Logo

কামরুল ইসলাম সিদ্দিকের হাত ধরে বদলে যায় গ্রামীণ বাংলাদেশ

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১৭:৫০
কামরুল ইসলাম সিদ্দিকের হাত ধরে বদলে যায় গ্রামীণ বাংলাদেশ
ছবি: সংগৃহীত

একসময় বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ গ্রামাঞ্চলে যোগাযোগব্যবস্থার দুরবস্থা ছিল উন্নয়নের বড় বাধা। কাঁচা সড়ক, বিচ্ছিন্ন জনপদ আর নদী-খালের কারণে পিছিয়ে থাকা গ্রামকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করার স্বপ্ন দেখেছিলেন প্রকৌশলী কামরুল ইসলাম সিদ্দিক। তার পরিকল্পনায় সড়ক ও সেতু কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং গ্রামীণ অর্থনীতি ও মানুষের জীবনমান পরিবর্তনের হাতিয়ার হয়ে উঠেছিল।

বিজ্ঞাপন

১৯৪৫ সালের ২০ জানুয়ারি কুষ্টিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন কামরুল ইসলাম সিদ্দিক। কৃষিচিন্তক প্রয়াত নূরুল ইসলাম সিদ্দিক ও বেগম হামিদা সিদ্দিকের সন্তান তিনি। লালন শাহ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও মীর মশাররফ হোসেনের স্মৃতিবিজড়িত কুষ্টিয়াতেই তার শৈশব ও শিক্ষাজীবনের সূচনা।

১৯৬৬ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিগ্রি অর্জনের পর ১৯৬৭ সালে কুষ্টিয়া জেলা পরিষদের সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন তিনি।

মুক্তিযুদ্ধেও রেখেছিলেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা

বিজ্ঞাপন

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে দেশের স্বাধীনতার সংগ্রামে যোগ দেন কামরুল ইসলাম সিদ্দিক। ৩০ এপ্রিল ভারতে গিয়ে বেতাই ইয়ুথ ক্যাম্পে আশ্রয় নেন তিনি। বৃহত্তর কুষ্টিয়া ও পাবনা অঞ্চল নিয়ে গঠিত জোনাল কাউন্সিলের সঙ্গে যুক্ত থেকে মুক্তিকামী যুবকদের সংগঠিত ও প্রশিক্ষণ দেওয়ার কাজে ভূমিকা রাখেন।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তার সামনে আসে আরেক যুদ্ধ—ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে দেশ পুনর্গঠনের কাজ। সেই লক্ষ্যেই তিনি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন।

পরিকল্পনা ও নগর ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা অর্জনের জন্য ১৯৭৭ সালে যুক্তরাজ্যের শেফিল্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আরবান অ্যান্ড রিজিওনাল প্ল্যানিংয়ে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন।

বিজ্ঞাপন

গ্রাম উন্নয়নে ছিল ভিন্ন চিন্তা

কর্মজীবনে ওয়ার্কস প্রোগ্রামের উপ-প্রধান প্রকৌশলী, এলজিইবির প্রকৌশল উপদেষ্টা এবং পরবর্তী সময়ে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রতিষ্ঠাতা প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন কামরুল ইসলাম সিদ্দিক। তার নেতৃত্বে প্রাথমিক পর্যায়ের একটি প্রকৌশল কাঠামো ধীরে ধীরে বৃহৎ ও কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।

গ্রামীণ উন্নয়ন নিয়ে তার চিন্তাধারা ছিল সমন্বিত। তিনি মনে করতেন, একটি রাস্তা নির্মাণের সুফল শুধু মানুষের যাতায়াতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে কৃষিপণ্য পরিবহন, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা এবং স্থানীয় অর্থনীতির বিকাশও জড়িত।

বিজ্ঞাপন

এই ধারণা থেকেই গ্রামীণ হাট-বাজারকে ‘গ্রোথ সেন্টার’ হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন তিনি। এর ফলে স্থানীয় বাজারগুলোকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করার সুযোগ তৈরি হয়।

শুষ্ক মৌসুমে কৃষিকাজে পানির জোগান নিশ্চিত করতে পানি সংরক্ষণের জন্য দেশে রাবার ড্যাম প্রযুক্তির ব্যবহার ও প্রসারেও তার ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।

উন্নয়ন পরিকল্পনায় প্রযুক্তির সংযোজন

বিজ্ঞাপন

তথ্যনির্ভর উন্নয়ন পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তাও গুরুত্বের সঙ্গে দেখেছিলেন কামরুল ইসলাম সিদ্দিক। জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে বেসম্যাপ তৈরিতে জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সিস্টেম (জিআইএস) প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ নেন তিনি। সে সময় দেশের উন্নয়ন ব্যবস্থাপনায় এটি ছিল আধুনিক ও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

তার নেতৃত্বে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নির্মিত হয় অসংখ্য গ্রামীণ সড়ক, সেতু ও কালভার্ট। পাশাপাশি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বহুমুখী ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র এবং বাজারভিত্তিক বিভিন্ন অবকাঠামোও গড়ে ওঠে।

এসব অবকাঠামোর মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলের যোগাযোগ সহজ হওয়ার পাশাপাশি কৃষিপণ্য দ্রুত বাজারে নেওয়া এবং স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হয়।

বিজ্ঞাপন

আন্তর্জাতিক পর্যায়েও ছড়ায় বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা

দক্ষতা ও নেতৃত্বের স্বীকৃতি হিসেবে কামরুল ইসলাম সিদ্দিক পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং ঢাকা ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন বোর্ডের নির্বাহী পরিচালক ছিলেন।

তার নেতৃত্ব ও তত্ত্বাবধানে বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), জাইকা, কেএফডব্লিউ, ইউএসএআইডি ও ওপেক ফান্ডসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীর অর্থায়নে বহু প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশের গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের অভিজ্ঞতা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরতেও সক্রিয় ছিলেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, জাপান, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকাসহ বিভিন্ন দেশে শতাধিক সভা, সেমিনার ও সম্মেলনে অংশ নেন।

কাজের স্বীকৃতিতে পেয়েছেন বহু পুরস্কার

কর্মজীবনে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ভাসানী স্বর্ণপদক, কবি জসীম উদ্দীন স্বর্ণপদক, আইইবি স্বর্ণপদক, শেরেবাংলা স্বর্ণপদক, বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী স্বর্ণপদক এবং জাইকা মেরিট অ্যাওয়ার্ডসহ বিভিন্ন সম্মাননা অর্জন করেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

১৯৯৭ সালে বিশ্বব্যাংকের উদ্যোগে ইন্টারন্যাশনাল রোড ফেডারেশন তাকে ‘পার্সন অব দ্য ইয়ার’ সম্মানে ভূষিত করে।

পেশাগত দায়িত্বের বাইরেও সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন কামরুল ইসলাম সিদ্দিক। ইনস্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইইবি)-এর নির্বাচিত সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি আহ্ছানিয়া মিশন ক্যানসার হাসপাতাল নির্মাণ কমিটির সভাপতি এবং ঢাকাস্থ কুষ্টিয়া জেলা সমিতির সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন।

মৃত্যুর পরও ছড়িয়ে আছে তার কর্মের প্রভাব

বিজ্ঞাপন

২০০৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন কামরুল ইসলাম সিদ্দিক। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর।

জীবনের শেষ পর্যায়েও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড থেকে দূরে সরে যাননি তিনি। বাংলাদেশ ওয়াটার পার্টনারশিপের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি এলজিইডির উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।

একজন প্রকৌশলী হিসেবে তার বড় সাফল্য ছিল উন্নয়নকে শহরকেন্দ্রিক না রেখে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়া। সড়ক, সেতু, বাজার, পানি ব্যবস্থাপনা এবং প্রযুক্তিনির্ভর পরিকল্পনাকে একই উন্নয়ন কাঠামোর আওতায় এনে তিনি গ্রামীণ বাংলাদেশের পরিবর্তনের একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করেছিলেন।

বিজ্ঞাপন

তার জীবন ও কর্মের দিকে তাকালে রবীন্দ্রনাথের সেই কথাটিই মনে পড়ে—“মানুষ নির্মাণ করে প্রয়োজনে, সৃষ্টি করে আনন্দে... নিজের পরিচয় দেয় সৃষ্টিতে।” কামরুল ইসলাম সিদ্দিকও তার কর্ম ও সৃষ্টির মধ্য দিয়ে নিজের পরিচয় রেখে গেছেন। তিনি নেই, কিন্তু বাংলাদেশের অসংখ্য গ্রাম ও জনপদের অবকাঠামোর মধ্য দিয়ে তার কাজ আজও দৃশ্যমান।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD