সিগারেট খাতে ৪৭ হাজার কোটি রাজস্ব, ২৭ টিম মাঠে নামাচ্ছে এনবিআর

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) হিসাবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সিগারেট খাত থেকে ৪৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে। তবে একই সময়ে নকল সিগারেট, জাল ও পুনর্ব্যবহৃত ব্যান্ডরোল, চোরাচালান এবং নির্ধারিত মূল্যের বেশি দামে বিক্রির মাধ্যমে বিপুল রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগও সামনে এসেছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় তামাক খাতে নজরদারি বাড়িয়ে ১১ সদস্যের কেন্দ্রীয় মনিটরিং কমিটির পাশাপাশি ২৭টি এনফোর্সমেন্ট টিম মাঠে নামাচ্ছে এনবিআর।
বিজ্ঞাপন
সম্প্রতি মানিকগঞ্জের শিবালয়ে একটি তুলনামূলক ছোট অভিযানে নকল ব্যান্ডরোল ব্যবহারের মাধ্যমে প্রায় সাড়ে ১১ লাখ টাকা শুল্ক-কর ফাঁকির চেষ্টা শনাক্ত হয়। গত ১১ আগস্ট বিউটি টোব্যাকোতে অভিযানে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ৩ লাখ ৭০ হাজার শলাকা সিগারেট এবং ১৩ হাজার ট্যাক্স স্ট্যাম্প বা ব্যান্ডরোল জব্দ করা হয়। যাচাইয়ের পর ৯০ হাজার সিগারেটে নকল ব্যান্ডরোল এবং আরও ১৩ হাজার অব্যবহৃত নকল ব্যান্ডরোল পাওয়া যায়।
এর আগে ২০২৫ সালের ৪ ডিসেম্বর ঈশ্বরদীর ইউনাইটেড টোব্যাকো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডে অভিযান চালিয়ে প্রায় ৯ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়েছিল ভ্যাট গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। সেখান থেকে ৬ লাখ ৩৪ হাজার ৫৯০ শলাকা জাল ব্যান্ডরোলযুক্ত সিগারেট এবং ১০ লাখ ২৯ হাজার অব্যবহৃত জাল ব্যান্ডরোল জব্দ করা হয়েছিল।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব ফাঁকি ও জাল ব্যান্ডরোলের বিরুদ্ধে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ১৮ হাজার অভিযান হয়েছে। এসব অভিযানে নকল পণ্য ছাড়াও চোরাচালান এবং সর্বোচ্চ খুচরা মূল্যের (এমআরপি) বেশি দামে সিগারেট বিক্রির মতো অনিয়মের বিষয়ও সামনে এসেছে।
বিজ্ঞাপন
বিক্রির পর্যায়েই হাজার কোটি টাকার ফাঁকি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বিউরো অব ইকোনমিক রিসার্চ’ ও ‘বাংলাদেশ নেটওয়ার্ক ফর টোব্যাকো ট্যাক্স পলিসি’ (বিএনটিটিপি)-র যৌথ গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, শুধু নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সিগারেট বিক্রির কারণেই বছরে প্রায় ৫ হাজার ১৮২ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি হচ্ছে।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
গবেষণায় স্তরভেদে রাজস্ব ফাঁকির পরিমাণও তুলে ধরা হয়েছে। অতিউচ্চ স্তরে ৫১০ কোটি ৩১ লাখ, উচ্চ স্তরে ১২৪ কোটি ৪০ লাখ, মধ্যম স্তরে ১ হাজার ৯২৫ কোটি ৫৮ লাখ এবং নিম্ন স্তরে ২ হাজার ৬২১ কোটি ২৪ লাখ টাকার ফাঁকির হিসাব পাওয়া গেছে।
সংশ্লিষ্টদের ধারণা, নকল সিগারেট ও জাল ব্যান্ডরোলের হিসাবও যুক্ত হলে বার্ষিক রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ ১০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
বিজ্ঞাপন
২৭ কমিশনারেটে এনফোর্সমেন্ট টিম
রাজস্ব সুরক্ষায় গঠিত ১১ সদস্যের কেন্দ্রীয় মনিটরিং কমিটির পাশাপাশি দেশের ২৭টি কাস্টমস ও ভ্যাট কমিশনারেটের আওতায় পৃথক এনফোর্সমেন্ট টিম গঠন করা হয়েছে। প্রতিটি টিমে পাঁচজন সদস্য থাকবেন।
এনবিআরের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এসব দল সপ্তাহে অন্তত পাঁচ দিন কারখানা, বাজার ও খুচরা দোকানে অভিযান চালাবে। প্রয়োজন অনুযায়ী দিন ও রাত—দুই সময়েই অভিযান পরিচালনার প্রস্তুতি থাকবে।
বিজ্ঞাপন
নজরদারি শুধু উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। সবুজ তামাকপাতা সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, কাঁচামাল ও প্যাকেজিং পেপার সরবরাহ, কারখানায় উৎপাদন, ব্যান্ডরোল ব্যবহার, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং শেষ পর্যন্ত খুচরা বাজার—পুরো চেইনকে পর্যবেক্ষণের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
এনবিআরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘মূল উদ্দেশ্য ছিল সর্বোচ্চ রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করা। ... আমরা এখন মাঠপর্যায়ে নজরদারির ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিচ্ছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য নকল বিড়ি, নকল সিগারেট ও নকল ব্যান্ডরোল নির্মূল করা। রিটেইল পর্যায় পর্যন্ত আমাদের পৌঁছাতে হবে; কারণ দোকানদারদের সচেতন ও সতর্ক করা গেলে নকল সিগারেট বিক্রি কঠিন হয়ে পড়বে।’
বিজ্ঞাপন
কাঁচামাল থেকে অনলাইন বিক্রি—সবখানে নজর
কেন্দ্রীয় কমিটির দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে তামাক উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ থেকে শুরু করে সিগারেট উৎপাদন এবং ভোক্তা পর্যায় পর্যন্ত পুরো সরবরাহব্যবস্থা পর্যালোচনা। একই সঙ্গে গত পাঁচ বছরের উৎপাদন, গ্রাহক ও কারখানায় সরবরাহের তথ্য যাচাই করা হবে।
জাল বা পুনর্ব্যবহৃত ব্যান্ডরোল ঠেকাতে বর্তমান নিরাপত্তাব্যবস্থা পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় সুপারিশও করবে কমিটি। পাশাপাশি চোরাচালান, মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে আমদানি এবং অনলাইনে বিদেশি ও নকল সিগারেট বিক্রি বন্ধে কৌশল নির্ধারণের কথা রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে সিগারেটের কাগজ আমদানিকারক সাতটি প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয়ভাবে কাগজ প্রস্তুতকারী দুটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানকেও নজরদারির আওতায় আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
ডিজিটাল ট্র্যাকিংয়ের তাগিদ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এবং বিএনটিটিপির কনভেনর অধ্যাপক ড. রুমানা হক মনে করেন, শুধু অভিযান পরিচালনা করলেই দীর্ঘমেয়াদে রাজস্ব ফাঁকি বন্ধ করা যাবে না। উৎপাদন থেকে বাজার পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে ডিজিটাল ট্র্যাকিং-ট্রেসিং ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন।
বিজ্ঞাপন
তিনি বলেন, ‘উৎপাদন থেকে বাজার পর্যন্ত তামাকপণ্যের গতিপথ নজরদারিতে দ্রুত ট্র্যাকিং-ট্রেসিং এবং কিউআর কোডভিত্তিক ডিজিটাল প্রযুক্তি চালু করা জরুরি।’
তার মতে, কেবল সিগারেট নয়, জর্দা ও গুলের মতো অন্যান্য তামাকজাত পণ্যের ক্ষেত্রেও কিউআর কোডভিত্তিক নজরদারি চালু করা উচিত। একই সঙ্গে এনবিআরের নিজস্ব তথ্যভান্ডার ও গবেষণা সক্ষমতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
ছয় বছরে রাজস্ব বেড়েছে প্রায় ২০ হাজার কোটি
বিজ্ঞাপন
এনবিআরের হিসাবে, ২০২০-২১ অর্থবছরে সিগারেট খাত থেকে রাজস্ব এসেছিল ২৭ হাজার ৯৩০ কোটি টাকা। ২০২১-২২ সালে তা বেড়ে হয় ২৯ হাজার ৬৫৪ কোটি, ২০২২-২৩ সালে ৩২ হাজার ৮১৬ কোটি এবং ২০২৩-২৪ সালে ৩৭ হাজার ৯১৫ কোটি টাকা।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজস্ব আদায় দাঁড়ায় ৪০ হাজার ৪১১ কোটি টাকা। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা আরও বেড়ে ৪৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এর মধ্যে বৃহৎ করদাতা ইউনিট (ভ্যাট) থেকেই এসেছে ৪৩ হাজার ৬৩৮ কোটি টাকা।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
অর্থাৎ রাজস্ব আদায় বাড়লেও অবৈধ বাণিজ্য ও কর ফাঁকির কারণে বিপুল অর্থ সরকারের কোষাগারের বাইরে থেকে যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী অবৈধ তামাক বাণিজ্যের কারণে সরকারগুলো বছরে প্রায় ৪ হাজার ৫০ কোটি ডলার রাজস্ব হারায়। বাংলাদেশেও অবৈধ সিগারেটের বাজার নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। ‘ইনসাইট ম্যাট্রিক্স’-এর দাবি অনুযায়ী, দেশের মোট সিগারেট বাজারের ১৩ দশমিক ১ শতাংশ অবৈধ পণ্যের দখলে।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নকল সিগারেট উৎপাদনের নেটওয়ার্ক থাকার কথাও উঠে এসেছে। পাবনা, কুষ্টিয়া, নাটোর, মানিকগঞ্জ, বগুড়া ও রংপুরকে এ ধরনের উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পাশাপাশি সমুদ্র ও স্থলপথের পাশাপাশি বিমানবন্দর ব্যবহার করে বিদেশি সিগারেট চোরাচালানের অভিযোগও রয়েছে।
অধ্যাপক ড. রুমানা হক বলেন, ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তামাকপাতা সংগ্রহ থেকে শুরু করে উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের প্রতিটি ধাপের নির্ভরযোগ্য তথ্য এনবিআরের নিজস্ব তদারকি ব্যবস্থায় সংগ্রহ করে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিশ্লেষণ করা।’
এনবিআরের নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি ও ২৭টি এনফোর্সমেন্ট টিমের কার্যক্রম তাই কেবল নকল সিগারেট উদ্ধারে সীমাবদ্ধ না থেকে পুরো তামাক সরবরাহব্যবস্থায় রাজস্ব ঝুঁকি শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণ করতে কতটা কার্যকর হয়— সেটিই এখন দেখার বিষয়।








