আজ জাতিসংঘ দিবস, বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকারের ৮১ বছর

বিশ্বব্যাপী শান্তি, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং টেকসই উন্নয়নের অঙ্গীকার নিয়ে আজ শনিবার (২৪ অক্টোবর) পালিত হচ্ছে জাতিসংঘ দিবস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতার পর আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও শান্তিপূর্ণ বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে ১৯৪৫ সালের এই দিনে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে জাতিসংঘ। প্রতিষ্ঠার ৮১ বছর পূর্তিতে বিশ্বজুড়ে সংস্থাটির অর্জন, চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যৎ ভূমিকা নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
বিজ্ঞাপন
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দিবসটি উপলক্ষে জাতিসংঘের কার্যক্রম, আন্তর্জাতিক সংহতি, মানবিক সহায়তা এবং বৈশ্বিক সমস্যা সমাধানে সম্মিলিত উদ্যোগের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। যুদ্ধ, জলবায়ু পরিবর্তন, দারিদ্র্য ও বৈষম্যের মতো সংকট মোকাবিলায় বহুপক্ষীয় সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তাও এদিন বিশেষ গুরুত্ব পায়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে জাতিসংঘের জন্ম
জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার ইতিহাসের সঙ্গে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে। দীর্ঘ যুদ্ধের ফলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিপুল প্রাণহানি, অর্থনৈতিক বিপর্যয় এবং মানবিক সংকট দেখা দেয়।
বিজ্ঞাপন
ভবিষ্যতে এ ধরনের বৈশ্বিক সংঘাত প্রতিরোধ এবং রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বিরোধ শান্তিপূর্ণভাবে নিষ্পত্তির জন্য একটি কার্যকর আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা সামনে আসে।
এই লক্ষ্য নিয়ে ১৯৪৫ সালের ২৫ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকোতে আন্তর্জাতিক সম্মেলন শুরু হয়। সম্মেলনে ৫০টি দেশের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। দীর্ঘ আলোচনা ও আলোচনার ভিত্তিতে জাতিসংঘ সনদ প্রস্তুত করা হয়।
একই বছরের ২৬ জুন সনদটি স্বাক্ষরিত হয়। পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনীয় সংখ্যক রাষ্ট্রের অনুমোদনের মাধ্যমে ২৪ অক্টোবর সনদ কার্যকর হয় এবং জাতিসংঘ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
বিজ্ঞাপন
যেভাবে ২৪ অক্টোবর জাতিসংঘ দিবসের স্বীকৃতি পায়
জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠার দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে প্রতিবছর ২৪ অক্টোবর জাতিসংঘ দিবস পালন করা হয়। ১৯৪৫ সালের এই দিনে চীন, ফ্রান্স, সোভিয়েত ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রসহ প্রয়োজনীয় সংখ্যক স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্রের অনুমোদনের পর জাতিসংঘ সনদ কার্যকর হয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ২৪ অক্টোবরকে জাতিসংঘ দিবস হিসেবে পালনের ঘোষণা দেয়। ১৯৭১ সালে সদস্যরাষ্ট্রগুলোকে দিনটি সরকারি ছুটির দিন হিসেবে পালনের সুপারিশও করে সাধারণ পরিষদ।
বিজ্ঞাপন
দিবসটি আন্তর্জাতিক শান্তি, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সহযোগিতার অঙ্গীকার স্মরণ করিয়ে দেয়।
১৯৩ সদস্যরাষ্ট্র নিয়ে বিশ্বব্যাপী কার্যক্রম
প্রতিষ্ঠার সময় জাতিসংঘের সদস্যরাষ্ট্র ছিল ৫১টি। বর্তমানে সংস্থাটির সদস্যসংখ্যা ১৯৩। জাতিসংঘের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখা। একই সঙ্গে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক উন্নয়ন, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং আন্তর্জাতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধানে সহযোগিতা করা।
বিজ্ঞাপন
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাত প্রতিরোধ, শান্তিরক্ষা কার্যক্রম, মানবিক সহায়তা, খাদ্যনিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার উন্নয়নে জাতিসংঘ এবং এর বিভিন্ন সংস্থা কাজ করে যাচ্ছে।
এ ছাড়া শরণার্থী, বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠী এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সহায়তায় সংস্থাটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
মানবাধিকার ও টেকসই উন্নয়নে জাতিসংঘের ভূমিকা
বিজ্ঞাপন
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামো প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্র গ্রহণ করে। এই ঘোষণাপত্র পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও নীতিমালা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে।
দারিদ্র্য দূরীকরণ, ক্ষুধামুক্ত বিশ্ব গঠন, মানসম্মত শিক্ষা, লিঙ্গসমতা এবং পরিবেশ সুরক্ষার লক্ষ্যেও জাতিসংঘ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উদ্যোগ পরিচালনা করছে।
২০১৫ সালে গৃহীত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজির আওতায় ২০৩০ সালের মধ্যে ১৭টি বৈশ্বিক লক্ষ্য অর্জনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়।
বিজ্ঞাপন
এসব লক্ষ্য বাস্তবায়নে উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত এবং নীতিগত সহযোগিতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিশ্বের সংকট মোকাবিলায় ঐক্যের আহ্বান গুতেরেসের
জাতিসংঘ দিবস উপলক্ষে দেওয়া বার্তায় সংস্থাটির মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও সংহতির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন বলে প্রদত্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মানবজাতির ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করছে শান্তি, উন্নয়ন এবং মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় দেশগুলোর সম্মিলিতভাবে কাজ করার সক্ষমতার ওপর।
সংঘাতের পরিবর্তে আলোচনার পথ বেছে নেওয়া, বিভেদের পরিবর্তে সহযোগিতা বাড়ানো এবং পারস্পরিক অবিশ্বাসের পরিবর্তে সংহতি প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
বিশ্বব্যাপী চলমান সংঘাত, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব, ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য এবং প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের ফলে সৃষ্ট নতুন চ্যালেঞ্জের কথাও তাঁর বার্তায় উঠে এসেছে।
বিজ্ঞাপন
এসব সমস্যা মোকাবিলায় জাতিসংঘ সনদ ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা এবং বহুপক্ষীয় সহযোগিতাকে আরও কার্যকর করার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরা হয়েছে।
জলবায়ু সংকট ও বৈশ্বিক বৈষম্য মোকাবিলায় চ্যালেঞ্জ
প্রতিষ্ঠার আট দশকের বেশি সময় পরও জাতিসংঘকে নানা জটিল আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সশস্ত্র সংঘাত, মানবিক বিপর্যয়, খাদ্যসংকট এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তাকে আরও স্পষ্ট করেছে।
বিজ্ঞাপন
একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরা এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ছে।
বিশেষ করে উন্নয়নশীল ও জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো এসব সংকটের কারণে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপের মুখে পড়ছে।
এ পরিস্থিতিতে জলবায়ু অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর সহায়তায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
জাতিসংঘের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘ সম্পর্ক
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ইতিহাসেও জাতিসংঘ গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। স্বাধীনতার পর ১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতিসংঘের ১৩৬তম সদস্যরাষ্ট্র হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নতুন মাত্রা পায়।
পরবর্তী সময়ে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে। বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে বাংলাদেশের সামরিক ও পুলিশ সদস্যরা শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালন করেছেন।
এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন, নারী ও শিশু অধিকার এবং রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকটসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইস্যুতে জাতিসংঘের সঙ্গে বাংলাদেশের সহযোগিতা রয়েছে।
বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় সম্মিলিত উদ্যোগের গুরুত্ব
জাতিসংঘ দিবস শুধু একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী নয়; এটি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, মানবিক মর্যাদা এবং রাষ্ট্রগুলোর যৌথ দায়িত্বের গুরুত্ব স্মরণ করার উপলক্ষ।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থান ভিন্ন হলেও জলবায়ু পরিবর্তন, মহামারি, খাদ্যনিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক সংঘাতের মতো সমস্যা কোনো একটি দেশের পক্ষে এককভাবে সমাধান করা সম্ভব নয়।
এই বাস্তবতায় জাতিসংঘ দেশগুলোর মধ্যে আলোচনা, সহযোগিতা এবং যৌথ সিদ্ধান্ত গ্রহণের একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক মঞ্চ হিসেবে কাজ করছে।
প্রতিষ্ঠার ৮১ বছর পূর্তিতে সংস্থাটির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে পরিবর্তিত বিশ্বপরিস্থিতির সঙ্গে কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করা এবং আন্তর্জাতিক শান্তি, মানবাধিকার ও উন্নয়নের লক্ষ্য বাস্তবায়নে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর সহযোগিতা নিশ্চিত করা।
বিশ্বজুড়ে সংঘাত ও অনিশ্চয়তার মধ্যে এবারের জাতিসংঘ দিবস তাই আন্তর্জাতিক ঐক্য, সংলাপ এবং মানবকল্যাণে সম্মিলিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তাকে নতুন করে সামনে এনেছে।








