Logo

জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর সংকটে বাড়ছে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
১১ জুলাই, ২০২৬, ১২:৪৬
জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর সংকটে বাড়ছে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ
ছবি: সংগৃহীত

দেশের বিভিন্ন এলাকায় জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর ঘাটতি ক্রমেই জনস্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। দীর্ঘদিন ধরে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্র এবং ইউনিয়ন সাব-সেন্টারগুলোতে প্রয়োজনীয় জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় অনেক দম্পতি নিয়মিত পরিবার পরিকল্পনা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এর ফলে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ, অনিরাপদ গর্ভপাত, মাতৃস্বাস্থ্যের ঝুঁকি এবং পারিবারিক নানা সংকট বাড়ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

বিজ্ঞাপন

কুড়িগ্রামের একটি চরাঞ্চলে পরিচালিত প্রজননস্বাস্থ্যবিষয়ক গবেষণায় এমন বাস্তব চিত্র উঠে এসেছে। গবেষণায় অংশ নেওয়া এক নারীর অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, প্রয়োজনীয় জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী না পাওয়ায় তিনি অনিচ্ছাকৃতভাবে গর্ভধারণ করেন। বিষয়টি জানাজানির পর পারিবারিক নির্যাতনের মুখোমুখি হওয়ার পাশাপাশি তাঁকে গর্ভপাত করতেও বাধ্য করা হয়। পরে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত অনিরাপদ পদ্ধতি অনুসরণ করায় তাঁর শারীরিক অবস্থারও অবনতি ঘটে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে একই ধরনের সমস্যা বাড়ছে। পরিবার পরিকল্পনা সামগ্রী সহজলভ্য না হওয়ায় বহু নারী ও পরিবার স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন, যার দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবও রয়েছে।

বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস উপলক্ষে এ বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এবারের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে— ‘তরুণদের আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করি, আজকের প্রত্যয়ে সুন্দর আগামী গড়ি।’ তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জনে প্রজননস্বাস্থ্যসেবার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা এখন অত্যন্ত জরুরি।

বিজ্ঞাপন

মেরি স্টোপস বাংলাদেশের লিড অ্যাডভোকেসি কর্মকর্তা মনজুন নাহার বলেন, মাঠপর্যায়ের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর সংকটের কারণে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নারী অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের শিকার হচ্ছেন এবং অনেককে গর্ভপাতের মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ দেশের মাতৃমৃত্যুর একটি বড় কারণ হিসেবে কাজ করছে এবং সামগ্রিক জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা ও স্বাস্থ্যকর্মীরা জানান, নিয়মিত পিল, কনডমসহ প্রয়োজনীয় জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী না পাওয়ায় অনেক দম্পতি কার্যকর পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি অনুসরণ করতে পারছেন না। কোথাও কোথাও নারীরা প্রয়োজনের তুলনায় কম ওষুধ ব্যবহার করছেন বা একটি পিলের পাতা ভাগ করে দীর্ঘ সময় চালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন, যা কার্যকর সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে।

এর ফল হিসেবে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের সংখ্যা বাড়ছে এবং মাতৃস্বাস্থ্য আরও ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। একই সঙ্গে নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করার প্রচেষ্টাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিজ্ঞাপন

মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন সূত্র বলছে, জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণে ব্যর্থ হওয়ায় অনেক নারী পারিবারিক অশান্তি এমনকি সহিংসতারও শিকার হচ্ছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবার পরিকল্পনা সেবা শুধু জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের বিষয় নয়; এটি নারীর ক্ষমতায়ন, পারিবারিক স্থিতিশীলতা, দাম্পত্য সম্পর্ক এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা আরও জানিয়েছেন, বর্তমানে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ বৃদ্ধির পাশাপাশি মাতৃমৃত্যু কমানোর অগ্রগতিও ধীর হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি বাল্যবিয়ের হার বৃদ্ধি, প্রাতিষ্ঠানিক প্রসবের হার কমে যাওয়া এবং বাড়িতে প্রসবের প্রবণতা বাড়ার মতো বিষয়গুলো পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। এসব কারণে মা ও নবজাতকের স্বাস্থ্যঝুঁকিও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচির ধারাবাহিকতায় বিঘ্ন ঘটলে বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে। বিশেষ করে মাতৃমৃত্যু হ্রাস, সর্বজনীন প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং নারীর ক্ষমতায়ন-সংক্রান্ত লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়নে বড় বাধা সৃষ্টি হতে পারে।

বিজ্ঞাপন

তাঁদের সুপারিশ অনুযায়ী, জরুরি ভিত্তিতে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর সরবরাহ স্বাভাবিক করা, মাঠপর্যায়ে পরিবারকল্যাণ সহকারীদের কার্যক্রম আরও জোরদার করা, কিশোর-কিশোরীদের প্রজননস্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে স্থানীয় প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ ও সামাজিক সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

এ বিষয়ে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. জিন্নাত রেহানা জানিয়েছেন, ২০২৪ সালে অপারেশনাল প্ল্যান (ওপি) বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে দেশে জন্মনিয়ন্ত্রণ ও সুরক্ষা সামগ্রীর সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়। এর প্রভাব হিসেবে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ, গর্ভপাত এবং জন্মহার—সব ক্ষেত্রেই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা দিয়েছে।

তিনি জানান, পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী ক্রয়ের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে সরবরাহ পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হবে এবং চলমান সংকট অনেকটাই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।

বিজ্ঞাপন

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, জনসংখ্যাকে কেবল সংখ্যার হিসাব হিসেবে নয়, দেশের গুরুত্বপূর্ণ মানবসম্পদ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। আর সেই মানবসম্পদ গড়ে তুলতে নিরাপদ মাতৃত্ব, মানসম্মত প্রজননস্বাস্থ্যসেবা এবং প্রত্যেক দম্পতির জন্য নিরবচ্ছিন্ন পরিবার পরিকল্পনা সেবা নিশ্চিত করা সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD