মাথাপিছু আয়ে ভারতকে পেছনে ফেলতে পারে বাংলাদেশ

মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) বিবেচনায় ভারতকে ছাড়িয়ে যাওয়ার পথে রয়েছে বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছর বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি দাঁড়াতে পারে ২ হাজার ৮৮৬ ডলারে। অন্যদিকে ভারতের ক্ষেত্রে এই পরিমাণ হতে পারে ২ হাজার ৭৪৯ ডলার।
বিজ্ঞাপন
তবে মাথাপিছু জিডিপিতে এগিয়ে থাকলেই একটি দেশের মানুষের জীবনযাত্রার মান অন্য দেশের তুলনায় ভালো—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। মূল্যস্ফীতি, প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা, আয়বৈষম্য এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মতো বিষয়ও মানুষের জীবনযাত্রার মান নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সামগ্রিক অর্থনীতির আকারে ভারত বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বড়। কিন্তু জনসংখ্যার অনুপাতে অর্থনৈতিক উৎপাদনের হিসাব করলে বাংলাদেশ প্রতিবেশী দেশটিকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর বিশেষ করে গত দুই দশকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।
দেশের তৈরি পোশাকশিল্প, প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স এবং কর্মক্ষেত্রে নারীদের ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণ এই অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক খাত বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
তবে অর্থনৈতিক অগ্রগতির পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছর ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশ হতে পারে। বিপরীতে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি নেমে আসতে পারে ৩ দশমিক ৬ শতাংশে। এ ছাড়া ক্রয়ক্ষমতার সমতা বিবেচনায় ভারতের অবস্থান বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে।
স্থানীয় বাজারে পণ্য ও সেবার দাম এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় নিলে দুই দেশের মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতার চিত্রেও পার্থক্য দেখা যায়। বাংলাদেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। মূল্যস্ফীতির কারণে খাদ্য, পরিবহনসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যয় বাড়লে আয় বাড়লেও মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যেতে পারে। আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী কয়েক বছরে দুই দেশের মাথাপিছু জিডিপির অবস্থানে পরিবর্তন আসতে পারে এবং ২০২৯ সালের দিকে ভারত আবারও বাংলাদেশকে ছাড়িয়ে যেতে পারে।
দুই দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোতেও উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি মূলত তৈরি পোশাকসহ রপ্তানিমুখী উৎপাদন খাতের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। অন্যদিকে ভারতের অর্থনীতি প্রযুক্তি, বৃহৎ সেবা খাত, শিল্প উৎপাদন এবং বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজারের সমন্বয়ে তুলনামূলকভাবে বৈচিত্র্যময়।
বিজ্ঞাপন
বৈশ্বিক পরিস্থিতিও দুই দেশের অর্থনীতির জন্য বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগরকেন্দ্রিক বাণিজ্যপথে বিঘ্ন জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহনে প্রভাব ফেলতে পারে। জ্বালানি আমদানির ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতা এবং তৈরি পোশাক রপ্তানির জন্য আন্তর্জাতিক পরিবহনব্যবস্থার গুরুত্বের কারণে এসব পরিস্থিতি দেশের উৎপাদন ও রপ্তানি ব্যয় বাড়ানোর ঝুঁকি তৈরি করে।
অর্থনীতির মূল্যায়নে মাথাপিছু জিডিপি একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলেও এটি দেশের সব মানুষের আয় বা জীবনযাত্রার পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরে না। গড় হিসাবের আড়ালে ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান এবং সম্পদের অসম বণ্টন থেকে যেতে পারে। বাংলাদেশ ও ভারত—দুই দেশেই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছানো একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
তাই মাথাপিছু জিডিপিতে সম্ভাব্য অগ্রগতি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক ইঙ্গিত হলেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় স্বস্তি আনতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানো এবং আয়বৈষম্য কমানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
বিজ্ঞাপন
সূত্র: আল-জাজিরা








