Logo

মিষ্টিসহ বিতর্কে জড়িয়ে যেসব এমপিকে হারাতে হয়েছিল সংসদীয় পদ

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
৩ অক্টোবর, ২০২৬, ২১:৩২
মিষ্টিসহ বিতর্কে জড়িয়ে যেসব এমপিকে হারাতে হয়েছিল সংসদীয় পদ
ছবি: সংগৃহীত

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের যাত্রা শুরুর পর এখন পর্যন্ত দুই সংসদ সদস্যকে ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তারা হলেন জামায়াতে ইসলামীর মনোনয়নে নির্বাচিত গাজী নজরুল ইসলাম এবং বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি।

বিজ্ঞাপন

গাজী নজরুল ইসলাম বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। নৈতিক স্খলনের অভিযোগে দল থেকে বহিষ্কৃত হলেও এখনো তার সংসদ সদস্য পদ বহাল রয়েছে। অন্যদিকে ঢাকার মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় নাম আসার পর পদত্যাগ করতে হয়েছে ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে।

তবে বিতর্ক, দলীয় বহিষ্কার বা আইনি জটিলতার কারণে সংসদ সদস্য পদ হারানোর ঘটনা বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন নয়। অতীতে বিভিন্ন কারণে অন্তত পাঁচজন সংসদ সদস্যের আসন শূন্য হয়েছে। আবার কয়েকজন দল থেকে বহিষ্কৃত হলেও তাদের সংসদ সদস্য পদ বহাল ছিল। দলবদল ও দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থানের ক্ষেত্রে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ প্রয়োগ করে কয়েকজনের আসন শূন্য হওয়ার নজিরও রয়েছে।

লতিফ সিদ্দিকী

বিজ্ঞাপন

২০১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে বিতর্কিত মন্তব্যের জেরে তৎকালীন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী এবং টাঙ্গাইল-৪ আসনের সংসদ সদস্য আবদুল লতিফ সিদ্দিকী রাজনৈতিক চাপে পড়েন। ওই বছরের ১২ অক্টোবর তাকে মন্ত্রিসভা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় এবং আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর পদ থেকেও অব্যাহতি দেওয়া হয়।

২৪ অক্টোবর আওয়ামী লীগের প্রাথমিক সদস্যপদ বাতিল করে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। দেশে ফেরার পর ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে প্রায় নয় মাস কারাগারে ছিলেন তিনি।

তার সংসদ সদস্য পদ নিয়ে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে আওয়ামী লীগের চিঠি চালাচালি হয়। কমিশনের শুনানির উদ্যোগ আদালতে চ্যালেঞ্জ করেও সফল হননি লতিফ সিদ্দিকী। পরে কমিশনের শুনানিতে তিনি জানান, স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করবেন। ২০১৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর সংসদে দেওয়া বক্তব্যে পদত্যাগের ঘোষণা দেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

মুরাদ হাসান

২০২১ সালের ডিসেম্বরের শুরুতে অশ্লীল মন্তব্য ও একটি ফোনালাপ ছড়িয়ে পড়ার পর তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন তৎকালীন তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মুরাদ হাসান। ওই ফোনালাপে এক চিত্রনায়িকার সঙ্গে আপত্তিকর ভাষায় কথা বলার অভিযোগ ওঠে। একই সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের নিয়েও তার কিছু বক্তব্য নিয়ে সমালোচনা হয়।

পরিস্থিতির মধ্যে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ৮ ডিসেম্বর মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন তিনি। পরে জামালপুর জেলা আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যাবিষয়ক সম্পাদকের পদ থেকেও তাকে বহিষ্কার করা হয়।

বিজ্ঞাপন

তখন তার সংসদ সদস্য পদ বাতিলের দাবি উঠলেও তিনি পদত্যাগ করেননি। এ নিয়ে উচ্চ আদালতে রিট হলেও শেষ পর্যন্ত সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত মুরাদ হাসান সংসদ সদস্য পদে বহাল ছিলেন।

গোলাম মাওলা রনি

আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য গোলাম মাওলা রনি ২০১৩ সালে বেসরকারি একটি টেলিভিশন চ্যানেলের দুই সাংবাদিককে মারধরের ঘটনায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যান। পরবর্তী নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাননি।

বিজ্ঞাপন

২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে বিএনপিতে যোগ দেন রনি। পরে পটুয়াখালী-৩ আসনে বিএনপির মনোনয়নও পেয়েছিলেন তিনি।

