Logo

ঘরে বিক্ষোভ, বাইরে চাপ: তিন দিক থেকেই কোণঠাসা মোদি

profile picture
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
১৩ অক্টোবর, ২০২৬, ১৬:১৫
ঘরে বিক্ষোভ, বাইরে চাপ: তিন দিক থেকেই কোণঠাসা মোদি
ছবি: সংগৃহীত

ক্ষমতায় থাকার ১৩তম বছরে এসে একসঙ্গে একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। দেশে তরুণদের বিক্ষোভ, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন এবং ভারতীয় মুদ্রা রুপির ওপর বাড়তে থাকা চাপ—সব মিলিয়ে কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়েছে তাঁর সরকার। এর সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি।

বিজ্ঞাপন

একসময় ভারতের রাজনীতিতে মোদিকে প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী মনে করা হলেও সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ তাঁর সরকারের সামনে নতুন চাপ তৈরি করেছে। বিশেষ করে তরুণদের আন্দোলন, ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিরোধীদের আপত্তি এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনার অচলাবস্থা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

তরুণদের বিক্ষোভে নতুন চ্যালেঞ্জ

ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) নামে তরুণদের একটি সংগঠনের আন্দোলন শুরু হয়েছিল অনেকটা কৌতুকের মধ্য দিয়ে। পরে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন করে সংগঠনটি আলোচনায় আসে। এবার তাদের লক্ষ্য ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার।

বিজ্ঞাপন

ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়া নিয়েও বিক্ষোভ বাড়ছে। আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে নয়াদিল্লির বিভিন্ন এলাকায় শত শত মানুষকে আটক করা হয়েছে। কিছু এলাকায় ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ রাখা এবং যান চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপের ঘটনাও ঘটেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছর শুরু হওয়া ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ায় ১৩ কোটিরও বেশি নাম বাদ পড়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২ কোটি ৮০ লাখ মৃত ব্যক্তি, ৬ কোটি ৩০ লাখ অন্যত্র চলে যাওয়া মানুষ এবং প্রায় ৩ কোটি ব্যক্তির নাম রয়েছে, যাঁদের খুঁজে পাওয়া যায়নি। এই বিপুলসংখ্যক নাম বাদ পড়ার বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

সিজেপি এখনো কোনো নির্বাচনে অংশ নেয়নি। অন্যদিকে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বিভিন্ন রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে বিজেপি জয় পেয়েছে। তবু সংগঠনটির আন্দোলন রাজনৈতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ফিচ সলিউশন্সের একটি বিভাগ বিএমআই গত সপ্তাহে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, আগামী কয়েক সপ্তাহে সিজেপির দ্বিতীয় দফার আন্দোলন আরও বিস্তৃত হতে পারে। জুলাইয়ের আন্দোলনকেও ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে প্রতিষ্ঠানটি মনে করছে।

বিএমআইয়ের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এবার সংগঠনটির সাংগঠনিক সক্ষমতা আগের চেয়ে বেশি, অভিযোগের পরিধিও বিস্তৃত। পাশাপাশি বিরোধী দলগুলোর সমান্তরাল আন্দোলনের সমর্থন রয়েছে। তবে বড় শহরগুলোর বাইরে আন্দোলনে অংশগ্রহণ সমান না হওয়ায় দেশজুড়ে এর বিস্তার কতটা হবে, তা এখনো অনিশ্চিত।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা থমকে

বিজ্ঞাপন

অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়েও চ্যালেঞ্জের মুখে মোদি সরকার। কয়েক মাস ধরে আলোচনায় থাকা ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যচুক্তির অগ্রগতি কার্যত থমকে গেছে বলে জানিয়েছেন ভারতের অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন।

আলোচনা কেন এগোচ্ছে না, সে বিষয়ে দুই দেশের পক্ষ থেকেই স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। তবে রাশিয়া থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে তেল কেনা দেশগুলোর পণ্যে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ক্ষমতা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দেওয়ার একটি প্রস্তাবিত আইনকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ভারত ও চীনও এর আওতায় পড়তে পারে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক জ্যেষ্ঠ গবেষক মাইকেল কুগেলম্যানের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে মোদি সরকারের বক্তব্যে পরিবর্তন এসেছে। আগে সমঝোতার ওপর জোর দেওয়া হলেও এখন তুলনামূলক কঠোর অবস্থান দেখা যাচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

কুগেলম্যানের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি, পাকিস্তানের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের ঘনিষ্ঠতা এবং ভারতের সমালোচনা নিয়ে দেশটির জনসাধারণের একটি বড় অংশের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে সরকারের পক্ষে নীরব থাকা রাজনৈতিকভাবে কঠিন হয়ে উঠেছে।

এদিকে, ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী শ্রম সনদ কর্মসূচি সীমিত করার উদ্যোগ নিয়েছে ওয়াশিংটন। অতীতে ইনফোসিস ও টাটা কনসালট্যান্সি সার্ভিসেসের মতো প্রতিষ্ঠান এ কর্মসূচি ব্যাপকভাবে ব্যবহার করত।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, গত পাঁচ বছরে এসব প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয় কর্মী পাঠানোর ওপর নির্ভরতা কমিয়েছে। ফলে নতুন উদ্যোগের তাৎক্ষণিক প্রভাব সীমিত থাকতে পারে।

বিজ্ঞাপন

রুপির দরপতন ঠেকাতে পদক্ষেপ

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়লে ভারতীয় মুদ্রা রুপির ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের উচ্চমূল্য এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ভারতীয় সম্পদ বিক্রি করে অর্থ তুলে নেওয়ার কারণে ইতিমধ্যেই রুপি চাপে রয়েছে।

ভারতের অর্থনীতি এখনো ৭ শতাংশের বেশি হারে বাড়ছে এবং দেশটি বড় অর্থনীতিগুলোর মধ্যে দ্রুত প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে। কিন্তু উচ্চ তেলের দাম এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা নিয়ে উদ্বেগের কারণে বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা দ্রুতগতিতে ভারতীয় সম্পদ বিক্রি করছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে বিনিয়োগের আকর্ষণীয় সুযোগের অভাবও ভারতের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কমার একটি কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।

বিজ্ঞাপন

মুম্বাইভিত্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান সিস্টেম্যাটিক্স গ্রুপের প্রধান নির্বাহী ধনঞ্জয় সিনহার মতে, বাণিজ্যিক উত্তেজনা ভারতের সামষ্টিক অর্থনীতির সম্ভাবনা এবং রুপির জন্য বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা প্রবৃদ্ধিতে সহায়তাকারী মূলধন তুলে নেওয়ায় মুদ্রাটিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

সিনহার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দেশের অভ্যন্তরে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল দেখানোর আশঙ্কা থেকে ভারত যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তুলনামূলক কঠোর অবস্থান নিয়ে থাকতে পারে। ওয়াশিংটনের চাপে ভারত নতি স্বীকার করছে—এমন ধারণা এড়াতে সরকার আগ্রহী হতে পারে।

গত সপ্তাহে প্রায় চার বছরের মধ্যে প্রথমবার সুদের হার বাড়ায় ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কিন্তু তাতেও রুপির দুর্বলতা ঠেকানো যায়নি। পরে ডলারের চাহিদা কমাতে সপ্তাহান্তে নতুন কিছু পদক্ষেপ নেয় রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া।

মূল্যস্ফীতিও বাড়াচ্ছে উদ্বেগ

রাজনৈতিক ও বৈদেশিক বাণিজ্যসংক্রান্ত চাপের পাশাপাশি ভারতে মূল্যস্ফীতিও বেড়েছে। সোমবার প্রকাশিত সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে দেশটির মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৫ দশমিক ৫৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে চালু হওয়া নতুন পরিসংখ্যান ধারায় এটিই সর্বোচ্চ হার। একই সময়ে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয়েছে ৭ দশমিক ৭৪ শতাংশ।

পণ্যমূল্য বৃদ্ধি নিয়ে পরিবারগুলোর উদ্বেগও বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার আরও সর্বোচ্চ ৭৫ ভিত্তি পয়েন্ট বাড়াতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সব মিলিয়ে তরুণদের বিক্ষোভ, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন এবং রুপির দুর্বলতা—এই তিন বড় চাপের সঙ্গে মূল্যস্ফীতিও মোদি সরকারের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলেও এসব সংকটের সম্মিলিত প্রভাব সরকারের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

সূত্র: রয়টার্স

জেবি/জেএইচআর

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD