স্বাধীন মত প্রকাশ ও সাংবাদিকতার যত আইন!

ছবি: সংগৃহীত
আজাহারুল ইসলাম (সুজন): মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম চেতনা ও দাবি ছিল গণতন্ত্র। সংবিধানেও মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে সুসংহত করা হয়েছে। যদিও দেশে মত প্রকাশ ও সাংবা...
বিজ্ঞাপন
আজাহারুল ইসলাম (সুজন): মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম চেতনা ও দাবি ছিল গণতন্ত্র। সংবিধানেও মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে সুসংহত করা হয়েছে। যদিও দেশে মত প্রকাশ ও সাংবাদিকতার পথ রুদ্ধ করতে নানা আইন-আদালত সৃষ্টি করা হচ্ছে। সুরক্ষার কথা বলা হলেও উল্টো এসব আইনের যথেচ্ছ ব্যবহার হচ্ছে সাংবাদিকদের হয়রানি ও হেনস্তায়। বিশেষ করে গত কয়েক বছরে ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট প্রয়োগের মূল লক্ষ্যবস্তুই ছিল সাংবাদিকরা।
বাংলাদেশে সাংবাদিকেরা প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক নির্যাতনের শিকার হন সবচেয়ে বেশি। আর সাংবাদিকদের প্রচলিত আইন ছাড়াও আরো কমপক্ষে ১৯ ধরনের আইন ও বিধি মাথায় নিয়ে কাজ করতে হয়। কিন্তু সাংবাদিককের সুরক্ষার কোনো আইন নাই। প্রতীচ্যের দিক থেকে ফিরিয়ে প্রাচ্যে নজর দিন; প্রায় একই ছবি দেখা যাবে। এই উপমহাদেশের প্রায় সব কটি দেশের সংবাদমাধ্যমেরই কমবেশি হাসফাঁস অবস্থা। ভৌগলিকভাবে প্রতিবেশী দেশগুলো সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রশ্নেও একে অপরের ঘনিষ্ঠ সহযোগী। এ যেন মিলের ওপর সোয়া মিল! সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সূচকে বিশ্বের বৃহৎ গণতন্ত্র ও ঘর-লাগোয়া প্রতিবেশী ভারতের অবস্থান গত কয়েক বছর ধরেই নিম্নমুখী। সংবাদমাধ্যমের অফিসে আয়কর বিভাগ থেকে পুলিশের তল্লাশি, সাংবাদিক হত্যা থেকে মামলা কিছুই বাদ যাচ্ছে না। সাংবাদিক সুরক্ষার কোনো আইন নাই বলেই সহজেই চুরি, ডাকাতিসহ রাষ্ট্রদ্রোহের মামলার আসামি করা যায় সাংবাদিকদের। সংবাদ সংগ্রহ কালে হতে হয় নির্যাতনের শিকাড়।
শাসকদের স্বরে সুর মেলানো সংবাদমাধ্যমের কাণ্ডারিরা জেগে না উঠলে তাদের ঘুম আর ভাঙার নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ঘুম চিরঘুমে রূপান্তরিত হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না, ইতিহাস তার সাক্ষী।
বিজ্ঞাপন
সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে এবং সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এত আইন কেন?
পুরনো আইনের মধ্যে প্রিন্টিং প্রেসেস অ্যান্ড পাবলিকেশন্স .ডিক্লেয়ারেশন অ্যান্ড রেজিস্ট্রেশন) অ্যাক্ট, ১৯৭৩ এ আইনটি সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে দায়িত্ব নির্ধারণ করে দিয়েছে।
ফৌজদারি কার্যবিধির ৯৯ (ক) (খ) (গ) (ঘ) (ঙ) (চ) ধারায় সংবাদপত্র বিষয়ে সরকারকে কিছু ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট, ১৯২৩ এ আইনের ৩ ধারায় বলা হয়েছে, নিষিদ্ধ স্থানে যদি কেউ যায় বা যেতে উদ্যত হয় কিংবা ওই স্থানের কোনো নকশা বা স্কেচ তৈরি করে বা কোনো গোপন তথ্য সংগ্রহ বা প্রকাশ করে তবে সে অপরাধী হবে। ৩ (ক) ধারায় বলা হয়েছে যে, নিষিদ্ধ স্থানের কোনো ফটো, স্কেচ বা নক্সা কেউ প্রকাশ করতে পারবে না। ৪ ধারায় বলা হয়েছে যে, কোনো বিদেশী এজেন্টের সঙ্গে যোগাযোগ করে খবর সংগ্রহ করা যাবে না। ৫ ধারায় বলা হয়েছে যে, কোনো ব্যক্তি গোপনে কোনো সংবাদ পেয়ে থাকলে সেই সংবাদ প্রকাশ করতে পারবে না। কোনো সংবাদপত্র যদি কোনো গোপন সংবাদ প্রকাশ করে তবে প্রতিবেদক, সম্পাদক, মুদ্রাকর এবং প্রকাশক অপরাধী হবেন। এসব কাজে সহায়তা করা অপরাধ বলে গণ্য হবে।
নতুন আইন আইসিটি অ্যাক্ট, ডিজিটাল সিকিউরিটি, গণমাধ্যমকর্মী আইন, ডাটা প্রটেক্ট ল, ওটিটি। এসব আইনের নাম ভিন্ন হলেও এগুলো প্রয়োগের যে পরিধি, সেখানে ঘুরেফিরে মত প্রকাশের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করার সুযোগ সৃষ্টি হয়। এগুলো সৃষ্টিশীল কাজের প্রতিবন্ধক। ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের মাধ্যমে সাংবাদিকতা পেশা বিকশিত হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। এ আইনে ২০ জায়গায় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে, যার ১৪টিই জামিন অযোগ্য। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মোট ৪৮টি ধারার মধ্যে ০১ থেকে ১৬ ধারায় ডিজিটালের সংজ্ঞা, ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব, ইমার্জেন্সি রেসপন্সটিম গঠন এবং ১১ সদস্যের একটি ডিজিটাল নিরাপত্তা কাউন্সিল গঠনের বিষয়ে উল্লেখ রয়েছে। এই আইনে ১৭, ১৯, ২১, ২২, ২৩, ২৪, ২৬, ২৭, ২৮, ৩০, ৩১, ৩২, ৩৩, ৩৪ ধারাসমূহ আমলযোগ্য ও জামিনযোগ্য এবং আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে আপসযোগ্য, অপরাধের বিচার ও দন্ডের বিষয়ে ১৭-৪৮ ধারায় বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে।
এই আইনের বহুল আলোচিত ৫৭ ধারাসহ উল্লিখিত পাঁচটি ধারা বাতিল করা হয়েছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ তে ৪৮টি ধারায় বিভিন্ন অপরাধ ও শাস্তির বিধান উল্লেখ রয়েছে। উল্লেখযোগ্য বহুল আলোচিত ৩২ ধারায় বলা হয়েছে, ‘সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্টানে কেউ যদি বেআইনীভাবে প্রবেশ করে কোনো ধরনের তথ্য-উপাত্ত, যে কোনো ধরনের ইলেকট্রানিক্স যন্ত্রপাতি দিয়ে গোপনে রেকর্ড করে, তাহলে সেটা গুপ্তচর বৃত্তির অপরাধ হবে এবং এ অপরাধে সেই ব্যক্তি ১৪ বছরের কারাদন্ড ও ২০ লক্ষ টাকা জরিমানা বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবেন।’
বিজ্ঞাপন
এই আইনের ২৮ ধারায় রয়েছে, ‘কেউ যদি ধর্মীয়বোধ ও অনুভূতিতে আঘাত করে, তাহলে তার ১০ বছরের জেল ও ২০ লক্ষ টাকা জরিমানা হবে। ২৯ ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে, ‘কেউ মানহানিকর কোনো তথ্য দিলে সেই ব্যক্তির ৩ বছরের জেল ও ৫লক্ষ টাকা জরিমানা বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবে।’ আইনের অপপ্রয়োগের মাধ্যমে ভয়াবহভাবে নিপিড়নের মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই আইনের ফলে মানুষের অধিকার খর্ব করার প্রচেষ্টা, বাক স্বাধীনতা দমনের ব্যবস্থাসহ অপরাপর যেসব প্রভাব পড়ছে তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে: ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মানুষের নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি, এই আইনের ফলে দুর্নীতির ব্যাপক বিস্তার, শাসকদের হাতে নিপিড়নের শক্তিশালী অস্ত্র তুলে দেওয়া, সরকারের কোনো অপছন্দের মানুষকে অতি সহজে আটক, কারো কাছ থেকে কোনো তথ্য সংগ্রহ করা যাবে না, ঘুষ-দুর্নীতির মাত্রা সর্বত্র প্রসারিত হবে, সাংবাদিকদের হাত-পা বেঁধে গণমাধ্যম পঙ্গু করে দেওয়া হবে, সাংবাদিককে অতি সহজেই গুপ্তচর হিসেবে চিহ্নিত করা যাবে, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা করা যাবে না, আমলাদের দুর্নীতি-ঘুষ বাণিজ্যের খবর প্রকাশ করা যাবে না, ঘুষ গ্রহণের ছবি ও তথ্য প্রকাশ করা যাবে না, দুর্নীতিবাজ-শাসক আমলাদের দুর্নীতি ও ঘুষগ্রহণ অবাধে করতে পারবে, অসাধুদের প্রভাব ও অপতৎপরতা ক্রমাগত বেড়ে যাবে।
প্রশ্ন হলো, স্বাধীন মত প্রকাশের বিরুদ্ধে এত আইন কেন? এত আইন দিয়ে কেন আমাদের হাত-পা বেঁধে দিতে হবে। গণমাধ্যমের হাত-পা বেঁধে দিয়ে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের বিকাশ হবে না। গণতন্ত্র আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম একটি চেতনা, একটি স্বপ্ন ও একটি দাবি। গণমাধ্যমের হাত-পা বেঁধে গণতন্ত্রকে ব্যাহত করার চেষ্টা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী।
মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত আমাদের সংবিধানে মানুষের বিবেকের স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছে। সেই বিবেক অনুযায়ী মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকতে হবে। সেটা প্রকাশ করার সুযোগ যদি না থাকে, তাহলে গণতন্ত্র থাকবে না। বাংলাদেশের মানুষ গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করেছে। কাজেই সেই অধিকার তাদের দিতে হবে। গণমাধ্যমের ওপর নজরদারি নেতিবাচকভাবে দেখলে চলবে না। সাংবাদিকদের ওপর নজরদারি প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির লক্ষ্যে নয়, সাংবাদিকদের তুলে আনা বিভিন্ন সংবাদের ভিত্তিতে যথাযথ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে।
বিজ্ঞাপন
জেবি/আরএইচ/








