Logo

চরম তাপে গর্ভাবস্থায় বাড়ছে মা ও শিশুর ঝুঁকি

profile picture
বশির হোসেন বাবু
৪ অক্টোবর, ২০২৬, ১৫:০৯
চরম তাপে গর্ভাবস্থায় বাড়ছে মা ও শিশুর ঝুঁকি
ছবি: সংগৃহীত

জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত এখন আর শুধু ঘূর্ণিঝড়, বন্যা কিংবা খরার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। পৃথিবীর ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা এবার সরাসরি আঘাত হানছে গর্ভাবস্থা, সন্তান জন্মদান ও নবজাতকের স্বাস্থ্যে। প্রচণ্ড তাপের কারণে অকাল প্রসব, মৃত সন্তান প্রসব, কম ওজনের শিশু জন্ম এবং মায়ের বিভিন্ন জটিলতার ঝুঁকি বাড়ছে। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া না হলে এই সংকট ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে সতর্ক করেছেন জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক নির্বাহী সচিব সাইমন স্টিয়েল।

বিজ্ঞাপন

ফিজিতে সোমবার আয়োজিত ‘বার্থরাইট’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, চরম তাপমাত্রা যত বাড়ছে, গর্ভাবস্থা ও সন্তান জন্মদান বৈশ্বিক জলবায়ু সংকটের একটি নতুন ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্রে পরিণত হচ্ছে—যার পরিণতি প্রাণঘাতীও হতে পারে।

ভয়াবহ চিত্র জরিপে

স্বাস্থ্যবিষয়ক বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান ওয়েলকামের উদ্যোগে অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, ভারত, যুক্তরাজ্য ও জিম্বাবুয়ের এক হাজার মাতৃস্বাস্থ্য পেশাজীবীর ওপর চালানো জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য।

বিজ্ঞাপন

জরিপে অংশ নেওয়া ৯৮ শতাংশ স্বাস্থ্যকর্মী জানিয়েছেন, তারা এমন অন্তঃসত্ত্বা নারীর চিকিৎসা বা সেবা দিয়েছেন, যার স্বাস্থ্যে প্রচণ্ড তাপের প্রভাব পড়েছে বলে তারা মনে করেন। একইভাবে ৯৯ শতাংশ স্বাস্থ্যকর্মী এমন শিশুর সেবা দিয়েছেন, যার স্বাস্থ্যে চরম তাপের প্রভাব পড়েছে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ৭৩ শতাংশ স্বাস্থ্যকর্মী জানিয়েছেন, গত পাঁচ বছরে তাপজনিত রোগ ও জটিলতার ঘটনা বেড়েছে। আর ৮১ শতাংশ স্বাস্থ্যকর্মী আশঙ্কা করেছেন, যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে প্রচণ্ড তাপ মাতৃস্বাস্থ্য, গর্ভস্থ শিশু ও নবজাতকের জন্য আরও বড় হুমকি হয়ে উঠবে।

এক ডিগ্রি তাপ বাড়লেই বাড়ছে ঝুঁকি

বিজ্ঞাপন

জরিপ ও সংশ্লিষ্ট বৈজ্ঞানিক তথ্য অনুযায়ী, তাপমাত্রা প্রতি এক ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে অকাল সন্তান প্রসবের হার ৫ শতাংশ এবং গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের হার ৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত তাপের সংস্পর্শ অকাল প্রসব, মৃত সন্তান প্রসব ও কম ওজনের শিশু জন্মের সঙ্গে ক্রমবর্ধমানভাবে সম্পর্কিত বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের উদ্ধৃত করে সাইমন স্টিয়েল বলেন, এই সংকটের পেছনে শুধু তাপমাত্রা বৃদ্ধি নয়, স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ, খাদ্য-পানি-বিদ্যুতের সংকট এবং নিরাপদ চিকিৎসাসেবায় অসম প্রবেশাধিকারও ভূমিকা রাখছে।

বিজ্ঞাপন

‘ঠান্ডা থাকুন’ বললেই সমাধান নয়

জলবায়ু সংকটের প্রভাব সবার ওপর সমানভাবে পড়ে না। খোলা জায়গায় কাজ করা মানুষ, অনিরাপদ ও অপর্যাপ্ত আবাসনে বসবাসকারী পরিবার, দূরের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যেতে বাধ্য হওয়া নারী এবং পানি-বিদ্যুৎ ও শীতলীকরণ সুবিধাবঞ্চিত স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীলদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।

সাইমন স্টিয়েলের ভাষায়, “যেখানে ঠান্ডা থাকার কোনো জায়গাই নেই, সেখানে ‘ঠান্ডা থাকুন’—এই পরামর্শ কোনো সমাধান নয়।”

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, নিরাপদ সন্তান জন্মদান ইতোমধ্যেই ভূগোল, আয় এবং স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশাধিকারের ওপর নির্ভরশীল। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে প্রচণ্ড তাপ এই বৈষম্য আরও বাড়িয়ে দেবে।

স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে প্রস্তুত করার তাগিদ

গর্ভবতী নারী ও নবজাতককে জলবায়ুজনিত ঝুঁকি থেকে রক্ষায় জাতীয় পর্যায়ের পরিকল্পনায় মাতৃস্বাস্থ্যকে অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘের এই কর্মকর্তা।

বিজ্ঞাপন

তাঁর মতে, স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোকে প্রচণ্ড তাপ মোকাবিলার উপযোগী করে তুলতে হবে। নিশ্চিত করতে হবে নিরাপদ পানি, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, প্রয়োজনীয় শীতলীকরণ ব্যবস্থা এবং প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী। পাশাপাশি তাপপ্রবাহের আগাম সতর্কবার্তা এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় সুস্পষ্ট নির্দেশনাও থাকতে হবে।

তিনি বলেন, “যা কোনো পরিকল্পনায় উল্লেখ করা হয় না, তা প্রায়ই অর্থায়ন, পরিমাপ ও সুরক্ষার আওতার বাইরে থেকে যায়।”

বৈষম্যের নতুন মাত্রা

বিজ্ঞাপন

সাইমন স্টিয়েল সতর্ক করে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গর্ভাবস্থা ও সন্তান জন্মদানের নিরাপত্তা যেন অর্থনৈতিক সক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল হয়ে না পড়ে।

তিনি বলেন, “একটি নবজাতকের সুস্থভাবে পৃথিবীতে আসা কখনোই কোনো পরিবারের তাপ থেকে পালিয়ে বাঁচার সক্ষমতার ওপর নির্ভর করা উচিত নয়।”

তার মতে, জলবায়ু সংকটের কারণে স্বাস্থ্যব্যবস্থায় যে চাপ তৈরি হচ্ছে, তা শুধু উন্নত দেশগুলোর বিষয় নয়। বরং উন্নয়নশীল ও ছোট দ্বীপরাষ্ট্রগুলো তুলনামূলকভাবে কম দায়ী হয়েও এর বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ছে।

বিজ্ঞাপন

তিন দফা পদক্ষেপের আহ্বান

গর্ভবতী নারী ও নবজাতককে জলবায়ুজনিত ঝুঁকি থেকে রক্ষায় তিনটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সাইমন স্টিয়েল।

প্রথমত, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো এবং তাপ মোকাবিলার জাতীয় পরিকল্পনায় মাতৃ ও নবজাতকের স্বাস্থ্যকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

বিজ্ঞাপন

দ্বিতীয়ত, বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও তথ্যকে বাস্তব সুরক্ষা ব্যবস্থায় রূপান্তর করতে হবে। স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ, আগাম তাপ সতর্কতা, নিরাপদ স্বাস্থ্যকেন্দ্র, পানি ও বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে হবে।

তৃতীয়ত, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কোথায় স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে, কোন ব্যবস্থা কার্যকর এবং কোথায় অর্থ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রয়োজন—তা নিয়মিতভাবে পরিমাপ ও বিশ্লেষণ করতে হবে।

‘সন্তান জন্মদান অনিরাপদ হতে পারে না’

বিজ্ঞাপন

সাইমন স্টিয়েলের বক্তব্যে সবচেয়ে জোরালো বার্তা ছিল—জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে একজন নারী যেন নিরাপদে সন্তান জন্মদানের অধিকার থেকে বঞ্চিত না হন।

তিনি বলেন, “পরিবর্তিত জলবায়ু কখনোই এমন কারণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না, যার কারণে গর্ভাবস্থা ও সন্তান জন্মদান কম নিরাপদ হয়ে পড়ে।”

ফিজিতে অনুষ্ঠিত এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে জলবায়ু পরিবর্তন ও মাতৃস্বাস্থ্যের সম্পর্ক আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনায় নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে। সামনে কপ-৩১ সম্মেলন। তার আগে গর্ভবতী নারী ও নবজাতকের সুরক্ষাকে জলবায়ু অভিযোজনের মূল পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জোরালো হচ্ছে।

কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি শুধু সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা, ঘূর্ণিঝড় কিংবা খরার পরিসংখ্যানে আটকে নেই—এর প্রভাব পৌঁছে যাচ্ছে একজন মায়ের গর্ভে থাকা অনাগত শিশুর জীবন পর্যন্ত।

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD