Logo

জ্বালানি আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে ৩৫ হাজার কোটি টাকা

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১৩:৪৮
জ্বালানি আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে ৩৫ হাজার কোটি টাকা
ছবি: সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক বাজারে তেল, গ্যাস ও কয়লার দাম বর্তমান পর্যায়ে থাকলে ২০২৬ সালে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি ব্যয় গত বছরের তুলনায় সর্বোচ্চ ২৮০ কোটি মার্কিন ডলার বা প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা বাড়তে পারে। এতে দেশের বাণিজ্য ঘাটতি ও মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ার পাশাপাশি টাকার ওপরও অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

জ্বালানি আমদানির এই বাড়তি ব্যয়ের পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির ওপর বাংলাদেশের উচ্চ নির্ভরতার কথা উঠে এসেছে। আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা জিরো কার্বন অ্যানালিটিকস (জেডসিএ) বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে এ তথ্য জানিয়েছে।

সংস্থাটির হিসাব বলছে, চলতি বছর বাংলাদেশের জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানিতে ব্যয় ২০২৫ সালের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ বাড়তে পারে। অতিরিক্ত এই ব্যয় দেশের মোট বাণিজ্য ঘাটতির প্রায় ১০ শতাংশের সমান।

জেডসিএর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বর্তমান পর্যায়ে স্থির থাকলে আমদানি ব্যয় মেটানোর সক্ষমতাও কিছুটা কমে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আমদানি কভার ৫ দশমিক ৭ মাস থেকে নেমে প্রায় ৫ দশমিক ২ মাস হতে পারে।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

শুধু আমদানিতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় নয়, এই অর্থ বিকল্প জ্বালানি অবকাঠামোতেও ব্যবহার করা যেত। জেডসিএ বলছে, ২০২৬ সালে জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানিতে যে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হতে পারে, তা দিয়ে প্রায় ৮ গিগাওয়াট ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করা সম্ভব। এতে দেশের বর্তমান প্রায় ৩২ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার সঙ্গে আরও প্রায় ২৫ শতাংশ সক্ষমতা যুক্ত হতে পারে।

বিজ্ঞাপন

এলএনজি আমদানি কমলেও ব্যয় বাড়ছে

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশের এলএনজি আমদানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৩ শতাংশ কমেছে। তবে জুলাই ও আগস্টে হরমুজ প্রণালিতে সরবরাহ বিঘ্নের কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। ওই দুই মাসে এলএনজি আমদানি প্রায় ৮৩ শতাংশ কমে যায়।

জেডসিএর তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ে বাংলাদেশ প্রায় ৬ লাখ ৩০ হাজার টন এলএনজি আমদানি করেছিল। আগস্টে তা কমে দাঁড়ায় মাত্র ১ লাখ ১০ হাজার টনে।

বিজ্ঞাপন

তবে আমদানির পরিমাণ কমলেও আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে সামগ্রিক ব্যয় কমেনি। বরং ভবিষ্যতে আমদানি ব্যয় আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৬৪ শতাংশ গ্যাসনির্ভর হওয়ায় এলএনজি সরবরাহে বিঘ্নের সরাসরি প্রভাব পড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। গত ১১ আগস্ট দেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ ঘাটতি ৩ হাজার ৫৯২ মেগাওয়াটে পৌঁছেছিল, যা ওই সময়ের মোট চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশ।

শিল্প ও কৃষিতেও বাড়ছে সংকট

বিজ্ঞাপন

জ্বালানি সংকটের প্রভাব বিদ্যুৎ খাতের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে। শিল্প ও কৃষি উৎপাদনেও এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে। জেডসিএর তথ্য অনুযায়ী, দেশের সাতটি বড় সার কারখানার মধ্যে ছয়টি গ্যাসের অপর্যাপ্ত সরবরাহের কারণে বন্ধ রয়েছে অথবা সীমিত সক্ষমতায় উৎপাদন করছে।

রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকশিল্পও গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সাভার, আশুলিয়া ও ধামরাইয়ের কয়েকটি কারখানায় উৎপাদন ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া কিছু গ্রামীণ এলাকায় প্রতিদিন আট থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিভ্রাটের খবরও পাওয়া যাচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থায় ঝুঁকি

বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের দীর্ঘমেয়াদি দুর্বলতা হিসেবেও আমদানিনির্ভরতাকে চিহ্নিত করেছে জেডসিএ। সংস্থাটির হিসাবে, ২০২৩ সালে দেশের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় ৪৬ শতাংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হয়েছিল। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ৬৫ শতাংশের সঙ্গে আমদানিনির্ভর জ্বালানি যুক্ত ছিল।

এদিকে ২০২৫ সালে বাংলাদেশের এলএনজি সরবরাহের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ হরমুজ প্রণালি হয়ে এসেছে। ফলে ওই অঞ্চলে সরবরাহে কোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটলে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ স্পট মার্কেটসহ বিভিন্ন উৎস থেকে এলএনজি সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে। আগস্ট ও সেপ্টেম্বরের জন্য দুটি স্পট এলএনজি কার্গো অনুমোদনের পাশাপাশি যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া ও ওমানের সরবরাহকারীদের কাছ থেকে আরও আটটি কার্গো সংগ্রহ করা হয়েছে। ভারত থেকেও অতিরিক্ত ডিজেল চাওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, দীর্ঘমেয়াদে এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। ২০২৬ থেকে ২০৩৮ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১১৭টি এলএনজি কার্গো কেনার চুক্তি করেছে বাংলাদেশ।

তবে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি থাকলেও বৈশ্বিক সংকটের সময় সরবরাহ নিশ্চিত হওয়ার নিশ্চয়তা নেই। জেডসিএর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বর্তমান সংকটের মধ্যে বাংলাদেশের তিনটি বড় এলএনজি সরবরাহকারী চুক্তির আওতায় সরবরাহের ক্ষেত্রে ‘ফোর্স মেজর’ ঘোষণা করেছে।

বিজ্ঞাপন

এলএনজির বিকল্প খোঁজার তাগিদ

চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাকির হোসেন খান বলেন, এলএনজি বাংলাদেশের জ্বালানি স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে পারে না। বৈশ্বিক সংকটের সময় সরবরাহ চুক্তি থাকলেও নির্ধারিত সময়ে গ্যাস দেশের বন্দরে পৌঁছানোর নিশ্চয়তা নেই। অথচ এর ব্যয় বাড়তেই থাকবে।

তিনি বলেন, এলএনজিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থায় ঝুঁকি বেশি। তাই নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে, বিশেষ করে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতে বিনিয়োগ বাড়ানো দরকার।

বিজ্ঞাপন

ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) বাংলাদেশের প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলমও এলএনজিনির্ভরতা বাড়ানোকে টেকসই সমাধান হিসেবে দেখছেন না।

তার হিসাব অনুযায়ী, পরিকল্পিত নতুন এলএনজি টার্মিনালগুলো চালু হলে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের এলএনজি আমদানি ৭০০ বিলিয়ন ঘনফুট ছাড়িয়ে যেতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারদরের ওপর নির্ভর করে এতে বছরে ৮৫০ কোটি থেকে ১ হাজার ৪০০ কোটি ডলার পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে।

শফিকুল আলম বলেন, এ ধরনের নির্ভরতা বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়াবে এবং শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা কমাবে। অথচ এতে দেশের জ্বালানি ব্যবস্থার সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়বে না।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

তার মতে, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ, ব্যাটারি সংরক্ষণব্যবস্থা এবং আন্তঃসীমান্ত জলবিদ্যুতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

সৌরবিদ্যুতে বিকল্প সম্ভাবনা

জ্বালানি আমদানির ওপর চাপ কমাতে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎকে সম্ভাবনাময় বিকল্প হিসেবে দেখছে জেডসিএ। ২০২৫ সালে বাংলাদেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাত্র ৫ শতাংশের কিছু বেশি এসেছিল নবায়নযোগ্য উৎস থেকে। ওই বছর দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির স্থাপিত সক্ষমতা ছিল ১ দশমিক ৪৯ গিগাওয়াট।

আইইইএফএর হিসাব অনুযায়ী, ১ মেগাওয়াট ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করলে বছরে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার ডলারের আমদানি করা জ্বালানি ব্যয় সাশ্রয় করা সম্ভব।

বাংলাদেশের ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য পূরণ করতে ২০৩০ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর প্রায় ৭৬০ মেগাওয়াট নতুন নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ সক্ষমতা যুক্ত করার প্রয়োজন হবে। কিন্তু চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নির্মাণাধীন নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর মোট সক্ষমতা ছিল মাত্র ৩৫৮ মেগাওয়াট।

ফলে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় শুধু আমদানি বাড়ানোর পরিবর্তে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বৃদ্ধি, সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণ এবং অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়ার প্রয়োজনীয়তাই বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। দীর্ঘমেয়াদে এসব উদ্যোগই জ্বালানি আমদানির চাপ কমিয়ে দেশের অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তাকে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রাখতে পারে।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD