কে ক্ষমতাধর মাটি চোর, ভূমি দস্যু, খাল চোর না কি সরকার?

১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর ১৯৭০ সাল পর্যন্ত ২৩ বছরে জাতীয় এবং সাধারণ জনতা পর্যায়ে এত চোর ছিল না বা ভূমিখোর ছিল না। স্বাধীনতা যুদ্ধের ৯ মাসে দেশে চোর বেড়ে যায় লক্ষ লক্ষ। তারা যুদ্ধকালীন সময়ে বাড়ি বাড়ি চুরি করেছে, লুট করেছে। সেই সাথে জাতীয় সম্পদও চুরি করেছে অবলীলায়। চুরি করে ফকির, মিসকিন হয়েছে লাখপতি, কোটিপতি আর বিত্তবানরা হয়েছে নিঃস্ব।
বিজ্ঞাপন
স্বাধীনতা পরবর্তীকালে ১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারির পর থেকে বিভিন্ন জেলা, মহকুমা, দপ্তর ও মিল-কারখানায় চোর বেড়েছে গাণিতিক হারে। রিলিফের মালামাল তথা ছাতু, গুঁড়াদুধ, কম্বল, ত্রিপল, বিস্কুট, রেডি ফিশ, রেডি মিট চুরি হয়েছে অবলীলায়। রিলিফের মাল যাদের জন্য আনা তাদের কপালে জুটেছে খুব কম।
বিদেশি সাহায্যেরও ৯০ শতাংশ মালামাল তথা ত্রাণসামগ্রী চুরি করেছে ভারতে বসে বসে খাওয়া এবং ফিরে আসা অমুক্তিযোদ্ধা নামক নেতা-কর্মীরা। স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম সনদপ্রাপ্ত চোর সৃষ্টি হয় শেখ মুজিব সরকার গঠন করার পর।
তিনি জনসভায় বারবার বলেছেন, আমি পেয়েছি চোরের খনি। খনিতে এত চোর থাকলেও ১৯৭৫-এর ১৫ই আগস্টের আগ পর্যন্ত কোনো চোরকে তিনি শাস্তি দিতে পারেননি বা ইচ্ছে করেই দেননি। তিনি ভাষণে বলে এক, বাস্তবে করেন আর এক। প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা শেখ মুজিবের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন আর মুজিববাদী নামক অমুক্তিযোদ্ধারা হয়েছেন চোর এবং তারা ছিল শেখ মুজিবের খুব কাছের।
বিজ্ঞাপন
নতুন বাংলাদেশে শেখ মুজিবের প্রশ্রয়ে বেড়ে ওঠা, গড়ে ওঠা চোরেরা মুজিব সরকারের পতনের পর নতুন ভেল ধরে এবং সাধুর তকমা লাগিয়ে অনেকেই জিয়াউর রহমানের গঠিত দলে ভিড়ে যায় এবং বনে যায় মুখোশধারী কর্মী, নেতা। জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে দখলবাজি তেমন না হলেও ১৯৯১-এর পর প্রথম গঠিত বিএনপি সরকার আমল থেকে ২০২৪-এর পূর্ব পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের আমল থেকে চোর সৃষ্টি হয়েছে, দখলবাজ সৃষ্টি হয়েছে, সৃষ্টি হয়েছে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা।
জাতীয় পর্যায়ে চোর সাধারণত তিন ধরনের যেমন— ১) জাতীয় সম্পদ চোর ২) খাল, বিল, ভূমি ও মাটি চোর ৩) গাছ চোর। শেখ হাসিনা সরকার আমলে সবচেয়ে বেশি চোর পয়দা হয়েছে। রাস্তার ধারে অবস্থিত বড় বড় গাছ কেটে সাবাড় করেছে। খালেদা জিয়া সরকার আমলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে খাল চোর, বিল চোর, ভূমি চোর। আগে জানতাম চোরের কোনো লাইসেন্স হয় না। কিন্তু খাল চোর, মাটি চোর, সম্পত্তি চোরেরা বর্তমানে হয়েছে ধোয়া তুলসী পাতা এবং লাইসেন্স করে ব্যবসা করে। মজার ব্যাপার হচ্ছে এই সব চোরেদেরও আবার সমিতি আছে।
স্বাধীনতার পর ঢাকার ৫৭টি খাল থাকলেও বর্তমানে পাওয়া গেছে ২৬টি। রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের ২০২০ সালের জরিপমতে ঢাকায় মোট খালের সংখ্যা ৭৩টি। ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং তাদের গবেষণায় ঢাকার মোট ৫০টি খালের অস্তিত্বের প্রমাণ পেয়েছে। খালপাড় দখল করে যেমন ভূমি চোরেরা বাড়ি বানিয়েছে তেমনি অনেক খাল বন্ধ করে, জলাশয় ভরাট করে আবাসন তৈরি করেছে।
বিজ্ঞাপন
খ) বিত্তবান ও ক্ষমতাবান চোরেরা খালপাড় ও খাল বন্ধ করে গড়ে তুলেছে সুউচ্চ ভবন। খালের মুখ বন্ধ থাকায় পানি তুরাগ, বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যায় নামতে পারে না ফলে ঢাকা শহরে সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। এমন চোরদের বিরুদ্ধে কোনো সরকারই আইনগত ব্যবস্থা নেয়নি বা নিতে পারেনি। ফলে দখলদাররা হয়ে উঠেছে বেপরোয়া। সিলেটের মতো পবিত্র ভূমিতে সৃষ্টি হয়েছে টিলা চোর।
এই টিলা চোরেরা বিগত ১৫ বছরে ১৫০০ পাহাড়-টিলা খেয়ে ফেলেছে। এতে দেখা দিয়েছে পরিবেশ বিপর্যয়। গত এক যুগে টিলা ধসে ৬২ জন মারা গেছে তবুও টনক নড়েনি পরিবেশ অধিদপ্তরের। বর্তমানে সিলেটে টিলা আছে ৫৬৫টি, তার মধ্যে ৬৫টি কেটে সাবাড় করেছে মাটি চোরেরা। ঠিক একইভাবে চট্টগ্রামে পাহাড় কেটে বসতি গড়ে উঠেছে। পাহাড় কাটার কারণে সৃষ্ট ভূমিধসে প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে পাহাড় ধসে অনেকের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া সমতল ভূমিতে ফসলি জমির মাটি চুরি হচ্ছে, বালু চুরি হচ্ছে, পাথর চুরি হচ্ছে।
কিন্তু কোনো রেকর্ড নেই যে মাটি চোরদের ধরে আইনের আওতায় এনে সাজা দিয়েছে। সরকার যেন দেখেও দেখে না, নেয় না কোনো পদক্ষেপ। এখন প্রশ্ন হচ্ছে সরকারের চেয়েও ক্ষমতাধর কি চোরেরা? সরকার যদি পদক্ষেপ না নেয় সেখানে পাবলিক কী করবে! ঢাকার খাল উদ্ধার করে, খনন করে সংরক্ষণ করা গেলে ঢাকা শহরে জলাবদ্ধতার ততটা তীব্র হবে না।








