পরিচিতি সংকটে এনসিপি প্রার্থীরা, জোটের টিকিট পেলেও এলাকায় ‘নতুন মুখ’

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ‘ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ’ জোটের সঙ্গে মাঠে নামছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। জোটের অংশ হিসেবে ঢাকায় ৬টিসহ সারাদেশে ৩০টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে দলটি।
বিজ্ঞাপন
তবে নির্বাচনী প্রতীক ‘শাপলা কলি’ পেলেও অধিকাংশ প্রার্থীই নিজ নিজ এলাকায় তুলনামূলকভাবে অপরিচিত এবং রাজনীতিতে নতুন। ফলে নির্বাচনের আগে পরিচিতি সংকট, সীমিত সময়ের প্রস্তুতি ও দুর্বল সাংগঠনিক অবস্থান—এই তিন বাস্তবতা এনসিপির জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজনীতিতে ‘নতুন ধারা’ ও তরুণ নেতৃত্বের বার্তা নিয়ে মাঠে নামলেও ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ তৈরির ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকার অভিযোগ রয়েছে দলটির বিরুদ্ধে। এতে করে নির্বাচনে তারা কতটা প্রভাব ফেলতে পারবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠেছে।
শুরুতে এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দেয় এনসিপি। গত নভেম্বরে ৩০০ আসনের বিপরীতে ১ হাজার ৪৮৪টি মনোনয়ন ফরম বিক্রি করে দলটি। পরে ডিসেম্বরের প্রথম ধাপে ১২৫ আসনে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটে যুক্ত হয়ে ৩০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সিদ্ধান্ত নেয় তারা।
বিজ্ঞাপন
দলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সুপারিশে সম্প্রতি জোটের পক্ষে এনসিপির চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকাও প্রকাশ করা হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অনেক প্রার্থী প্রথমে অন্য আসনে নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিলেও শেষ মুহূর্তে বদলি করা হয়েছে। কেউ কেউ আবার হঠাৎ করেই মনোনয়ন পেয়েছেন, ফলে পর্যাপ্ত জনসংযোগের সুযোগ পাননি।
বিজ্ঞাপন
অন্যদিকে বড় দলগুলোর প্রার্থীরা তফসিল ঘোষণার আগেই মাসের পর মাস এলাকায় সক্রিয় ছিলেন—সভা, সমাবেশ, লিফলেট বিতরণ, ঘরে ঘরে প্রচারণা চালিয়েছেন। তুলনায় এনসিপির প্রার্থীদের অনেকেই প্রচার শুরু করেছেন বেশ দেরিতে।
বিভিন্ন আসনে প্রাথমিক ও চূড়ান্ত মনোনয়নের তালিকায় একাধিক পরিবর্তন দেখা গেছে। ফলে স্থানীয়ভাবে স্থায়ী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
কয়েকটি নির্বাচনি এলাকায় কথা বলে জানা গেছে, অনেক ভোটারই এনসিপির প্রার্থীদের নাম প্রথমবার শুনছেন। তরুণদের মধ্যে কিছুটা আগ্রহ থাকলেও প্রবীণ ভোটারদের কাছে তারা প্রায় অপরিচিত।
বিজ্ঞাপন
ঢাকার একটি আসনের বাসিন্দা এক ভোটার বলেন, ব্যানার-পোস্টার দেখছি, কিন্তু প্রার্থী কে বা কী করবে—সে সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নেই।
বান্দরবানেও একই চিত্র। সেখানে দলীয় সিদ্ধান্তে শেষ মুহূর্তে প্রার্থী পরিবর্তন হওয়ায় স্থানীয়ভাবে প্রভাব তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন অনেকে। যদিও স্থানীয় নেতারা দাবি করছেন, থানা ও ইউনিয়নভিত্তিক কমিটি গঠনের মাধ্যমে সংগঠন শক্তিশালী করার চেষ্টা চলছে।
বিজ্ঞাপন
৩০টি আসনে ছাড়ের কথা থাকলেও সব জায়গায় এখনো পুরোপুরি সমঝোতা হয়নি। কয়েকটি আসনে জোটের শরিকদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার নিয়ে জটিলতা রয়েছে। কোথাও জামায়াত বা অন্য শরিক দল প্রার্থী রেখে দিয়েছে, আবার কোথাও পারস্পরিক সমর্থনের ঘোষণা এসেছে। এ বিষয়গুলো সমাধানে জোটের সমন্বয় কমিটি আলোচনা চালাচ্ছে বলে জানিয়েছে দলীয় সূত্র।
কিছু গুরুত্বপূর্ণ আসনে এনসিপির শীর্ষ নেতারাও শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বীর মুখে পড়েছেন। বিএনপি বা অন্যান্য বড় দলের দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী নেতাদের বিপক্ষে নতুন প্রার্থীদের টিকে থাকা কঠিন হবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। তবে যেসব আসনে জামায়াতের শক্ত সাংগঠনিক ভিত্তি রয়েছে, সেখানে জোটের সমর্থন কাজে লাগাতে পারলে এনসিপি প্রার্থীরা কিছুটা সুবিধা পেতে পারেন।
এনসিপি নেতাদের মতে, নির্বাচনই তাদের জন্য সংগঠন বিস্তারের সুযোগ। প্রচারণার মধ্য দিয়ে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হবে এবং তরুণ নেতৃত্বের প্রতি সাধারণ মানুষের আগ্রহ রয়েছে। পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা ও জোটের ভোট একত্রিত করতে পারলে বেশ কিছু আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই সম্ভব।
বিজ্ঞাপন
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের নির্বাচনি সংস্কৃতিতে ব্যক্তিগত পরিচিতি, প্রভাব ও দীর্ঘদিনের মাঠকাজ বড় ভূমিকা রাখে। সে তুলনায় নতুন দল ও অপরিচিত প্রার্থীদের জন্য পথ সহজ নয়। তবে তরুণ ভোটারদের আকর্ষণ, ‘নতুন রাজনীতি’র বার্তা এবং জোটভিত্তিক ভোট সমন্বয় ঠিকভাবে করতে পারলে কিছু আসনে চমকও দেখা যেতে পারে।
এনসিপির জন্য এবারের নির্বাচন যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনি সম্ভাবনাময়ও। সংগঠন শক্তিশালী করা ও দ্রুত জনসংযোগ বাড়াতে পারলেই কেবল ‘শাপলা কলি’ প্রতীক ভোটের মাঠে কতটা কার্যকর হয়—তার উত্তর মিলবে ভোটের দিনেই।








