Logo

ইসলামী ব্যাংকের সংকটে তোপের মুখে বাংলাদেশ ব্যাংক

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১৭:২০
ইসলামী ব্যাংকের সংকটে তোপের মুখে বাংলাদেশ ব্যাংক
ছবি: সংগৃহীত

দেশের ব্যাংকিং খাতের উল্লেখযোগ্য অংশ শরিয়াহভিত্তিক হলেও মুদ্রানীতিতে ইসলামী ব্যাংকিংকে যথাযথ গুরুত্ব না দেওয়া, একটি ইসলামী ব্যাংক থেকে এক মাসে বিপুল আমানত তুলে নেওয়া এবং দীর্ঘদিন খেলাপি ঋণের প্রকৃত তথ্য গোপন রাখার অভিযোগে বাংলাদেশ ব্যাংকের তীব্র সমালোচনা করেছেন সংসদীয় কমিটির সদস্যরা।

বিজ্ঞাপন

জাতীয় সংসদের অর্থ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠকে এসব বিষয় নিয়ে গভর্নরসহ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের কাছে ব্যাখ্যা চান সদস্যরা। একই সঙ্গে ইসলামী ব্যাংকিংয়ে শরিয়াহ বোর্ডের দুর্বলতা, ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের ঘাটতি এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদারকি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়।

সম্প্রতি জাতীয় সংসদ ভবনের ক্যাবিনেট কক্ষে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অর্থ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। কমিটির সভাপতি মুশফিকুর রহমান এমপির সভাপতিত্বে সভায় উপস্থিত ছিলেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান, ডেপুটি গভর্নর ড. মো. হাবিবুর রহমান, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারক, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে তথ্য ঘাটতির অভিযোগ

বিজ্ঞাপন

বৈঠকের শুরুতে কমিটির সভাপতি মুশফিকুর রহমান সংসদীয় স্থায়ী কমিটিকে ‘মিনি পার্লামেন্ট’ হিসেবে উল্লেখ করে সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে কমিটির সাংবিধানিক গুরুত্ব তুলে ধরেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের উপস্থাপিত প্রতিবেদন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রতিবেদনটি তথ্যসমৃদ্ধ হলেও অতিরিক্ত কারিগরি ও জটিল। ফলে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সহজ ও সংক্ষিপ্তভাবে উপস্থাপন করা প্রয়োজন।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

তিনি অভিযোগ করেন, প্রতিবেদনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাংগঠনিক কাঠামো, জনবল ও দায়িত্ব বণ্টনের পাশাপাশি গত তিন থেকে চার বছরের মুদ্রানীতির কার্যকারিতা এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংকের সুনির্দিষ্ট ভূমিকা সম্পর্কে পর্যাপ্ত ব্যাখ্যা নেই। সরকারের বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থানমুখী নীতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কীভাবে সহায়তা করছে, সেই বিষয়েও বিস্তারিত ব্যাখ্যা চান তিনি।

মূল্যস্ফীতিই এখন মুদ্রানীতির প্রধান লক্ষ্য

বিজ্ঞাপন

কমিটির প্রশ্নের জবাবে গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে মুদ্রানীতি পরিচালনা করা হচ্ছে।

বিষয়টির কারিগরি দিক ব্যাখ্যার জন্য তিনি ডেপুটি গভর্নর ড. মো. হাবিবুর রহমানকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দিতে সভাপতির কাছে অনুরোধ করেন।

পরে পাওয়ার পয়েন্ট উপস্থাপনায় ডেপুটি গভর্নর জানান, বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার, ১৯৭২ অনুযায়ী কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ছয়টি মূল বিধিবদ্ধ দায়িত্ব রয়েছে। এর মধ্যে মুদ্রানীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।

বিজ্ঞাপন

তার ভাষ্য অনুযায়ী, মুদ্রানীতির প্রধান উদ্দেশ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে সহায়তা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। এর পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রাবাজার ব্যবস্থাপনা, রিজার্ভ পরিচালনা, নতুন মুদ্রা ও নোট ইস্যু, আধুনিক পেমেন্ট ব্যবস্থা এবং তফসিলি ব্যাংকের তদারকিও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।

‘মানি টার্গেটিং’ থেকে নীতি সুদভিত্তিক মুদ্রানীতি

ডেপুটি গভর্নর দেশের মুদ্রানীতির বিবর্তন তুলে ধরে জানান, ১৯৯৩ সালে ‘মনিটারি ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড টেকনিক্যাল ইউনিট’ গঠনের মাধ্যমে মুদ্রানীতি ব্যবস্থাপনায় প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে এটি পূর্ণাঙ্গ ‘মনিটারি পলিসি ডিপার্টমেন্ট’-এ রূপ নেয়।

বিজ্ঞাপন

বিনিময় হার ব্যবস্থাপনাতেও পর্যায়ক্রমে পরিবর্তন আনা হয়। ২০০৩ সালে ‘ফিক্সড এক্সচেঞ্জ রেট’ থেকে ‘ফ্লোটিং এক্সচেঞ্জ রেট রেজিম’ এবং ২০২৩ সালে ‘ক্রলিং পেগ রেজিম’ চালু করা হয়।

তিনি জানান, একসময় ‘মানি সাপ্লাই’, ‘রিজার্ভ মানি’ ও ‘হাই পাওয়ারড মানি’কে মুদ্রানীতির প্রধান লক্ষ্য ধরা হলেও সময়ের সঙ্গে অর্থ সরবরাহ ও মূল্যস্ফীতির মধ্যকার আগের সম্পর্ক দুর্বল হয়েছে। ফলে বাংলাদেশ ব্যাংকও অন্যান্য আধুনিক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতো ‘মনিটারি টার্গেটিং’ থেকে সরে ‘ইন্টারেস্ট রেট টার্গেটিং’ বা নীতি সুদভিত্তিক ব্যবস্থায় গেছে।

গত তিন বছরে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নীতি সুদের হার বাড়ানো হলেও সরবরাহ-পক্ষের বিভিন্ন সমস্যা থাকায় প্রত্যাশিত ফল পুরোপুরি পাওয়া যায়নি বলে জানান তিনি। তবে এর মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও বিনিময় হার ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি প্রণোদনা প্যাকেজ বিবেচনায় রয়েছে বলেও জানান ডেপুটি গভর্নর।

উচ্চ সুদে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান কমেছে: গভর্নর

গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান বলেন, প্রচলিত অর্থনৈতিক তত্ত্ব অনুযায়ী সুদের হার বাড়লে মূল্যস্ফীতি কমার কথা। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় সেই সম্পর্ক কার্যকরভাবে প্রতিফলিত হয়নি।

বিজ্ঞাপন

২০২৩ সাল থেকে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করা হলেও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছাড়া অন্যান্য কিছু সূচকে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি। বরং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ও কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়েছে বলে তিনি জানান।

বাংলাদেশ আমদানিনির্ভর হওয়ায় মূল্যস্ফীতির বড় অংশ সরবরাহ-পক্ষের সমস্যা থেকে তৈরি হচ্ছে উল্লেখ করে গভর্নর বলেন, উচ্চ সুদের কারণে উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ছে। এ কারণে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে নীতি সুদের হার পুনর্মূল্যায়নের জন্য বিশেষ সভা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

ব্যাংকিং খাতের সংকট সামাল দিতে নতুন উদ্যোগ

বিজ্ঞাপন

গভর্নর জানান, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় ব্যাংকিং খাত বড় ধরনের সংকটে ছিল। অনিয়ম, বিপুল আমানত পাচার ও তারল্য সংকটে কয়েকটি ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।

এ পরিস্থিতিতে নীতি সুদের পাশাপাশি অন্যান্য পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে। বাণিজ্যভিত্তিক অর্থ পাচার ঠেকাতে সুদের মার্জিন বেঞ্চমার্ক প্লাস চার শতাংশ থেকে কমিয়ে তিন শতাংশ করা হয়েছে এবং ব্যাংকের সুদের ‘স্প্রেড’ সর্বোচ্চ চার শতাংশে সীমিত করা হয়েছে।

খেলাপি ঋণ আদায়ে ১৮ মাসের একটি রোডম্যাপ নেওয়া হয়েছে। এর প্রথম ছয় মাসে ব্যাংক ও গ্রাহকের মধ্যে সমঝোতার সুযোগ থাকবে। পরবর্তী ১২ মাসে ‘ডিস্ট্রেসড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট অ্যাক্ট’ এবং সংশোধিত ‘অর্থ ঋণ আদালত আইন’ প্রয়োগের মাধ্যমে দ্রুত মামলা নিষ্পত্তির প্রস্তাব রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

এ ছাড়া ঋণের প্রকৃত সুবিধাভোগী বা ‘আল্টিমেট বেনিফিশিয়ারি’ শনাক্ত করে তাদের আইনি জবাবদিহির আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান গভর্নর।

গোপন খেলাপি ঋণের তথ্য প্রকাশের উদ্যোগ

৬০ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত প্রণোদনা প্যাকেজে অতীতের মতো অর্থের অপব্যবহার ঠেকাতে কঠোর শর্ত দেওয়ার কথা জানান গভর্নর। বড় শিল্পগোষ্ঠীর পরিবর্তে ক্ষুদ্র ও উৎপাদনমুখী উদ্যোক্তাদের অগ্রাধিকার দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

তিনি বলেন, কয়েকটি ব্যাংকে ইতোমধ্যে বিশেষ নিরীক্ষা, সম্পদের মান যাচাই এবং ফরেনসিক অডিট শুরু হয়েছে। দীর্ঘদিন গোপন রাখা খেলাপি ঋণের তথ্যও ধাপে ধাপে প্রকাশ করা হচ্ছে।

মুদ্রানীতি প্রতি ছয় মাসের পরিবর্তে তিন মাস অন্তর পর্যালোচনার বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে পরিসংখ্যান ব্যুরোর সঙ্গে খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের বাস্কেটের তথ্য সংশোধন, আইএফআরএস-৯ পর্যায়ক্রমে চালু, ওয়েবসাইট আধুনিকায়ন এবং মুদ্রানীতির দ্বিভাষিক সংস্করণ প্রকাশের উদ্যোগের কথাও জানান গভর্নর।

রুগ্ন শিল্পের তহবিলের জন্য আলাদা স্টিয়ারিং কমিটি গঠন এবং ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থায় শরিয়াহ বোর্ড পুনর্গঠন ও শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি।

এক মাসে ২৪ হাজার কোটি টাকা উত্তোলন নিয়ে প্রশ্ন

বৈঠকে সংসদ সদস্য মো. সাইফুল আলম দেশের অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে নীতি সুদের হার একক অঙ্কে নামিয়ে আনার আহ্বান জানান। তার মতে, তা কোনোভাবেই সাড়ে নয় শতাংশের বেশি হওয়া উচিত নয়।

খেলাপি ঋণ উদ্ধারে তৃতীয় পক্ষ নিয়োগের ক্ষেত্রে শতভাগ স্বচ্ছতা ও উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার দাবি জানান তিনি। ঋণ খেলাপির দায় শুধু গ্রাহকের ওপর না দিয়ে ঋণ অনুমোদনকারী ব্যাংক পরিচালকদেরও জবাবদিহির আওতায় আনার জন্য আইন সংশোধনের আহ্বান জানান।

তিনি অতীতে প্রণোদনার অর্থ অপব্যবহারের বিষয়টি তুলে ধরে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও নিরাপদ ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করার তাগিদ দেন।

বৈঠকে একটি ইসলামী ব্যাংক থেকে মাত্র এক মাসে ২৪ হাজার কোটি টাকা আমানত তুলে নেওয়ার ঘটনাও তিনি তুলে ধরেন এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার আহ্বান জানান।

ইসলামী ব্যাংকিংয়ে আলাদা গুরুত্বের দাবি

সংসদ সদস্য জয়নুল আবেদীন বলেন, দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রায় ৩০ শতাংশ শরিয়াহভিত্তিক হওয়ায় মুদ্রানীতিতে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের জন্য সুস্পষ্ট ও কার্যকর প্রতিফলন থাকা প্রয়োজন।

তিনি অতীতে অনুসৃত ‘নয়/ছয়’ সুদ ব্যবস্থার অভিজ্ঞতা থেকে সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানান। ঋণ পুনঃতফসিলীকরণ নীতি কঠোর করে নামমাত্র অর্থ পরিশোধের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা নেওয়ার সুযোগ বন্ধ করার সুপারিশ করেন।

তার মতে, ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত প্রণোদনা যেন অনুৎপাদনশীল খাতে বা খেলাপি ঋণের পুনঃঅর্থায়নে চলে না যায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ইসলামী ব্যাংকিং বিভাগকে আরও শক্তিশালী করা এবং মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ‘দ্বৈত ব্যাংকিং ব্যবস্থা’ গড়ে তোলার পরামর্শও দেন তিনি। পাশাপাশি তিন মাস অন্তর মুদ্রানীতি পর্যালোচনার দাবি জানান।

৬০ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ নিয়ে প্রশ্ন

সংসদ সদস্য মো. আবুল হাসনাত ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজে ১৯ হাজার কোটি টাকা ‘হাই পাওয়ারড মানি’ থেকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি কমানোর চেষ্টা চলার মধ্যে এই অর্থ সরবরাহ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা জানতে চান তিনি। মানি মাল্টিপ্লায়ারের মাধ্যমে অর্থ সরবরাহ কতটা বাড়তে পারে এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকের পরিবর্তে রিজার্ভ মানি ব্যবহারের কারণও জানতে চান।

মার্চের হিসাবে খেলাপি ঋণ ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ দেখানো হলেও এর বাইরে অঘোষিত খেলাপি রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। এসব তথ্য দ্রুত প্রকাশ ও নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি মুদ্রানীতির সহজবোধ্য বাংলা সংস্করণ প্রকাশের সুপারিশ করেন।

রুগ্ন শিল্পের ২০ হাজার কোটি টাকার তহবিল নিয়েও প্রশ্ন

সংসদ সদস্য মঈনুল ইসলাম খান রুগ্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য ঘোষিত ২০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল কীভাবে এবং কোন শ্রেণির শিল্পে বিতরণ করা হবে, তা জানতে চান।

বন্ধ কারখানা পুনরায় চালু, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং তহবিল ব্যবহারের ওপর নজরদারি কীভাবে হবে, সে বিষয়েও বিস্তারিত ব্যাখ্যা চান তিনি। আগের ‘এককালীন প্রস্থান’ বা ‘ওয়ান-টাইম এক্সিট’ সুবিধার ফলাফল এবং বর্তমান উদ্যোগ বাস্তবায়নে বেসরকারি ব্যাংকের অনীহা থাকলে বাংলাদেশ ব্যাংক কী ব্যবস্থা নেবে, সেটিও জানতে চান।

নীতি সুদ কমানোর জোর দাবি

সংসদ সদস্য মো. শাহাদাত হোসেন বর্তমান সংকোচনমূলক মুদ্রানীতিতে নীতি সুদের হার অপরিবর্তিত রাখাকে হতাশাজনক বলে মন্তব্য করেন। উচ্চ সুদের কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে উল্লেখ করে দ্রুত হার কমানোর দাবি জানান তিনি।

তিনি ‘নিরাপদ প্রস্থান’ বা ‘সেফ এক্সিট’ সুবিধার সময়সীমা ৩০ ডিসেম্বরের পরিবর্তে ৩০ জুন পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দেন। একটি প্রতিষ্ঠানের সমস্যার কারণে অন্য ভালো প্রতিষ্ঠানের সিআইবি প্রতিবেদনে যেন নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে, সেদিকেও নজর দেওয়ার আহ্বান জানান।

এসএমই উদ্যোক্তাদের ঋণপ্রাপ্তি সহজ করা এবং ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের অনিয়ম তদন্তে সংসদীয় উপকমিটি গঠনের প্রস্তাবও দেন তিনি।

রাজনৈতিক তদবির ও স্বজনপ্রীতির আশঙ্কা

সংসদ সদস্য মো. জালাল উদ্দিন মুদ্রানীতির সংবেদনশীলতার কথা বিবেচনা করে বৈঠকের আগেই কার্যপত্র সদস্যদের হাতে পৌঁছে দেওয়ার দাবি জানান।

তিনি বলেন, সুদভিত্তিক নীতি থেকে মূল্যস্ফীতি-লক্ষ্যভিত্তিক নীতিতে যেতে হলে সিন্ডিকেট, চাঁদাবাজি, সরবরাহ ব্যবস্থার ত্রুটি ও তথ্যের ঘাটতি দূর করতে হবে।

ব্যাংকিং খাতের বিপর্যয় ও অর্থ লুটপাটের সঙ্গে জড়িত মূল হোতা ও সহযোগীদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি। পাশাপাশি এ বিষয়ে একটি সংসদীয় উপকমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন।

মুদ্রানীতি তিন মাস অন্তর পর্যালোচনার দাবি

সংসদ সদস্য মো. আবুল হাসনাত ছাড়াও কয়েকজন সদস্য মুদ্রানীতি তিন মাস অন্তর পর্যালোচনার ওপর গুরুত্ব দেন। তাদের মতে, ছয় মাস পরপর পর্যালোচনার কারণে নীতিগত ভুল সংশোধনে অতিরিক্ত সময় লেগে যায়।

ভারতের ‘মুদ্রানীতি জবাবদিহিতা কমিটি’র আদলে নিয়মিত পর্যালোচনা ব্যবস্থা চালুর পরামর্শ দেওয়া হয়। মূল্যস্ফীতি পরিমাপের বাস্কেট আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে আসে।

বৈঠকের কাগজপত্র নিয়েও অসন্তোষ

বৈঠকে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ ও কমিটির সদস্য মো. নূরুল ইসলাম কার্যপত্র দেরিতে পাওয়ার কারণ জানতে চান।

আরও পড়ুন

কমিটি সচিব জানান, সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসের শেষে কার্যপত্র হাতে পাওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে হোয়াটসঅ্যাপ এবং বিশেষ বাহকের মাধ্যমে সদস্যদের কাছে পাঠানো হয়েছে। এ সংক্রান্ত চালানও সংরক্ষিত রয়েছে।

ভবিষ্যতে সভার অন্তত এক থেকে দুই দিন আগে কার্যপত্র ও উপস্থাপনার লিখিত কপি সরবরাহের নির্দেশ দেন চিফ হুইপ। এতে সদস্যরা আগেভাগে প্রস্তুতি নিয়ে আরও কার্যকর আলোচনা করতে পারবেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।

অর্থমন্ত্রীর জবাবদিহিতার ওপর জোর

কমিটির সদস্য ও অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সংসদীয় স্থায়ী কমিটি সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক মাধ্যম।

তিনি সদস্যদের পর্যাপ্ত প্রস্তুতির জন্য সভার অন্তত এক বা দুই দিন আগে কার্যপত্র সরবরাহের ওপর জোর দেন। আগামীতে পর্যাপ্ত সময় নিয়ে নিয়মিত বৈঠক করার পাশাপাশি অর্থনীতির বিভিন্ন সূচক গভীরভাবে পর্যালোচনার আশ্বাস দেন।

অর্থমন্ত্রী বলেন, পরিচয়মূলক হওয়ায় এ বৈঠকে প্রাথমিক মতামত ও গভর্নরের ব্যাখ্যা নেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে কমিটি সরকারের অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে ওয়াচডগ হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে।

পরের বৈঠকে ঋণের সুদ ও উদ্যোক্তা সংকট

সমাপনী বক্তব্যে সভাপতি মুশফিকুর রহমান আবারও সভার অন্তত দুই দিন আগে কার্যপত্র সরবরাহের নির্দেশনা দেন। তিনি বলেন, অর্থ মন্ত্রণালয় ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা বাড়লে দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ পরিবেশও উন্নত হবে।

পরবর্তী বৈঠকে ব্যাংকিং খাত, কস্ট অব ফান্ড, ঋণের কার্যকর সুদের হার এবং উদ্যোক্তাদের সমস্যাকে আলোচনার মূল বিষয় করার কথা জানান তিনি। উদ্যোক্তাদের অভিযোগ অনুযায়ী, ঋণের প্রকৃত সুদের হার ১৮ থেকে ১৯ শতাংশে পৌঁছে যাচ্ছে—এ বিষয়টিও পর্যালোচনা করা হবে।

সভাপতি বলেন, বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়াতে শুধু মুদ্রানীতি নয়, সমন্বিত সম্প্রসারণমূলক অর্থনৈতিক নীতি প্রয়োজন। এনবিআরসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংস্থাকে নিয়ে পর্যায়ক্রমে বৈঠক করা হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের নেওয়া পদক্ষেপগুলোর বাস্তব অগ্রগতি পর্যালোচনা করে অর্থনীতির নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনে সংসদীয় কমিটি তার সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করবে।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD