Logo

আটক পণ্য নিষ্পত্তিতে নিলাম ও বিক্রির নতুন নিয়ম জারি এনবিআরের

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
১৮ আগস্ট, ২০২৬, ১৫:৩৮
আটক পণ্য নিষ্পত্তিতে নিলাম ও বিক্রির নতুন নিয়ম জারি এনবিআরের
ছবি: সংগৃহীত

চোরাচালান, আমদানি-রপ্তানি আইন লঙ্ঘনসহ বিভিন্ন অভিযোগে আটক ও বাজেয়াপ্ত পণ্য নিষ্পত্তির জন্য নতুন স্থায়ী আদেশ জারি করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। নতুন ব্যবস্থায় সাধারণভাবে নিলামের পাশাপাশি নির্দিষ্ট শ্রেণির পণ্য সরকারি প্রতিষ্ঠান বা সংশ্লিষ্ট সংস্থার কাছে বিক্রি, হস্তান্তর কিংবা প্রয়োজন অনুযায়ী ধ্বংস করার পদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

সোমবার (১৭ আগস্ট) এনবিআরের কাস্টমস শাখা থেকে ‘অখালাসকৃত বা চোরাচালানের অভিযোগে আটক ও বাজেয়াপ্তকৃত পণ্যের নিষ্পত্তি পদ্ধতি সংক্রান্ত স্থায়ী আদেশ, ২০২৬’ জারি করা হয়। এতে স্বাক্ষর করেন এনবিআরের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিব।

নতুন আদেশের মাধ্যমে ২০২৫ সালের ২ জুলাই জারি করা আগের স্থায়ী আদেশ বাতিল করা হয়েছে। কাস্টমস আইন, ২০২৩-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে নতুন নির্দেশনাটি জারি করা হয়েছে।

নতুন আদেশে নিলামযোগ্য পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে এনবিআরের চালু করা লাইভ ই-অকশন বা ই-নিলাম ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। তবে ই-নিলাম করা সম্ভব না হলে প্রকাশ্য, তাৎক্ষণিক বা সিল্ড নিলামের মাধ্যমে পণ্য বিক্রির সুযোগ রাখা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

নিলামের মাধ্যমে বিক্রির আগে নির্দিষ্ট শ্রেণির কিছু পণ্য সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠান বা সংস্থার কাছে সরাসরি বিক্রি কিংবা হস্তান্তর করা যাবে।

আটক পণ্য কোথায় জমা দিতে হবে

কাস্টমস, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), পুলিশ, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, কোস্টগার্ড ও আনসারসহ সংশ্লিষ্ট আটককারী কর্তৃপক্ষকে জব্দ করা পণ্য নিকটস্থ কাস্টমস গুদামে জমা দিতে হবে।

বিজ্ঞাপন

সাধারণ পণ্য সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত এবং মূল্যবান ধাতু ও বৈদেশিক মুদ্রা সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত গ্রহণ করা হবে। পচনশীল পণ্য অফিস সময়ের পরও গ্রহণের সুযোগ রাখা হয়েছে।

মূল্যবান ধাতু, হীরা, জুয়েলারি ও বৈদেশিক মুদ্রার ক্ষেত্রে স্বীকৃত যাচাইকারী প্রতিষ্ঠানের সনদ দেওয়ার বিধান রয়েছে। সনদ না পাওয়া গেলে এসব পণ্য সাময়িকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা রাখা যাবে।

মালিক বা দাবিদারকে সুযোগ

বিজ্ঞাপন

আটক পণ্য নিষ্পত্তির আগে আমদানিকারক, রপ্তানিকারক, এজেন্ট বা দাবিদারকে নিজের দাবি প্রতিষ্ঠার সুযোগ দিতে সাত কর্মদিবসের নোটিশ দিতে হবে।

ডাক, কুরিয়ার, ই-মেইল, সংবাদপত্র, ডিজিটাল যোগাযোগ কিংবা নোটিশ বোর্ডের মাধ্যমে এই নোটিশ দেওয়া যাবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দাবিদার প্রয়োজনীয় প্রমাণ দিতে পারলে এবং প্রযোজ্য শুল্ক-কর ও জরিমানা পরিশোধ করলে পণ্য খালাসের সুযোগ থাকবে।

অন্যদিকে দাবিদার পাওয়া না গেলে বা দাবি প্রমাণিত না হলে আইন অনুযায়ী পণ্য রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করে পরবর্তী নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করা হবে।

বিজ্ঞাপন

যেসব পণ্য নিলাম ছাড়াই বিক্রি বা হস্তান্তর করা যাবে

নতুন আদেশে নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে নিলাম ছাড়াই সরকারি প্রতিষ্ঠান বা সংশ্লিষ্ট সংস্থার কাছে বিক্রি ও হস্তান্তরের সুযোগ রাখা হয়েছে। চিনি, লবণ, ডাল ও সয়াবিন তেলের মতো পচনশীল পণ্য বাংলাদেশ ট্রেডিং করপোরেশন (টিসিবি) কিনতে আগ্রহী হলে বোর্ড নির্ধারিত মূল্যে বিক্রি করা যাবে।

স্বর্ণ, রৌপ্য, প্লাটিনাম, হীরা, জুয়েলারি ও বৈদেশিক মুদ্রা বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দেওয়ার বিধান রয়েছে। বিস্ফোরক, আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মতামতের ভিত্তিতে প্রতিরক্ষা বাহিনী বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে হস্তান্তর করা যাবে।

বিজ্ঞাপন

এ ছাড়া মদ ও মদ্যজাতীয় পানীয় এবং বিদেশি সিগারেট বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের কাছে বিক্রির সুযোগ রয়েছে। প্রত্নসম্পদ জাতীয় বা আঞ্চলিক জাদুঘর কিংবা সরকারি দপ্তরে হস্তান্তর করা যাবে।

প্রাণী বা প্রাণীর দেহাবশেষ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে বিনামূল্যে দেওয়া যাবে। ওষুধের কাঁচামাল ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের অনুমোদন সাপেক্ষে এসেনশিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেড বা রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করা যাবে।

বিএমটিএফের কাছেও বিক্রির সুযোগ

বিজ্ঞাপন

পরিশিষ্টে নির্দিষ্ট করে দেওয়া ৫৩ ধরনের পণ্য বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি লিমিটেডের (বিএমটিএফ) কাছে সংরক্ষিত মূল্যের ন্যূনতম ৬০ শতাংশ দামে বিক্রির সুযোগ রাখা হয়েছে।

তালিকায় খাদ্যপণ্য, মসলা, ভোজ্যতেল, রাসায়নিক, কসমেটিকস, প্লাস্টিক, চামড়া, কাঠ, কাগজ, পোশাক, জুতা, টাইলস, ধাতু, যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রনিকস, মোবাইল, যানবাহন, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ফার্নিচারসহ বিভিন্ন পণ্য রয়েছে।

নিলামে অংশগ্রহণের যোগ্যতা

বিজ্ঞাপন

প্রাতিষ্ঠানিক দরদাতার ক্ষেত্রে হালনাগাদ ট্রেড লাইসেন্স, মূসক নিবন্ধন, টিআইএন সনদ এবং আয়কর রিটার্ন দাখিলের প্রত্যয়নপত্র থাকতে হবে। ব্যক্তি দরদাতার ক্ষেত্রে জাতীয় পরিচয়পত্র, টিআইএন সনদ ও আয়কর রিটার্ন দাখিলের প্রত্যয়নপত্র প্রয়োজন হবে।

প্রতিটি লটের সংরক্ষিত মূল্যের ৫ শতাংশ হারে ফেরতযোগ্য জামানত দিতে হবে। ই-নিলামের ক্ষেত্রে ই-পেমেন্ট এবং অন্যান্য নিলামের ক্ষেত্রে পে-অর্ডার, ই-পেমেন্ট বা যাচাইযোগ্য নেগোশিয়েবল ইন্সট্রুমেন্টের মাধ্যমে জামানত দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

নিলামের আগে প্রচার ও পরিদর্শন

বিজ্ঞাপন

নিলাম অনুষ্ঠানের কমপক্ষে সাত কর্মদিবস আগে একটি জাতীয় ও একটি স্থানীয় দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে হবে। পাশাপাশি এনবিআর ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ওয়েবসাইটেও বিজ্ঞপ্তি দিতে হবে।

আগ্রহী ক্রেতাদের নিলামের আগে পণ্য পরিদর্শনের সুযোগ দিতে হবে। নিলামের দুই দিন আগে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করতে হবে।

প্রচলিত পদ্ধতির নিলামে প্রথমবার সংরক্ষিত মূল্যের অন্তত ৬০ শতাংশ দর পাওয়া গেলে সর্বোচ্চ দরদাতার কাছে বিক্রির সুপারিশ করা হবে। বিক্রি না হলে দ্বিতীয় ও তৃতীয় নিলামের ব্যবস্থা করা যাবে। তিন দফাতেও পণ্য বিক্রি না হলে মেগালট করে পরবর্তী নিলামে তোলার সুযোগ রাখা হয়েছে।

ই-নিলামের ক্ষেত্রে প্রথম নিলামকেই চূড়ান্ত হিসেবে গণ্য করা হবে। সফটওয়্যার স্বয়ংক্রিয়ভাবে দরদাতাদের তুলনামূলক তালিকা তৈরি করবে এবং নিলাম কমিটি সর্বোচ্চ গ্রহণযোগ্য দরদাতাকে নির্বাচনের সুপারিশ করবে।

অর্থ পরিশোধ ও পণ্য খালাসে সময়সীমা

নিলাম কমিটির সুপারিশ পাওয়ার পর তিন কর্মদিবসের মধ্যে কমিশনারকে তা অনুমোদন অথবা যুক্তিসংগত কারণ দেখিয়ে আইনানুগ সিদ্ধান্ত দিতে হবে।

অনুমোদনের পর তিন কর্মদিবসের মধ্যে বিজয়ী দরদাতার অনুকূলে বিক্রয়াদেশ দিতে হবে। এরপর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দরমূল্য, উৎসে প্রযোজ্য আয়কর ও মূসক পরিশোধ করতে হবে।

অর্থ পরিশোধের পর তিন কর্মদিবসের মধ্যে ডেলিভারি অর্ডার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ডেলিভারি অর্ডার পাওয়ার পর তিন কর্মদিবসের মধ্যে পণ্য খালাস নিতে হবে।

নির্ধারিত বা বর্ধিত সময়েও পণ্য গ্রহণ না করলে বিক্রয় অনুমোদন বাতিল করা হবে। একই সঙ্গে বিজয়ী দরদাতার জামানত রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করে পণ্য পুনরায় নিলামে তোলা হবে।

ধ্বংস করা হবে যেসব পণ্য

নিলামে বিক্রি করা সম্ভব নয় এমন নিয়ন্ত্রিত, নিষিদ্ধ, গুণগতমান নষ্ট বা ধ্বংসযোগ্য পণ্য বিশেষায়িত সংস্থার কাছে বিনামূল্যে হস্তান্তর করে ধ্বংস বা নিষ্ক্রিয় করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

নিষিদ্ধ পণ্য, মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য এবং নির্ধারিত প্রতিষ্ঠানের কাছে মদ, মদ্যজাতীয় পানীয় বা বিদেশি সিগারেট বিক্রি সম্ভব না হলে সেগুলোও ধ্বংস করা যাবে।

আরও পড়ুন

ধ্বংস কার্যক্রমের জন্য কাস্টমস, জেলা প্রশাসন, পুলিশ, বন্দর কর্তৃপক্ষ, সিভিল এভিয়েশন, বাংলাদেশ বিমান, বিজিবি বা কোস্টগার্ড, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ফায়ার সার্ভিসের প্রতিনিধিদের নিয়ে কমিটি গঠনের বিধান রয়েছে।

ধ্বংসের আগে পণ্যের বিস্তারিত ইনভেন্টরি তৈরি করতে হবে। এতে পণ্যের বিবরণ, পরিমাণ, ব্র্যান্ড, মডেল, আর্ট নম্বর, পার্ট নম্বর, উৎপাদন সাল, উৎপাদনকারী দেশসহ প্রাসঙ্গিক তথ্য উল্লেখ করতে হবে।

অনিয়ম করলে কালো তালিকাভুক্তি

নিলাম কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি, মিথ্যা তথ্য বা জাল দলিল দাখিল, নির্ধারিত সময়ে জামানত না দেওয়া কিংবা অন্য দরদাতাকে ভয়ভীতি প্রদর্শনের মতো ঘটনা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করা হবে।

প্রয়োজনে প্রচলিত আইনে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থাও নেওয়া যাবে।

নিলাম ও ধ্বংস কার্যক্রমের প্রতিবেদন নিয়মিতভাবে প্রস্তুত করে প্রতি মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে এনবিআরের নিলাম শাখায় পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

নতুন স্থায়ী আদেশটি অবিলম্বে কার্যকর হবে। এতে আটক ও বাজেয়াপ্ত পণ্যের ব্যবস্থাপনায় ই-নিলাম, নির্দিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানে হস্তান্তর এবং নিয়ন্ত্রিত পণ্য ধ্বংসের ক্ষেত্রে আগের তুলনায় আরও কাঠামোবদ্ধ প্রক্রিয়া নির্ধারণ করা হয়েছে।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD