দুর্গম এলাকার ৩০০ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পৌঁছাবে বিদ্যুৎ

রাঙ্গামাটি জেলার দুর্গম পাহাড়ি এলাকার প্রায় ৩০০টি বিদ্যুৎবিহীন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সোলার প্যানেলের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহের পরিকল্পনা করছে সরকার। প্রত্যন্ত এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ পৌঁছালে মাল্টিমিডিয়া ক্লাস, ডিজিটাল প্রযুক্তি ও আধুনিক শিক্ষাব্যবহারের সুযোগ বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
বিজ্ঞাপন
রাঙ্গামাটির ১০টি উপজেলায় বর্তমানে মোট ৩৮৯টি বিদ্যালয় বিদ্যুৎ সংযোগের বাইরে রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩০০টি বিদ্যালয় এমন দুর্গম এলাকায় অবস্থিত, যেখানে প্রচলিত বিদ্যুৎ অবকাঠামো পৌঁছানো কঠিন।
এই বাস্তবতায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের নবায়নযোগ্য জ্বালানি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এসব বিদ্যালয়ে সোলার প্যানেল স্থাপনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছেন।
জেলা প্রশাসকের প্রস্তাব থেকে উদ্যোগ
বিজ্ঞাপন
চলতি বছরের মে মাসে অনুষ্ঠিত জেলা প্রশাসক সম্মেলনে রাঙ্গামাটির দুর্গম পাহাড়ি এলাকার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে সোলার প্যানেল স্থাপনের প্রস্তাব দেওয়া হয়।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
প্রস্তাবে প্রায় ৩০০টি বিদ্যুৎবিহীন প্রাথমিক বিদ্যালয়কে বিদ্যুতের আওতায় আনার কথা বলা হয়। পরে বিষয়টির বাস্তবতা যাচাই করতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোকে চিঠি দেয়।
বিদ্যুৎ বিভাগ প্রস্তাবটি নিয়ে কাজ করতে সম্মতি জানিয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পের মাধ্যমে বিদ্যালয়গুলোতে সোলার প্যানেল স্থাপনের পক্ষে মতামতও দেওয়া হয়েছে। তবে এখনো প্রকল্পটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব বা ডিপিপিতে অন্তর্ভুক্ত হয়নি।
বিজ্ঞাপন
পাঁচ বছরে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রকল্পটি অনুমোদন পেলে দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে এর কাজ বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রকল্পটি ২০২৬ সালে শুরু হয়ে ২০৩১ সাল পর্যন্ত চলতে পারে। এর আগে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিদ্যুৎবিহীন বিদ্যালয়গুলোর একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করে বিদ্যুৎ বিভাগের কাছে জমা দিতে হবে।
এরপর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অনুমোদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে প্রকল্পটির আর্থিক সক্ষমতা যাচাই করা হবে। সব ধাপ শেষ হওয়ার পর মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
বিজ্ঞাপন
প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসনকে মাঠপর্যায়ের প্রধান তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে।
বিদ্যুৎ পেলে বদলাবে শিক্ষার পরিবেশ
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, দুর্গম বিদ্যালয়গুলোতে বিদ্যুৎ পৌঁছানো গেলে শিক্ষার্থীদের জন্য আধুনিক শিক্ষার সুযোগ তৈরি হবে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ সংযোগের মাধ্যমে মাল্টিমিডিয়া ক্লাস পরিচালনা, কম্পিউটার ও অন্যান্য ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার এবং ই-লার্নিং কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা সম্ভব হবে।
বিজ্ঞাপন
দুর্গম পাহাড়ি এলাকার এসব বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ দরিদ্র পরিবারের সন্তান। অনেক পরিবার দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। ফলে বিদ্যালয়ে আধুনিক প্রযুক্তির সুযোগ তৈরি হলে তাদের শিক্ষার মান উন্নয়নের পাশাপাশি অন্যান্য এলাকার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ব্যবধানও কমানো সম্ভব হবে।
সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, বিদ্যুৎ সংযোগ শুধু শিক্ষার পরিবেশ উন্নত করবে না, বরং প্রত্যন্ত এলাকার সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নেও ভূমিকা রাখবে।
পার্বত্য তিন জেলায় প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা
বিজ্ঞাপন
পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটির মোট ৫৫০টি বিদ্যালয়ে বর্তমানে টেলিভিশন ও মাল্টিমিডিয়া সংযোগ রয়েছে। এ ছাড়া ১৪৯টি বিদ্যালয় ই-লার্নিং কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।
তবে বিদ্যুৎ সরবরাহের সীমাবদ্ধতার কারণে দুর্গম এলাকার অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এসব প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার এখনো সম্ভব হচ্ছে না। সোলার প্যানেলের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা গেলে এই সীমাবদ্ধতা অনেকটাই দূর করা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পার্বত্য অঞ্চলে শতভাগ বিদ্যুতের লক্ষ্য
বিজ্ঞাপন
পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে শতভাগ বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে।
দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় সোলার প্যানেলের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য তৃতীয় পর্যায়ের একটি প্রকল্পের প্রস্তাব সরকারি বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে অননুমোদিত বা বরাদ্দহীন প্রকল্প হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছে।
এ ধরনের প্রস্তাবকে ‘সবুজ পাতা প্রকল্প’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এটি মূলত ভবিষ্যৎ প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে নীতিগত সম্মতি বা প্রাথমিক তালিকার অংশ। পরবর্তী সময়ে অনুমোদন পেলে প্রকল্পটি ডিপিপিতে অন্তর্ভুক্ত হয়ে বাস্তবায়নের পর্যায়ে যেতে পারে।
বিজ্ঞাপন
সচিব জানান, প্রস্তাবটি ডিপিপিতে অন্তর্ভুক্ত হলে পাঁচ বছর মেয়াদি প্রকল্প হিসেবে এর কার্যক্রম শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিদ্যুৎ সংকটে শিক্ষা ও কৃষিতে বাধা
পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পার্বত্য তিন জেলার দুর্গম এলাকায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের অভাব দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়নের পথে বড় বাধা হয়ে রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বিদ্যুতের সীমাবদ্ধতার কারণে শুধু শিক্ষা নয়, কৃষি উৎপাদনসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে স্থানীয় মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নও প্রত্যাশিত গতিতে এগোতে পারছে না। তাই দুর্গম এলাকায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
সোলার প্যানেলেই কেন গুরুত্ব
পার্বত্য অঞ্চলের দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে অনেক এলাকায় প্রচলিত বিদ্যুৎ অবকাঠামো স্থাপন করা কঠিন এবং ব্যয়বহুল। পাহাড়ি দুর্গম এলাকায় বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণও তুলনামূলকভাবে জটিল।
এ কারণে সোলার প্যানেলকে বিকল্প ও বাস্তবসম্মত সমাধান হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বিদ্যালয়ভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা গেলে জাতীয় গ্রিডের ওপর নির্ভরতা ছাড়াই আলো, কম্পিউটার, মাল্টিমিডিয়া সরঞ্জামসহ প্রয়োজনীয় কিছু বৈদ্যুতিক সুবিধা চালু রাখা সম্ভব হবে।
অনুমোদনের পরই চূড়ান্ত হবে প্রকল্প
তবে ৩০০ বিদ্যালয়ে সোলার প্যানেল স্থাপনের পরিকল্পনাটি এখনো চূড়ান্ত প্রকল্পে রূপ নেয়নি। ডিপিপিতে অন্তর্ভুক্তি, অনুমোদন এবং অর্থ বরাদ্দসহ বেশ কয়েকটি ধাপ এখনো বাকি রয়েছে।
সরকারি প্রক্রিয়া অনুযায়ী এসব ধাপ সম্পন্ন হওয়ার পর প্রকল্প বাস্তবায়নের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে রাঙ্গামাটির দুর্গম পাহাড়ি এলাকার শত শত শিক্ষার্থী প্রথমবারের মতো নিয়মিত বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় আসার সুযোগ পাবে। এর ফলে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা বিস্তারের পাশাপাশি প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দেশের অন্যান্য এলাকার শিক্ষার্থীদের শিক্ষাগত ব্যবধান কমানোর সম্ভাবনাও তৈরি হবে।








