রোহিঙ্গা সংকটে সুইডেনের আরও সহায়তা চাইলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং সংকট মোকাবিলায় সুইডেনের আরও সহযোগিতা চেয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, সম্মানজনক ও টেকসই প্রত্যাবাসনই এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের স্থায়ী সমাধান।
বিজ্ঞাপন
মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) বাংলাদেশ সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কার্যালয়ে বাংলাদেশে নিযুক্ত সুইডেনের রাষ্ট্রদূত নিকোলাস লিনাস রাগনার উইকস সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে গেলে বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকটসহ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রোহিঙ্গা সংকটকে শুধু মানবিক সমস্যা নয়, আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্যও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে তুলে ধরেন। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ এবং বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের জন্য সহায়তা অব্যাহত রাখতে সুইডেনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিককে আশ্রয় দিয়ে আসছে। তাদের জীবনযাত্রার মান বজায় রাখা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা এবং অন্যান্য মৌলিক চাহিদা পূরণে আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রয়োজন।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
রোহিঙ্গা ডোনার গ্রুপের সহ-সভাপতির দায়িত্বে থাকায় এ সংকটকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরতে সুইডেনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, রোহিঙ্গাদের দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে তাদের মিয়ানমারে নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ এবং টেকসই প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরি করতে হবে। প্রত্যাবাসনের পাশাপাশি বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখাও জরুরি বলে তিনি জানান।
বৈঠকে সুইডেনের রাষ্ট্রদূত নিকোলাস লিনাস রাগনার উইকস রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তন ও পুনর্বাসনের ওপর গুরুত্ব দেন। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা নারী ও শিশুদের শিক্ষা এবং সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সুইডেনের আগ্রহের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
বিজ্ঞাপন
রাষ্ট্রদূতের বক্তব্যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিশেষ করে নারী ও শিশুদের জন্য শিক্ষা ও নিরাপত্তামূলক কার্যক্রম জোরদারের বিষয়টি গুরুত্ব পায়। দুই পক্ষের আলোচনায় রোহিঙ্গা সংকটের একটি দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সমাধানের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও উঠে আসে।
সাক্ষাতে রোহিঙ্গা সংকটের পাশাপাশি নিরাপত্তা, অনিয়মিত অভিবাসন প্রতিরোধ, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার, কারিগরি শিক্ষা, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা এবং দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়।
সুইডেনকে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বৈশ্বিক শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে সরকার কারিগরি শিক্ষার আধুনিকায়নে গুরুত্ব দিচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
তিনি জানান, দেশের বিভিন্ন এলাকায় নতুন কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার জন্য পরিকল্পনা ও প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। দক্ষ জনশক্তি তৈরির মাধ্যমে দেশের তরুণদের আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তোলার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সুইডেনসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কেয়ারগিভারসহ দক্ষ জনশক্তির চাহিদা বাড়ছে। এই সুযোগ কাজে লাগাতে বাংলাদেশে কারিগরি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মান উন্নয়ন প্রয়োজন।
দক্ষ জনশক্তি তৈরির পাশাপাশি তাদের বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে সুইডেন সরকারের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি। কারিগরি প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার সুযোগ রয়েছে বলেও বৈঠকে আলোচনা হয়।
বিজ্ঞাপন
সুইডেনের রাষ্ট্রদূত জানান, দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশই একমাত্র দেশ, যার সঙ্গে সুইডেনের একটি দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা কৌশল রয়েছে। দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কও ধীরে ধীরে বিস্তৃত হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তৈরি পোশাক ও স্বাস্থ্যসেবাসহ সম্ভাবনাময় বিভিন্ন খাতে সুইডিশ বিনিয়োগ বাড়ছে বলেও জানান রাষ্ট্রদূত। এর মাধ্যমে দুই দেশের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
রাষ্ট্রদূত আরও জানান, বর্তমানে প্রায় ১০ হাজার বাংলাদেশি সুইডেনে বসবাস করছেন। তাদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ শিক্ষার্থী।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
সুইডেনে অনিয়মিত অভিবাসনের বিষয়েও বৈঠকে উদ্বেগ প্রকাশ করেন রাষ্ট্রদূত। তিনি বলেন, অসাধু মানবপাচারকারী চক্রের প্রলোভনে পড়ে কিছু মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ ও অনিয়মিত অভিবাসনের পথে যাচ্ছেন।
এর জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, মানবপাচার প্রতিরোধে সরকার কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। উন্নত জীবনযাপনের আকাঙ্ক্ষা এবং পাচারকারী চক্রের নানা ধরনের প্রলোভন অনিয়মিত অভিবাসনের অন্যতম প্রধান কারণ বলে উল্লেখ করেন তিনি।
মানবপাচারের ঝুঁকি সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করতে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে বলেও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
বিজ্ঞাপন
অনিয়মিত অভিবাসন ও মানবপাচার প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা—আইওএমের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার কথা জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, দেশজুড়ে সচেতনতামূলক প্রচারণার পাশাপাশি মানবপাচার প্রতিরোধে বহুমুখী উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। মানুষের মধ্যে বৈধ অভিবাসনের বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি পাচারকারীদের প্রতারণা থেকে সতর্ক রাখাও এসব কার্যক্রমের অন্যতম লক্ষ্য।
বৈঠকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এবং বাংলাদেশে সুইডিশ দূতাবাসের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
সাক্ষাতে রোহিঙ্গা সংকটের মানবিক ও নিরাপত্তাগত দিক, প্রত্যাবাসনের প্রয়োজনীয়তা, দক্ষ জনশক্তি উন্নয়ন এবং দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতা—সবগুলো বিষয়ই গুরুত্ব পেয়েছে। বাংলাদেশের প্রত্যাশা, আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সহযোগিতায় রোহিঙ্গা সংকটের একটি টেকসই সমাধানের পথ আরও সুগম হবে।