মোহাম্মদ শহিদ ইসলাম পাপুল

২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে লক্ষ্মীপুর-২ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন মোহাম্মদ শহিদ ইসলাম পাপুল। তার বিরুদ্ধে মানবপাচার ও ভিসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে বিপুল অর্থ উপার্জনের অভিযোগ ছিল।

বিজ্ঞাপন

২০২০ সালের জুনে কুয়েতে গ্রেপ্তার হন তিনি। পরে ঘুষ লেনদেনের মামলায় ২০২১ সালের ২৮ জানুয়ারি কুয়েতের আদালত তাকে চার বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ১৯ লাখ কুয়েতি দিনার জরিমানা করেন।

বিদেশের মাটিতে ফৌজদারি অপরাধে কোনো বাংলাদেশি সংসদ সদস্যের দণ্ডিত হওয়ার ঘটনা হিসেবে এটি বিশেষভাবে আলোচিত হয়। এরপর ২০২১ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি তার সংসদীয় আসন শূন্য ঘোষণা করা হয়। ফলে সংসদ সদস্য পদ হারান পাপুল।

আবুল কাশেম

বিজ্ঞাপন

২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে টাঙ্গাইল-৫ আসন থেকে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন আবুল কাশেম। তার বিরুদ্ধে ঋণখেলাপি ও বিলখেলাপির অভিযোগ এনে পরাজিত প্রার্থী বিএনপির মাহমুদুল হাসান হাইকোর্টের নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে আবেদন করেন।

আবেদনে সোনালী ব্যাংকে তার বিপুল পরিমাণ ঋণ এবং ময়মনসিংহ টেলিফোন এক্সচেঞ্জে বকেয়া বিল থাকার বিষয়টি তুলে ধরা হয়।

শুনানি শেষে হাইকোর্টের নির্বাচনী ট্রাইব্যুনাল আবুল কাশেমের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার গেজেট অবৈধ ঘোষণা করেন। তিনি আপিল বিভাগে গেলেও ২০১২ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি তার আপিল খারিজ হয়ে যায়। এর ফলে সংসদ সদস্য পদ বাতিল হয় তার।

বিজ্ঞাপন

মহীউদ্দীন খান আলমগীর

‘ওয়ান-ইলেভেন’-পরবর্তী সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে দুর্নীতির মামলায় আওয়ামী লীগ নেতা মহীউদ্দীন খান আলমগীরের ১৩ বছরের কারাদণ্ড হয়। প্রায় ২০ মাস কারাভোগের পর ২০০৮ সালের অক্টোবরে মুক্তি পান তিনি।

২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চাঁদপুর-১ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিলে দণ্ডের কারণে রিটার্নিং কর্মকর্তা তা বাতিল করেন। পরে আইনি লড়াইয়ে প্রার্থিতা ফিরে পান এবং নির্বাচনে জয়ী হয়ে সংসদ সদস্য হন।

বিজ্ঞাপন

দণ্ডপ্রাপ্ত অবস্থায় নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার বিষয়টি নিয়ে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়। পরবর্তী সময়ে সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের পর নির্বাচন কমিশন তার আসন শূন্য ঘোষণা করে।

মেজর (অব.) জসিমউদ্দিন

২০০৮ সালের নির্বাচনে ভোলা-৩ আসন থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মেজর (অব.) জসিমউদ্দিন। এর আগে ২০০৪ সালের আগস্টে তাকে সেনাবাহিনী থেকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়েছিল।

বিজ্ঞাপন

তৎকালীন আইনে সরকারি চাকরি থেকে অবসরের পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ ছিল। এ বিষয়টি তুলে ধরে তার প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থী হাফিজ উদ্দিন আহমদ উচ্চ আদালতে রিট করেন।

আইনি প্রক্রিয়া শেষে উচ্চ আদালত জসিমউদ্দিনের সংসদ সদস্য পদ অবৈধ ঘোষণা করেন। পরে তার আসন শূন্য ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন।

মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান

কিশোরগঞ্জ-২ আসনের সাবেক বিএনপি সংসদ সদস্য মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে সংসদ অধিবেশনে যোগ দেওয়ায় সংসদ সদস্য পদ হারিয়েছিলেন।

২০০০ সালে বিএনপি সংসদ বর্জনের সিদ্ধান্ত নিলেও তিনি অধিবেশনে অংশ নেন। দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থানের কারণে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তার আসন শূন্য ঘোষণা করা হয়।

এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতে গেলেও সপ্তম সংসদ বিলুপ্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত তার আসন শূন্যই ছিল।

হাসিবুর রহমান স্বপন

সিরাজগঞ্জ-৭ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়নে সপ্তম সংসদে নির্বাচিত হন হাসিবুর রহমান স্বপন। ১৯৯৮ সালে বিএনপি থেকে পদত্যাগ করে আওয়ামী লীগে যোগ দেন এবং পরে উপমন্ত্রী হন।

দল পরিবর্তনের কারণে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের বিধান অনুযায়ী তার সংসদ সদস্য পদ বাতিল হয়ে যায়।

মোহাম্মদ আলাউদ্দিন

১৯৯৮ সালে রাজশাহী-৫ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মোহাম্মদ আলাউদ্দিন। পরে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রীর দায়িত্ব পান।

দল পরিবর্তনের পর তার সংসদীয় আসন শূন্য হয়ে যায়। অবশ্য পরবর্তী উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে আবারও জয়ী হয়ে সংসদ সদস্য হন তিনি।

সুলতান মোহাম্মদ মনসুর ও জাহিদুর রহমান

২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট থেকে নির্বাচিত আট সংসদ সদস্য প্রথমে শপথ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তবে মৌলভীবাজার-২ আসনের গণফোরাম নেতা সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ জোটের সিদ্ধান্ত অমান্য করে ২০১৯ সালের ৭ মার্চ শপথ নেন। একই দিন তাকে গণফোরাম থেকে বহিষ্কার করা হয়।

এরপর ২৫ এপ্রিল ঠাকুরগাঁও-৩ আসনের বিএনপি প্রার্থী জাহিদুর রহমান শপথ নেন। দুই দিন পর তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। তবে দল থেকে বহিষ্কারের কারণে তাদের সংসদ সদস্য পদ বাতিল হয়নি।

পরে বিএনপি সংসদে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে দলের আরও চারজন সংসদ সদস্য ২৯ এপ্রিল শপথ নেন। বগুড়া-৬ আসনে নির্বাচিত দলের তৎকালীন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শপথ না নেওয়ায় ওই আসনে উপনির্বাচন হয় এবং বিএনপির গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ নির্বাচিত হন। পরবর্তী সময়ে জাহিদুর রহমানের বহিষ্কারাদেশও প্রত্যাহার করে বিএনপি।

এইচ এম গোলাম রেজা

২০০৮ সালে মহাজোটের মনোনয়নে সাতক্ষীরা-৪ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন জাতীয় পার্টির নেতা এইচ এম গোলাম রেজা। জীবনবৃত্তান্ত ও সংসদে অসত্য তথ্য দেওয়ার অভিযোগে ২০১২ সালের অক্টোবরে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।

তবে দল থেকে বহিষ্কার হলেও তার সংসদ সদস্য পদ বাতিল হয়নি।

আবু হেনা

অষ্টম জাতীয় সংসদে ২০০১ সালে রাজশাহী-৪ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়নে নির্বাচিত হন সাবেক আমলা আবু হেনা। ২০০৫ সালে নিজ এলাকায় সংবাদ সম্মেলন করে তৎকালীন বিএনপি সরকারের এক মন্ত্রীর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তোলেন তিনি।

রাজশাহীর বাগমারায় উগ্রবাদীদের হাতে স্থানীয় মানুষ নির্যাতনের শিকার হওয়ার প্রেক্ষাপটে ওই বক্তব্য দেন আবু হেনা। পরে তাকে বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হয়।

তবে সংসদের তৎকালীন স্পিকার জমির উদ্দিন সরকার সিদ্ধান্ত দেন, দল থেকে বহিষ্কার হলেও আবু হেনার সংসদ সদস্য পদ বহাল থাকবে।

অতীতের এসব ঘটনায় দেখা যায়, কোনো সংসদ সদস্য দল থেকে বহিষ্কৃত হলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার সংসদ সদস্য পদ বাতিল হয়নি। আবার আদালতের রায়, নির্বাচনী অযোগ্যতা, বিদেশে দণ্ড কিংবা সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের মতো নির্দিষ্ট আইনি কারণে কয়েকজনের আসন শূন্য হওয়ার নজিরও রয়েছে।

জেবি/জেএইচআর

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD