Logo

সৌদিগামী ফ্লাইট বাতিলে বিপাকে হাজারো রেমিট্যান্স যোদ্ধারা

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
১৯ অক্টোবর, ২০২৬, ১৭:৪৩
সৌদিগামী ফ্লাইট বাতিলে বিপাকে হাজারো রেমিট্যান্স যোদ্ধারা
ছবি: সংগৃহীত

সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোতে নিরাপত্তাজনিত বিধিনিষেধের কারণে একের পর এক ফ্লাইট বাতিল ও স্থগিত হওয়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন বাংলাদেশি প্রবাসী কর্মীরা। ছুটি কাটিয়ে কর্মস্থলে ফেরার অপেক্ষায় থাকা অনেকেই সময়মতো সৌদি আরবে পৌঁছাতে পারছেন না। এতে আকামা ও ভিসার মেয়াদ, চাকরি এবং অতিরিক্ত যাত্রাব্যয় নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তারা।

বিজ্ঞাপন

হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রবিবার (১৮ অক্টোবর) সৌদিগামী যাত্রীদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা যায়। হাতে টিকিট ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে কেউ এয়ারলাইন্সের কাউন্টারে খোঁজ নিচ্ছিলেন, কেউ বিকল্প ফ্লাইট খুঁজছিলেন, আবার কেউ পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে পরিস্থিতি জানাচ্ছিলেন। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ঢাকায় এসে ফ্লাইট বাতিলের খবর পাওয়ায় অনেক যাত্রী বিপাকে পড়েন।

বিকল্প পথে যেতে বাড়তি ৮০ হাজার টাকা

টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের বাসিন্দা মালেক এক মাসের ছুটি কাটিয়ে সৌদি আরবে ফেরার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। কিন্তু প্রথম টিকিট বাতিল হওয়ার পর তাকে বিকল্প রুটে যাত্রার ব্যবস্থা করতে হয়েছে। তিনি বলেন, ‘এক মাসের ছুটিতে এসেছিলাম। ইয়েমেনের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কারণে প্রথম টিকিট ক্যান্সেল হয়েছে। এখন দুবাই হয়ে মদিনায় যাচ্ছি। এতে ৮০ হাজার টাকা বাড়তি দিয়ে যেতে হচ্ছে। কারণ যদি যেতে না পারি মরণ ছাড়া গতি নেই।’

বিজ্ঞাপন

কুমিল্লার চান্দিনার মো. শরীফ সরকার তিন মাসের ছুটি শেষে সৌদি আরবে ফিরতে চেয়েছিলেন। তার আশঙ্কা, আকামার মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে কর্মস্থলে ফেরা কঠিন হয়ে পড়বে। বিমানবন্দরে এসে তিনি জানতে পারেন, সকাল ১১টার রিয়াদ-দাম্মাম ফ্লাইটটি বাতিল হয়েছে। পরে তাকে রাত সাড়ে ৮টার ফ্লাইটে মদিনা হয়ে দাম্মাম যাওয়ার কথা জানানো হয়।

হতাশা প্রকাশ করে শরীফ বলেন, ‘যাইতে পারি কি না আল্লাহ জানেন।’

প্রথমবার বিদেশযাত্রাতেও অনিশ্চয়তা

বিজ্ঞাপন

নাটোরের বড়াইগ্রামের আতিকুল ইসলাম প্রথমবারের মতো চাকরি নিয়ে সৌদি আরব যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। গত ১২ অক্টোবর বিমানবন্দরে এসে ফ্লাইট বাতিলের খবর পান। রবিবার আবারও বিমানবন্দরে গিয়ে যাত্রার সময় নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েন তিনি। পরে বাবাকে সঙ্গে নিয়ে গুলশান-২ এলাকায় গালফ এয়ারের কার্যালয়ে যোগাযোগ করতে যান।

আতিকুলের বাবা আদম আলী বলেন, ‘আমি কৃষক মানুষ অনেক আশা নিয়ে আমার সর্বস্ব দিয়ে ছেলেকে বিদেশে পাঠাচ্ছি। যদি যেতে না পারে আমার ছেলের আকামা থাকবে না। আমার মুখের ভাষা বন্ধ হয়ে যাবে।’

প্রায় দুই ঘণ্টা পর ফিরে এসে আতিকুল জানান, রাত ৮টার ফ্লাইটে বিকল্প রুটে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

কুমিল্লার বাসিন্দা মো. আসাদও সৌদি এয়ারলাইন্সের রাত ১১টার ফ্লাইট বাতিলের বিষয়ে আগে থেকে জানতে পারেননি। তিনি বলেন, ‘সৌদি এয়ারলাইন্সে রাত ১১টায় আমার ফ্লাইট ছিল। কিন্তু আমি জানিই না আমার ফ্লাইট ক্যান্সেল হয়েছে। যদি যাইতে না পারি তাহলে আমার সব ছারখার হয়ে যাবে।’

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবার মো. মাইনুদ্দীনের সরাসরি ফ্লাইটও পরিবর্তন করা হয়। রাত ১টা ৪০ মিনিটে সৌদি এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে যাওয়ার কথা থাকলেও তাকে দুবাই হয়ে মদিনা যাওয়ার বিকল্প দেওয়া হয়। এতে বাড়তি ভাড়া দিতে না হলেও দীর্ঘ যাত্রা ও রুট পরিবর্তনের কারণে ভোগান্তিতে পড়েছেন তিনি।

কর্মস্থলে ফিরতে পারছেন না ছুটি কাটানো প্রবাসীরা

বিজ্ঞাপন

নোয়াখালী থেকে আসা সৌদি আরবের রিয়াদপ্রবাসী আব্দুল মান্নান চার মাস আগে দেশে এসেছিলেন। রবিবার দুপুরে সৌদি আরবে ফেরার কথা থাকলেও বিমানবন্দরে গিয়ে ফ্লাইট বাতিলের খবর পান।

তিনি বলেন, ‘চার মাস আগে দেশে এসেছিলাম। নোয়াখালী থেকে ঢাকায় এসে ফ্লাইট ধরার প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। এখন হঠাৎ ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় বিপাকে পড়েছি। কবে যেতে পারব, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় আছি। সৌদি আরবে আমার জরুরি কাজ আছে। তারিখমতো ফিরতে না পারলে ভয়াবহ সমস্যায় পড়তে হবে। ফ্লাইটের বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত জানানো হলে আমাদের ভোগান্তি কিছুটা কমত।’

মালেক, শরীফ, আসাদ ও আব্দুল মান্নানের মতো অনেক প্রবাসীর যাত্রা আটকে যাওয়ায় তাদের চাকরি ও ভিসার মেয়াদ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিকল্প রুটের টিকিটের দাম বেড়ে যাওয়ায় অনেককে অতিরিক্ত অর্থের ব্যবস্থাও করতে হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

১১৮টি ফ্লাইট বাতিল বা স্থগিত, ভোগান্তিতে ১৮ হাজারের বেশি যাত্রী

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবের বিভিন্ন বিমানবন্দরে ফ্লাইট চলাচলে বিধিনিষেধের কারণে বাংলাদেশ থেকে সরাসরি ও ট্রানজিট রুটে চলাচলকারী ১১৮টি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল বা স্থগিত হয়েছে। এতে মোট ১৮ হাজার ৩৬২ জন যাত্রী ভোগান্তিতে পড়েছেন।

বাতিল বা স্থগিত ফ্লাইটের মধ্যে সরাসরি ফ্লাইট ৫২টি এবং ট্রানজিট ফ্লাইট ৬৬টি। বেবিচকের সহকারী পরিচালক (জনসংযোগ) কাওছার মাহমুদ বলেন, ‘এই পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে ফ্লাইট বাতিলের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে।’

বিজ্ঞাপন

বিকল্প ফ্লাইটে যাত্রী পাঠানোর উদ্যোগ

যাত্রীদের দুর্ভোগ কমাতে এবং ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার ঝুঁকি এড়াতে বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। আসন খালি থাকা সাপেক্ষে সৌদি আরবের দাম্মাম ও মদিনাগামী ফ্লাইটে যাত্রীদের বিনা অতিরিক্ত খরচে সমন্বয় করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত গত সোমবার জানান, যাদের ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, তাদের বিকল্প ফ্লাইটে পাঠানোর চেষ্টা চলছে।

বিজ্ঞাপন

বিদেশগামী কর্মীর সংখ্যা কমেছে

বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ১২ অক্টোবর পর্যন্ত বিদেশে যাওয়ার ছাড়পত্র নিয়েছিলেন ৮ লাখ ৫৩ হাজার ৬৬ জন কর্মী। চলতি বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮০ হাজার ৬৩২ জনে। অর্থাৎ কমেছে প্রায় ৩২ শতাংশ।

শুধু সৌদি আরবগামী কর্মীদের ক্ষেত্রে ছাড়পত্রের সংখ্যা ৫ লাখ ৭২ হাজার ৫৪ থেকে কমে ৩ লাখ ১১ হাজার ৫৬৭ হয়েছে। এ ক্ষেত্রে হ্রাসের হার প্রায় ৪৬ শতাংশ।

বিজ্ঞাপন

অন্যদিকে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ছয় লাখের বেশি বাংলাদেশি সৌদি আরবে গেছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ওই সময়ে সৌদি আরব থেকে দেশে ৫৮৫ কোটি মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৩৭ শতাংশ বেশি।

সৌদিগামী ফ্লাইট চলাচল স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত প্রবাসী কর্মীদের যাত্রা, কর্মস্থলে যোগদান ও আর্থিক পরিকল্পনা নিয়ে অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD