শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে গুজব ছড়ানো হচ্ছে: শিক্ষামন্ত্রী

এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা ম্যানেজিং কমিটির হাতে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে—এমন খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সমালোচনা করেছেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন।
বিজ্ঞাপন
তিনি দাবি করেছেন, শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে যে তথ্যের ভিত্তিতে আন্দোলন শুরু হয়েছে, সেটি চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নয়। একটি সভার রেজুলেশনের আলোচনার অংশবিশেষ বাদ দিয়ে বিষয়টি প্রচার করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বার্ক) মিলনায়তনে ‘সমৃদ্ধ অর্থনীতির বিনির্মাণে শিক্ষা : দক্ষতা, ভাষাগত সক্ষমতা ও বৈশ্বিক গতিশীলতা’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শিক্ষামন্ত্রী এসব কথা বলেন।
‘চিলে কান নিয়ে গেছে শুনে চিলের পেছনে দৌড়াচ্ছে’
বিজ্ঞাপন
এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের নিয়োগ নিয়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনের প্রসঙ্গ তুলে ধরে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, সিদ্ধান্তটি এখনো চূড়ান্ত না হলেও সেটিকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে ধরে নেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
তিনি বলেন, একটি সভার রেজুলেশনের আলোচনার অংশবিশেষ কেটে প্রচার করা হয়েছে। অথচ রেজুলেশনের পরের অংশে মন্ত্রীর পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং পরবর্তী প্রজ্ঞাপনের বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে।
শিক্ষামন্ত্রী এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘চিলে কান নিয়ে গেছে শুনে চিলের পেছনে দৌড়াচ্ছে, একবারও কানে হাত দিয়ে দেখে না আমার কানটা রয়েছে কিনা।’
বিজ্ঞাপন
তিনি জানান, একটি মিটিংয়ে কোনো বিষয়ে আলোচনা হওয়ার পর তা রেজুলেশনের আকারে মন্ত্রণালয়ে আসে। এরপর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী সেটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। সবকিছু পর্যালোচনার পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলন নিয়ে প্রশ্ন শিক্ষামন্ত্রীর
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, আগের রাতে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে মিছিলের খবর শুনেছেন। তাঁর দাবি, একটি মিটিংয়ের রেজুলেশনের আলোচনার অংশবিশেষ প্রকাশ করে এমন একটি ধারণা তৈরি করা হয়েছে যে এমপিও শিক্ষকদের নিয়োগ ব্যবস্থাপনা কমিটির হাতে দেওয়া হয়ে গেছে।
বিজ্ঞাপন
শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, রেজুলেশনের পরবর্তী ধাপে মন্ত্রীর পর্যালোচনা ও প্রজ্ঞাপন জারির বিষয়টি ছিল। কিন্তু সেই অংশটি বাদ পড়ায় বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে।
‘রেজুলেশনের সিদ্ধান্ত কি মন্ত্রীর সিদ্ধান্ত?’
সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করতে গিয়ে শিক্ষামন্ত্রী প্রশ্ন তোলেন, একটি বৈঠকের রেজুলেশন তৈরি হলেই সেটিকে চূড়ান্ত সরকারি সিদ্ধান্ত হিসেবে ধরে নেওয়া যায় কি না।
বিজ্ঞাপন
তিনি বলেন, কোনো একটি বিষয়ে প্রথমে আলোচনা হয়। পরে সেই আলোচনার ভিত্তিতে রেজুলেশন তৈরি হয় এবং তা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর কাছে আসে। এরপর বিষয়টি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
তাঁর ভাষায়, রেজুলেশনের সিদ্ধান্তকে সরাসরি মন্ত্রীর সিদ্ধান্ত, রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত, প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত বা দলীয় সিদ্ধান্ত হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
এনটিআরসিএ প্রতিষ্ঠার প্রসঙ্গ
বিজ্ঞাপন
শিক্ষক নিয়োগের প্রসঙ্গে জাতীয় শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) প্রতিষ্ঠার কথাও তুলে ধরেন আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি দাবি করেন, ২০০৪ সালে শিক্ষকদের মর্যাদা ও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় শৃঙ্খলা আনার উদ্দেশ্যে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে আলোচনা করে এনটিআরসিএ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
পরবর্তীতে এনটিআরসিএর মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া শুরু হয় বলে জানান তিনি। তবে বিভিন্ন ব্যাচের নিবন্ধনধারীদের চাকরিতে নিয়োগ এবং বয়সসীমা নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন শিক্ষামন্ত্রী।
তিনি বলেন, ১৮তম নিবন্ধনে প্রায় এক লাখ শিক্ষককে এনটিআরসিএর সার্টিফিকেট দেওয়া হলেও তাদের অনেকে এখনো চাকরি পাননি। ফলে তাদের বয়সসীমা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
৭৭ হাজার শিক্ষক পদ শূন্য
শিক্ষামন্ত্রী দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বড় ধরনের শিক্ষক সংকটের কথা তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এমপিওভুক্ত স্কুল ও কলেজে বর্তমানে প্রায় ৭৭ হাজার পদ শূন্য রয়েছে।
এই বিপুলসংখ্যক শূন্য পদ পূরণের বিষয়টি দ্রুত সমাধান করা প্রয়োজন বলেও তিনি ইঙ্গিত দেন। এর আগে শিক্ষক সংকট নিয়ে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষকের ঘাটতির কথাও জানিয়েছিলেন তিনি।
বিজ্ঞাপন
নিয়োগ নিয়ে জটিলতার অভিযোগ
শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে অতীতে ভৌগোলিকভাবে দূরের প্রতিষ্ঠানে প্রার্থীকে নিয়োগ দেওয়ার কারণে নানা সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন শিক্ষামন্ত্রী।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
তিনি উদাহরণ হিসেবে বলেন, এক জেলার শিক্ষককে অন্য জেলার দূরবর্তী এলাকায় নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এতে পরবর্তীতে বদলি বা কর্মস্থল পরিবর্তনের বিষয়টি জটিল হয়ে পড়ে।
শিক্ষামন্ত্রীর মতে, শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রার্থী ও প্রতিষ্ঠানের অবস্থান বিবেচনা করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
৯ হাজার শিক্ষক নিয়োগের পরিকল্পনা
দেশের শিক্ষক সংকট কমাতে প্রায় ৯ হাজার শিক্ষক নিয়োগের পরিকল্পনার কথাও জানান শিক্ষামন্ত্রী। তিনি বলেন, প্রথম ধাপে ৯ হাজার শিক্ষক নিয়োগের পর বিদ্যমান শূন্য পদগুলোর হিসাব পুনরায় পর্যালোচনা করতে হবে। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী পরীক্ষাসহ অন্যান্য প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এ ক্ষেত্রে নিবন্ধনধারী প্রার্থীদের যোগ্যতা ও বিদ্যমান শূন্য পদের তথ্য সমন্বয় করা প্রয়োজন বলে তিনি জানান।
নিয়োগে দুর্নীতির সুযোগ থাকবে না
শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দুর্নীতির সুযোগ না রাখার প্রতিশ্রুতিও দেন শিক্ষামন্ত্রী। তিনি বলেন, কোনো শিক্ষার্থী বা প্রার্থী যখন শিক্ষকতার জন্য প্রয়োজনীয় সার্টিফিকেট অর্জন করবেন, তখন যোগ্যতা অনুযায়ী নিয়োগের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের দুর্নীতি চলবে না বলেও তিনি স্পষ্ট করেন।
সব মিলিয়ে এমপিওভুক্ত শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা ম্যানেজিং কমিটির হাতে যাচ্ছে—এমন আলোচনার মধ্যেই শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যে বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি বলে সরকারের অবস্থান সামনে এসেছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে রেজুলেশন পর্যালোচনা, মন্ত্রীর অনুমোদন এবং প্রজ্ঞাপন জারির ধাপ রয়েছে বলেই জানিয়েছেন তিনি।








