Logo

বিশ্ব বাঘ দিবস আজ: সুন্দরবনে বাড়ছে রয়েল বেঙ্গল টাইগার

profile picture
জেলা প্রতিনিধি
বাগেরহাট
২৯ জুলাই, ২০২৬, ১২:০৪
বিশ্ব বাঘ দিবস আজ: সুন্দরবনে বাড়ছে রয়েল বেঙ্গল টাইগার
ছবি: সংগৃহীত

আজ ২৯ জুলাই বিশ্ব বাঘ দিবস। দিবসটি উপলক্ষে সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার সংরক্ষণ নিয়ে আশাব্যঞ্জক চিত্র তুলে ধরেছেন বন বিভাগ ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, সুন্দরবনের বাঘ রক্ষা মানে শুধু একটি বিপন্ন প্রাণীকে সংরক্ষণ করা নয়, বরং বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন, এর সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য এবং উপকূলীয় পরিবেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাঘ হত্যা, পাচার এবং মানুষ-বাঘের সংঘাত উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। একই সঙ্গে সুন্দরবনে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের উপস্থিতি ও বিচরণও বেড়েছে।

বিজ্ঞাপন

বন বিভাগের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শুমারিতে বাংলাদেশ অংশের সুন্দরবনে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২৫টি। এর আগে ২০১৪ সালের শুমারিতে এ সংখ্যা ছিল ১০৬ এবং ২০১৮ সালে বেড়ে হয়েছিল ১১৪। ধারাবাহিকভাবে বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধিকে সংরক্ষণ কার্যক্রমের সফলতার অন্যতম বড় প্রমাণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, কঠোর আইন প্রয়োগ, প্রযুক্তিনির্ভর বন টহল, ক্যামেরার মাধ্যমে নজরদারি, আকাশপথে পর্যবেক্ষণ এবং স্থানীয় জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণের ফলে বর্তমানে বাঘ হত্যা ও মানুষ-বাঘের সংঘাত অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে। তবে চোরাশিকার, পাচার, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, নদীভাঙন এবং বাঘের আবাসস্থল সংকুচিত হওয়ার মতো চ্যালেঞ্জ এখনও পুরোপুরি দূর হয়নি। এসব বিষয় সুন্দরবনের বাঘ সংরক্ষণের জন্য বড় ধরনের হুমকি হিসেবে রয়ে গেছে।

বাংলাদেশে বাঘ সংরক্ষণে প্রথম বড় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল ১৯৭৩ সালে। সে সময় বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ-সংক্রান্ত আইনের মাধ্যমে সুন্দরবনে বাঘ শিকার নিষিদ্ধ করা হয়। পরবর্তীতে ২০১২ সালের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইনে বাঘ শিকার, হত্যা, পাচার এবং অবৈধ বাণিজ্যের বিরুদ্ধে আরও কঠোর শাস্তির বিধান যুক্ত করা হয়। এরপর থেকে বন বিভাগ আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় বাঘ সংরক্ষণ কার্যক্রম আরও বিস্তৃত ও কার্যকরভাবে পরিচালনা করে আসছে।

বিজ্ঞাপন

তবে অতীতের চিত্র ছিল উদ্বেগজনক। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত প্রায় আড়াই দশকে পূর্ব সুন্দরবনে অন্তত ৯১টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে চোরাশিকারি ও পাচারকারীদের হাতে ২৬টি, বনদস্যুদের হাতে ১৮টি, গ্রামবাসীর পিটুনিতে ১৪টি, বার্ধক্যজনিত কারণে ২১টি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে তিনটি বাঘ মারা যায়। এছাড়া উদ্ধার হওয়া বিভিন্ন বাঘের চামড়ার সূত্র ধরে আরও কয়েকটি বাঘ পাচারের শিকার হয়েছে বলে ধারণা করা হলেও সেসব ঘটনার নির্ভরযোগ্য তথ্য সংরক্ষিত হয়নি। একই সময়ে বাঘের আক্রমণে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৪২৫ জন বনজীবী।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

তবে সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়েছে বলে জানিয়েছে বন বিভাগ। নিয়মিত টহল, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, বন অপরাধ দমন এবং স্থানীয় জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে মানুষ ও বাঘের সংঘাত কমেছে। এর ইতিবাচক ফল হিসেবে ২০২৪ সালের পর থেকে সুন্দরবনে কোনো বাঘ হত্যা কিংবা অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি বলে দাবি করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জে শিকারিদের পাতা ফাঁদে আটকা পড়ে একটি পূর্ণবয়স্ক বাঘিনী। বন বিভাগের সদস্যরা সেটিকে উদ্ধার করে খুলনার বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের পুনর্বাসন কেন্দ্রে নিয়ে প্রায় ছয় মাস চিকিৎসা ও নিবিড় পরিচর্যা করেন। পরে গত ১২ জুলাই সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়ার পর বাঘিনীটিকে আবার সুন্দরবনের প্রাকৃতিক আবাসস্থলে অবমুক্ত করা হয়। তার চলাচল পর্যবেক্ষণের জন্য বনাঞ্চলের প্রায় আট কিলোমিটার এলাকায় ২০টি স্বয়ংক্রিয় ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। বন বিভাগের মতে, এটি বাংলাদেশের বাঘ সংরক্ষণ কার্যক্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য।

বিশ্ব বাঘ দিবসের আগে মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে পূর্ব সুন্দরবনের দুটি স্থানে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের দেখা মিলেছে। প্রথমে চাঁদপাই রেঞ্জের আন্ধারমানিক পর্যটনকেন্দ্রসংলগ্ন বন কার্যালয় এলাকায় এবং পরে শরণখোলা রেঞ্জের কচিখালী অভয়ারণ্যের টাইগার পয়েন্ট এলাকায় নদী সাঁতরাতে দেখা যায় একটি বাঘটিকে।

গত ২৪ জুলাই আন্ধারমানিক বন কার্যালয়ের সামনে একটি বাঘিনী কিছু সময় খোলা স্থানে অবস্থান করে পরে জঙ্গলে ফিরে যায়। এরপর ২৬ জুলাই সকালে কচিখালী এলাকায় বন বিভাগের একটি টহল নৌকার সামনে নদী পার হতে দেখা যায় আরেকটি বাঘটিকে। নৌকার শব্দ শুনে সেটি মাঝপথ থেকেই ফিরে যায়। বন বিভাগের স্মার্ট টিমের নৌকাচালক সাইফুর রহমান মোবাইল ফোনে সেই বিরল দৃশ্য ধারণ করেন।

বিজ্ঞাপন

পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক মো. শরীফুল ইসলাম বলেন, নদী ও খাল পেরিয়ে সাঁতার কাটা বাঘের স্বাভাবিক আচরণের অংশ। খাদ্যের সন্ধান, নিজস্ব এলাকা পরিবর্তন কিংবা অন্য প্রাকৃতিক প্রয়োজনেই তারা নিয়মিত পানিপথ অতিক্রম করে। তবে এত কাছ থেকে এমন দৃশ্য খুব কমই দেখা যায়।

পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, সরকার সুন্দরবনের বাঘ সংরক্ষণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। নিয়মিত টহল, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, বন অপরাধ দমন এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণের ফলে মানুষ ও বাঘের সংঘাত উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। পাশাপাশি সুন্দরবনে বাঘের চলাচলও আগের তুলনায় বেড়েছে। তিনি জানান, আট কিলোমিটার এলাকাজুড়ে স্থাপন করা ২০টি ক্যামেরায় নতুন তিনটি বাঘের ছবি ধরা পড়েছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সুন্দরবনের বাঘকে নিরাপদ রাখা বন বিভাগের প্রধান লক্ষ্য।

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে সুন্দরবনে তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকায় বন অনেকটাই মানব কোলাহলমুক্ত। এতে বাঘসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণী স্বাভাবিক পরিবেশে অবাধে বিচরণ করতে পারছে এবং বন অপরাধও কমে এসেছে।

বিজ্ঞাপন

পরিবেশ সংগঠন ‘সুন্দরবন রক্ষায় আমরা’-এর প্রধান সমন্বয়কারী ড. নূর আলম শেখ বলেন, সুন্দরবনের বাঘ রক্ষায় বন বিভাগ, স্থানীয় জনগণ এবং পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ আরও শক্তিশালী করতে হবে। তার মতে, বাঘ বাঁচলে সুন্দরবন বাঁচবে, আর সুন্দরবন টিকে থাকলে উপকূলীয় পরিবেশও নিরাপদ থাকবে।

বাঘ ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. এম. এ. আজিজ বলেন, শুধু আইন প্রণয়ন করলেই বাঘ সংরক্ষণ সম্ভব নয়। বাঘকে টিকিয়ে রাখতে হলে তার প্রধান খাদ্য হরিণকেও রক্ষা করতে হবে। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা এবং বাঘের আবাসস্থল সংরক্ষণে দীর্ঘমেয়াদি, কার্যকর ও সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণের বিকল্প নেই।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার সংরক্ষণ মানে শুধু একটি প্রাণীকে রক্ষা করা নয়; বরং বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন, এর জীববৈচিত্র্য এবং বাংলাদেশের উপকূলীয় পরিবেশকে সুরক্ষিত রাখা। তাই বিশ্ব বাঘ দিবসে তাদের আহ্বান—চোরাশিকার ও পাচার সম্পূর্ণ বন্ধ, খাদ্যশৃঙ্খল অক্ষুণ্ন রাখা, বন ধ্বংস রোধ এবং স্থানীয় জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগারের নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD