দিনেই হবে রাত, শতাব্দীর দীর্ঘতম সূর্যগ্রহণের অপেক্ষায় বিশ্ব

আগামী বছরগুলোর মধ্যে জ্যোতির্বিজ্ঞানের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ঘটনাগুলোর একটি ঘটতে যাচ্ছে ২০২৭ সালের ২ আগস্ট। ওই দিন পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চল থেকে দেখা যাবে ২১ শতকের স্থলভাগ থেকে পর্যবেক্ষণযোগ্য সবচেয়ে দীর্ঘ পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ।
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞানীদের হিসাব অনুযায়ী, চাঁদ টানা প্রায় ৬ মিনিট ২৩ সেকেন্ড সূর্যকে সম্পূর্ণভাবে আড়াল করে রাখবে, যা সাম্প্রতিক সময়ের যেকোনো পূর্ণ সূর্যগ্রহণের তুলনায় অনেক বেশি দীর্ঘ।
এই বিরল মহাজাগতিক ঘটনার খবর প্রকাশের পর থেকেই বিশ্বজুড়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানী, গবেষক এবং আকাশ পর্যবেক্ষকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই ইতোমধ্যে গ্রহণ পর্যবেক্ষণের পরিকল্পনা শুরু করেছেন।
কেন এত দীর্ঘ হবে এই সূর্যগ্রহণ?
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞানীদের মতে, গ্রহণটির দীর্ঘস্থায়িত্বের পেছনে কাজ করছে কয়েকটি বিশেষ জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক অবস্থান। গ্রহণের সময় চাঁদ পৃথিবীর তুলনামূলক কাছাকাছি অবস্থানে থাকবে। ফলে আকাশে চাঁদকে স্বাভাবিকের তুলনায় কিছুটা বড় দেখাবে।
অন্যদিকে, ওই সময় পৃথিবী সূর্য থেকে অপেক্ষাকৃত দূরের অবস্থানের কাছাকাছি থাকবে, যাকে জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভাষায় ‘অ্যাফেলিয়ন’ বলা হয়। এর ফলে সূর্যকে আকাশে তুলনামূলক ছোট দেখাবে। চাঁদের আপাত আকার বড় এবং সূর্যের আপাত আকার ছোট হওয়ার এই বিরল সমন্বয়ের কারণেই দীর্ঘ সময় ধরে পূর্ণগ্রাস অবস্থা বজায় থাকবে।
বিজ্ঞাপন
যেসব অঞ্চল থেকে দেখা যাবে পূর্ণগ্রাস
গ্রহণের মূল বা কেন্দ্রীয় পথ শুরু হবে আটলান্টিক মহাসাগর থেকে। এরপর এটি দক্ষিণ ইউরোপ, উত্তর আফ্রিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলের ওপর দিয়ে অতিক্রম করবে।
পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখার সুযোগ পাওয়া যাবে স্পেন, জিব্রাল্টার, মরক্কো, আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া, লিবিয়া, মিসর, সুদান, সৌদি আরব, ইয়েমেন এবং সোমালিয়ার কিছু অংশ থেকে। এসব অঞ্চলের বাসিন্দারা দিনের বেলাতেই কয়েক মিনিটের জন্য রাতের মতো অন্ধকার পরিবেশ প্রত্যক্ষ করতে পারবেন।
বিজ্ঞাপন
গ্রহণ দেখার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত স্থান
জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের বিশ্লেষণে মিসরকে গ্রহণ পর্যবেক্ষণের অন্যতম সেরা স্থান হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বিশেষ করে লুক্সর এবং নিউ ভ্যালি অঞ্চলে পূর্ণগ্রাসের সময়কাল সবচেয়ে বেশি এবং আবহাওয়াগত পরিস্থিতিও তুলনামূলক অনুকূল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব এলাকায় গ্রহণের পুরো সময়জুড়ে আকাশের নাটকীয় পরিবর্তন সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা যেতে পারে। এজন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে পর্যবেক্ষক ও গবেষকদের সেখানে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
গ্রহণের সময় কী দেখা যাবে?
পূর্ণগ্রাস শুরু হলে দিনের আলো দ্রুত কমে গিয়ে গোধূলির মতো পরিবেশ সৃষ্টি হবে। কয়েক মিনিটের জন্য চারপাশে অস্বাভাবিক অন্ধকার নেমে আসবে এবং তাপমাত্রাও কিছুটা হ্রাস পেতে পারে।
এ সময় সাধারণত খালি চোখে সূর্যের বাইরের স্তর বা করোনা দৃশ্যমান হয়, যা স্বাভাবিক অবস্থায় দেখা যায় না। পাশাপাশি ‘বেইলি’স বিডস’ এবং ‘ডায়মন্ড রিং’ নামে পরিচিত সূর্যগ্রহণের কিছু বিরল দৃশ্যও পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হতে পারে।
বিজ্ঞাপন
গ্রহণের সময় আকাশে কিছু উজ্জ্বল গ্রহ ও নক্ষত্রও দৃশ্যমান হয়ে উঠতে পারে, যা পুরো অভিজ্ঞতাকে আরও ব্যতিক্রমী করে তুলবে।
নিরাপত্তা বিষয়ে সতর্কতা
বিজ্ঞাপন
বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলছেন, পূর্ণগ্রাসের সংক্ষিপ্ত সময় ছাড়া সূর্যের দিকে সরাসরি তাকানো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। গ্রহণের অন্যান্য পর্যায়ে অবশ্যই আন্তর্জাতিক মানের সোলার ফিল্টারযুক্ত চশমা বা নিরাপদ পর্যবেক্ষণ সরঞ্জাম ব্যবহার করতে হবে।
সাধারণ সানগ্লাস, রঙিন কাচ বা এক্স-রে ফিল্ম দিয়ে সূর্যগ্রহণ দেখা নিরাপদ নয় এবং এতে চোখের স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
কোটি কোটি মানুষের নজর থাকবে আকাশে
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞানীদের ধারণা, বিশ্বের ৪০০ কোটিরও বেশি মানুষ কোনো না কোনোভাবে এই সূর্যগ্রহণ প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পাবেন। কেউ পূর্ণগ্রাস, কেউ আবার আংশিক গ্রহণ দেখতে পারবেন।
এই বিশাল দর্শকসংখ্যা এবং গ্রহণের অসাধারণ স্থায়িত্বের কারণে ২০২৭ সালের ২ আগস্টের সূর্যগ্রহণকে ২১ শতকের সবচেয়ে আলোচিত জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ঘটনাগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। আকাশপ্রেমীদের কাছে এটি শুধু একটি গ্রহণ নয়, বরং জীবনে একবার দেখা মিলতে পারে এমন এক বিরল মহাজাগতিক অভিজ্ঞতা।








