Logo

স্পেনের আকাশে টানা তিন বছর দেখা যাবে সূর্যগ্রহণ

profile picture
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
১৩ আগস্ট, ২০২৬, ১৬:৩৫
স্পেনের আকাশে টানা তিন বছর দেখা যাবে সূর্যগ্রহণ
ছবি: সংগৃহীত

আজ ১৩ আগস্ট বুধবার স্থানীয় সময় বিকেলে স্পেনের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে। শুধু এবারই নয়, আগামী বছর আগস্ট এবং এর পরের বছর জানুয়ারিতেও দেশটির মানুষ সূর্যগ্রহণ দেখার সুযোগ পাবেন। অর্থাৎ, প্রায় দেড় বছরের ব্যবধানে স্পেনে পরপর তিনবার সূর্যগ্রহণ দেখার বিরল সুযোগ তৈরি হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

বুধবার উত্তর-পশ্চিম স্পেনের গালিসিয়া থেকে পূর্বদিকে বালেয়ারিক দ্বীপপুঞ্জ পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে। এছাড়া গ্রিনল্যান্ড এবং আইসল্যান্ডের পশ্চিম প্রান্ত থেকেও এ গ্রহণ পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে।

এরপর ২০২৭ সালের ২ আগস্ট দক্ষিণ স্পেনের সীমান্তবর্তী অঞ্চল, উত্তর আফ্রিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি অংশ থেকে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে। এর পরের বছর ২০২৮ সালের জানুয়ারিতে স্পেনের দক্ষিণ-পশ্চিম থেকে উত্তর-পূর্বাঞ্চল পর্যন্ত বলয়গ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে।

উত্তর-পূর্ব স্পেনের বাসিন্দা হোসেপ মাসাইয়েস মাত্র ১৭ বছর বয়সে বার্সেলোনার আকাশে সূর্যগ্রহণ দেখে মুগ্ধ হন। এরপর থেকেই সূর্যগ্রহণের প্রতি তার আগ্রহ বাড়তে থাকে। সেই আগ্রহ থেকে তিনি পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে বেড়িয়েছেন। ৫৩ বছর বয়সে এখন পর্যন্ত তিনি ৪৩টি গ্রহণ দেখেছেন। এর মধ্যে ২২টি ছিল পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বার্সেলোনা জ্যোতির্বিজ্ঞান সমিতির সদরদপ্তরে কথা হয় মাসাইয়েসের সঙ্গে। তিনি বলেন, গ্রহণের সৌন্দর্য অতুলনীয়। বর্তমানে তিনি ওই সংস্থার সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। মাসাইয়েস জানান, সূর্যগ্রহণের প্রতি আগ্রহ তাকে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণের সুযোগ করে দিয়েছে। একই সঙ্গে ভিন্ন সমাজ ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানার পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন জ্যোতির্বিজ্ঞানীর সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগও তৈরি হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

পরপর তিন বছর সূর্যগ্রহণ দেখার জন্য মাসাইয়েস নতুন পরিকল্পনা করেছেন। এবার তিনি অন্য জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের সঙ্গে নিয়ে স্পেনের পাশাপাশি উত্তর আফ্রিকার মরক্কো, আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া ও মিশর থেকে সূর্যগ্রহণ পর্যবেক্ষণ করতে চান।

সূর্যগ্রহণের সময় যা হয়

পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের সময় চাঁদ সূর্যের আলোকে সম্পূর্ণ ঢেকে দেয়। ফলে পৃথিবীর নির্দিষ্ট একটি অঞ্চল অন্ধকার হয়ে যায়।

বিজ্ঞাপন

আর বলয়গ্রাস গ্রহণের সময় চাঁদ পৃথিবী থেকে এতটাই দূরে থাকে যে, তা সূর্যকে সম্পূর্ণভাবে ঢেকে দিতে পারে না। এতে সূর্যের বাইরের প্রান্তটুকুই দেখা যায়, ঠিক একটি আগুনের বলয়ের মতো। তাই এটি পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ নয়।

প্রতি বছর দুই থেকে তিনটি সূর্যগ্রহণ হয়। তবে বেশিরভাগই সমুদ্রের ওপর অথবা পৃথিবীর জনবিরল অঞ্চলে ঘটে। পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ সাধারণত প্রতি ১৮ মাসে একবারই ঘটে।

স্পেনে প্রায় দেড় বছরের মধ্যে তিনটি সূর্যগ্রহণের এই ঘটনাকে ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার বিজ্ঞান, যোগাযোগ ও শিক্ষা বিভাগের প্রধান সান্দ্রা বেনিতেজ ব্যতিক্রমী ঘটনা বলে দাবি করেছেন।

বিজ্ঞাপন

বেনিতেজ এরেরা বলেন, “এটা সত্যিই অত্যন্ত অস্বাভাবিক৷ সূর্য-পৃথিবী-চাঁদ ব্যবস্থার বিন্যাস এবং কক্ষপথগুলোর হেলানো অবস্থানই স্পেনকে এই তিন গ্রহণ উপহার দিয়েছে৷”

আইবেরিয়ান উপদ্বীপ থেকে ১৯১২ সালের পর আর কোনো পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখা যায়নি। এমনকি ২০২৭ সালের পর ২০৫৩ সাল পর্যন্ত ইউরোপের কোনো অংশে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ হবে না।

মূলত চাঁদ সূর্যকে যখন পুরোপুরি ঢেকে দেয়, তখনই আকাশ অন্ধকার হয়ে যায়। এসময় সূর্য বিকিরণের প্রভাবে সূর্যের বায়ুমন্ডলের বাইরের স্তর খালি চোখেই দেখা যায়৷ উল্লেখ্য, সূর্যের এই বায়ুমণ্ডলীয় স্তরের নাম ‘করোনা’৷

বিজ্ঞাপন

সূর্যকে চাঁদ ঢেকে রাখে মাত্র কয়েক মিনিটের জন্যই। তবে হোসেপ মাসাইয়েসের মতে, “এই সূর্যগ্রহণ কাউকে উদাসীন রাখে না। এই সৌন্দর্য মানুষের মনে মহাবিশ্বের বিশালতা নিয়ে অনুভূতির সৃষ্টি করে৷ মানুষ বুঝতে পারে, মহাবিশ্বের তুলনায় গ্রহগুলো কতটা ছোট৷”

পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ এক জাদুকরী মুহূর্ত

পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের কারণে সূর্যের বায়ুমণ্ডল তথা করোনার প্রভাব পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ পান বিজ্ঞানীরা। সৌর বায়ু ও সৌরঝড়ের উৎস এই করোনা, এবং এগুলো মহাকাশ দিয়ে পৃথিবীতে এসে পৌঁছায়৷ এই পুরো প্রক্রিয়াটিকে বলা হয় ‘স্পেস ওয়েদার' বা মহাকাশ আবহাওয়া।

বিজ্ঞাপন

মহাকাশ আবহাওয়া মানুষের দৈনন্দিন জীবনের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে৷ যেমন, শক্তিশালী সৌরঝড় উপগ্রহের কার্যক্ষমতা নষ্ট করে দিতে পারে। যার ফলে ব্যাহত হতে পারে মোবাইল নেটওয়ার্ক, জিপিএস, এমনকি ব্যাংক লেনদেনও। বিদ্যুৎ গ্রিডে ব্যাঘাত ঘটে, হতে পারে বিদ্যুৎ বিভ্রাটও। যেহেতু আমরা যোগাযোগ, ব্যাংকিং এবং জলবায়ু পরিবর্তনসহ নানা বিষয়ে ইতোমধ্যেই উপগ্রহনির্ভর হয়ে পড়েছি, তাই এই মহাকাশ আবহাওয়া পূর্বাভাস পাওয়া আগের চেয়ে এখন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমানে বিজ্ঞানীরা মাটি থেকে করা পর্যবেক্ষণ আর মহাকাশযান থেকে পাওয়া তথ্য একসঙ্গে মিলিয়ে মহাকাশ আবহাওয়ার ঝুঁকি বোঝার চেষ্টা করছেন। এর মধ্যে একটি হলো : ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার প্রোবা-৩, যা মহাকাশে কৃত্রিমভাবে সূর্যগ্রহণের মতো অবস্থা তৈরি করতে পারে। আরেকটি হলো ‘সোলার অরবিটার', যা মহাকাশ আবহাওয়ার ঝুঁকি নিরূপণ করার চেষ্টা করে।

তবে সূর্যগ্রহণের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে শিক্ষাক্ষেত্রেই। এর মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ মানুষ জ্যোতির্বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানের অন্যান্য দিক সম্পর্কে জানতে অনুপ্রাণিত হয়।

বিজ্ঞাপন

এদিকে মারাকেশের কাছের একটি ছোট গ্রামে বেড়ে ওঠা মুলানে জানান, ছোটোবেলায় তার গ্রামের মানুষ গ্রহণকে ভয় পেত। তারা মনে করত এটা মানুষের জন্য বিপজ্জনক।

তিনি বলেন, “গ্রামের মানুষ আমাদের ঘরের ভেতরে লুকিয়ে থাকতে বলত, কারণ তারা কী ঘটছে সেটা বুঝতো না৷ এখন আমরা তার ঠিক উল্টোটা করছি। আমরা মানুষকে বাইরে গিয়ে চশমা পরে গ্রহণ দেখতে এবং তা উপভোগ করতে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।”

শতাব্দীর গ্রহণ ঘিরে একজোট বিশ্ব

বিজ্ঞাপন

ইতোমধ্যে অনেকেই ২০২৭ সালের সূর্যগ্রহণের অপেক্ষায় রয়েছেন। এটিকে ‘শতাব্দীর গ্রহণ’ বলা হচ্ছে। কারণ ধারণা করা হচ্ছে, মিশরের ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় এই পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের পূর্ণতা ছয় মিনিটেরও বেশি সময় স্থায়ী হবে।

২০২৬ সালের গ্রহণ সূর্যাস্তের কাছাকাছি সময়ে ঘটবে। বিপরীতে ২০২৭ সালের গ্রহণ হবে সকাল গড়িয়ে দুপুরের দিকে, যখন সূর্য আকাশের মাঝামাঝি অবস্থানে থাকবে।

গ্রহণ পর্যবেক্ষণের জন্য স্পেনের ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জ অ্যাস্ট্রোফিজিক্স ইনস্টিটিউট এরই মধ্যে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে একটি গবেষণা প্রকল্প হাতে নিয়েছে। যেখানে সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞানীদের সঙ্গে কাজ করবেন৷ মরক্কোর মোহাম্মদ সিক্সথ পলিটেকনিক ইউনিভার্সিটি এবং যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সোলার অবজারভেটরি এই প্রকল্পে তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। এই তিন প্রতিষ্ঠান মিলেই ২০২৭ সালের সূর্যগ্রহণ পর্যবেক্ষণের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

অন্যদিকে নর্থ আফ্রিকান টেলিস্কোপ ইক্লিপস প্রকল্পের লক্ষ্য হলো স্পেন, মরক্কো ও যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞানী এবং উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ করে দেওয়া। উত্তর মরক্কোর ১০টি জায়গায় বসানো টেলিস্কোপ দিয়ে তারা সূর্যের বায়ুমণ্ডলীয় স্তর পর্যবেক্ষণ করবেন। প্রতিটি অবস্থান থেকে গ্রহণের সময় ছবি সংগ্রহ করা হবে৷ এরপর এগুলো একত্র করে সূর্যের বায়ুমণ্ডলে কী ঘটছে, তার একটি বিস্তৃত ছবি তৈরি করা হবে।

মোহাম্মদ সিক্সথ পলিটেকনিক ইউনিভার্সিটির জ্যোতির্পদার্থবিদ ইউসেফ মুলানে বলেন, “এই গ্রহণের অর্থ আমার কাছে অনেক গভীর।”

মূল মার্কিন পরীক্ষাটি পরিচালনাকারী মার্টিনেজ বলেন, “আমি মরক্কো থেকে সূর্য পর্যবেক্ষণের সময় একটি ‘করোনাল মাস ইজেকশন' বা একটি বড় শিখা দেখতে চাইব। যাই হোক, বিজ্ঞান সংশ্লিষ্ট কিছু না কিছু তো হবেই৷ কিন্তু মূল লক্ষ্য হলো, শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করা এবং তাদের বিজ্ঞানের প্রতি উৎসাহী করে তোলা।”

২০২৭ সালের মূল আয়োজনের প্রস্তুতি হিসেবে শিক্ষার্থীদের একটি ছোট দল ২০২৬ সালের সূর্যগ্রহণ দেখতে উত্তর স্পেনে ভ্রমণ করবে।

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD