গুলি ও শিরশ্ছেদে ৯ জনকে হত্যা, পুড়িয়ে দেওয়া হলো বাড়িঘর

ভারতের মণিপুর রাজ্যে আবারও ছড়িয়ে পড়েছে সহিংসতা। রাজ্যটির পাহাড়ি জেলাগুলোয় শুক্রবার রাত থেকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অন্তত নয়জন নিহত হয়েছেন। এ সময় নাগা ও কুকি সম্প্রদায়ের বাড়িঘরসহ অন্তত ১৪টি বাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। কোথাও গুলিতে প্রাণহানি, আবার কোথাও শিরশ্ছেদের অভিযোগ ঘিরে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।
বিজ্ঞাপন
এমন পরিস্থিতিতে রাজ্যে শান্তি ও স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করেছেন মুখ্যমন্ত্রী ইউমনাম খেমচাঁদ সিং। নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত বৈঠকে মণিপুরের পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
শুক্রবার (১১ অক্টোবর) রাতে কামজং জেলার চাসাদ গ্রামে নিরাপত্তা বাহিনী ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে কথিত গোলাগুলির ঘটনায় কুকি নারী ডমখোনেই তোথাং নিহত হন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করেই নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, চাসাদ গ্রামে অবৈধ বাংকার উচ্ছেদে মণিপুর পুলিশ, ইন্ডিয়া রিজার্ভ ব্যাটালিয়ন (আইআরবি) ও সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ যৌথ অভিযান চালায়। এ সময় স্থানীয় নারীরা অভিযান বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে অজ্ঞাতপরিচয় হামলাকারীরা নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে গুলি ছুড়লে বাহিনীর সদস্যরাও পাল্টা গুলি চালান।
বিজ্ঞাপন
শুক্রবার রাতেই পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটে। কয়েকটি বাড়িতে আগুন দেওয়া হয় এবং নিরাপত্তা বাহিনী ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে আবারও গোলাগুলি শুরু হয়। এতে নাগা ও কুকি সম্প্রদায়ের অন্তত ১৪টি বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, চাসাদ গ্রামের স্বেচ্ছাসেবকদের গ্রেপ্তার ও আটকাদেশের প্রতিবাদে চলা বিক্ষোভের সময় রাত সাড়ে ৯টার দিকে এসব ঘটনা ঘটে। কুকি উইমেন ইউনিয়নের দাবি, এ সময় ২৩ বছর বয়সী মাইকেল গামিনলেন হাওকিপ গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। সংগঠনটির অভিযোগ, নাগা বিদ্রোহীরা তাকে হত্যা করেছেন।
বিভিন্ন এলাকায় প্রাণহানি ও হামলা
বিজ্ঞাপন
শনিবার সকালে মণিপুরের একাধিক এলাকায় নতুন করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। চাসাদ থানায় আগুন দেওয়ার চেষ্টার অভিযোগও ওঠে। ভোর ৫টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত সেখানে গোলাগুলি চলে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে কামজংয়ের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট থানার চারপাশের ৪০০ মিটার এলাকায় মানুষের জমায়েত নিষিদ্ধ করেন।
কামজং জেলার নিংচৌ চিনডং গ্রামে পৃথক ঘটনায় দুই নাগা গ্রামরক্ষক নিহত হন। নিহতরা হলেন গাচানসো নিংশেন (৩০) ও লেইশিশান হুঙিয়ো (৫০)। শনিবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে চাসাদ গ্রামের প্রায় ১৭ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে এ ঘটনা ঘটে। সরকারি সূত্রগুলোর ধারণা, সীমান্তের ওপারে সক্রিয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো এতে জড়িত থাকতে পারে। তবে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু নিশ্চিত করা হয়নি।
এর আগে ভোর ৫টার দিকে মাকুই গ্রামে হামলায় আরও তিন নাগা গ্রামরক্ষক নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। তাদের নাম মাচুংগাম্মাম, আজিনপৌ রিংকাংমাই ও রবার্ট। নিহতদের ওপর কুকি সশস্ত্র গোষ্ঠী হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
বিজ্ঞাপন
গ্রামবাসীর দাবি, নিহত আজিনপৌ রিংকাংমাইয়ের শিরশ্ছেদ করা হয়েছে। এ-সংক্রান্ত ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে বলেও জানা গেছে। প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত ওই এলাকায় গুলিবর্ষণ চলছিল বলে স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানানো হয়। এ কারণে নিরাপত্তা বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পারেনি।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
এদিকে কাংপোকপি জেলার তাপোন গ্রামেও শনিবার সকাল ৬টার দিকে হামলার ঘটনা ঘটে। মাকুই গ্রামের কাছে ইম্ফল-তামেংলং সড়কে সন্দেহভাজন সশস্ত্র ব্যক্তিদের অতর্কিত হামলায় এক নাগা গ্রামস্বেচ্ছাসেবক নিহত এবং দুজন আহত হন বলে অভিযোগ উঠেছে।
নিহত ব্যক্তির নাম মাচুংওয়াংবৌ (৩৫)। তিনি থালোন গ্রামের বাসিন্দা। আহত দুজন হলেন নাহাসন (২৯) ও মাথাংগামবৌ (৩০)। ওই এলাকায় দুপুর পর্যন্ত গোলাগুলি চলার খবর পাওয়া গেছে।
বিজ্ঞাপন
অন্যদিকে উখরুল জেলার কনজাং গ্রামের কাছে ২০২ নম্বর জাতীয় মহাসড়কে হামলায় সন্দীপ রাই (৩০) নামের এক যাত্রী নিহত হন। তিনি সেনাপতি জেলার তাফৌ সেনাপতি নেপালি গ্রামের বাসিন্দা। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার ভোর সাড়ে ৫টার দিকে গাড়িতে করে যাওয়ার সময় অজ্ঞাতপরিচয় সশস্ত্র ব্যক্তিরা তার ওপর হামলা চালান। হামলার কারণ ও জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় এখনো জানা যায়নি।
পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে কেন্দ্রের সহায়তা চাইলেন মুখ্যমন্ত্রী
রাজ্যের ক্রমবর্ধমান সহিংসতার মধ্যে নয়াদিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করেন মুখ্যমন্ত্রী ইউমনাম খেমচাঁদ সিং। বৈঠকে তিনি মণিপুরে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনতে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন। রাজ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
বিজ্ঞাপন
তবে বিভিন্ন এলাকায় নতুন করে সংঘাত, প্রাণহানি ও বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় মণিপুরের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
তথ্যসূত্র: দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস








