Logo

মানব দেহস্থিত দশ লতিফার পরিচয় এবং খোদাপ্রাপ্তি সাধনায় ভূমিকা

profile picture
জনবাণী ডেস্ক
৭ জুলাই, ২০২৬, ১৮:৪৫
মানব দেহস্থিত দশ লতিফার পরিচয় এবং খোদাপ্রাপ্তি সাধনায় ভূমিকা
ছবি: জনবাণী।

খোদাপ্রাপ্তি জ্ঞানের আলোকে শাহ্সূফি হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত লতিফাসমূহের পরিচিতি بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ মানব দেহস্থিত দশ লতিফার পরিচয় এবং খোদাপ্রাপ্তি সাধনায় ইহাদের ভূমিকাঃ

বিজ্ঞাপন

হাদীসে কুদসীতে আল্লাহপাক বলেন,

كُنْتُ كَنْزًا مَخْفِيًّا فَأَحْبَبْتُ أَنْ أَعْرَفَ فَخَلَقْتُ

الْخَلْقَ لأَعْرَف

বিজ্ঞাপন

অর্থাৎ-"আমি গুপ্ত ধন ভান্ডার ছিলাম। অতঃপর আমি পরিচিত হইতে চাহিলাম। তাই বিশ্ব ব্রহ্মান্ডকে সৃষ্টি করিলাম।" ইহা স্পষ্টত যে, আল্লাহ পাক নিজকে প্রকাশ করিবার জন্য সৃষ্টি করিলেন। কাজেই আমাদের কর্তব্য আল্লাহপাকের পরিচয় গ্রহণে সচেষ্ট হওয়া। এই পৃথিবী হইতে খোদাতায়ালাকে চিনিয়া না গেলে পরকালে অন্ধ হইয়া উঠিতে হইবে। পরকালে খোদাতায়ালাকে চিনিবার, জানিবার বা বুঝিবার কোন সুযোগ থাকিবে না। কিন্তু এই দুনিয়াতে কিভাবে খোদাতায়ালাকে চেনা যাইবে? আল্লাহপাক তাঁহাকে চিনিবার উপায় তিনি নিজেই বাৎলাইয়া দিয়াছেন। সৃষ্টির পূর্বে আল্লাহপাক একাই ছিলেন, আর কোন কিছুরই অস্তিত্ব ছিল না। অতঃপর সৃষ্টির উদ্দেশ্যে আল্লাহপাক 'কুন' বা হও বলিলেন। ফলে সকল মানব রূই একত্রে সৃষ্ট হইয়া আলমে আরওয়াহতে অবস্থান গ্রহণ করিল। শুধু মানব রূহ-ই নহে, সৃষ্ট জগতের সকল কিছুই সূক্ষ্ম অবস্থায় আলমে আরওয়াহতে বিরাজমান রহিল। এখানে একটি বিষয় রহস্যাবৃত থাকিয়া যায়। আল্লাহপাক 'কুন' শব্দের আদেশ কাহার উপর প্রয়োগ করিলেন? আদেশ শব্দটার প্রয়োগের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় আর একটি সত্ত্বা বা দ্বিতীয় পুরুষের আবশ্যক হয়। ইহার উত্তরে বলা যায় যে, খোদাতায়ালার পবিত্র জাত চিরস্থায়ী। জাতের মত আল্লাহতায়ালার সিফাতও চিরস্থায়ী। আল্লাহতায়ালার হাকীকী সিফাতসমূহের মধ্যে সকল সৃষ্টির হকিকতের উৎপত্তি স্থান নিহিত। আল্লাহতায়ালা সৃষ্টিলগ্নে যে 'কুন' শব্দ প্রয়োগ করিয়াছিলেন, তাহা আল্লাহতায়ালার সিফাতস্থিত ঐ হকিকত সমূহের প্রতি। ফলে ঐ আদেশে সমুদয় সৃষ্টি সূক্ষ্মভাবে প্রকাশ পায়।

আল্লাহতায়ালার 'কুন' আদেশে সকল মানব রূহ একত্রে সৃষ্টি হইয়া আলমে আরওয়াহতে অবস্থান গ্রহণ করিল। তৎপর সেখান হইতে মানুষ বহু ধাপ অতিক্রম করিয়া এই আদামাতে আসিয়া স্থূল আকার ধারণ করিয়াছে। এই আদামাতে আসিয়া আমরা আপন প্রভুর কথা ভুলিয়া গিয়াছি। আলমে আরওয়াহতে আমরা আল্লাহতায়ালার প্রভুত্ব স্বীকার করিয়া আসিয়াছি। কিন্তু এই আদামাতে আসিয়া আমরা আমাদের প্রভুর কথা বিস্মৃত হইয়াছি। আমাদের উৎসের কথা ভুলিয়া নাফসে আম্মারার দাসত্ব করিতেছি। শয়তানের কুহকে পড়িয়া আমরা আমাদেরকে দেওয়া খোদাতায়ালার আমানতের খেয়ানত করিতেছি। এই অবস্থা চলিতে থাকিলে আমাদের পরিণাম হইবে ভয়াবহ। নাফসে আম্মারা এবং শয়তানের সংগে আমাদেরকে আল্লাহতায়ালার ক্রোধের শিকার হইয়া অনন্তকাল দোযখের আগুনে দগ্ধ হইতে হইবে। ইহা হইতে বাঁচিবার উপায়, দুনিয়া হইতেই খোদাতায়ালাকে চিনিয়া যাওয়া।

আল্লাহপাক আমাদের এই মানব দেহে দশটি কেন্দ্র নির্ধারণ করিয়াছেন, যে কেন্দ্রগুলিকে লতিফা বলা হয়। পীরে কামেলের নির্দেশিত পথে চেষ্টা ও সাধনা করিয়া উক্ত দশটি লতিফাকে পরিচ্ছন্ন করিয়া, সেখানে খোদাতায়ালার নূর ধারণ করিয়া, সেই নূরে পথ দেখিয়া, ঊর্ধ্বলোকের পানে উরুজ ও ছায়ের করিয়া খোদাতায়ালার পরিচয় গ্রহণ করা যায়। এই লতিফাগুলি হইলঃ কালব, রুহ, সের, খফি, আখফা, আব, আতস, খাক, বাদ ও নাফস।

বিজ্ঞাপন

সৃষ্টি জগতকে দুইভাগে ভাগ করা হইয়াছে। যথাঃ আলমে আমর ও আলমে খালক। কালব, রূহ, সের, খফি, আখফা-এই পাঁচটি আলমে আমর বা সূক্ষ্ম জগতের লতিফা। আর আব, আতস, খাক ও বাদ অর্থাৎ আগুন, পানি, মাটি ও বাতাস আলমে খালক বা স্থূল জগতের লতিফা। আলমে আমর ও আলমে খালকের মধ্যস্থানে বিভেদকারী পর্দার মত আরশ অবস্থিত। সহজ কথায় আরশের উপর হইতে ঊর্ধ্ব দিকে আলমে আমর বা লা-মাকাম এবং আরশ হইতে নীচের দিকে সাততলা জমিনের নীচে তাহাতাস সারা পর্যন্ত আলমে খালক অবস্থিত। নিম্নে লতিফা সমূহের সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলিয়া ধরা হইল।

লতিফায়ে কালব-

এই লতিফা মানুষের বাম স্তনের দুই অংগুলি নীচে অবস্থিত। পদ্মকোরক উল্টাইয়া ধরিলে যেই রূপ দেখা যায়, লতিফা

বিজ্ঞাপন

কালবের আকার অনেকটা সেইরূপ। বাংলায় যাহাকে হৃদপিন্ড এবং ইংরেজীতে যাহাকে হার্ট (Heart) বলে। এই লতিফায়ে কালব আল্লাহতায়ালার ভেদের এক মহা জ্ঞানভান্ডার, আল্লাহতায়ালার ভেদের এক মহা জ্ঞান সমুদ্র। এই কালবের মধ্যেই আল্লাহতায়ালার নিদর্শন সমূহ লাভ করা যায়। আল্লাহ পাক কুরআন মাজীদে বলেন,

وَفِي أَنْفُسِكُمْ طَ أَفَلَا تُبْصِرُونَ

অর্থাৎ-আমার নিদর্শন তোমাদের ভিতরেই আছে, তোমরা দেখ না কেন? (সূরা জারিয়াতঃ ২১)

বিজ্ঞাপন

খোদাতায়ালার নিদর্শন সমূহ দেখিবার কেন্দ্রই এই কালব। একটি বটের বীজের মধ্যে যেমন বিরাট একটি বটগাছ লুকাইয়া রহিয়াছে, তেমনি মানব বক্ষস্থিত কালব নামক ক্ষুদ্র এই মাংশপিন্ড, যাহার মধ্যে আল্লাহতায়ালার ভেদের এক বিরাট দফতর লুকাইয়া আছে। লতিফায়ে কালব মহাকালবের ক্ষুদ্রতম অংশ। সূফী সাধকগণ ফরমাইয়াছেন যে, কালবের ক্ষেত্র ব্যাপক এবং বিস্তৃত। দুই চারিশত আসমান যদি এই কালবের ভিতরে রাখা হয়, তবে তাহা কালবের এক পার্শ্বে পড়িয়া থাকিবে। কালব আরশের উপরের জগতের লতিফা হওয়ায় তাহা স্বচ্ছ এবং পবিত্র। কিন্তু আলমে খালকে আসিয়া নাফসে আম্মারার সংস্পর্শে কালব তাহার পবিত্রতা এবং স্বচ্ছতা হারাইয়া ফেলে। মানুষ যতই পাপ কার্যে লিপ্ত হয়, তাহার কালব ততই অসচ্ছ হয়, মলিন হয়। পীরে কামেলের তাওয়াজ্জুহ এত্তেহাদীর বলে মুরীদের কালব তাহার স্বচ্ছতা এবং পবিত্রতা ফিরিয়া পায়। এমতাবস্থায় মহাকালবের সহিত কালব পুনরায় যোগসূত্র স্থাপন করিতে সমর্থ হয়। মহাকালব হইতে আল্লাহতায়ালার জাতের জেল্লী, তাঁহার গুণসমূহ বা সিফাতের প্রতিচ্ছবি এবং তাঁহার ক্রিয়াসমূহের প্রতিচ্ছবি তখন মুরীদের কালবে প্রতিফলিত হয়। ফলে ছালেক এই কালবের মাধ্যমে সৃষ্টিতত্ত্বজ্ঞান এবং স্রষ্টাতত্ত্বজ্ঞান অর্থাৎ এলমে হুসুলী এবং এলমে হুজুরীর জ্ঞান লাভ করিতে পারে। পরিচ্ছন্ন এই কালবে আরশ কুরছি, লওহ, কলম সবই দৃষ্ট হয়। মাওলানা রূমী (রঃ) বলিয়াছেন,

"আরশ, কুরছি, দার দেলে উস্ত লওহ কলম

হারকে দেলরা ইয়াফত্যা আরা নিস্ত গোম।"

বিজ্ঞাপন

অর্থাৎ-"আরশ, কুরছি, লওহ, কলম, বেহেশত, দোযখ, সাত তলা আসমান হইতে সাত তলা জমিনের নীচে তাহাতাস সারা পর্যন্ত সবই তোমার কালবে পরিলক্ষিত হইবে, যদি তোমার কালব মহাকালবের সহিত যোগ সূত্র স্থাপন করিবার ক্ষমতা প্রাপ্ত হয়।"

মহাকালব হইতে তখন ছালেকের কালব অসীম জ্ঞান রাজ্যের জ্ঞান আহরণ করিয়া মহাজ্ঞানী হয়। এই প্রসঙ্গে একটি ঘটনা তোমাদেরে জানাইতে চাই। হযরত আবুবকর কাতানী (রঃ) ছাহেব কাবা শরীফের নিকটবর্তী এলাকায় তরিকা প্রচার করিতেন। তিনি মক্কাবাসীদের নিকট "চেরাগে হেরেম" অর্থাৎ হরম শরীফের প্রদীপ বলিয়া আখ্যায়িত ছিলেন। একদিন তিনি কাবা শরীফের ভিতরে এক পার্শ্বে একাকী বসিয়া ওজিফারত আছেন। দূরে মাকামে ইব্রাহিমের নিকট কয়েকজন তাবেঈ রাসূলে করীম (সাঃ) এর বাণীসমূহ লইয়া আলোচনা করিতেছেন। এমন সময় একজন বৃদ্ধলোক সোজাসুজি হযরত কাতানী (রঃ) ছাহেবের নিকট আসিয়া বলিলেন, "মাকামে ইব্রাহিমের নিকট হাদীস বিশারদগণ হাদীস লইয়া গবেষণা করিতেছে, আর আপনি এখানে একাকী বসিয়া আছেন কেন? সেখানে হাদীস গবেষণায় অংশ গ্রহণ করিতে তো পারিতেন।"

হযরত কাতানী (রঃ) ছাহেব মাথা উত্তোলন পূর্বক বলিলেন, "যাহারা হাদীস লইয়া গবেষণা করিতেছেন, তাহারা কোথা হইতে তাহা পাইয়াছেন।" উত্তরে আগন্তক বৃদ্ধ বলিলেন, "তাহারা প্রধান প্রধান সাহাবীদের নিকট হইতে হাদীস শিখিয়াছেন এবং সাহাবা সকল রাসূলে করীম (সাঃ) এর নিকট হইতে প্রাপ্ত হইয়াছেন।" ইহা শুনিয়া হযরত কাতানী (রঃ) বলিলেন, "আপনি তো দীর্ঘ সূত্রের কথা বলিলেন, কিন্তু আমি এখানে বসিয়া বিনা সূত্রে সরাসরি তাহা শ্রবণ করিতেছি।" "কিভাবে আপনি শ্রবণ করিতেছেন?" বৃদ্ধ প্রশ্ন করিলেন। তিনি বলিলেন, "আমার কালব খোদাতায়ালার নিকট হইতে সমস্তই আমার নিকট বর্ণনা করিয়া থাকে।” আগন্তক বৃদ্ধ পুনরায় প্রশ্ন করিলেন, আপনার এই কথার সমর্থনে কোন প্রমাণ আছে কি?” হযরত কাতানী (রঃ) মুচকি হাসিয়া বলিলেন, ইহার পক্ষে এতটুকু প্রমাণই যথেষ্ট যে, যে আগন্তক বৃদ্ধ আমাকে উপদেশ প্রদান করিতেছেন, তিনি হযরত খিজির (আঃ)। হযরত খিজির (আঃ) ইহা শ্রবণে নিজের পরিচয় প্রদান করিয়া উপরোক্ত কথার সাথে একমত পোষণ করিলেন।

বিজ্ঞাপন

কালবে যে নূর দৃষ্ট হয়, তাহা সরিষা ফুলের ন্যায় হলুদ বর্ণের।

কালবের মূল আরশের উপরে এবং ইহার মূলের মূল তাজাল্লীয়াতে আফয়ালে সন্নিবেশিত আছে। ছালেক বা মুরীদ যখন এই মাকামে সংঘটিত হইতেছে তাহা এক খোদাতায়ালার ইচ্ছা এবং ক্রিয়াগুণ সমূহের উন্নীত হয়, তখন সে বুঝিতে পারে যে এই বিশ্ব ব্রহ্মান্ডে যাহা কিছু দ্বারা সংঘটিত হইতেছে। পৃথিবী, চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ-নক্ষত্রের নিজ নিজ কক্ষপথে ভ্রমণ, এক এক ঋতুতে পথিবীর এক এক রূপধারণ, সমস্ত আল্লাহতায়ালার ক্রিয়াগুণ সমূহের প্রতিবিম্ব। লতিফায়ে কালব প্রথমে হযরত আদম (আঃ) এর উপর বিকাশ পাইয়াছিল। তাই এই লতিফাকে হযরত আদম (আঃ) এর জেরে কদমের লতিফা বলা হয়। লতিফায়ে কালবের বেলায়েত অর্জনকারীকে 'আদমী মাশরাব ওলী'-অর্থাৎ হযরত আদম (আঃ)-এর ঘাটের ঘাটী বলা হয়।

লতিফায়ে রূহ-

বিজ্ঞাপন

ইহা আলমে আমর বা সূক্ষ্ম জগতের লতিফা। ইহার অবস্থান দক্ষিণ স্তনের দুই অংগুলি নীচে। এই লতিফার মূল আরশের উপরে এবং মূলের মূল খোদাতায়ালার 'সিফাতে ছুবুতী এলাহিয়া'তে সন্নিবেশিত আছে। এই সিফাতে ছুবুতী ঐ সমস্ত গুণ, যাহা খোদাতায়ালার জাতে ছাবেত থাকে। পীরে কামেলের তাওয়াজ্জুহ বলে ছালেক এই স্তরে পৌছাইলে সে বুঝিতে পারে যে তাহার নিজের কোন গুণ নাই। দর্শন, শ্রবণ, চিন্তন, বর্ণন, কল্পন, কথন, সৃজন সমস্তই খোদাতায়ালার গুণাবলী। বস্তুতঃ মানুষের নিজের বলিয়া কিছু নাই। তাহার সমস্ত গুণাগুণ খোদাতায়ালা হইতে ধার করা। খোদাতায়ালার আমানত যাহা মানুষ গ্রহণ করিল তাহা আল্লাহতায়ালার উক্ত গুণাবলী বই কিছুই নহে। এই লতিফার নূরের রং সোনালী। এই লতিফা হযরত নূহ (আঃ) ও হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর উপরে প্রথম প্রকাশ পায়। তাই এই লতিফাকে হযরত নূহ (আঃ) এবং হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর জেরে কদমের লতিফা বলা হয়। লতিফা রূহের বেলায়েত হাছিলকারীকে #### 'ইব্রাহিমী মাশরাব ওলী'-অর্থাৎ হযরত ইব্রাহিম (আঃ)-এর ঘাটের ঘাটী বলা হয়।

লতিফায়ে সের-

এই লতিফা আলমে আমরের লতিফা। ইহা লতিফা কালবের দুই অংগুলি পরিমান দূরে বুকের দিকে অবস্থিত। অর্থাৎ কালব এবং বক্ষস্থলের মধ্যবর্তী স্থানে লতিফায়ে সের অবস্থিত। ইহার আসল আরশের উপরে এবং আসলের আসল খোদাতায়ালার শানে সন্নিবেশিত আছে। এই লতিফার নূর সাদা-অতি তেজস্কর। ইহা হযরত মুছা (আঃ) এর উপর প্রথম প্রকাশ পায়। তাই এই লতিফাকে হযরত মুছা (আঃ) এর জেরে কদমের লতিফা বলা হয়। লতিফা ছেরের বেলায়েত অর্জনকারীকে ### 'মুছবী মাশরাব ওলী' অর্থাৎ হযরত মুসা (আঃ)-এর ঘাটের ঘাটী বলা হয়।

বিজ্ঞাপন

লতিফায়ে খফি-

ইহা আলমে আমরের লতিফা। ইহা লতিফা রূহের দুই অংগুলি পরিমান দূরে বুকের দিকে অবস্থিত। এই লতিফার মূল আরশের উপরে এবং মূলের মূল খোদাতায়ালার 'সিফাতে ছলবীয়া'তে সন্নিবেশিত আছে। এই মাকামে উন্নীত হইলে ছালেক বুঝিতে পারে যে, আল্লাহপাক অব্যয়, অক্ষয়, চিরস্থায়ী, অপরিবর্তনশীল ইত্যাদি। এই লতিফার নূর কালো বর্ণের, তবে তাহা দৃষ্টিরোধক নয়। এই লতিফা হযরত ঈসা (আঃ) এর উপর প্রথম প্রকাশ পায়। তাই এই লতিফাকে হযরত ঈসা (আঃ) এর জেরে কদমের লতিফা বলা হয়। লতিফা খফির বেলায়েত হাছিলকারীকে #### 'ঈসুবী মাশরাব ওলী' অর্থাৎ হযরত ঈসা (আঃ)-এর ঘাটের ঘাটী বলা হয়।

লতিফায়ে আখফা-

বিজ্ঞাপন

ইহা বুকের মাঝখানে অবস্থিত। ইহার মূল আরশের উপরে এবং মূলের মূল খোদাতায়ালার শানে জামেয়ায় সন্নিবেশিত আছে। ইহাকে তাইনে আওয়াল বা তাইনে ওজুদী বা হকিকতে আহমদী বলে, যাহা হকিকতে মুহাম্মদীর উৎপত্তিস্থল। ছালেক এই মাকামে উন্নীত হইলে খোদাতায়ালার এমনি নিবিড় ও ঘনিষ্ট সান্নিধ্য লাভ করে যাহা ভাষায় ব্যক্ত করা যায় না। এখানে গুণ ও শানের কোন প্রতিবন্ধকতা নাই। এই সম্পর্ককে ইংগিতেও বুঝানো যায় না। যাহা কেহ স্বীয় জ্ঞানে আনিতে পারে না, অনুভবও করিতে পারে না। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) বলেন যে, আহাদ ও আহমদ নামের মধ্যে যে মিমের ব্যবধান তাহা কেবল এই দুই নামের মধ্যেকার পার্থক্যই নির্ণয় করে। এই মাকামে উন্নীত ছালেকের সহিত আল্লাহতায়ালার সম্পর্ক অবর্ণনীয়। ইহা কেবলমাত্র আল্লাহতায়ালাই জানেন। এই লতিফার নূর সবুজ বর্ণের। এই লতিফা রাসূলে করীম (সাঃ) এর উপর প্রথম প্রকাশ পায়। তাই ইহাকে রাসূলে করীম (সাঃ) এর জেরে কদমের লতিফা বলা হয়। লতিফা আখফার বেলায়েত অর্জনকারীকে #### 'মুহাম্মদী মাশরাব ওলী' অর্থাৎ হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সাঃ)-এর ঘাটের ঘাটী বলা হয়।

আলমে আমরের উক্ত পঞ্চ লতিফা যথা কালব, রূহ, সের, খফি ও আখফাকে হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) সারপঞ্চক বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন।

আমাদের এই দেহ আব, আতস, খাক ও বাদ অর্থাৎ আগুন, পানি, মাটি ও বাতাসের সমন্বয়ে তৈরী। আল্লাহপাক বিশেষ কৌশলে পরস্পর বিপরীতধর্মী এই চার উপাদান দ্বারা আমাদের দেহকে তৈরী করিয়াছেন। এই চারটি উপাদান পৃথক পৃথক ভাবে এক একটি লতিফা। এই চারটি লতিফার অবস্থান সর্ব দেহ ব্যাপী।

তৎপর আলমে খালকের অবশিষ্ট লতিফা যাহার নাম নাফস। আগুন, পানি, মাটি ও বাতাসের সমন্বয়ে পৃথক এক সত্ত্বা যাহার ধর্ম উক্ত চার উপাদান হইতে পৃথক। হাইড্রোজেন এবং অক্সিজেনের যৌগিকে যেমন ভিন্ন এক উপাদান পানির তৈরী হয়। এই পানির ধর্ম হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনের ধর্ম হইতে পৃথক। তেমনি এই নাফস, যাহার স্বভাব দৈহিক অন্যান্য উপাদানের ধর্ম হইতে পৃথক। যাবতীয় কুচিন্তা এবং কুকর্মের উৎস এই নাফস। কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ, মাৎসর্য, হিংসা, কিনা, রিয়া, কামনা, বাসনা ইত্যাদি সকল রিপুই এই নাফস হইতে উৎপত্তি। নাফসের স্বভাব আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধাচারণ করা। আল্লাহতায়ালার নাফরমানীতেই তাহার শান্তি। আল্লাহতায়ালার দাসত্বের অস্বীকৃতি প্রদানই তাহার ধর্ম। দুনিয়ার ধন, জন, যশ, খ্যাতি, কর্তৃত্ব-এ সবই তাহার আকাংখা। নাফস চায় সকলের উপরে কর্তৃত্ব করিতে। সকল সৃষ্টিই তাহার অধীন হইয়া থাকিবে আর সে সকলের উপর সদারি করিবে-ইহাই তাহার কাম্য। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব বলেন যে, 'নাফসের এই স্বভাব খোদায়ী দাবী বই কিছুই নহে। প্রত্যেকের নাফসই তাই এক একটি ফেরাউন।' কাজেই এই নাফসের হাত হইতে মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত কাহারোও কোন নিস্তার নাই।

আল্লাহতায়ালা হযরত আদমের দেহ তৈরী করিয়া তাহার ভিতরে রূহ ফুকিয়া দিলেন। রূহ হযরত আদম (আঃ) দেহে প্রবেশ করিয়া অন্ধকার দেখিয়া দেহ হইতে বাহির হইয়া আসিল। দেহের সেই অন্ধকারে থাকিয়া যাইতে রূহ অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করিল। তৎপর আল্লাহতায়ালার ইশারায় হযরত আদম (আঃ) এর দেহে নূরে মুহাম্মদী প্রবেশ করিল। নূরে মুহাম্মদীর আকর্ষণে তখন রূহ মানব দেহে রহিয়া গেল। এই ভাবে আল্লাহপাক তাঁহার নিজস্ব কৌশলে নাফসের সাথে রূহের মিলন ঘটাইলেন, অন্ধকারের সহিত আলোর সংমিশ্রণ করিলেন। তৎপর নাফসের সহিত রূহের প্রেমের সম্পর্ক গড়িয়া দিলেন। রূহ ঊর্ধ্ব জগতের উপাদান। রূহের উৎস আল্লাহপাকের সিফাতে এরাদত। রূহ আল্লাহতায়ালার চরিত্রে চরিত্রবান। রূহের ভিতর ভালগুণ ব্যতীত খারাপের কোন স্থান নাই। রূহের আবাসস্থল আমরে রাব্বী। অন্যদিকে

নাফস এই আলমে খালকের উপাদান। যাবতীয় কুকর্মের কর্তা এই নাফস। খারাপ ভিন্ন ভালোর কোন স্থান এই নাফসের ভিতরে নাই। আল্লাহপাক বলেন, "নাফস আমার শত্রু, তোমরা নাফসের সহিত শত্রুতা কর।" কাজেই রূহের একান্ত ইচ্ছা, এই নাফসকে তাহার কু-স্বভাব হইতে মুক্ত করিয়া, ঊর্ধ্বজগতের নূরে আলোকিত করিয়া ঊর্ধ্বলোকের পানে লইয়া যাইবে। আল্লাহতায়ালার প্রেমিক বানাইবে।

কিন্তু হিতে বিপরীত হইল। রূহ নাফসে আম্মারাকে হেদায়েত করিতে আসিয়া নিজেই নাফসের প্রেমে পড়িয়া গেল। নাফসের দাসত্ব করা শুরু করিল। নাফসের যাহা ভাল লাগে, রূহেরও তাই ভাল লাগে। নাফসের প্রেমে পড়িয়া নাফসের ভাল লাগাই রূহের ভাল লাগায় পরিণত হইল। নাফসের কর্মসূচীই রূহের কর্মসূচী হইল। কিন্তু কথাতো ইহা ছিল না। দুইয়ের স্বভাবও এক ছিল না। রূহের যাহা প্রিয়, নাফসের তাহা অ-প্রিয়। রূহের জন্য যাহা মধুর, নাফসের জন্য তাহা তিক্তকর। নাফস সর্বদাই আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধাচারণ করিতে ভালবাসে। নাফস আল্লাহতায়ালার শত্রু। আল্লাহ বলেন, "তোমরা নাফসের সাথে বন্ধুত্ব করিও না, তোমরা নাফসের দাসত্ব করিও না।" এই দুনিয়ার যশ, খ্যাতি, ধন-সম্পদ, কর্তৃত্ব সকলই নাফসের কাম্য।।

নাফস এই দুনিয়াকে সুন্দর রূপে সাজাইয়া রূহের সম্মুখে উপস্থিত করিল। ফলে রূহও দুনিয়ার প্রেমে পড়িল। নাফসকে ঈমানদার বানাইতে আসিয়া নিজেই ঈমান হারাইয়া ফেলিল। খোদাতায়ালার কথা, নূরময় জগতের কথা, নিজস্ব আবাস স্থলের কথা-সবই ভুলিয়া গেল। দুনিয়ার প্রেমে মত্ত হইয়া নাফসের দাসত্ব করা শুরু করিল। এই অবস্থা চলিতে থাকিলে রূহের ধ্বংস অনিবার্য। নাফসের সাথে, নাফসের সাহায্যকারী দুনিয়ার সংগে, আল্লাহতায়ালার ক্রোধানলে পড়িয়া অনন্তকাল দোযখের আগুনে দগ্ধ হইতে হইবে। কাজেই নাফসে আম্মারার কবল হইতে রূহকে মুক্ত করিবার জন্য একজন সাহায্যকারীর প্রয়োজন। সেই সাহায্যকারী হিসেবে যুগে যুগে দুনিয়াতে নবী রাসূলের আর্বিভাব ঘটিয়াছে। নবুয়তের দরজা বন্ধ হইয়া যাওয়ার পর তাঁহাদেরই চরিত্রে চরিত্রবান করিয়া আল্লাহতায়ালা ওলীয়ে কামেল সকলকে প্রেরণ করিতেছেন পথভ্রষ্ট মানব সকলকে তথা মানব রূহকে নাফসে আম্মারার দাসত্ব হইতে মুক্ত করাইয়া, দুনিয়ার অধীনতাকে অস্বীকার করাইয়া আল্লাহমুখী করিবার জন্য।

হযরত শেখ সাদী (রঃ) ছাহেব একটি রূপক কাহিনীর মাধ্যমে মানব রূহের উক্ত অবস্থা এবং খোদাপ্রাপ্তির নিদর্শন মানবদেহের দশ লতিফার চমকপ্রদ এক ব্যাখ্যা প্রদান করিয়াছেন। কাহিনীটি হইলঃ

একজন জ্ঞানী ভদ্রলোক, বাড়ী তাহার আফগানস্থানে। তিনি স্ত্রী-পুত্র পরিজনসহ সুখে, শান্তিতে বসবাস করিতে ছিলেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, তাহার অতি আদরের পুত্রধন একদিন হারাইয়া গেল, বহু তালাশ করা হইল কিন্তু ছেলেকে পাওয়া গেল না। তিনি নিরাশ না হইয়া পুত্রের অনুসন্ধান কার্য চালাইয়া গেলেন। একদিন পুত্রের খোঁজে বাহির হইয়া নির্জন এক এলাকা অতিক্রম করিবার সময় দেখিলেন অতি আশ্চর্য এক দৃশ্য। এক বৃদ্ধা, দেখিতে কুৎসিত কদাকার। তাহার সম্মুখপ্রান্তে বসিয়া আছে তাহারই আদরের পুত্রধন। সামনাসামনি বসিয়া অপলক নেত্রে সেই বৃদ্ধার পানে তাকাইয়া রহিয়াছে। পুত্র সে বৃদ্ধার ধ্যান করিতেছে। পিতা পুত্রের নিকট নিজের পরিচয় দান করিয়া বলিল, "হে পুত্র! তোমার শোকে তোমার গর্ভধারিণী মা শয্যাশায়িনী। তোমার আত্মীয় স্বজন পাগল প্রায়। তুমি দ্রুত চল আমার সাথে। কিন্তু পুত্র বলিল, "তুমি কে হে ভদ্রলোক! আমি তোমাকে চিনি না। আমার মা কে? আমি জানি না।

আমার বাড়ী ঘর, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন কিছুই নাই। সব কিছুই আমার এই বৃদ্ধা। আমি এই বৃদ্ধার প্রেমে বিভোর। বৃদ্ধাই আমার জীবন, বৃদ্ধাই আমার মরণ। এক মুহূর্ত বৃদ্ধার অদর্শনে আমি মারা যাইব। কাজেই তুমি যাও। আমাকে বিরক্ত করিও না। বৃদ্ধার প্রেমসুধা পানে আমাকে বাধা দান করিও না। প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করিও না।" পুত্রের এই প্রকারের কথা শ্রবণে পিতা আশ্চর্যান্বিত হইলেন। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইলেন। পিতা তাহার জ্ঞান সাগরে ডুব দিলেন। তাফাকুর বা চিন্তা করিতে লাগিলেন পুত্রের এই হীন অবস্থা দেখিয়া। তিনি ভাবিলেন, নিশ্চয়ই পুত্রকে ঐ বৃদ্ধা যাদু করিয়াছে। যাদুর প্রভাবে পুত্র তাহার পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন, বাড়ী-ঘরের কথা ভুলিয়া গিয়াছে। কাজেই পুত্রকে যাদুর প্রভাবমুক্ত করিতে হইবে। কিন্তু কিভাবে ঐ চরিত্রভ্রষ্ঠা বৃদ্ধা তাহার পুত্রকে যাদু করিল? তিনি যাদুর উপকরণাদির সন্ধান করিতে লাগিলেন। হঠাৎ তিনি দেখিতে পাইলেন, বৃদ্ধার পার্শ্বে দুইটি পাথর। একটির উপরে আর একটি বসানো। পিতা ভাবিলেন-নিশ্চয়ই ইহার ভিতর কোন রহস্য লুক্কায়িত। তিনি উপরের পাথরটিকে সরাইলেন। পাথরটি অপসারণের পর তিনি একটা লম্বা চুল দেখিতে পাইলেন, যে চুলে দশটি গিরা লক্ষ্য করিলেন। জ্ঞানী পিতা প্রথম গিরাটি খুলিলেন।

ইহাতে পুত্রের চৈতন্য ফিরিয়া আসিল। সে তাহার বাবাকে চিনিয়া জড়াইয়া ধরিল। ইহা দর্শনে জ্ঞানী পিতা আসল রহস্য বুঝিতে পারিলেন। তিনি দ্বিতীয় গিরাটি মুক্ত করিলেন। ছেলের উঠিল। সে অঝর নয়নে ক্রন্দন শুরু করিল। জ্ঞানী পিতা তৎপর ৩য়,. হা-হুতাস আরও বাড়িয়া গেল। তাহার মায়ের কথা স্মৃতিপটে ভাসিয়া ৪র্থ ও ৫ম গিরাটি উন্মুক্ত করিলেন। পুত্র তাহার উৎসে, তাহার আবাসস্থলে ফিরিয়া যাওয়ার জন্য পিতাকে উত্যক্ত করিতে লাগিল। উপরোক্ত পাঁচটি গিরাকে হযরত সাদী (রঃ) আলমে আমরের পাঁচ লতিফাকে বুঝাইয়াছেন এবং জ্ঞানী পিতাকে পীরে কামেলের রূপক হিসেবে উল্লেখ করিয়াছেন। তৎপর অবশিষ্ট পাঁচটি গিরা যাহা আলমে খালকের পাঁচ লতিফা যথা আব, আতস, খাক, বাদ ও নাফসের সহিত তুলনা করিয়াছেন। এই ভাবে আলমে আমরের পাঁচ লতিফার গিরা যখন খুলিয়া দেওয়া হইল, ছেলে তাহার বাবাকে চিনিল, তাহার মাকে স্মরণ করিল, আবাসস্থলের কথা তাহার স্মরণে পড়িল। তৎপর ছেলে বাবাকে জড়াইয়া ধরিল দেশে লইয়া যাওয়ার জন্য।

বাবাকে সে বলিল, "বাবা, আমি এখানে কেন? আমাকে বাড়ী লইয়া চলেন।" ছেলে বাড়ী যাওয়ার জন্য অস্থির হইল। আধ্যাত্বিকতত্ত্বে জ্ঞানী বাবা ছেলেকে বলিলেন, "ছবুর কর, ধৈর্য ধারণ কর। এখনও আরও পাঁচটি গিরা অবশিষ্ট আছে। সে গিরাগুলি খুবই শক্ত। অস্ত্র ব্যতীত সেই গিরাগুলি কর্তন করা যাইবে না। শান পাথর দ্বারা অস্ত্রকে ধারালো করা হয়। তেমনি শান পাথর হইল নাফী এসবাত জেকের।" এই শানপাথররূপী নাফী এসবাত জেকেরের দ্বারা জ্ঞানী বাবা একটি একটি করিয়া অবশিষ্ট গিরাগুলি কাটিতে লাগিলেন। সেই বৃদ্ধা কুহকিনীর হাত হইতে ছেলে মুক্ত হইল। তাই হযরত শেখ সাদী (রঃ) ছাহেব ফরমাইয়াছেন, "তোমরা এমন স্ত্রীলোকের সংগে প্রেম করিও না যে প্রতিদিন সকালে একটি করিয়া স্বামী গ্রহণ করে। এই কুহকিনী দুনিয়া-বৃদ্ধা এক রমণী। দেখিতে অতীব কুৎসিত। তাহার দুই পাটি দাঁত আছে। সম্মুখের দাঁত দ্বারা সে হাসিতে থাকে কিন্তু পিছনের দাঁত দ্বারা সে কাটিয়া হালাক করে।" তুমি যদি এই কুহকিনীর হাত হইতে বাঁচিতে চাও, তবে পীরে কামেলের কদমকে শক্ত করিয়া ধর। পীরে কামেলই একমাত্র তাহার তাওয়াজ্জুয়ে এত্তেহাদীর দ্বারা এই কলংকিনী, কুহকিনী রমণীর হাত হইতে বাঁচাইতে পারেন।

তাই জ্ঞানী পিতা মুর্শেদে কামেলের সংগ ধর এবং কুহকিনীর কুহক হইতে বাঁচিতে চেষ্টা কর। তবেই তুমি দুনিয়ার কুহক হইতে পরিত্রাণ লাভ করিয়া আল্লাহতায়ালার সান্নিধ্য অর্জন করিতে পারিবে। একমাত্র পীরে কামেলের তাওয়াজ্জুহ দ্বারাই ইহা সম্ভব। তাই বলা হয়, যাহার পীর নাই তাহার পীর শয়তান। নাফস হইল তোমাদের শরীরে শয়তানের পক্ষ হইতে সিপাহসালার। এই নাফসই তোমাদের মধ্যে সমস্ত কুকথা টানিয়া আনে। সকল কুকর্ম, কুচিন্তা এবং ওয়াসওয়াসা দেওয়াই হইল এই নাফসের স্বভাব। তাই পারস্যের মহাসূফীসাধক হযরত মাওলানা রূমী (রঃ) ছাহেব এই নাফসকে কাল সাপের সহিত তুলনা করিয়াছেন। তিনি বলেন,

"হিসনা কোশাদ মারে রাজো জাল্লেপীর

দামনে আ নাফসরে কোশরা সাসতগীর।"

অর্থাৎ-তোমরা যদি নাফসরূপী কাল সাপের ছোবল হইতে বাঁচিতে চাও, তবে নাফসহন্তা মুর্শেদে কামেলকে শক্ত করিয়া ধর। সমস্ত বুজুর্গানে দ্বীন একই মত প্রকাশ করিয়াছেন। তাঁহারা বলিয়াছেন, "তোমরা নাফসের সহিত জেহাদ কর।"

তোমরা যখন নামাজে দাঁড়াও, তখন প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হইয়া নামাজে দন্ডায়মান হও। তোমরা বল,

و إِنِّي وَجَّهْتُ وَجْهِي لِلَّذِي فَطَرَ السَّمَوَاتِ الْأَرْضَ حَنِيفًا وَ مَا أَنَا مِنَ الْمُشْرِكِينَ

অর্থাৎ-"আমি মুখ ফিরাইলাম সেই আল্লাহর দিকে যিনি আসমান ও জমিনের স্রষ্টা এবং আমি কখনও মুশরেকদের অন্তর্ভুক্ত নহি।”

উপরের এই প্রতিজ্ঞায় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হইয়া, হলফ করিয়া তোমরা যখন নামাজে দাঁড়াও তখন তোমাদের মনে কি কোন কুচিন্তা, বাজে কথার উদয় হয় না? তোমরা কি দেখ না? যে কত পুরাতন বন্ধুর স্মৃতি, কত মামলা-মকদ্দমার কথা তোমাদের মনে আসিয়া মনকে ভিন্ন দিকে ঘুরাইয়া লয়। যাহাকে উদ্দেশ্য করিয়া নামাজে দন্ডায়মান হইলে, তাঁহার কথাই তোমাদের আর স্মরণ থাকে না। কিন্তু আল্লাহপাক ফরমান,

إِنَّهُ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ -

অর্থাৎ- "নিশ্চয়ই তিনি (আল্লাহ) তোমাদের দেলের খবর রাখেন।" (সূরা হুদঃ ৫)

তাই, হে জাকেরানগণ! তোমরা যদি খাঁটিভাবে নামাজ আদায় করিতে চাও, বিশুদ্ধভাবে আল্লাহর বন্দেগী করিতে চাও, তবে নাফসের কুখায়েশ, কুচিন্তা হইতে বাঁচিবার আপ্রাণ চেষ্টা কর। আল্লাহ ভিন্ন অন্য কোন চিন্তা যেন মনে আসিতে না পারে। নাফস শয়তান তোমাদের শরীরের শিরা-ধমনী, মাথার চান্দি হইতে পায়ের তলা পর্যন্ত, প্রতি গ্রন্থিতে গ্রন্থিতে তোমাদেরকে ঘেরাও করিয়া রাখিয়াছে, যেন তোমরা আল্লাহর দিক না যাইতে পার। আল্লাহর কথা তোমাদের মনে না আসিতে পারে। তোমরা যদি নাফসের এই করাল গ্রাস হইতে বাঁচিতে চাও, তবে পীরে কামেলকে শক্ত করিয়া ধর। পীরে কামেলের অসিলা ব্যতীত দ্বিতীয় আর উপায় নাই। বর্তমান জামানার মুজাদ্দেদ হযরত খাজাবাবা শাহ্সূফী এনায়েতপুরী (কুঃ) ছাহেব। তাঁহার কদম শক্ত করিয়া ধর এবং রাবেতায়ে কালব-ফিশ-শেখ হাছিল কর-তবেই কল্যাণ। আল্লাহ তোমাদের শক্তি দান করুন, যাহাতে নাফসের করাল গ্রাস হইতে তোমরা বাঁচিতে পার।

"হে আল্লাহ! আপনার মহব্বত দেলে পয়দা করাই আমাদের উদ্দেশ্য। আপনাকে রাজি রাখাই আমাদের কর্তব্য ও কর্ম। আপনি দয়া করিয়া আপনার মারেফাত ও মহব্বত ভিক্ষা দিন। হে খোদা! আপনি পরম দয়ালু, দাতা ও সর্বশক্তিমান। আপনার দয়া ব্যতীত নাফসের এই ভয়ানক গ্রাস হইতে বাঁচিবার ক্ষমতা কাহারও নাই। তাই নাফসের সাথে এই জেহাদে আপনার অনুগ্রহে আমরা যাহাতে বিজয়ী হইতে পারি, সেই করুণাই আপনার কাছে আমরা ভিক্ষা চাই। আপনি দয়া করিয়া নাফসের এই করাল গ্রাস হইতে বাঁচান।"

তাই মুর্শেদে কামেলের মহব্বতের রজ্জু ধরিয়া তোমরা চলিতে থাক। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের দয়া করিবেন। আল্লাহ তোমাদের সহায় থাকিবেন। নিশ্চয় তিনি তোমাদের কামিয়াবী বখশিস করিবেন। তোমরা পীরের হুকুম ঠিক ঠিক মত প্রতিপালন কর। দমে দমে আল্লাহকে স্মরণ কর-তবেই কল্যাণ। মুর্শেদে কামেলের তাওয়াজ্জুহ দ্বারাই এই অপূর্ব নেয়ামত হাছিল করা যায়। ইহা ব্যতীত বিকল্প কোন পথ নাই। তোমরা আল্লাহ ও রাসূলের মহব্বতের রজ্জু ধরিয়া সত্য পথে চলিতে থাক। আল্লাহ তোমাদের কবুল করুন। আমীন!

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD