ডেঙ্গুতে আক্রান্ত বেশি তরুণরা, তবুও নারীদের মৃত্যু বেশি কেন?

দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ দ্রুত বাড়ছে। আগস্টজুড়ে যত মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন, সেপ্টেম্বরের প্রথম ২০ দিনেই তার প্রায় দ্বিগুণ আক্রান্তের তথ্য পাওয়া গেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, আক্রান্তদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যা বেশি হলেও চলতি বছরে ডেঙ্গুতে মৃতদের মধ্যে নারীর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি।
বিজ্ঞাপন
বয়সভিত্তিক পরিসংখ্যানেও তরুণদের আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা বেশি। বিশেষ করে ১৬ থেকে ৩৫ বছর বয়সীদের মধ্যে আক্রান্তের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি দেখা যাচ্ছে।
আক্রান্তে পুরুষ বেশি
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে একদিনে ১ হাজার ২৩২ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৭৮৯ জন পুরুষ এবং ৪৪৩ জন নারী।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ৬০ হাজার ৩৭৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৩৭ হাজার ৬৬৫ এবং নারী ২২ হাজার ৪৭৩ জন।
বিজ্ঞাপন
অন্যদিকে, একই সময়ে ডেঙ্গুতে মারা গেছেন ১৭৮ জন। তাদের মধ্যে ৯২ জন নারী এবং ৮৫ জন পুরুষ।
১৬ থেকে ৩৫ বছর বয়সীদের আক্রান্ত বেশি
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বয়সভিত্তিক হিসাবে ১৬ থেকে ৩৫ বছর বয়সী ব্যক্তিদের মধ্যে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বেশি।
বিজ্ঞাপন
জানুয়ারি থেকে ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৬ থেকে ১০ বছর বয়সী ৩ হাজার ৩ জন, ১১ থেকে ১৫ বছর বয়সী ৩ হাজার ৭৮৯ জন, ১৬ থেকে ২০ বছর বয়সী ৮ হাজার ২২৪ জন, ২১ থেকে ২৫ বছর বয়সী ৮ হাজার ৭৫১ জন, ২৬ থেকে ৩০ বছর বয়সী ৮ হাজার ৬৩১ জন এবং ৩১ থেকে ৩৫ বছর বয়সী ৫ হাজার ৯৬৬ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন।
এই বয়সসীমার মধ্যে মৃত্যুর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। ১৬ থেকে ২০ বছর বয়সীদের মধ্যে ৭ জন, ২১ থেকে ২৫ বছর বয়সীদের মধ্যে ১৪ জন, ২৬ থেকে ৩০ বছর বয়সীদের মধ্যে ২৩ জন এবং ৩১ থেকে ৩৫ বছর বয়সীদের মধ্যে ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে।
তরুণদের আক্রান্ত হওয়ার কারণ
বিজ্ঞাপন
কীটতত্ত্ববিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কবিরুল বাশারের মতে, জনসংখ্যায় তরুণদের অংশ বেশি হওয়ায় তাদের আক্রান্তের সংখ্যাও বেশি হতে পারে। পাশাপাশি তরুণদের চলাচল তুলনামূলক বেশি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস, কর্মস্থল ও বিভিন্ন স্থানে যাতায়াতের কারণে দিনের বেলায় এডিস মশার সংস্পর্শে আসার সুযোগও বাড়ে।
তার মতে, ঘরের বাইরে বেশি সময় কাটানো এবং বিভিন্ন স্থানে চলাচলের কারণে তরুণদের মশার কামড়ের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মো. তারিকুল ইসলাম লিমনও তরুণদের বেশি আক্রান্ত হওয়ার ক্ষেত্রে জীবনযাত্রার বিষয়টিকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। তার ভাষ্য, তরুণরা জৈবিকভাবে ডেঙ্গুর প্রতি বেশি সংবেদনশীল—এমন প্রমাণ নেই। তবে এডিস মশা দিনের বেলায় কামড়ানোর কারণে শিক্ষার্থী ও কর্মজীবী তরুণরা বাইরে থাকায় সংক্রমণের ঝুঁকিতে বেশি থাকেন।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
তিনি আরও বলেন, অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কারখানা বা নির্মাণস্থলের মতো জায়গায় মশক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা দুর্বল হলে ঝুঁকি বাড়ে। আবার কর্মজীবীদের চিকিৎসা-সনদের প্রয়োজনেও হাসপাতালে যাওয়ার প্রবণতা থাকায় সরকারি পরিসংখ্যানে তরুণ ও পুরুষদের আক্রান্তের সংখ্যা বেশি প্রতিফলিত হতে পারে।
বিজ্ঞাপন
নারীদের মৃত্যুর হার বেশি হওয়ার সম্ভাব্য কারণ
বিশেষজ্ঞদের মতে, নারীদের ডেঙ্গুতে মৃত্যুর ক্ষেত্রে হাসপাতালে দেরিতে আসা, গর্ভাবস্থা, রক্তপাত ও রক্তস্বল্পতার মতো বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
অধ্যাপক কবিরুল বাশারের মতে, অনেক নারী পরিবারের অন্যান্য দায়িত্বকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে জ্বর বা অসুস্থতার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখেন না। ফলে পরীক্ষা ও চিকিৎসা নিতে দেরি হতে পারে। গর্ভাবস্থায় শারীরিক পরিবর্তনও ডেঙ্গুর জটিলতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বিজ্ঞাপন
ডা. তারিকুল ইসলাম লিমনের মতে, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া নারীদের মধ্যে মৃত্যুর হার বেশি হওয়ার পেছনে চিকিৎসা নিতে দেরি করাসহ বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। পরিবারের চিকিৎসা-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে নারীর সীমিত ভূমিকা থাকলে গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে পৌঁছানোর ঝুঁকি বাড়তে পারে।
তিনি বলেন, নারীদের বয়স, গর্ভাবস্থা, রক্তপাত বা রক্তস্বল্পতার মতো সহ-অসুস্থতাও ডেঙ্গুর জটিলতা বাড়াতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গুতে নারীদের ঝুঁকি কমাতে হাসপাতালে ভর্তির সময় গর্ভাবস্থা ও রক্তক্ষরণের তথ্য নেওয়া, প্রয়োজন অনুযায়ী প্রসূতি ও মেডিসিন বিভাগের সমন্বিত চিকিৎসা এবং জ্বর হলে দ্রুত পরীক্ষা ও চিকিৎসার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।








