ইরানে ৮০০ বিক্ষোভকারীর ফাঁসি সাময়িক স্থগিত

সরকারবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেওয়ার অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া প্রায় ৮০০ বিক্ষোভকারীর ফাঁসির দণ্ড সাময়িকভাবে কার্যকর না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। হোয়াইট হাউসে আয়োজিত এক নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংয়ে প্রেসিডেন্টের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লিভিট জানান, নির্ধারিত দিনে এই বিক্ষোভকারীদের ফাঁসি হওয়ার কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে তা স্থগিত করা হয়।
বিজ্ঞাপন
ব্রিফিংয়ে ক্যারোলিন লিভিট বলেন, ইরান সরকারের ভেতর থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে যে আন্তর্জাতিক চাপ—বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র এবং মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চলের মিত্র দেশগুলোর কূটনৈতিক তৎপরতার কারণে—ইসলামি প্রজাতন্ত্রী সরকার এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে।
প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে ইরানজুড়ে যে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ চলছে, তা দেশটির সাম্প্রতিক ইতিহাসে নজিরবিহীন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার পর গত ৪৭ বছরে এত ব্যাপক ও তীব্র আন্দোলনের মুখে কখনো পড়েনি তেহরান। রাজধানী তেহরানসহ বড় শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে এই বিক্ষোভ।
বিজ্ঞাপন
এই আন্দোলনের পেছনে মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে ইরানের চরম অর্থনৈতিক সংকট। দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা, দুর্বল অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা এবং লাগাতার অবমূল্যায়নের ফলে দেশটির জাতীয় মুদ্রা ইরানি রিয়েল কার্যত ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। বর্তমানে এক মার্কিন ডলারের বিপরীতে প্রায় ৯ লাখ ৯৪ হাজার ৫৫ ইরানি রিয়েল লেনদেন হচ্ছে, যা বিশ্বে অন্যতম দুর্বল মুদ্রা হিসেবে রিয়েলকে চিহ্নিত করেছে।
মুদ্রার এই ভয়াবহ অবমূল্যায়নের সরাসরি প্রভাব পড়েছে সাধারণ মানুষের জীবনে। ইরানে এখন ভয়ঙ্কর মাত্রার মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। খাদ্য, পোশাক, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ মৌলিক প্রয়োজন মেটানো সাধারণ মানুষের জন্য ক্রমেই অসম্ভব হয়ে উঠছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
এই প্রেক্ষাপটে গত ২৮ ডিসেম্বর রাজধানী তেহরানের বিভিন্ন বাজারের পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীরা মূল্যস্ফীতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে ধর্মঘটের ডাক দেন। সেই ধর্মঘট থেকেই ধীরে ধীরে আন্দোলন রূপ নেয় দেশব্যাপী সরকারবিরোধী বিক্ষোভে। অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই ইরানের ৩১টি প্রদেশের প্রায় সব শহর ও গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে প্রতিবাদের আগুন।
বিজ্ঞাপন
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। দেশজুড়ে ইন্টারনেট ও মোবাইল যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ রাখা হয়েছে। পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর পাশাপাশি সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ শহর ও স্থাপনায়। বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংঘর্ষে এখন পর্যন্ত ১২ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। একই সঙ্গে হাজার হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এদিকে বিক্ষোভ শুরুর পর থেকেই ইরানে সামরিক অভিযান চালানোর হুমকি দিয়ে আসছিলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একাধিক বক্তব্যে তিনি ইরান সরকারের কঠোর সমালোচনা করেন এবং প্রয়োজন হলে সামরিক পদক্ষেপের ইঙ্গিত দেন। তবে সাম্প্রতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, চলমান অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার কারণে আপাতত ইরানে সরাসরি মার্কিন হামলার সম্ভাবনা কম।
বিজ্ঞাপন
ফাঁসির দণ্ড কার্যকর স্থগিতের সিদ্ধান্তকে অনেকেই আন্তর্জাতিক চাপের একটি তাৎপর্যপূর্ণ ফল হিসেবে দেখছেন। তবে এই সিদ্ধান্ত ইরানের অভ্যন্তরীণ সংকট কতটা প্রশমিত করবে, তা নিয়ে এখনও অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
সূত্র: এএফপি








