গৃহকর্মী-নিরাপত্তাকর্মীদের কম ভাড়ায় ফ্ল্যাট দেবে সরকার

গৃহকর্মী, গাড়িচালক, নিরাপত্তাকর্মী, পরিচ্ছন্নতাকর্মীসহ নিম্নআয়ের মানুষের জন্য রাজধানীর উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টরে সাশ্রয়ী ভাড়ায় আবাসনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রস্তাবিত প্রকল্পে মাসিক ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা আয় করা পরিবারের জন্য ফ্ল্যাট বরাদ্দের পরিকল্পনা রয়েছে। মাসিক ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে সাড়ে ৭ হাজার টাকা।
বিজ্ঞাপন
‘উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টরে সোশ্যাল হাউজিং নির্মাণ’ শীর্ষক প্রকল্পটি বাস্তবায়নের প্রস্তাব দিয়েছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। ২০২৬ থেকে ২০৩১ সাল পর্যন্ত প্রকল্পটির মেয়াদ ধরা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে ৮২৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা।
রাজউকের প্রস্তাব অনুযায়ী, ছয়তলা ছয়টি আবাসিক ভবনে ৬০০ বর্গফুটের ৩০৮টি এবং ৪০০ বর্গফুটের ২৮৪টি—মোট ৫৯২টি ফ্ল্যাট নির্মাণ করা হবে। পাশাপাশি ছয়তলা একটি মসজিদ ভবন, অভ্যন্তরীণ সড়ক ও ফুটপাত, একটি পার্ক এবং তিনটি খেলার মাঠ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রতিটি আবাসিক ভবনে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং ব্যবস্থা থাকবে। প্রকল্পের আওতায় বেজমেন্টসহ ১২ তলা একটি বাণিজ্যিক ভবনও নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর আয়তন প্রায় ৩ লাখ ৭০ হাজার ১৬০ বর্গফুট। বাণিজ্যিক ভবন থেকে পাওয়া আয় আবাসিক এলাকার বাসিন্দাদের বিভিন্ন চাহিদা পূরণে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
তবে এসব ফ্ল্যাটে বসবাসের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত রাখা হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, উপকারভোগীদের উত্তরা এলাকায় গৃহকর্মী, চালক, নিরাপত্তাকর্মী বা পরিচ্ছন্নতাকর্মীর মতো সেবা দিতে হবে।
বিজ্ঞাপন
ফ্ল্যাটগুলো একটি নীতিমালার আওতায় কোম্পানি নিয়োগের মাধ্যমে ভাড়াভিত্তিক বরাদ্দ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। সংগৃহীত ভাড়ার ৪০ শতাংশ তৃতীয় পক্ষ ব্যবস্থাপনা ফি হিসেবে পাবে এবং বাকি ৬০ শতাংশ রাজউকের রিজার্ভ হিসেবে থাকবে। এই অর্থ ভবনের মেরামত ও তদারকির কাজে ব্যবহারের কথা রয়েছে।
রাজউকের নির্বাহী প্রকৌশলী (বাস্তবায়ন-৬) শেখ মো. গোলাম রাব্বী বলেন, ‘উত্তরায় ১৮ নম্বর সেক্টরে সোশ্যাল হাউজিং নির্মাণ’ শীর্ষক প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। তবে এখনো ডিপিপি অনুমোদন হয়নি।
ফ্ল্যাট কারা পাবেন—এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সংশ্লিষ্টদের উত্তরা এলাকার সার্ভিস প্রোভাইডার হতে হবে। সাড়ে সাত হাজার টাকায় ফ্ল্যাটে বসবাস করতে পারবেন। তবে এখনো প্রকল্পের সার্বিক বিষয় চূড়ান্ত হয়নি। কিছু বিষয় এখনো সংশোধন হবে।’
বিজ্ঞাপন
প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন পরিকল্পনা কমিশনের
রাজউকের প্রস্তাবিত প্রকল্পটি নিয়ে গত ৭ জুন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভা হয়। সভায় প্রকল্পটির বিভিন্ন দিক নিয়ে প্রশ্ন ও সুপারিশ তুলে ধরা হয়।
পরিকল্পনা কমিশনের মতে, গৃহকর্মী, নিরাপত্তাকর্মীসহ লক্ষ্যভুক্ত জনগোষ্ঠীর প্রকৃত মাসিক আয় কত, তা সমীক্ষার মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা আয়সীমার বাইরে থাকা নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীর আবাসনের জন্য কী ব্যবস্থা থাকবে, সেটিও স্পষ্ট করা দরকার।
বিজ্ঞাপন
৫৯২টি ফ্ল্যাট লক্ষ্যভুক্ত জনগোষ্ঠীর জন্য যথেষ্ট কি না এবং ৪০০ ও ৬০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট বড় পরিবারের জন্য কতটা উপযোগী হবে—এ বিষয়েও সমীক্ষা প্রয়োজন বলে মত দিয়েছে কমিশন।
উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টরের জমির বাজারমূল্য বিবেচনা করে প্রকৃত ভর্তুকির পরিমাণ নির্ধারণ এবং আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবনের উপযুক্ত সমন্বয়ের মাধ্যমে জমির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
গাড়িচালক, গৃহকর্মী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও নিরাপত্তাকর্মীদের একই এলাকায় আবাসন দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়েও বিকল্প বিবেচনার পরামর্শ দিয়েছে কমিশন। উত্তরা সংলগ্ন অপেক্ষাকৃত কম দামের জমিতে আবাসন তৈরি করে পরিবহন সুবিধা দেওয়ার সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখতে বলা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় কর্মীদের কর্মস্থলের কাছাকাছি আবাসন দিলে উৎপাদনশীলতা শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ বাড়তে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ৮২৭ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত প্রকল্পে এই উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির প্রভাব কতটা হবে এবং তা কীভাবে পরিমাপ করা হয়েছে, তা স্পষ্ট নয় বলে জানিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সদস্য (সিনিয়র সচিব) নেয়ামত উল্যা ভূইঁয়া বলেন, ‘প্রকল্পটির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য মহৎ এবং সরকারের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। তবে, প্রকল্পে পরিপত্রের নির্দেশনা অনুযায়ী ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা) তৈরি হয়নি। ডিপিপিতে তথ্যের অপ্রতুলতা, অসামঞ্জস্য ও উপস্থাপনাগত ত্রুটি-বিচ্যুতি রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ভাড়াভিত্তিক ফ্ল্যাট বরাদ্দ নীতিমালা যেটি করা হয়েছে তা-ও আংশিক বা অসম্পূর্ণ। প্রকল্পটির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য মহৎ হলেও তথ্য-উপাত্ত আরও বিস্তৃত ও সঠিকভাবে সমৃদ্ধ করে যৌক্তিকভাবে উপস্থাপন করা প্রয়োজন।’
রাজউকের এক ঊর্ধ্বতন প্রকৌশলী জানান, ছয়তলার বেশি উচ্চতার ভবন নির্মাণ করলে নির্মাণব্যয়, লিফট, অগ্নিনিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বাড়বে। এসব বিষয় বিবেচনায় ভবনের উচ্চতা ছয়তলায় সীমিত রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
তবে ভৌত অবকাঠামো বিভাগ মনে করে, উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টরের মতো মূল্যবান এলাকায় জমির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে শুধু নির্মাণব্যয় কম রাখার বিষয়টি বিবেচনা করলে হবে না। জমির গুরুত্ব ও বাজারমূল্য বিবেচনায় নিয়ে প্রকল্পের নকশা ও ভবনের উচ্চতা পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।








