তামাকপণ্যের দাম বৃদ্ধি যথেষ্ট নয়, টোব্যাকো নিষিদ্ধের দাবি

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে তামাকপণ্যের মূল্য সমন্বয়কে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য অপ্রতুল ও অকার্যকর বলে মন্তব্য করেছে গবেষণা ও উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান উবিনীগ (উন্নয়ন বিকল্পের নীতি-নির্ধারণী গবেষণা) এবং তামাকবিরোধী সংগঠন তাবিনাজ (তামাক বিরোধী নারী জোট)।
বিজ্ঞাপন
সংগঠন দুটির মতে, বাজেটে সিগারেটের দাম কিছুটা বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হলেও তা বাস্তবে তামাক ব্যবহার কমানোর মতো কার্যকর পদক্ষেপ নয়। পাশাপাশি নিকোটিন পাউচ ও হিটেড টোব্যাকো পণ্যের জন্য মূল্য ও কর নির্ধারণ করায় দেশে নতুন ধরনের নিকোটিননির্ভর বাজার তৈরির ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
এক যৌথ প্রতিক্রিয়ায় সংগঠন দুটি জানিয়েছে, তামাক নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে মূল্য ও কর কাঠামো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু এবারের বাজেট প্রস্তাবে যে হারে মূল্যবৃদ্ধি করা হয়েছে, তা মূল্যস্ফীতির প্রভাব বিবেচনায় খুবই সীমিত। ফলে তামাকপণ্যের ব্যবহার কমানোর ক্ষেত্রে এর প্রভাব তেমন দৃশ্যমান হবে না।
বিজ্ঞাপন
প্রস্তাবিত বাজেট অনুযায়ী, প্রতি ১০ শলাকা নিম্নস্তরের সিগারেটের দাম ৬০ টাকা থেকে ৬২ টাকা, মধ্যম স্তরের সিগারেট ৮০ টাকা থেকে ৯২ টাকা, উচ্চস্তরের সিগারেট ১৪০ টাকা থেকে ১৬০ টাকা এবং প্রিমিয়াম স্তরের সিগারেট ১৮৫ টাকা থেকে ২১০ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। কাগজে-কলমে এ বৃদ্ধি যথাক্রমে ৩ দশমিক ৩ শতাংশ, ১৫ শতাংশ, ১৪ দশমিক ৩ শতাংশ এবং ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ।
তবে সংগঠনগুলোর দাবি, প্রকৃত মূল্যায়নে এই বৃদ্ধি অনেকটাই গুরুত্ব হারায়। কারণ মে ২০২৬ অনুযায়ী দেশের বার্ষিক মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ। সেই হিসেবে মূল্যস্ফীতি সমন্বয়ের পর নিম্নস্তরের সিগারেটের প্রকৃত মূল্য উল্টো কমে যেতে পারে। অন্য স্তরগুলোতেও বাস্তব মূল্যবৃদ্ধির হার খুবই সীমিত থাকবে, যা ধূমপায়ীদের আচরণে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে সক্ষম নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তামাকপণ্যের মূল্য এমনভাবে বাড়ানো প্রয়োজন যাতে ব্যবহারকারীদের জন্য তা কম আকর্ষণীয় ও তুলনামূলক ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে। কিন্তু বর্তমান প্রস্তাবে সেই লক্ষ্য পূরণ হওয়ার সম্ভাবনা কম।
বিজ্ঞাপন
এছাড়া সিগারেটের চার স্তরের বিদ্যমান মূল্য কাঠামো বহাল রাখার বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে উবিনীগ ও তাবিনাজ। তাদের মতে, নিম্নস্তর ও মধ্যম স্তরের সিগারেটের মধ্যে মূল্য ব্যবধান আরও বৃদ্ধি পেলে অনেক ধূমপায়ী ধূমপান ত্যাগ না করে অপেক্ষাকৃত কম দামের ব্র্যান্ডে চলে যেতে উৎসাহিত হবেন। এতে তামাক নিয়ন্ত্রণের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হতে পারে।
সংগঠন দুটি উল্লেখ করেছে, বর্তমানে নিম্ন ও মধ্যম স্তরের সিগারেটের মূল্য ব্যবধান ২০ টাকা হলেও নতুন প্রস্তাব কার্যকর হলে তা ৩০ টাকায় পৌঁছাবে। ফলে সস্তা ব্র্যান্ডে স্থানান্তরের প্রবণতা আরও বাড়তে পারে।
বিজ্ঞাপন
ধোঁয়াবিহীন তামাকপণ্য নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। বাজেটে জর্দা ও গুলের মূল্য অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য ইতিবাচক বার্তা নয় বলে মনে করছে সংগঠনগুলো। তাদের মতে, মূল্যস্ফীতির কারণে এসব পণ্যের প্রকৃত দাম আরও কমে যাবে এবং ব্যবহারকারীদের জন্য এগুলো আরও সহজলভ্য হয়ে উঠবে।
গ্লোবাল অ্যাডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে (গ্যাটস) ২০১৭-এর তথ্য তুলে ধরে তারা জানিয়েছে, দেশে ২০ দশমিক ৬ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ ধোঁয়াবিহীন তামাক ব্যবহার করেন। বিশেষ করে নারীদের মধ্যে এর ব্যবহার তুলনামূলক বেশি। জরিপ অনুযায়ী, নারীদের মধ্যে ব্যবহার হার ২৪ দশমিক ৮ শতাংশ, যেখানে পুরুষদের ক্ষেত্রে তা ১৬ দশমিক ২ শতাংশ। এছাড়া নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীর মধ্যেও এসব পণ্যের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য।
এ প্রেক্ষাপটে জর্দা ও গুলের মূল্য অপরিবর্তিত রাখাকে নারীদের স্বাস্থ্য এবং নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীর সুরক্ষার বিষয়টি উপেক্ষা করার সামিল বলে মনে করছে তামাকবিরোধী সংগঠনগুলো।
বিজ্ঞাপন
অন্যদিকে প্রস্তাবিত বাজেটে নতুন ধরনের নিকোটিন ও তামাকপণ্যের জন্যও মূল্য ও কর কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রতি ১০ গ্রাম নিকোটিন পাউচের মূল্য ৫০০ টাকা এবং সম্পূরক শুল্ক ৪০ শতাংশ প্রস্তাব করা হয়েছে। একইভাবে প্রতি ১০ শলাকা হিটেড টোব্যাকো পণ্যের মূল্য ২১০ টাকা এবং সম্পূরক শুল্ক ৬৭ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
উবিনীগ ও তাবিনাজের মতে, এসব পণ্যের জন্য মূল্য ও কর নির্ধারণ করা মানে কার্যত নতুন একটি বাজার তৈরির সুযোগ সৃষ্টি করা। তারা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছে, নতুন প্রজন্ম বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে এসব পণ্যের ব্যবহার বাড়তে পারে, যা ভবিষ্যতে জনস্বাস্থ্যের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।
বিজ্ঞাপন
এ অবস্থায় সংগঠন দুটি সরকারের কাছে কয়েকটি সুস্পষ্ট দাবি জানিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সিগারেটের নিম্ন ও মধ্যম স্তর একীভূত করা, সব স্তরের সিগারেটের মূল্য উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করা, কার্যকর সুনির্দিষ্ট কর আরোপ, জর্দা ও গুলের দাম কমপক্ষে ২০ শতাংশ বাড়ানো এবং নিকোটিন পাউচ ও হিটেড টোব্যাকো পণ্য সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা।
তাদের মতে, তামাক ব্যবহার কমিয়ে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার লক্ষ্যে রাজস্বনীতিকে আরও শক্তিশালী ও জনস্বাস্থ্যবান্ধব করা প্রয়োজন। অন্যথায় মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে তামাকপণ্য সহজলভ্যই থেকে যাবে এবং তামাক নিয়ন্ত্রণে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে।








