হুকুমের জগত বা নূরময় জগতের। আর বাকী পাঁচটি অর্থাৎ আব, আতস, খাক, বাদ ও নাফস আলমে খাল্ক বা জড় জগতের। আলমে আমরের লতিফাসমূহ নূরানী। ইহারা নূর দ্বারা তৈরী। অপর দিকে আলমে খালকের লতিফা সমূহ অন্ধকারাচ্ছন্ন। ইহারা অন্ধকারে সৃষ্ট।"

অতঃপর আল্লাহপাক বলিলেন, "পূর্ববর্তী বুজুর্গগণ আলমে খাল্ক হইতে মারেফাত চর্চা শুরু করিতেন। তাহারা প্রথমে নাফসের পরিশুদ্ধি অর্জনে চেষ্টা করিতেন। কিন্তু নাফস অন্ধকারে সৃষ্ট। নাফসের স্বভাবও অন্ধকারাচ্ছন্ন। যাবতীয় কুচিন্তা ও কু-কর্মের উৎস এই নাফস। দুনিয়ার সাথে নাফসের গাঢ় সম্পর্ক। লতিফায়ে নাফস হইতে মারেফাত চর্চা শুরু করায় তাহাদেরকে প্রথমেই দুনিয়ার সাথে পরিপূর্ণরূপে সম্পর্ক ছিন্ন করিতে হইত। যেহেতু নাফস সর্বাধিক জুলমতপূর্ণ লতিফা এবং যাবতীয় দোষ ত্রুটি ও অপবিত্রতার আকর-তাই ইহার পরিশুদ্ধি যেমন কঠোর সাধনা সাপেক্ষ, তেমনি সময় সাপেক্ষ। তোমাকে এই পদ্ধতি অবলম্বন করিতে হইবে না।"

অতঃপর বলিলেন, "তুমি কাজ শুরু করিবে আলমে আমর হইতে। আলমে আমরের লতিফা-লতিফায়ে কালবের পরিশুদ্ধিই প্রথম করিবে। কালব নূরময় জগতের উপাদান। তাই জেকেরে কালবী প্রথমে হাছিল করিতে পারিলে অতি সহজেই খোদাতালাশীর বাতেন নূরানী হইয়া উঠিবে। এই ভাবে যখনই তালেবে মাওলাদের দেলে আল্লাহ পাকের মহব্বতের নূর জ্বলিয়া উঠিবে, তৎক্ষণাৎ আপনা আপনি গায়রুল্লাহ অর্থাৎ আল্লাহ ভিন্ন অপরাপর সবকিছুর মহব্বত বা আকর্ষণ দেল হইতে চলিয়া যাইবে। ফলে মাঞ্জিলে মাকছুদে পৌছিবার পথ অনেক সহজ হইয়া যাইবে।"

হযরত খাজা বাহাউদ্দিন (রঃ) ছাহেবের মাকছুদ পূর্ণ হইল। উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য আসান তরিকা তিনি পাইলেন। সেজদা হইতে মাথা উঠাইয়া তিনি অনেকক্ষণ অঝরে কাঁদিলেন। অতঃপর হযরত খাজা বাহাউদ্দিন (রঃ) ছাহেবের প্রতি নির্দেশ আসিল আল্লাহপ্রদত্ত সহজ ও আসান তরিকার মাধ্যমে পথহারা, আল্লাহভোলা মানব সমাজকে হেদায়েত করিবার জন্য।

প্রাপ্ত সহজ ও আসান তরিকার ব্যাপক প্রচারঃ

হযরত খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (রঃ) ছাহেব প্রাপ্ত আসান তরিকার মাধ্যমে খোদাতায়ালার দিকে মানব সমাজকে আহবান করিলেন। তাঁহার আহবানে যথেষ্ট সাড়া পাওয়া গেল। দলে দলে তালেবে মাওলাগণ ভীড় করিল। তিনি তাহাদের মধ্যে নতুন তরিকার সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয় বিশ্লেষণ করেন, এই তরিকা পদ্ধতিতে তাহাদেরকে তালিম দেন, তরবিয়ত করেন। তাঁহার শক্তিশালী তাওয়াজ্জুয়ে এত্তেহাদীর বলে আগত খোদাতালাশীদের জেকেরে কালবী হাছিল হইত; দেল চৌদ্দই রাত্রির পূর্ণিমার চাঁদের মত উজ্জল হইত।

তিনি নিজ তরিকা সম্পর্কে বলিতেন, "আমি এমন এক তরিকা আল্লাহর নিকট হইতে প্রাপ্ত হইয়াছি-যে তরিকায় আল্লাহতায়ালার সহিত মিলন অনিবার্য। তিনি বলিতেন, "রাসূলে পাক (সাঃ) এর অনুসরণ এবং সাহাবায়ে কেরামদের জীবনাদর্শ ও কার্য প্রণালী বাস্তবায়ন ও প্রতিফলনের উপর আমার তরিকার ভিত্তি।" তিনি আরও বলিতেন, "আল্লাহতায়ালার অতি বৃহৎ ফজল আমার নছিব হইয়াছে। নিজস্ব আমল দ্বারা আমি কিছুই পাই নাই। প্রারম্ভে এবং শেষে আমি শুধুমাত্র আল্লাহতায়ালার ফজলই দেখিয়াছি।"

ধীরে ধীরে দিক-বিদিক এই নব তরিকার আলো ছড়াইয়া পড়িল। বোখারাস্থিত হযরত খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (রঃ) ছাহেবের দরবারে সব সময়ই মৌমাছির মত খোদাতালাশীদের ভীড় থাকিত। তিনি অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে তাহাদেরকে প্রশিক্ষণ দিতেন, আল্লাহ রাসূলের প্রেমের শরাব পান করাইতেন।

তিনি বলিতেন, এই তরিকার বিশেষত্ব এই যে, একই সাথে মানুষের 'জাহের' দুনিয়ার সংগে এবং 'বাতেন' আল্লাহপাকের স্মরণে মশগুল থাকে।

দিকে দিকে হযরত খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (রঃ) ছাহেবের খ্যাতি বা প্রসিদ্ধি ছড়াইয়া পড়ে। হাজার হাজার, লাখ লাখ খোদাতালাশী ব্যক্তিবর্গ তাঁহার তাওয়াজ্জুয়ে এত্তেহাদীতে খোদামুখী হয়, জেকেরে কালবী বুঝিতে পারে। খোদাতায়ালার প্রেম সাগরে সন্তরণ করিতে সক্ষম হয়।

খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (রঃ) ছাহেবের সংসার ধর্ম পালনঃ

হযরত খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (রঃ) ছাহেব যে সংসার বিরাগী সাধক ছিলেন তাহা নয়, তিনি সংসার ধর্ম পালন করেন। তাহার একাধিক সন্তানাদিও ছিল। বয়ঃজ্যেষ্ঠ সন্তান ছিল মেয়ে। তাঁহার তরিকা প্রচার জীবনের মাঝা মাঝি পর্যায়ে তদীয় মেয়ে বিবাহ উপযুক্ত হন। তিনি তাহার পূণ্যবতী মেয়েকে বোখারাস্থিত এক ধর্মপরায়ণ ও পরহেজগার যুবকের সাথে বিবাহ দেন। যুবকের নাম আলাউদ্দিন। বিবাহের পরে জামাতা আলাউদ্দিনকে তিনি নিজ সান্নিধ্যে রাখিয়া অত্যন্ত যত্নের সাথে তালিম বা খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞান শিক্ষা দেন। পরবর্তীতে এই যুবক আলাউদ্দিনই হযরত খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (রঃ) ছাহেবের আত্মিক উত্তরাধিকার লাভ করেন। তিনিই আলাউদ্দিন আত্তার নামে পরিচিত। হযরত খাজা নকশবন্দ (রঃ) ছাহেবের অবর্তমানে তিনিই নকশবন্দীয়া তরিকাকে দেশে-বিদেশে প্রচার করেন। তাঁহার দ্বারাই এই তরিকা ব্যাপক প্রসিদ্ধি লাভ করে।

হযরত খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (রঃ) ছাহেব জীবনে দুইবার হজ্জ পালন করেন। জ্যেষ্ঠ কন্যার বিবাহ দেওয়ার পরে প্রথমে তিনি হজ্জের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। তাঁহার কাফেলা বেশ কয়েকদিন পথ চলিবার পরে পবিত্র মক্কা নগরীতে উপস্থিত হয়।

হজ্জ শুরু হইলে তিনি একে একে হজ্জের সকল পর্ব বা আচার-অনুষ্ঠান সম্পন্ন করেন। অতঃপর সকলের সাথে তিনিও আরাফাতের মাঠে উপস্থিত হন। হজ্জের শেষ পর্বে কোরবানী করিতে হয়। সকলেই পশু কোরবানী করিতে লাগিল। হযরত খাজা বাহাউদ্দিন (রঃ) চিন্তা করিতে লাগিলেন। তিনি ভাবিলেন, খোদার রাস্তায় হযরত ইব্রাহিম (আঃ) তাঁহার প্রাণপ্রিয় পুত্র হযরত ইসমাইল (আঃ) কে কোরবানী করিয়াছিলেন। হযরত ইসমাইল (আঃ)-ই ছিলেন তাঁহার নিকট অধিক প্রিয়। তিনিও ভাবিতে লাগিলেন, কোন বস্তু তাহার নিকট বেশী প্রিয়। চিন্তা করিয়া দেখিলেন যে, তাহার কনিষ্ঠ পুত্র, ছোট ছাহেবজাদার প্রতি তাঁহার হৃদয়ের আকর্ষণ সব কিছুর চাইতে বেশী। তিনি সেই আরাফাতের মাঠে খোদাতায়ালার শাহী দরবারে হাত তুলিয়া বলিলেন, "হে খোদা! আজকের এই পবিত্র দিনে আমার ছোট বাচ্চাকেই তোমার রাহে কোরবানী করিলাম।" আল্লাহতায়ালা তাহার কোরবানী কবুল করিলেন। ঐ দিনই বোখারাস্থিত খানকায় তাহার ছোট ছেলে প্রাণ ত্যাগ করেন। হজ্ব সমাপনান্তে দেশে আসিয়া তিনি তাঁহার পুত্রের প্রাণ বিয়োগের কথা শুনিতে পান।

হযরত খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (রঃ) ছাহেব দুনিয়া ত্যাগের কিছুদিন পূর্বে আবার হজ্জ্ব সমাপনের উদ্দেশ্যে মক্কায় যান। দ্বিতীয়বার হজ্জ্ব সমাপনান্তে গৃহে আসিবার কয়েকদিন পর লক্ষ লক্ষ মুরীদান ও আশেকানদের শোক সাগরে ভাসাইয়া দারুল বাকায় চলিয়া যান। সেই দিন ছিল ৭৯১ হিজরীর ৩-রা রবিউল আউয়াল। তাহার পবিত্র মাজার বোখারাতে অবস্থিত।

খাজা বাহাউদ্দিন নকশ্বন্দ (রঃ) ছাহেবের সুযোগ্য তিন জন খলিফাঃ

মহান সাধক, নব তরিকার প্রবর্তক হযরত খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (রঃ) ছাহেব বিশিষ্ট তিন জন আত্মিক উত্তরাধিকারী রাখিয়া যান, যাহারা তাঁহার অবর্তমানে নকশবন্দীয়া তরিকার ধারাকে আরও গতিশীল করেন, প্রাণ বন্ত করেন। সাধক তিনজন হইলেনঃ

  • জামাতা হযরত আলাউদ্দিন আত্তার (রঃ)-যিনি প্রধান খলিফা ছিলেন।

  • হযরত খাজা মুহাম্মদ পারসা (রঃ) ছাহেব। এবং

  • হযরত ইয়াকুব চরখী (রঃ) ছাহেব।

  • খাজা বাহাউদ্দিন নকশ্বন্দ (রঃ) ছাহেব আসল মারেফাতে ভূষিত ছিলেনঃ

    আল্লাহপাক পরিপূর্ণ বা পূর্ণাংগ মারেফাত দান করেন তাহার পেয়ারা হাবিব (সাঃ) কে। রাসূলে পাক (সাঃ) এর পবিত্র নেছবতে কতিপয় সাহাবা সেই পরিপূর্ণ মারেফাত অর্জন করেন। ইহার পর হাজার বছরের মধ্যে আর কেহই মারেফাতের সেই চুড়ান্ত সীমায় পৌঁছাইতে পারেন নাই। হাজার বছর অন্তে হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবকে পুনরায় সেই মারেফাতে ভূষিত করা হয়। তবে এই হাজার বছরের মধ্যে দু-চারজন সাধক মূল মারেফাত কারখানাতে বিচরণ করিয়াছেন এবং প্রধান কারখানার কিছু কিছু জ্ঞান আহরণ করিয়াছেন। যে দুই-চার জন সাধক বেলায়েতে কোবরার মারেফাত অর্জন করিয়াছেন বা মারেফাতের প্রধান কারখানাতে প্রবেশ করিয়া কারখানাস্থিত আসল মারেফাতে ভূষিত হইয়াছেন-তাহাদের মধ্যে হযরত খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (রঃ) ছাহেব অন্যতম।

    পূর্ববর্তী ওলী-আল্লাহদের মধ্যে দুই-চারজন বাদে সকলেই তাহাদের মারেফাত শেষ করিয়াছেন বেলায়েতে ছোগরায়। কেন তাঁহারা বেলায়েতে ছোগরাতে থাকিয়া গেলেন? উত্তরে বলা যায়ঃ খোদাপ্রাপ্তির এই রাস্তা মানবদেহের সাত লতিফার সংখ্যানুযায়ী সাত কদম মাত্র। সাত কদমের দুই কদম আলমে খালক বা স্থূল জগতের সাথে সম্পর্কিত। বাকী পাঁচ কদম আলমে আমর বা সূক্ষ্ম জগতের সাথে সম্পর্কিত। প্রথম দুই কদমের সম্পর্ক নাফস ও দেহের সাথে। পরবর্তী পাঁচ কদমের সম্পর্ক কালব, রূহ, ছের, খফি ও আফ্ফার সাথে।

    পূর্ববর্তী ওলী-আল্লাহ সকল তাঁহাদের মারেফাত চর্চা শুরু করিতেন আলমে খালকের প্রথম কদম লতিফায়ে নাফস হইতে। নাফস ও দেহ -উভয়ই জুলমতপূর্ণ। নাফস ও দেহের স্বভাবও তাই অন্ধকারাচ্ছন্ন। যাবতীয় দোষত্রুটি, কুচিন্তা ও কু-কর্মের আকর যেমন নাফস, তেমনি জড় দেহের স্বভাবও দোষ ত্রুটিপূর্ণ। আর তাই আলমে খালকের এই দুই কদম অতিক্রম করিতে যেমন শ্রমের প্রয়োজন, তেমনি সময়ের দরকার। পূর্ববর্তী সাধকবর্গ লতিফায়ে নাফস হইতে যাত্রা শুরু করিতেন বিধায় তাঁহাদেরকে জড়মুখী এই দুই লতিফাকে পরিস্কার করিতে বা নাফসের শৃংখলমুক্ত হইতে এবং দেহসত্তার মোহমুক্ত বা আকর্ষণ মুক্ত হইতে কঠিন রেয়াযতের সাথে প্রচুর সময়ও দিতে হইত। ত্রিশ, চল্লিশ বছর সাধনান্তে তাহারা ততীয় কদম বা আলমে আমরের প্রথম দরজা লতিফায়ে কালবে পৌছাইতেন। অতঃপর আরও কিছু কাল সাধনা করিয়া তাহারা কালবের মূলের মূল তাজাল্লীয়াতে আফয়ালে পৌঁছাইতেন। তাজানীয়াতে আফয়াল বেলায়েতে ছোগরার জগতে বর্তমান। এই বেলায়েতে ছোগরা বা প্রতিবিম্বের দায়েরায় পৌঁছাইয়া তাঁহারা মারেফাত সাধনায় ক্ষান্ত হইতেন।

    কিন্তু হযরত খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (রঃ) ছাহেবকে মহান খোদাতায়ালা দয়া করিয়া যে আসান তরিকা প্রদান করেন, সেই তরিকাতে মারেফাতের চর্চা শুরুই হয় তৃতীয় কদম বা আলমে আমরের প্রথম লতিফা-লতিফায়ে কালব হইতে। লতিফায়ে কালব নূরময় জগতের উপাদান। যদিও নাফসের সংস্পর্শে আসাতে কালবের উপর গোনাহের মরিচা পড়িয়া তাহা অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়, তথাপিও পীরে কামেলের শাহাদাত অংগুলির স্পর্শে সহজেই কালবে নূর আসে, জেকেরে কালবী হাছিল হয়। ফলে মুরীদের দেলে জযবা পয়দা হয়, খোদাতায়ালার মহব্বত সৃষ্টি হয়। সাথে সাথে গায়রুল্লাহর মহব্বত দেল হইতে অপসারিত হয়। ফলে কালবের ছাফাই এবং নাফসের শোধন-একই সাথে সম্পন্ন হয়। নাফস ও দেহ সত্তার পরিশুদ্ধির জন্য পৃথক ভাবে দীর্ঘ সময় ব্যাপী আর কঠিন ব্রত বা পরিশ্রমের প্রয়োজন হয় না। লতিফায়ে কালব হইতে যাত্রা শুরু করায় এই নকশবন্দিয়া তরিকায় কিঞ্চিৎ সাধনান্তে প্রথমেই তাজাল্লীয়াতে আয়ালের সাথে ছালেক পরিচিত হয়। এই কারণেই হযরত খাজা বাহাউদ্দিন (রঃ) ছাহেব বলিতেন, হকের মারেফাত বাহাউদ্দিনের জন্য হারাম যদি হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) এর শেষ অবস্থা আমার প্রারম্ভে অর্জিত না হয়। তিনি আরও বলিতেন, আমি শেষ বস্তুকে প্রথমেই প্রবেশ করাই।

    অবশ্য ইহা ছিল হযরত খাজা বাহাউদ্দিন (রঃ) ছাহেবের প্রতি খোদাতায়ালার মহা দান। তিনি যে উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য একটি আসান তরিকার আশায় একাধারে ১৫ দিন সেজদায় পড়িয়া অঝরে কাঁদিয়াছিলেন, তাহার বিনিময়ে উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য এই বিশেষ নেয়ামত আল্লাহতায়ালা তাঁহার মাধ্যমে দান করিয়াছেন।

    তাহা ছাড়া চেষ্টা-সাধনা, মুরাকাবা, মোজাহাদা ও মুশাহেদার মাধ্যমে বেলায়েতে ছোগরার উপরে যাওয়া কোন ছালেকের পক্ষেই সম্ভব নয়। ইহার ঊর্ধ্বে যাওয়ার জন্য প্রয়োজন শুধুমাত্র আল্লাহতায়ালার ফজল বা অনুকম্পা-যে অনুকম্পা বা দয়া আসিয়াছিল হযরত খাজা বাহাউদ্দিন (রঃ) ছাহেবের প্রতি। তাই তিনি বলিলেন, "নিজের আমল দ্বারা আমি কিছুই পাই নাই। শুরুতে এবং শেষে আমি শুধুমাত্র আল্লাহপাকের ফজল বা অনুস্পাই দেখিয়াছি।"

    আল্লাহতায়ালার অনুকম্পা বা দয়া গুণে হযরত বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (রঃ) ছাহেব বেলায়েতে ছোগরা অতিক্রম করিয়া মূল মারেফাত কারখানাতে প্রবেশ করেন এবং কারখানার কেন্দ্র হকিকতে মুহাম্মদীতেও ছায়ের করেন। সেখানে হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেব পৌঁৗছিবার ঐকান্তিক চেষ্টা করিয়াছিলেন বটে কিন্তু মহান খোদাতায়ালার অনুমোদন পান নাই। হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেবের জীবনী আলোচনায় ইহার বিশ্লেষণ করা হইয়াছে

    হযরত খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (রঃ) ছাহেব এই প্রসংগে বলেন, "হযরত শায়খ জোনায়েদ বোগদাদী (রঃ), হযরত শায়খ শিবলী (রঃ), হযরত শায়খ মনসুর হাল্লাজ (রঃ) এবং হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেব যে সমস্ত মাকাম ছায়ের করিয়াছেন-আমিও ঐ সমস্ত মাকাম ছায়ের করিয়াছি। তাহারা যে যে স্থান পর্যন্ত গমন করিয়াছেন, আমিও ঐ পর্যন্ত গিয়াছি। একবার এক আলীশান (বিশাল) নূরময় মাকাম পর্যন্ত উপস্থিত হইলাম। জানিতে পারিলাম, ইহা দরবারে মুহাম্মদী (সাঃ)। হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেব উক্ত মাকাম ছায়ের করিবার জন্য বেচয়েন বা বেকারার হইয়া পড়িলেন। কিন্তু তাহাকে অনুমতি দেওয়া হইল না। আমি তাঁহার মত উক্ত মাকাম ছায়ের করিবার জন্য ব্যতিব্যস্ত না হইয়া আল্লাহর ইচ্ছার প্রতি নিজেকে পূর্ণরূপে সমর্পণ করিলাম। ফলে আমাকে উক্ত মাকাম ছায়ের করাইয়া ধন্য করা হইল।"

    পূর্ববর্তী কালে একজন খোদাঅন্বেষীকে একাধিক সাধকের খেদমত করিতে হইত; কিন্তু বর্তমানে তাহা করিতে হয় না-কেন?

    তোমরা দেখিয়াছ, হযরত খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (রঃ) ছাহেব খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞান হাছিলের জন্য বেশ কয়েকজন সাধকের খেদমত করিয়াছেন। হযরত খাজা সামম্মাছি (রঃ), হযরত আমির কুলাল (রঃ) ছাহেব, হযরত খলিল দরবেশ (রঃ) ছাহেব, হযরত মাওলানা আরেফ (রঃ) ছাহেব, হযরত শায়খ ফাতাহ (রঃ) ছাহেব -সকলেই হযরত খাজা বাহাউদ্দিন (রঃ) ছাহেবের পীর বা মোর্শেদ ছিলেন।

    তেমনি হাজারী মুজাদ্দেদ (রাঃ) ছাহেবেরও বেশ কয়েকজন আধ্যাত্মিক গুরু ছিলেন। যেমন, পিতা হযরত আব্দুল আহাদ (রঃ), হযরত শাহ কামাল কায়থেলী (রঃ), হযরত খাজা বাকীবিল্লাহ (রাঃ) ছাহেব প্রমুখ। তিনি পৃথক পৃথক ভাবে সবগুলি তরিকার তথা কাদেরীয়া, চিন্তিয়া, কুবরাবিয়া, সোহওয়াদ্দিয়া, নকশবন্দীয়া তরিকার নেছবত ও কামালিয়াত হাছিল করেন। অতঃপর রাসূলে পাক (সাঃ) এর খাছ নেছবত প্রাপ্ত হন এবং আল্লাহতায়ালার ফজলে মারেফাতের শেষ সীমা বা হোব্বে সেরফা ও মাবুদিয়াতে সেরফা পর্যন্ত পৌছান। অতঃপর সবগুলি তরিকার সমন্বরে এক নব তরিকার প্রবর্তন করেন। ইহাই খাছ মুজাদ্দেদীয়া তরিকা। ইহা নকশবন্দীয়া-মুজাদ্দেদীয়া তরিকা নামে খ্যাত। ইহা পূর্বেও বলা হইয়াছে। ফলে হাজারী মুজাদ্দেদ (রাঃ) ছাহেবের পর হইতে পরবর্তী সময়ে যাহারা এই নকশবন্দীয়া-মুজাদ্দেদীয়া তরিকার মাধ্যমে কামালিয়াত লাভ করিয়াছেন এবং করিতেছেন-তাহারা একই সাথে অন্যান্য তরিকারও নেছবত ও কামালিয়াত প্রাপ্ত হইয়াছেন এবং হইতেছেন। পৃথকভাবে তাহাদেরকে আর অন্য তরিকার নেছবত ও কামালিয়াত হাছিলের জন্য শ্রম দিতে হয় না।

    আমার পীর কেবলাজান, হিজরী চতুর্দশ শতাব্দীর মুজাদ্দেদ, হযরত খাজাবাবা শাহসূফী এনায়েতপুরী (কৃঃ) ছাহেব মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের খাছ বাতেনী নেছবতে নকশবন্দীয়া-মুজাদ্দেদীয়া তরিকার পরিপূর্ণ কামালিয়াত অর্জন করিয়া মারেফাত দফতরের চুড়ান্ত সীমায় পৌঁছান। এই কারণেই হাজারী মুজাদ্দেদ (রাঃ) ছাহেবের পরে তাঁহার সম ওলী আর আসমানের নীচে আসেন নাই।

    সেই মহাসাধক দীর্ঘ চল্লিশ বছর এই গোলামকে তাঁহার চরণে রাখিয়া বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে মাধ ধীরে ধীরে খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞানের তালিম দেন এবং প্রচলিত সবগুলি তরিকার নেছবত ও কামালিয়াত দান করেন এবং সমস্ত তরিকার সমন্বয়ে সৃষ্ট খাছ মুজাদ্দেদীয়া তরিকার নেয়ামতপূর্ণ ডালা মাথায় অর্পণ করিয়া সেই ডালা হইতে নেয়ামত বিতরণের নির্দেশ দেন। তাঁহারই নির্দেশ মোতাবেক ওয়াক্তে ওয়াক্তে সেই নেয়ামত তোমাদেরকে বিতরণ করা হইতেছে। তোমরা সকলেই কমবেশী এই আধ্যাত্মিক নেয়ামত উপলব্ধি করিতে পারিতেছ।

    যিনি একবার এই তরিকায় অন্তর্ভুক্ত হন, তিনি আর মাহরুম হন না। আমার পীর কেবলাজান বলিয়াছেন, যাহারা বেহেশতের মাটি দিয়া তৈরী, তাহারাই এই তরিকার ছায়াতলে আসিবে; কারণ বেহেশতের মাটি বেহেশতেই যাইবে।"

    হযরত খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (রঃ) ছাহেব বলিয়াছেন, আমার তরিকা অটুট বাঁধনে বাঁধা। এই তরিকায় আল্লাহ পাকের সহিত মিলন অনিবার্য।

    কথা অতি সত্য। দুনিয়াতে থাকাবস্থায় তোমরা খোদাপ্রাপ্তির পথে যে যতটুকুই অগ্রসর হও না কেন, তোমাদের ছায়ের-ছুলুক যদি জীবৎকালে সম্পন্ন নাও হয়, তবুও ভয় নাই। মৃত্যুর পরে কবরের মধ্যে দুই পূণ্যাত্মা (অর্থাৎ রাসূলে পাক (সাঃ) এবং আপন পীর) তোমাদিগকে প্রশিক্ষণ দিবেন, মারেফাতের তালিম দিবেন; ফলে হাশরের মাঠে সকলেই আল্লাহর ওলী হইয়া উঠিবে। এই কারণেই বলা হয়-এই তরিকায় যিনি দাখিল হন, তিনি আর বঞ্চিত হন না।

    জাকেরানদের কর্তব্যঃ

    হে জাকেরান সকল, তোমরা তরিকতের নিয়ম পদ্ধতি যথাযথ পালন কর। ইবাদত ও মহব্বত-এই দুই গুণ অর্জনের চেষ্টা কর। ইবাদতের চূড়ান্ত মাকাম মাবুদিয়াতে ছেরফা এবং মহব্বতের শেষ দফতর হোব্বে ছেরফা। এই দুই গুণের কামালাত যদি তোমরা অর্জন করিতে পার তবে দুনিয়া হইতে মারেফাতের রাস্তার সাত কদম অতিক্রম করিয়া খোদাতায়ালার জাত পর্যন্ত পৌঁছাইতে পারিবে, আল্লাহর সান্নিধ্য লাভকরিতে সক্ষম হইবে। দু'আ, ইতি!

    জেবি/এসডি

    জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

    Developed by: AB Infotech LTD