প্রাথমিক শিক্ষকদের বদলিতে লটারি চালুর পরিকল্পনা সরকারের

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের বদলি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা বাড়াতে নতুন পদ্ধতি চালুর উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। কোনো বিদ্যালয়ের একটি শূন্যপদের বিপরীতে একাধিক যোগ্য শিক্ষক বদলির আবেদন করলে লটারির মাধ্যমে চূড়ান্ত প্রার্থী বাছাইয়ের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকরা (ডিসি) লটারি পরিচালনার দায়িত্ব পেতে পারেন। নতুন ব্যবস্থা কার্যকর করতে বিদ্যমান বদলি নীতিমালায় সংশোধন আনার প্রস্তুতি চলছে।
বিজ্ঞাপন
বর্তমানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক বদলির ক্ষেত্রে লটারির মাধ্যমে প্রার্থী নির্বাচনের কোনো বিধান নেই। ফলে নতুন পদ্ধতি চালু করতে নীতিমালায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে হবে। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে দ্বিতীয়বারের মতো বদলি নীতিমালা সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়ায় শিক্ষকদের বদলি ব্যবস্থায় নতুন পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
বদলি প্রক্রিয়ায় লটারি চালুর পরিকল্পনার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। গত ২৭ অক্টোবর টাঙ্গাইলের বিন্দুবাসিনী সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয়ে শিক্ষার সার্বিক মানোন্নয়নে শিক্ষকদের সঙ্গে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ পরিকল্পনার কথা জানান।
মন্ত্রী বলেন, সরকারি প্রাথমিক শিক্ষকদের বদলি কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব জেলা প্রশাসকদের দেওয়া হয়েছে। কোনো একটি পদের বিপরীতে একাধিক শিক্ষক আবেদন করলে প্রয়োজন অনুযায়ী লটারির মাধ্যমে প্রার্থী নির্বাচন করা হবে। একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, শিক্ষক বদলির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগ রাখা হয়নি।
বিজ্ঞাপন
শিক্ষক সংকট বিবেচনায় নিয়েই হবে বদলি
প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রয়োজনের তুলনায় শিক্ষকসংখ্যা কম থাকার বিষয়টিও তুলে ধরেছেন মন্ত্রী। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আরও ৫০ হাজার সহকারী শিক্ষক প্রয়োজন। পাশাপাশি প্রধান শিক্ষকের পদ রয়েছে ৩৮ হাজার।
এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষক একসঙ্গে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) সীমাবদ্ধতার কথা জানিয়েছে। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করা হলে তিনি বিকল্প পদ্ধতিতে সমস্যা সমাধানের পরামর্শ দিয়েছেন বলে জানান শিক্ষামন্ত্রী।
বিজ্ঞাপন
বদলির ক্ষেত্রে বিদ্যালয়ভিত্তিক শিক্ষকসংখ্যা বিবেচনায় নেওয়ার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। কোনো বিদ্যালয়ে মাত্র পাঁচজন শিক্ষক কর্মরত থাকলে সেখান থেকে শিক্ষক বদলি না করার বিষয়েও নির্দেশনার কথা উল্লেখ করেন মন্ত্রী। কারণ, শিক্ষক সংকট থাকা বিদ্যালয় থেকে আরও শিক্ষক সরিয়ে নিলে নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তদবির ও সুপারিশ এড়াতে দায়িত্ব পাচ্ছেন ডিসিরা
শিক্ষকদের বদলির ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধরনের তদবির ও সুপারিশের প্রবণতা রয়েছে বলে মন্তব্য করেন এহছানুল হক মিলন। আত্মীয়স্বজন কিংবা পরিচিত ব্যক্তির পরিচয় ব্যবহার করে অনেকে বদলির জন্য সুপারিশ করান। এ ধরনের প্রভাব কমিয়ে নিয়মতান্ত্রিকভাবে বদলি কার্যক্রম পরিচালনার লক্ষ্যেই জেলা প্রশাসকদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
মন্ত্রী জানান, একটি পদের বিপরীতে একাধিক যোগ্য প্রার্থী থাকলে জেলা প্রশাসকরা লটারির মাধ্যমে প্রার্থী নির্বাচন করতে পারবেন। এতে ব্যক্তিগত যোগাযোগ কিংবা বিশেষ সুপারিশের পরিবর্তে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় বদলির সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
ঢাকায় বদলির বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, বিশেষ পরিস্থিতিতে রাজধানীতে বদলির সুযোগ রাখা যেতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে প্রচলিত নিয়ম ও নির্ধারিত শর্ত অনুসরণ করতে হবে।
বদলির ক্ষেত্রে যেসব শর্ত মানতে হয়
বিজ্ঞাপন
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক বদলি কার্যক্রমে চলতি বছরই প্রশাসনিক ও পদ্ধতিগত পরিবর্তন আনা হয়েছে। আবেদন যাচাই এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য উপজেলা, জেলা, বিভাগীয় ও জাতীয় পর্যায়ে পৃথক কমিটি গঠন করা হয়েছে। এসব কমিটি নিজ নিজ প্রশাসনিক পর্যায়ে শিক্ষকদের আবেদন যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেয়।
বর্তমান বদলি নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো সহকারী শিক্ষক বা শিক্ষিকার চাকরির মেয়াদ দুই বছর পূর্ণ না হলে সাধারণত বদলির জন্য আবেদন বিবেচনার সুযোগ নেই। এ ছাড়া একবার বদলি হওয়ার পর পরবর্তী তিন বছর পূর্ণ হওয়ার আগে আবারও বদলির আবেদন বিবেচনার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ রয়েছে।
নতুন লটারি পদ্ধতি যুক্ত হলেও বিদ্যমান এসব শর্তের পরিবর্তন হবে কি না, সে বিষয়ে এখনো বিস্তারিত সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি। নীতিমালা সংশোধনের পরই নতুন পদ্ধতির কার্যকর রূপরেখা স্পষ্ট হবে।
বিজ্ঞাপন
দেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক সাড়ে তিন লাখের বেশি
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৬৫ হাজারের বেশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে মোট শিক্ষকসংখ্যা ৩ লাখ ৭১ হাজার ৯৭০ জন।
এর মধ্যে নারী শিক্ষক ২ লাখ ৪৮ হাজার ৮০৫ জন এবং পুরুষ শিক্ষক ১ লাখ ২৩ হাজার ১৩৪ জন। অধিদপ্তরের দেওয়া সংখ্যার হিসাবে নারী শিক্ষকের হার ৬৬ দশমিক ৮৮ শতাংশ এবং পুরুষ শিক্ষকের হার ৩৩ দশমিক ১২ শতাংশ।
বিজ্ঞাপন
নতুন লটারি পদ্ধতি চালু হলে একাধিক যোগ্য প্রার্থীর মধ্যে বদলির জন্য নির্বাচন প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আসবে। তবে বিদ্যালয়ের শিক্ষক সংকট, চাকরির মেয়াদ এবং বদলির পর নির্ধারিত সময়সীমার মতো শর্তগুলো বিবেচনায় রেখেই পুরো কার্যক্রম পরিচালনার পরিকল্পনা করছে সরকার।








