Logo

এক ফলাফলেই শেষ ৭টি প্রাণ, এসএসসির ফল কি জীবনের চেয়ে দামি?

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
১২ আগস্ট, ২০২৬, ১৩:৩০
এক ফলাফলেই শেষ ৭টি প্রাণ, এসএসসির ফল কি জীবনের চেয়ে দামি?
ছবি: সংগৃহীত

এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে অন্তত সাত শিক্ষার্থীর মৃত্যুর খবর সামনে এসেছে। ফল আশানুরূপ না হওয়া, একাধিক বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়া কিংবা পরীক্ষায় ফেল করার পর হতাশা ও মানসিক চাপ থেকে কয়েকজন আত্মহত্যা করেছে বলে পরিবার ও স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

সোমবার (১০ আগস্ট) এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর রাজশাহী, কুষ্টিয়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, চাঁদপুর, চট্টগ্রাম, শেরপুর ও গোপালগঞ্জে এসব মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। ঘটনাগুলো আবারও প্রশ্ন তুলেছে—একটি পরীক্ষার ফল কি একজন শিক্ষার্থীর জীবনের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে?

পাস করলে আনন্দ, জিপিএ-৫ পেলে গর্ব আর ফেল করলে লজ্জা—সমাজে ফলাফলকে ঘিরে এমন মানসিকতার কারণে অনেক শিক্ষার্থী তীব্র চাপের মধ্যে পড়ে। অথচ একটি পরীক্ষায় ব্যর্থতা জীবনের শেষ নয়। সামনে থাকে ঘুরে দাঁড়ানোর অসংখ্য সুযোগ।

রাজশাহীতে শিক্ষার্থীর মৃত্যু

বিজ্ঞাপন

রাজশাহীর বাগমারায় এসএসসি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়ে কারিনা পাল (১৬) নামে এক শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে। মহব্বতপুর গ্রামের কারিনা চাঁন্দেরআড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ছিল। সোমবার ফল প্রকাশের পর সে হতাশ হয়ে পড়ে। পরে নিজ ঘরে গিয়ে ফ্যানের সঙ্গে ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করে।

স্বজনরা তাকে দ্রুত রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করেন। তবে হাসপাতালে নেওয়ার পথেই তার মৃত্যু হয়।

কুষ্টিয়ায় দুই বিষয়ে ফেল করে শিক্ষার্থীর মৃত্যু

বিজ্ঞাপন

কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় তানিয়া খাতুন (১৬) নামে এক শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে। সে বাহাদুরপুর মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিল।

ফল প্রকাশের পর জানা যায়, তানিয়া দুটি বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছে। ওই রাতেই স্বজনরা নিজ কক্ষে তার ঝুলন্ত মরদেহ দেখতে পান।

পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ফলাফল নিয়ে হতাশা থেকেই ঘটনাটি ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

চাঁপাইনবাবগঞ্জে বিষপানে শিক্ষার্থীর মৃত্যু

চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে এসএসসি পরীক্ষায় ইংরেজিতে অকৃতকার্য হওয়ার পর বিষপানে হালিমা খাতুন তরিকা (১৬) নামে এক শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে।

হালিমা চাকপাড়া আদর্শ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিল। ফল প্রকাশের পর হতাশ হয়ে সে বিষপান করে বলে স্বজন ও স্থানীয়রা জানিয়েছেন। অসুস্থ অবস্থায় তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

বিজ্ঞাপন

চাঁদপুরেও ফল প্রকাশের পর মৃত্যু

চাঁদপুরের শাহরাস্তিতে শামীমা আক্তার মুন্নি (১৬) নামে এক শিক্ষার্থীর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। সে চেড়িয়ারা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থী ছিল। এসএসসি পরীক্ষায় দুটি বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়ার পর ফল প্রকাশের দিনই তার মৃত্যু হয়।

ঘটনাটি এলাকায় শোকের পাশাপাশি পরীক্ষার ফল নিয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত মানসিক চাপের বিষয়টিও সামনে এনেছে।

বিজ্ঞাপন

চট্টগ্রামে পাঁচ বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর মরদেহ উদ্ধার

চট্টগ্রামের বাকলিয়ায় আদনানুজ্জামান নিহাল (১৯) নামে এক শিক্ষার্থীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। নিহাল পূর্ব বাকলিয়া সিটি করপোরেশন বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ছিল। এসএসসি পরীক্ষায় পাঁচ বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়ার পর সে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিল বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

মঙ্গলবার সকালে কালামিয়া বাজার এলাকার বাসা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিকভাবে ঘটনাটি আত্মহত্যা বলে ধারণা করা হলেও বিষয়টি তদন্ত করে দেখছে পুলিশ।

বিজ্ঞাপন

শেরপুরে চার বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর মৃত্যু

শেরপুরের নকলায় দিয়ামনি অন্তি (১৬) নামে এক শিক্ষার্থীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এসএসসি পরীক্ষায় চার বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়ার পর তার মৃত্যু হয়।

চন্দ্রকোনা ইউনিয়নের চরবাছুর আগলি গ্রামের নিজ বাড়ি থেকে মঙ্গলবার সকালে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

বিজ্ঞাপন

স্বজনদের ধারণা, ফলাফল নিয়ে হতাশা, লজ্জা ও মানসিক চাপের কারণে সে আত্মহত্যা করে থাকতে পারে। এ ঘটনায় থানায় অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে। পরে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

গোপালগঞ্জে ফেল করার পর শিক্ষার্থীর মৃত্যু

গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরে অভি বিশ্বাস (১৭) নামে এক শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে। এসএসসি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার খবর জানার পর সে আত্মহত্যা করেছে বলে পরিবার জানিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

অভি বেদগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয়ের মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থী ছিল। ফল প্রকাশের পর নিজ ঘরে তার মৃত্যু হয়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করেছে। এ ঘটনায় প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া চলছে।

কেন ফলাফল এত বড় চাপ হয়ে উঠছে?

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, পরীক্ষার ফলকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের ওপর পরিবারের প্রত্যাশা অনেক সময় অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছে যায়। বিশেষ করে জিপিএ-৫ বা সর্বোচ্চ ফলাফলকে সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করার প্রবণতা শিক্ষার্থীদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করে।

বিজ্ঞাপন

একজন শিক্ষার্থী হয়তো পড়াশোনায় দুর্বল, কিন্তু অন্য কোনো ক্ষেত্রে তার প্রতিভা থাকতে পারে। কেউ পরীক্ষায় প্রত্যাশিত ফল না পেলেও পরবর্তী সময়ে শিক্ষা, কর্মজীবন কিংবা অন্য কোনো ক্ষেত্রে সফল হতে পারে।

তাই একটি পরীক্ষার ফল দিয়ে একজন শিক্ষার্থীর পুরো ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা যায় না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোসাম্মৎ মালেকা পারভীন মনে করেন, পরীক্ষার ফল খারাপ হতে পারে—এই বাস্তবতাকে শিক্ষার্থীদের আগে থেকেই মানসিকভাবে গ্রহণ করতে শেখানো প্রয়োজন।

তার মতে, শিক্ষার্থীদের বুঝতে হবে, পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া মানেই সবকিছু শেষ হয়ে যাওয়া নয়। প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে ফলাফল ভালো বা খারাপ—দুই ধরনের সম্ভাবনার জন্যই প্রস্তুত থাকতে হবে।

প্রতিটি স্কুলে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের প্রয়োজন

অধ্যাপক মালেকা পারভীনের মতে, শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় দেশের প্রতিটি স্কুলে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ নিয়োগের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা উচিত।

তিনি মনে করেন, শুধু কোনো শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করার পর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা না করে আগে থেকেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। নিয়মিত কাউন্সেলিং ও মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক সেশন শিক্ষার্থীদের চাপ মোকাবিলায় সহায়তা করতে পারে।

পরিবারের প্রত্যাশার বিষয়টিও তিনি বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছেন। তার মতে, জিপিএ-৫ পেলেই সন্তান সফল—এমন ধারণা পরিবর্তন করতে হবে।

প্রত্যেক শিশুর মধ্যে আলাদা ধরনের সক্ষমতা ও সম্ভাবনা থাকে। কোনো শিক্ষার্থী একটি বিষয়ে দুর্বল হলেও অন্য কোনো ক্ষেত্রে তার বিশেষ দক্ষতা থাকতে পারে। তাই ফল খারাপ হলে বকাঝকা বা অপমান না করে সন্তানের সক্ষমতা চিহ্নিত করে তাকে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিতে হবে।

পরিবারের আচরণই হতে পারে বড় সহায়তা

একটি পরীক্ষায় ফল খারাপ করার পর একজন শিক্ষার্থী যখন সবচেয়ে বেশি ভেঙে পড়ে, তখন পরিবারের প্রতিক্রিয়া তার মানসিক অবস্থায় বড় প্রভাব ফেলে। এই সময়ে তুলনা, অপমান, বকাঝকা বা ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয় দেখানোর পরিবর্তে পাশে থাকা জরুরি।

সন্তানকে বোঝাতে হবে—একটি পরীক্ষার ফলাফল তার পুরো জীবনকে সংজ্ঞায়িত করে না। ভুল থেকে শেখা, নতুন করে প্রস্তুতি নেওয়া এবং ভবিষ্যতে ভালো করার সুযোগ সবসময় থাকে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকেও শুধু ফলাফল ও জিপিএকেন্দ্রিক সাফল্যের ধারণা থেকে বেরিয়ে শিক্ষার্থীদের মানসিক সুস্থতার বিষয়টি গুরুত্ব দিতে হবে।

এসএসসি কিংবা অন্য কোনো পাবলিক পরীক্ষা জীবনের একটি ধাপ মাত্র। ফল ভালো হলে আনন্দের কারণ আছে, খারাপ হলে নতুন করে চেষ্টা করার সুযোগও আছে। কিন্তু কোনো ফলাফলই একটি প্রাণের চেয়ে বড় নয়।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD