এআই দিয়ে আ.লীগের পক্ষে ভুয়া সংবাদ তৈরি, ২৯ অ্যাকাউন্ট বন্ধ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে বাংলায় বিপুল পরিমাণ ভুয়া সংবাদ ও বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট তৈরির অভিযোগে বাংলাদেশ থেকে পরিচালিত একটি স্বয়ংক্রিয় প্রচারণা নেটওয়ার্ক শনাক্ত করেছে এআই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিক। প্রতিষ্ঠানটির তৈরি চ্যাটবট ক্লড ব্যবহার করে প্রায় ১৬ মাস ধরে এসব কনটেন্ট তৈরি করা হয়েছে বলে জানিয়েছে তারা।
বিজ্ঞাপন
অ্যানথ্রপিকের ‘ডিটেক্টিং অ্যান্ড কাউন্টারিং মিসইউজ অব এআই: সেপ্টেম্বর ২০২৬’ শীর্ষক প্রতিবেদনে গত বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) এসব তথ্য প্রকাশ করা হয়। সেখানে কার্যক্রমটিকে ‘জিটিজি-৫৪০০৬’ নামে শনাক্ত করা হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির মূল্যায়ন অনুযায়ী, নেটওয়ার্কটির প্রচারণার বড় অংশ ছিল আওয়ামী লীগের পক্ষে এবং দলটির রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের বিরুদ্ধে। তবে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতার বাইরে থাকায় এটিকে সরকারি উদ্যোগ নয়, বরং বিরোধী রাজনৈতিক অবস্থান থেকে পরিচালিত প্রচারণা হিসেবে বিবেচনা করছে অ্যানথ্রপিক।
২৯টি অ্যাকাউন্টে ১৬ মাসের কার্যক্রম
বিজ্ঞাপন
অ্যানথ্রপিকের তদন্তে উঠে এসেছে, গাইবান্ধা জেলার একজন ব্যক্তি একাই এই নেটওয়ার্ক পরিচালনা করতেন। নজরদারি ও প্ল্যাটফর্মের ব্যবহারে থাকা সীমাবদ্ধতা এড়াতে তিনি পালাক্রমে ২৯টি ক্লড অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করতেন।

কার্যক্রম পরিচালনায় ‘ফেক_নিউজ_৩.পিওয়াই’ নামের একটি কাস্টম সফটওয়্যার ব্যবহার করা হয়। এটি সরাসরি ক্লডের সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। প্রতিটি ব্যাচে সফটওয়্যারটির মাধ্যমে ১৫টি শিরোনাম, তিনটি বিস্তারিত বানোয়াট প্রতিবেদন এবং ১৫টি ছবি তৈরির নির্দেশনা বা প্রম্পট তৈরি করা হতো।
অ্যানথ্রপিক জানিয়েছে, সফটওয়্যারটির অন্তত তৃতীয় সংস্করণ ব্যবহারের প্রমাণ তারা পেয়েছে।
বিজ্ঞাপন
প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে, পুরো কার্যক্রমে অন্তত ১ হাজার ৫০০টি শিরোনাম, ৩০০টি বানোয়াট প্রতিবেদন এবং ১ হাজার ৫০০টি ছবি তৈরির নির্দেশনা তৈরি করা হয়েছিল।
গ্রামীণ জনগোষ্ঠী ছিল প্রধান লক্ষ্য
অ্যানথ্রপিকের তথ্য অনুযায়ী, এসব কনটেন্ট ফেসবুক লাইভ, ইউটিউব ও টিকটকে ধারাবাহিকভাবে প্রচারের জন্য প্রস্তুত করা হতো। বিশেষভাবে সীমিত শিক্ষার সুযোগ পাওয়া গ্রামীণ আওয়ামী লীগ সমর্থকদের লক্ষ্য করে এগুলো তৈরি করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
ক্লডে সরাসরি ছবি তৈরির সুবিধা না থাকায় ছবি তৈরির জন্য প্রস্তুত করা নির্দেশনাগুলো অন্য কোনো এআই মডেলে ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করছে প্রতিষ্ঠানটি।
তৈরি হওয়া কনটেন্ট প্রথমে নির্দিষ্ট একটি ক্লাউড স্টোরেজ ফোল্ডারে সংরক্ষণ করা হতো। পরে সেগুলো অডিও-ভিডিওতে রূপান্তর করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের জন্য প্রস্তুত করা হতো।
অভ্যন্তরীণ যোগাযোগে যুক্ত ব্যক্তিরা নিজেরাই জেনেশুনে ভুয়া তথ্য ছড়ানোর বিষয়টি স্বীকার করেছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কনটেন্টগুলোকে আক্রমণাত্মক ও সহজবোধ্যভাবে উপস্থাপন করা হতো, যাতে সীমিত শিক্ষার মানুষও সহজে বুঝতে পারেন এবং সেগুলোকে সত্য বলে বিশ্বাস করেন।
বিজ্ঞাপন
যেসব বয়ান ছড়ানো হয়েছে
অ্যানথ্রপিকের বিশ্লেষণে নেটওয়ার্কটির কনটেন্টে চারটি প্রধান বয়ান বারবার উঠে এসেছে।
প্রথমত, বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টিকে (এনসিপি) তালেবানধাঁচের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং নিরাপত্তা বাহিনীতে অনুপ্রবেশের পরিকল্পনাকারী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
দ্বিতীয়ত, তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার ও ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের বিরুদ্ধে কথিত হত্যা পরিকল্পনা এবং ঘাতক দলের নানা বানোয়াট গল্প প্রচার করা হয়েছে।

তৃতীয়ত, জুলাই আন্দোলনের ছাত্রনেতাদের বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার এজেন্ট হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে।
চতুর্থত, বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর বিরুদ্ধে আর্থিক দুর্নীতি ও গোপন জোটের মতো বিভিন্ন মিথ্যা অভিযোগ ছড়ানো হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এসব প্রচারণার কিছু বয়ান ভারতের পক্ষে থাকা ভূরাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। তবে এর পেছনে কোনো রাষ্ট্রীয় নির্দেশনা বা অর্থায়নের প্রমাণ পায়নি অ্যানথ্রপিক।
স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইউটিউবে ভিডিও প্রকাশ
নেটওয়ার্কটির একটি পৃথক স্ক্রিপ্ট ইউটিউবের এপিআই ব্যবহার করে বিপুলসংখ্যক ভিডিও একসঙ্গে আপলোড করতে পারত। তৃতীয় পক্ষের একটি কনটিনিউয়াস ইন্টিগ্রেশন সেবার মাধ্যমে এসব ভিডিও আগে থেকেই নির্ধারিত সময় অনুযায়ী প্রকাশ করা হতো।
বিজ্ঞাপন
অ্যানথ্রপিকের মতে, ওই তৃতীয় পক্ষের সেবা ব্যবহার করায় মূল পরিচালকের ইন্টারনেট প্রটোকল বা আইপি ঠিকানাও আড়ালে রাখা সম্ভব হয়েছিল।
‘ব্রেকআউট স্কেল’ অনুযায়ী, অ্যানথ্রপিক এই কার্যক্রমকে তৃতীয় শ্রেণিতে রেখেছে। কারণ ফেসবুক, ইউটিউব ও টিকটক—তিনটি প্ল্যাটফর্মেই বাংলাদেশকেন্দ্রিক একাধিক চ্যানেল ও প্রোফাইলে নেটওয়ার্কটির তৈরি কনটেন্টের সঙ্গে মিল পাওয়া ভিডিও শনাক্ত হয়েছে।
তবে ঠিক কোন কোন চ্যানেলে পুরো কনটেন্ট প্রকাশিত হয়েছিল, তা নির্দিষ্টভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। এসব অ্যাকাউন্টের বাইরে আরও বিস্তৃত পরিসরে কনটেন্ট ছড়িয়ে পড়ার প্রমাণও পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
বিজ্ঞাপন
সব অ্যাকাউন্ট বন্ধ করেছে অ্যানথ্রপিক
নিজস্ব তদন্তের মাধ্যমে নেটওয়ার্কটি শনাক্ত করার পর এর সঙ্গে যুক্ত সব ক্লড অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দিয়েছে অ্যানথ্রপিক। একই ধরনের নতুন অ্যাকাউন্ট তৈরির চেষ্টা ঠেকাতে নেটওয়ার্কটির আচরণগত বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে নতুন শনাক্তকরণ ব্যবস্থাও তৈরি করা হয়েছে।
এ ছাড়া তদন্তে পাওয়া তথ্য সংশ্লিষ্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ও অন্যান্য অংশীদার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া হয়েছে। তবে ক্লাউড স্টোরেজ ফোল্ডারের পরিচয় ও আপলোড স্ক্রিপ্টের মতো কিছু কারিগরি তথ্য নিরাপত্তাজনিত কারণে প্রকাশ্যে না এনে অংশীদারদের সঙ্গে শেয়ার করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে অ্যানথ্রপিক মোট নয়টি এআই অপব্যবহারের ঘটনা তুলে ধরেছে। রাশিয়া, ইরান, তুরস্ক, উপসাগরীয় অঞ্চল, দক্ষিণ এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপ থেকে পরিচালিত বিভিন্ন প্রভাব বিস্তারকারী নেটওয়ার্কের কথাও সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সরকার, রাষ্ট্র-সংশ্লিষ্ট প্রচারণা প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি সংস্থা ও রাজনৈতিক দলের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে।
অ্যানথ্রপিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তালিকাভুক্ত ঘটনাগুলোর মধ্যে বাংলাদেশই একমাত্র উদাহরণ, যেখানে কোনো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নয়, বরং একজন ব্যক্তি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এআই ব্যবহার করে বড় পরিসরে ভুয়া কনটেন্ট তৈরির কার্যক্রম চালিয়েছেন।
প্রতিষ্ঠানটি আরও জানিয়েছে, ক্লডের অপব্যবহার শনাক্ত ও প্রকাশ করা তাদের দায়িত্বের অংশ। গত আট মাসে সাইবার হামলা, ভুয়া তথ্য ও অপপ্রচার, নজরদারি, মডেল চুরি এবং জৈবিক অপব্যবহারের মতো বিভিন্ন ঘটনায় ব্যবস্থা নিয়ে সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্ট নিষিদ্ধ করেছে তারা।
অ্যানথ্রপিকের মতে, এআই এখন কম দক্ষ ব্যক্তি বা ছোট গোষ্ঠীকেও বড় পরিসরে সাইবার হামলা ও অপপ্রচার পরিচালনার সক্ষমতা দিচ্ছে। এ ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকার, গবেষক এবং অন্যান্য এআই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তথ্য বিনিময় ও সমন্বিত নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও জোরদার করা প্রয়োজন।








